ভোট, ভয় ও বিভাজনের ভূগোল

শুভজিৎ বসাক

 


পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরেই— রাজ্যটি কি ফিরে পাবে তার পুরনো চরিত্র, সেই উদার, সহিষ্ণু, সৃষ্টিশীল বাংলার স্বরূপ? নাকি বিভাজনের এই নতুন বলয়েই চিরস্থায়ী হবে তার পরিচয়? সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর ঘড়ির কাঁটা যে দিকে ঘুরছে, তা খুব আশাপ্রদ নয়। তবু, ইতিহাস সাক্ষী, বাংলা বারবার ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় দশ কোটি মানুষের অনেকেই এখনও ভাবেন, বাংলা চায় একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ— যেখানে ধর্ম হবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাজনীতি হবে জনকল্যাণের মাধ্যম, আর অভিবাসন হবে পছন্দের বিষয়, বাধ্যবাধকতা নয়

 

পশ্চিমবঙ্গ এখন এক ত্রিমুখী টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে— ধর্মীয় মেরুকরণ, অর্থনৈতিক পলায়ন ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার চাপে রাজ্যটির পুরনো চরিত্র যেন ক্রমশ ধুলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষ বিকেলে দীঘার সমুদ্রতীরে যখন জগন্নাথ মন্দিরের চূড়ায় সূর্যের শেষ আলো পড়ল, তখন অনেকের চোখেই ভেসে উঠেছিল অযোধ্যার রামমন্দিরের সেই চেনা দৃশ্যপট। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করলেন নিজ হাতে। তিন দিন ধরে তিনি দীঘায় ক্যাম্প করেছিলেন— যেন এই একটি মুহূর্তই ঠিক করে দেবে আগামী নির্বাচনের হাওয়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলাবলি করছিলেন, “বিজেপির ‘জয় শ্রী রাম’-এর পাল্টা জবাব খুঁজে পেয়েছে তৃণমূল— ‘জয় জগন্নাথ’।” কিন্তু এই পাল্টা হিন্দুত্বের রাজনীতির আড়ালে যে ফাটলগুলো আরও গভীর হচ্ছে, সেগুলো কি কোনওদিন জোড়া লাগবে?

পশ্চিমবঙ্গ এখন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক পরীক্ষাগার। ৩৪ বছরের বাম শাসনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে, টানা তিন মেয়াদে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনাধীন এই রাজ্যটি দেখছে এক নতুন ধরনের বিভাজন— যেখানে ধর্ম হয়ে উঠেছে প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র, অভিবাসন পরিণত হয়েছে জাতীয় পরিচয়ের সংকটে, আর উন্নয়নের(!) প্রতিশ্রুতিগুলো যেন চিরকালীন মরীচিকা হয়েই থেকে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই সংকট আরও তীব্রতর হয়েছে। মন্দির-মসজিদের দ্বৈরথ, ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার আতঙ্ক, আর সীমান্তের ওপারে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ছায়া— এই সবকিছু মিলিয়ে রাজ্যটি যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

 

মন্দিরের ছায়ায় মসজিদের স্বপ্ন: প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার উত্থান

রাজ্য সরকার যখন একের পর এক মন্দির নির্মাণের ঘোষণা করছে— দীঘায় জগন্নাথ মন্দির, নিউ টাউনে দুর্গা অঙ্গন, শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির, জলপাইগুড়িতে দেবী চৌধুরানী মন্দিরের সংস্কার— তখন মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার সাসপেন্ডেড তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের কণ্ঠে শোনা গেল ভিন্ন এক দাবি। “সরকার যদি শত শত কোটি টাকা মন্দির বানাতে পারে, তাহলে মুসলমানরা মসজিদ বানাবে না কেন?” তিনি প্রকাশ্যে ডাক দিলেন বাবরি মসজিদের আদলে একটি মসজিদ নির্মাণের। যদিও তাঁর বিজেপির সঙ্গে আঁতাতের একটি স্টিং অপারেশনের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে ভিডিওটি ছোট করে দেখানো হচ্ছে। অতএব এর সত্যতা নিয়ে আর সংশয় থাকে না। সুতরাং তাঁর এই মসজিদ গড়ার ডাক শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনার দাবি নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্বের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

