শুভদীপ ঘোষ
বার্গম্যানের শিল্পীজীবন কিন্তু শুরু হয়েছিল একজন নাট্যনির্দেশক হিসেবেই। আটচল্লিশটি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তাঁর নির্দেশিত নাটকের সংখ্যা চলচ্চিত্রের প্রায় তিনগুণেরও বেশি! এমন সময়ও গেছে যখন বছরে তিনি চারটি করে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। চলচ্চিত্র ও নাটক উভয়ক্ষেত্রেই স্বমহিমায় বিরাজমান, বার্গম্যান ছাড়া আর তেমন দেখা যায়নি
ইঙ্গমার বার্গম্যানের প্রসিদ্ধি মূলত একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে। তাঁর চলচ্চিত্র দেখে মুগ্ধ হননি এরকম মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু নাট্যনির্দেশক হিসেবেও তিনি যে খুবই প্রসিদ্ধ ছিলেন, এ-ব্যাপারে আমরা সম্ভবত ততটা ওয়াকিবহাল নই। তাঁর শিল্পীজীবন কিন্তু শুরু হয়েছিল একজন নাট্যনির্দেশক হিসেবেই। আটচল্লিশটি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তাঁর নির্দেশিত নাটকের সংখ্যা চলচ্চিত্রের প্রায় তিনগুণেরও বেশি! এমন সময়ও গেছে যখন বছরে তিনি চারটি করে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন।
পেশাদার নাট্যনির্দেশক হিসেবে কাজ শুরু করার পূর্বে তিনি বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করেন স্টকহোমের মাস্টার ওলোফসগার্ডেন থিয়েটার এবং স্টুডেন্ট থিয়েটারে। শখের প্রোডাকশন হলেও এগুলি বহুলপ্রচারিত হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল তাঁর লেখা প্রথম নাটক দ্য ডেথ অফ পাঞ্চ (১৯৪২)। নাটকটি একজন অভিনেতাকে নিয়ে, যার সঙ্গে মৃত্যুর দূত দেখা করতে আসত। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে, তাঁর বিখ্যাত দ্য সেভেন্থ সিল ছবিটির কথা। ক্রুসেড শেষে ফেরার পথে ছবির প্রধান চরিত্র অ্যান্থনিও ব্লক সমুদ্রের পারে মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলতে বসেন। বোঝা যায় জীবনের শুরু থেকেই বার্গম্যানের শিল্পসাধনার একটা প্রধান বিষয় ছিল মৃত্যু। তিনি ছিলেন সুইডেনের সর্বকনিষ্ঠ থিয়েটার ম্যানেজার। পেশাদার নাট্যনির্দেশক হিসেবে ১৯৪৪ সালে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত হন দক্ষিণ সুইডেনের মাঝারি মাপের শহর হেলসিংবর্গের মিউনিপ্যাল থিয়েটারে। তাঁর দায়িত্ব ছিল মৃত এই রঙ্গমঞ্চটিকে পুনরুজ্জীবিত করা। কাজটি তিনি সফলতার সঙ্গে করেছিলেন। বলতে গেলে একটা ঘুমন্ত নাট্যশালাকে দুটি মরশুমের মধ্যে পরিণত করেছিলেন বিতর্কের অতিজাগরুক একটি অট্টালিকায়। তিনি নিজে ন-টি নাটক মঞ্চস্থ করেন। এর মধ্যে ১৯৪৪ সালে নির্দেশিত শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ নাটকটি রাজনৈতিক কারণে পৃথকভাবে উল্লেখযোগ্য। এই নাটকের মূল চরিত্রটিকে নাজিবাদের সর্বগ্রাসিতার প্রতিমূর্তিতে গড়ে তোলা হয়।

হেডা গ্যাবলার, স্টকহোম ১৯৬৪
তথাপি বার্গম্যানের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৪৬-৪৯ গোথেনবার্গ মিউনিসিপ্যাল থিয়েটারের প্রিন্সিপ্যাল ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার সময়ই তিনি নাটকের শিল্পসুষমার দিকটি বুঝতে ও শিখতে শুরু করেন। আসলে হেলসিংবর্গের থেকে গোথেনবার্গের থিয়েটারে আধুনিক যন্ত্রপাতি অনেক বেশি পরিমাণে ছিল। আলবেয়ার কামুর ক্যালিগুলা-র মতো বিস্ফোরক প্রোডাকশনে কীভাবে এই যন্ত্রপাতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা যায় সেটা যেরকম শিখেছিলেন