কৃষক বিদ্রোহ: এর কি কোনও আশু সমাধানসূত্র নেই?

অনন্ত ছাঝর

 

ছাত্র, আইআইএম-আমেদাবাদ

মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাকে কখনও এত কঠিন বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি। মজার কথা, এই বিরোধিতা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের তরফ থেকে আসেনি, বরঞ্চ প্রতিবাদ এসেছে ভারতের কৃষকসমাজের কাছ থেকে, যাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য মোদি সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।

২৭ নভেম্বর ২০২০ প্রথমবার এই গণবিক্ষোভের বীজ বোনা হয়েছিল, যেদিন রাষ্ট্রপতি সম্মতি দিয়ে সংসদে পাশ হওয়া তিনটি কৃষি বিলকে আইনে পরিণত করেন। এই তিনটি বিল হল যথাক্রমে কৃষি উৎপাদনের বাণিজ্য ও বিপণন সম্পর্কিত বিল (কৃষিপণ্যের প্রসার ও বাণিজ্য-সুবিধা), কৃষিপণ্যের মূল্য সুনিশ্চিতকরণ চুক্তি বিল (কৃষকের ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা) এবং কৃষিসেবা এবং অত্যাবশ্যক পণ্য (সংশোধনী) বিল। এই তিনটি বিলেরই সাধারণ ধর্ম হল বেসরকারি গোষ্ঠীর পথ সুগম করা যার ফলে তারা বর্তমান ‘মান্ডি’ ব্যবস্থা এড়িয়ে সরাসরি কৃষকের সঙ্গে রফা করতে পারেন।

অন্যদিকে সরকার ‘বিশ্বাস’ করেন, এই তিনটি আইনের ফলে কৃষক নির্দিষ্ট মান্ডির বাইরেও খোলা বাজারে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন, এবং এর ফলে বাজার ক্রমশ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে ও চাষি নিজের ফসলের আরও ভালো দাম পাবেন। এছাড়াও আইনগুলি কৃষকের কাছে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা সুলভ করে তুলবে, পণ্য পরিবহনের খরচ কমাবে, ফলত কৃষকের লাভ ও সুবিধা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। অবশ্য, সরকারের এ আশ্বাসে চিড়ে ভেজেনি। চাষিরা এই আইনগুলির আসল উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। তাদের আশঙ্কা এই আইন ছোট ও প্রান্তিক চাষিকে অনিয়ন্ত্রিত বাজার-চালিত মূল্যব্যবস্থার ঝড়ের মুখে ফেলবে ও তার ফলে ইতিমধ্যেই বিদ্যমান সঙ্কটকে আরও গভীর করে তুলবে। এক ঘোরতর বিপদ আসতে চলেছে, যেহেতু কতিপয় বড় প্রাইভেট ব্যবসায়ী-গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, চাষিরা তাদের উৎপাদনের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাবেন না, কৃষি মান্ডিগুলি ক্রমেই তামাদি হয়ে পড়বে ও চাষিদের ভাগ্য শুধুমাত্র বেসরকারি ব্যবসায়ী-গোষ্ঠী দয়া ও চুক্তিচাষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

ভারতের কৃষিক্ষেত্রে বৈষম্যের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। ২০১৫-১৬ সালের কৃষিসুমারি অনুসারে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষির সংখ্যা কৃষিজীবী জনসংখ্যার ৮৬.২ শতাংশ কিন্তু তাদের অধীনে দেশের মাত্র ৪৭.৩ শতাংশ কৃষিজমি। কৃষকের সম্পদের পরিমাণে এই ভারসাম্যহীনতার জন্য দেশের খুব সামান্য অংশের চাষি খোলা বাজারে বড় ক্রেতার সামনে দাঁড়িয়ে সমানে-সমানে দরদস্তুর করবার ক্ষমতা রাখেন, আর এই নতুন বিলগুলি এই অসাম্যকেই আরও প্রকট করে তুলবে৷ নতুন বিলগুলি ক্ষেত্রটিকে সমস্ত রকমের সরকারি নজরদারির বাইরে নিয়ে যাবে। ঠিক একইরকম আশঙ্কজনক অবস্থা তৈরি হয়েছিল ১৯৯১ সালে, দুগ্ধ প্রকল্পগুলির ডিরেগুলেশনের সময়, যখন নষ্ট দুধে বাজার ছেয়ে গিয়েছিল। এমনকি ২০০৬ সালে বিহারে কৃষিপণ্য বাজার সমিতির উদারীকরণ সে রাজ্যের কৃষকদের আঘাত করেছিল, কারণ উৎপাদিত পণ্যের মূল্যনির্ধারণ বিষয়ে বাজারে কোনও সঠিক তথ্যই ছিল না।

