জুনেইদ আলি, রেন মু ও মুহাম্মদ ইয়াকুব
সর্বত্রই নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটছে। ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগুলি রাশিয়া ও চিনের সামরিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে, আর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলি রাশিয়াকে চিনের অর্থায়ন ও বাণিজ্যের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। এই অতিরিক্ত প্রসারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতার অবনতি ঘটছে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনও মহাশক্তি একসঙ্গে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সামাল দিতে চায়, তখন সেই অতিরিক্ত বিস্তার শেষ পর্যন্ত তার নিজস্ব প্রাধান্যকেই দুর্বল করে দেয়। কৌশলগত ত্রিভুজের ভেতরে এই বৈপরীত্য একটি চিন-রাশিয়া অক্ষ গড়ে তুলেছে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সহজে ভাঙতে পারছে না— শীতল যুদ্ধের সময়কার তাদের কৌশল এখানে খাটছে না
১. ভূমিকা
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা-পরিবেশে মহাশক্তিগুলির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও একটি নির্ধারক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।[1] যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়ন/রাশিয়া-চিন— এই কৌশলগত ত্রিভুজের সমীকরণের সঙ্গে সঙ্গে মহাশক্তিগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বিবর্তিত হয়েছে।
১৯৪০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৯০-এর দশকের গোড়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে শীতল যুদ্ধ চলেছিল তা ছিল একটি দ্বিমেরু সংঘাত, যার চারিত্র্য নির্ধারণ করেছিল রাজনৈতিক, মতাদর্শগত এবং সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।[2] সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন ওয়ারশ চুক্তি জোট এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত ন্যাটো জোট নিজেদের মধ্যে এমন একটি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যার বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচলিত সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের বাগাড়ম্বর।[3] সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র ছিল ইউরোপ, এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে শীতল যুদ্ধ তার পরিণতিতে পৌঁছয়।[4]
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে একটি একমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র সুপারপাওয়ার হিসেবে প্রাধান্য বিস্তার করে।[5] পূর্বোল্লেখিত কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ ছিল যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত-চিন সমীকরণের একটি সাময়িক ভাঙন; রাশিয়া তখন প্রান্তিক অবস্থায় চলে গেছে এবং চিন রয়েছে অপেক্ষাকৃত নিষ্ক্রিয় অবস্থায়— ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য বা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন তথাকথিত উদার বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার অবস্থায় ছিল না।[6]
তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে চিন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে।[7] একমেরু বা দ্বিমেরু ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন একটি নতুন বহুমেরু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যার চালিকাশক্তি হল এই কৌশলগত ত্রিভুজের পুনরুজ্জীবিত পারস্পরিক নির্ভরতা।
গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে— যেমন আফগানিস্তান ও ইরাকে ব্যর্থ যুদ্ধ, একটি আর্থিক সংকট, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মেরুকরণ, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতৃত্ব।[8] এদিকে একই সময়ে চিনের অর্থনীতি নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং সামরিক ক্ষেত্রেও দেশটি আগের যে-কোনও সময়ের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।[9] অর্থনৈতিক দিক থেকে বর্তমানে চিন উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে।
এই কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে চিনের এই অর্থনৈতিক উত্থান— যা ২০২৪ সালে ক্রয়ক্ষমতা-সমতা (PPP) অনুযায়ী ৩৫.২৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৮.৭৮ ট্রিলিয়ন ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে[10]— ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। চিন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে পশ্চিমি বিশ্বের বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলায় রাশিয়ার জন্য একটি অর্থনৈতিক সঙ্গীরও জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালে চিনের ৩.৫১ ট্রিলিয়ন ডলারের রপ্তানি-অর্থনীতি এবং ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত[11] তাকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত করেছে।[12] এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হতে হচ্ছে, আর রাশিয়া বাস্তববাদীভাবে চিনের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করছে।
একই সঙ্গে, বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হওয়া চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA)[13] এই পরিবর্তনকে আরও সুনির্দিষ্ট করেছে। এর ফলেই যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে হয়েছে— যা দেখে বোঝা যায় চিনের উত্থান কীভাবে এই ত্রিপাক্ষিক শক্তি-সমীকরণের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে।
তা সত্ত্বেও, অনেকের মতে রাশিয়ার পুনরুত্থানও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।[14] শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের অধিকারী[15] রাশিয়া একটি সংশোধনমূলক নীতি অনুসরণ করছে, যার বৈশিষ্ট্য হল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা এবং মধ্যপ্রাচ্য— যেমন, সিরিয়া— ও সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলগুলিতে— যেমন, ইউক্রেন, জর্জিয়া ও ক্রিমিয়া— প্রভাব বিস্তার করা।[16] রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে “মহাশক্তি”গুলির অন্যতম হিসেবে ধরে রাখা এবং নিশ্চিত করা যে, বিশ্ব-রাজনীতির তদারকি যেন সমমর্যাদাসম্পন্ন একাধিক শক্তির হাতে থাকে।[17] এই কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার পুনরুত্থানের সহায়ক বিষয়গুলি হল যুক্তরাষ্ট্র-চিন উত্তেজনাকে কাজে লাগানো; সামরিক দৃঢ়তা প্রদর্শনের মাধ্যমে আমেরিকান আধিপত্যের মোকাবিলা করা এবং বহুমেরুত্বের পক্ষে সওয়াল করতে চিনের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা।[18] এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সংযম’ বা নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রভাবিত হয় এবং একই সঙ্গে চিনের অবস্থানও আরও শক্তিশালী হয়— যা এই ত্রিমুখী শক্তি-সমীকরণের পারস্পরিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের একমেরু নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে।
অধিকন্তু, এই ত্রিপাক্ষিক পরিবর্তন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উভয় ব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে, যেখানে চিনের সামুদ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা-কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে; এবং ইউরেশিয়ায়, যেখানে চিন-রাশিয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব শক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। এসব পরিবর্তন এশিয়া এবং তার বাইরেও আমেরিকান আধিপত্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে হাজির হচ্ছে।
চিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি যদি অবাধে প্রসারিত হতে থাকে, তবে তার উত্থান এই ভূ-রাজনৈতিক ত্রিভুজকে গভীরভাবে পরিবর্তিত করতে পারে— সম্ভবত তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকেও অতিক্রম করে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে রূপ দেবে।
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক ভূ-কৌশলগত পরিবেশে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি এবং তার মিশনসমূহকে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছিল। একইভাবে, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির নতুন পরিবর্তনগুলিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশল ও উদ্যোগগুলির ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, এই গবেষণার উদ্দেশ্য হল চিনের উত্থান এবং রাশিয়ার পুনরুত্থান কীভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে পুনর্গঠিত করছে তা ব্যাখ্যা করা। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে একটি ‘কৌশলগত ত্রিভুজ’ কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি, এই প্রবণতাগুলির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য এর সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে— তাও এখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই গবেষণায় আমরা দেখব যে, চিনের উত্থান এবং রাশিয়ার পুনরুত্থান একটি ‘দ্বৈত-নিয়ন্ত্রণের বৈপরীত্য’ (dual-containment paradox)-এর জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ, কৌশলগত ত্রিভুজের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যখন একই সঙ্গে চিন ও রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে, তখন তা অনিচ্ছাকৃতভাবে এই দুই শক্তির মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়কে আরও উৎসাহিত করে— ফলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা কমার বদলে বরং আরও তীব্র হয়ে ওঠে। যখন কোনও হেজিমন একই সময়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে, তখন তা তাদের নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি পাল্টা ভারসাম্য রক্ষাকারী জোট গঠনে বাধ্য করে। ফলে তাদের প্রভাব সীমিত করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ’ নীতি সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্র জুড়ে চিন ও রাশিয়ার মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতা তৈরিতে সহায়তা করে। এরই ফল সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO) এবং ব্রিকস (BRICS)-এর মতো সংগঠনগুলির আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা এবং তাদের মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া বৃদ্ধি পাওয়া।
