তা হ’লে কেন বুদ্ধিজীবী

অশোক মিত্র

 

নিবন্ধটি রূপা অ্যান্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত সমাজসংস্থা আশানিরাশা (১৯৮২ সংস্করণ) থেকে গৃহীত, এবং পরে সংস্কৃতির সংকট ও বুদ্ধিজীবী (২য় খণ্ড) সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত

 

জনৈক বুদ্ধিজীবীর প্রসঙ্গ উত্থাপন ক’রে আমার বক্তব্য শুরু করি। আমার নিজের কথাই বলছি। জনশ্রুতি, আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি, প্রগতিপন্থী অধ্যাপক, এখানে-ওখানে সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব-ও-আদর্শগত সমস্যার উপরে ব’লে থাকি, কখনো-কখনো লিখেও থাকি। সমাজবিপ্লব বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের মুক্তি পরাহত, তর্কে-আলোচনায় প্রায়ই এই বিশ্বাস ব্যক্ত করি, নাবালক ছাত্রছাত্রীদের বাহবা কুড়োই।

কিন্তু কতটুকু মূল্য এ-ধরনের বুলি-কপচানোর? আমার দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সমাজতন্ত্রের আদর্শের সামান্যতম ছোঁয়াও নেই। থাকি পার্ক স্ট্রীটের দক্ষিণে যা একদা শৌখিন সাহেবপাড়া ছিল— এখন পয়সাওলা মারোয়াড়ী-পাঞ্জাবী-অধ্যুষিত— এমন-এক নিভৃত রাস্তার চারতলার আরামদায়ক ফ্ল্যাটে, কাজ করি এমন-এক প্রতিষ্ঠানে যেখানে পড়ানোর সঙ্গে সচ্ছল মাইনের সহ-অবস্থান আছে, শহরে ঘোরাফেরা করি বিদেশ থেকে আমদানি-করা গাড়িতে। বছরে একদিনও ট্রামে-বাসে চড়তে হয় না আমাকে, দাঁড়াতে হয় না র‍্যাশনের লাইনে, ঠেলতে হয় না রেলস্টেশনের ভিড়। কলকাতার বাইরে যখন অন্যত্র যেতে হয়, হাওয়াই জাহাজই প্রশস্ত। তাছাড়া প্রতি বছর দু’একবার দেশের বাইরে যাওয়া তো লেগেই আছে। মস্ত রেডিওগ্রাম, তদ্গত হয়ে ইওরোপীয় সঙ্গীত শুনি; শখ হ’লে পুরোনো কবিবন্ধুদের নিমন্ত্রণ ক’রে বাংলা কবিতার ঘোর অন্ধকার নিয়ে আলোচনা করি; গঙ্গায়-মেঘনায়-যমুনায় জল বয়ে যায়।

