“রাজ্যের ও দেশের শাসক দলের বিরুদ্ধে মানুষের যে রাগ এই নির্বাচনে তার প্রকাশ আমরা দেখতে পাব”— কথোপকথনে কলতান দাশগুপ্ত

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

 

২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি কেন্দ্রটি হঠাৎ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪-এর ৯ আগস্ট কলকাতার আরজিকর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অভয়ার নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে সারা বাংলার মানুষ যেভাবে দোষীদের বিচারের দাবিতে এবং শাসক দলের অপশাসনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে নেমে রাতদখল করেছিলেন— তা অভূতপূর্ব। অভয়ার মাতৃদেবী, সন্তানহারা শ্রীমতী রত্না দেবনাথ এবার পানিহাটি কেন্দ্র থেকে বিজেপি মনোনীত প্রার্থী। বিপরীতে, এই কেন্দ্র থেকে বামজোটের তরফে প্রার্থী হয়েছেন সিপিআইএম-এর কলতান দাশগুপ্ত, যিনি ও যাঁর দল সাধারণ মানুষকে পাশে নিয়ে অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবিতে পথে নেমেছিলেন। অর্থাৎ রাজনীতির মোচড় পানিহাটি কেন্দ্রকে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এক জটিল ও ত্রিমুখী লড়াইয়ে পরিণত করেছে। এই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দফা ভোটের ঠিক আগে কলতান দাশগুপ্তের সঙ্গে স্থানীয় সিপিআইএম পার্টি অফিসে কথা বললেন চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি।

 

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: কলতান, আপনি এবার প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনের জন্য আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই।

কলতান: ধন্যবাদ।

প্রথমেই আপনাকে একটি বুনিয়াদি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। রাজনীতি কথাটি বলতে আমরা বুঝি সমাজের প্রান্তিকতম মানুষটির মৌলিক অধিকারগুলিকে সুনিশ্চিত করার লড়াই, তাঁকে একটি সম্মানজনক জীবনযাত্রা দেওয়ার লড়াই। আপনি রাজনীতিকে ঠিক কীভাবে দেখেন? রাজনীতির এই সংজ্ঞার সঙ্গে আর কিছু যোগ করতে চান?

হ্যাঁ, ঠিক এটাই। তবে রাজনীতি এখন যেরকম হয়েছে, তা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন রাজা কী খাবেন, কী পড়বেন— রাজনীতি প্রায় তারই নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যারা প্রার্থী হয়েছি, তারা সারাদিনে কখন কী খাই, কী করি, এসব এখন মিডিয়ার আলোচনার উপজীব্য, এসব নিয়ে তারা ভিডিও, রিল ইত্যাদি তৈরি করছে। ব্যক্তির ওপরে ফোকাস করে সমষ্টির সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, কোনওমতেই এটা রাজনীতি হওয়া উচিত নয়, অথচ এখন সেটাই হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে রাজনীতি যা হওয়া উচিত, তা হল যাঁরা ভোট দিচ্ছেন, তাঁরা দুবেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছেন কিনা, তার চর্চা। আমরা বামপন্থীরা সেই রাজনীতিটাই করতে চেষ্টা করি।

সঠিক রাজনীতির চর্চাটা কি গত পনেরো বছরে আমাদের রাজ্যে তথা জাতীয় পরিসর থেকে সরে গেছে বলে আপনার মনে হয়?

সরে যায়নি, সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ আমাদের যদি এই বিষয় নিয়ে চর্চা করতে হয় যে সাধারণ মানুষ কী খাচ্ছে, কী অবস্থার মধ্যে আছে, তাহলে তো আলুর দাম, পটলের দাম, চালের দাম, সরষের তেলের দাম— এগুলি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে যে মানুষ খেতে পারছে না কারণ তারা তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছে না। কেন কিনতে পারছে না তার কারণ বাজারে সেসব জিনিসের দাম বেশি ও ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। দ্বিতীয়ত, মানুষ সেসব জিনিস কিনতে পারছে না কারণ তাদের হাতে টাকা নেই। কেন টাকা নেই? কারণ মানুষের হাতে কাজ নেই। অর্থাৎ বেকারত্ব। রেলে কাজ নেই, ব্যাঙ্কে কাজ নেই, বিমায় কাজ নেই, পশ্চিমবাংলায় একশো দিনের কাজ নেই, নতুন শিল্প গড়ে ওঠেনি— এসব নিয়ে আমাদের আরও বেশি করে কথা বলতে হবে। আর আমরা যদি এসব নিয়ে কথা বলতে চাই, তাহলে বিজেপি আর তৃণমূল ডাহা ফেল করবে। তাই এখন এগুলো নিয়ে আলোচনা একেবারে বন্ধই হয়ে গেছে। বরং কে কী খাবেন বা খাবেন না, কে কী পরবেন, কে কোন ধর্মের ব্যাপক প্রচার করবেন, মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে কে কাকে ভোট দেবেন— এগুলো সব এখন রাজনীতির লোকেরাই ঠিক করে দিচ্ছে। ন্যারেটিভের এরকম বদলে যাওয়াটা ভারতবর্ষের রাজনীতি বা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি— কারও পক্ষেই ভালো হয়নি।

এই কথার সূত্র ধরেই আপনাকে পরবর্তী প্রশ্নটা করি। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশ কতগুলি প্রকল্প চালু করেছে— যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, বার্ধক্য ভাতা… সম্প্রতি এসেছে যুবসাথী ইত্যাদি। এই ভাতা দেওয়া নিয়ে বিভিন্নরকম মতামত আছে। যেমন, এটা একটা ডোল রাজনীতি, ভাতার বিনিময়ে আমাদের রাজ্যের একটা বিরাট অংশের মানুষকে প্রায় কিনে নেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। আবার অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এইভাবে সরাসরি গরিব মানুষের হাতে টাকা তুলে দিলে, বিশেষত মহিলাদের হাতে টাকা এলে তাদের ক্ষমতায়ন হচ্ছে, এমনকি এইভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য পরোক্ষে বাজারের ওপরেও একটা সুপ্রভাব পড়ছে, কারণ কেনাবেচা বাড়ছে। আপনারা বামপন্থীরা এই ভাতা রাজনীতিকে কীভাবে দেখছেন?