এই দ্বন্দ্বের উৎস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০১১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলে। যখন তৃণমূল-কংগ্রেস জোট ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল, তখন রাজনীতির মূল ইস্যু ছিল জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণ, প্রশাসনিক স্তব্ধতা এবং ‘পরিবর্তন’-এর আকাঙ্ক্ষা। ধর্ম তখনও রাজনীতির মূলধারায় আসেনি। কিন্তু ২০১২ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা ঘোষণা করলেন, তখনই প্রথম ইঙ্গিত মিলেছিল যে Identity politics পশ্চিমবঙ্গেও শিকড় গাড়তে শুরু করেছে।

পরবর্তী এক দশকে যা ঘটেছে, তাকে বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন “প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা”। তৃণমূল যতই হিন্দু ভোটারদের কাছে পৌঁছতে চেয়েছে, বিজেপি ততই সেই জায়গায় নিজের কট্টর হিন্দুত্বের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। ২০১১ সালে বিজেপির ভোট শতাংশ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই ভোটই পৌঁছে যায় ৪০ শতাংশে। এই উত্থান নিছক সাংগঠনিক সাফল্য নয়; এটি রাজ্যের সামাজিক কাঠামোতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

এই প্রতিযোগিতার মাশুল দিতে হয়েছে রাজ্যের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে— যারা ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের জনসংখ্যার ২৭.০১ শতাংশ। গত এক দশকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের তালিকা দীর্ঘ: কালিয়াচক (২০১৬), হাজিনগর (২০১৬), ধূলাগড় (২০১৬), বাদুড়িয়া (২০১৭), ভাটপাড়া (২০১৯), তেলেনিপাড়া (২০২০)। ২০২২ সালের জুনে হাওড়ায় বিজেপির এক মুখপাত্রের নবি মুহম্মদ সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর রামনবমীর শোভাযাত্রা যেন আরও বেশি সংখ্যায়, আরও বেশি অস্ত্রের প্রদর্শনী নিয়ে বেরোয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে হাওড়া ও হুগলিতে রামনবমীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঘটে, তা যেন স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গ আর আগের সেই ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মডেল’ নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল নিয়ে বিক্ষোভ মুর্শিদাবাদের কিছু অংশে সহিংস প্রতিবাদ সৃষ্টি করে; সামসেরগঞ্জ রাজ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাগুলির একটি দেখে, যাতে তিনজনের প্রাণ যায় এবং শতাধিক মানুষ গৃহহীন হয়— এটি ছিল স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা।

এই সংঘাতগুলোর পেছনে শুধু ধর্মীয় বিভেদ নয়, কাজ করছে সুচিন্তিত রাজনৈতিক পরিকল্পনাও। “জনসংখ্যার পরিবর্তন” ও “অবৈধ অনুপ্রবেশ”— এই দুই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিজেপি যে রাজনৈতিক আখ্যান তৈরি করেছে, তা ভোটারদের মেরুকরণে সফল হয়েছে। শুধু রাজ্য নেতৃত্বই নন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই দুই ইস্যুকে বারবার সামনে এনেছেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় প্রথম খসড়াতেই ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং ১.৩৬ কোটিরও বেশি মানুষকে ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’-র নোটিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার লিস্ট থেকে। যে রাজ্যের সীমানা দেশভাগের পর একাধিকবার পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে, যে রাজ্য একের পর এক শরণার্থী ঢেউ গ্রহণ করেছে, সেখানে এসআইআর প্রক্রিয়াকে নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)-র ভূমিকা হিসেবেই দেখা হচ্ছে— যেখানে নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম থাকতে গেলে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গের বিভেদ শুধু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নয়। এই বিভেদ সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত, বিশেষ করে যখন অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা আসে। চাকরির অভাব; উচ্চ জনঘনত্ব (প্রতি বর্গকিমিতে ১,১০৬ জন, জাতীয় গড় ৪১৫ জনের তুলনায় অনেক বেশি); এবং ক্ষুদ্র ভূসম্পত্তি (৯৬ শতাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, গড় ভূসম্পত্তির আকার মাত্র ০.৭৭ হেক্টর)— এই কারণগুলি পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিককে কাজের জন্য দক্ষিণ ও পশ্চিমের রাজ্যগুলিতে পাড়ি জমাতে বাধ্য করেছে।

