যে বই পড়ার সময় হয়নি এখনও

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

 


এখনও হয়নি, একদিন হবে সে দম। এখনও আসেনি, কিন্তু আসবে সে দিন। যে দিন আমি পোমোদোরো ঘড়ির ট্যাব বন্ধ করে উঠে পড়ব। টুপ করে গলে পড়ব এই সময়ের তলে তলে বওয়া অন্য সময়প্রবাহটাতে। ঘড়িহীন। ডেডলাইনহীন। শুরুহীন। শেষহীন। মাপামাপিহীন

 

 

ব্লু টোকাইয়ের পাঁচ নম্বর টেবিল। পিঠে গোল জানলা। সামনে ল্যাপটপ। ঘাড় কুঁজো, কাঁধ কানের কাছে, কিবোর্ডের ওপর হুমড়ি। স্প্লিট স্ক্রিন। ডানদিকে গুগল ডক, বাঁদিকে পোমোদোরো ক্লক। টিক টিক টিক। পঁচিশ মিনিট ননস্টপ কাজ করার চ্যালেঞ্জ। এই পঁচিশ মিনিটে থামা যাবে না। জল খাওয়া যাবে না। হাই তোলা যাবে না। শ্বাসপ্রশ্বাসকেও লাই না দিয়ে যথাসম্ভব কমের দিকে রাখলেই ভালো।

পঁচিশ মিনিটের এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই, শুধু প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস। তবেই না ফিউচার পারফেক্ট। পঁচিশ মিনিট ফুরোলে ঘণ্টা বাজবে, শুরু হবে বিশ্রাম। শর্ট হলে পাঁচ মিনিট, লং হলে দশ। টিক টিক টিক। বিশ্রাম ক্যাম্পে ফোন দেখা যাবে না, চেনা লোককে দেখে হাসা যাবে না, শ্বাসপ্রশ্বাস হতে হবে ধীর ও গভীর। চার গুনে ইন, আট গুনে আউট। বিশ্রাম ফুরোলে— শর্ট হলে পাঁচ, লং হলে দশ— ঘণ্টা বাজবে। শুরু হবে পঁচিশ মিনিটের প্রোডাক্টিভিটি ক্যাম্প। টিক টিক টিক। ঘাড় কুঁজো, কাঁধ কানের কাছে, কিবোর্ডের ওপর হুমড়ি। থামা যাবে না। জল খাওয়া যাবে না। হাই তোলা যাবে না। শ্বাসপ্রশ্বাসকেও লাই না দিয়ে যথাসম্ভব কমের দিকে রাখলে ভালো।

রিপিট। রিন্‌স্‌। রিপিট।

লিখছি না-পড়া বই নিয়ে। যে বই আমার এখনও পড়া হয়নি কিন্তু একদিন না একদিন পড়বই। দিতে হবে তিন দিনে। লোভ সামলাতে না পেরে হ্যাঁ বলে দেওয়ার ঠেলা সামলাচ্ছি।

পড়িনি, কিন্তু একদিন পড়বই— প্রুস্তের ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম। যার সাত ভলিউম আমার বইয়ের তাকে বসে আছে— কবে থেকে মনেও নেই। ওই সাত ভলিউম নিয়ে আই ব্লক থেকে ডি ব্লকে শিফট করেছি, ডি থেকে আবার আই, এই চাকরি থেকে ওই চাকরি, এক দেশ থেকে অন্য দেশ, আবার ব্যাক টু জন্মভূমি, ওই চাকরি থেকে সেই চাকরি, অফিস থেকে ক্যাফে। এর মধ্যে হাজারখানেক পোমোদোরো ইন্টারভ্যাlল ঢুকে গেছে, শ-খানেক বই, সিকিখানা প্রেম আর এককোটি নাকখত।

প্রুস্ত অপেক্ষা করছেন।

 

অথচ পড়ে ফেলা যেত। রোজ দশ পাতা করে পড়লেও চার হাজার দুশো পাতা নামাতে চারশো কুড়ি দিন। কেন পড়িনি? কারণ ইস্যুটা শব্দসংখায় আর পৃষ্ঠাসংখ্যার নয়। ইস্যুটা পোমোদোরোর। পঁচিশ মিনিট আর পাঁচ মিনিটের অ্যালার্মের জাগলারির মাঝে আর যে লেখককেই গোঁজা যাক, প্রুস্তকে যায় না। কিছু কিছু বই পড়া আর না-পড়ার ফারাক শুধু সময়ের নয়, এখনকার আমি আর হয়ে উঠতে চাওয়া আমিটার।

 

পড়িনি, কিন্তু জানি তো বটেই। সবাই জানে। ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম-এর প্রথম লাইন।

Longtemps, je me suis couché de bonne heure.