ভাতা মানুষ পাবেন তাঁর অধিকারে। এটা আসলে কোনও রাজনৈতিক নেতা বা সরকারের কোনও মন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না। বামফ্রন্টের সময় বেকারভাতা চালু হয়েছিল। সেটা কিন্তু খুব খুশিমনে বামফ্রন্টের মন্ত্রীরা দেননি। এই ধারণা থেকে বেকারভাতা দেওয়া হয়েছিল যে যাদের হাতে কাজ দেওয়ার কথা, রাজ্য সরকার তাদের হাতে এক্ষুনি কাজ দিতে পারছে না বলে আপাতত ভাতাটা দিচ্ছে। তারপর আস্তে আস্তে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ তৈরি হল, তার কার্ড হল, বাড়িতে বাড়িতে ইন্টারভিউ লেটার এল, শিল্প তৈরি হল পশ্চিমবঙ্গে। ফলে সেই জায়গা থেকে বেকারভাতা দেওয়ার প্রয়োজনটা ধীরে ধীরে কমে গেল। কিন্ত এখনকার যে বেকারভাতা তা আগামী পাঁচ বছর অবধি দেওয়া হবে বলা হচ্ছে। কিন্তু এই পাঁচ বছরের মধ্যে সেই ছেলেটি বা মেয়েটি কোথায় কাজ পাবে, তার কোনও গ্যারান্টি রাজ্যের সরকার বা দেশের সরকার কেউই দিতে পারছে না। আপনি যে কেন্দ্রে বসে আছেন সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সভা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীরও সভা হয়েছে। কিন্তু এতসব হাইভোল্টেজ সভা থেকে মানুষের নিট প্রাপ্তি শেষমেশ শূন্য। বেকারত্বের সুরাহা নিয়ে কোনও আশ্বাস আমরা পাইনি।

বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে প্রথমেই যেটা করা হবে যে ভাতার টাকার অঙ্ক বাড়বে, এটা সবাই জানে। কারণ কাটমানি থাকবে না, এটা-ওটা থাকবে না, টাকার পরিমাণ বাড়বে। কিন্তু প্রথমে সেটাকে আইনে পরিণত করা হবে। যেমন বামফ্রন্ট সরকার বিনামূল্যে শিক্ষা অর্থাৎ অবৈতনিক শিক্ষাকে আইনে পরিণত করেছিল। ঠিক সেভাবেই এইসব ভাতা, যার যেটা প্রয়োজন, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা ইত্যাদি— এগুলিকে আইনে পরিণত করা হবে। সাধারণ মানুষ সেগুলো তাঁদের অধিকারে পাবেন। কিন্তু আমি ভাতা দিচ্ছি বলে আমাকে ভোট দাও— এই যে প্রচার এখন চলছে তার কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু যে আজ বেকারভাতা পাচ্ছে অবশ্যই তার হাতে একটা স্থায়ী কাজ তুলে দিতে হবে। এই উদ্দেশ্য নিয়েই বামফ্রন্ট চলতে চায়।

যে প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বামফ্রন্ট জমানার শেষের দিকে জন্ম নিয়েছে, জ্ঞানত বামফ্রন্ট সরকারকে দেখেনি কিন্তু গত পনেরো বছরের তৃণমূল আমলের মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে উঠেছে, এবং এবারের নির্বাচনে সম্ভবত তাদের প্রথম বা দ্বিতীয় ভোটটি দিচ্ছে— এই প্রজন্ম কেন বামফ্রন্টকে ভোট দেবে?

এই নতুন প্রজন্মের ভোটাররা তৃণমূল আর বিজেপি একেবারে তাদের গায়ের চামড়ায় দেখছেন। নতুন ভোটারকে স্বপ্ন দেখানোর মতো কোনও কাজ তৃণমূল বা বিজেপি করতে পারেনি। বরঞ্চ স্বপ্নের ধ্বংসই তারা চারদিকে দেখেছে। রেল, ব্যাঙ্ক, বিমা, কয়লাখনি, ইস্পাতশিল্প, প্রতিরক্ষাক্ষেত্র— সমস্ত জায়গায় গত বারো বছরে কেন্দ্র সরকার চাকরি কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি সেনা নিয়োগের ক্ষেত্রের মাত্র চার বছরের জন্য কাজের চুক্তি হচ্ছে। সব ক্ষেত্রে স্থায়ী কাজের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। ওদের উদ্দেশ্যটা হচ্ছে ওরা কাউকেই নিরাপদ জীবন দিতে চায় না। আপনি একটা চুক্তির কাজে থাকবেন, অস্থায়ী কাজে থাকবেন, সবসময় আপনাকে বসের জো-হুজুরি করে যেতে হবে, না করলেই চাকরি চলে যাবে। আপনার কোনও নিরাপত্তা থাকবে না। ঠিক যে কারণে ওরা নতুন শ্রম কোডগুলি এনেছে, এই শ্রম কোড একবার চালু হলে শ্রমিক আর তার অধিকারের কথা বলতে পারবে না।

