রিয়া মুখার্জি
এখন বুঝি নিজের কাছে ফিরতে গেলে একা হতে হয়। ছেলেবেলায় বুঝতাম না, কিন্তু এখন জানি প্রকৃতির কাছেও যেতে হয় একা, চুপিচুপি, নিঃশব্দ সেই দুই চোখে কেবল থাকে আকুতির অতল সাগর। এই অভিসার বুঝিবা অনিবার্য, একবার হলেও, এই জীবনেই
দেশ পত্রিকায় একসময় ধারাবাহিকভাবে ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ প্রকাশিত হতে থাকলে লেখাটি পাঠকমহলে গ্রহণযোগ্য হয়। ধারাবাহিক এই লেখাটি পরবর্তীকালে ১৯৫৪ সালের নভেম্বর মাসে বেঙ্গল পাবলিশার্স থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়। অমৃত কুম্ভের সন্ধানে প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে গেলে, দ্বিতীয় মুদ্রণকালে উপন্যাসটির শুরুতেই কালকূট ‘বিচিত্র’ নামের একটি সংযোজনী লেখেন—
অনেক বিচিত্রের মধ্যে মানুষের চেয়ে বিচিত্র তো আর কোনদিন কিছু দেখিনি। সে বিচিত্রের মধ্যেই আমার অপরূপের দর্শন ঘটেছে। সব মানুষই একজন নন। আরেকজন আছে তার মধ্যে। একজন যিনি কাজ করেন, বাঁচবার জন্য গলদকর্ম দিবানিশি। যিনি আহার মৈথুন সন্তান পালনের মহান কর্তব্যে ব্যাপৃত প্রায় সর্বক্ষণ, এই জটিল সংসারে যার অনেক সংশয়, ভয় প্রতিপদে। অবিশ্বাস, সন্দেহ, বিবাদ এইসব নিয়ে যে মানুষ তার মধ্যে আছেন আর একজন— তিনি কবি, সাহিত্যিক, পাঠক, শিল্পী, গায়ক, ভাবুক। এককথায় যিনি রসপিপাসু।… মানুষের এই অনুভূতির তীব্রক্ষণে সে বড় একলা। এই একাকিত্বের বেদনা যত গভীর, আনন্দ তেমনি তীব্র।
বেশ কয়েক বছর আগে যখন প্রথমবার উপন্যাসটি পড়ি, আমার পড়া কালকূটের লেখা এটিই প্রথম উপন্যাস ছিল। পড়া শেষ হলে হৃদয় মথিত করে জেগে উঠেছিল বেদনার সেই অপরিসীম সুর। কুম্ভমেলার প্রেক্ষাপটে লেখা, যেখানে এসে মেলে কত ধর্মের মানুষ, বাউল, বৈষ্ণব, তন্ত্রসাধক নারী, পুরুষ, কত শত সাধারণ মানুষ। বহু মানুষ এসেছেন ধর্মাচরণ করতে, আর কালকূট এসেছেন মানুষ দেখতে। তবুও কালকূটের গলায় আফসোস— “আমি একদিনও দেখলাম না তারে, আমার ঘরের কাছে আরশিনগর এক পড়শি বসত করে।”

লেখকের কালকূট ছদ্মনামটি, যার আক্ষরিক অর্থ তীব্র বিষ, তখনই মাথার ভিতর অনুরণন তুলেছিল। একের পর এক পড়েছি তখন, অমৃত বিষের পাত্র, শাম্ব, ধ্যান জ্ঞান প্রেম। পরে গাহে অচিন পাখি রচনাতে সমরেশ বসু নিজেই জানিয়েছেন কালকূট-এর জন্মরহস্য—
কিন্তু এমন নামটি কেন? তা হলে যে প্রাণটি খুলে দেখাতে হয়। দেখলেই বোঝা যাবে, বুক ভরে আছে গরলে, আপনাকে খুঁজে ফেরা, আসলে তো হা অমৃত হা অমৃত! বিষে অঙ্গে জরজর, কোথা হা অমৃত! কালকূট ছাড়া, আমার আর কী নাম হতে পারে?