ফর আ লং টাইম, আই ওয়েন্ট টু বেড আর্লি।

বহুদিন ধরে, আমি তাড়াতাড়ি শুতে চলে যেতাম।

লেখা শেখার চেষ্টায় এদিকওদিক ঢুঁ মেরে দেখেছি, প্রথম বাক্যের নাকি মারাত্মক গুরুত্ব। একটিও বর্ণ বাজে খরচ না করে শুরু থেকেই পাঠকের টুঁটি টিপে ধর। নাড়িয়ে দে। ছুঁয়ে যা। চমক লাগা। টুপি খোলা। ভুরু তোলা। কাঁদিয়ে ছাড়। হাসিয়ে মার।

সে জায়গায়, একটা লোক উপন্যাস শুরু করছে, Longtemps, je me suis couché de bonne heure. বহুদিন ধরে, আমি তাড়াতাড়ি শুতে চলে যেতাম।

লেহ্‌। কী করবি কর। কত তাড়া দিবি দে। পাঠকের টুঁটি টিপে ধরার কোনও দায়ই নেই লোকটার। কাউকে ঘেঁটি ধরে পড়িয়ে নেওয়ার কোনও হাঁকপাঁকই বোধ করছেন না। লোকটা আসলে আরও সাংঘাতিক জিনিস ঘটাচ্ছেন। পাঠকের টুঁটি ধরার বদলে সময়ের ঝুঁটি পাকড়াচ্ছেন। সময় ছোটাবে কি, প্রুস্ত সময়কে ছোটাবেন। বা হামাগুড়ি দেওয়াবেন। বা বলবেন, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক নইলে দড়াম করে তোর মাথা উড়িয়ে দেব। বলে, চায়ে প্রথম চুমুকে শুরু হয়ে তিন নম্বর চুমুকে সে-সব স্মৃতিরা উবে যায় তাদের পিছুপিছু ঘুরতে চলে যাবেন। পাঠক সঙ্গে গেলে ভালো, না গিয়ে ‘ধুস বোরিং’ বলে উঠে গেলেও অসুবিধে নেই, প্রুস্ত তাড়াতাড়ি ঘুমোতে চলে যাবেন।

এবং সবচেয়ে ডেঞ্জারাস, ঘুমোতে চলে যাবেন কিন্তু ঘুমিয়ে পড়বেন না। পরের চল্লিশ পাতা ধরে এপাশ-ওপাশ-ধপাস করবেন। আধোঘুম ছিঁড়ে চমকে চমকে উঠবেন, বালকবয়সে কোমব্রে-র বাড়িতেও কেমন ঘুম আসতে দেরি হত, জানালা দিয়ে কেমন চার্চের মাথা দেখা যেত, রাস্তা দিয়ে কারা কলকল করে যেত আসত, দিদিমা জানালায় বসে বসে তাদের মাপতেন যাতে পরে সেই নিয়ে বিলা বিলা করা যায়। এইসব হতে হতে চার ও পাঁচপাতার মধ্যে একটা বাক্য লেখা হবে যা চুয়াল্লিশ লাইন ধরে চলবে। চায়ের ফোঁটা ঝাড়তে কেউ কাপের ধারে চামচের ঠুন্‌ করবে, সেই একটা নিরীহ ঠুন্‌ উপন্যাসের নেক্সট সতেরো প্যারাগ্রাফ খেয়ে নেবে।

এডিটর বলবে, একটু কি গোছানো যায় না? প্রুস্ত পাত্তা দেবেন না। প্রুস্তের তাড়া নেই। কে কী খাবে সে নিয়ে টেনশন তো নেই-ই।

 

কথা হচ্ছে, আমরা পড়ারই সময় পাচ্ছি না, প্রুস্ত এত লেখার সময় পেলেন কোত্থেকে।

পেলেন কারণ সময়টা অন্যরকম ছিল। তখন ইচ্ছে হলে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে চলে যাওয়া অ্যাফর্ড করতে পারত লোকে। এখন, অসম্ভব। এখন সময়টা অন্যরকম।

