শাহীন ফেরদৌসি
খবরের কাগজ যখন সদ্য খবরবিক্রেতার কর্পোরেট স্যুট পরেছে, তখনকার কথা। সাল ২০১৫, কাগজের শেষ পাতায় খেলার খবর কলামে বড় বড় করে কলাম ধোনি-সাক্ষীর কন্যাসন্তান জন্মেছে, নাম জিভা। এটুকু যথেষ্ট ক্যাটালাইজড করে দিয়েছিল আপামর বুদ্ধিমত্তায়। নাম নিয়ে নানবিধ প্রবচন, যেন বাচ্চাটির নাম, তার পরিচয়ের দায় আমাদের সবার ছিল!
এ তো গেল নিরামিষ ঘটনা। একদিন বলিউডের ব্লু ব্লাড খানদানের এক রমণী বিয়ে করে ফেললেন এক খান-কে, শুধু তাই নয় প্রথম পুত্রসন্তানের নাম দিলেন তৈমুর। আমরা নীল প্রচ্ছদের জীবন মুখোপাধ্যায় বেলের পানার মতো গুলে খেয়েছি। তৈমুর নামটি বিশেষ পরিচিত আমাদের কাছে। আগুনে ঘি পড়ল। সোবার, ক্লাসি, এবং ডিগনিফায়েড চরিত্রদের বাথরুমের আয়না দেখে হস্তমৈথুন করার কাঁচা ছবি বেরিয়ে এল অনেক।
এই দুই ক্ষেত্রেই দোষ একটি, নাম। এ মেলোডিয়াস জার্নি ফ্রম “নাম পে ক্যায়া রাখখা হ্যায় টু নাম তো সুনা হোগা”।
এবার ব্যক্তিগত ডায়েরি খোলা যাক, সংবেদনশীলতার পরীক্ষায় পাশ করবে কি না তা সময় বলবে, তবে সত্যতার বিচারে ফুল মার্কস্ পাবে নিশ্চিত।
একটি বাচ্চা জন্মানো-পরবর্তী জীবনে কর্ম তার পরিচয় হয়ে ওঠার আগে নাম তার প্রথম ও প্রধান পরিচয় হয়। আমার ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত নাম এবং ততোধিক অদ্ভুত একটি সারনেম থুতনির তিলওয়ালা মেয়েটার আইডেন্টিটি কার্ড হয়ে গিয়েছিল। লাইনে দাঁড়ানো পরপর প্রচলিত নামের মাঝে “কী! সাহানা? শাইনা? ফেরোদোসী? এ আবার কেমন নাম!!” বাবার নাম শুনে আরও একদফা হোঁচট। “টাইটেল হোসেন??!! নিজের বাবা???””
প্রতিবার সদ্য কুঁড়িফোটা একটি বাচ্চা মেয়ে নিজের ও নিজের পিতৃপরিচয় বলতে ঢোঁক গিলত।
বাড়িতে দরজার কোণে দাঁড়িয়ে বারবার বলত মায়ের শিখিয়ে দেওয়া কলি, “বলবি আমাদের মধ্যে বাবার টাইটেলের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখার কোনও নিয়ম নেই।” বলত আর নিজের কানে শুনত, শুনে বিশ্বাস করার চেষ্টা করত। আর ভাবত ঠিক কীভাবে বললে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা যাবে। ওই কৌতূহলী চোখগুলির জ্বলজ্বলে প্রশ্ন এই উত্তরে নেভানো যাবে তো!
