প্রবীর পুরকায়স্থ না হয় ছাড়া পেলেন— বাকিদের কী হবে?

অশোক মুখোপাধ্যায়

 


বিনা অপরাধে একজনের সাত মাস জেলে বন্দি হয়ে থাকতে হল, পুলিশ আইনকানুন জেনেও আইনভঙ্গ করল— এর যদি শাস্তি না হয়, তাহলে এই একইরকম আইনভঙ্গকারী কাজ পুলিশ, সিবিআই বা এনআইএ করতেই থাকবে। আসলে করতেই থাকে তারা। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এরকম হলে (আসলে অহরহই হচ্ছে) তারা কতজন টাকাপয়সা খরচ করে পুলিশি জুলুমবাজির বিরুদ্ধে মামলা লড়তে এবং অধিকার সুরক্ষিত রাখতে পারবে? মনে রাখতে হবে, নামের গায়ে আরবি ছাপ থাকায় সিদ্দিকি কাপলানকে আড়াই বছর জেলে পচতে হয়েছে। শার্জিল ইমাম বা উমর খালিদের জামিন চার বছর পরেও এখনও হল না। অথচ, এই প্রতিটি মামলায় সরকারপক্ষ যে বিচারপ্রক্রিয়া চালানোর জায়গায় নেই, তা প্রতিটি শুনানিতে আদালতের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে

 

নিউজক্লিক পোর্টালের প্রতিষ্ঠাতা দেশের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রবীর পুরকায়স্থকে গ্রেফতার করার গোটা প্রক্রিয়াটাই ছিল বেআইনি। ধৃতকে বা তাঁর উকিলকে ইউএপিএ ধারায় গ্রেফতারির কারণ কখনওই জানানো হয়নি। সুতরাং তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।— এই মর্মে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের এক দুই সদস্যের বেঞ্চ।

আমরা খুশি। অন্তত একটা মামলায় সর্বোচ্চ আদালত অমিত শাহর অধীনস্থ দিল্লি পুলিশের এই গ্রেফতারির পুরো কাজকে বেআইনি আখ্যা দিয়েছে এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত দুটো ধারার (২২/১ এবং ২২/৫) বেপরোয়া উল্লঙ্ঘন বলে সাব্যস্ত করেছে। বিচারপতি সন্দীপ মেহতা রায়ের বয়ান লিখতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন:

The right to be informed about the grounds of arrest flows from Article 22(1) (an arrested person shall be informed of the grounds of arrest and allowed to consult a lawyer of his or her choice) of the Constitution and any infringement of this fundamental right would vitiate the process of arrest and remand.

এমনকি যখন তাঁকে পুলিশ কাস্টডিতে নেওয়া হয়েছিল, তখনও তাঁকে আটকে রাখার কোনও কারণ জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি পুলিশ আধিকারিকরা। বিচারক মেহতার মতে,

like arrests, the grounds of detention should also be communicated in writing to a detainee. Any lapse would be a violation of Article 22(5) of the Constitution, which mandates that a person under detention should be communicated the grounds of the detention order and allowed to make a representation against the detention at the earliest opportunity.

নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগে ৩ অক্টোবর ২০২৩ সকাল ৫টা থেকে সারা দেশে ৪৬ জন সাংবাদিকের বাড়িতে ইডি এবং আয়কর দফতরের যৌথ উদ্যোগে খানাতল্লাশি চালানো হয়, তার মূল কথা হল, প্রবীরবাবুরা নাকি চিনের থেকে পয়সা খেয়ে ভারত-বিরোধী প্রচার করছিলেন। তাঁদের সকলের মোবাইল এবং ল্যাপটপ পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তারপর প্রবীর পুরকায়স্থকে ইউএপিএ আইনের ধারায় জামিনঅযোগ্য মামলায় গ্রেফতার করা হয়।

গত সাত মাসে দিল্লি পুলিশ এক ছটাকও তথ্য তাদের সেই গ্রেফতারির সমর্থনে আদালতে পেশ করে উঠতে পারেনি। আসলে যা নেই, তা পাবে কোত্থেকে?

১২ অক্টোবর ২০২৩ কলকাতার মৌলালি যুব কেন্দ্রে ফ্যাসিস্ট আরএসএস বিজেপি বিরোধী বাংলা মঞ্চের তরফে গণতন্ত্রের সপক্ষে এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে একটি নাগরিক কনভেনশনে বক্তব্য রাখতে এসে সেই দিনগুলির ভয়াবহ পুলিশি তাণ্ডবের কাহিনি বলেছিলেন আর এক বিশিষ্ট সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা। এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, আদানির একটার পর একটা ন-নম্বরি কালা কারবারের খোঁজখবর করে ছালচামড়া ছাড়িয়ে আনার যে কাজগুলির মাধ্যমে সাংবাদিকের পবিত্র দায়িত্ব তাঁরা পালন করছিলেন, তার বিরুদ্ধেই অমিত শাহ তাঁর বিভিন্ন এজেন্সি এবং পুলিশবাহিনিকে লেলিয়ে দেন।

১২ অক্টোবরের কনভেনশনে বক্তব্য রাখছেন মুম্বাই হাইকোর্টের আইনজীবী মিহির দেশাই

 

আমাদের এখন প্রশ্ন হল, বিভিন্ন এজেন্সিগুলি যার এবং যাদের নির্দেশে এই সব ঘোরতর আইনভাঙা কাজকর্ম করেছে, আদালত কি তাদের ডেকে পাঠাচ্ছে? তাদের বক্তব্য জানতে চাইছে? পুলিশ তো বিনা নির্দেশে এই সব অপকম্ম করেনি। তাহলে শুধুমাত্র পুলিশকে দোষ না দিয়ে সেই মাথাগুলিকে কেন ডেকে আনা হবে না? কেন তাদের বিরুদ্ধে এখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না?