আঠেরোশো একাত্তরে প্যারিস কমিউনের ঝোড়ো বাহাত্তর দিন কেটে যাওয়ার দু-মাস পর প্রুস্ত জন্মেছিলেন। উনিশশো নয়ে যখন তিনি ঘরে ঢুকে দোর দিচ্ছেন, ইউরোপে শুরু হচ্ছে— যাকে অনেকেই বলেছেন প্রথম প্রযুক্তি বিপ্লব। ঘোড়া খুলে মোটর জুড়ছে গাড়িতে, ইংলিশ চ্যানেলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে প্রথম প্লেন, ইউরোপ জুড়ে পাতা হচ্ছে রেললাইনের জাল, ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে টেলিফোনের তার। স্থানকালের চেনা ধারণাকে চিঁড়েচ্যাপ্টা করে দিচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। সময়ের ধারণার কান মুলে দিচ্ছে আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির তত্ত্ব। ইউরোপ ছুটতে শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে পারি শহর।

একটা গোটা শহর ছুটলে কী পরিমাণ হাওয়ার ঝাপটা শুরু হয়? প্রুস্ত আজন্ম রুগ্ন। ওই হাওয়া গায়ে লাগলে আর দেখতে হবে না। কাজেই প্রুস্ত সরে যাচ্ছেন। ঘরে ঢুকে দোর দিচ্ছেন, জানালা আঁটছেন। গ্যাসের আলো জ্বালিয়ে, ফায়ারপ্লেসে অগ্নিসংযোগ করে, গলা পর্যন্ত কম্বল টেনে লিখতে শুরু করছেন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস। ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম। বন্ধ জানালার ওপারে রুদ্ধশ্বাস দৌড়ের নেশায় পারি শহর শুকনো খোলসের মতো পরিত্যাগ করছে বেলে ইপোক, বন্ধ জানালার এপারে বসে প্রুস্ত তুলে আনছেন সে সুন্দর সময়ের হাইসোসাইটির হালচাল, ড্রয়িংরুমের পিএনপিসি। কিচ্ছু বাদ দিচ্ছেন না। এক-একটা বাক্য এই পাতায় শুরু হয়ে অসীম রেলায় ওই পাতায় ঢুকে যাচ্ছে, যেন ফাঁকা প্রাসাদের খাঁ খাঁ করিডর, এক্সিট-টেক্সিট বোর্ড নেই কোথাও, আপনার তাড়া আছে বলে যে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে না, বন্ধ দরজার সামনে পৌঁছে দিচ্ছে, আপনি যাক বাবা বলে দরজা খুলে দেখছেন একটা ঘর, ঘরে অপেক্ষা করছে এক একজন স্মরণিকা বা স্মরণজিৎ, সরি বলে বেরিয়ে আসতে পারছেন না, বসে গল্প শুনতে হচ্ছে, সে গল্প আবার ডালপালা মেলছে, উড়ে এসে বসছে ভাবনার চড়াই, উপলব্ধির শালিক। অবশেষে যখন বেরোচ্ছেন বা বেরোনোর অনুমতি পাচ্ছেন, করিডর গিয়ে থামছে আর একটা ঘরের সামনে, আর একটা বন্ধ দরজা, কপালে কী আছে জেনেই আপনি দরজা ফাঁক করে উঁকি দিচ্ছেন আর পাল্লায় পড়ে যাচ্ছেন অন্য কোনও স্মরণজিৎ বা সিমরনের…

 

পুরোটাই কি নিড়বিড়েপনা? রুগ্নতা? যাঁরা প্রুস্ত পড়ে প্রুস্তের ভক্ত হয়েছেন, যাঁরা না-পড়েই (আহা, পড়ার আগে)— অনেকেই মনে করেন এই রুগ্নতাকে প্রতিবাদ হিসেবে রিফ্রেম করা যায়। N’allez pas trop vite— সে প্রুস্তিয়ান প্রতিবাদের স্লোগান। N’allez pas trop vite. ডোন্ট গো টু ফাস্ট। অত তাড়াহুড়োর কিছু হয়নি। অনেক সময় আছে।

 

সময় শেষ হয়েছিল, যে-সময় সরলরেখায় হাঁটে। জীবন ফুরিয়েছিল, যে-জীবন ঘড়ির কাঁটায় মাপা যায়। উনিশশো বাইশে মৃত্যুর আগে প্রুস্ত তাঁর সার্চ অফ লস্ট টাইম শেষ করেছিলেন কিন্তু শেষ তিন ভলিউম— দ্য প্রিজনার, দ্য ফিউজিটিভ, ও টাইম রিগেইনড-এর প্রকাশ দেখে যেতে পারেননি। ড্রাফট অবস্থায় ছিল। প্রুস্তের মৃত্যুর পর ঝেড়েমুছে প্রকাশ পায়।

প্রুস্ত হাওয়া হন। রেখে যান সাড়ে বারো লাখের বেশি শব্দ। চার হাজারের বেশি পাতা। অপরিমিত সময়। অগুন্তি জীবন। সাত ভলিউমের ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম। যা পড়ে ভার্জিনিয়া উলফের মতো লোক বলেন, what remains to be written after that?