সময়ের সঙ্গে পরিধি বাড়ল। বিপদ হল প্রবল। কোনও অনুষ্ঠানে মাইকে নিজের নামের একাধিক অপভ্রংশের সম্মুখীন হতে হত বারবার। প্রতিবার নামের লিস্টে নিজের নাম সংশোধন করতে হত। “নিজের বাবা? নিজের নাম? খাতুন হয় না তোমাদের মধ্যে?” সমুদ্রের ঢেউয়ের সামনে অসহায় একটা মেয়ে ফুটিফাটা লাইফজ্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে।
পরিচয়, কাজ, আচরণ, প্রবৃত্তি, ইচ্ছে সবকিছু এই অন্যরকম নামের সঙ্গে ওঠা প্রশ্নের ছটায় ধুলোর কলয়েড হয়ে ভেসে যেত প্রতিবার। এতটাই, যে চোদ্দো বছর বয়সে প্রথমবার নামের সাবলীল উচ্চারণ এবং কমপ্লিমেন্ট পাওয়ার পর সেই স্মৃতি আজীবন আগলে রাখা ছিল। প্রথম প্রেমিকের দেওয়া গোলাপের মতো শুকনো সেই স্মৃতি চটকালে আজও মধুর লাগে।
পরবর্তীতে পূর্ববঙ্গের সাহিত্য, ইতিহাস পড়তে শুরু করলে দেখা গেল স-এর অপভ্রংশ হওয়া ছ-এর বহুল ব্যবহার। নূরনেশার হয়ে যায় নূরনেছার, ইশা হয় ইছা।
এদেশে যে সংখ্যালঘু, সে ওদেশে সংখ্যাগুরু। ধর্মগ্রন্থ, ধর্মগুরু ইত্যাদির প্রভাব, ধর্মীয় আলোচনায় বুঁদ জাতি হাদিছ বা ইছালে ছাওয়াব শুনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মুসলিম মৌলবিপন্থী সমাজে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি ঝোঁক এমনি এমনি আসেনি। তার কিছু জীবন্ত দলিল নিয়ে কথা বলা যাক। একটি সংখ্যালঘু এলাকায় কাজ করার সূত্রে প্রতিদিন বিবিধ ঘটনা তুল্যমূল্য বিচার করতে পারি। চাকরিসূত্রে বর্তমান স্কুলটিতে যখন এলাম, আমায় নিয়ে প্রফেশনাল সার্কেলে সবার ভাবগতিক দেখে নিজেকে দেশের জন্য যুদ্ধে লড়তে যাওয়া সেনা মনে হয়েছিল। শহিদ হল বলে! আধিকারিক বা সহকর্মীরা সহমর্মী হয়ে উঠেছিল কারণ “ওই এলাকা খুব বাজে… উগ্রতা, হিংসে, কেউ যেতে চায় না”… ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, আর সবচেয়ে বড় যে কারণ ছিল যা কেউ মুখে বলে উঠতে পারেনি তা ছিল, জায়গাটি সেন্ট পার্সেন্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত। গরুখেকো উগ্র মুসলিম— এই অ্যাব্রেভিয়েশন সুচতুরভাবে ইনজেক্টেড আমাদের শিরায়। সেই উগ্র মুসলিম এলাকায় গিয়ে প্রথমদিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হল। হেডপোস্টের মানুষটিকে স্যার না বলে ম্যাডাম বলতে হলে অনেকেরই ইগো হার্ট হয়। আমরা আজ্ঞাবহনকারী এবং বদল-পরিপন্থী মনুষ্যজাতি, আমিও প্রিকনসিভড্ নোশন থেকে অনেক কিছু নেগেটিভ ভেবে ফেললাম। একদিন কর্মক্ষেত্রে বিরক্ত, ক্লান্ত হয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে শাপশাপান্ত করছি, কেউ একজন বললেন ‘ঈগলস্ ভিউ ডেভেলপ করো। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে।’
স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে স্থাপিত এই স্কুলটি শুধুমাত্র সংখ্যালঘু বাচ্চাদের ইতিহাস বয়ে চলেছে টানা। পনেরোই আগস্ট অনুষ্ঠানে মেয়েরা নাচ করবে বায়না ধরল। অনুষ্ঠানসূচি তৈরি হল। মুসলিম মেয়েরা নাচবে!! গ্রামবাসী স্কুলে তালা দেবে, আগুন জ্বালিয়ে দেবে ইত্যাদি উড়ো খবর। আমি মার খাওয়ার বন্দোবস্ত করছি… আবহাওয়া থমথমে হয়ে গেল। স্বাধীনতা দিবসের একদিন আগে, দুপুর অবধি বুকের ভেতর উদ্বেগ কাজ করছিল। সত্যিই কিছু এদিক ওদিক হয়ে