এই কালকূটেরই লেখা আরেকটি উপন্যাস, যা এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি, কোথায় পাবো তারে (১৯৬৮)। আজকের লেখাটিতে তারই কথা বলব।

কেন্দুলির জয়দেবের মেলাকে কেন্দ্র করে কালকূট লিখেছিলেন খুঁজে ফিরি সেই মানুষে, ছোট লেখা। মেলায় আগত বাউল-ফকিরদের মুখে কালকূট শুনছেন সন্ন্যাসী, গৃহী বাউলদের যাপন, তাঁদের দর্শন, বাইরের দারিদ্র্যের আড়ালে অন্তরের ঐশ্বর্যের দীপ্তি। এই লেখটির মধ্যেই কোথায় পাবো তারে উপন্যাসটির বীজ লুকিয়ে ছিল।

কেন কালকূট আমায় টানে? এর উত্তর এককথায় বলা কঠিন। আসলে কালকূট আমাদের সকলেরই মধ্যেকার সেই বাউল প্রাণটির মর্মমূলে নাড়া দেন। রোজকার জীবনের যে হিসেবি ছক তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে, অনিশ্চয়তার যে অপার রহস্য সেইখানে কালকূট হাতছানি দিয়ে ডাকেন। কারও কারও কাছে তা হয়ে যায় নিশির ডাকের মতো, যাতে সাড়া দেওয়া অনিবার্য। এই সূত্র ধরে ফিরে যাই নিজের শৈশবে। আজ বুঝি কালকূট আমি আর আমার শৈশবের নিশ্চিন্দিপুরের মধ্যেকার সেই দরজা-জানালা, যা দিয়ে ভেসে আসে একরাশ আলোমাখা সুগন্ধি পরাগরেণু।
আমার ছোটবেলাটা কেটেছে গ্রামে, সেখানে প্রদীপের আলোয় বৃদ্ধ পুরোহিতমশাইয়ের সন্ধ্যারতি দেখেছি কতদিন, কেউ থাকত না সেখানে, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা একটা পুরানো ময়লা ধুতি আর শতচ্ছিন্ন উত্তরীয় যাঁর সম্বল, ওই বৃদ্ধ শীর্ণ মানুষটি অস্ফুটে কী যে বলতেন পাথরের দেবীমূর্তিকে… আমি কতদিন দেখেছি তাঁর বন্ধ চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে ভাঙা গালদুটো বেয়ে।
খেয়াল করে দেখেছি প্রকৃতির সব সৃষ্টিরহস্যগুলোর মধ্যেই ‘ভয়’ আর ‘মাদকতা’ কেমন যেন জড়াজড়ি করে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। ঠিক কবে যে প্রথম ভয়ের প্রতি এই মাদকতা তৈরি হয়েছিল এখন আর তা মনে নেই। তবে সেটা ছিল শৈশবেরই কোনও একটা সময়। এই প্রসঙ্গে বলা দরকার, আমাদের একটা শৈশব ছিল। সেই শৈশবে শপিং মল, ভিডিও গেম, কেএফসি, পিৎজা, বিগবাজার ছিল না, ছিল না আরও অনেক কিছুই। আমাদের ছিল ‘অভাব’, আর সেই অভাব মেটাতে আমরা বারবার ছুটে যেতাম প্রকৃতির দুয়ারে। হায় রে সেই সব দিন! এখনও চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই সেই সব সারি সারি ছবির অ্যালবাম।… বিদ্যুৎপরিষেবাহীন ছোটবেলার সেই সব রাতে গ্রামগুলোতে সন্ধ্যার পর ঘরে জ্বলে উঠত হ্যারিকেন। কাচের চিমনিতে ঢাকা সেই হ্যারিকেনের আলোছায়ায় কোথায় যেন মিশে থাকত একটা রহস্যময় জগতের হাতছানি। আলোর বৃত্তের বাইরে অনেকটা থমকে থাকা অন্ধকার। দেওয়ালের উপর দুলতে থাকা মানুষের ছায়া, চারিদিকে কেমন যেন একটা অশরীরী গন্ধ, কল্পনায় তারা যেন আরও নিবিড় হয়ে পাশে এসে বসত, শীতের রাতগুলোতে আমাদেরই মাঝে একজন হয়ে হ্যারিকেনের ওম নিত লুকিয়েচুরিয়ে। মাঝে মাঝে ওদের ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করত আলতো করে। জানালার ওপাশে কুয়াশামাখা রাত, উঠোন পেরিয়ে আঁধার মাঠাঘাট, জোনাকিদের জ্বলা-নেভা, ব্যাঙেদের একটানা ডাক, তারই মাঝে ঝোপঝাড় দিয়ে খসখস করে কী যেন একটা চলে গেল আবার! কী ছিল ওটা? এক বুক শিরশিরানি নিয়ে হ্যারিকেনের আলোর আরও একটু কাছে গিয়ে ঘন হয়ে বসতাম। হায় রে সেই সব রাত! গা ছমছমানির সঙ্গে আকর্ষণ-বিকর্ষণের শুরু বোধ করি তখন থেকেই।
