সৈকত ভট্টাচার্য
পূর্ব প্রকাশিতের পর
গত দু-তিন দিন ধরে জয়দার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। মানে, মানুষটাকে আমরা রোজই দেখছি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অফিস যেতে, কিন্তু ফিরতে দেখছি না। অথচ পরের দিন সকালবেলা দশটা নাগাদ আবার দেখছি রবি ঠাকুরের বানানো টিফিনবাক্স নিয়ে ব্যাগ কাঁধে অফিস যাচ্ছে। আমাদের সঙ্গে তিনদিনে বোধহয় সাকুল্যে সাড়ে তিনবার কথা বলেছে। সিগন্যালিং সফটওয়ারের কেলোর কীর্তির পর অফিসে যে বেশ হুড়ো লেগেছে সেটা বুঝছি। অথচ ব্যাপারটার কোনও ফয়সালা হল কি না, সেটা নিয়ে কিছুই বলে না। অবশেষে আর থাকতে না পেরে আজ সকালে ভদ্রলোকের পথ অবরোধ করে বললাম, ব্যাপার কী হে তোমার?
—কী আবার ব্যাপার? ভারি অবাক হয়ে জয়দা জিজ্ঞেস করল।
—তোমায় যেতে দেখি, ফিরতে দেখি না। অদৃশ্য দেহ ধারণ করা-টরা শিখলে নাকি?
—দৃশ্য আর অদৃশ্য বড় দর্শকসাপেক্ষ ব্যাপার হে! জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে কেমন একটা দার্শনিক কণ্ঠে উত্তর দিল সে।
—মানে টা কী?
—মানে তোরা দেখছিস না বলে ভাবছিস অদৃশ্য, রাত দেড়টা অবধি জেগে থাকলে দেখতিস দিব্যি এই স্থূল শরীরটা নিয়েই সদর দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছি। অন্য জুতোটা পায়ে গলিয়ে বলল জয়দা।
—রাত দেড়টা! তখন তো আমরা দিনের শেষে ঘুমের দেশে!
—সেটাই তো বললাম।
—কিন্তু এত রাত অবধি কী করছ? প্রেম-ট্রেম করছ নাকি? শুভ এতক্ষণে ইন্টারোগেশনে অংশ নিল।
—প্রেম-ই বটে! তবে নিকষিত হেম, কামগন্ধ নাহি তায়… বলে জয়দা উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিল। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে আমাদের বোকা বোকা মুখ দুটোর দিয়ে তাকিয়ে বলল, নতুন অবতার। রহস্যসন্ধানী জয়!— বলেই দরজা গলে ধাঁ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমাদের মনের রহস্য অন্ধকারেই রয়ে গেল।
তক্কে তক্কে ছিলাম ভদ্রলোককে আবার পাকড়াও করব বলে। অবশেষে শনিবার সকালে কফির টেবিলেই ধরলাম।
—কী হে, রহস্য কদ্দূর সন্ধান করলে? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
জয়দা মোবাইলে টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়তে পড়তে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। আমার প্রশ্ন শুনে এক গাল হেসে তাকাল। তারপর একটা টোস্টবিস্কুটে সাবধানে কামড় দিয়ে গুঁড়ো ছড়ানোর থেকে বাঁচিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, প্রথম পর্ব সমাপ্ত।
—যাহ, প্রথম পর্ব সমাপ্ত মানে? আমাদের অন্ধকারে রেখে?
—না না, তোদের না বললে হয়? সুযোগ পাচ্ছিলাম না জাস্ট। জয়দা ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করে।
—আজ তো ছুটি। একটু ঝেড়ে কাশো।
—এমন শিরেসংক্রান্তি অবস্থাতে কি ছুটি হয় রে? জয়দা বেশ দুঃখভরা গলায় বলল।
—আজকেও অফিস যাবে?
—অফিস যাব, না বাড়ি থেকে কাজ করব সেটা ডিপেন্ড করছে কিছু ফাইন্ডিংসের উপর। একটু পরে জানতে পারব। ওয়েটিং ফর আ ফোন কল।
—এমন ফেলুদা-মার্কা হাবভাব ছেড়ে বলো তো কেসটা কী?