গেলে! বিকেল চারটের দিকে একটি ফোনকল এল, ওপ্রান্তে একটি ছাত্রীর বাবা। বললেন, “ম্যাডাম, মেয়ে বলছে কোনও ড্রেস কিনতে হবে না। তাও যদি দরকার হয় বলুন কেমন ড্রেস দরকার। আমি বাজারে এসেছি, কিনে নিয়ে যাব।” আষাঢ়ের গুমোটে সেই একটুকরো বসন্ত আমি কোনওদিন ভুলব না। পরবর্তী ঘটনা সাধারণ; মাঠ ভেঙে গ্রামবাসী এসেছিল বাচ্চাদের অনুষ্ঠান দেখতে। সঙ্গে প্রচুর হাততালি। এই উগ্র এলাকায় স্কুলের ইতিহাসে প্রথমবার বাচ্চারা নাচ, নাটক, গান, আবৃত্তি করল। এবং আমি মার খেলাম না।
তবে এতটাও জেনারালাইজড নয় সামগ্রিক পরিস্থিতি। এখনও বেয়ার মিনিমাম প্রথাগত শিক্ষা পায় না অনেকেই। কারণ মাথায় চেপে বসে আছে, ধর্মীয় শিক্ষা সাপ্লিমেন্টারি নয় বরং একমেবাদ্বিতীয়ম। ধর্মের নামে গোঁড়ামি এদের আঁকড়ে রেখেছে কচুরিপানার মতো। জলসার মতো অনুষ্ঠানে কয়েকশো ডেসিবেল আওয়াজে তাদের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে গোঁড়ামি। বলা হচ্ছে জীবনদর্শন শিক্ষা এবং ধর্মীয় শিক্ষা সিনোনিমাস। প্রথাগত শিক্ষায় তাদের কোনও লাভ হবে না। কারণ মুসলিমদের অধিকার দেওয়া হয় না কোথাও। এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে এদের মধ্যে। বহুদিন ধরে। বিজ্ঞান, অঙ্ক, সাহিত্য একজনের বৌদ্ধিক বিকাশ, অ্যানালিটিকাল ক্ষমতা বাড়ায়। সামগ্রিক উন্নয়ন করতে হলে অর্থনীতি এবং তার সঙ্গে সামাজিক অবস্থানের আন্ডারস্ট্যান্ডিং যে দরকার এরা তা বোঝার মানসিক স্থিতাবস্থা কখনওই পায়নি। কারণ বঙ্গীয় মুসলিমরা আদপে কনভার্টেড শুদ্র হিন্দু। শিক্ষা, চিকিৎসা বা রোজগার সর্বত্র প্যারালাল অ্যাকসেপটেন্সের অভাব এবং সরিয়ে রাখার প্রবণতা সমানে ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করে গেছে। অশিক্ষিত একটি জাতিকে বোঝানো সম্ভবই হয়নি প্রথাগত শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদ ও তার গভীরতার গুরুত্ব। ফলত এদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য প্রথম থেকে ছিল না। তাই যখন যখন প্যারাডাইম শিফ্ট হয়েছে এরা ভেসে আরও সীমানার দিকে থিতু হয়েছে। সমাজের প্রান্তিক স্তরে মৃত পশুর চামড়া, মাংস কাটার মতো ছোট ছোট ব্যবসা করে এগোতে হয়েছে। অর্থের ঘাটতি এদের একটা বাড়ি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ কিছুই দিতে পারেনি। গোমাংসভক্ষক ব্রাহ্মণকে আমারা এলিগেন্সের সূচক মনে করলেও, খান বা ইসলামদের গায়ে আমরা সারাক্ষণ লালমাংসের নোংরা গন্ধ পাই। এতটাই নোংরা মানসিক অবক্ষয় আমাদের প্রথম থেকে আঁকড়ে রেখেছে আমরা ধরেই নিই এই জাতির মানুষগুলি বিছানায় প্লেট রেখে খাবার খায়।
একটি ছোট ঘটনা বলি। জিউইশ রিভোল্ট প্রথম শুরু হয় যখন জেরুজালেমের মন্দিরে জিউইশ ভগবান ইয়েওয়ার মূর্তি সরিয়ে রোমানরা তাদের সম্রাট ক্যালিগুলার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে। ইহুদি-রোমানদের যুদ্ধের ভিত্তি ছিল এই বিমূর্ততার সংক্ষিপ্ত জ্ঞান বা বলা ভালো প্লেটোনিজম। একটি বিখ্যাত ফ্রেজ মনে পড়ছে, platonicity is what makes us think that we understand more than we actually do.
বলাই যায়, সিগমুন্ড কার্ডের সেই সুপারইগোওয়ালা জাতি এবার মাঠে নেমে পড়েছে জঞ্জাল সাফ করবে বলে!
