শুভব্রত সরকার
এই সংশোধনী কোনও সুরক্ষামূলক আইন নয়; মানসিক ও দৈহিক স্বায়ত্তশাসন পদ্ধতিগতভাবে কেড়ে নিয়ে, শরীরকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নজরদারির আওতায় এনে, ভারতীয় রাষ্ট্রের তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের উপর নিজের পরম ও সার্বভৌম মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার একটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি প্রয়োগের উন্নত কাঠামো গঠনের উদ্যোগ
মানবদেহ কেবল রক্ত-মাংসের শরীর নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক পরিসর, যেখানে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। ২০২৬-এর মার্চ মাসে, ভারতীয় সংসদ এই তাত্ত্বিক বিমূর্ত ধারণাকে এক রূঢ় আইনি বাস্তবে পরিণত করেছে। রূপান্তরকামী ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল, ২০২৬ (Transgender Persons (Protection of Rights) Amendment Bill, 2026) গ্রহণ করার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার রূপান্তরকামী নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিটিই আমূল বদলে ফেলার ঘোষণা করেছে।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট উপেক্ষা করে লোকসভা ও রাজ্যসভায় ধ্বনিভোটের দ্বারা তাড়াহুড়ো করে বিলটি পাশ করানো হয়। এর ফলে গত এক দশকে তিল তিল করে গড়ে ওঠা অধিকারভিত্তিক কাঠামোটি বাতিল হয়ে যায়। এই আইনে স্ব-উপলব্ধ লিঙ্গ পরিচয়ের নীতিকে সম্পূর্ণরূপে খারিজ করা হয়েছে। অস্পষ্টতা দূর করা এবং তথাকথিত ‘প্রকৃত’ ও যাচাইযোগ্য জৈবিক অসুস্থতায় ভুগছেন এমন মানুষদের কাছে কল্যাণমূলক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রশাসনিক অজুহাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া বলে দাবি করা হচ্ছে।
এটি নিছক কোনও আইনি পরিবর্তন বা পরিমার্জন নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক অধিকারের চরম সংকট। এই পরিবর্তনের বিশালতা উপলব্ধি করতে হলে এটিকে কেবল প্রশাসনিক নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমরা সঠিকভাবে বুঝতে পারব না, এক্ষেত্রে আমার মনে হয় ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েও বিশ্লেষণ অতি প্রয়োজন। ২০২৬-এর এই সংশোধনীটি হল জৈব-রাজনীতির একটি সুস্পষ্ট রূপ; চিকিৎসাবিজ্ঞানের একচেটিয়া অধিকারকে কাজে লাগিয়ে মানবজীবনকে বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে একটি প্রান্তিক সম্প্রদায়কে শ্রেণিবদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত এবং নজরদারির আওতায় আনার এক সুসংগঠিত প্রচেষ্টা।
নালসা (NALSA)-র মৃত্যু এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের নজরদারি
ভারতে রূপান্তরকামী অধিকারের আধুনিক ইতিহাসের ভিত্তি নিহিত রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী ২০১৪ সালের নালসা (NALSA) রায়ের মধ্যে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, লিঙ্গপরিচয় হল একজন ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ আত্ম-উপলব্ধি, যার জন্য কোনও জৈবিক প্রমাণ বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই। কারণ আদালত স্বীকার করেছিল যে, কারও ওপর চিকিৎসাগত বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া মানে তার শরীরের সার্বভৌমত্ব এবং মানবিক মর্যাদার ওপর হস্তক্ষেপ।
বর্তমানের সংশোধনীটি এই প্রগতিশীল রক্ষাকবচকে বাতিল করেছে। এটি স্ব-পরিচয় নির্ধারণের অধিকারকে অস্বীকার করে এবং তার বদলে রাষ্ট্র-আরোপিত কঠোর চিকিৎসা শংসাপত্রের ব্যবস্থা চালু করার কথা বলে। নতুন এই ব্যবস্থায়, কোনও রূপান্তরকামী ব্যক্তি আইনি স্বীকৃতি চাইলে তাঁকে জেলাশাসকের কাছে আবেদন করতে হবে। কিন্তু জেলাশাসক নিজে পরিচয়পত্র দিতে পারবেন না, তাঁকে নির্ভর করতে হবে চিফ মেডিকেল অফিসারের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র-নিযুক্ত একটি মেডিকেল বোর্ডের বিশেষ সুপারিশের ওপর।
ফুকো তাঁর দ্য বার্থ অফ দ্য ক্লিনিক গ্রন্থে এমন এক দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তনের কথা বলেছেন যেখানে চিকিৎসকের দৃষ্টি বা নজরদারি রোগীকে একটি খণ্ডিত বস্তু হিসেবে দেখে, যাকে বিশ্লেষণ, পরিমাণ নির্ধারণ এবং মেরামত করা যায়। বর্তমান বিলটির মাধ্যমে ঠিক এই ধরনের চিকিৎসাগত নজরদারিকেই ভারতীয় নাগরিকত্বের মধ্যে সুচারুভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে লিঙ্গপরিচয় আর কোনও ব্যক্তিগত সত্যের বিষয় থাকছে না; এটি এখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত একটি জৈবিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। অধিকারকর্মীরা এই মেডিকেল বোর্ডগুলোর ভয়াবহ চরমপন্থার কথা তুলে ধরেছেন। ১৯৮০-র দশকে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা ট্রান্স-নারী রেভা স্মরণ করেন, কীভাবে চিকিৎসকরা তাঁর রূপান্তরকামিতা নির্ধারণের জন্য জোরপূর্বক তাঁকে বিবস্ত্র করে তাঁর যৌনাঙ্গের স্পর্শকাতর অংশগুলো পরীক্ষা করত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “৩০-৪০ বছর আগে আমি যে যন্ত্রণা সহ্য করেছি… আমি চাই না নতুন প্রজন্মকে তার সম্মুখীন হতে হোক।” রাষ্ট্র চিকিৎসাবিজ্ঞানকে আইনি পরিচয় নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন নাগরিকদের এমন সব জৈবিক নমুনায় পরিণত করছে, যাঁদের বেঁচে থাকার জন্য ক্লিনিক্যাল বৈধতার প্রয়োজন।
রাজকতা এবং মুছে দেওয়ার নির্মাণকাঠামো
ফুকো-প্রবর্তিত রাজকতা বা ‘গভর্নমেন্টালিটি’ তত্ত্বটি সেই সমস্ত জটিল প্রতিষ্ঠান ও আমলাতন্ত্রের সমষ্টিকে বোঝায় যা রাষ্ট্রকে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত নিয়মের ধাঁচে পরিচালনা ও অধীনস্থ করতে সক্ষম করে। ২০১৯ সালের আইনের লিঙ্গ-তারল্যের সংজ্ঞাটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় শ্রেণিবদ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বর্তমানের বিলের প্রণেতারা নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর শ্রেণিবিন্যাসের এক বিশাল যন্ত্র তৈরি করেছেন। এই নতুন বিলটি শারীরবৃত্তীয়ভাবে নির্ধারিত শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে রূপান্তরকামী ব্যক্তির বিস্তৃত সংজ্ঞাকে আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস করে দেয়। এটি আইনি পরিচয়কে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক সম্প্রদায় (যেমন কিন্নর বা হিজড়া) এবং জন্মগত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত আন্তঃলিঙ্গ বৈচিত্র্য থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়। এই আইনের কঠোর ছাঁচে যারা খাপ খায় না, সেইসব ট্রান্স-পুরুষ, ট্রান্স-নারী এবং জেন্ডারক্যুইয়ার মানুষদের আইনি অস্তিত্বকে এটি সুকৌশলে মুছে ফেলে।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলে আইনটিতে বলা হয়েছে যে, স্ব-উপলব্ধ পরিচয়ের আর কোনও আইনি ভিত্তি থাকবে না। এই ক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্র গত সাত বছরে ইস্যু করা হাজার হাজার পরিচয়পত্র বাতিল করার একচ্ছত্র অধিকার পেয়ে যাবে। এই বাতিল হওয়ার হুমকি সমাজকে এক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে এবং জন্ম দেবে যা ফুকো বর্ণনা করেছেন ‘বাধ্য শরীর’ বা অনুগত সত্তা।
উপরন্তু, এই বিলে বলা হয়েছে যে লিঙ্গ-নিশ্চিতকরণ অস্ত্রোপচার পরিচালনাকারী হাসপাতালগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির কাছে তাদের রোগীদের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে। এটি রোগী এবং চিকিৎসকের মধ্যেকার গোপনীয়তাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয় এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রীয় নজরদারির এক সর্বগ্রাসী ব্যবস্থায় বা প্যানোপটিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।
