অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
আয়ের অসাম্যের বিপরীতে, সম্পদের অসাম্যই আজ এই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অসাম্যের অবস্থা সৃষ্টি করেছে। তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে মোট যে পরিমাণ সম্পদবৃদ্ধি ঘটেছে— তার ৪১ শতাংশই সারা পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ জনতার কুক্ষিগত হয়েছে। এর বিপরীতে, অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে সবচেয়ে নিচে থাকা ৫০ শতাংশ জনসংখ্যার কপালে জুটেছে ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীর মোট সম্পদবৃদ্ধির পরিমাণের মাত্র ১ শতাংশ
কোভিড-সময়ের শেষার্ধ। এমন এক সময়ে একা একা কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। শহরকে একা একা খোঁজার এমন অভ্যাস তখনই বহুদিনের। মহামারি কাটিয়ে ওঠা শহরকে তখন আরও নরম চোখে চিনেছিলাম।
এ-সময়েরই একটি দৃশ্য মনে পড়ছে। পার্ক স্ট্রিটের কোনও এক আলোকোজ্জ্বল সন্ধ্যা। কোভিড-টিকাকরণের তখন দ্বিতীয় পর্যায়। কাজেই প্রথম পর্যায়ের টিকাকরণ মোটামুটি শেষ হয়ে এসেছে। ভরসা পেয়ে কুল-বাঁচানো বাবুসকল সে-সময়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। রেস্তোরাঁর টেবলগুলিতে হুল্লোড়ের কমতি নেই। কাচের জানালার ওপাশে নিয়ন-আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া সাজানো টেবল। পানীয়ের সম্ভার। হৃষ্টপুষ্ট মুখে খাবার ঠুসতে থাকা একেকজন খদ্দর-পরা ভদ্দরলোকের অবয়ব।
ঠিক তার বাইরেটায় বয়সে রীতিমতো প্রবীণ, শ্মশ্রুগুম্ভশোভিত একজন প্রহরী— দ্বারবান। বুকে তকমা আঁটা, “প্লিজ বি আওয়ার গেস্ট, আয়্যাম ভ্যাকসিনেটেড।” ভিতরে তখন ভ্যাকসিন নেওয়া অথবা না-নেওয়া বাবু-বিবিদের দল রুশ-মার্কিন চক্রান্ত, তদুপরি এহেন ভ্যাকসিন/ভ্যাকসিনেশনের পিছনেও কেমন ভয়াবহ ধরনের সব আন্তর্জাতিক চক্রান্ত জড়িয়ে আছে— এই সব নিয়ে মতবিনিময়ের অনুপানে রক্তিম পানীয়ের ঢল নামিয়েছেন। অন্যদিকে প্রবীণ, তকমা-আঁটা মানুষটি এপাশে ঠায় দণ্ডায়মান। কষ্ট হলেও মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখাটা তাঁর ‘জব-রোল’-এর অন্তর্গত। মদ গিলে বেরোনো বাবুদের অসম্মান সহ্য করাটাও।
অসাম্যের এমন একেকটি উদাহরণ সর্বদাই তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
আমাদের চারপাশেই।
আলাদা করে তার জন্য অধ্যাপক স্টিগলিৎজের গবেষণাপত্র পাঠ নিষ্প্রয়োজন। বরং অধ্যাপক স্টিগলিৎজ ও তাঁর সহকারী গবেষক-দলের যে প্রস্তাব, তার প্রধান লক্ষ্য ছিলেন বিশ্বের তাবড় রাষ্ট্রনেতাদেরই একাংশ— বারংবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেও, উন্নয়নের বিরাট প্রদীপের তলায় থাকা আরও বিরাট অন্ধকারটুকু যাঁদের নজরে আসে না একেবারেই।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সদ্য শেষ হয়েছে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন। মোদি–মেলোনির কূটনীতি, রুশ–ইউক্রেন সংঘাত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার কূটনৈতিক মনোমালিন্য— ইত্যাদি বিষয়ই যে সম্মেলন-প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলিতে প্রধান গুরুত্ব পেল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সম্মেলনে আলোচিত অর্থনীতি ও তৎসম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের মূল বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে তাদের নজরের আড়ালে চলে গিয়েছে।
তাই এই সম্মেলনের প্রধান গুরুত্বের প্রসঙ্গে প্রথমেই বেসরকারি গবেষণা-সংস্থা অক্সফ্যামকে উদ্ধৃত করতে চাইব। তাদের বক্তব্য—