 

সংখ্যালঘুর সংখ্যাতত্ত্ব: ভোট আছে, কিন্তু কণ্ঠস্বর নেই

সাবির আহমেদের (Programme Director at Amartya Sen Research Centre, Pratichi, and also at the affiliated Sabar Institute) দীর্ঘদিনের গবেষণা ও মাঠে-ময়দানে কাজ যে চিত্রটি তুলে ধরে, তা হতাশাজনক। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘ভোটব্যাঙ্ক’ হিসেবে অত্যন্ত মূল্যবান, কিন্তু নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের জন্য কোনও স্থান সংরক্ষিত নেই। স্বাধীনতার পর থেকে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা একটি সামাজিকভাবে প্রান্তিক ও রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক পরেও, জনগণের ক্ষেত্রে, এবিএ গনিখান চৌধুরী ও আব্দুস সাত্তারের মতো মাত্র মুষ্টিমেয় কংগ্রেস নেতা ছিলেন। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক অ্যান ফিলিপসের ‘উপস্থিতির রাজনীতি’-র বিশ্লেষণের আলোকে, আসুন পরীক্ষা করি কীভাবে মুসলমানরা শাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছেন। ফিলিপস যুক্তি দেন যে নারী, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক সামাজিক গোষ্ঠীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য ‘উপস্থিতির রাজনীতি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার স্থান, মন্ত্রিসভা ও রাজনৈতিক দলগুলিতে উপস্থিতি তাদের কণ্ঠস্বর ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত ও শোনার সুযোগ সম্প্রসারিত করে। তাঁর মতে, উপস্থিতির রাজনীতির পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিপ্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করা, যার মাধ্যমে প্রান্তিক গোষ্ঠীর স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি সুরক্ষিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সরকারি কর্মসংস্থানের স্টাফ সেন্সাস তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দুই দশকের স্ট্যাটিস্টিক্স দেখায়, ২০০৮ ও ২০১৬-র মধ্যে সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বে এক শতাংশের সামান্য কম বৃদ্ধি হয়েছে। ২০০৮ সালের স্টাফ সেন্সাস অনুযায়ী, মোট ৩,৪৭,৭৯৮ জন রাজ্য সরকারি কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ৫.১৯ শতাংশ ছিলেন মুসলমান। ২০১৪-১৫ সালের স্টাফ সেন্সাস অনুযায়ী রাজ্য সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ৬.১৭ শতাংশ— যেখানে জনসংখ্যার অংশ ২৭.০১ শতাংশ। কলকাতা পুরসভায় এই হার ৫.২ শতাংশ (২১,২৮৫ জন কর্মচারীর মধ্যে ১,১২৩ জন), যা ২০০৮ সালের ৪.৫ শতাংশ থেকে বেড়েছে। অধিকন্তু, নতুন নিয়োগ স্থগিত এবং আউটসোর্সিং-এর ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে, পৌর পরিষেবাগুলিতে মুসলিম কর্মচারীর প্রকৃত সংখ্যা ২০০৮ সালে ১,৫৫৫ থেকে কমে ২০১৯ সালে ১,১২৬ হয়েছে। আরটিআই তথ্য প্রকাশ করে যে কলকাতা পুলিশে মোট ২৫,৯৯৯ জন কর্মীর মধ্যে মাত্র ২,৮৯৭ জন কর্মী (১১.১৪ শতাংশ) ছিলেন মুসলমান। ২০০৮ সালে বামফ্রন্টের শাসনের সময়, বাহিনীতে মুসলমানরা ছিল ৯.১৩ শতাংশ। সুতরাং, ২০০৮ ও ২০১৯-এর মধ্যে, মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২.০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কলকাতা মেডিকেল কলেজের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মুসলিম অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র ২.৭ শতাংশ, অন্যদিকে মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজে এই হার তুলনামূলকভাবে ভালো (১৯.৫ শতাংশ) হলেও, সেটি ব্যতিক্রম মাত্র। তবুও কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো সরকারি মেডিকেল কলেজের (১.৮ শতাংশ) মতো প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলি প্রায় নগণ্য হার দেখায়। এই তথ্য ইঙ্গিত করে যে একটি “নতুন শিক্ষা আন্দোলন” আরও মুসলিম ছাত্রছাত্রীকে চিকিৎসাক্ষেত্রে ঠেলে দিতে শুরু করলেও, সিনিয়র ফ্যাকাল্টি ও নেতৃত্বের ভূমিকায় রূপান্তরিত হতে সময় লাগবে। এই ব্যবধান সত্ত্বেও, অভূতপূর্ব ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে সংখ্যালঘু তুষ্টির ইস্যু যে কোনও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে। কেন্দ্রীয় প্রশ্ন, তবে, হল তথাকথিত সংখ্যালঘু তুষ্টির নীতিগুলি কি সত্যিই গত ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের জীবন উন্নত করেছে?