এছাড়াও, সর্বত্রই নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটছে। ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগুলি রাশিয়া ও চিনের সামরিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে, আর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলি রাশিয়াকে চিনের অর্থায়ন ও বাণিজ্যের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। এই অতিরিক্ত প্রসারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতার অবনতি ঘটছে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনও মহাশক্তি একসঙ্গে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সামাল দিতে চায়, তখন সেই অতিরিক্ত বিস্তার শেষ পর্যন্ত তার নিজস্ব প্রাধান্যকেই দুর্বল করে দেয়। কৌশলগত ত্রিভুজের ভেতরে এই বৈপরীত্য একটি চিন-রাশিয়া অক্ষ গড়ে তুলেছে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সহজে ভাঙতে পারছে না— শীতল যুদ্ধের সময়কার তাদের কৌশল এখানে খাটছে না। এর সঙ্গে ন্যাটো, অকাস (AUKUS) এবং কোয়াড (Quad)-এর মতো যুক্তরাষ্ট্রের জোটগুলির মধ্যেও অবসন্নতা লক্ষিত হচ্ছে—জোটসঙ্গীরা হয় আরও স্বাধীনতা দাবি করছে বা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যগুলির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের যুক্ত করতে অনীহা দেখাচ্ছে।
‘দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ’ কৌশলটি যে টেকসই নয়, এগুলি মূলত তারই ইঙ্গিত। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত আরও লক্ষ্যভিত্তিক সম্পৃক্ততার পথে যেতে হবে— অর্থাৎ প্রতিযোগিতা পরিচালনা করতে হবে এমনভাবে, যাতে তা একটি যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী জোটকে আরও শক্তিশালী করে না তোলে।
এই প্রেক্ষাপটেই বহুমেরুত্ব বর্তমানে এক ধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কারণ, মহাশক্তিগুলির পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত বিস্তার— দুটিই কোনও একক শক্তির বৈশ্বিক আধিপত্য অর্জনের পথে বাধা। ফলে এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে সীমিত আকারে কৌশলগত প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে, এবং যার গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হবে এই ত্রিভুজের অবিরাম পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে।

২. ধারণাগত কাঠামো
কৌশলগত ত্রিভুজ (Strategic Triangle) তত্ত্বটি মূলত ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রসচিব হেনরি কিসিঞ্জারের মস্তিষ্কপ্রসূত। এই তত্ত্বটি শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন, চিন এবং যুক্তরাষ্ট্র— এই তিনটি প্রধান শক্তির জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহৃত হয়, যাদের পারস্পরিক ক্রিয়াই তখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও ভূ-কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে নির্ধারণ করত।[19] স্ট্র্যাটেজিক ট্রায়াঙ্গেল ধারণাটি এই রাষ্ট্রগুলিকে পারস্পরিকভাবে নির্ভরশীল শক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যেখানে প্রত্যেকের আচরণ— যেমন চিনের উত্থান, রাশিয়ার পুনরুত্থান অথবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া— অন্য দুই শক্তির সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে প্রভাব ও পাল্টা-প্রতিক্রিয়ার একটি পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা তৈরি হয়।[20] এই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ত্রিমুখী পারস্পরিক নির্ভরতা। অর্থাৎ, একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিবর্তন— যেমন চিন-রাশিয়া সহযোগিতা— পুরো ত্রিভুজ জুড়ে প্রভাব ফেলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে পরিবর্তিত করে; একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপও বাকি দুই শক্তির সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।[21] প্রতিটি রাষ্ট্র একটি স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করে— চিন একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে শক্তির ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করছে; রাশিয়া পুনরুত্থিত একটি শক্তি হিসেবে তার অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে; আর যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠিত আধিপত্যশালী শক্তি হিসেবে নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তাদের এই সম্মিলিত কর্মকাণ্ডই বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বিপুল প্রভাব বিস্তার করে।[22]
তদুপরি, এই তত্ত্ব অনুযায়ী কোনও রাষ্ট্রই একা কাজ করে না। রাশিয়ার জ্বালানি কূটনীতি এবং সামরিক পদক্ষেপ প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র-চিন উত্তেজনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে ওঠে;[23] একইভাবে চিনের অর্থনৈতিক বিস্তার ও আঞ্চলিক দাবি-দাওয়া যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে নিজেদের কৌশল সমন্বয় করে[24]; যুক্তরাষ্ট্রের জোটনীতি ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপও চিন-রাশিয়া সম্পর্ক অনুযায়ী প্রতিফলিত হয়।[25] এই সম্পর্কভিত্তিক শক্তি-কাঠামো সব সময় অভিযোজনক্ষম থাকে। প্রতিটি রাষ্ট্র অন্যদের পদক্ষেপ অনুযায়ী নিজের কৌশল পুনর্গঠন করে, ফলে স্থির কোনও ভারসাম্যের পরিবর্তে এই ত্রিভুজের গতিশীলতা ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকে।[26]
এই কাঠামো অনুযায়ী, রাশিয়ার পুনরুত্থান— ভূখণ্ডগত দাবি জোরদার করা, জ্বালানি শক্তিকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এবং চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে তোলা— তাকে এক ধরনের ‘সুইং প্লেয়ার’ বা ভারসাম্য বদলে দিতে সক্ষম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম।[27] অন্যদিকে চিনের উত্থান— বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মতো অবকাঠামোগত প্রকল্প, সামুদ্রিক সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত বিকাশের মাধ্যমে— এই ত্রিভুজের শক্তি-সমীকরণকে পরিবর্তিত করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের মোকাবিলায় রাশিয়াকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে নিজের দিকে টেনে আনছে।[28] এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার ভূমিকা দৃঢ় রাখতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বিভিন্ন জোট গঠন করার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে সে চিন-রাশিয়া অক্ষকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, যাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে না পারে।[29]
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বোঝা যায় যে রাশিয়ার পুনরুত্থান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা আবার চিনের ইন্দো-প্যাসিফিক পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে;[30] অথবা চিনের BRI কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমূলক কৌশলকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে ইউরোপে রাশিয়ার সুযোগ-সম্ভাবনাও নতুনভাবে গড়ে ওঠে। এভাবে পারস্পরিক প্রভাবের একটি জটিল বলয় তৈরি হয়।[31] স্ট্র্যাটেজিক ট্রায়াঙ্গেল তত্ত্বটি এই তৃতীয় পক্ষের প্রভাবগুলিকে ধরতে পারার কারণেই গুরুত্বপূর্ণ, যা তুলনামূলকভাবে সহজ দ্বিপাক্ষিক মডেলগুলিতে ধরা পড়ে না। এটি কিসিঞ্জারের শীতল যুদ্ধের সময়কার কাঠামোকে— যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়ন-চিন— বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুঝতে সাহায্য করে, যেখানে রাশিয়ার পুনরুত্থান, চিনের উত্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অভিযোজন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।[32] যদিও এই তত্ত্বটিতে কখনও কখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গৌণ শক্তি বা বৈশ্বিক সংকটের মতো অ-রাষ্ট্রীয় উপাদানগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়,[33] তবু ত্রিমুখী পারস্পরিক ক্রিয়ার ওপর এর কেন্দ্রীভূত বিশ্লেষণের কারণেই এটি একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণাত্মক হাতিয়ার।
সারসংক্ষেপে, স্ট্র্যাটেজিক ট্রায়াঙ্গেল তত্ত্ব রাশিয়াকে একটি পুনরুত্থানশীল শক্তি, চিনকে একটি উদীয়মান শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বিদ্যমান আধিপত্যশালী শক্তি হিসেবে চিত্রিত করে। এই দৃষ্টিকোণ তাদের পারস্পরিক নির্ভরশীল কৌশলগুলি কীভাবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে পুনর্গঠন করছে তা বিশ্লেষণের জন্য একটি স্পষ্ট ও সম্পর্কভিত্তিক কাঠামো প্রদান করে।

৩. কৌশলগত ত্রিভুজে চিনের উত্থান