আমাকে মিছিলে দেখা যায় না, ময়দানের মিটিংয়ে দেখা যায় না, গা বাঁচিয়ে, অবসর-বিনোদনের আধার হিশেবে আমার সমাজতন্ত্রে আস্থা। ক্বচিৎ-কদাচিৎ লিখে, অথবা মিহিন বক্তৃতা দিয়ে, আমার সাম্যবাদী দায়িত্বের লীলা শেষ: সারগর্ভ সব প্রবন্ধ, উষ্মার ভারে টইটম্বুর নানা বাণী। দেশ থেকে বড়োলোকদের ঝেঁটিয়ে তাড়াতে হবে, এই-এই শিল্পোদ্যোগ রাষ্ট্রীয় করতে হবে, কৃষিক্ষেত্রে ঐ-ঐ মহাজনদের উপর কর বসাতে হবে; মার্কিন দস্যুরা ভিয়েতনামে যে-পাশব তাণ্ডব শুরু করেছে, তার প্রতিবাদে সবাইকে সামিল হ’তে হবে; ট্রামের ভাড়া বাড়ানো অবশ্যই অনুচিত; ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার বক্তব্যে এবং জীবনযাত্রায় কোনো মিল নেই: সন্দেহ হয়, মনে আর মুখেও নেই। আমার প্রবাদিত সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস হয়তো নিছক একটি অভ্যাস। কিশোর এবং তরুণ বয়সে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, পরীক্ষায় ভালো করার লোভে সে-বন্ধন আস্তে-আস্তে আলতো ক’রে আনি। তারপর এক কুড়ি বছর কেটেছে জীবিকার মান উপরে তোলার ধাঁধায়, সুবিধান্বেষণের অনেকগুলি অর্গল পেরিয়ে আপাতত ফের কলকাতায় স্থিত হয়েছি। ব্যাঙ্কে কিছু টাকা জমেছে, বাইরের লোকের জানা নেই, চুপি-চুপি একটা-দুটো জমি কলকাতার আশেপাশে কেনা আছে, জাগতিক সম্ভোগের মগডালে ব’সে এবার নতুন ক’রে মনে হচ্ছে সমাজতন্ত্র মন্দ জিনিশ নয়, একটা-দুটো প্রবন্ধ লেখা যাক। এবং, এমনই বাংলা দেশ, একটা-দুটো প্রবন্ধ লিখে ফেলতে পারলেই বুদ্ধিজীবী হিশেবে নাম হয়ে যেতে বাধ্য। অসাধু আমি, প্রবঞ্চক আমি, দুধ ও তামাকে সমান আগ্রহবান আমি, সেই নামের বেসাতি করছি বিবেককে বিলাসব্যসনের নিচে চাপা দিয়ে। তবে এখনো বোধ হয় মাঝে-মাঝে চক্ষুলজ্জা থেকে ভুগি, গাড়ি হাঁকিয়ে সমাজতন্ত্রের সমস্যার উপর বক্তৃতা দিতে যাই, কিন্তু সভাক্ষেত্র থেকে খানিকটা দূরে গাড়িখানাকে দাঁড় করাই, তারপর বাকিটা পথ হেঁটে যাই।

নিজের কেচ্ছা গাইলাম এতক্ষণ ধ’রে, তার কারণ, অবিনয়ের মতো শোনালেও, বলতেই হয়, বাঙালি বুদ্ধিজীবীর এই স্বরূপটি শুধুই আমার একার নয়: আমার সমসাময়িক এ-রকম আরো অনেকে আছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন সময়ে ছাত্র ছিলেন, আন্দোলন করেছেন, স্লোগান চেঁচিয়েছেন, নতুন সমাজের নীলিমা-ছাওয়া গল্প-কবিতা লিখেছেন, ১৯৪৫-৫০-এর অন্তর্লীন বিপ্লবের ঘোর লাগা-বছরগুলিতে দু’একবার দু’এক সপ্তাহ ক’রে কারাবরণ করেছেন পর্যন্ত। কিন্তু কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই: আমার মতোই, সবাই ভদ্র, সবাই সম্ভ্রান্ত। কেউ সদাগরি দপ্তরে বড়ো সাহেব, কেউ ব্যবসাতে ফেঁপেছেন, কেউ মস্ত সরকারি চাকুরে। পার্ক স্ট্রীটের দক্ষিণাঞ্চলে আমার কাছাকাছি থাকেন, ছেলেমেয়েরা ইংরেজি স্কুলে শাণিত উচ্চারণ ও মার্কিনি কেতা শিখছে, বাড়িতে বাংলাভাষায় কথা বলার পাট প্রায় উঠে যাওয়ার মতো, স্ত্রীরা অফুরন্ত বাড়তি সময় নিয়ে কী করবেন ভেবে পান না। মার্কেট থেকে মার্কেট ঘুরে কেনা-কাটা করার পরে হয়তো তাঁরা ঘোড়দৌড়ের মাঠে যান, নয়তো গলফ রপ্ত করতে শুরু করেন। সন্ধ্যায় প্রতি ফ্ল্যাটে চকচকে ঝকঝকে জনসমাগম, রসালো আড্ডা, প্রাচুর্যে উপচে-পড়া বিন্যাস।