হাতে কাজ তো নেই-ই, পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের যারা তাদের পড়াশোনা করতে গিয়েও অসুবিধা হচ্ছে। সরকারি স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজে ড্রপআউট বাড়ছে। বেসরকারি জায়গায় লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা দিয়ে পড়তে হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এক ধরনের যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমরা বলছি, এই যন্ত্রণামুক্তির উপায় হিসেবে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বামফ্রন্টকে ভোট দেবেন। এছাড়া এই রাজ্যে থেকেই তার হাতে যেন একটা স্থায়ী কাজ তুলে দেওয়া যায়, তাকে যেন তার বাবা-মা-পরিবারকে ছেড়ে বাইরে কাজের জন্য চলে যেতে না হয়। দলে দলে অভিবাসী শ্রমিক যে বাইরের রাজ্যে কাজ করতে যান, তাঁরা যেন এ রাজ্যেই কাজ পান, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যিনি মাটি কাটার কাজ করেন, তিনিও যেমন অভিবাসী শ্রমিক, আইটি-তে কাজ করলেও তিনি একজন অভিবাসী শ্রমিক, শুধু তাঁর কাজটা একটু হোয়াইট কলার জব, কিন্তু দু-ক্ষেত্রেই তাঁদের কাজের জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে। সেটা যেন তাঁকে করতে না হয়, তিনি যেন পশ্চিমবঙ্গে বাস করে একটা ভালো মাইনের কাজ করে বেঁচে থাকতে পারেন, সেই চেষ্টা বামফ্রন্ট করবে, যেটা এত বছর ধরে বিজেপি বা তৃণমূল করেনি।

আপনি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে কথা বললেন। আমরা এই যে এখন পানিহাটিতে বসে আছি, এখানে এই মুহূর্তে প্রচুর স্কুল বন্ধ হয়েছে গেছে। আবার কয়েকটি স্কুল খোলা থাকলেও সেইসব স্কুলে ছাত্রছাত্রী নেই। পাশাপাশি, বাংলার গ্রামেগঞ্জে ক্লাস ফাইভ-সিক্স পড়ার পরেই পড়াশোনা ছেড়ে ছোট ছোট কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়াটা একটা মহামারির আকার ধারণ করেছে। বাংলার ছেলেরা হোটেল বা অন্য শিল্পে সামান্য মাইনের কাজের সন্ধানে দিল্লি, নয়ডা, মহারাষ্ট্র অথবা ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে ভিড় করছে। বাংলার কর্মক্ষেত্রের এই বিপুল সংকট নিয়ে আপনারা কি ওয়াকিবহাল?

হ্যাঁ, অবশ্যই। শুধু সোদপুর নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে স্কুলশিক্ষার বেহাল দশা। আট হাজারের ওপর স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া যে স্কুলগুলিকে আমরা খোলা থাকতে দেখছি, সেখানে হয়তো অল্প সংখ্যক রেজিস্টার্ড ছাত্রছাত্রী আছে, কিন্তু কার্যত সেই স্কুলগুলো চলে না। এক এলাকাতেই কোনও কোনও স্কুল আছে যেখানে ছাত্রছাত্রী কম, কিন্তু শিক্ষক বেশি হয়ে গেছে। কারণ ড্রপআউটের হার ব্যাপক। এর দুটো দিক আছে। এক হচ্ছে, নতুন শিক্ষানীতিতে এমন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যে উচ্চশিক্ষার দিকে যত কম লোক যেতে পারে, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর অপরদিকে, চাকরিবাকরির বাজার এমন হয়েছে যে আর একজনের রোজগারে সংসার চলছে না। টাকাপয়সার সমস্যা হচ্ছে। ফলে পড়াশুনা করে চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না, এই ভাবনা যেমন একদিকে রয়েছে, একইরকমভাবে পড়াশুনা না করেই যদি কিছু টাকা পাওয়া যায়, এই ধরনের উদাহরণও চোখের সামনে আসছে।

কোভিডের পর আমাদের পরিচিত বনগাঁর এক স্কুলশিক্ষক পাড়ায় পাড়ায় ঘুরছিলেন, ছাত্রদের আবার স্কুলে ফেরাবেন বলে। দুই ভাইকে গিয়ে ধরেছেন— তোরা স্কুলে চল! তারা বলছে, স্যার, কাজ পেয়ে গেছি। শিক্ষক বলছেন, কী এমন রোজগার করছিস। আমার সঙ্গে চল। পড়াশোনাটা শেষ করে যখন কাজ পাবি, সেই কাজের রোজগার অনেক ভালো হবে। তখন সেই ছেলেরা বলছে যে একটা গরুর কান টেনে পাঁচ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া— এই কাজ ওরা করে প্রতিদিন রাত্তিরবেলা, এবং তাতে যে টাকা পায় তাতে নাকি মাসে একেকজনের কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকা করে হয়ে যায়। ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র তারা। অর্থাৎ যেভাবে দুর্নীতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একটা যোগসূত্র তৈরি করে দেওয়া যাচ্ছে, তারপরে পড়াশোনার দিকে তারা আগ্রহী হবে কেন? এবং তাদেরকে দুষ্কৃতি বানিয়ে দিতে পারলে, তাদেরকে ওই দুষ্কৃতিবাহিনীর মধ্যে যুক্ত করে নিতে পারলে শাসকের লাভ। এই লুম্পেনবাহিনী তৈরির চেষ্টাটা দেশের শাসক এবং রাজ্যের শাসক মিলেই করছেন।

বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে এই কেন্দ্রের কী কী সমস্যা আপনার প্রধান বলে মনে হয়, যদি প্রধান তিনটি সমস্যার কথা বলেন…

চব্বিশ ঘণ্টার পরিশ্রুত পানীয় জলের একটা প্রকল্প বাম আমলে তৈরি হওয়ার কথা ছিল। এতদিনেও হয়নি। সেটা আমরা তৈরি করতে চাই। জমা জলের সমস্যার জন্য এলাকার সাতটা মিউনিসিপ্যালিটিকে জুড়ে নিয়ে বাম আমলে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড নিকাশি ব্যবস্থার বদলে নতুন প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা হয়েছিল, সেটাও আর হয়নি। ক্ষমতায় এলে সেটাই আমরা করব। জঞ্জাল একটা বিরাট সমস্যা পানিহাটিতে। মহিষপোতায় জমি কেনা ছিল, যেখানে ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’— এই প্রকল্প হবে, জঞ্জাল ওখানে ফেলে সেখান থেকে বিদ্যুৎ তৈরির একটা প্রক্রিয়াকরণ হবে, সেটাও গত পনেরো বছরে হয়নি, সেটাও আমরা করতে চাই। এছাড়াও আগরপাড়ার দিক থেকে আসার জন্য একটা রেলওয়ে ওভারব্রিজ। একবার গেট পড়ে গেলে দীর্ঘ সময় মানুষকে ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেই ওভারব্রিজ আমরা করতে চাই। ঊষুমপুরে একটি স্টেডিয়াম আমরা করতে চাই। এলাকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে একটা বিকল্প সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র, একটা অডিটোরিয়াম আমরা করতে চাই।