—বললাম তো সেদিন। টেনিদার ভাষায় পুঁদিচ্চেরি কাণ্ড যাকে বলে। আমাদের কোম্পানির কন্ট্রাক্ট গোল্লায় যেতে বসেছে ব্যাঙ্গালোর ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে।
—সে তো বুঝলাম। কিন্তু কেন এমন হল তার জবাব খুঁজে পেলে?
—সেদিন যে বলছিলে কী সব বিষ খাওয়ানো হয়েছে মডেলকে নাকি! শুভ পাশ থেকে বলল।
—সেইটারই অনুসন্ধান চলছে। এই গোটা সপ্তাহ ধরে আমাদের পুরো কোড খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু কোনও ভুলভ্রান্তি নেই। সেটা এক্সপেক্ট করছিলাম। কারণ আমি প্রতিটা কোড রিভিউ করে তবে অ্যাপ্রুভ করেছি। আমাদের হার্ডওয়ার টিম প্রতিটা সেন্সর এবং ক্যামেরা চেক করেছে এর পাশাপাশি। সব একেবারে বিন্দাস চলছে। কোনও ভুলচুক নেই। এখন আমাদের হাতে দুটো কাজ বাকি। এক, যে সময় গণ্ডগোলটা হয়েছে সেই সময়কার অ্যাপ্লিকেশন লগ আর ভিডিও ফুটেজ মিলিয়ে চেক করা।
—সেটা অ্যাদ্দিন করোনি?
—নাহ, কারণ ভিডিও ফুটেজ সরাসরি জমা হয় সরকারি তথ্যভাণ্ডারে। লাল ফিতের গেরোয় সেখান থেকে তা পেতে একটু সময় লাগছে। তার জন্যই অপেক্ষা এখন।
—সে না হয় হল, কিন্তু সমস্যাটা কোথায়? তোমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় কী বলছে?
—ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছে সমস্যা অনেক গভীরে।
—মানে?
—মানে, গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও…। বলে আবার হেঁড়ে গলায় গান শুরু করতে যাচ্ছিল, আর তক্ষুণি দরজায় ঘণ্টি বাজল।
মঞ্জুশ্রী এসেছে। ও গত সোমবারই নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেছে। রান্নার ঝামেলা করেনি কদিনের জন্য। তাই আমাদের রবি ঠাকুরের খাবারই খাচ্ছে। আমাদের ছুটি থাকলে চলে আসছে, নইলে শুভ ফুড ডেলিভারির কাজ করছে। মঞ্জুশ্রী ঢুকেই জয়দাকে বলল, বাপ রে অমন ভীষ্মলোচন অবতার কেন?
অমনি শুভ ফুট কাটল, ভীষ্মলোচন আর বরদাচরণের মধ্যে দোল খাচ্ছে জয়দার অবতার।
—ইউ মিন, গোয়েন্দা বরদাচরণ? মঞ্জুশ্রী কনফার্ম করে।
—হ্যাঁ, নইলে আর বলছি কী!
—কী কেস জয়দা? সেই এআই রহস্য?
—হ্যাঁ, পুরো ঘেঁটে ঘ হয়ে আছি। জয়দা উত্তর দেয়।
—ডিটেইলস প্লিজ। মঞ্জুশ্রী নাছোড়।
—ডিটেইলস দেওয়ার মতো কিছু হয়নি। যথাসময়ে বলব। কিন্তু বললে বুঝবি তোরা?
—কেন বুঝব না?
—বুঝবি না, কারণ তোরা এখনও আটকে আছিস মানুষের মুখের ভাষার উৎস সন্ধানে। তারপর তো কেটে গেছে প্রায় এক লক্ষ বছর!
জয়দার মুখ থেকে গল্পের গন্ধে আমরা উৎসুক হয়ে বসি। ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢেলে মঞ্জুশ্রীকে দিয়েছে শুভ। মঞ্জুশ্রী কাপে চুমুক দিয়ে বলে, তাহলে বলে ফেলো বাকিটা। আলোকিত করো আমাদের।
জয়দা এক চুমুকে কাপের বাকি কফিটা গলায় ঢেলে নিয়ে খালি কাপটা ফের ফ্লাস্ক থেকে পূর্ণ করতে করতে বলল, রাজা অজাতশত্রুর নাম শুনেছিস?
—হ্যাঁ, সেই ইতিহাসে পড়েছিলাম মনেহয়। আমি বললাম।
মঞ্জুশ্রী বলল, অজাতশত্রু রাজা হল যবে,/পিতার আসনে আসি/পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে/মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে—/সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলোতে/বৌদ্ধশাস্ত্ররাশি।… সেই অজাতশত্রু?