ইতিহাসে এটিই প্রথম শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্মেলন, যেখানে বিশ্বব্যাপী অসাম্যের যে চূড়ান্ত অবস্থা— তাকেই সমস্ত আলোচনায় প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করা হল। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকার সবল নেতৃত্বের পরিচায়ক— যার ফলে আজ কোটিপতিদের সম্পদের তুলনায় অসাম্যের বিষয়টিকেই আলোচনার সামনের সারিতে নিয়ে আসা গিয়েছে।[1]
‘ইনইক্যুয়ালিটি এমার্জেন্সি’ অথবা বাংলায় বললে ‘অসাম্যের এক জরুরি অবস্থা’— নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ ও তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটি অসাম্য ও বিশ্ব অর্থনীতির বিষয়ে জি-২০ দেশগুলির কাছে পেশ করা তাঁদের রিপোর্টে বর্তমান সময়কালকে এভাবেই ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন।[2][3] তাঁদের বক্তব্য[4] অনুসারে, সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক অসাম্যের যে বর্তমান অবস্থা, তা আজ কেবল আর মুষ্টিমেয় কয়েকটি গরিব দেশে সীমাবদ্ধ নেই। বিপরীতে, সারা পৃথিবীতেই এই অসাম্যের অবস্থা ক্রমশ তার আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে।
অক্সফ্যামের রিপোর্ট[5] অনুসারে জানা যাচ্ছে, গত এক বছরে বিশ্বের কোটিপতিদের মোট সম্পদবৃদ্ধির পরিমাণ কমবেশি ২.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অঙ্ক বলছে, কেবল এই ‘সম্পদবৃদ্ধি’র পরিমাণটুকু দিয়েই সারা পৃথিবীতে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা সমস্ত মানুষকে দারিদ্র্যসীমার উপরে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল!
অক্সফ্যাম তাঁদের নিজস্ব বিবৃতিতে[6] জানিয়েছে, সকল জি২০ সদস্য রাষ্ট্রের উচিত—
- পূর্ববর্তী জি-২০ সম্মেলনগুলির আদর্শ মেনে বৃহৎ পুঁজিপতিদের উপর কর বাড়ানো,
- অধ্যাপক স্টিগলিৎজ ও তাঁর সহযোগী গবেষকদের প্রস্তাব অনুযায়ী অবিলম্বে অসাম্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্যানেল তৈরি করা, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা এই বিষয়ে গঠনমূলক কৌশল নির্ধারণ করবেন, এবং
- বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ঋণ-সংকট মোকাবিলায় কার্যকরী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন।
যদিও শেষ অবধি, (সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ চাপে জি-২০ সম্মেলনের তরফে যে সরকারি বিবৃতি প্রকাশিত হয়, তাতে এই বিষয়গুলি যথেষ্টই লঘুত্বের সঙ্গে পরিবেশিত হয়েছে। তবু দক্ষিণ আফ্রিকা ও তার সহযোগী দেশগুলির তরফে বারংবার এই বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা এবং কূটনৈতিক একাধিক পদক্ষেপ ওয়াকিবহাল মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এমনকি, ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুলা দ্য সিলভা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী— যথাক্রমে সিরিল রামাফোসা ও পেড্রো স্যাঞ্চেজের তরফে— লিখিত একটি যৌথ সম্পাদকীয় নিবন্ধ[7] সম্মেলন চলাকালীন ফাইনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই নিবন্ধেও ‘অসাম্যের এই জরুরি অবস্থা’র বিষয়ে নিবন্ধ-লেখকেরা শঙ্কা প্রকাশ করেন।
পৃথিবীতে ধনী–গরিব ভেদাভেদ থাকবে—এই ‘বাস্তবের সঙ্গে’ আমরা বহুকাল মানিয়ে নিয়ে চলেছি। তবু মানিয়ে নিতে নিতে, পরিস্থিতির অবনতি যে ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়েছে, সেই ‘আরেক বাস্তব’-কেই স্টিগলিৎজ-কমিটির রিপোর্ট[8] আজ সামনে নিয়ে এসেছে। রিপোর্ট অনুসারে কিছু তথ্য তাই এই প্রসঙ্গে পেশ করা জরুরি।