মাত্র কুড়ি বছরে এতটা পরিবর্তন সম্ভবপর সেটা প্রথম ধাক্কায় বিশ্বাস করা অনেকের পক্ষে হয়তো মুশকিল। যাঁরা পরিবর্তিত হয়েছেন, তাঁরা হয়তো মানতেও চাইবেন না কোনো কিছু বিশেষ বদলেছে। তাঁরা সগর্বে বলবেন, তাঁদের বিবেক আছে, লুকিয়ে-চুরিয়ে দু’দশ টাকা তাঁরা এখনো বামপন্থী আন্দোলনের জন্য দিতে প্রস্তুত। ‘সাংস্কৃতিক’ ও ‘সাহিত্যিক’ পত্রিকায় তাঁরা সব সময়েই প্রবন্ধ লিখছেন, সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব খুঁটছেন, অতি বামমার্গিতা কত অপনাশসাধক তা প্রভৃত ব্যাখ্যা ক’রে দেখাচ্ছেন, তা ছাড়া দেশের এবং সমাজের কথা ভেবেই পরিবার নিয়ন্ত্রণ, সাক্ষরতা প্রসার, এ-ধরনের ‘গঠনমূলক’ কাজে প্রবল উৎসাহে নিজেদের— এমন কি স্ত্রীদের পর্যন্ত নিয়োগ করছেন। এখনো তাঁরা বই কেনেন, সামর্থ্য বেড়েছে তাই বেশি ক’রেই কেনেন, বামপন্থী বইও কাতারে-কাতারে কেনেন, বসবার ঘরে সবাইকে সগর্বে দেখান সে-সব বই। কুড়ি বছর আগে উগ্র বামপন্থী ছিলেন, অফিস মহলে সেটা তাঁরা সগর্বে প্রচার করেন— এই প্রচারে বিপদের আশঙ্কা বর্তমানে শূন্য, প্রচারগত গৌরবের পরিমাণই বড়ো। অনেক দপ্তরে মালিক মশাইরা প্রাক্তন বামপন্থী পুষে আমোদ ও আনন্দের খোরাক পান; চিরস্থায়ী ব্যবস্থার ছত্রচ্ছায়ায় ঊনবিংশ শতকে আমাদের জমিদাররা হাতি পুষতেন, পাখি পুষতেন, ওস্তাদ পুষতেন, শিল্পপতিরা তেমনি এখন তাঁদের খেয়াল মেটাচ্ছেন নির্বাপিত বামপন্থী পুষে।

দন্তনখহীন আমরা, ক্লীবত্বের চরম অবস্থায় পৌঁছে গেছি, এভাবে পোষ-মানা যে গ্লানিকর, সে-বোধ পর্যন্ত আমাদের অধিকাংশের অন্তর্হিত। সচ্ছলতার মধ্যে থাকা সমাজতন্ত্রের প্রতীপধর্মী সেটা আমরা মানতে রাজি নই। অনেকে আবার এমন শাণিত যুক্তিও ব্যবহার করেন, ব্যবসাবাণিজ্যে, রাষ্ট্রচালনায় আমরা দক্ষতা শিখছি, এ-সমস্তই ভবিষ্যতের কথা ভেবে, আমাদের দক্ষতা নতুন সমাজের সুষ্ঠু নির্মাণে কাজে লাগবে; সমাজতন্ত্রের আদর্শ আমরা ছেড়ে যাইনি, সমাজতন্ত্রের জন্যই তো আমাদের এই ভালো-থাকা ভালো-পরা ভালো-গাড়ি-চড়া।