অডিটোরিয়ামের প্রসঙ্গে মনে পড়ল, লোকসংস্কৃতি ভবন যার ঠিক পাশেই আমরা বসে আছি, এই অডিটোরিয়ামটি বাম আমলেই তৈরি হয়েছিল। এই মুহূর্তে তার অবস্থাও খুব খারাপ। ওখানে কোনও নাটক দেখতে গেলে দর্শক নাটকের সংলাপ স্পষ্টভাবে শুনতে পারেন না, সাউন্ড সিস্টেম এত খারাপ…

লোকসংস্কৃতি ভবন বলুন বা সোদপুরে রেলের ওভারব্রিজ বলুন, এগুল সব বাম আমলে তৈরি হওয়া। উন্নয়ন যা হয়েছে তা বাম আমলেই। কিন্তু এখন সেগুলো একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেগুলো তো অবশ্যই রেনোভেশন হবে। আপনি নাটকের কথা বললেন। কলকাতা শহর হোক, বা কলকাতার বাইরে অন্য কোনও শহর, মফস্বল বা গ্রাম হোক, এখন নাটকের হল বুকিং তারাই পাবে, যারা শাসকের হয়ে কথা বলছে। যারা শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলছে, তাদের কলকাতার সেরা মঞ্চ থেকে শুরু করে মফস্বলের হল, কোথাও নাটক করতে দেওয়া হচ্ছে না। এই বিকল্প ব্যবস্থাও আমরা তৈরি করতে চাই।

এবার আমরা একটু প্রসঙ্গান্তরে আসি। বিষয়টি হল এসআইআর। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে আমরা দেখলাম নির্বাচন কমিশন আগে কোথাও পরীক্ষা না হওয়া একটি সফটওয়ারের মাধ্যমে বাংলার এক বিপুল সংখ্যক মানুষকে ‘লজিকাল ডিসস্ক্রিপেন্সি’র নাম করে বাদ দিয়ে দিল। সংখ্যালঘু, দলিত, নিম্নবর্ণের হিন্দু, এবং মহিলা— এমন অসংখ্য বৈধ ভোটারকে টার্গেট করে করে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসআইআর যখন প্রথম ঘোষিত হয়, তখন কি আপনারা আখেরে কী হতে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরেছিলেন? নাকি ভুয়ো ভোটার বাদ যাওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস সমস্যায় পড়বে, তাদের ভোট কমবে— শুধু এটাই ভেবেছিলেন? মোদ্দা কথা, বিজেপির সরকার উদ্দেশ্যে কী, সেটা নিয়ে আপনার কি কোনও আগাম ধারণা ছিল?

বিজেপির উদ্দেশ্য কখনও ভালো হতে পারে না। বামপন্থীরা সেটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই মোস্তারি বানু গত নভেম্বর মাসে মামলা করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী তো ফেব্রুয়ারিতে লোক-দেখানো মামলা করেছেন, গোটা প্রক্রিয়াটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর। ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়ার জন্য আমাদের যে প্রয়াস, সেটা কিন্তু শুধু এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নির্বাচন কমিশনের কাছে এখনও পুরনো চিঠি রয়েছে। ২০২২-২৩-এ সিপিআইএম-এর পক্ষ থেকে কয়েকটি স্যাম্পেল বিধানসভা কেন্দ্র থেকে হাজার হাজার ফর্ম ৭ পূরণ করে আমরা নিয়ে গেছিলাম। একবার সাঁইত্রিশ হাজার, একবার চল্লিশ হাজার। ফর্মগুলো নিয়ে গিয়ে আমরা কমিশনকে বলেছিলাম যে এই মানুষগুলি মারা গেছেন অথচ ভোটার তালিকা থেকে কেন এঁদের নাম বাদ যাচ্ছে না? নাম বাদ দেওয়া হয়নি। সামান্য কয়েকটি নাম বাদ গেছিল। কিন্তু বেশিরভাগ নাম, যা বাদ যাওয়া উচিত, সেগুলো বাদ যায়নি। এই প্রক্রিয়াটা আমরা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তারপর যখন এসআইআর এল, ইনুমারেশন ফর্ম ফিলআপ করতে আমরা মানুষকে সাহায্য করেছি। কারণ মানুষ অসহায় ছিল। এখন যখন মানুষকে ট্রাইবুনালে যেতে হচ্ছে, তখনও আমরা মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করছি। আমাদের আইনজীবীরা বলেছেন কোনওসময় মামলা লড়তে হলে তাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়বেন। মানুষকে সাহায্য আমরা করছি। পাশাপাশি, বিজেপির এই রাজনীতির বিরোধিতাও আমরা করছি, যেখানে ধর্ম ও জাতের নামে একেবারে টার্গেট করে ওরা এই এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এরপর এনআরসি ইত্যাদিও করবে, ওরা যেভাবে দেশটাকে সাজাতে চাইছে সেই ফ্রেমওয়ার্কের জন্য! কিন্তু মতুয়াদের নাম কেন বাদ গেল? রাজবংশীদের নাম কেন বাদ গেল? এত এত সংখ্যালঘু অংশের মানুষের নাম কেন বাদ গেল? এমনকি সংখ্যাগুরু অংশের মানুষের নামও বাদ গেছে। ধর্মীয় সংখ্যাগুরু যারা, তাদের নামও বহু জায়গায় বাদ গেছে। কেন গেল? বিজেপি অনেক জায়গায় দেওয়াল লিখেছে, তুমি অমুক ধর্মের লোক হলে তোমাকে বিজেপিকে ভোট দিতেই হবে। কিন্তু সেই ধর্মের লোকেদের নামও কেন বাদ গেল, এই প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রধানমন্ত্রীর সভা থেকেই বলুন, বা পাড়ার বিজেপি নেতার সভা থেকেই বলুন, আমরা কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না।