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের একমেরু আধিপত্যের একটি স্বল্পস্থায়ী যুগের সূচনা হয়। ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক মঞ্চে এমনভাবে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, যেখানে সমমানের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। কিন্তু ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে উন্মোচিত করে এবং চিনের উত্থানকে একটি পাল্টা ভারসাম্যকারী শক্তি হিসেবে দ্রুততর করে তোলে।[34] চিন-যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া— এই কৌশলগত ত্রিভুজের মধ্যে চিন দক্ষতার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে কাজে লাগায়। কম মজুরি এবং স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নের অনুপস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করায় বিপুল পরিমাণ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ চিনে যেতে থাকে।[35] একই সঙ্গে বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি এবং ২০০২ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগদান— যা বাণিজ্য-বাধা কমানোর মাধ্যমে সম্ভব হয়— চিনের অর্থনৈতিক উত্থানকে আরও সুদৃঢ় করে।[36]
এই উত্থানের শিকড় পাওয়া যাবে আরও আগে, ১৯৭৮ সালে, যখন দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কার কর্মসূচি স্তালিনীয় কেন্দ্রীভূত পরিকল্পিত অর্থনীতিকে ভেঙে দিয়ে চিনকে একটি নয়া-উদারপন্থী, পশ্চিমমুখী অর্থনৈতিক মডেলের দিকে নিয়ে যায়, যা ‘চিনা বৈশিষ্ট্যযুক্ত’ রূপে গৃহীত হয়েছিল।[37] এই কৌশলগত পুনর্গঠন নাটকীয় ফলাফল এনে দেয়: ১৯৮০ সালে যেখানে চিনের জিডিপি ছিল প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ডলার, তা ১৯৯৮ সালে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং ২০২৪ সালে পৌঁছে প্রায় ১৮.৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে।[38]
বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিতে, চিনের এই অর্থনৈতিক উত্থান কৌশলগত ত্রিভুজের ভারসাম্য পুনর্গঠন করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্য দুর্বল হয়েছে এবং বৈশ্বিক বাজারে আমেরিকান প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য চিনকে শক্তিশালী অবস্থান দিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া সামরিক শক্তিতে শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে তুলনামূলকভাবে গৌণ শক্তি হিসেবে থেকে যায় এবং প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিকে ভারসাম্য করতে চিনের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে। এই পরিবর্তনের ফলে চিন শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতেই পরিণত হয়নি, বরং তার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হয়েছে, যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করতে সক্ষম। আর এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া নিজের কৌশলগত গুরুত্ব আরও জোরদার করার সুযোগ পেয়েছে।
৩.১. দেং শিয়াওপিংয়ের রূপান্তরমূলক সংস্কার এবং কৌশলগত ত্রিভুজ
১৯৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) কেন্দ্রীয় কমিটির ১১তম অধিবেশনের তৃতীয় প্লেনারি সভায় দেং শিয়াওপিংয়ের উত্থান চিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথচলায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। এখান থেকেই শুরু হয় তার সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি। মাও সেতুংয়ের কেন্দ্রীভূত পরিকল্পিত অর্থনীতি এবং তাঁর মতাদর্শগত কঠোরতাকে বর্জন করে[39] দেং শিয়াওপিং চিনের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই একটি বাস্তববাদী, নয়াউদারপন্থী-প্রভাবিত অর্থনৈতিক মডেল গ্রহণ করেন। এই পরিবর্তন— স্তালিনীয় আত্মনির্ভর অর্থনীতি থেকে বাজারনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়া— চিনকে যুক্তরাষ্ট্র-চিন-রাশিয়া কৌশলগত ত্রিভুজের মধ্যে একটি সক্রিয় ও গতিশীল শক্তিতে পরিণত করে। ভারি শিল্পের পরিবর্তে ভোগ্যপণ্যের উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং সমবায় কৃষিব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে কৃষিক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি করা[40]— এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে দেং উৎপাদনশীলতার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটান। এর ফলে গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি পায় এবং শিল্পক্ষেত্রে নতুন পরীক্ষামূলক উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি হয়। এই সংস্কারগুলির ফলে চিন যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়নের সুযোগকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়, একই সঙ্গে রাশিয়ার দুর্বল হয়ে পড়া সোভিয়েত অর্থনৈতিক মডেল থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। ফলে বেইজিং একদিকে পশ্চিমি বাজারের সঙ্গে তার স্বার্থকে আংশিকভাবে সমন্বয় করে, কিন্তু অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতাদর্শগত আধিপত্যকে পুরোপুরি গ্রহণও করে না।
“চার আধুনিকীকরণ”— কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা— চিনের কৌশলগত ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কৃষিক্ষেত্রে কৃষকদের জমি ব্যবহারের অধিকার দেওয়া এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদন নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ দেওয়া[41] শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই নিশ্চিত করেনি; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে এই বার্তাও দিয়েছিল যে চিন বাইরের সাহায্য বা জোটের ওপর নির্ভর না করেও তার বিপুল জনসংখ্যাকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। শিল্পক্ষেত্রে পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা[42] অর্থনীতির অভিযোজনক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে চিন ধীরে ধীরে রাশিয়ার জড়তাগ্রস্ত কেন্দ্রীভূত অর্থনীতিকে ছাপিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীল শিল্পশক্তিকেও চ্যালেঞ্জ করার ভিত্তি তৈরি করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কার শিক্ষাগত স্থবিরতা দূর করেন এবং জেনেটিক্স ও মহাকাশ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলিতে প্রায় ৮ লক্ষ গবেষকের জন্য দ্রুতগতির উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু করেন।[43] বিদেশে পড়াশোনা করতে উৎসাহ দেওয়া এবং বিদেশি প্রযুক্তির অনুকরণ ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে উদ্ভাবন শেখার নীতি গ্রহণ করে চিন পশ্চিমি জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে— বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র থেকে— আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়।[44] একই সঙ্গে এটি রাশিয়ার মতো প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতার পথ এড়িয়ে ভবিষ্যতের এক শক্তিশালী শিল্পশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যায়।
সামরিক ক্ষেত্রেও দেং শিয়াওপিং পিপলস লিবারেশন আর্মির আধুনিকীকরণ করেন— সেনাসংখ্যা কমানো এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে। এর ফলে চিনা সেনা একটি স্থলভিত্তিক বাহিনী থেকে ধীরে ধীরে এমন এক উন্নত শক্তিতে পরিণত হয়, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।[45]
এই পরিবর্তনগুলি সরাসরি কৌশলগত ত্রিভুজের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যে যুক্তরাষ্ট্র একসময় নিরঙ্কুশ অবস্থানে ছিল, এখন তাকে এমন এক চিনের মুখোমুখি হতে হয় যার ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার রণকৌশলকে নতুন করে সাজাতে বাধ্য করে। অন্যদিকে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের মোকাবিলায় চিনের মধ্যে একটি অংশীদার খুঁজে পায়, যদিও তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ক্রমশ চিনই অধিক প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।[46] এছাড়াও দেং শিয়াওপিংয়ের রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির কৌশল— যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ জাপান ও এশীয় টাইগার দেশগুলির মডেলে গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ)— চিনে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। এর ফলে চিন দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে একীভূত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়।[47] এই পদক্ষেপগুলির ফলে একদিকে চিন যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়, অন্যদিকে সেই নেটওয়ার্ককেই প্রভাবিত ও পুনর্গঠন করার জন্যও সক্ষম হয়ে ওঠে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়, আর রাশিয়াকেও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বজায় রাখতে ক্রমশ বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকতে হয়।
কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে দেং-এর সংস্কার চিনকে এক প্রান্তিক শক্তি থেকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্মুক্ততার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে চিন ধীরে ধীরে আমেরিকার একমেরু আধিপত্যতে ভাঙন ধরায়, একই সময়ে রাশিয়াকেও কৌশলগতভাবে ছাড়িয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী পতনের ফলে রাশিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে তাকে ক্রমশ চিনের অর্থনৈতিক উত্থানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এর ফলাফল হল একটি পুনর্বিন্যস্ত কৌশলগত ত্রিভুজ, যেখানে চিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক শক্তি বৈশ্বিক জোট ও শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। এতে একদিকে চিন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানায়, অন্যদিকে রাশিয়াকে ক্রমশ নিজের প্রভাববলয়ের ভেতরে টেনে নিয়ে আসে, যেখানে রাশিয়া অপেক্ষাকৃত জুনিয়র অংশীদারের ভূমিকায় অবস্থান করে।
দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কারের ফলে চিন যুক্তরাষ্ট্র-চিন-রাশিয়া কৌশলগত ত্রিভুজের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সমমানের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের মধ্যে চিনের জিডিপি পৌঁছেছে ১৮.৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে— যা যুক্তরাষ্ট্রের ২৮.৭৮ ট্রিলিয়ন ডলারের সঙ্গে ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে এনেছে— এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (PPP) অনুযায়ী ৩৫.২৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে।[48] এর মাধ্যমে চিন আবার সেই ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক প্রাধান্যের দিকে ফিরে গেছে, যা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব যুগে দেখা গিয়েছিল, যখন বিশ্ব-জিডিপির ৩০ শতাংশেরও বেশি চিনের দখলে ছিল।[49] ১৯৮০ সালে বিশ্ব-জিডিপির মাত্র ২.২৬ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ১৯.০১ শতাংশে পৌঁছানো[50]— এই উত্থান দেখায় যে চিন কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়নকে সচেতনভাবে কাজে লাগিয়েছে। এর ফলে চিন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে।[51]
কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে চিনের এই অর্থনৈতিক উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের একমেরু আধিপত্যকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং ওয়াশিংটনকে নিয়ন্ত্রণমূলক কৌশল গ্রহণে বাধ্য করেছে— যার উদাহরণ হিসেবে বাণিজ্যযুদ্ধ এবং কোয়াড ও অকাস-এর মতো জোট গঠনের কথা উল্লেখ করা যায়।
চিনের রপ্তানি সক্ষমতা তার কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট নিদর্শন। উৎপাদিত পণ্যই তার বর্তমান রপ্তানির প্রধান অংশ— ১৯৯৫ সালে যেখানে এটি ছিল ৮৫.৫৬ শতাংশ, সেখানে ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৫.৪৯ শতাংশে। একই সঙ্গে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি ২০০৭ সালে ৩৪২.৫৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৯৪২.৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ১৬৯.২২ বিলিয়ন ডলার এবং জার্মানির ২১১.৮৯ বিলিয়ন ডলারকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যায়।[52] প্রাথমিক পণ্য থেকে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের দিকে এই রূপান্তর— যার পরিধি মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে জৈবপ্রযুক্তি পর্যন্ত বিস্তৃত— চিনকে বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।[53] এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং উচ্চপ্রযুক্তিক্ষেত্রে রাশিয়ার গুরুত্বও তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। BRI এই কৌশলগত প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ এটি এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা জুড়ে অর্থনৈতিক নির্ভরতার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করছে।[54] বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে BRI একটি পাওয়ার-পলিটিক্সের কৌশল: বিভিন্ন দেশকে নিজের অর্থনৈতিক প্রভাববলয়ে যুক্ত করে চিন ইন্দো-প্যাসিফিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সীমিত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এটি পশ্চিমি বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার মুখে রাশিয়ার জন্য একটি অর্থনৈতিক সহায়ক পথও তৈরি করেছে— যদিও সেই সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ মূলত বেইজিংয়ের হাতেই।
সামরিক ক্ষেত্রে, চিনের ২০২৩ সালের ২৯৬.৪৩ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট[55] PLA-র ব্যাপক আধুনিকীকরণ ঘটিয়েছে এবং বিশেষ করে তার নৌ ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছে।[56] এই সামরিক শক্তিবৃদ্ধি কৌশলগত ত্রিভুজের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। একসময় যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, এখন তাকে এমন এক চিনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে যার যুদ্ধক্ষমতা সম্ভাব্য সংঘাতে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।[57] ফলে সরাসরি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন প্রতিরোধ কৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
রাশিয়া চিনের উত্থান থেকে ন্যাটোর বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্যকারী শক্তি হিসেবে সুবিধা পেলেও, চিনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর তার ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দুই দেশের মধ্যে একটি অসম অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করে তুলছে। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোয়াড এবং অকাস-কে শক্তিশালী করা ইঙ্গিত দেয় যে শীতল যুদ্ধের সময়ের মতো চিন-রাশিয়া বিভাজনকে কাজে লাগানোর কৌশল থেকে সরে এসে এখন তাকে একটি অপেক্ষাকৃত ঐক্যবদ্ধ চিন-রাশিয়া জোটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।[58]
এই অর্থনৈতিক শক্তি— এবং প্রয়োজনে বিরল মাটির খনিজ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মতো চাপ সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ— চিনকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যার ফলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই নিজেদের কৌশল নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে হচ্ছে।
এর পাশাপাশি চিনের দ্রুত নৌবাহিনী সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ চিন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপগুলিকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলির ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নেতৃত্ব দেওয়ার চিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষারও প্রকাশ।[59] এই আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা শুধু চিনের কৌশলগত গভীরতাই বাড়াচ্ছে না; এর ফলে রাশিয়ার কৌশলগত মূল্যায়নও প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে মস্কো এমন এক অংশীদারকে পাচ্ছে, যার সঙ্গে মিলিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সীমিত করা যেতে পারে।
এছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ৫জি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো ক্ষেত্রে চিনের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার বৈশ্বিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।[60] এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ— যেমন যৌথ জ্বালানি প্রকল্প— আরও জোরদার হচ্ছে।
চিন-রাশিয়া জোটটি মূলত বাস্তববাদী স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে হলেও, এতে কৌশলগত ত্রিভুজের ভেতরে চিনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। উদাহরণস্বরূপ, পাওয়ার অব সাইবেরিয়া গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এবং যৌথ সামরিক মহড়াগুলি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্যকারী জোট গঠনের ইঙ্গিত দেয়। এই সমন্বয় যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে, কারণ এতে ওয়াশিংটনকে তুলনামূলকভাবে আরও ঐক্যবদ্ধ এক বিরোধী শক্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি রাশিয়াকে তার সংশোধনমূলক নীতি এগিয়ে নিতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তাও জোগাচ্ছে।
এছাড়াও চিনের সফট পাওয়ার কৌশল— যেমন কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতি— তার প্রভাব আরও বিস্তৃত করছে। এর ফলে ছোট দেশগুলির মধ্যে চিনের প্রতি নির্ভরতা বাড়ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতাদর্শগত প্রাধান্যও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।[61]
সংক্ষেপে বলা যায়, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাবের ক্ষেত্রে চিনের উত্থান কৌশলগত ত্রিভুজের ভারসাম্য তার দিকে আরও ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিতে তার প্রাধান্য দেখায় যে উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে চিন দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে BRI রাশিয়ার ঐতিহ্যগত প্রভাবক্ষেত্র— যেমন মধ্য এশিয়া, এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অঞ্চল— যেমন আর্কটিক পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তার করছে। এই বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রকে তার অবস্থান ধরে রাখতে বিভিন্ন জোটকে শক্তিশালী করতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে চিনের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারায় রাশিয়া ক্রমশ বেইজিংয়ের ওপর নির্ভর করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ঘেরাও নীতির মোকাবিলা করা যায়। ফলে শক্তির ভারসাম্য স্পষ্টতই পরিবর্তিত হয়েছে। প্রায় সমমানের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে চিনের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নমনীয়তাকে সীমিত করছে। এর ফলে শীতল যুদ্ধের সময়কার ত্রিভুজ কূটনীতির পরিবর্তে এখন আরও সংঘাতপূর্ণ এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিই ক্রমশ সম্পর্কের শর্ত নির্ধারণ করতে শুরু করেছে।

৪. রাশিয়ার পুনরুত্থান: কৌশলগত ত্রিভুজে নতুন পথনির্দেশ