জি-২০ সদস্য দেশগুলির সামনে স্টিগলিৎজ-নেতৃত্বাধীন ‘জি২০ এক্সট্রাঅর্ডিনারি কমিটি অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট এক্সপার্টস অন গ্লোবাল ইনইক্যুয়ালিটি’র তরফে পেশ করা এই রিপোর্ট বলছে, বিশ্বব্যাঙ্কের তরফে নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুসারে এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীর ৮৩ শতাংশ দেশে অর্থনৈতিক অসাম্যের এক চরম অবস্থা বজায় রয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্কের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনও দেশে জনসংখ্যার গড় আয়ের নিরিখে জিনি সূচকের মান[9] যদি ০.৪-এর কম হয়, তবে সেই দেশে চরম অর্থনৈতিক অসাম্যের অবস্থা বজায় রয়েছে বলে নির্ধারণ করা যেতে পারে। স্টিগলিৎজ-কমিটির রিপোর্ট অনুসারে, আজ সারা পৃথিবীর ৮৩ শতাংশ দেশেই এই অবস্থা জারি রয়েছে; এবং জনসংখ্যার নিরিখে সারা পৃথিবীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এই তথ্য অনুসারে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অসাম্যের অবস্থায় থাকা দেশগুলিতেই বসবাস করেন।
আয়ের অসাম্যের বিপরীতে, সম্পদের অসাম্যই আজ এই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অসাম্যের অবস্থা সৃষ্টি করেছে। তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে মোট যে পরিমাণ সম্পদবৃদ্ধি ঘটেছে— তার ৪১ শতাংশই সারা পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ জনতার কুক্ষিগত হয়েছে। এর বিপরীতে, অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে সবচেয়ে নিচে থাকা ৫০ শতাংশ জনসংখ্যার কপালে জুটেছে ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীর মোট সম্পদবৃদ্ধির পরিমাণের মাত্র ১ শতাংশ।
এই সময়কালের ভিতরে পৃথিবীর ধনীতম ১ শতাংশ জনসংখ্যার গড় সম্পদবৃদ্ধির পরিমাণ যেখানে ১.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার— এর বিপরীতে দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ জনসংখ্যার একই সময়ে গড় সম্পদবৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ৫৮৫ মার্কিন ডলার! অর্থাৎ অঙ্কের নিরিখে দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের বিপরীতে ধনীতম ১ শতাংশ জনসংখ্যার মোট সম্পদবৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ২,৬৬৫ গুণ।
‘অসাম্যের নিরিখে জরুরি অবস্থা’— এই শব্দবন্ধকে আর এতটুকুও অত্যুক্তি বলে মনে হয় না। তথ্য বলছে, সারা পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার অন্তত ২৫ শতাংশ মানুষ (সংখ্যার হিসেবে ২৩০ কোটি মানুষ) এই মুহূর্তে খাদ্যের নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। অর্থাৎ এই শস্যশ্যামলা, অন্নপূর্ণা পৃথিবীর ২৩০ কোটি মানুষ এই মুহূর্তে নিয়মিত অন্তত একবেলা, অথবা সারাদিনই, আধপেটা খেয়ে থাকেন।
সংখ্যা বলছে, সারা পৃথিবীর ধনীতম ১০ শতাংশ মানুষের হাতেই এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীর মোট আয়ের ৫৪ শতাংশ ও মোট সম্পদের ৭৪ শতাংশ কুক্ষিগত রয়েছে। বিগত ৪০ বছরের তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, এই সময়কালের ভিতরে পৃথিবীর ধনীতম ১ শতাংশ জনসংখ্যার গড় বার্ষিক আয়বৃদ্ধির পরিমাণ ১.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার— এর বিপরীতে দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ জনসংখ্যার একই সময়ে গড় বার্ষিক আয়বৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ৩৫৮ মার্কিন ডলার! সারা পৃথিবীর মোট জিডিপির ১৬ শতাংশই এখন ধনীতম ৩,০০০ জন কোটিপতির নিয়ন্ত্রণে।