আবার প্রয়োজনমতো মিত-ব্যাবহারের ব্যাপারটাও রপ্ত করেছিলেন। এই ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় গোথেনবার্গে মঞ্চস্থ তাঁর শেষ নাটকটির কথা ভাবলে। প্রথমবারের জন্য আমেরিকার আধুনিক নাট্যকার টেনিসি উইলিয়ামের অ্যা স্ট্রিটকার নেম ডিজায়ার মঞ্চস্থ করেন। বাস্তবতার প্রকাশ ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের নিরিখে এই নাটকটিকে চিহ্নিত করা যায় তাঁর ছোট আকারের অভিনেতা-কেন্দ্রিক আগামীদিনের সফল নাটকগুলির সূচনা হিসেবে।
১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ মাল্মো মিউনিসিপ্যাল থিয়েটারে শিল্পনির্দেশক হিসেবে কাজ করার সময়টি নাট্যকার হিসেবে তাঁর সবচাইতে সফল সময় গেছে। তাঁর চলচ্চিত্রে যে সমস্ত প্রথিতযশা অভিনেতাদের আমরা দেখতে পাই তাঁদের এই সময়ই তিনি একত্রিত করেন। বিবি অ্যান্ডারসন, হ্যারিয়েট অ্যান্ডারসন, নাইমা উইফস্ট্র্যান্ড, ইনগ্রিড থুলিন, ম্যাক্স ভন সিডো, গুনেল লিন্ডব্লম এবং আরলেন্ড জোসেফসন— এঁরা সবাই নাটক থেকে উঠে এসেছিলেন। মাল্মো-য় বার্গম্যানের বছরগুলি উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে নাটক নিয়ে অসামান্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। এর মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ ফ্রাঞ্জ ল্যাহের-র মেরি উইডো যেরকম আছে, একই সঙ্গে আছে সুইডেনের লোক-কাব্য দ্য পিপল অফ ভার্মল্যান্ড-এর বিশ্বাসযোগ্য অবিকৃত মঞ্চায়ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এখানেই বার্গম্যান ধ্রুপদী সাহিত্যগুলিকে আন্তরিকতার সঙ্গে মঞ্চরূপ দেওয়া শুরু করেন। যেমন মলিয়েরের ডন জুয়ান-এর বিদ্রূপাত্মক উপস্থাপনা কিংবা গ্যয়েটের ফাউস্ট-এর একদম নতুন ধরনের ব্যাখ্যা। কিংবা স্ট্রেইন্ডবার্গ-এর ঘোস্ট সোনাটা বা ইবসনের পিয়ার জিন্ট। এই আখ্যানগুলির কাছে তিনি বারবার ফিরে গেছেন আর প্রত্যেকবার প্রদান করেছেন নতুন ধরনের ব্যাখ্যা। একজন শ্রেষ্ঠ সেতারবাদক যেরকম একই রাগের প্রত্যেকবার বহুবিধ উপস্থাপনা করে থাকেন, এও অনেকটা সেরকমই।

মিস জুলি, স্টকহোম ১৯৯১
তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, রেপার্টরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট প্রিয় নাট্যকারকে কখনওই আলাদা প্রাধান্য দেননি। বরং সর্বদা উৎসুক থেকেছেন বিভিন্ন ধরনের কাজ গ্রহণ করতে। এটা কিন্তু সত্যি। তাঁর শুরুটার কথা যদি আমরা ভাবি তাহলে দেখবে তিনি কত অনায়াসে যাতায়াত করেছেন আলবেয়ার কামু, টেনিসি উইলিয়ামস ও আধুনিক সুইডিশ নাট্যকারদের মধ্যে। প্রারম্ভিক এই সাফল্য তাঁর প্রতিভাকে করেছে আরও বিকশিত এবং প্রণোদিত করেছে মলিয়ের, গ্যয়েটে, স্ট্রেইন্ডবার্গ বা ইবসনের মতো তথাকথিত কঠিন আখ্যানকারদের কাজকে নতুন নতুন ব্যাখ্যা সহকারে বারংবার মঞ্চস্থ করতে। যেমন, মলিয়েরের ডন জুয়ান বা স্ট্রেইন্ডবার্গের এ ড্রিম প্লে বা ইবসেনের হেডা গ্যাবলার-এর কাছে বিভিন্ন সময়ে তিনি অন্তত বার তিনেক ফিরে গেছেন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৬, স্টকহোমের রয়্যাল ড্রামাটিক থিয়েটারের প্রধান হিসেবে কাজ করার সময়ও মাল্মোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বজায় ছিল। ১৯৬৪ সালে নির্দেশিত ইবসেনের হেডা গ্যাবলার, নাট্যনির্দেশক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রোডাকশন বলা যেতে পারে। এর মঞ্চায়নের তাকলাগানো শৈলী এবং আদ্যন্ত মৌলিক পন্থা ইউরোপের নাট্যজগতে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দেয়। অনেক নাট্যসমালোচকের মতে এটি হেডা গ্যাবলার-এর অন্যতম সেরা বৈপ্লবিক ও প্রভাবশালী প্রোডাকশন। এই নাটকটি ১৯৬৮ সালে লন্ডনে এবং ১৯৭৯ সালে মিউনিখে আবার মঞ্চস্থ করেন।