 

প্রুস্তকে যৌবনে আচ্ছন্ন করেছিল বোদলেয়ারের অনৈচ্ছিক স্মৃতি বা ইনভলান্টারি মেমোরির মায়া, যা বলে স্মৃতি জিনিসটার ওপর আমাদের আসলে কোনও হাত নেই, কখন কোন শব্দ গন্ধ রং কী খুঁড়ে তুলবে কে জানে। প্রুস্ত ভক্ত ছিলেন ফ্লোবারের মেটিকুলাস রিয়েলিজমের, যা দাবি করে বাস্তবকে সততার সঙ্গে শিল্পে প্রতিফলিত করার। প্রুস্তের দ্রোণাচার্য ছিলেন জন রাসকিন যিনি বিশ্বাস করতেন গভীর মনোস্থাপনা ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ নিজেরাই এক একটি নৈতিক অবস্থান।

ইজম-এর দিক থেকে প্রুস্তের পক্ষপাতিত্ব ছিল এসথেটিসিজমের প্রতি, যার দাবি ছিল শিল্পের স্লোগান হওয়ার দরকার নেই, নীতিকথা হওয়ার দরকার নেই, ব্যবহারিক হওয়ার দরকার নেই। সুন্দর হলেই চলবে। শিল্প শুধু শিল্পের জন্যই।

বক্তব্যের তুলনায় ফর্ম ও ছন্দ প্রুস্তেরও প্রায়োরিটি ছিল, কিন্তু সৌন্দর্য তাঁর মোক্ষ ছিল না, ছিল মোক্ষের পথ। প্রুস্তের কাছে শিল্প জিনিসটা যেমন সমাজের ঠিকভুল উচিতঅনুচিত ভালোমন্দের ঠেকা নেওয়ার নয়, আবার একেবারে পটচিত্র হয়ে জীবনের দেওয়ালে ঝুলে থাকারও নয়। প্রুস্তের আর্টের অন্য একটা কাজ আছে।

মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক গ্র্যাজুয়েশন চাকরি সন্তানপালনের মাইলস্টোন ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলা যে জীবনটাকে আমরা আসল ও একমাত্র জীবন বলে ধরি, তার তলে তলে আর একটা জীবন বয়। সরি, একটা নয়, অগণ্য জীবন। এই ওপরের জীবনের গন্ধ বর্ণ শব্দ মুহূর্তরা, ক্বচিৎ-কদাচিৎ, বোদলেয়ারের ইনভলান্টারি মেমোরি মেকানিজমে সে তলে-তলের জীবনগুলোর অস্তিত্বের প্রতি আমাদের সজাগ করে। চায়ে ডোবানো ম্যাডেলিন জিভ ছুঁলে আটলান্টিকের তলায় লুপ্ত শহরপ্রতিম শৈশব মাথা তোলে। প্যারিসের এবড়োখেবড়ো পাথরে ঠোক্কর খেলে ভুস করে ভেসে ওঠে ভুলে যাওয়া ভেনিস, মাড় দেওয়া ন্যাপকিনের রুক্ষতায় অতীতের ডিনার পার্টিসমূহের পোলাইট কথোপকথনরা গুনগুনায়, এক কুচি সোনাটায় চেপে উড়ে আসে অপূর্ণ প্রেম।

গেঁয়ো পথে কুঁড়ির সুবাস, বাতাসে চার্চের ঘণ্টা, ঘরে এসে পড়া রোদ্দুর— প্রুস্ত বিশ্বাস করেন আমাদের কেজো জীবনটার কিনারে কিনারে আলপনা নয়, ওই অদৃশ্য জীবনগুলোর আর্কাইভ। লকার খুলে হার দুল আংটির আবর্জনা থেকে বেরিয়ে পড়া সস্তা একজোড়া লোহাবাঁধানোয়, ভিড়ে বেজে ওঠা রিংটোনে, অন্ধকার রাতে দূর দিয়ে চলে যাওয়া ট্রেনের আলোকিত জানালার সারি থেকে সোৎসাহে হাত নাড়ছে যারা, তারা একসময় আমাদেরই জীবন ছিল, আমরা তাদের ভুলে গেছি, মুভ অন করে গেছি অবলীলায়। প্রুস্ত বিশ্বাস করেন শিল্পের কাজ হচ্ছে মানুষকে তার বিস্মৃত জীবনসমূহের কথা মনে পড়িয়ে দেওয়ায়। এই সব মুহূর্তগুলোকে হোরক্রুক্সে পরিণত করায় যাতে এই এই রক্তমাংসের বেঁচে থাকা ছাই হয়ে গেলেও, সরলরৈখিক সময়ের অ্যালার্ম বেজে গেলেও, এই সব জীবনরা দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকে।