তথ্য আরও বলছে, ২০২০ কোভিড মহামারি-পরবর্তী সময়ে এই পৃথিবীতে দারিদ্র্য-দূরীকরণের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এমনকি বেশ কিছু দেশে ২০২০-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য-দূরীকরণের বিপরীতে নতুন করে আরও আগ্রাসী দারিদ্র্যের অবস্থা সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই এখনও পর্যন্ত ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসার নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। এমনকি সারা পৃথিবীর অন্তত ১৩০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যখাতে অস্বাভাবিক খরচের কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমশ দারিদ্র্যের দিকে এগিয়েছেন। নির্দিষ্ট কোনও একটি তথ্য উল্লেখ করে বলতে হলে, আজকের কেনিয়ায় মাতৃত্বজনিত মৃত্যুর হার আধুনিক সুইডেনে একই হারের তুলনায় প্রায় ৩৭ গুণ!
এর বিপরীতে দেখা যাচ্ছে, কোটিপতিদের সম্পদবৃদ্ধির অন্যতম কারণও তাঁদের মেধা, পরিশ্রম বা তিতিক্ষা নয়! স্রেফ উত্তরাধিকার-সূত্রে আহরিত সম্পদের বাড়বাড়ন্তেই আজ তাঁদের এতখানি সম্পদবৃদ্ধি ঘটছে। মনে রাখা প্রয়োজন, এই উত্তরাধিকার-সূত্রে আহরিত সম্পদের উপর অধিকাংশ দেশেই সামান্যতম করও বলবৎ করা হয় না। ধনী থেকে ধনীতর হওয়ার পথে তাই কারও সামান্যতম প্রতিবন্ধকতা নেই। অঙ্ক বলছে, আগামী ৩০ বছরে পৃথিবীর ধনীতম ১,০০০ জন মানুষ উত্তরাধিকার-সূত্রে তাঁদের উত্তরসূরিদের খাতায় অন্ততপক্ষে ৫.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হস্তান্তরিত করবেন। আগামী এক দশকে স্রেফ উত্তরাধিকার-সূত্রেই সারা পৃথিবীর মোট সম্পদবৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। সামাজিক অসাম্যের এর চেয়ে প্রকট কোনও উদাহরণ নেই।
এর ফলে সারা পৃথিবীর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর প্রভাব পড়বে। অধ্যাপক স্টিগলিৎজ ও তাঁর সহযোগীরা মনে করেন[10], চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অসাম্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনও একটি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমাগত বাড়বে। রাশিতথ্যের নিরিখেই, অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল একেকটি দেশের তুলনায়, অর্থনৈতিক অসাম্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একেকটি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির সম্ভাবনা অন্তত সাতগুণ বেশি।
ঋণগ্রস্ত অর্থনীতির ভার সইতে না পেরে আমাদের প্রতিবেশী একাধিক দেশে এই অর্থনৈতিক অসাম্য এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘটনা ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে। নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান এর সাম্প্রতিক উদাহরণ। গরিবির সুযোগ নিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে উত্তেজিত করা ও ট্রল-আর্মি হিসেবে ব্যবহার করার কুফল যে কোন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ঘটনায় আমরা তার একের পর এক উদাহরণ দেখেছি।
আমাদের দেশেও পরিস্থিতি একেবারেই সুবিধাজনক নয়। চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অসাম্যের অবস্থা প্রতি পদক্ষেপে নানান মাধ্যমে আমাদের সম্মুখে উঠে আসছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ নির্মূলীকরণের প্রয়াস।