সাচার কমিটির রিপোর্ট (২০০৬) যে বৈষম্যের ছবি এঁকেছিল, তা আজও বহুলাংশে অপরিবর্তিত। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনকালে উচ্চবর্ণের আধিপত্য ছিল অনস্বীকার্য। সিপিআই(এম)-এর দলীয় কাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। দীর্ঘ বামফ্রন্ট যুগে, মুসলিম নেতৃত্ব মূলত মুহম্মদ সেলিম, সৈফুদ্দিন চৌধুরী, মহম্মদ আমিনের মতো নেতারা ছিলেন ব্যতিক্রম, নিয়ম নন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কিছুটা বেড়েছে— বর্তমানে ২৯৪ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিম, ৪৪ জন মন্ত্রীর মধ্যে পাঁচজন এই সম্প্রদায়ের। কিন্তু নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দপ্তর ছাড়া কোনও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় তাঁদের হাতে দেওয়া হয়নি। বরং বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলের মুসলিম প্রার্থী দেওয়ার প্রবণতা কমছে, যা আগামী দিনে এই প্রতিনিধিত্ব আরও সঙ্কুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

তবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও চোখে পড়ার মতো। ওবিসি সংরক্ষণের সুফল কিছুটা হলেও দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ASHIE (All India Survey on Higher Education) তথ্য অনুযায়ী,  প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯.৯ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের। সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজগুলিতে মুসলিম অধ্যাপকের হার প্রায় ৮ শতাংশ, বিদ্যালয় শিক্ষাক্ষেত্রে ১২ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে মুসলমানদের মধ্যে স্নাতকোত্তর পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীর পরিমাণ (১৪.৮১ শতাংশ) ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মেডিকেল কলেজগুলিতে ভর্তির হার এখন প্রায় ২০ শতাংশ— এক দশক আগে যা ছিল কল্পনাতীত। সম্প্রদায়-পরিচালিত আবাসিক বিদ্যালয়গুলির মাধ্যমেও এক ধরনের ‘নতুন শিক্ষা আন্দোলন’ গড়ে উঠছে। কিন্তু এই অগ্রগতি কি যথেষ্ট? রাজনৈতিক মেরুকরণের এই উত্তপ্ত সময়ে, যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুত্বের সামাজিকীকরণ চলছে পূর্ণোদ্যমে, তখন মুসলিম মধ্যবিত্তের এই নবজাগরণ কি টিকে থাকতে পারবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরও গভীরে যেতে হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছয়টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিকল্পনা করেছিল, যার জন্য বাজেটে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দও হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জড়তার কারণে আজ পর্যন্ত সেই প্রকল্পের কাজ শুরুই হয়নি। অন্যদিকে কালীঘাট মন্দির, গঙ্গাসাগর মেলা, নবদ্বীপধামের উন্নয়নের জন্য শত শত কোটি টাকার বরাদ্দ হচ্ছে। দীঘার জগন্নাথ মন্দির তো রীতিমতো রাজ্যের ‘সিগনেচার প্রোজেক্ট’ হয়ে উঠেছে। এই বৈষম্য যে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ভোটের রাজনীতিরই আরেক রূপ, তা বোঝা কঠিন নয়।