এমনকি সুপ্রিম কোর্ট থেকে যেটা বলা হয়েছিল যে ট্রাইবুনাল গঠন করে যাঁদের নাম বিবেচনাধীন আছেন সেই ২৭ লক্ষ মানুষদের মধ্যে যাঁরা বৈধ ভোটার, তাঁদের নাম ভোটের দুদিন আগে হলেও ঘোষণা করে দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা দেখলাম, প্রথম দফার ভোটের আগে মাত্র শ-দেড়েক মানুষের নাম ঘোষণা হয়েছে…

আপনি যে বিধানসভা এলাকায় বসে আছেন সেখানে একটি নামও আসেনি। শুধু এই বিধানসভা নয়, ২৭ লক্ষের মধ্যে যদি দুশোটি নাম ক্লিয়ার করা হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ২৯০টি কেন্দ্রের কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি। কোর্ট তো রায় দিয়ে দিল যে এই কাজটা এই সময়ের মধ্যে করে ফেলতে হবে, কিন্তু কাজটা হল না। আবার আজ বাদে কাল বিজেপি যদি কোনও একটা বিল নিয়ে আসে যে যাঁরা ভোটার নন তাঁদের ওপর আরও একটা নিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হল, বিজেপির ষড়যন্ত্র… কিছুই বলা যায় না, তখন এই মানুষগুলো কোথায় যাবেন? এই ভাবনাতেই এবারের ভোট হবে— যাঁরা ভোট দিতে পারলেন না, তাঁদের প্রতি যে অবিচার হল, সেই অবিচারের বিরুদ্ধে এবারের ভোটটা হবে।

প্রথম দফার ভোট আমরা দেখে নিয়েছি, এবং এই দফায় রেকর্ড ভোট পড়েছে, প্রায় ৯১.৭৮ শতাংশ, যা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে এর আগে হয়নি। সাধারণত দেখা গেছে যে এত ভোট পড়লে, তা শাসকের বিপক্ষে যায়। আপনারা কীভাবে দেখছেন এই বিপুল পরিমাণ ভোটদানকে?

দেশের ও রাজ্যের শাসকের বিরুদ্ধেই তো এই ভোট। রাজ্যের শাসকের বিরুদ্ধে রাগ আছে, তার প্রতিক্রিয়ায় এই ভোট। এবং দেশের শাসক যেভাবে মানুষের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, এই ভোটটা তো তার বিরুদ্ধেও। তাই দেশের ও রাজ্যের, দুই শাসকের বিরুদ্ধেই এই ভোট।

১৯২৫, মতান্তরে ১৯২০, মোটামুটি ওই সময় থেকেই ভারতবর্ষের বামপন্থীদের চলার শুরু। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যেমন ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়েছে তেমনি ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে শ্রমজীবী মানুষদের অধিকারও আদায় করেছে। ঠিক একই সময়ে, অর্থাৎ ১৯২৫ সালেই আরএসএস-এর জন্ম। আমরা জানি আরএসএস তো কখনও ব্রিটিশদের বিরোধিতা তো করেইনি, বরং নানা সময়ে তাদের চাটুকারিতা করেছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপক্ষে কাজ করেছে, এমনি দেশের সংবিধানকেও মেনে নেয়নি। অথচ এই একশো বছর পরে সেই আরএসএস-ই বকলমে গোটা দেশের শাসনব্যবস্থাকে অধিকার করে নিয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা তো বটেই, এমনি প্রতিটি সাংবিধানিক উচ্চপদেও তাদের লোক বসে আছে। অথচ স্বাধীনতার চেতনা অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের আদর্শ ধারণ করেও, মানুষের বুনিয়াদি সমস্যাগুলির কথা তুলে ধরেও বামপন্থীরা আজ প্রায় সংসদীয় রাজনীতি থেকে মুছে গেছেন। এই একশো বছরের যাত্রাপথে কোথায় ভুল হল, কোথায় বিচ্যুতি হল যে আপনার মানুষের মন থেকে এতখানি দূরে সরে গেলেন?