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে শীতল যুদ্ধের দ্বিমেরু কাঠামোর অবসান ঘটে, এবং এর ফলে রাশিয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত— প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুর্বল অবস্থায় পড়ে যায়।[62] ১৯৯২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়র ঘোষণা করেন, “ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হয়নি, এটি জয় করা হয়েছে।” সোভিয়েত-পরবর্তী যুগের বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যে প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়, এই ঘোষণা তারই ইঙ্গিত ছিল।[63]
রাশিয়ার জন্য এই পরিস্থিতি ছিল এক বিপর্যয়কর ভাঙন। দেশটি দুই মিলিয়নেরও বেশি বর্গমাইল ভূখণ্ড হারায়, পূর্ব ইউরোপের উপগ্রহ রাষ্ট্রগুলো ন্যাটোর দিকে ঝুঁকে পড়ে, এবং ইউক্রেন ও জর্জিয়ার মতো সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির ওপরেও তার প্রভাব কমে যায়।[64] পরে ভ্লাদিমির পুতিন এই ঘটনাকে “একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়” বলে উল্লেখ করেন।[65] মস্কো যে নিজেকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পর্যবসিত করে দেওয়া মেনে নিতে প্রস্তুত নয়, তা তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র-চিন-রাশিয়া কৌশলগত ত্রিভুজের মধ্যে এই পতনের ফলে রাশিয়া কিছুটা প্রান্তিক অবস্থায় চলে যায়। বৈশ্বিক নেতৃত্ব তখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়, আর চিন তখনও মূলত একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি। তবে রাশিয়ার এই ভূখণ্ডগত ক্ষতি— এবং বিশেষ করে ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ[66]— পরবর্তীতে রাশিয়ার পুনরুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে। এর পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ঘেরাও নীতি মোকাবিলা করার তাগিদ এবং একই সঙ্গে চিনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা।
রাশিয়ার আঞ্চলিক শক্তিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে প্রত্যাখ্যান করার পেছনে কৌশলগত ত্রিভুজের গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল এবং ন্যাটো ও ইইউ সম্প্রসারণের নেতৃত্ব দিয়েছিল— যার ফলে ২০০৭ সালের মধ্যে লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া-সহ আরও কয়েকটি দেশ এই জোটগুলির অন্তর্ভুক্ত হয়।[67] এর ফলে এই দুই জোটই কার্যত রাশিয়ার ঘাড়ের কাছে চলে আসে। মার্কিন কূটনীতিক জর্জ এফ কেনান ন্যাটোর এই সম্প্রসারণকে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন নীতির “সবচেয়ে গুরুতর ভুল” বলে উল্লেখ করেছিলেন।[68] কারণ রাশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতায় আর্কটিক ও প্রশান্ত মহাসাগর ছাড়া প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী প্রাকৃতিক সীমান্তের অভাব থাকায় এই সম্প্রসারণ তার নিরাপত্তা-উদ্বেগকে আবারও জাগিয়ে তোলে।[69] যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন এই অগ্রযাত্রা রাশিয়ার চিরাচরিত ‘বাফার জোন’ বা নিরাপত্তা বলয়কে সঙ্কুচিত করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক সম্প্রসারণবাদী নীতি গ্রহণ করে— যার উদাহরণ ক্রিমিয়া সংযুক্তিকরণ এবং আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওশেশিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার।
কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে দাঁড় করায়। একই সময়ে চিন তুলনামূলকভাবে নীরব ও শান্তিপূর্ণভাবে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়েই নিজের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়।
রাশিয়ার পুনরুত্থান অনেকটাই নির্ভর করছে এই ত্রিমুখী শক্তি-সমীকরণকে কীভাবে পরিচালনা করা যায় তার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক বিস্তার বা চিনের অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে না পারলেও মস্কো তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক নিরাপত্তা-উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ন্যাটোর ক্রমবর্ধমান নৈকট্য— বিশেষ করে ইউক্রেনকে সামিল করার সম্ভাবনা— রাশিয়ার মূল নিরাপত্তাস্বার্থের প্রতি সরাসরি হুমকি, যার ফলে মস্কো কৌশলগতভাবে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করছে।[70] তবে এই পরিস্থিতি রাশিয়াকে চিনের আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছে। চিনের অর্থনৈতিক উদ্যোগ— বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ— পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে রাশিয়াকে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ভরসা জোগাচ্ছে।[71] প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, যা ক্রমশ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-প্রাধান্যের বিরুদ্ধে রাশিয়া ও চিনের অবস্থান প্রায় অভিন্ন। তবে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রেক্ষিতে এক্ষেত্রেও রাশিয়ার অবস্থান তুলনামূলকভাবে একটি জুনিয়র পার্টনারের।
ফলে কৌশলগত ত্রিভুজের ভারসাম্য নতুনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে— সুপারপাওয়ার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য নয়, বরং এক ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে। অর্থাৎ, আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনাকে বিঘ্নিত করা এবং একই সঙ্গে চিনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করে নিজের আপেক্ষিক পতনের প্রভাবকে সামাল দেওয়াই মস্কোর মূল লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
৪.১. পুতিনের রাশিয়া: কৌশলগত ত্রিভুজে সংশোধনমূলক নীতি
রাশিয়ার বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য— যা ১৯৯৭ সালে বরিস ইয়েলৎসিন তুলে ধরেছিলেন এবং ২০০০ সাল থেকে ভ্লাদিমির পুতিন আরও জোরদার করে তোলেন— মূলত শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করার প্রতিফলন।[72] প্রথমদিকে পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেছিলেন। বিশেষত ৯/১১-র পরে মধ্য এশিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেন,[73] যা একটি সম্ভাব্য কৌশলগত সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু এই সমঝোতা ভেঙে যায় ইরাক যুদ্ধের সময়, যখন রাশিয়া ফ্রান্স ও জার্মানির সঙ্গে মিলে এর বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে জর্জিয়া (২০০৩), ইউক্রেন (২০০৪) এবং কিরগিজস্তান (২০০৫)-এর তথাকথিত “রঙিন বিপ্লব” পুতিনের কাছে রাশিয়ার প্রভাববলয়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাসন পরিবর্তনের প্রচেষ্টা বলে মনে হয়।[74]
যুক্তরাষ্ট্র-চিন-রাশিয়া কৌশলগত ত্রিভুজের ভেতরে এই পরিস্থিতি রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। মস্কো সরাসরি মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার পথে হাঁটে এবং একই সঙ্গে চিনকে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই প্রবণতা অনেকটাই শীতল যুদ্ধের সময়কার ত্রিমুখী শক্তি-সমীকরণের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র-চিন ঘনিষ্ঠতা সোভিয়েত ইউনিয়নকে কৌশলগতভাবে চাপে ফেলেছিল। তবে বর্তমান বাস্তবতায় রাশিয়া উল্টোভাবে চিনের দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য মোকাবিলা করার জন্য। এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা স্পষ্ট হয়— আন্তর্জাতিক জোট প্রায়ই আদর্শগত মিলের চেয়ে ক্ষমতার শূন্যতা বা শক্তির ভারসাম্যের ভিত্তিতেই পরিবর্তিত হয়।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ— উভয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া প্রায়ই পশ্চিমবিরোধী সরকারগুলিকে সমর্থন করে, আর ইউরোপে তার অবস্থান ন্যাটোর জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৭ সালে মিউনিখে পুতিনের ভাষণ এই অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, যেখানে তিনি মার্কিন একতরফা নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।[75] এর মাধ্যমে রাশিয়ার এক নতুন, সংঘাতমুখী পুনরুত্থানের সূচনা হয়— যেখানে বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে মস্কো পশ্চিমি ঐক্যকে ভাঙার চেষ্টা করছে এবং একই সঙ্গে নিজের মহাশক্তির মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চাইছে।[76]
২০০৮ সালের রুশ–জর্জিয়া যুদ্ধ এই কৌশলের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধটির ইন্ধন ন্যাটোর জর্জিয়া ও ইউক্রেনকে ভবিষ্যতে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি।[77] এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া সামরিক অভিযান শুরু করে এবং দক্ষিণ ওশেশিয়া ও আবখাজিয়া-কে সমর্থন দেয়। এর মাধ্যমে কার্যত ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ থামিয়ে দিয়ে রাশিয়া কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।[78] এই পদক্ষেপ যত না ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্যে, তার চেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বার্তা দেওয়ার জন্য যে, রাশিয়ার নিকটবর্তী প্রভাববলয়ে হস্তক্ষেপের যে-কোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে মস্কো ভেটো দেবে। এই ঘটনা ওবামার ‘রিসেট’ নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক উন্নত করার প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দেয়।[79]
কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে চিন এখানে নীরবে সুবিধা পেয়ে যায়। মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির দিকে থাকায় মধ্য এশিয়ায় চিন অর্থনৈতিকভাবে আরও গভীর প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পায়।