প্রুস্তের আর্টের কাজ, এক কথায়, মানুষকে অমরত্ব দেওয়া।

 

পোমোদোরো ক্লক চলছে টিক টিক টিক। আমি লিখছি। ‘পড়িনি কিন্তু পড়ব’ বই নিয়ে লেখার লোভ সামলাতে না পেরে হ্যাঁ বলে দেওয়ার ঠেলা সামলাচ্ছি। ঘাড় কুঁজো, কাঁধ কানে, কি-বোর্ডের ওপর হুমড়ি। শ্বাসপ্রশ্বাসকে লাই না দিয়ে যথাসম্ভব কমের দিকে রেখেছি। অ্যাংজাইটিতে খুঁটে খুঁটে বুড়ো আঙুলের ছাল তুলছি। আসলে লিখছি কম খুঁটছি বেশি। খুঁটছি, ছাল তুলছি, দুলছি, নখ কামড়াচ্ছি, মাথা ঝাঁকাচ্ছি। ভুল টাইপ করে ব্যাকস্পেস মারতে মারতে শিট বলছি, অভ্র ভুল সাজেশন দিলে বলছি ফাক।

এই কুন্তলার দ্বারা প্রুস্ত পড়া হবে না। মানবজমিনটা কষে চষা হল না বলে যার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে, জীবনের গামছা যথাসম্ভব নিংড়োনো হল নাকি কিছু জল এখনও রহিয়া গেল চিন্তায় যার ভাত হজম হচ্ছে  না। যে পঁচিশ মিনিটের ইন্টারভ্যালে জীবনকে গোঁজার চেষ্টা করছে এবং প্রাণপণ ছুটেও পাশ দিয়ে কাঁচকলা দেখিয়ে বেরিয়ে যাওয়া সময়ের সঙ্গে রেসে পিছিয়ে পড়ছে— সেই কুন্তলার দ্বারা প্রুস্ত পড়া হবে না।

অন্য কোনও কুন্তলার দ্বারা হয়তো হবে। চার হাজার পাতা দেখে যার ভয় লাগে না, পাতা উল্টে লাস্টে কী হল দেখে নেওয়ার চোরামো যার নেই। যে জানে সময় জিনিসটা অত ঠুনকো নয় যে হেঁজিপেঁজির হাতে নষ্ট হয়ে যাবে, জীবন ব্যাপারটা অত সরল নয় যে জন্মে থেকে নাকবরাবর দৌড়ে গিয়ে মরে যাবে। ঘুম পাচ্ছে বা জাস্ট ইচ্ছে করছে বলেই তাড়াতাড়ি ঘুমোতে চলে যাওয়ার যার দম আছে।

এখনও হয়নি, একদিন হবে সে দম। এখনও আসেনি, কিন্তু আসবে সে দিন। যে দিন আমি পোমোদোরো ঘড়ির ট্যাব বন্ধ করে উঠে পড়ব। টুপ করে গলে পড়ব এই সময়ের তলে তলে বওয়া অন্য সময়প্রবাহটাতে। ঘড়িহীন। ডেডলাইনহীন। শুরুহীন। শেষহীন। মাপামাপিহীন। যে-প্রবাহে প্রুস্ত ভেসেছিলেন, আমিও ভাসব। ভাসতে ভাসতে তাক থেকে সোয়্যান’স ওয়ে নামিয়ে ফুঁ দিয়ে মলাটের ধুলো উড়িয়ে, প্রথম পাতার প্রথম লাইনটা পড়ব। যেন প্রথমবার।

Longtemps, je me suis couché de bonne heure.
ফর আ লং টাইম, আই ওয়েন্ট টু বেড আর্লি।
বহুদিন ধরে, আমি তাড়াতাড়ি শুতে চলে যেতাম।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. যে বই পড়বই: মননবিশ্ব ও পাঠকের অ্যান্টি-লাইব্রেরি— নবম বর্ষ, ষষ্ঠ যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.