যদি দু-একটা বীজ ভিজে ওঠে

প্রসঙ্গ: কৃষক আন্দোলন

কৃষকদের ডাকা ৮ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক ভারত বন্‌ধ শুরু হতে যখন আর মাত্রই কয়েক ঘন্টা বাকি, তখন, দ্রুত এই সম্পাদকীয় প্রতিবেদনের কপি প্রস্তুত করতে-করতে খবর পাচ্ছি, গোটা দিল্লি-মথুরা রোড কার্যত চলে গিয়েছে কৃষকদের দখলে। চম্বলের দিক থেকে দিল্লিতে ঢোকার পলওয়ল সীমানাও কৃষকদের স্রোতে অবরুদ্ধ। জয়পুর-দিল্লি রোড থইথই করছে মানুষে, সন্ধের পরেও হাজার-হাজার কৃষক পথ হাঁটছেন রাজধানীর উদ্দেশে। গত দশদিনের বেশি সময় ধরে দিল্লি-হরিয়ানার সীমানায় সিংঘু বর্ডারে জমায়েত হয়ে রয়েছেন লাখের বেশি কৃষক। দিল্লিতে ঢোকার অন্যান্য রাস্তাগুলোরও অধিকাংশই আপাতত পঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা কৃষকদের দখলে।

এ-বছরে গত এক দশকের মধ্যে শীতলতম নভেম্বরের সাক্ষী থেকেছে দিল্লি। এই তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে, পুলিশের নির্বিচার জলকামান ও টিয়ার গ্যাস উপেক্ষা করে, খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। সরকারের-প্রণীত তিন নয়া কৃষি-আইনের প্রত্যাহার চান তাঁরা, চান ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের লিখিত আইনি প্রতিশ্রুতি। কেবল এই দশদিন ধরেই নয়, বস্তুত তার দু’মাস আগে থেকেই কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে পঞ্জাবের কৃষকরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। আন্দোলনের আঁচ ক্রমেই বাড়ছিল, কিন্তু, সম্ভবত রাজধানী দিল্লিতে তার উত্তাপ এসে পৌঁছয়নি বলেই তা নিয়ে মোদি সরকার বিশেষ মাথা ঘামায়নি। কিন্তু, তারপর পরিস্থিতি দ্রুত পালটেছে, এবং যথাসময়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকদের কথায় কর্ণপাত না-করার মাশুল অবশেষে গুনতে হয়েছে সরকারকে। গত সপ্তাহকালব্যাপী রাজধানী শহর কার্যত অবরুদ্ধ, দফায়-দফায় বৈঠক করে, অযথা কালক্ষেপণের সম্ভাব্য সমস্ত কৌশল অবলম্বন করে, পঞ্জাব ও অন্যান্য রাজ্যের কৃষকদের মধ্যে বিভেদ রচনার জন্য যাবতীয় শঠতার আশ্রয় নিয়ে, গোদি-মিডিয়াকে লেলিয়ে দিয়ে কৃষকদের খালিস্তানি প্রমাণের চক্রান্ত করে, মাসোহারাভোগী আইটি সেল ও পদলেহক ভক্তবৃন্দের সম্মিলিত উদ্যোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুৎসা ও মিথ্যা সংবাদের বন্যা বইয়ে দিয়েও কৃষকদেরকে তাঁদের দাবি থেকে বিন্দুমাত্র হেলানো সম্ভব হয়নি, তাঁদের শান্ত অথচ প্রত্যয়ী অবস্থানের সামনে উলটে নিজেদের সুর ক্রমান্বয়ে নরম করতে হয়েছে, যুক্তির লড়াইয়ে পিছু হঠে আইনে কিছু প্রসাধনী পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে – কিন্তু সমস্তরকম ছলচাতুরির বিপরীতে সটান দাঁড়িয়ে থেকে কৃষকরা জানিয়ে দিয়েছেন, তিন কালা-কানুন প্রত্যাহার না-করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এবং এই আন্দোলন যে কেবল পঞ্জাবের আন্দোলন নয়, তা প্রমাণ করতে আজ, ৮ ডিসেম্বর দেশজোড়া বন্‌ধের ডাক দিয়েছেন তাঁরা।