কেন এমন হয়? বুদ্ধিজীবীদের কেন এই বিশ্বাসঘাতকতা? বিশ্বাসঘাতকতার পরেও কেন তাঁদের এতদূর পাপবোধহীনতা? একদা কিশোরচেতনায় যে-স্বপ্নের অঞ্জন ছুঁয়েছিল, তাতে কোনো ফাঁকি ছিল না। আমরা সবাই-ই একদা ত্যাগে বিশ্বাস করতাম, সাম্যের মন্ত্র তদ্গত হৃদয়ে আবৃত্তি করতাম, আস্থা ছিল দেশে সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রচার করতে পারবো, কৃষক-মজুরের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারবো, তাদের মধ্যে যতদিন সংহতি ও শ্রেণীচেতনা আসছে না, পাশে-পাশে থেকে আশ্বাস দেবো, আশ্রয় দেবো, অভয় দেবো, এক সঙ্গে জলে ভিজবো, রোদে পুড়বো, কাদায় মাখামাখি হবো। আন্দোলনে ঢুকে, প্রথম কয়েক বছর অন্তত, আমাদের আদর্শের সঙ্গে অভিব্যক্তির, ইচ্ছার সঙ্গে কর্মের, কোনো অসদ্ভাব দেখা যায়নি, প্রথমাবস্থায় তো আমাদের চেষ্টার-অধ্যবসায়ের ত্রুটি হয়নি। তবে তিরিশের প্রান্তে পৌঁছে চিড় ধরলো কেন? চোরের মতো সভয়ে পালিয়ে এলাম কেন? আমাদের আদর্শের শেষ বিবেকটুকু আজ কেন নেহাতই সামান্য ক’টি ছেলেভুলানো বক্তৃতায় আর বাগাড়ম্বর-সর্বস্ব প্রবন্ধে পর্যবসিত?

স্বীকার করতেই হয়, যা হলো, যা হয়েছে, তার হেতু চেতনায়, শ্রেণীগত ইশারায়। শৈশব-কৈশোরের বাষ্প ধর্তব্যের মধ্যে না। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে মোহ ছাপিয়ে আমাদের মধ্যবিত্ত মানসে ব্যক্তিস্বার্থের প্রচ্ছন্ন আকুলি-বিকুলি প্রভাব ছড়ায়। তত্ত্ব যা-ই বলুক, অতটা অবলীলার সঙ্গে নিজেকে শ্রেণীচ্যুত করা সম্ভবপর নয়। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যেতে-যেতে অনেক রকম বিভ্রান্তি-হতাশায় অভিজ্ঞ হ’তে হয়, নানা ঝড়ঝাপটা, বহু মোহক্ষয়। এমন-অনেক মুহূর্ত আসে, কোনটা খাঁটি কোনটা মেকি তা পর্যন্ত ঘোলাটে হয়ে পড়ে, সন্দেহ হয় যে-নেতাদের এতদিন অন্ধের মতো অবলম্বন ক’রে এসেছি, তাঁরা ভুয়ো, তাঁদের নিজেদেরই আদর্শ সম্বন্ধে অবৈকল্য নেই। কীসের জন্য তা হ’লে আমাদের তিতিক্ষা, কেন কৃচ্ছ্রসাধন, আমরাই বা কেন দ্বিরাচরণে দ্বিধাগ্রস্ত থাকবো? এমনধারা যুক্তির সন্তর্পিত প্রয়োগে যে-হৃদয়দৌর্বল্যের প্রথম প্রকাশ, তা-ই আস্তে-আস্তে প্রগাঢ় রূপ নেয়, আদর্শের প্রতি বন্ধন ক্রমশ শিথিল হয়ে আসে, তারপর শ্রেণীস্বার্থের বজ্র আঁটুনিতে বন্দী হ’তে হয়। সে-অবস্থায় বিবেকদংশনের বালাই আর থাকে না, বরঞ্চ ঘরের-খেয়ে বনের-মোষ-তাড়ানো বছরগুলির জন্য অনুশোচনা জাগে। বহুগুণ উৎসাহে রজতসাধনায় নিজেদের তখন থেকে আমরা নিযুক্ত করি, প্রথম দিকে যা হারিয়েছি, এবার তা উশুল ক’রে নিতে হবে। তা ছাড়া, আদর্শের বিকৃত ফাঁদে পা দিয়ে যে-স্বাচ্ছন্দ্য-প্রাচুর্যবিলাস-সম্ভোগ থেকে আমরা নিজেদের বঞ্চিত করেছিলাম, আমাদের আনন্দের মধ্য দিয়ে সেই ভোগের সম্পৃক্তি হোক। আমাদের ছেলেমেয়েরা তাই মার্কিনি আদর্শে বড়ো হয়ে ওঠে, স্ত্রীরা বাংলা-ভাষায় কথা বলতে প্রায় ভুলে যান।