 

পেটের টানে পরদেশে, সন্দেহের ছায়ায় বাংলাদেশে

২০২৫ সালের জুন মাস। দিল্লির রোহিণীর একটি জুগ্গি বস্তি থেকে তুলে নেওয়া হল সুনালি খাতুনকে— স্বামী দানিশ শেখ, ৮ বছরের নাবালক সন্তান আর প্রতিবেশী সুইটি বিবি আর তাঁর দুই নাবালক সন্তানকে। ছয়জনকে কোনওরকম আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ঠেলে দেওয়া হল আসাম সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশের জঙ্গলে অর্থাৎ সীমান্তের ওপারে। ১০ দিন কাটাতে হয়েচিল তাঁদের ওই জঙ্গলে। তারপর তাঁরা একদিন সবাই মিলে নদী পেরিয়ে চলে আসেন পাশের গ্রামে। সেখান থেকে ভিক্ষে করতে করতে প্রথমে ঢাকা তারপর চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী হিসাবে বাংলাদেশ পুলিশের হাতে ধরা পড়া। সুনালি তখন গর্ভবতী। কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের এক দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে তিনি আর তাঁর নাবালক পুত্র এই বাংলাতে ফিরতে পারলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বামী দানিশ, সুইটি বিবি ও তাঁর দুই নাবালক পুত্র এখনও বাংলাদেশের জেলেই আটকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রামপুরহাট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুনালি জন্ম দিলেন এক পুত্রসন্তানের। মুখ্যমন্ত্রী পাঠিয়েছেন ফুলের তোড়া, হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা। কিন্তু সুনালির চোখে-মুখে সেই আতঙ্ক এখনও লেগে আছে। তিনি শপথ করেছেন— আর কখনও দিল্লি যাবেন না।

এই গল্প শুধু সুনালির নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি নোটিফিকেশন রাজ্যগুলোকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক’ শনাক্ত ও আটকের নির্দেশ দেওয়ার পর থেকে বাংলাভাষী অভিবাসী শ্রমিকরা হয়ে উঠেছেন সন্দেহভাজনের তালিকায় শীর্ষে। মুম্বইয়ের নালাসোপারা থেকে তুলে নেওয়া নাজিমুদ্দিন মণ্ডলকে হাত-পা বেঁধে উড়িয়ে নেওয়া হল উত্তরবঙ্গে, তারপর বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হল। সৌভাগ্যক্রমে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় দশ দিনের মধ্যে তিনি মুর্শিদাবাদের তারতিপুর গ্রামে (হরিহরপাড়া ব্লক) নিজের বাড়ি ফিরতে পারলেন। কিন্তু এক মাস যেতে না যেতেই নাজিমুদ্দিন আবার মুম্বইগামী ট্রেন ধরলেন— এবার কোনও পরিচয়পত্র ছাড়াই। তিনি বললেন, “পশ্চিমবঙ্গে কাজ নেই। মুম্বইয়ে যা পাই, এখানে তার অর্ধেকও পাব না। কী করব? পরিবার চালাতে হবে তো!”