শাস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ এবং আত্মীয়তা ও সম্পর্কের অপরাধীকরণ
এই বিলের একটি দিক হল এর শাস্তিমূলক ধারা। ধারা ১৮-তে বলা হয়েছে, কাউকে রূপান্তরকামী পরিচয়ে বাধ্য করতে বা ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করতে “অপহরণ বা গুরুতর আঘাত” করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
যদিও সরকার এটিকে মানবপাচার-বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, প্রান্তিক সম্প্রদায় এটিকে তাদের একটি ফাঁদ হিসেবেই দেখছে। যেসব ক্যুইয়ার তরুণ-তরুণী তাদের নির্যাতনকারী পরিবার থেকে পালিয়ে আসে, তারা প্রায়শই ভারতের ঐতিহ্যবাহী হিজড়া-আরাভানি জামাত বা এনজিও পরিচালিত প্রগতিশীল আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এক নতুন পরিচয়ের আত্মীয়তার সন্ধান পায়। বিলের দুর্বল খসড়া এই ধরনের আত্মীয়তা, প্রবীণ রূপান্তরকারী ব্যক্তি এবং এমনকি নানান প্রগতিশীল চিকিৎসকদেরও অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলবে, যাদের বিরুদ্ধে রূপান্তরকামী হওয়ার জন্য তরুণদের প্রলুব্ধ করার বা বাধ্য করার মিথ্যা অভিযোগ আনা হতে পারে। এটি ঔপনিবেশিক আমলের ১৮৭১ সালের ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট-এর জৈব-রাজনৈতিক যুক্তিরই প্রতিফলন, যা হিজড়া সম্প্রদায়কে রোগতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে জন্মগতভাবেই অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
একই সঙ্গে, ভারতের সাধারণ দণ্ডবিধি যৌন নিপীড়নের শিকার রূপান্তরকামীদের সামান্যই সুরক্ষা প্রদান করে। একজন রূপান্তরকামী ব্যক্তিকে যৌন নির্যাতনের সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র দুই বছর, যা একজন সিসজেন্ডার বা জন্মগত নারীর ধর্ষণের শাস্তির (ভারতীয় ন্যায়সংহিতা বা BNS অনুযায়ী ন্যূনতম দশ বছর) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই চরম আইনি বৈষম্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দেয়: একজন রূপান্তরকামীর শরীরের মূল্য অনেক কম।
সাংবিধানিক মর্যাদার অবলুপ্তি
বিলটির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, নানান প্রান্তে প্রতিবাদ, এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ট্রান্সজেন্ডার পারসনস (NCTP)-এর সদস্য ঋতুপর্ণা নিয়োগ ও কল্কি সুব্রহ্মণ্যমের পদত্যাগ; এসবই সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া অস্তিত্বের সংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। ১৪০ জনেরও বেশি আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞ রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে এই বিলে সম্মতি না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।
এই সংশোধনী কোনও সুরক্ষামূলক আইন নয়; মানসিক ও দৈহিক স্বায়ত্তশাসন পদ্ধতিগতভাবে কেড়ে নিয়ে, শরীরকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নজরদারির আওতায় এনে, ভারতীয় রাষ্ট্রের তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের উপর নিজের পরম ও সার্বভৌম মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার একটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি প্রয়োগের উন্নত কাঠামো গঠনের উদ্যোগ।
এই বিলটি রূপান্তরকামীদের শরীরকে মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারের সমসাময়িক পরিসর থেকে ঠেলে দিয়ে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি এবং নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির এক অন্ধকূপে নিক্ষেপ করছে। এটি এই বার্তা দেয় যে, “কল্যাণ”-এর মতো আবছা শব্দের আড়ালে জৈব-ক্ষমতা বা বায়োপাওয়ার বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।