জয়দা উচ্চৈঃস্বরে বলল, ব্রাভো! ব্রাভো! এই মেয়েটা যতদিন যাচ্ছে, আমায় বেশি করে ইমপ্রেস করে চলেছে! তোরা জানিস এই কবিতাটা?
বলা বাহুল্য শেষ প্রশ্নটা আমাকে আর শুভকে করা, এবং আমরা যথারীতি ক্লুলেস।
আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যপূর্ণ ‘হুঁ’ বলে জয়দা আবার বলল, পূজারিণী। রবি ঠাকুর!
আমাদের রবিঠাকুর ভাবল তাকে ডাকা হচ্ছে। রান্নাঘরে ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিল। মুখ বাড়িয়ে বত্রিশপাটি দাঁত বের করে শুধল, হাঁ ভাইয়া?
মোবাইলের স্মাইলিগুলোর মধ্যে যে স্ট্রেইট ফেস স্মাইলিটা থাকে, জয়দা অবিকল তার মতো মুখ করে রবির দিকে তাকিয়ে রইল সেকেন্ড দুয়েক। তারপর বলল, না হে এ ঠাকুর সে ঠাকুর নয়। তুমি কাজে লাগো। কন্টিনিউ।
রবিঠাকুর কিছু না বুঝে আবার একটা হাসি দিয়ে রান্নাঘরে মিলিয়ে গেল। আমরা খুক খুক করে হাসছি দেখে জয়দা ধমক লাগিয়ে বলল, রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়িসনি, আবার হাসছিস! লজ্জা করে না?
মঞ্জুশ্রী সুযোগ পেয়ে বলল, তুমি বলো তারপর। এদের ছেড়ে দাও। পোলাপান সব।
—হুম, বলে জয়দা আবার শুরু করল— আমি রাজা অজাতশত্রুর কথা কেন বললাম? কারণ, এই যে আজকাল এআই-এর চক্করে যে সব কিছু স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে, লোকজন কম লাগবে কাজে— এর একটা জিগির উঠেছে, সেটা এ-দেশে প্রথম বোধহয় হয়েছিল সম্রাট অজাতশত্রুর সময়ে।
—অ্যাঁ! কী বলছ! অশোকের সময় এআই!! আমরা প্রায় সমস্বরে আঁতকে উঠলাম।
—হুঁ হুঁ বাওয়া তবে আর বলছি কী! তবে আমি বলছি না। বলছে, লোকপন্নতি নামে এক প্রাচীন গ্রন্থ।
—উফ, বেশ ইন্ডিয়ানা জোন্সের মতো ফিলিং আসছে কিন্তু। তারপর? মঞ্জুশ্রী বলল।
—এই বইটা লেখা হয় একাদশ শতাব্দীতে। পালি ভাষায়। ব্রহ্মদেশে। মানে, যাকে এখন বার্মা বা মায়ানমার বলে জানি আমরা। বৌদ্ধগ্রন্থ। কিন্তু মূলত, বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃত বৌদ্ধ পুথি যা তখনই অবলুপ্ত ছিল, সেই সব বইয়ের চাইনিজ অনুবাদ থেকে পালি ভাষায় অনুবাদ করে এই সঙ্কলনটা তৈরি করা হয়েছিল।
—মানে, সংস্কৃত থেকে চাইনিজে অনুবাদ হয়েছে, তারপর পালিতে? জিজ্ঞেস করলাম।
—হ্যাঁ, চিনদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বৌদ্ধপুথিও চৈনিকভাষায় অনূদিত হয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই। নইলে চৈনিকরা এই বইগুলো পড়বে কী করে! পরবর্তীকালে সেইসব মূল বই কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও চিনদেশে এই অনূদিত বইগুলো থেকে যায়। পরে তিব্বতিভাষায় অনূদিত বইগুলোও অনেক কিছু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাহুল সাংকৃত্যায়ন ফের অনুবাদ করেছিলেন, সে গল্প তো তোদের আগেই বলেছি।
