ধুলোবালি, যা-কিছু সযত্নে রাখা…

সোহিনী দাশগুপ্ত

 

যে-কোনও পুজো এলেই একা লাগে। ভিড় সহ্য হয় না, মাথা ঝনঝন করে। এত মানুষের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও নিজেকে খুঁজে পাওয়া হয় না খুব একটা। তারই মাঝে চোখে পড়ল একটি দৃশ্য। প্রায়ান্ধকার একটি গলির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুজন মানুষ। এই গলিতে উৎসবের আলো এসে পৌঁছয় না তেমন একটা। একজন আরেকজনের কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে ওরা। ওদের ঠিক পেছনে আমি। এমন সময়ে কত গান এসে বসে প্রাণে। সে-সব গান হয়তো নিত্যদিনের সাথী। অথচ একটা দৃশ্যের সঙ্গে অনায়াসে জুড়ে গিয়ে একটা গান পেল অমরত্ব। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে সন্ধেবেলার মৃদুমন্দ হাওয়ায় ভেসে চলেছে দুজন মানুষ একে অপরকে ঘিরে। মনখারাপ ঘিরে ধরে আমায়, পেরিয়ে যেতে পারবে তো ওরা! ভয় করে। পথ যতই ভাঙুক, আলাদা হয়ে যাক্; ওদের চলে যাওয়াটুকু সাবধানে হোক।

একেকটা গান জড়িয়ে রাখে সারা দিনরাত। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ পুত্র সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে চারুবালা দেবীর বিয়ে উপলক্ষে ‘বাজিল কাহার বীণা’ গানটি রচিত। ছিন্নপত্রাবলী-র ১১৫ সংখ্যক চিঠিটি পড়লে জানা যায়, এই গানটিতে সুরের পালা গোড়াতেই শেষ করেন রবীন্দ্রনাথ। অথচ কথা বাকি থেকে যায়, তাই গানটিকে এতদূর টেনে নিয়ে যাওয়া। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ছয়টি চরণের সুর অদলবদল করে রাখা হয়েছে গানের বাণীকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য। এ তো গেল তথ্যনির্ভর সত্যের কথা। রবীন্দ্রনাথের গান ব্যক্তিমানুষের ব্যক্তিগত বিপন্নতা কিংবা আনন্দের সম্মিলিত উচ্চারণ। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন গানের সঙ্গে নানারকম যাপন আছে মানুষের। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে বদলে যায় সেইসব। প্রতিটি প্রিয় গানের সঙ্গেই কোনও না কোনও ব্যক্তিগত স্মৃতি কিংবা বিস্মৃতি জড়িত থাকে। ‘বাজিল কাহার বীণা’ গানটির পঞ্চম চরণের কথাগুলি আরেকবার মনে করে নেওয়া যাক্—

লাগে বুকে সুখে দুখে কত যে ব্যথা,
কেমনে বুঝায়ে কব না জানি কথা।

এই গানটি বেহাগ রাগে বাঁধা। রবীন্দ্রনাথের প্রচুর গান বেহাগ রাগে বাঁধা। অনুমান করে নেওয়াই যায় বেহাগ ওঁর অতি প্রিয় রাগের মধ্যে একটি। এই গান নিয়ে দু-কলম লিখতে গেলেই মনে পড়ে যায় বহু সেপিয়া রঙের দুপুরে চিলেকোঠার ঘরের দেওয়ালে রং-পেন্সিল দিয়ে কারও নামে ঋতু উৎসর্গ করার কথা। সেসব‌ দুপুরের পরের বিকেলগুলো অহেতুক হলুদ। এই গান শুনলে মনে হয়, কারও অমোঘ সান্নিধ্য পেতে চেয়েছিল এক কিশোরী। তীব্র মধ্যম সুরে লাগেনি। তারপর আর কারও কাছে যেতে ইচ্ছে হয়নি তার। বরং এটাই ভেবে গেছে সে, কেউ যেন কখনও তার জন্য অপেক্ষা না করে। অপেক্ষা আসলে একটা নদীর ধারাভাষ্য। অন্তহীন বিষাদ পেরিয়ে যে তীরে পৌঁছোনো যায়, সেই নদীতীরের নামই হয়তো অপেক্ষা। এই গান হয়তো সেই নদী, যাতে ভেসে থাকা যায় অথচ সাঁতরে পার হওয়া যায় না। অনেকটা নদীপথ পেরিয়ে থিতু হতে হয় এক গল্পকথকের জন্য। তার সর্বক্ষণ যেন একটা গল্প বলে যেতে চাইছে, তবু পারছে না। অথচ তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে কতসব যন্ত্রণার আঁচড়।‌ ভালোবাসা নামে যেসব অনুভূতিকে ডাকা হয়, তাদের গায়ে হাত রাখলে কি যন্ত্রণা ধারণ করা মানুষটির দুঃখ গায়েব হয়ে যায়? শতাব্দীর পর শতাব্দী হেঁটে চলা মঙ্গলকাব্য কিংবা পুরাতনী গান থেকে উঠে আসা চরিত্রদের ক্লান্তি মালুম হয় কম; তারা পথিক, তাই লিখে রাখে পথের দৃশ্য। মাথার ভেতরের এসব অলীক ভাবনা দিয়ে বিনিসুতোর মালা গাঁথে মেয়েটি। মালা তো নয় আসলে, এ তো গান। আমাদের অজান্তে আমাদের ভেতরে যে নিরন্তর ধ্বনি ঢুকে পড়ছে প্রতিনিয়ত, তার সামান্যও যদি গাওয়া যেত! এই সামান্যের কাছে হাত পেতে যেটুকু কুড়িয়ে পাওয়া গেছে, সেই সামান্যের কাছেই কেবল ধরা দেয় এই গান।

দূরে দাঁড়িয়ে মানুষের চলে যাওয়া দেখি। মনে হতে থাকে, সবাই একা রেখে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। অথচ জানি না কত দূরে। কেউ কত দূরে গেলে তাকে দূরে যাওয়া বলে, তাও কি জানি? এইসব অহেতুক প্রশ্ন ভিড় করে আসে মনে। এইসব অপ্রাপ্তির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে যেটুকু নৈকট্য বোঝাতে চেয়েছি, তার কতটুকুই বা বোঝাতে পেরেছি? এই দীনতার কথা লিখে রাখি সমস্ত গাছের পাতার গায়ে। তবু তো কিছু ভুলে যাওয়া হয়ে ওঠে না। কতকিছুই তো ভুলতে পারি না, যেমন ভুলতে পারি না কারও প্রশ্নহীন চাহনি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5300 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...