আমরা জানি, আইন হচ্ছে শাসনপ্রক্রিয়ার অঙ্গ এবং যে-কোনও নাগরিকের পক্ষে আইনভঙ্গ করা একটা অপরাধ। সুতরাং আইনের যারা রক্ষক তাদের বেলায় জেনেশুনে আইনভঙ্গ করা তো আরও বড় অপরাধ। আর আইনের রক্ষকদের যারা পরিচালক তাদের তরফে আইন ভাঙতে নির্দেশ দেওয়ার মতো ভয়ানক অপরাধ আর কিছু আছে কী?

বিনা অপরাধে একজনের সাত মাস জেলে বন্দি হয়ে থাকতে হল, পুলিশ আইনকানুন জেনেও আইনভঙ্গ করল— এর যদি শাস্তি না হয়, তাহলে এই একইরকম আইনভঙ্গকারী কাজ দিল্লি পুলিশ, অন্যান্য রাজ্যের পুলিশ কিংবা সিবিআই বা এনআইএ করতেই থাকবে। আসলে করতেই থাকে তারা। প্রবীরবাবু না হয় ভিআইপি। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এরকম হলে (আসলে অহরহই হচ্ছে) তারা কতজন টাকাপয়সা খরচ করে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে পুলিশি জুলুমবাজির বিরুদ্ধে মামলা লড়তে এবং অধিকার সুরক্ষিত রাখতে পারবে?

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

পিএম-এর জাল ডিগ্রির খবর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জানতে চাওয়ার “অপরাধে” অরবিন্দ কেজরিওয়ালের পঁচিশ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল গুজরাত হাইকোর্ট। অর্থাৎ, আদালত ভুয়ো(?) মামলা মনে করলে মামলাকারীকে শাস্তি দিতে পারে।

তাই আমাদের মতে, এই বিশেষ মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের উচিত, নিছক তিরস্কার নয়, আইনভঙ্গকারীদের শাস্তিরও বিধান দেওয়া। মোদির সরকার যেভাবে আদানি প্রমুখর মহাজোচ্চুরির মেগাকারবার সংক্রান্ত সংবাদ জনগণের দরবারে প্রকাশ্যে আনা ঠেকাতে এই জাতীয় স্বৈরাচারী কাজ করে চলেছে একটার পর একটা ক্ষেত্রে, তার স্বরূপ বুঝে নিয়ে তাকে আটকাতে হলে সুপ্রিম কোর্টকে আরও কঠোর মনোভাব নিতে হবে।

তবু তো প্রবীরবাবু সাত মাসের মাথায় সুবিচার পেলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নামের গায়ে আরবি ছাপ থাকায় সিদ্দিকি কাপলানকে আড়াই বছর জেলে পচতে হয়েছে। তারপর তিনি জামিন পেয়েছেন। এখনও তাঁর বিরুদ্ধে সেই ভুয়ো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। শার্জিল ইমাম বা উমর খালিদের জামিন চার বছর পরেও এখনও হল না। অথচ, এই প্রতিটি মামলায় সরকারপক্ষ যে বিচারপ্রক্রিয়া চালানোর জায়গায় নেই, তা প্রতিটি শুনানিতে আদালতের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

মোদির পরিচালনায় এমন একটা এক দেশ এক আইন চালু হয়েছে, যেখানে আদালতে বিচার শেষ হয়ে সাজাপ্রাপ্ত যাবজ্জীবন কয়েদিদের বিজেপি সরকার মুক্তি দিয়ে দিচ্ছে (যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাদের আবার জেলে ঢোকানো হয়েছে); আর যাদের বিরুদ্ধে মামলা দাঁড় করাতেও পারছে না, তাঁদের নানা দানবিক আইনে জেলে পুরে রেখে দিচ্ছে। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের ধারাগুলি প্রতিদিন এইভাবে পদদলিত হয়ে চলেছে।

বিচারকদের উদ্দেশে আমাদের নিবেদন: নিউজক্লিক মামলায় আপনারা একটা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। উপরে উল্লিখিত বাকি মামলাগুলির ক্ষেত্রেও আরও সদর্থক পদক্ষেপ নিতে আবেদন জানাচ্ছি। পাশাপাশি, প্রশাসনের উচ্চমহল থেকে আইনভঙ্গকারীদের শাস্তির দাবিও জানাচ্ছি।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. আইনের অভিসন্ধিমূলক ব্যবহারকারীদের শাস্তির দাবি তীব্রতর হোক – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...