প্রথম কথা হল, আরএসএস গোটা দেশের দখল নেওয়ার জন্য প্রথম থেকে যা যা করেছে, তা বামপন্থীরা কোনওদিনই করবে না। পাশাপাশি তৃণমূলও রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্য যা যা করেছে, সেগুলোও বামপন্থীরা করবে না। আপনি কোনওদিন বামপন্থীদের বিধানসভা ভাঙচুর করতে দেখবেন না। জঙ্গলমহলে আমাদের আড়াইশো কর্মী খুন হয়েছে, সেটাও আপনি অন্য কোথায় দেখবেন না। গোটা দেশের ক্ষেত্রে যেটা বাস্তব তা হল আরএসএস মানুষভাগের রাজনীতি করেছে। সেটা শুরুতে যাঁর গায়ের চামড়ায় লাগেনি সেটা তিনি অনেকসময় বুঝতে চাননি। কারণ আপনি যদি দেখেন, তাহলে দেখবেন তৃণমূলের বিরোধিতা বিজেপি করতে পারবে, এমন একটা ধারণা এখানকার অনেক মানুষের মনের মধ্যে ছিল। কেন ছিল? কারণ ইডি ও সিবিআই, এদেরকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই হবে এমন একটা ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবং কোটি কোটি টাকা খরচা করে সোশাল মিডিয়ায়, সমস্ত প্রচারমাধ্যমে দিনের পর দিন এই ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখনও ভোটের আগে ইউটিউবারদের বিজেপি ইত্যাদির পক্ষে থেকে কোটি কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে ফেলার জন্য। বামপন্থীরাও মানুষের ভাবনাচিন্তা বদলে ফেলতে চায় ভালো দিকে, তাদের জীবনের উন্নতির জন্য। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তারা এই ধরনের কোনও ন্যক্কারজনক পদক্ষেপ নেবে না। ফলে আরএসএস যে রাজনীতিটা করেছে তা মানবিকতার বিরুদ্ধে তো নিশ্চয়ই, আর তারা তা করতে নেমে যেনতেনপ্রকারে নিজেদের লক্ষ্য হাসিল করতে চেয়েছে, যেতে না দিলে দেওয়াল ভেঙে চলে যেতে হবে… অনেকটা এইরকম ব্যাপার… এই ধরনের রাজনীতি বামপন্থীরা করে না, কোনওদিনও করবে না। তারা মানুষকে বোঝানোর লড়াইতে রয়েছে, তারা মানুষের রুজিরুটির লড়াইতে রয়েছে, এবং বিজেপি আরএসএস যে মানুষের মগজ দখলের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে সেটার বিরুদ্ধেও বামপন্থীরা লাগাতার মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। আজকে যেভাবে টিভি সিরিয়াল, সিনেমার মধ্যে দিয়ে এক দেশ, এক সংস্কৃতি, এক ভাষা— এই একমাত্রিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটা কিন্তু একতরফা হয়ে যাচ্ছে না। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ করছে, এবং প্রতিবাদের মধ্যে বামপন্থী চিন্তাভাবনাও মিশে আছে। অভয়ার আন্দোলন আমাদের দেশে হাজারে হাজারে লাখে লাখে মানুষ করেছেন। তার মধ্যে সলিল চৌধুরীর গণসঙ্গীত তো কোনও বামপন্থী কর্মী গিয়ে চালিয়ে দেননি। সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই ভাবনাটা ছিল বলে সেটা উঠে এসেছে। এইভাবে যখন রাগের বহিঃপ্রকাশ হয়, মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন, তখন তাদের মধ্যে বামপন্থী চেতনা কাজ করে এটা আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি। কৃষক আন্দোলনের সময় দেখেছি, অভয়া আন্দোলনের সময়েও দেখেছি। আমরা আশা করছি, এই ভাবনাটা আরও বেশি মানুষের মধ্যে আমরা ছড়িয়ে দিতে পারব। আর আরএসএস যত আগ্রাসী হবে, সাধারণ মানুষের গায়ের চামড়ায় সেই অভিজ্ঞতা এসে ঠেকবে এবং মানুষে তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে পারবেন।

অভয়ার মা শ্রীমতী রত্না দেবনাথ বিজেপির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোয় অভয়ার ন্যায়বিচার পাওয়ার আন্দোলন কি ভাগ হয়ে গেল?

ন্যায়বিচারের জন্য এখনও লোকে রাস্তায় রয়েছে। উই ওয়ান্ট জাস্টিস স্লোগানে এখনও লোকে গলা মেলাচ্ছে। বরং বিজেপি উত্তর দিতে হবে যে দেড় বছর-পৌনে দু-বছর হয়ে গেল এখনও জাস্টিস কেন পাওয়া গেল না। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু উত্তর দিয়ে যেতে পারেননি, বলেছেন চার তারিখের পর ফাইল খুলবেন। এটা কি ব্ল্যাকমেলিং নাকি? যে আমাকে ভোটটা না দিলে আমি ফাইলটা খুলব না। ফাইল তো সিবিআই-এর হাতে অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। তাহলে আমাকে ভোট না দিলে আমি ফাইল খুলব না এটা তো ব্ল্যাকমেলিং হয়ে গেল। কোনও একজন নারীর নির্যাতন, খুন ন্যক্কারজনক ঘটনা, সেই ঘটনার ন্যায়বিচার চাওয়ার সাথে ব্ল্যাকমেলিং-কে কেন যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাব তো বিজেপিকে দিতে হবে।

এবার একটু আপনাদের পার্টির প্রসঙ্গে আসি। ভোটের আগে আপনাদের নেতা মহম্মদ সেলিম তৃণমূলের বহিষ্কৃত নেতা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে কলকাতার একটি হোটেলে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ওঁর কথামতো উনি নাকি হুমায়ুন কবীরের ‘মন বুঝতে’ গিয়েছিলেন। ‘মন বোঝা’ এই শব্দবন্ধটা ব্যবহার করেছেন। এই নিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমে আলোচনাও হয়েছিল। এর কদিন পরেই একটা স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে প্রকাশিত হল যে হুমায়ুন কবীর নাকি বিজেপির কাছ থেকে প্রচুর টাকা নিয়েছেন এবং বাবরি মসজিদের নাম করে মুসলিম ভোটের একটা বড় অংশকে নিজের দিকে টানাই তাঁর উদ্দেশ্য। এই প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ আসার পর আসাদউদ্দিন ওয়েসির দল হুমায়ুনের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছে। হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক সততা নিয়ে একটা সন্দেহ বহুদিন ধরেই ছিল। তাও কেন মহম্মদ সেলিমের মতো একজন বামপন্থী নেতার এরকম একজন সাম্প্রদায়িক লোকের মন বুঝতে যাওয়ার দরকার হল? নাকি সিপিআইএমও অন্যান্য দলের মতো মুসলিমদের একটি ভোটব্যাঙ্ক হিসেবেই দেখছে, যে যার সঙ্গে হাত মেলালে কিছু মুসলিম ভোট পাওয়া যেতে পারে, তার সঙ্গেই জোট করতে হবে?

বামপন্থীরা তো হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান ভোট এইভাবে বিষয়টিকে দেখেন না। ওটা আরএসএস দেখতে চায়। বিভিন্ন এমন রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন এমন মানুষ প্রতিবার ভোটের আগে আমাদের দপ্তরে আসেন, দেখা করেন, বিভিন্ন সাজেশন দেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসে আমাদের সঙ্গে জোট করতে চান, এটা শুধু এইবারে নয়, আগেরবারেও হয়েছে। এবার মিডিয়া এটা হাইলাইট করেছে কারণ ওরা হুমায়ুনকে দেখাতে চেয়েছিল। অতীতেও যাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল, তাদের সবার সঙ্গে জোট হয়নি। কিন্তু এই ন্যূনতম সৌজন্যটুকু তো বজায় রাখতেই হবে। এক্ষেত্রেও হুমায়ুনই সেলিমদাকে ফোন করেছিলেন। এবার কথাটা হচ্ছে, কারও সঙ্গে দেখা করার সৌজন্যবোধ বামপন্থীদের সারা জীবন থাকবে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা বা দেখা করা মানে তাঁর রাজনীতিকে আত্মস্থ করে নেওয়া নয়, কোনও নির্বাচনী জোট করাও নয়, এবং ভবিষ্যতে তাঁর সঙ্গে এক মঞ্চ শেয়ার করাও নয়।

বামপন্থীরা চৌত্রিশ বছর আমাদের রাজ্যে শাসনক্ষমতায় ছিলেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে যেটা হয়, যারা প্রথমদিকে লড়াই করে, অনেক কৃচ্ছসাধন করে ক্ষমতায় এসেছেন, আর যারা একটু পরবর্তীকালে পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন পার্টির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে মানসিকতায় অনেক সময় কিছুটা তফাত দেখা যায়। পরের দিকে দলের সঙ্গে অনেক কর্মী যুক্ত হন যাঁরা কিছু পাওয়ার লোভে পার্টিতে আসেন। সব দলেই এটা হয়। সিপিআইএম-এও হয়েছে। শেষের দিকে আমরা পার্টির দূর্বৃত্তায়ন দেখেছি। পার্টির সদস্যদের উদ্দেশ্যে স্বয়ং জ্যোতিবাবুকে বলতে শুনেছি, মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবেন না। বামফ্রন্টের সময়েই সিন্ডিকেটরাজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। তারপরেও সিঙ্গুর হয়েছে, নন্দীগ্রাম হয়েছে, তাপসী মালিকের ঘটনা আমরা জানি। খুব বেশিদিনের ঘটনা নয়। এখনও মানুষের স্মৃতিতে সেসব ঘটনার রেশ রয়ে গেছে। এবার মাঝখানের এই পনেরো বছর ব্যবধানে সিপিআইএম-এর তরুণ ব্রিগেড অর্থাৎ আপনারা নতুন করে মানুষের দরবারে ভোট চাইতে এসেছেন। সেক্ষেত্রে অতীতের ব্যাগেজগুলোকে আপনারা কীভাবে সামলাচ্ছেন? আপনারা কি মানেন যে মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে আপনাদের কিছু ভুল হয়েছিল? এবং সেই সময়কার ভুলত্রুটিগুলো স্বীকার করে নিয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছেন যাতে তারা আবার আপনাদের ওপর ভরসা করতে পারেন?

তাপসী মালিকের ঘটনায় শেষমেশ কী প্রমাণ হল সেটাও কিন্তু আপনাকে বলতে হবে। যাঁদেরকে সে সময় অভিযুক্ত হিসেবে জনতার আদালতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল, তাঁরা কিন্তু শেষমেশ অভিযুক্ত হলেন না। তাঁরা সবাই ছাড়া পেয়ে গেলেন কিন্তু সেই সময় এমন একটা ব্যান্ড বাজানো হল সবাই মিলে এবং টাকাপয়সা খরচা করে যে তাতে মনে হল যে বামপন্থীরাই দোষী। কিন্তু অবশেষে কিন্তু অভিযুক্তরা নির্দোষ হিসেবেই ছাড়া পেয়ে গেলেন।

আর সেইসময় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সিদ্ধান্ত নিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেই যা বলার বলেছেন, যথেষ্টই বলেছেন। আমরা বিশ্বাস করি ওই সময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ভুল স্বীকার করলেও সিপিআইএম-এর আড়াইশো কর্মী যে তখন শহিদ হয়েছিলেন সে বিষয়ে মমতা ব্যানার্জি পরে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তাই কথাটা ব্যাগেজের নয়। কথাটা হল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে আমাদের ভাবনাটা কী ছিল। নন্দীগ্রামে শিল্প হবে না— এই সার্কুলার অফিসে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেইসময় মিডিয়ার এক অংশকে ব্যবহার করে বিজেপি ইত্যাদি আরও অনেক শক্তিকে ব্যবহার করে অন্ধ সিপিআইএম-বিরোধিতাকে ইন্ধন দেওয়া হল। সেইসময় আমরা সদ্য গ্র্যাজুয়েশন করেছি। আমাদের প্রজন্মের চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন, নতুন শিল্প হওয়ার স্বপ্নটাকে কার্যত গলা টিপে খুন করে দেওয়া হল। ফলে এটা আমাদের কাছে ব্যাগেজ নয়। যে বামপন্থী কর্মীরা ওইসময় খুন হয়েছেন, আপনি ভাবুন, ট্রিগারটা টেপার আগে কেউ যদি হাত তুলে বলে দিতেন যে না না, আমি আর সিপিআইএম করব না, তাহলে কিন্তু গুলিটা চলত না। কিন্তু বুকে গুলি খাওয়া সেই আড়াইশো কর্মী কিন্তু গুলিটা খেয়েছেন এইজন্যে যে আমাদের সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। ফলে আমরা যারা এখন রাজনীতি করছি, আমাদের থেকে জুনিয়র যারা আগামী দিনে বামপন্থী রাজনীতি করতে আসবে, আমরা এই শিক্ষা নিয়ে চলব যে ক্ষমতায় আসার জন্য আমরা কখনও ওই পদ্ধতি নেব না। কিন্তু ক্ষমতায় আসা মানে আসলে মানুষের উপকার করা— এই কথাটা যে আমরা বারংবার বলি, এটা আমরা আমাদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করব। গত পনেরো বছরে যারা রাজ্যের ক্ষমতায় আছে, তারা তো মানুষের উপকারে কিছু করতে পারেনি।