এরই মধ্যে আশ্চর্য সব রূপকথার জন্ম দিয়েছে এই দিল্লি অবরোধ। কৃষক বলতে যাঁরা সচরাচর দুবলা-পাতলা এবং ‘নিছকই আত্মহত্যাপ্রবণ’ চাষিভাইদের বুঝতেন ও তাঁদের নিয়ে মধ্যে-মধ্যে আহা-উহু করে মোলায়েম করুণাবর্ষণ করতে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁরা হঠাৎ সচকিত হয়ে লক্ষ করেছেন, এঁরা অন্য ভাষায় কথা বলেন। এঁরা জলকামানের বদলে পাটকেল ছোড়েন না বা ট্রাকে করে পাথর নিয়ে আন্দোলনের ময়দানে আসেন না কিংবা অন্য নানা কায়দায় গোলমাল পাকিয়ে দিতে চাইলে প্ররোচিত হন না ঠিকই, কিন্তু চোখরাঙানি দেখে পৃষ্ঠপ্রদর্শনও করেন না, সরকার ছলেবলে তাঁদের বুরারি ময়দানে সরে যেতে বললে শান্তভাবে তা অস্বীকার করেন, সরকারি ভবনে বৈঠক করতে এসে সরকারের দেওয়া খাবার প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের আনা খাবার খাওয়ার সাহস রাখেন, মন্ত্রিমহোদয়রা কথার মারপ্যাঁচে ভুলিয়ে দরকষাকষি করতে চাইলে বিরক্তি সত্ত্বেও সভাভঙ্গ না-করে বৈঠকের মধ্যেই মৌনব্রত নিয়ে পালটা প্যাঁচ কষতে জানেন। এবং সবশেষে এ-কথাও সরকারকে মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না যে, রুটি গুগ্‌ল থেকে ডাউনলোড-যোগ্য নয়— সরকার চাইলে চেষ্টা করে দেখতে পারে। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা জানিয়ে দেন যে, মাঝপথে পিছু হঠার কোনও ইচ্ছে তাঁদের নেই— লড়াই দীর্ঘমেয়াদি হবে জেনেই, এবং তার জন্য রীতিমত প্রস্তুত হয়েই তাঁরা বেরিয়েছেন। একইসঙ্গে, জলকামানের মুখে দাঁড়িয়েও সরকারের বেতনভুক সিপাইদের ডেকে এনে তাঁরা নিজেদের লঙ্গরের খাবার খাওয়ান, খোদ কৃষিমন্ত্রীকে পর্যন্ত লঙ্গরে এসে দুধ-জিলেবি খেয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে ভোলেন না। এরই পাশাপাশি হরিয়ানার চাষিরা যখন নিজেরা এই আন্দোলনে যোগ দেন এবং নিজেদের গুদাম খুলে খাদ্যদ্রব্যের সম্ভার নিয়ে তাঁদের পঞ্জাবি ভাইদের পাশে দাঁড়ান; রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র থেকে কৃষকরা দলে-দলে এসে তাঁদের শক্তি বাড়িয়ে তোলেন; দিল্লির মুসলমান সমাজ যখন আন্দোলনকারীদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে, শাহিনবাগের সময় গুরদোয়ারা থেকে খাবার এসেছিল তাই এবার সময় এসেছে ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর; একমাত্র বহুজন সমাজ পার্টি ছাড়া আর প্রায় প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল যখন উপায়ান্তর না-দেখে তাঁদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে কোনওক্রমে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে চায়; দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রযুবরা একদিনের প্রতীকী অনশন পালন করে কৃষকদের লড়াইয়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন— তখন সম্যক টের পাওয়া যায় যে, এই আন্দোলন কেবল আর কৃষকদের আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ নেই— তা রূপ নিয়েছে জনবিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক লড়াইয়ের।

এই পরিস্থিতিতে, সরকারের পদলেহনকারী গোদি মিডিয়া যখন কৃষকদের আন্দোলনকে কুৎসা এবং উপেক্ষার পথ নিয়েছে, তখন, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম একেবারে শুরু থেকেই এই বিষয়ে লাগাতার খবর প্রকাশ করে গিয়েছে। কিন্তু, কেবল সেখানেই থেমে না-থেকে, আজ থেকে আমরা আমাদের নির্দিষ্ট প্রকাশসূচির বাইরে গিয়ে প্রতিদিন এই আন্দোলনের খবর প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের সামর্থ্য সীমিত হলেও উচ্চাশা আকাশচুম্বী। আমাদের লক্ষ, ক্লান্তিহীনভাবে এই আন্দোলনের বিষয়ে খবর করে যাওয়া, আরও বেশি করে এই বিকল্প ভারতবর্ষের ছবি মানুষের সামনে তুলে ধরা— যেহেতু আমরা বিশ্বাস রাখি এই সত্যে যে, মরুতে জলসেচের সুযোগ তুলনায় স্বল্প বলেই সেখানে অতিরিক্ত সিঞ্চন জরুরি, যাতে কোথাও অন্তত দু-একটা বীজ ভিজে ওঠে…

পাঠকদের কাছে অনুরোধ, নিরপেক্ষ না-থেকে ভারতবর্ষের পক্ষে দাঁড়ান…

সূচি

%d bloggers like this: