RNA বিশ্ব-হাইপোথিসিস: একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এবং ‘শিক্ষিত’ হিন্দু বাঙালির প্রগতিশীলতা নিয়ে কয়েকটি কথা

মণিশংকর বিশ্বাস

 


ইসলামিক ধর্মীয় স্কলার বা খ্রিস্টান থিওলজিস্টরা যে খুব পাত্তা পান নিজ নিজ সমাজের শিক্ষিত বিদগ্ধ মানুষজনের কাছে, এমনটা আমার মনে হয় না। অন্যদিকে যাঁরা বাঙালির একদম কালচারাল পিরামিডের সর্বোচ্চ ধাপে অবস্থান করছেন, তাঁরাও রামকৃষ্ণ মিশন বা ওখানকার সন্ন্যাসী শুনলে মূর্ছা যান। আবার অনেকেই অ্যাক্টিভলি বেদান্ত ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে এক করে দেখার এই চেষ্টাকে ঠারেঠোরে সমর্থনও জানান

 

RNA বিশ্ব-হাইপোথিসিস অনুযায়ী, যখন RNA অণুগুলো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরির ক্ষমতা অর্জন করা শুরু করেছিল, সেই থেকে জীবন শুরু হয়েছিল। এখন বিজ্ঞানীরা এমন একটি RNA মলিকিউল আবিষ্কার করেছেন যা প্রায় এই কাজটি করতে সক্ষম— অর্থাৎ প্রয়োজনীয় ধাপগুলোর বেশিরভাগই সম্পন্ন করতে পারে, যদিও সবগুলো একসঙ্গে করতে পারে না।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের MRC Laboratory of Molecular Biology-র গবেষক ফিলিপ হলিগার বলেন,

এই পর্যায়ে পৌঁছাতে আমাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে— যেখানে আমরা নিজেদের বোঝাতে পেরেছি যে সঠিক পরিস্থিতিতে RNA মলিকিউলও নিজের প্রতিলিপি তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। আমার মনে হয় এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে এটি সত্যিই সম্ভব।

কিন্তু এমন অণু খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন ছিল। গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে মনে করতেন যে নিজে নিজে প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম RNA অবশ্যই তুলনামূলকভাবে বড় এবং জটিল হবে। কিন্তু দেখা গেছে বড় RNA অণু দ্বারা প্রতিলিপি তৈরি করানো অত্যন্ত কঠিন।

কেমব্রিজের MRC Laboratory of Molecular Biology-তে একদল বিজ্ঞানী এমন একটি RNA অণু আবিষ্কার করেছেন যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গঠিত হতে পারে এবং নিজের পাশাপাশি তার সহায়ক স্ট্র্যান্ডেরও কপি তৈরি করতে পারে। তাঁরা এটার নাম দিয়েছেন “QT45”।

জীবিত কোষে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে— যেমন রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা (catalysis)। এই প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা সংরক্ষিত থাকে দ্বিস্তরবিশিষ্ট DNA অণুতে। RNA হল DNA-র একটি রাসায়নিক আত্মীয়, যা সাধারণত একক স্ট্র্যান্ড আকারে থাকে।

তথ্য সংরক্ষণে RNA, DNA-র মতো ভালো নয়, কারণ এটি কম স্থিতিশীল। কিন্তু RNA এমন একটি কাজ করতে পারে যা DNA পারে না— এটি ভাঁজ হয়ে প্রোটিন-সদৃশ এনজাইমের মতো আচরণ করতে পারে এবং রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই ১৯৬০-এর দশকেই ধারণা করা হয়েছিল যে জীবন হয়তো শুরু হয়েছিল এমন RNA অণু দিয়ে, যা নিজের কপি বা প্রতিলিপি তৈরির প্রক্রিয়াকে নিজেই ত্বরান্বিত করেছিল।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, কেমব্রিজের এই গবেষকরা যে RNA অণুটি সম্পর্কে এত আশাবাদী— সেটি মাত্র ৪৫টি নিউক্লিওটাইড দীর্ঘ। আগে ধারণা করা হয়েছিল এটি হয়তো হাজার খানেক নিউক্লিওটাইড দীর্ঘ হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য জীবের মতোই এটি মাত্র চার ধরনের নিউক্লিওটাইড ব্যবহার করে— A, G, C, T। তবে যেহেতু এটি RNA (DNA নয়), তাই এখানে T-এর পরিবর্তে U (Uracil) থাকে।

অর্থাৎ যদি adenine (A), cytosine (C), guanine (G), এবং uracil (U) নামের এই উপাদানগুলো সামান্য লবণাক্ত ও তুলনামূলক ঠান্ডা জলে ভেসে বেড়ায় এবং এলোমেলোভাবে যুক্ত হতে থাকে— তাহলে এই RNA স্ট্র্যান্ড সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গঠিত হতে পারে, প্রায় শূন্য থেকে।

এই উপাদানগুলো মহাবিশ্বে খুবই সাধারণ। বিখ্যাত মিলার–ইউরি এক্সপেরিমেন্ট (Miller–Urey experiment) দেখিয়েছিল যে পৃথিবীর প্রাথমিক অবস্থার মতো পরিবেশে (বায়ুমণ্ডল, জল এবং মাঝে মাঝে বজ্রপাত) অ্যামিনো অ্যাসিড স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হতে পারে।

এই পরীক্ষাটি পরে অনেকবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, বিভিন্ন পরিবেশগত অবস্থায়। প্রাথমিক পৃথিবীর অবস্থা সম্পর্কে আমাদের ধারণা সময়ের সঙ্গে আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু প্রায় যে-কোনও সম্ভাব্য অবস্থাই ধরা হোক না কেন— প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড তবুও তৈরি হয়।

বিজ্ঞানীরা এও দেখেছিলেন যে তুলনামূলক ছোট RNA অণু সঠিক পরিস্থিতিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হতে পারে, কিন্তু বড় অণু তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

হলিগার বলেন, “এতে আমরা ভাবতে শুরু করি— হয়তো আমরা ভুল ভাবছিলাম। হয়তো ছোট এবং সহজ কোনও অণুই এই প্রতিলিপি তৈরির কাজটি করতে পারে। তাই আমরা খুঁজতে শুরু করি, এবং শেষ পর্যন্ত একটি (QT45) খুঁজে পাই।”

RNA গঠিত হয় নিউক্লিওটাইড নামের ছোট বিল্ডিং ব্লক দিয়ে। গবেষকরা প্রথমে ২০, ৩০ বা ৪০ নিউক্লিওটাইড দীর্ঘ এক ট্রিলিয়ন এলোমেলো RNA সিকোয়েন্স তৈরি করেন। সেখান থেকে তারা তিনটি অণু নির্বাচন করেন যেগুলো নিউক্লিওটাইড যুক্ত করার মতো প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে। এরপর এই তিনটি সিকোয়েন্সকে একত্রিত করে বহু ধাপে পারমুটেশন-কম্বিনেশন করে দেখে নেওয়া হয়, যে কোন কোন সিকোয়েন্স ভালো কাজ করে এবং সেগুলো নির্বাচন করা হয়।

অবশেষে এই প্রক্রিয়ায় যে অণুটি তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা তার নাম QT45, যার দৈর্ঘ্য মাত্র ৪৫ নিউক্লিওটাইড।

হালকা ক্ষারীয় এবং প্রায় হিমাঙ্কের কাছাকাছি ঠান্ডা জলে এটি একক স্ট্র্যান্ড RNA-কে টেম্পলেট হিসেবে ব্যবহার করে কমপ্লিমেন্টারি স্ট্যান্ড তৈরি করতে পারে। এটি দুই বা তিন নিউক্লিওটাইডের ছোট ছোট অংশ যুক্ত করে এই কাজটি করে— এমনকি নিজের সিকোয়েন্সের কমপ্লিমেন্টারি অংশও তৈরি করতে পারে।

হলিগার বলেন, “এটি এখনও ধীরগতির প্রক্রিয়া, কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রথমবারের মতো আমরা এমন একটি RNA মলিকিউল পেয়েছি যা নিজেকে এবং তার encoding strand— দুটিই তৈরি করতে পারে। এগুলোই হল নিজের প্রতিরূপ তৈরির প্রথম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি মৌলিক ধাপ।”

হলিগার আরও বলেন, “সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বিষয় হল— একবার যখন সিস্টেমটি নিজে নিজে প্রতিলিপি তৈরি শুরু করবে, তখন এটি নিজেই নিজেকে উন্নত করতে শুরু করবে।”

কারণ এই প্রক্রিয়ায় অনেক ভুল (mutation) হবে, যার ফলে নানারকম ভিন্নতা তৈরি হবে। এর মধ্যে কিছু ভিন্নতা হয়তো আরও ভালো কাজ করবে এবং এগুলি নিজেদের আরও বেশি কপি তৈরি করবে।

প্রাথমিক পৃথিবীতে QT45-এর মতো অণুগুলো সম্ভবত আইসল্যান্ডের মতো পরিবেশে নিজে নিজে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারত— যেখানে বরফ আছে, আবার হাইড্রোথার্মাল কার্যকলাপও রয়েছে।

এই আবিষ্কারের তাৎপর্য অসীম।

তবে যে তিনটি বিষয় এর থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তা হল:

১. মহাবিশ্বে জীবন সম্ভবত খুবই সাধারণ একটা ঘটনা। এখানে জীবন বলতে অবশ্যই আণুবীক্ষণিক জীবন।
২. বিজ্ঞান এখন অবশেষে “আমরা কীভাবে এখানে এলাম” তার একটি সুসংহত ব্যাখ্যা দিতে পারছে— বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত।
৩. “God-of-the-gaps” যুক্তির শেষ ফাঁকটিও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন প্রতিটি ধাপ পরিচিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

এক্ষেত্রে একটি সাধারণ ও সহজবোধ্য প্রশ্ন হল— যদি এমন অণু এত সহজে তৈরি হয়, তাহলে আজকের মহাসাগরে আমরা এগুলো দেখি না কেন?

কারণ সম্ভবত এটি ঘটেছে বিলিয়ন বছর ধরে বিলিয়ন বার। কিন্তু পুরো পৃথিবীর মহাসাগরে বছরে মাত্র একবার এমন কোনও প্রাথমিক জীব তৈরি হলেও তা লক্ষ করবার মতো আমাদের টেকনোলজি নেই।

আর সেই সরল প্রাণের, আধুনিক জীবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সম্ভাবনাও প্রায় শূন্য। কিন্তু যখন পুরো গ্রহটাই তাদের জন্য খালি ছিল— তখন সেই পরিবেশ একটি খুবই নাজুক এবং আদিম জীবকেও টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিল। ধীরে ধীরে তারা সমুদ্র ভরিয়ে তোলে এবং আরও উন্নত জীবের দিকে বিবর্তিত হয়।[1]

 

দুই.

এখন কথা হল, এই ধরনের এক গবেষণার কথা আমি কেন এত উৎসাহ নিয়ে লিখলাম! প্রথম কারণটা খুবই সহজবোধ্য। কীভাবে এমন একটা RNA মলিকিউল বা জৈবিক অণু স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয়েছিল যা নিজের প্রতিলিপিও তৈরি করতে শুরু করেছিল, যখন পৃথিবীতে কোনও প্রাণ ছিল না! প্রাণহীন সম্পূর্ণ জড়জগৎ থেকে এমন কিছু একটার উদ্ভব হল যা নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে, এই ভাবনাটাই আমার কাছে অসম্ভব ম্যাজিকাল মনে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে সবসময়ই এই জাদুমুহূর্তটির কথা ভেবে বুঁদ হয়ে থেকেছি। আজ বিজ্ঞান এর একটা সুসংহত ব্যাখ্যা দিচ্ছে, যার মধ্যে কিছুমাত্র ‘ঈশ্বর’ নেই! প্রাণ বা ‘আত্মা’ তাহলে এক জটিল ও আকস্মিক রসায়ন! এইসব রহস্যঘন মুহূর্তের মজাটা হল এই যে, বিজ্ঞান এসবের ব্যাখ্যা দিলেও আমাদের বিস্ময়-মাত্রা কিছুমাত্র কম হয় না তাতে।

অন্য আরেকটি কারণ হল, ভদ্রলোক বাঙালির যে অংশটি নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবি করে, তাদের হিপোক্রেসিকে আরেকবার চিহ্নিত করবার জন্য।

শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুমাত্রেই জানেন, স্বামী অভেদানন্দের বিখ্যাত গ্রন্থ মরণের পরে। তো এই বইয়ের শেষের দিকে একটা ছবি ছিল, যেখানে একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে আর তার দেহ থেকে আত্মার নির্গমন হচ্ছে, সাদা কুয়াশার মতো কিছু একটা। এখন কথা হল, বিজ্ঞানের এই আদিম ও স্বয়ম্ভূ RNA অণুটির কথা না জানলেও, এটা বোঝা কিছু মাত্র কঠিন নয় যে এই ছবিটি একটি অতি নিকৃষ্ট মানের চিটিংবাজি। অথচ আমরা কখনও দেখেছি, প্রগতিশীল ও তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালিকে উঁচুস্বরে স্বামী অভেদানন্দকে একটা বুজরুক বলে ডাকতে? দেখিনি। এই গোটা ক্ল্যানটা, যা স্বামী বিবেকানন্দ থেকে আজ পর্যন্ত, সিস্টেমেটিক্যালি বাঙালি ‘সো কল্ড’ শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে, একটা অবৈজ্ঞানিক ক্ষতিকারক ধর্মান্ধতা চারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। একটু কম যারা শিক্ষিত, তাদের অন্য ঠাকুর আছে, অনুকূল ঠাকুর থেকে বালক ব্রহ্মচারী, সে এক লম্বা লিস্ট! কিন্তু এরা এত ক্ষমতাবান নয়। পশ্চিমবঙ্গে সর্বক্ষেত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা আছে, যারা সিনেমা, সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে জনমত বা জনরুচি প্রভাবিত করে, সব কিছু বা সবার উপরে এই গোষ্ঠীটার কিন্তু বিরাট লম্বা হাত! খুব সূক্ষ্মভাবে কথার জাল বুনে আজকাল দেখি এদের স্বামীজিরা এমনকি ইউটিউবে পর্যন্ত প্রচার করে চলেছেন, বেদান্তের পথেই আমাদের মুক্তি! সেদিন দেখলাম আমার এক পরিচিত, খুব পড়াশোনা করা একজন মানুষ, একটা কলেজে পড়ান, এরকমই এক স্বামীজি শহরে কোথাও একটা আসছেন শুনে সোশাল মিডিয়ায় খুব উচ্ছ্বসিত এবং সময় ও সুযোগ পেলে তিনিও তাঁর কথা শুনতে যাবেন বলে মন্তব্য করেছেন একটি পোস্টে! অথচ ওই স্বামীজির কথা ইউটিউবে শুনেছি। খুব মনোমুগ্ধকর কথা বলেন স্বামীজি। খুব সুন্দর! কিন্তু তাঁর একটা লক্ষ্য আছে! বেদ-পুরাণ, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক, মৃত্যু-পুনর্জন্ম-জাতিস্মর ইত্যাদি ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্রেমওয়ার্কটির প্রচার ও প্রসার ঘটানো, রামকৃষ্ণ মিশনের অন্য সকলের মতো। অনেকেই বলবেন, যে এতে অপরাধটা কোথায়? এগুলি কেউ যদি মানে বা প্রচার করে, তাহলেই তো মানুষটা বা তাঁদের সংগঠন খারাপ হয়ে গেল না! অনেকেই জিজ্ঞেস করবেন, সর্বত্যাগী ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীরা এঁরা, এঁদের বিরুদ্ধে আমার সত্যি অভিযোগটা কী? অভিযোগ হল এই যে, মানুষের জন্মমৃত্যু সবই নির্ধারিত, আমি ‘আমার এই জন্মে’ যে কষ্ট-দুর্ভোগ পোহাচ্ছি সবই আসলে গতজন্মের পাপ বা কর্মফল, এটা প্রচার করা একধরনের ব্রাহ্মণ্যবাদী অ্যাজেন্ডা, প্রকারান্তরে যা জাতপাত বা বর্ণবাদকেও সমর্থন করে। আর আজও চিন্তা-ভাবনায় এগিয়ে থাকা বাংলায় এই অ্যাজেন্ডাকে সমর্থন করবার লোকের অভাব নেই। খারাপ লাগে যখন দেখি যাঁরা নিজেদেরকে বামপন্থী ও প্রগতিশীলতার অংশ বলে দাবি করেন, তাঁদেরও অধিকাংশ এই দলেই। অন্তত অ্যাক্টিভলি বিরুদ্ধে নন। ঠিক একইভাবে এই ‘ব্রহ্মচারী’ সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে নারীবিদ্বেষের অভিযোগও তোলা যায়। কিন্তু সাধারণ মেয়েদের কথা ছেড়ে দিলাম, নারী-স্বাধীনতা নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন এপার বাংলায়, তাদের কজনকে দেখেছি আমরা এ-বিষয়ে কথা বলতে এ পর্যন্ত? বিখ্যাত দৈনিকে উত্তর সম্পাদকীয় লেখার লোভ জয় করা বড় সহজ নয় হয়তো!

জানি অনেকেরই রাগ হচ্ছে এ-পর্যন্ত পড়ে। বিবেকানন্দকে এর মধ্যে টেনে এনে ভালো করিনি, অনেকেই নিশ্চয়ই বলতে শুরু করেছেন মনে মনে।

কিন্তু বিবেকানন্দ যতই বলুন না কেন, “ভুলিও না— নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই!” বিবেকানন্দ খুব স্পষ্ট ভাষায় তাঁর অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছেন, এটা বলে যে, “Caste is a very good thing. Caste is the plan we want to follow.”[2] তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে জাতপাতের বিলোপ কামনা করা “শুদ্ধ বাজে কথা” (sheer nonsense)। জাতপাত সম্পর্কে বিবেকানন্দের মনোভাব কি এতেই ফয়সালা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল না?

কিন্তু এরপর এক দল মানুষ, যাদের বেশিরভাগই আসবেন প্রিভিলেজড ক্লাস থেকে, বিভিন্ন রেফারেন্স দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে বিবেকানন্দ, অস্পৃশ্যতাকে কত ঘৃণা করেছেন! অস্পৃশ্যতাকে দেখেছেন সমাজের ওপর চাপানো এক নিকৃষ্ট শৃঙ্খল হিসেবে। এমনকি জন্মভিত্তিক কঠোর জাতপাতের ব্যবস্থাকে তিনি যে সমর্থন করেন না, এও বহুবার বলেছেন।

এমনকি নিম্নবর্ণের মানুষের উন্নতি কীভাবে হবে, তারও চমৎকার উপায় বাতলে দিয়েছেন স্বামীজি: “তোমাদের অবস্থা উন্নত করার একমাত্র উপায় সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করা।”[3]

এখানে যে যুক্তিটা দেখানো হবে তা হল, এই সংস্কৃত শেখার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদের কোনও সম্পর্ক নেই; নিম্নবর্ণের মানুষ যে এই ভাষাটা শিখতে পারত না, সে-কথাও বোধ করি এড়িয়ে যাওয়া যাবে খুব সহজেই, এটা বলে যে স্বামীজি নিম্নবর্ণের মানুষকে মূলত পড়াশোনা শিখতে বলছেন, জাতপাত নিয়ে বিরোধ না করে!

আমি ভাবি যখনই ওঁর কোনও আপত্তিকর মন্তব্য সামনে আসে, কত সহজে সেটা এড়িয়ে যাই আমরা। তক্ষুনি স্বামীজির আরেকটি বক্তব্য সামনে নিয়ে আসি আমরা, যে উনি তো এও বলেছিলেন! তাহলে?! যেন আমাদের এক দায় রয়েছে যে, আমরা শুধু ওঁর সংবেদনশীল, মুক্তচিন্তার সাক্ষর আছে এমন মন্তব্যগুলিই ধর্তব্যের মধ্যে আনব! অথচ প্রায় ততোধিক বিপরীতমুখী বক্তব্য ওর আছে, যেগুলি রীতিমতো সাম্প্রদায়িক, রেসিস্ট! আমার প্রশ্ন এই যে, সেগুলিকে একদম সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে হবে কেন? এই যে মনিষী বলে ছাড় দেব, প্রশ্ন করব না, এটা সমাজের ঠিক কী উপকার করে? কেন আমাদের ছোটদের সে সময়ের আরেক যুগনায়ক অক্ষয়কুমার দত্তের বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে ঠিক করে পরিচিতও হতে দেওয়া হয় না। বিবেকানন্দ সারা জীবন বিজ্ঞানবিরোধী। সারা জীবন বর্ণবিভেদ, আত্মা, পুনর্জন্ম ইত্যাদিকে শক্ত ভিতের দাঁড় করাতে চেয়েছেন। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার সেগুলি উনি ভান করেছেন যে বিজ্ঞান দিয়েই তিনি তার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন! অথচ কে না জানে, যে কোনও অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের চেয়ে অনেকগুণ ক্ষতিকারক হল সিউডোসায়েন্স। একটা উদাহরণ দিই।

বিবেকানন্দ বলছেন:

Take the case of a chicken just out of the egg; it begins to pick up grains.

.

Take a duck just hatched; it runs to the water and swims.

.

Chickens are afraid of the hawk.

এরপর তিনি প্রশ্ন তোলেন:

If knowledge comes only through experience, how do they know these things?

তারপর ব্যাখ্যা করেন:

What we call instinct is the result of past experience.[4]

‘পাস্ট এক্সপিরিয়েন্স’ মানে জন্মান্তরবাদের ফল।[5] আমি মানছি তখনও জিন ইত্যাদি কীভাবে কাজ করে তা আবিষ্কৃত হয়নি। অনেক সময় অনেক বিজ্ঞানীও বলেছেন এমন অনেক কথা, পরবর্তীকালে হয়তো বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে সেটা একদমই ঠিক না বা সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কোনও ইনটেনশন থাকে না। বিবেকানন্দের ইনটেনশন খুব পরিষ্কার। অজর অনড় হিন্দুধর্মের নবজাগরণ। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। আজও রামকৃষ্ণ মিশনের অনেকেই নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এটা ‘প্রমাণ’ করবার জন্য যে বেদান্ত আসলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রাচীন হিন্দু ম্যানিফেস্টেশন। কাগজে পড়েছিলাম, রামকৃষ্ণ মিশন কিছুদিন আগে এমন একটা সেমিনারও করেছিল। আমি সেই খবরটার লিঙ্ক খুঁজে পাচ্ছি না। যারা এমন সব আলোচনায় আলোচক হিসেবে অংশগ্রহন করেন, তাঁরা সবাই পড়াশোনায় ব্রিলিয়ান্ট, কারও গণিতে বিরাট ডিগ্রি আছে, কারও বা ফিজিক্সে। কেউ কেউ হয়তো সরাসরি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়েই গবেষণা করেছেন। এখন সমস্যা হল এই যে গণিত বা পদার্থবিদ্যার এইসব তুমুল ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রদের তুলনায় আমি বিজ্ঞান নিয়ে আর কতটুকু জানি! আমি জানি এভাবেই আমাকে নস্যাৎ করা হবে। তবু আমি খুব সহজেই দেখাতে পারি এই দুটিকে (বেদান্ত আর কোয়ান্টাম মেকানিক্স) এক করে দেখার চেষ্টা কত বড় ফাঁকি। কিন্তু সেটা আর একটা প্রবন্ধের বিষয়। শুধু সংক্ষেপে বলি— বৈদান্তিক দর্শন আর কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে জোড়ার চেষ্টা করা হয় সাধারণত উপরিতলের কিছু মিল দেখে এবং তারপর একটা বড়, কিন্তু ভিত্তিহীন, সাদৃশ্য দাঁড় করানো হয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এমন সব ধারণায় ভরা যা শুনতে অদ্ভুত, এমনকি অলৌকিক এবং দার্শনিক বলে মনে হয়, যা ভুল ব্যাখ্যার জন্য খুবই উপযোগী। কবিতার মতো অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করে এরপর বেদান্তর সঙ্গে একটা যোগসূত্র তৈরি করা হয়। আগেই বলেছি, এটা অন্য এক প্রবন্ধের বিষয়, তবু সংক্ষেপে ওঁরা বলেন, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা অনুযায়ী একটা কণা একসঙ্গে অনেক জায়গায় থাকতে পারে (সুপারপজিশন)। অদ্বৈত বেদান্ত বলে আত্মা সর্বব্যাপী। সুতরাং, কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রমাণ করে বেদান্ত সত্যি। ওঁদের আরেকটি যুক্তি হল, কোয়ান্টাম মেকানিক্স দেখায় অসীম দূরত্বে থেকেও দুটি কণা একটি জোড় তৈরি করতে পারে  (এনট্যাঙ্গলমেন্ট) এবং একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। বেদান্ত বলে দূরত্ব বা ভিন্নতা কোনও বিষয় নয়, সবই এক ব্রহ্মের অংশ বা ব্রহ্ম। তাহলে দেখো, দুটোই একই কথা বলছে! আবার কোয়ান্টাম মেকানিক্সে পর্যবেক্ষক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে। বেদান্ত বলে পৃথিবীটা মায়া, যা চৈতন্য দ্বারা সৃষ্ট। সুতরাং, চেতনাই বাস্তবতা তৈরি করে, যেমনটা বেদ বলে আর কী! এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় এমন সব ধারণা যার কোনও প্রমাণ হয় না, যেমন ব্রহ্ম— চূড়ান্ত, অপরিবর্তনীয় সত্য, একক, নিরাকার সত্তা যা সবকিছুর মূল; আত্মা— ব্যক্তিগত সত্তা বা আত্মা, যা শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মেরই সমান; মায়া— সেই ভ্রান্তিময় শক্তি যা ব্রহ্মকে আচ্ছন্ন করে রাখে এবং এই পৃথক রূপ ও বস্তুর জগতকে সত্য বলে মনে করায়।

বিজ্ঞানীদের একটা দায় থাকে কোনও একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার। কিন্তু বিবেকানন্দ বা এই আজকের সন্ন্যাসীরা তো বিজ্ঞানী নন, ওঁদের কী দায়, এইসব ছদ্মবিজ্ঞান ব্যাবহার করবার? দায় আছে। দায় হল বেদ-উপনিষদ-পুরাণ, ইত্যাদিতে যা যা বলা হয়েছে তা সবই ঠিক। বিজ্ঞান আজ যা আবিষ্কার করছে সে সব আমাদের পৌরাণিক পুঁথিপত্রে অনেক আগে বলা হয়ে গেছে। সুতরাং আমার ধর্ম, ন্যায়শাস্ত্র, স্মৃতিশাস্ত্র পুরাণ এ-সবই সত্যি আর সঠিক। আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ, ধর্মের ইঁদুরদৌড়ে! এ শুধু হিন্দুরা করছেন না। গোঁড়া মুসলিমরা, খ্রিস্টানরা সবাই দেখাতে ব্যস্ত যে আমার ধর্মগ্রন্থে, আজ বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করছে, তা অনেক আগে থেকেই বলা আছে। যেমন কোরানে আছে, ‘জল থেকেই প্রাণের উদ্ভব’ যা আজ বিজ্ঞানও বলছে; বা বাইবেলে আছে লেট দেয়ার বি লাইট— বিগব্যাং-এর ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর আলো সৃষ্টি হল।

কিন্তু এগুলির একটাও বিজ্ঞান নয়। ইংরেজিতে একে বলে রেট্রোফিটিং। মানে বিজ্ঞান আজ যা আবিষ্কার করেছে, কবে কোথায় কোন ধর্মগ্রন্থে অস্পষ্ট কাব্যিক, ডিটেইলড রিসার্চ বা গাণিতিক ফাউন্ডেশন ছাড়াই কিছু একটা ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে আর সেটাকে আমি মিলিয়ে নিয়ে বললাম, দেখেছ, কত আগে এসব বলা হয়েছে আমাদের ধর্মে! রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন,

Science is not about finding things that match what you already believe.

অন্যদিকে কার্ল সাগান বলেছিলেন,

Humans are very good at seeing patterns— even when none exist… Science requires testable predictions made before the discovery, not after.

কিন্তু ইসলামিক ধর্মীয় স্কলার বা খ্রিস্টান থিওলজিস্টরা যে খুব পাত্তা পান নিজ নিজ সমাজের শিক্ষিত বিদগ্ধ মানুষজনের কাছে, এমনটা আমার মনে হয় না। অন্যদিকে যাঁরা বাঙালির একদম কালচারাল পিরামিডের সর্বোচ্চ ধাপে অবস্থান করছেন, তাঁরাও রামকৃষ্ণ মিশন বা ওখানকার সন্ন্যাসী শুনলে মূর্ছা যান। আবার অনেকেই অ্যাক্টিভলি বেদান্ত ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে এক করে দেখার এই চেষ্টাকে ঠারেঠোরে সমর্থনও জানান। যে সন্ন্যাসী জীবনে কখনও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেনি অথবা গণিত বা পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি করেছেন, তিনি যখন এ-বিষয়ে বলেন, আমরা ধরেই নিই তিনি তো ঠিকই বলবেন।

কোয়ান্টাম গণিতের একটা ক্ষুদ্র অংশ

 

অথচ বেদান্তের ধারণা যখন প্রথম আসে, তখন গাণিতিক শূন্যের ধারণাও ছিল না। অন্যদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স যে জটিল গাণিতিক ফাউন্ডেশনের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটা সাধারণ স্কুল-কলেজে পড়া একটু-আধটু বীজগণিত জানেন, ক্যালকুলাস জানেন এমন মানুষেরও বোধগম্য হওয়ার কথা নয়! সুতরাং কোনওরকম জটিল গাণিতিক ফাউন্ডেশন ছাড়াই বৈদিক ঋষিরা যে বেদান্ত দর্শনের কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বা আধুনিক কণাবিজ্ঞানের কোনও সম্পর্ক থাকতেই পারে না। হয়তো একটা দার্শনিক মিল-তাল থাকতে পারে! কিন্তু সেটাকে ফলাও করে প্রচার করে গর্বিত হওয়াটা প্রকৃত জ্ঞানচর্চার নামে স্রেফ নিজস্ব অ্যাজেন্ডার তরে তরী ভাসানো। তাহলে এইসব পুকুরচুরি রেট্রোফিটিং নিয়ে, বিশেষত হিন্দু বাঙালি সারস্বত সমাজ আপত্তি করে না কেন? গণেশের প্লাস্টিক সার্জারি বা মহাভারতের সময়ে ওয়াইফাই ছিল বলে যে উত্তর ভারতীয় গোবৎসরা দাবি করেন, আমরা তাঁদের থেকে উন্নত মানের, রেট্রোফিটার, যারা বেশ বুদ্ধি করে, খুব কালচার্ড একটা উপায়ে জন্মান্তর, জাতিস্মর ইত্যাদি বুজরুকিগুলিকে সুন্দর দার্শনিক তত্ত্বের মোড়কে পরিবেশন করতে পারি বলে?

 


[1] Le Page, Michael. RNA strand that can almost self-replicate may be key to life’s origins. NewScientist. Feb 12, 2026.
[2] ১৮৯৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি চেন্নাই যাওয়ার পথে ট্রেনযাত্রার সময় দ্য হিন্দু পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার।
[3] “The only safety, I tell you men who belong to the lower castes, the only way to raise your condition is to study Sanskrit, and this fighting and writing and frothing against the higher castes is in vain, it does no good, and it creates fight and quarrel, and this race, unfortunately already divided, is going to be divided more and more.” Complete Works of Swami Vivekananda, Vol. 3, Pg. 291.
[4] Raja Yoga, অধ্যায় “Samskaras and Memory”. পরে The Complete Works of Swami Vivekananda, Vol. 1-এ সঙ্কলিত।
[5] “According to the Yogis, these experiences are stored in the mind and carried from one life to another.”

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5338 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...