২০২৫ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে, যখন দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের হয়রানির খবর আসছিল, তখন সাধারণ ট্রেনের কামরার জন্য লাইনে দাঁড়ানো পুরুষদের চেহারা ছিল গম্ভীর। তাঁরা কাজের সন্ধানে বের হচ্ছিলেন, খবরে নিরুৎসাহিত না হয়ে। হাওড়া স্টেশনের ম্লান সন্ধ্যার আলোয়, যে অভিবাসী শ্রমিক আগে খুশি হয়ে বলতেন তিনি কোথায় যাচ্ছেন, তিনি এখন কথা বলতে অস্বীকার করলেন। রাকেশ আলম, ২৭ বছর বয়সি একজন অভিবাসী শ্রমিক, আমেদাবাদগামী গভীর রাতের ট্রেনে জানালার সিট পেয়ে ভাগ্যবান ছিলেন। চার মাস বয়সি একটি মেয়ের বাবা, তিনি সুরাতে দর্জি হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছিলেন। আলম বলেন, তিনি এক বছরের জন্য বাড়ি ফিরবেন না এবং তাঁর মেয়ের প্রথম জন্মদিন মিস করবেন। “আমার পরিবারকে খাওয়াতে হবে। আমি তাদের ফেলে রেখে যেতে বাধ্য হচ্ছি, এবং চারপাশে কী ঘটছে তাতে ভয় পাওয়ার সামর্থ্য আমার নেই,” তিনি বলেন। শাহনেওয়াজ রহমান মালদহের একটি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি পেয়েছেন, কিন্তু তিনি তামিলনাড়ুতে শিলিগুড়ির ১৩ যুবকের একটি দলের জন্য লেবার সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন। সুপারভাইজার হওয়া সত্ত্বেও, অন্যদের মতো তিনিও নির্মাণ সাইটে কায়িক শ্রম করতে বাধ্য হন। “অতীতে, সারা দেশ থেকে মানুষ পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে আসত। এখন, আমাদের সকলকে মাসের পর মাস, কখনও কখনও বছরের পর বছর বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়, আমাদের পরিবার চালানোর জন্য।” তিনি সম্ভবত সেই সমস্ত অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলছেন যাঁরা কাজের জন্য রাজ্যের বাইরে থাকাতে বাধ্য হয়েছেন।