—হ্যাঁ, তিব্বতের গল্প বলার সময়। মঞ্জুশ্রী বলল।
—একইভাবে চৈনিক ভাষা থেকে এই টেক্সটগুলোকে পালিভাষায় ফের অনুবাদ করা হয়, এবং সেরকমই একটা সঙ্কলন হচ্ছে ‘লোকপন্নতি’ নামে যে গ্রন্থের কথা বললাম। এতবার অনুবাদের মধ্যে ধর্মীয় গ্রন্থে যে কত কল্পকাহিনি এসে মিশে গেছে, সেটা নিজেরাই বুঝে নে। তা সেরকমই একটা কাহিনি হচ্ছে সম্রাট অজাতশত্রুর রোবট-ফোর্স নিয়ে।
জয়দা থামল। থামতে হল, কারণ রবিঠাকুর ইন্দৌরি পোহার প্লেট সাজিয়ে নিয়ে এসেছে। প্রাতরাশ। উপর দিয়ে ঝুরিভাজা ছড়িয়ে দিয়েছে। ঘি-এর সঙ্গে কারিপাতা, সরষে— সব মিলিয়ে বেশ মনোমুগ্ধকর ক্ষুধাউদ্রেককারী সুন্দর গন্ধ বের হয়েছে। দেখেই খিদে পেয়ে গেল। জয়দা নিজের প্লেটটা হাতে নিয়ে এক চামচ মুখে দিয়ে চোখ আধবোজা করে স্বাদ নিল খানিক। তারপর আবার বলল, হ্যাঁ যেটা বলছিলাম। বৌদ্ধ গপ্পো বলছে সে যুগে নাকি যবনদেশে একদল লোক ছিল, যাদেরকে বলা হত ‘যন্ত্রকার’। যবনদেশ মানে জানিস তো?
—গ্রিস? এটা জানতাম। দেখলাম শুভও জানে। ওই বলল। পোহা চিবোতে চিবোতে।
—রাইট। গ্রিস বা রোম— ওই অঞ্চলটাকে যবনদেশ বলা হত। যবনদেশের যন্ত্রকারদের পেশা ছিল যন্ত্রপাতি বানানো— সেটা নাম থেকেই পরিষ্কার। কিন্তু একটু বিশেষ ধরনের যন্ত্র। এই যন্ত্ররা নাকি চলে ফিরে বেড়াতে পারে, কথাও বলতে পারে, এমনকি কাপড়কাচা, বাসনমাজাও পারে। অর্থাৎ কি না আমাদের আধুনিক যুগে যাকে রোবট বলা হয়। এই বইতে তার নাম বলা হচ্ছে ‘ভূতবাহনযন্ত্র’— অর্থাৎ কি না, যন্ত্রের মধ্যে ভূত বা আত্মা থাকে বলেই সে এমন কাজকর্ম করতে পারে। কাহিনিকার বলছেন যে যবনদেশের বাইরে কেউ এই ভূতবাহনযন্ত্র বানাতে জানত না। আর যাবনিকরা সেই রোবট বানানোর গুপ্ত কৌশল দেশের বাইরে বের হতে দিত না। পাহারা দেওয়ার ভার ন্যস্ত ছিল একদল অমন যন্ত্রমানবের উপরই। কেউ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলেই ঘ্যাচাং-ফু! কিন্তু কৌশল সে ফাঁক গলে না বের হতে পারলেও, খবর তো চেপে থাকে না। এমন অদ্ভুত যন্ত্রবিদ্যার কথা সাগর পার হয়ে এসে পৌঁছেছিল পাটলিপুত্র নগরে। সেখানে এক ইঞ্জিনিয়ারের মাথায় ভূত চাপল যে সে এই বিদ্যা শিখবে। কিন্তু সেখান থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরতে পারলে তবে না যন্ত্রবিদ্যার কৌশল সঙ্গে করে নিয়ে আসবে! অতএব ভদ্রলোক খুউব সহজ একখানা উপায় করলেন। ‘লোকপন্নতি’ বলছে তিনি নাকি যবনদেশে পুনর্জন্ম নিলেন। কিন্তু পূর্বজন্মের ফন্দির কথা ভুললেন না।
—বাহ, খুবই সহজ উপায়। শুভ ফুট কাটল।