স্টিগলিৎজ-কমিটির তরফেই পরিবেশ পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক প্যানেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক অসাম্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও একটি বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক প্যানেল তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সত্তরটি দেশের পাঁচ শতাধিক বিজ্ঞানী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ এবং অসাম্যের বিষয়ে বিশেষজ্ঞজনেরা এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে একটি প্রকাশ্য বিবৃতি[11] জারি করেছেন। নিন্দুকেরা বলছেন, অসাম্যের বিষয়টিকে এভাবে সামনে নিয়ে আসা এবং সেই সঙ্গে এই প্রসঙ্গে সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের চেষ্টা— এই কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসার যাবতীয় মনোমালিন্যের সূচনা।[12] কারণ তথ্য বলছে:
১. চূড়ান্ত অসাম্যের অবস্থায় না থাকলেও, এই মুহূর্তে প্রথম বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন অর্থনৈতিক অসাম্যের বিস্তার সর্বাধিক, তারপরেই ইংল্যান্ড।
২. এই সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী অসাম্যের বিষয়টি এমন গুরুত্ব পাওয়ার পরেই ঘূর্ণনরীতি অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ং জি-২০ সম্মেলনের সভাপতিত্ব লাভ করতে চলেছে; কাজেই বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে কষ্টকর এবং কূটনৈতিকভাবে বিড়ম্বনার হয়ে দাঁড়াবে। এবং
৩. সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কোটিপতি ব্যবসায়ীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে একটি আস্ত সোনার বাট উপহার দেন— যার পরবর্তীতে শ্রীযুক্ত ট্রাম্প সুইজারল্যান্ডের উপর চাপানো অতিরিক্ত শুল্কহার প্রত্যাহার করেন।[13]
অধ্যাপক স্টিগলিৎজ মনে করেন, বিশেষ করে শেষোক্ত ঘটনাটিই প্রমাণ করে দেয়— কীভাবে বৃহৎ-পুঁজির দ্বারাই আজ সারা পৃথিবীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাবলি চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়ে চলেছে।
[1] G20: South Africa defies geopolitical bullying and puts inequality emergency on global agenda, says Oxfam. Oxfam International. Nov 22, 2025.
[2] The Guardian view on the inequality emergency: why a Nobel prize winner’s warning must be heeded. Editorial, The Guardian. Nov 30, 2025.
[3] G20 EXTRAORDINARY COMMITTEE OF INDEPENDENT EXPERTS ON GLOBAL INEQUALITY. SUMMARY AND FULL REPORT. Nov, 2025.
[4] দ্রষ্টব্য, টীকা ২।
[5] দ্রষ্টব্য, টীকা ১।
[6] পূর্বোক্ত।
[7] Lula, Ramaphosa and Sánchez: We face an inequality emergency. Financial Times. এই নিবন্ধটি পড়তে গেলে পত্রিকার গ্রাহক/সদস্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।
[8] দ্রষ্টব্য, টীকা ৩।
[9] Gini coefficient. Wikipedia.
[10] দ্রষ্টব্য, টীকা ২, ৩।
[11] 500 economists and inequality experts from seventy countries support call for new ‘IPCC for inequality’. World Inequality Database. Nov 14, 2025.
[12] Savage, Rachel. South Africa’s dispute with US escalates amid row over G20 handover event. The Guardian. Nov 21, 2025.
[13] O’Caroll, Lisa. Swiss gold and Rolex gifts to Trump arouse ‘disgust’ in Europe. The Guardian. Nov 21, 2025.