যখন সাক্ষরতার আলো না পাওয়া ওই মানুষগুলো রেশন দোকান বা ভোটার কার্ডের ছয় নম্বর ফর্ম পূরণ করতে যেত, তাদের উচ্চারণ সঠিক হোক বা না হোক, অন্যরকম নামগুলো সরকারি কাগজে কখনওই (হ্যাঁ, কখনওই) সঠিক হত না। কারণ “ওদের নামগুলো বড্ড কঠিন”। সে-কারণে ওই সরকারি কাগুজে তথ্যে স্নিগ্ধা snigdha থাকলেও শাহীন sain হয়ে যায়। আজও হয়।
আর আজও হয়ে এসেছে বলেই এই বিশেষ নামাঙ্কিত জীবগুলি সিটিজেনশিপ বাঁচানোর আশায় অপেক্ষা করছে। কোনও স্থির পথ নেই, জানে না কোথায় কীভাবে এগোতে হবে। সন্ত্রস্ত ও স্ক্যাটার্ড কয়েক লক্ষ মানুষের কাগুজে বানান দেখে নির্ধারণ করা হয়ে গিয়েছে সে কোথায় থাকবে। তার বর্তমানের সুতো ছিঁড়ে দিয়েছে তার অতীতের ভুল নামের বানান। দড়কচা মেরে গুটিয়ে আছে সেই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ। ধর্মের রোষানলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ, স্থাবর সম্পত্তি বেদখল থেকে শুরু করে পড়াশুনো-চাকরি সব কিছুর অধিকার কেড়ে নেওয়ার ভয় ছাইয়ের মতো উড়ছে। সরকারি আমলারা রোবটের মতো যথাজ্ঞা হুজুর বলে টিকিয়ে রাখতে চাইছে কষ্টার্জিত সম্মান। সবকিছুর ঊর্ধ্বে পতপত উড়ছে এক গোষ্ঠীর কগনিটিভ ডিসোনেন্স। যা আমাদের দেখায় যে মানুষ কতটা যুক্তিবাদী (Rational) হওয়ার চেয়ে যুক্তি-প্রদর্শনকারী (Rationalizing) হতে বেশি পছন্দ করে। আমরা সত্যকে মেনে নেওয়ার চেয়ে নিজের ভুল কাজকে সঠিক প্রমাণ করতেই বেশি মাথা খাটাই।
এসআইআর-এ মুসলিম জাতিকে যেভাবে টার্গেট করা হয়েছে এতে বেশিরভাগ মানুষের কিন্তু মনের ভেতর কষ্ট বা হারানোর ভয় নেই। জাস্ট একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়ে যাবে। এক বদ্ধমূল ধারণা, যারা এ-দেশের নয় তারা এখানে এসে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করছে, সুযোগ নিচ্ছে। চাল থেকে কাঁকর বাছার এই পদ্ধতি স্যাটিসফায়িং বলে মনে করছে আমাদের অন্তরাত্মা। বাইরে আমরা শুধু এমপ্যাথির রং মাখছি।
নাগরিকত্বের প্রমাণের দলিল, এর অন্তর্নিহিত প্রোজেক্টাইল বড় গভীর। এর শেষ কিন্তু এখানে নয়, বরং এ হল শেষের শুরু। আজ যারা জুডিশিয়াল প্রসেসের মধ্যে কাল যখন এরা ব্যাক করবে, সেটাকে প্রমাণসাপেক্ষ ফিরে আসা তো মোটেই বলা হবে না। হিউম্যান সাইকোলজি বলে, আমরা সন্দেহ করতে ভালোবাসি। ওই যে বহুযুগ আগে যখন পাশ-ফেলের জুজু আমাদের শিক্ষার মেরুদণ্ড রুটেড রেখেছিল, তখন দুটি সাবজেক্টে ফেল করাকে কনসিডারেশনে পাশ বলা হত। পরের ক্লাসে উঠে গেলেও ফেল বলেই গণ্য করা হয়। এই জুডিশিয়াল এবং পরবর্তীতে ট্রাইবুনাল পাশ করে আসা ছাগলের নবম সন্তানরা হবে সেই কনসিডারেশনে পাশ করা লাস্টবেঞ্চার যে জন্ম দেবে কার্সড একটা প্রজন্ম। যারা আর হয়তো কখনও মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবে না। শিক্ষা বা চাকরিতে এই দলিল যদি ম্যান্ডেট করা হয়, সেই মাস্টারস্ট্রোক পরবর্তী শতাব্দীতে হয়তো জিন্নাহ-নেহরু কূটনীতিকেও পেছনে ফেলে দেবে। এবং এই ভিশাস সাইকেল পারপাসফুলি অবলুপ্তি চাইবে না বরং লুপ্তপ্রায় ধুঁকতে থাকা একটা জাতিকে বারবার সূচক বানাবে। বন্যাকবলিত এলাকায় কাদামাখা সর্বহারা একজন মানুষকে দশজন একটি চালের প্যাকেট দান করে যেমন ছবি তুলে মহানুভবতার আপ্যায়ণ গ্রহণ করে, তেমনই এই সুতোয় ঝোলা জাতিকে নিয়ে স্লামডগ মিলিয়েনিয়ার তৈরি হবে, আর আমরা গর্ব করে দেখাব।
Herd instincts of obedience-এ কাবু জনজাতিকে ক্যাটেগরিকাল ইমপারেটিভ শৃঙ্খলার কলে ধর্মরক্ষার রুটি সামনে ঝুলিয়ে যত্ন করে বেঁধে রাখা যায়।
শাসকের এই স্ট্যাটাস কুয়ো অনেকটা ‘জিরো-সাম গেম’-এর মতো। নিপীড়িত গোষ্ঠীর সামান্যতম উন্নতিকেও শাসক নিজের সেই অংশটুকুর হার বলে মনে করে এবং অস্তিত্বরক্ষার আপ্রাণ তাগিদে বলে ও বোঝায় যে এই পরিবর্তন অস্তিত্বের প্রতি হুমকি। তাই তাকে বাঁচানোর একটি সহজতম উপায় ছদ্মপ্রেমীদের অপসারণ। সাদাকালো ছকে রানি, হাতি ও নৌকা বাজি দিতে হলে রাজার আর বিশেষ কিছু বেঁচে থাকে না। ড্রাফট রোলের দীর্ঘ অপেক্ষা ও অপসারণ এবং তার পরবর্তী কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজ ঠিক কতটা গভীর হবে তা আজকের তারিখে কল্পনাতীত। কুপির টিমটিমে আলোয় লুপ্তপ্রায় জোনাকি তাও দেখা যায়। শহুরে ফ্লাডলাইটে জোনকিকে মনেও পড়ে না আর। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ঋজু শিরদাঁড়ার ঠিক নিচে ভঙ্গুর অস্থিরতা উজ্জ্বল অ্যাবসোলিউট ক্ষমতাকে তীব্রভাবে প্রদর্শন করে। কী অদ্ভুত প্যারাডক্স!
ইতিহাসের কবর খুঁড়লে বেরিয়ে আসে কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড ও পুনা চুক্তির প্রেতাত্মারা যেখানে আইন পরিষদে সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দুদের সিটের বন্দোবস্ত করেছিল ব্রিটিশরা, কিন্তু অভিশাপ বইতে হল অবিভক্ত বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিমদের। এই আইনসভার প্রথম ভোটে ১৯৪৭ সালে প্রান্তিক গলায় তাবিজ-বাঁধা এই জাতিটিই অবিভক্ত বাংলার দাবি জানিয়েছিল। অথচ জীবনভর আমাদের শিশুখাদ্যের মতো হজম করানো হল এই তথ্য যে বঙ্গবিভাগ হয় মুসলিম লিগের চাপের মুখে।
মন থেকে ডাক আসার অপেক্ষায়, রিকগনিশনের অপেক্ষায় ইতিহাসের পাতা ভরে গেল, তবু শেষরক্ষা হল না।
অদূর ভবিষ্যতে শাহীন ফিরদৌসিরা আর রিকগনিশন চাওয়ার সাহস করবে না। কারণ তারা জেনে গেছে রিকগনিশনের চাইতেও হিউমিলিয়েশনের ইমপ্রিন্টিং অনেক বেশি।
কারণ কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানে পেছন ফিরে দেখতে থাকা সেসব কৌতূহলী চোখ আজও একটা পজ বাটন প্রেস করে দেয়।


Khub Balo laglo emi. All the best