আসলে, বাঙালি ভদ্রসমাজের আমরা, বিপ্লবী বামপন্থে আন্দোলনে ধোপে টিকি না। নেতাদের কদাচিৎ আদর্শস্খলন ঘটে থাকে সেটা ঠিক, কিন্তু নেতারা এবং আমরা একই সংকীর্ণ শ্রেণীর প্রণালী বেয়ে এসেছি, তাই ব্যাধিটাও এক। দুঃখকষ্ট সহ্য করার, ত্যাগের বন্যায় নিজেদের ভাসিয়ে দেওয়ার, রোমান্টিক অভীপ্সাদি বহির্পৃথিবীর রূঢ় আঘাতে খুব বেশিদিন সামলাতে পারে না, কিছুদিন বিপ্লব-বিপ্লব খেলা খেলে আমরা তাই সরে পড়ি। বিবেকটাকে যদি পুরো কবর দেওয়া অসম্ভব হয়, তা হ’লে সুখী জীবনের নিরাপদ আরামের আশ্রয়ে অবস্থান ক’রে মাঝে-মাঝে সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রবন্ধ লিখি, নয়তো ঘরোয়া বৈঠকে বক্তৃতা দিই। মধ্যবিত্ত বিবেক অল্পেই তুষ্ট হয়, তুষ্ট হয়ে পাশ ফিরে ঘুমোয়।

অনেকে হয়তো বলবেন, ক্ষতি কী যদি ঠিক এমনই হয়? মনের সংবেদনশীল মুহূর্তে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলেরা অনেকে বামপন্থী আন্দোলনে যোগ দেবে, তাদের বেশির ভাগই দু’-দশবছর বাদে, শ্রেণীস্বার্থের হাতছানিতে, আন্দোলন পরিত্যাগ ক’রে জাগতিক সাফল্যের নিরাপদ দুর্গে ফিরে যাবে, কিন্তু যদি দু’একজনও টেঁকে তাতেই লাভ। তা ছাড়া, যাদের, ধ’রে রাখা গেল না, অন্তর্বর্তী সময়ে তারাও তো বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য কিছু-কিছু কাজ করেছে, তার মূল্য তো কম নয়। আন্দোলনে তারা, কয়েক বছরের জন্য হ’লেও, বুদ্ধির প্রখরতা এনে দিয়েছিল, এনেছিল চাতুর্য, দীপ্তি। যারা আন্দোলনে রইলো না তারাও অন্তত কয়েক বছর তো কৃষকদের সঙ্গে মিশেছে, মজুরদের বুদ্ধিপরামর্শ দিয়েছে, স্থানে-স্থানে আন্দোলনের নানা ধাপে যেখানে নেতৃত্বে অপূর্ণতা ছিল, সেই শূন্যতা বুজিয়েছে। তারা আন্দোলনে রইলো না, তা নিয়ে আক্ষেপ ক’রে কী লাভ, বরঞ্চ তারা যে স্বল্পকালের জন্যও এসেছিল তা নিয়েই কি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত নয়?