—হ্যাঁ, গল্পের গরু আকাশেও ওড়ে। যাই হোক, তারপর কী হল শোন। সে ভদ্রলোক যবনদেশে পুনর্জন্ম নিয়ে কোনও ঝামেলা ছাড়াই সিটিজেনশিপ পেয়ে গেলেন। তারপর চিফ অফ যন্ত্রবিদ্যার মেয়েকে বিয়ে করে ফেললেন দেরি না করে। এবার সেই যন্ত্রবিদ্যা শিখতে সমস্যা নেই। অতএব শিখেও ফেললেন চটপট। কিন্তু গোল বাধল পূর্বজন্মের প্ল্যানমাফিক সেই কলাকৌশল নিয়ে পাটলিপুত্র ফেরার সময়। সেই বিকটদেহী মারণ ভূতবাহনযন্ত্রের দল হ্যারি পটারের গল্পের ডেমেন্টরদের মতো পাহারা দিচ্ছে এই গুপ্তবিদ্যাকে। তাদেরকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল হি নেহি, না মুমকিন হ্যায়। সুতরাং অন্য পরিকল্পনা করতে হবে। ইতিমধ্যে তাঁর এক পুত্র সন্তান হয়েছে সে দেশে। ভদ্রলোক ছেলেকে বলে দিলেন তাঁর জীবনের আল্টিমেট লক্ষ্যের কথা। ছেলেকে বললেন যে, তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর মৃতদেহ যেন সুদূর প্রাচ্যের ভারতবর্ষের পাটলিপুত্র নগরে নিয়ে গিয়ে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু সমাধিস্থ করার আগে তাঁর উরুর মধ্যে লুকিয়ে রাখা এই যন্ত্রমানবের নকশা তুলে দিতে হবে রাজার হাতে।
—উফ, এ তো প্রায় পুরাকালের ক্লাউস ফুকস! মঞ্জুশ্রী বলে উঠল।
—হা হা, তা যা বলেছিস! জেমস বন্ডও বলা চলে। এ গুপ্তচর কি না— ‘বিশ্বাসঘাতক’ নয়। সে যাই হোক, সেই প্ল্যানমাফিক নিজের উরুর মধ্যে সেলাই করে ভূতবাহনযন্ত্রের নকশা লুকিয়ে ফেললেন ভদ্রলোক। তারপর পালানোর চেষ্টা করলেন। ফল হিসাবে ডেমেন্টরদের হাতে মৃত্যু হল অবধারিতভাবেই, এবং বাপের বাধ্য ছেলেও সেই নকশা-সহ দেহ এনে ফেললেন পাটলিপুত্র নগরে। তখন রাজত্ব করছেন সম্রাট অজাতশত্রু। তাঁর হাতে এল ভূতবাহন যন্ত্রের ফর্মুলা। লোকপন্নতি বলছে যে তারপর অজাতশত্রু নাকি অমন অনেকগুলো রোবট বানিয়েছিলেন এবং এই রোবট-ফোর্সকে নিয়োগ করা হয় বুদ্ধের অস্থিভস্মের উপর নির্মিত স্তূপকে পাহারা দেওয়ার কাজে।
—খুবই রোমহর্ষক ব্যাপার। শুভ বলল।
—সে আর বলতে! তবে যাহা রটে, তার কিছুটা সত্যিও বটে! পরবর্তীকালে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে এমন অটোম্যাটার কথা লেখা হয়েছে ইতিহাসের পাতাতে। ন-শো আটচল্লিশ সালে এক ইতালীয় দূত রাজা সলোমনের সিংহাসন বলে একটা স্থাপত্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তাতে নাকি দুই হাতলে দুই সিংহের মুখ ছিল— তারা আবার হাঁ করে গর্জনও করত।
—ভারি মজার খেলনা তো! মঞ্জুশ্রী বলল।
—হ্যাঁ, কিন্তু এমন আশ্চর্য জিনিস সে-যুগে বানানো এত সহজ ছিল না। টেকনোলজি এত উন্নত নয়, বিদ্যুৎ বলে কোনও জিনিস আকাশে দেখা গেলেও পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব ছিল না। শুধু মেকানিক্যাল যন্ত্রবিদ্যা দিয়ে তৈরি জিনিস। হাওয়া বা জলের মাধ্যমে শক্তি সরবরাহ করে তাতে প্রাণ জোগানো চাট্টিখানি কথা নয়! হোমারের ইলিয়ড ওডিসিতেও কবির কল্পনায় এমন আরও অনেক ‘আশ্চর্যন্ত্র’র বর্ণনা আছে।
—যেমন আমাদের দেশে রামায়ণ মহাভারতে এমন অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস আছে? আমি বললাম।