মারিয়া স্ট্রাউট, স্টকহোম ২০০০
ষাটের দশকটিকে বলা যায় তাঁর ক্ষেত্রে ইবসেনের দশক এবং সত্তরের দশকটি স্ট্রেইন্ডবার্গের দশক। সত্তরের দশকে স্ট্রেইন্ডবার্গের এ ড্রিম প্লে তিনি পুনরায় মঞ্চস্থ করেন। এবার এর রূপ, পূর্বের প্রক্ষেপণ ও উপকরণ ব্যতিরেকে, এক সরলীকৃত রূপ। মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল নতুন ধরনের অভিনয়ের দিকে। মাল্মোর পর তৃতীয়বারের জন্য ঘোস্ট সোনাটা এবং প্রথমবারের জন্য স্ট্রেইন্ডবার্গেরই টু দামাস্কাস এই সময়ই মঞ্চস্থ হয়। সম্ভবত স্ট্রেইন্ডবার্গ-ই সেই নাট্যলেখক যার কাছে বার্গম্যান ঘনঘন ফিরে গিয়েছেন। মিউনিখের আবাসিক থিয়েটারে এই সময় নোরা জুলি নাম দিয়ে তিনটি নাটকের একটি প্রোডাকশন মঞ্চস্থ করতেন— এর মধ্যে ছিল ইবসেনের এ ডল’স হাউস, স্ট্রেইন্ডবার্গের মিস জুলি এবং পরবর্তীকালে বিখ্যাত হওয়া নিজেরই টিভি সিরিজ এ সিনস ফ্রম এ ম্যারেজ-এর নাট্যরূপ। আশির দশকে জার্মানি থেকে সুইডেনে ফিরে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ফ্যানি অ্যান্ড অ্যালেকজান্ডার-এর পর তিনি পুনরায় রয়্যাল ড্রামাটিক থিয়েটারে নাট্যনির্দেশনার কাজ শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে পুনরায় স্ট্রেইন্ডবার্গের মিস জুলি ও এ ড্রিম প্লে, ১৯৮৯ সালে এ ডল’স হাউস এবং ১৯৯১ সালে পিয়ার জিন্ট। এর সঙ্গে শুরুর দিকের সেই বিতর্কিত ম্যাকবেথ-এর পর, ১৯৮৪ সালে দৃশ্যত মহিমান্বিত কিং লিয়ার, ১৯৮৬-তে অত্যন্ত বিতর্কিত হ্যামলেট এবং ১৯৯৪-এর এ উইন্টার টেল দিয়ে শেষ হয় তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত শেক্সপিয়ার-বীক্ষা। এর সমান্তরালে আধুনিক নাটক থেকে তিনি কিন্তু কখনও সরে আসেননি। ধারাবাহিকভাবে লিখলে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়— ১৯৮৮ ইউজিন ও’নেইল-এর লং ডে’জ জার্নি ইন্টু নাইট, ১৯৮৯ ইউকিও মিশিমার মার্কুই ডি সাদ, ১৯৯৩ বোথো স্ত্রাউসের টাইম অ্যান্ড দ্য রুম, ১৯৯৪ জর্জ তাবরির গোল্ডবার্গ ভ্যারিয়েশনস, ১৯৯৫ উইটোল্ড গম্ব্রোইচের ইভন, প্রিন্সেস অফ বুর্গুন্ডি এবং ১৯৯৮ পার ওলোভ এঙ্কুয়েস্টের দ্য ইমেজ মেকার’। এর মধ্যেই ১৯৯১ সালে প্রথমবারের জন্য বার্গম্যান মঞ্চস্থ করেন সুইডিশ কম্পোজার ড্যানিয়েল বোর্টজের সুরারোপিত অসামান্য অপেরা দ্য বাচ্চে! ২০০০ সালে পুনরায় ফিরে যান স্ট্রেইন্ডবার্গের ঘোস্ট সোনাটা-র কাছে, সে-বছরই ফ্রেড্রিখ ভন শিলারের মারিয়া স্ট্রাউট এবং ২০০২-এ ইবসেনের ঘোস্ট।
সামগ্রিকভাবে, বার্গম্যানের নাটক পরিচালনার ধারা কোনও নির্দিষ্ট নান্দনিক নীতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। বার্গম্যান নিজেই বলেছিলেন, “আমি কখনওই কোনও নাটক মঞ্চস্থ করব না যা লেখকের মূল অভিপ্রায়ের পরিপন্থী। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কখনও তা করিনি। আমি সবসময় নিজেকে দেখেছি একজন ব্যাখ্যাতা, এক পুনঃসৃষ্টিকারী হিসেবে।” চলচ্চিত্র ও নাটক উভয়ক্ষেত্রেই স্বমহিমায় বিরাজমান, বার্গম্যান ছাড়া আর তেমন দেখা যায়নি।
তথ্যসূত্র:
- মারেট কস্কিনেনের বার্গম্যান সংক্রান্ত একটি গবেষণা।