আমি বলবো কিছুতেই নয়, একেবারেই নয়। মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের ক্ষণিক প্রেম দিয়ে বামপন্থী আন্দোলনের উপকারের চেয়ে ক্ষতি করেছেন অনেক বেশি। ইদানীং আক্ষেপ শোনা যায়, এই দশকের তরুণরা-ছাত্ররা রাজনীতিপরাঙ্মুখ, বামপন্থী আন্দোলন সম্পর্কে তাদের তেমন উৎসাহ বা আগ্রহ নেই। আমার নিজের সন্দেহ, এই প্রবণতার প্রধান কারণ আমরা, যাঁরা আজ থেকে কুড়ি বছর আগে কলকাতার রাস্তায় বিপ্লব করেছি, বর্তমানে ভীষণরকম ভদ্রলোক হয়ে গেছি, উৎকটরকম সম্ভ্রান্ত। আমরা আদর্শ স্থাপন করেছি আদর্শহীনতার, নিজেদের দৃষ্টান্ত দিয়ে হালের ছাত্র-ছাত্রীদের আমরা দেখাচ্ছি যে বিপ্লবের বুলি বুজরুকির ব্যাপার, আপাতত সুখকর উত্তেজনার মধ্যে সময় কাটাতে সাহায্য করবে, কিন্তু ভবিষ্যতে এ-সমস্ত ছেড়ে ছুড়ে বাড়ি-গাড়ি-টেলিফোন-রেডিওগ্রাম-রেফ্রিজারেটরই হচ্ছে আসল। তা-ই যদি হয়, জাগতিক সাফল্যই যদি সব শেষের সার কথা হয়, তা হ’লে আর কেন বামপন্থী আন্দোলনে মাথা গলানো, মিছিলে নামা, স্লোগান চেঁচানো, খেতখামারে বা কারখানায় গিয়ে সংগঠন, তার চেয়ে বরং এখন থেকেই শেখা যাক কী ক’রে ভালো চাকরি বাগানো যেতে পারে, দেখা যাক কোন্‌ চালাকির মারফত কত অল্প সময়ের মধ্যে কত বেশি টাকা করা সম্ভবপর।

অন্য যা ক্ষতি সাধিত হয়েছে তা এর চেয়েও গুরুতর। শ্রমিক ও কৃষক-আন্দোলনের সংগঠনভার এতদিন পর্যন্ত বুদ্ধিজীবীর দল একচেটিয়া ক’রে রেখেছেন। গাদা-গাদা বুদ্ধিজীবী নানা দলে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের ব্যাপৃত রাখতে হবে, তাঁরা সংখ্যায় এত যে ছাত্র এবং শিক্ষক-আন্দোলনে সকলের জায়গা করা সম্ভবপর নয়। অতএব এ-সমস্ত মহামান্য বুদ্ধিজীবীরা কৃষক-মজুর সংগঠনে নেমেছেন, কয়েক বছর কাজ করেছেন, তারপর তাঁরা অন্তর্হিত হয়েছেন, নতুন বুদ্ধিজীবীর দল পুনরায় এসেছেন নেতৃত্ব দিতে, কিছুদিন বাদে তাঁরাও খ’সে পড়েছেন। এই বিচ্ছিন্নতাজাত অহরহ বিপর্যয়ের ফলে অনেক অঞ্চলে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন দানা বাঁধতে পারেনি, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে। আরো যা হয়েছে, বুদ্ধিজীবী আক্রমণের ফলে মজুর-কৃষক শ্রেণীর স্বাবলম্বী হবার প্রয়াস ব্যাহত হয়েছে। বাইরে থেকে তৈরি নেতারা বার-বার গিয়ে জুড়ে বসেছেন, নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, নিজেদের ত্যাগের-দুঃখভোগের কষ্টিপাথরের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব-এবং-প্রেরণা সৃষ্টির সৌভাগ্য থেকে মজুর-কৃষকদের বঞ্চিত ক’রে রাখা হয়েছে।

শ্রেণীবিভাজন বাদ দিয়ে অন্য-কোনো সত্য নেই। ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা সমাজতন্ত্রে বাগড়া দিতে পারেন মাত্র, তার বাইরে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই। আমাদের দেশে অন্তত, সমাজতন্ত্র-নির্মাণের প্রয়াসে অন্যতম প্রথম সূত্র হওয়া উচিত এই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল উৎখাত। অন্যথা প্রতি পদে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা।

 

১৯৬৫

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5300 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...