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ ভারসাম্যে আরও বদল আনে। ২০১১ সাল থেকে রাশিয়া আসাদ সরকারকে বিমান শক্তি ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে সহায়তা করে আসছে।[80] এর ফলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তনের প্রচেষ্টা— যা মূলত কার্টার ডকট্রিনের তেল ও নিরাপত্তা-সম্পর্কিত কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত ছিল— ব্যর্থ হয়ে যায়।[81] এই হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং একই সঙ্গে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার প্রতি চিনের আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। অন্যদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অতিরিক্ত বিস্তারের সীমাবদ্ধতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ইউক্রেন সংকট— ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া-সংযুক্তি এবং ২০২২ সালের যুদ্ধ— রাশিয়ার সংশোধনমূলক কৌশলকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইউক্রেনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান রাশিয়ার ইউরেশীয় কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ ইউক্রেনকে প্রভাবের বাইরে হারালে মস্কো কার্যত একটি এশীয় শক্তিতে পরিণত হবে।[82] ক্রিমিয়া দখল, ইউক্রেনকে দুর্বল করা এবং তার ন্যাটোতে যোগদানের পথ বন্ধ করার মাধ্যমে রাশিয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমি জোটকেই চ্যালেঞ্জ জানায়নি, বরং আধুনিক অসম যুদ্ধকৌশল— সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং তথ্যযুদ্ধ— যুদ্ধের চিরাচরিত পদ্ধতিগুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবহারের সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে।[83]
এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ। ইউরোপমুখী গ্যাস পাইপলাইনগুলোর মাধ্যমে মস্কো জ্বালানিকে রাজনৈতিক প্রভাবের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং কৌশলগত ত্রিভুজের ভেতরে রাশিয়ার দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।[84]
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সংযুক্তি, ইউক্রেনে বিদ্রোহীদের সমর্থন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের সংঘাত— এই ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলো দেখায় যে রাশিয়া সোভিয়েত-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে চায়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং একই সঙ্গে এটি এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে যা অনেকাংশে চিনের সেই লক্ষ্য— যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক নিয়ম ও কাঠামোকে দুর্বল করা— তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও সিরিয়াতে সামরিক উপস্থিতি এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রক্সি কার্যক্রমের মাধ্যমে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই পদক্ষেপগুলি মূলত একটি বৃহত্তর লক্ষ্যপূরণের অংশ— অর্থনৈতিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বা চিনের সমতুল্য না হয়েও সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে ব্যাঘাতমূলক কৌশল ব্যবহার করে পুনরায় একটি মহাশক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা।[85]
এর পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং উত্তর সমুদ্রপথ-এর ওপর দাবি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাশিয়ার পুনরুত্থান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই পদক্ষেপের ফলে সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোক পয়েন্ট’-গুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়, যা একই সঙ্গে চিন ও যুক্তরাষ্ট্র— উভয়ের কৌশলগত হিসাবনিকাশকেই প্রভাবিত করে।[86]
রাশিয়ার এই ভূমিকা আরও জটিল হয়ে ওঠে তার ভ্রান্ত তথ্য প্রচারের কৌশলের কারণে— যেমন বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ— যা পশ্চিমি জোটের ঐক্যকে দুর্বল করে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হতে হয়, আর সেই প্রতিক্রিয়া অনেক সময় পরোক্ষভাবে চিনের সুবিধা করে দেয়, কারণ এতে আমেরিকার মনোযোগ চিনের বদলে অন্যদিকে সরে যায়। কৌশলগত ত্রিভুজে এর ফলাফল হল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও অনেকটা শীতল যুদ্ধের সময়কার উত্তেজনার মতো পর্যায়ে পৌঁছানো। এর ফলে ওয়াশিংটনকে ন্যাটোকে আরও শক্তিশালী করতে এবং চিনের প্রশান্ত মহাসাগরীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নির্ধারিত কিছু সম্পদ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে হয়।
চিন এই পরিস্থিতি কৌশলগতভাবে কাজে লাগায়। BRI-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে মস্কোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে রাশিয়ার পদক্ষেপগুলোকে নীরবে সমর্থন করে।
রুশ সংশোধনমূলক নীতি কৌশলগত ত্রিভুজের ভারসাম্যকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছে। জর্জিয়া, ইউক্রেন এবং ককেশাস অঞ্চলে ন্যাটোর সম্প্রসারণ কার্যত থামিয়ে দিয়ে এবং সিরিয়াতে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে একটি স্পয়লার শক্তি হিসেবে নিজেদের পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।[87] এই অবস্থান চিনের বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ওপর রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা তার স্বায়ত্তশাসনকে সীমিত করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে শীতল যুদ্ধের সময়কার মতো চিন-রাশিয়ার পারস্পরিক মতভেদকে কাজে লাগিয়ে “ত্রিভুজ কৌশল” চালানো আর ততটা সহজ হচ্ছে না। ওয়াশিংটন এখন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ নীতির দিকে বেশি ঝুঁকছে।
রাশিয়ার পুনরুত্থান এই ত্রিভুজকে এক ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ ভারসাম্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে— যেখানে মস্কোর সামরিক দৃঢ়তা তার অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কিছুটা পুষিয়ে দিচ্ছে, একই সঙ্গে চিনের উত্থানকে আরও শক্তি জোগাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।

৫. কৌশলগত ত্রিভুজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
২০১২ সালে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। ১৯৭২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-চিনের যে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় ছিল, তা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে।[88] প্রাথমিকভাবে দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে স্থিতিশীল ছিল— যেমন যুক্তরাষ্ট্রের “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ”-এ চিনের সমর্থন এবং শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যৌথ বিরূপ মনোভাব। কিন্তু ওবামা, ট্রাম্প এবং বাইডেনের আমলে চিনের দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে।
কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে প্রতিরোধমূলক নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং চিনকে একটি পদ্ধতিগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করে।[89] ওবামা প্রশাসনের Pivot to Asia নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীর প্রায় ৬০ শতাংশ শক্তি এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করে। ২০২৪ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭৩টি ঘাঁটি ও ২৮,৫০০ সৈন্য, জাপানে ১২০টি ঘাঁটি ও ৫৩,৭১৩ সৈন্য এবং গুয়ামে ৫৩টি ঘাঁটি ও ৬,১৪০ সৈন্য মোতায়েন করা হয়[90] এবং চিনের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সরবরাহপথগুলিকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলতে মিত্র জোটগুলোকে আরও শক্তিশালী করা হয়।[91]
ট্রাম্প প্রশাসন এই আক্রমণ আরও তীব্র করে তোলে। চিনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে একটি ব্যাপক বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করা হয়[92] এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তা নীতি’তে চিন ও রাশিয়া— উভয়কেই যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।[93] এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য হল চিনের অর্থনৈতিক প্রভাবকে সীমিত করা— যা ত্রিমুখী শক্তি-সমীকরণে তার প্রভাবের মূল ভিত্তি। তবে একই সঙ্গে রাশিয়ার পুনরুত্থান এই ভারসাম্য রক্ষার কাজকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তার সঙ্গে, বাইডেন প্রশাসন এই দ্বি-মুখী কৌশলকে আরও তীব্র করে। ২০২২ সালের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি-তে ঘোষণা করা হল শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুগ শেষ, এবং চিনকে একমাত্র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হল, যে তার অর্থনৈতিক, সামরিক এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতা দিয়ে উদার বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার সক্ষমতা এবং ইচ্ছা রাখে।[94] ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ওবামার এশিয়া-পুনর্বিন্যাস নীতিকে বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র চিনের উত্থান নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে থাকে এবং বেইজিংয়ের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রতিহত করতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে থাকে।
কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-চিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি প্রধান অক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে রাশিয়ার ভূমিকা গৌণ হলেও কিছুটা অস্থির। চিন এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে BRI-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি মঞ্চে সম্পদ ভাগ করে নিতে বাধ্য করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে চিনের দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, নিজের অর্থনৈতিক ও জোটভিত্তিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রাধান্য বজায় রাখার চেষ্টা করে, এবং রাশিয়ার সামরিক দৃঢ়তাকে তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি এবং কম স্থায়ী চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরে নেয়।[95]
ইউরোপীয় ফ্রন্টে, রাশিয়ার ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার কার্যক্রমকে ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতা এবং ন্যাটোর ঐক্য— উভয় দিকেই প্রত্যক্ষ আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করে এবং বলে, এটা সোভিয়েত যুগের নীতির পুনরাবৃত্তি, যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল জোটে ফাটল ধরানো।[96] রাশিয়ার এই যুদ্ধকে “কৌশলগত ব্যর্থতা”য় পর্যবসিত করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে শক্তিশালী করে, ইউরোপকে তার “মৌলিক অংশীদার” হিসেবে চিহ্নিত করে, ট্রান্স-আটলান্টিক নিরাপত্তা বাড়াতে থাকে এবং মিত্রদের কাছে সামরিক বাড়াতে আবেদন করে।[97]
কৌশলগত ত্রিভুজের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রুশ সংশোধনমূলক নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া, যা ইউক্রেন, জর্জিয়া এবং সিরিয়া-র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন উদার বিশ্বব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করতে চায়। কিন্তু চিনের সঙ্গে রাশিয়ার সমন্বয় প্রতিরোধকে জটিল করে তোলে: ইউরোপে রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি এশিয়ার দিক থেকে সরিয়ে দেয়, যা পরোক্ষভাবে বেইজিংয়ের কৌশলগত পদক্ষেপগুলোকে সহায়তা করে। যার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরীয় জোট অকাস এবং কোয়াড-কেও রক্ষা করতে থাকে। এই সবই দেখিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিভুজীয় কৌশল এখন চাপের মধ্যে আছে। শীতল যুদ্ধের মতো সহজে চিন-রাশিয়ার মতভেদকে কাজে লাগানো সম্ভব তো হচ্ছেই না; বরং এখন একটি একীভূত চিনা-রুশ ফ্রন্টের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই ত্রিভুজে দ্বি-মুখী প্রতিরোধমূলক কৌশল নিয়েছে— অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে চিনের উত্থান আটকাতে চেষ্টা করছে এবং রাশিয়ার আঞ্চলিক আগ্রাসনকে দমন করতে চাইছে।
ত্রিভুজের ভারসাম্য এখন ঝুঁকছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং রাশিয়ার পুনরুত্থানের সঙ্গে তাল মেলাতে যথেষ্ট নয়। বহু-মেরু প্রতিযোগিতায় আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্যের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা স্পষ্ট হচ্ছে।
৫.১. কৌশলগত ত্রিভুজে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২২ সালের National Security Strategy (NSS) একটি দ্বি-মুখী প্রতিরোধমূলক কাঠামো উপস্থাপন করেছে, যার লক্ষ্য হল রাশিয়াকে প্রতিযোগিতায় হারানো এবং চিনের উত্থান সীমিত করা। এটি চিন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র ত্রিভুজের মধ্যে একটি কৌশলগত পিভটের প্রতিফলন।[98] এই কৌশল তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর নির্ভরশীল করে, যার প্রত্যেকটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে প্রভাবের পুনর্বিন্যাস ঘটায়।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র জোটগুলিকে শক্তিশালী করছে। গণতান্ত্রিক মিত্রদের জোট— যেমন ন্যাটো, জি-৭, কোয়াড, অকাস; নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে সমর্থনকারী অ-গণতান্ত্রিক অংশীদারদের জোট— যেমন, ফিলিপাইনস, ভিয়েতনাম; এবং IMF ও বিশ্বব্যাঙ্কের মতো সুপারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে সমন্বিত করছে।[99] কৌশলগত ত্রিভুজের প্রেক্ষাপটে এই কৌশল চিনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণকে— যেমন BRI-এর মতো উদ্যোগ— প্রতিরোধ করবে এবং রাশিয়ার ইউরোপীয় আগ্রাসনকে এমনভাবে বেষ্টন করবে যেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য জোটভিত্তিক প্রভাবের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় চিন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করছে এবং সেই জোটের সংহতি পরীক্ষা করছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়া ও ইউরোপ উভয়ের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
দ্বিতীয় স্তম্ভ মূলত অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে চিনের সঙ্গে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটি আধুনিক শিল্পনীতির সাহায্যে নিজের পতনের চাকা ঘোরানোর চেষ্টা করছে। অবকাঠামো, STEM শিক্ষা এবং বায়োটেক, সেমিকন্ডাক্টর, এবং সাসটেইনেবল এনার্জির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়েছে— যার লক্ষ্য প্রযুক্তিক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করা।[100] উন্নত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগে নজরদারি এবং কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে বাধা দিচ্ছে, যার ফলে একটি “অর্থনৈতিক যুদ্ধ” তীব্র হয়ে উঠেছে। এর ফলে ত্রিভুজে চিনের মূল শক্তির জায়গা— তার অর্থনৈতিক প্রাধান্য— হ্রাস পাচ্ছে, যেখানে রাশিয়া, যে এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ মস্কোর সামরিক প্ররোচনাগুলো থেকে সরে যাওয়ায় পরোক্ষভাবে সুবিধা পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত হুমকি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র চিনের ওপরেই জোর দিচ্ছে, বাজি ধরছে যে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ফলে বেইজিং-এর রাশিয়ার পুনরুত্থান সমর্থন করার ক্ষমতা সীমিত হবে।
তৃতীয় স্তম্ভটি হল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা ক্ষমতাকে আধুনিকীকরণ করে উভয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতিহত করা।[101] সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ প্রতিরক্ষাকর্মী বাহিনীতে বিনিয়োগ এই প্রতিরোধ-ক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে, বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের নৌসামরিক উত্থানের বিরুদ্ধে এবং ইউরোপে রাশিয়ার আঞ্চলিক আগ্রাসনের মোকাবিলায়। মধ্যপ্রাচ্যে অতীতের অতিরিক্ত সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে সেখান থেকে কৌশলগতভাবে পেছনে সরে আসা যুক্তরাষ্ট্রকে চিনের উত্থান মোকাবিলায় সম্পদ পুনর্বণ্টনের সুযোগ দিচ্ছে, যা NSS-এর প্রধান অগ্রাধিকার।[102] ত্রিভুজের প্রেক্ষিতে এই স্থানান্তর চিনের সামরিক আধুনিকীকরণের উপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে বেইজিংকে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ থেকে সম্পদ সরিয়ে সামরিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। একই সময়ে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের এই স্থানান্তর ব্যবহার করে সিরিয়ার মতো ফাঁকা জায়গায় প্রভাব বিস্তার করছে।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির মাধ্যমে এতদিন তার প্রাধান্য বজায় রাখলেও, বর্তমানে এর বিস্তৃত মনোযোগ চিন ও রাশিয়ার সম্মিলিত চাপের কাছে দুর্বলতারই প্রকাশ।
ওবামার পিভট, ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত শুল্ক নীতি, এবং বাইডেনের সুশৃঙ্খল প্রতিরোধ— পর পর জমানায় এই পদক্ষেপগুলি ত্রিভুজে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।[103] এই তীব্রতা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি চিন-রুশ ব্লকের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে চিনের অর্থনৈতিক শক্তি এবং রাশিয়ার সামরিক পুনরুত্থান আমেরিকার প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। শীতল যুদ্ধের সময়কার ত্রিকোণীয় কৌশল— সিনো-রাশিয়ান ফাটল ব্যবহার করে প্রাধান্য নিশ্চিত করা— এবার পুনরায় কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না; এর বদলে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতের পথে যেতে হচ্ছে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করছে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র চিন-সোভিয়েত বিভাজনের সুযোগ নিয়েছিল; বর্তমানে তার “দ্বিমুখী প্রতিরোধ” নীতি সেই জোটকেই শক্তিশালী করছে, যা মূল আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলের জন্যই হুমকি হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। যেমন দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার চাপের নিচে ন্যাটোর দমবন্ধ হওয়ায় এবং এশিয়ায় চিনের উত্থানের মুখে সেখানকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ায়।
স্পষ্ট শিক্ষা হল: যখন কোয়াড এবং অকাস-এর মতো মিত্ররা ব্যর্থ হয়, তখন অতিরিক্ত দাপট প্রতিকূল জোট তৈরি করে এবং হেজিমনিক নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে। স্পষ্ট চিনা-রুশ প্রভাব এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এখন ত্রিভুজকে বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু চিনের শক্তি যত বাড়বে এবং রাশিয়া যত দুর্বলতার সুযোগ নেবে, এই দ্বি-মুখী প্রতিরোধ নীতির সামনে অতিরিক্ত বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা আমেরিকার নেতৃত্বের সক্ষমতাকে এক বহু-মেরুকরণযুক্ত পরিবর্তনের পরীক্ষায় ফেলবে।
ত্রিভুজের ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, চিন রাশিয়ার ব্যাঘাতগুলোকে ব্যবহার করছে, এবং রাশিয়া চিনের অর্থনৈতিক ওজনের ওপর নির্ভর করছে। একটি বহুমেরু প্রতিযোগিতায় আমেরিকার সংকল্পের সীমা পরীক্ষিত হচ্ছে।

৬. উপসংহার: কৌশলগত ত্রিভুজ ও ত্রিমুখী আন্তঃনির্ভরতা