—হ্যাঁ, রাবণের পুষ্পক রথ, সঞ্জয়ের দিব্যদৃষ্টি, ব্রহ্মাস্ত্র— এমন কত শত উদাহরণ। সে যুগে কল্পনার বাইরে এসবের অস্তিত্ব ছিল না— সেটা বলা বাহুল্য। আমরা এখন যেমন মার্ভেলের সিনেমাতে দেখি— আয়রনম্যান কীসব অত্যাশ্চর্য যন্ত্রপাতি বানিয়ে ফেলে। সেইসব আজ থেকে একশো বছর পর কেউ দেখতে বসে যদি ভাবে এগুলো সত্যিই ছিল, তাহলে সেটা তার মূর্খামির পরিচয়ই বহন করবে। যাই হোক, কল্পনাকে ছেড়ে বাস্তবে ফেরা যাক। হেরন নামে একজন গ্রিক ইঞ্জিনিয়ার প্রথম শতাব্দী নাগাদ একটা মজার খেলনা বানিয়েছিলেন। গানগাওয়া পাখি। এর নকশাটা তিনি একটা বইতে লিখে রেখে গেছিলেন, যেটা পরে ঐতিহাসিকরা উদ্ধার করেছেন। একটা এয়ারটাইট বাক্সের মধ্যে জলের প্রবাহের মাধ্যমে অমন সুরেলা শব্দ তৈরি করার নকশা। মজার ব্যাপার হল, আমাদের দেশেও নাকি এমন জিনিসের খোঁজ পাওয়া যায়। সে অবিশ্যি এক কাঠি বাড়া। মামল্লপুরম প্রশস্তিতে তার উল্লেখ পাওয়া গেছে।
—মামল্লপুরম? মানে আমাদের চেন্নাইয়ের কাছে? মহাবলীপুরম? মঞ্জুশ্রী বলল বটে, কিন্তু চেন্নাইয়ের রেফারেন্স পেয়ে আমরা সকলেই একটু খুশি হয়ে গেছি। আমাদের চাকরিজীবনের প্রথম শহর বলে কথা!
—হ্যাঁ, আমাদের চেন্নাইয়ের দক্ষিণের মামল্লপুরম, বা, যাকে এখন আমরা মহাবলীপুরম বলে চিনি। সেখানে এরকম অদ্ভুত এক অটোম্যাটন ছিল নাকি। সেই রাজা দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনের সময়। অর্থাৎ সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে। দন্ডিন নামে সেই সময় এক বিখ্যাত কবি ছিলেন। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় যে মান্ধাতার নামে এক স্থপতি নাকি এমন বায়ু এবং জলের সাহায্যে একটা কথাবলা মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। সে অবিশ্যি একটাই কথা বলতে পারত। কী বলত?
—কী? সমস্বরে জানতে চাইলাম।
জয়দা একটু আড়মোড়া ভেঙে বলল, খিদে পেয়েছে।
শুভ বলল, এই তো খেলে। এক গামলা পোহা হজম হয়ে গেল?
জয়দা শুভর দিকে সেই ভস্মাসুর মার্কা দৃষ্টি হেনে বলল, ওটা কোটেশনের মধ্যে ছিল।
শুভ বোকা বনে বলল, মানে?
মঞ্জুশ্রী বুদ্ধিমান। বুঝে ফেলে বলল, ওই মূর্তিটা ‘খিদে পেয়েছে’ বলত? বলে খিল খিল করে হেসে উঠল।
জয়দা উপর-নিচে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, তারপর বলল— দন্ডিন লিখছেন যে সে নাকি থেকে থেকে ‘ক্ষুদিতম্’ বলে উঠত। ভাব একটা পাথরের মূর্তির নাকি কলাকৌশলের জেরে খিদেও পেত।
শুভ কিছুটা স্বগতোক্তির ঢঙে বলল, সাধে কি রবি ঠাকুর বলেছেন, ক্ষুধিত পাষাণ!
এবং শুভর কথা শুনে রান্নাঘর থেকে রবিঠাকুর আবার গলা বাড়িয়ে বলল, ভুখ লাগা ক্যা ভাইয়া?
আর ঠিক তখনই জয়দার ফোনটা প্রায় পিলে চমকে দিয়ে বেজে উঠল।
[আবার আগামী সংখ্যায়]