আজ আর সেই লোডশেডিং নেই, হারিয়ে গেছে হ্যারিকেনরাও। জীবনানন্দ কি তাঁর এই আলোকোজ্জ্বল তিলোত্তমায় বসে আজকে আর দেখতে পেতেন সেই— ‘জোছনারাতে বেবিলনের রানির ঘাড়ের উপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার মতন জ্বলজ্বল আকাশ’-এর মতন নেশাধরানো দৃশ্য? মরকতের মতো নীল সেই আকাশ আজ কোথায়? যে আকাশের নেশায় পোল্যান্ডের এক অখ্যাত যুবক তারাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হয়ে একদিন উঠেছিল নিকোলাস কোপারনিকাস। কালকূটের যাত্রাপথের বর্ণনা আমায় জলের কাছে নিয়ে যায়, শৈশবের সেই নিবিড় আশ্রয়, নদী, পুকুর, নৌকা, বৈঠা বেয়ে হারিয়ে যাওয়া দিগন্তের পানে।
সেই নদী, বর্ষায় যে দুকূল ভাসিয়ে জীবনকে আকঁড়ে ধরে গর্ভিণী মায়ের মমতায়, আবার গ্রীষ্মে কখনও কখনও তার শরীর জুড়ে নির্বিকল্প খাঁ খাঁ হাহাকার। আকাশের গায়ে উড়ে চলে যাওয়া পাখি যেমন তার নখের একবিন্দু দাগও ফেলে যায় না আকাশের বুকে, ঠিক তেমনই জলের বুদবুদও রেখে যায় না কোনও মায়া। তার সেই বুকভরা নীরবতার উপর দিয়ে মানুষ হেঁটে যায় কী অনায়াসে।
আর সমুদ্রের চোরাটানের ভাঁজে ভাঁজে নিরুদ্দেশের ডাকটিকিট। যার ফেনাভরা ঢেউয়ের দোলা খেতে খেতে বখাটে এক ইতালিয়ান যুবক হঠাৎই কলম্বাস হয়ে যায়, বেরিয়ে পড়ে নতুন দেশ খুঁজতে। আচ্ছা, পৃথিবীর আদিমতম জোৎস্নার সেই কুহকী রাতে কম্পাস আর মাস্তুল ছেড়ে তার কি একবারের জন্যও মনে পড়েনি পিছনে রেখে আসা মানুষদের কথা? ফিরে যেতে মন কাঁদেনি তার নোনা মেয়েমানুষের কাছে? হয়তো হয়েছিল, হয়তো-বা নয়। হয়তো এ আর সে এক মানুষ নয়, হয়তো-বা এই আশমানছোঁয়া সর্বনাশী জলের নেশা যাকে একবার ধরে সে আর আগের মানুষ থাকে না। অবিরাম অন্বেষণ তার শিরায় শিরায়, রক্তে রক্তে ঢেউ তুলে, তাকে পাগল করে মারে, আমি সেই পাগলকে ঈর্ষা করি। এই অফুরান অন্বেষাই তো মানুষের জীবন, মানুষের সামগ্রিক ইতিহাস। জীবনের জোয়ারে কত কিছু তীরে এসে ভিড়ে, ভাটা নিয়ে নেয় কত কিছু, হারায় না অনেককিছুই। কিছু কিছু থেকে যায় পলির স্তরে। সেখানে প্রকৃতি তার আপন হাতে কাজ করে যায়। আমরা সেই পলি ছানার কারিগরকে দূর থেকে দেখি। আমরা এই যাওয়া আসার কূলে পলি ছানব না, যা কিছু আমার তা এই দুই কূলের মৃত্তিকায় জমা থাক। সেই তো জীবনের নিয়ম। নিরন্তর বয়ে যাওয়া। কালকূট আমায় আমারই অজান্তে কখন যেন, নিরন্তর আত্ম-অন্বেষণের পথের প্রান্তে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দেয়। মনের ভিতর কেউ বলে ওঠে—
এখানে জয়ী হওয়ার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে
হে দশদিক আমি কোনো দোষ করিনি।
আমায় ক্ষমা করো।
এখন বুঝি নিজের কাছে ফিরতে গেলে একা হতে হয়। ছেলেবেলায় বুঝতাম না, কিন্তু এখন জানি প্রকৃতির কাছেও যেতে হয় একা, চুপিচুপি, নিঃশব্দ সেই দুই চোখে কেবল থাকে আকুতির অতল সাগর। এই অভিসার বুঝিবা অনিবার্য, একবার হলেও, এই জীবনেই। অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে শৈশবের, তবু আজও আমার, আমাদের সবার কাছেই একফালি একটা আকাশ আছে, তাকে জড়িয়ে টুকরো টুকরো মেঘ। কখনও কখনও তাতে লাগে গোধূলির রং, কখনও তার শরীর জুড়ে নামে শ্রাবণ। বহুদিন পর আমার আপন ঘরের সেই নোনাজল আমি গায়ে মাখি, হৃদয়ের মরচেগুলো ধুয়ে যায়। আমার সেই আমিতে আমি জ্বলে পুড়ি। কোথায় পাবো তারে উপন্যাসটি যেদিন উল্টে-পাল্টে দেখেছিলাম, চোখ আটকে গিয়েছিল শেষ লাইনে এসে, এখানে সেটি উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলাম না—
ক্ষ্যাপা তুই না জেনে তোর আপন খবর
যাবি কোথায়।
কী অমোঘ এই ভবিতব্য।