কৌশলগত ত্রিভুজ তত্ত্ব আজও চিন, রাশিয়া, এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার সমসাময়িক গতিবিধি বিশ্লেষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে প্রযোজ্য। মহাশক্তিগুলোর আচরণ শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দ্বারা নয়, বরং একটা ত্রিমুখী কাঠামোর মধ্যে তাদের আন্তঃনির্ভরতার মাধ্যমেও যে প্রভাবিত হয়, এই তত্ত্ব তা দেখায়।
এই প্রেক্ষাপটে, চিনের উত্থান কৌশলগত ত্রিভুজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হিসেবে বিবেচ্য, যা অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক অগ্রগতি, এবং কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সমন্বিত বিস্তৃত কৌশলের মাধ্যমে ত্রিভুজের ভারসাম্য গভীরভাবে পরিবর্তন করছে। কৌশলগত ত্রিভুজে চিনের উত্থান একটি বাঁক হিসেবে কাজ করছে, রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে আরও কাছে নিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করছে। এটি তত্ত্বের মূল নীতি— ত্রিমুখী আন্তঃনির্ভরতারই দৃষ্টান্ত।
রাশিয়ার পুনরুজ্জীবন এটিকে কৌশলগত ত্রিভুজে একটি “সুইং স্টেট” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে তারা চিনের উত্থান এবং আমেরিকার প্রাধান্যের মধ্যে সংঘর্ষের সুযোগ নিয়ে নিজের শক্তি ও প্রভাব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করছে। সামরিক ক্ষমতা, শক্তি সম্পদ, এবং ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ নেওয়ার ওপর রাশিয়ার কৌশল দাঁড়িয়ে আছে, এবং এগুলি দিয়েই তারা অন্য দুই শক্তিশালী মেরুর মধ্যে ফাঁক তৈরি করছে। শক্তি চুক্তি ও যৌথ সামরিক মহড়ার মাধ্যমে রাশিয়া চিনের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করছে, চিনের উত্থানকে ব্যবহার করে আমেরিকার চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, এবং একই সময়ে নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাধীনতা বজায় রাখছে। কীভাবে ত্রিভুজের অন্য দুটি মেরুর ওপর নির্ভর করে রাশিয়া তার পুনর্জীবন কার্যক্রম চালাচ্ছে তা একটা উদাহরণস্বরূপ— চিনের বাড়তি প্রভাবের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অর্থনৈতিক সহায়তা লাভ করছে, এবং আমেরিকার প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করে তাকে নিয়ন্ত্রণ-কৌশল নিতে বাধ্য করছে। যদিও তাদের সীমিত অর্থনৈতিক শক্তির কারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারে সীমাবদ্ধতা আছে, তবুও তাদের সুইং অবস্থানটিই তাদের গুরুত্ব নিশ্চিত করছে। কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের সংঘর্ষকে ব্যবহার করে নিজেদের শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে এবং সুযোগসন্ধানীর মতো কৌশলগত ত্রিভুজের গতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রমের একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার মাধ্যমে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কৌশলগত ত্রিভুজের “অ্যাঙ্কর” হিসেবে কাজ করছে, চিনের উত্থান এবং রাশিয়ার পুনরুজ্জীবনের বিরুদ্ধে তার বৈশ্বিক অবস্থান রক্ষা করার চেষ্টা করছে। চিনের আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষাগুলোকে বাধা দিচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মোতায়েন— যেমন নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ, কোয়াড, অকাস; আর রাশিয়ার আঞ্চলিক আগ্রাসনকে মোকাবিলা করা হচ্ছে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে জোরদার বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে। দুই মঞ্চেই শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার প্ররোচনা এবং চিনের সামুদ্রিক অগ্রগতির কারণে সৃষ্ট পরিবর্তিত গতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। চিনের প্রযুক্তিগত উত্থান এবং রাশিয়ার শক্তিশালী শক্তি-ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ায়, চিনের ওপর বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা (যেমন CHIPS Act এবং শুল্ক) চাপিয়ে এবং ইউক্রেনের পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে তাদের ক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই অ্যাঙ্করকে আরও শক্তিশালী করতে ন্যাটো সদস্যদেশগুলি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের সঙ্গে জোট গঠন করা হচ্ছে যা চিনা-রুশ অক্ষকে ঘিরে থাকবে। এর সঙ্গে, ত্রিভুজের অ-গতিশীল চ্যালেঞ্জের সঙ্গে খাপ খাইয়ে, যুক্তরাষ্ট্র হাইব্রিড প্রতিরক্ষা এবং নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার অগ্রগতি ঘটিয়ে চিনের সফট পাওয়ার ও রাশিয়ার বিভ্রান্তিকর প্রচারের মোকাবিলা করতে চাইছে। এলএনজি ও শেল বিক্রির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি-স্বাধীনতা সরাসরি রাশিয়ার ইউরোপে প্রভাব কমায়, এবং চিনের সম্পদ-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে বন্ধুদেরও সহায়তা করে। চিনের নাটকীয় উত্থান, যা ‘পিভট টু এশিয়া’কে প্ররোচিত করেছে, এবং রাশিয়ার পুনরুজ্জীবন, যা নিয়ন্ত্রণ-এর প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে, এই প্রতিক্রিয়াগুলিকে ত্রিভুজের মধ্যে প্রভাবিত করে, যেগুলিও পারস্পরিক আন্তঃনির্ভরতার উদাহরণ।
কৌশলগত ত্রিভুজ তত্ত্ব অনুযায়ী, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, সুযোগগুলি কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার পুনরুজ্জীবন, এবং পরিবর্তনকে প্ররোচিত করতে চিনের উত্থান— এই সবই অন্যদের কার্যকলাপের ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়ার আর্কটিক কৌশল এবং প্রক্সি কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া জাগায়, যা চিনের ইন্দো-প্যাসিফিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রভাবিত করে; একইভাবে, চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং সামরিক সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ-কৌশলকে উদ্দীপিত করে, যা রাশিয়ার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। চিনা-রুশ জোট তাদের শক্তি বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে ত্রিভুজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হতে হয়।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার এবং বর্তমান সময়ের ত্রিভুজের তুলনা করলে দেখা যায় যে, আগে যা সহজে ব্যবহারযোগ্য বিভাজন ছিল, এখন তা শক্তিশালী সমন্বয়ে পরিণত হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ কৌশল আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে স্থিতিশীল করার পরিবর্তে দুর্বল করে, এবং হেজিমনির পরিবর্তে বহুমেরু বিশ্ব বিকশিত হয়— যা ইউরোপীয় নিরাপত্তার পুনর্গঠন এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের ভাঙন দ্বারা প্রমাণিত। কিসিঞ্জারের দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, স্থায়ী ভারসাম্য বলে থাকবে না; রাশিয়ার প্রত্যাবর্তন তার কেন্দ্রীয় অবস্থান বজায় রাখবে, চিনের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, এবং যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত প্রসারিত হলে আসলে দুর্বল হয়ে পড়বে।

[1] Lovelace 2016: 5.
[2] Knutsen 2020.
[3] Gheorghe 2022.
[4] Miles 2024.
[5] Brooks and Wohlforth 2023.
[6] Lovelace 2016: 8.
[7] Zhang 2023.
[8] Brooks and Wohlforth 2023.
[9] Auslin 2020.
[10] IMF 2024.
[11] Bradsher 2025.
[12] Kastner and Pearson 2021.
[13] Smura 2024.
[14] Brooks and Wohlforth 2023.
[15] Kristensen et al. 2024.
[16] Charalambides 2022.
[17] Herd 2010.
[18] Herd 2022.
[19] Kissinger 2011.
[20] Dittmer 1981.
[21] Wohlforth 2014.
[22] Mearsheimer 2019.
[23] Trenin 2016.
[24] Lampton 2019.
[25] Allison 2017.
[26] Kissinger 2011.
[27] Lo 2015.
[28] Economy 2018.
[29] Campbell and Ratner 2018.
[30] Kaplan 2013.
[31] Rolland 2017.
[32] Kissinger 2011.
[33] Ikenberry 2018.
[34] Roper 2024.
[35] Chan et al. 2020.
[36] Boden 2012.
[37] Jinping 2022.
[38] IMF 2024.
[39] Kissinger 2012.
[40] Hart and Spero 2010.
[41] Hart and Spero 2010.
[42] পূর্বোক্ত।
[43] Keo 2020.
[44] Kissinger 2012.
[45] Yaqub, Ali, and Kumar 2024.
[46] Saeed and Yaqub 2023.
[47] Tan 2021.
[48] IMF 2024.
[49] Kissinger 2012.
[50] IMF 2024.
[51] Kastner and Pearson 2021.
[52] World Bank 2024.
[53] Auslin 2020.
[54] Wolf 2020.
[55] SIPRI 2024.
[56] Yaqub, Ali, et al. 2024.
[57] Yaqub, Ali, and Kumar 2024.
[58] পূর্বোক্ত।
[59] Yaqub, Ali, and Kumar 2024.
[60] Ding 2018.
[61] Xing 2018.
[62] Kotkin 2016.
[63] Lukyanov 2016.
[64] Kotkin 2016.
[65] Davidzon 2022.
[66] Yaqub and Ali 2024.
[67] Scicluna and Auer 2023.
[68] Lane 1997.
[69] Kaplan 2013.
[70] Marten 2020.
[71] Yaqub 2024.
[72] Donaldson and Nadkarni 2023.
[73] O’loughlin et al. 2004.
[74] Lucas 2014.
[75] Putin 2007.
[76] Herd 2022.
[77] Donaldson and Nadkarni 2023.
[78] Charalambides 2022.
[79] Legvold 2014.
[80] Maher and Pieper 2021.
[81] Woodward 2007.
[82] Brzezinski 2016.
[83] Pisciotta 2023.
[84] Katusa 2014.
[85] Herd 2022.
[86] পূর্বোক্ত।
[87] Idrees and Yaqub 2024.
[88] Khoo 2020.
[89] Yaqub, Ali, and Kumar 2024.
[90] Reuters 2024.
[91] Scappatura 2014.
[92] OECD 2019.
[93] Trump 2017.
[94] Biden 2022.
[95] পূর্বোক্ত।
[96] পূর্বোক্ত।
[97] পূর্বোক্ত।
[98] Yaqub, Ali, and Kumar 2024.
[99] Callinicos 2021.
[100] Biden 2022.
[101] পূর্বোক্ত।
[102] পূর্বোক্ত।
[103] Callinicos 2021.

*নিবন্ধটি TRAMES, 2025, 29(79/74), 3, 239–257-এ ইংরেজিতে প্রকাশিত