বর্তমানে, সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হল কৃষকদের প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে সরকারের প্রতিক্রিয়া। আন্দোলনকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে, উলটে বিক্ষোভকে অনেক বেশি জনসমর্থন জুগিয়েছে এবং প্রতিবাদকে এতখানি জোরালো করে তুলেছে যে কৃষকেরা তিনটি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে অনড় হয়ে রয়েছেন৷ কৃষক অধিকার রক্ষা আন্দোলনের কর্মী কিরণকুমার ভিসসা বললেন—

সরকারের প্রতিক্রিয়ার প্রথম পর্ব ছিল আমাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা। তা ব্যর্থ হওয়ায়, দ্বিতীয় পর্বে সরকার ছেলেভুলানো দরদাম করার চেষ্টা করছেন। দেখা যাক, প্রতিক্রিয়ার তৃতীয় পর্বে কী আসে।

এটা জলের মতো পরিষ্কার যে সরকারের আনা বিলগুলিতে এত বড়সড় কিছু ত্রুটি আছে যা সরকার আগেভাগে সংশোধন না করলে আলোচনা বা দরদস্তুর করার কোনও অর্থই হয় না। বিলে কৃষিজ পণ্যের দরদামের প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে বটে তবে সেটা শুধুমাত্র সরকারের পক্ষেই করা সম্ভব। যদি কৃষক মান্ডিতে সূচক মূল্যে পণ্য বেচার অধিকার হারায়, সরকারকেই কৃষকদের উপযোগী কোনও বিকল্প ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে৷ শস্যচাষে বৈচিত্র আনা— যা কৃষকের আর্থিক অবস্থা উন্নতির দিকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ভাবা হয়েছিল, চুক্তিচাষ তাতে বাধা দেবে। অতীতে চুক্তিচাষের ক্ষেত্রে এমনও ঘটেছে যে শস্যের গুণমান প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় ক্রেতা তা কিনতে অস্বীকার করেছেন অথবা কৃষককে পুরো দাম দিচ্ছেন না। প্রশাসনের তদারকি ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে, এই ধরনের গোলমালের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

এই মুহূর্তে, প্রশাসনের তরফ থেকে শুধুমাত্র আশ্বাসবাণীতে কাজ হবে না, তার চেয়ে আরও বেশি কিছু দরকার। প্রথমত, সরকারকে সবকটি স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে এবং এই সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে হবে যে যতক্ষণ না কোনও সমাধানসূত্র বের করা যাচ্ছে, আইনগুলি অকার্যকরী বা স্থগিত থাকবে। কৃষকদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে কৃষি আইনগুলিতে আরও অনেক স্বচ্ছতা আনা দরকার, কৃষকদের অন্যান্যভাবেও সাহায্য করা প্রয়োজন৷ আরও বেশি সংখ্যক হিমঘর তৈরির জন্য পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ দরকার, যাতে ধুঁকতে থাকা মান্ডি ব্যবস্থার দুর্দশা সামলানো সহজ হবে। মূল্যশৃঙ্খলে উচ্চ বিনিয়োগ জরুরি, একইসঙ্গে জমিতে উচ্চ ফলন ও মূল্যের নানা শস্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চাষ করার বিষয়ে কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে৷ এমনকি আমাদের দেশের সরকার ১৯৭৮ সালে চিনের বাজার উদারীকরণের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিতে পারে, ছোট ছোট পদক্ষেপে বাজার ও পণ্যের মূল্যের সংস্কারসাধন করতে পারে, কৃষি সমবায় গঠন করতে পারে, এবং কৃষকের হাতে জমির অধিকার তুলে দিতে পারে৷ নতুন নতুন কৃষি-প্রযুক্তি সংস্থার প্রসার পরিস্থিতিকে সহজতর করতে তুলতে পারে, সরকারের উচিত এইসব সংস্থাগুলির সাহায্যে এগিয়ে আসা যা পক্ষান্তরে কৃষকদেরই অনেকখানি সুবিধে দেবে।

স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করে আর জনমোহিনী বুলি আউরে কৃষকদের ঠান্ডা করা যাবে না। একমাত্র পথ অর্থপূর্ণ সংস্কারের মধ্য দিয়ে কৃষকদের আস্থা অর্জন করা। কৃষকেরা রাজপথ ছেড়ে আবার নিজেদের জমিজিরেতে ফিরে যেতে চাইছেন। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে কত শীঘ্র ও কতটা শান্তিপূর্ণভাবে তারা নিজেদের ঘরে ফিরে যাবেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...