এ বছর গড়বেতায় আপনারা প্রার্থী করেছেন শ্রী তপন ঘোষকে। ২০০১ সালে ছোট আঙারিয়ায় একটা ঘটনা ঘটেছিল যেখানে তপন-সুকুর— এই দুজনের নাম উঠে এসেছিল। অভিযুক্ত হিসেবে তাঁরা কিছুদিন জেল খেটেছিলেন, তারপর ছাড়াও পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের নাম উঠলে, পুরনো মানুষ যাঁরা আছেন তাঁদের মনে সেই ঘটনাটার কথা ফুটে উঠে। কে ঠিক কে ভুল আমি সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। বামফ্রন্ট কি আর কোনও যোগ্য প্রার্থীকে ওই জায়গায় দাঁড় করাতে পারল না যার গায়ে এই দাগটা নেই?

সেই হিসেবে দেখলে ওই দাগ তো আমারও আছে। সেই যে তৃণমূলের তৈরি করা ষড়যন্ত্র এবং তাতে আমার জেলযাত্রা, সেটা নিয়ে এই এলাকার বিজেপি প্রচার করছে যে কলতান খারাপ ছেলে, কারণ কলতান ওই ঘটনাটা ঘটিয়েছিল। ফলে কখন কোন ষড়যন্ত্র কার নামে দাগ হিসেবে লাগিয়ে দেওয়া হয়, সেটা বোঝা খুব মুশকিল। কথা হচ্ছে যে বামফ্রন্ট মনে করেছে যে ওই এলাকায় উনি প্রার্থী হতে পারেন এবং ওইটা দাগ নাকি সেইসময় ওখানে পার্টিকে রক্ষা করার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ— সেই বিষয়টা কিন্তু আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। বিচার শেষ হলে বলা যাবে যে ওটা আসলে দাগ নাকি পার্টিকে বাঁচাতে গিয়ে বিরোধীরা ওই দাগটা তাঁর গায়ে লাগিয়ে দিয়েছিল।

বেশ। এবার আমি একেবারে আপনার ব্যক্তিগত এক জায়গায় আসি। আপনি একটু আগে বললেন যে যখন নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের ঘটনা ঘটছে, তখন আপনি গ্রাজুয়েশন করছেন। আপনি এখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সর্বক্ষণের কর্মী। আপনি পুরো সময়ের জন্য রাজনীতির পথটাকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আপনার যারা বন্ধুবান্ধব, নিশ্চয়ই তাদের বেশিরভাগ অংশই নানারকম কেরিয়ারের দিকে গেছেন। সেক্ষেত্রে আপনার এইরকম একটি সম্পূর্ণ্ রাজনৈতিক জীবন বেছে নেওয়া পারিবারিক দিক থেকে এবং সামাজিক দিক থেকে কতটা কঠিন ছিল?

আমাদের পরিবারে একটা বামপন্থী রাজনীতির ছাপ ছিলই। কিন্তু যা হয় আর কী, ছেলে চাকরিবাকরি করবে না তাই নিয়ে পরিবারে নানা কথাবার্তা ইত্যাদি ছিল। সবাই আমার ভালোই চেয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের মত বলেছিলেন। আমি তাঁদেরকে বুঝিয়ে— বাবা ছিলেন না, মাকে বুঝিয়ে অন্তত সেইসময় এই সিদ্ধান্তটা নিতে পেরেছি। এটা একটা ভালো ব্যাপার যে আমার নেশা এবং পেশা একইরকম আর কি! এই ভালো লাগাটা সবার জীবনে থাকে না। সবাইকে নিজের পেশায় দৌড়তে হয় দু-বেলা দু-মুঠো খাওয়ার জন্য। ভালো না লাগলেও কাজটা করে যেতে হয়। আমার অন্তত এই খারাপ লাগাটা নেই।

কলতান দাশগুপ্ত কি এই নিশ্চিতিটা দিতে পারেন যে তিনি কোনওদিন প্রতীক উর রহমান হবেন না?

হ্যাঁ, অবশ্যই দিতে পারি। তবে আজকে এখন আমি হ্যাঁ বললাম। আপনি হয়তো মনে মনে ভাবতে পারেন যে কাল যদি আমার উত্তর অন্য কিছু হয়। আজ এটা আসলে একটা জটিল ব্যাপার। পার্টিসদস্য হয়েছি। আমরা কমিউনিস্ট হতে চাই, কিন্তু কমিউনিস্ট হওয়া তো একটা কঠিন ব্যাপার। আমি যদি পুরো জীবনটা এইভাবে কাটাতে পারি, তাহলে হয়তো শেষে গিয়ে বলতে পারব যে আমি গোটা জীবনটা কাটিয়েছি কিন্তু কোথাও ডিরেইলড হইনি। ডিরেইলড না হওয়ার যে লড়াইটা গোটা জীবন ধরে করে যেতে হয়। আমাদের সবাইকেই করে যেতে হয়।

ঠিক তাই। যাই হোক, একদম শেষের দিকে আমরা চলে এসেছি। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বামজোট কীরকম ফল করবে? তাদের ভোটের শতাংশ যে বাড়বেই সে বিষয়ে অন্তত কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি যদি আসনের কথা বলি, তাহলে আপনারা মোটামুটি কীরকম সিট পেতে চলেছেন?

আমি জ্যোতিষী নই, ফলে সংখ্যার হিসেব করতে পারব না। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভালো ফল হবে এটা আমি বলতে পারি। দুই শাসক দলের বিরুদ্ধে মানুষের যে রাগ এই নির্বাচনে তার প্রকাশ আমরা দেখতে পাব।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, কলতান। প্রচারের এই লগ্নে এতখানি ব্যস্ততার মধ্যেও আপনি আমাদের সময় দিয়েছেন। আপনার জন্য আবারও শুভেচ্ছা রইল।

আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5365 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...