একটি সবে কিশোর বয়স পার করা অভিবাসী শ্রমিকের যাত্রা শুরু হয় স্থানীয় বাসস্টপ থেকে একটি রেলস্টেশন পর্যন্ত। এই শ্রমিকরা, যারা বেশিরভাগই স্কুল ছেড়ে দেওয়া, ফারাক্কা এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনে ভ্রমণ করেন যা মুর্শিদাবাদের ফারাক্কাকে দিল্লির সঙ্গে সংযুক্ত করে। যেখানে ফারাক্কা এক্সপ্রেসের মালবাহী কামরাগুলি মুর্শিদাবাদ ও সংলগ্ন মালদহ জেলার মহিলাদের পাকানো বিড়ি বহন করে, সেখানে সাধারণ কামরাগুলি অভিবাসী শ্রমিকে ভর্তি থাকে। আসলে, উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে চলা সমস্ত ট্রেনের অসংরক্ষিত কামরাগুলি বাঙালি অভিবাসী শ্রমিকদের দেশের বিভিন্ন অংশে নিয়ে যায়। সুতরাং, যখন ২০২৩ সালের ২ জুন ওড়িশার বালাসোরে একটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রায় ২৯০ জন প্রাণ হারান, তাদের মধ্যে প্রায় ১০০ জনই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের, বেশিরভাগই রাজ্যের অভিবাসী শ্রমিক যাঁরা কাজের জন্য দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে যাচ্ছিলেন। সেই বছর, যখন মিজোরামের আইজলে নির্মাণাধীন একটি রেল সেতু ধসে পড়ে, পশ্চিমবঙ্গে ২২টি পরিবার নিহতদের শোকে মুহ্যমান হয়, সবাই আমাদের এই মালদা জেলার একই গ্রামের। রাজ্যের সর্বত্র থেকে শ্রমিকরা অভিবাসিত হন, কিন্তু রাজ্যের কিছু অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ এলাকায়, যেমন মালদহ ও মুর্শিদাবাদ, অভিবাসনের হার বেশি। মাঝে মাঝে, গ্রামগুলিতে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষদের একটি দল খুঁজে পাওয়া কঠিন। গ্রামে কাজের অভাব এবং MGNREGA-এর অধীনে ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই দ্বন্দ্বটাই এখন পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম প্রতিচ্ছবি। রাজ্যের শ্রম দপ্তরের সরকারি হিসাব বলছে, অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লক্ষ। কিন্তু বেসরকারি অনুমান বলছে, প্রকৃত সংখ্যা ৫০ লক্ষেরও বেশি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ সেই শীর্ষ পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে রয়েছে, যারা দেশের মোট বহির্গামী অভিবাসনের প্রায় ৪৮ শতাংশের জন্য দায়ী। অথচ স্বাধীনতার পরের দশকগুলোতে এই রাজ্যই ছিল দেশের অন্যতম প্রধান অভিবাসী-আকর্ষণ কেন্দ্র। হাওড়ার পাটকল, কলকাতার কারখানা, দুর্গাপুর-আসানসোলের শিল্পাঞ্চল— সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ছিল কর্মসংস্থানের এক স্বর্গরাজ্য। সরকারি হিসেবে অভিবাসীদের সংখ্যাটা প্রায় ১.৫ কোটি।

কিন্তু গত কয়েক দশকে চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি, ‘রিলেটিভ ইকোনমিক পারফরম্যান্স অফ ইন্ডিয়ান স্টেটস: ১৯৬০-৬১ টু ২০২৩-২৪’ বলছে, পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় জিডিপিতে অংশ ১৯৬০-৬১ সালে ছিল ১০.৫ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫.৬ শতাংশ। মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের ১২৭.৫ শতাংশ থেকে কমে এখন হয়েছে ৮৩.৭ শতাংশ। তৃণমূল সরকার গত ১৫ বছরে আটটি বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটের আয়োজন করেছে, যেখানে মোট ২৩.৪০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হলেও, বড় কোনও প্রকল্প বাস্তবে দেখা যায়নি। উল্টে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল ২০১১ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৫-এর মধ্যে ৬,৬৮৮টি কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদের রেজিস্টার্ড অফিস সরিয়ে নিয়েছে, যার মধ্যে ১১০টি ছিল স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত।

এই অর্থনৈতিক সঙ্কোচনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে এখন ২.৪২ কোটি মহিলা মাসে ১,২০০ টাকা (সাধারণ শ্রেণি) বা ১,৭০০ টাকা (সংরক্ষিত শ্রেণি) করে পান— রাজ্যের মোট মহিলা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। কন্যাশ্রী প্রকল্পের নাম নথিভুক্ত সুফলভোগী প্রায় এক কোটি। কিন্তু এই নগদ টাকা দেওয়ার প্রকল্পগুলি কি দীর্ঘমেয়াদি কোনও সমাধান দিতে পারছে? ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত নমুনা নিবন্ধন সমীক্ষা (এসআরএস— Sample Registration System) রিপোর্ট বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ৬.৩ শতাংশ মহিলার বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়সের আগে— যেখানে জাতীয় গড় মাত্র ২.১ শতাংশ। অথচ কন্যাশ্রী প্রকল্পটি চালু হয়েছিল বাল্যবিবাহ রোধের লক্ষ্যেই। এক দশক পরেও এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে শুধু টাকা বিলি করলে সামাজিক পরিবর্তন আসে না।

অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো শুধু তাদের অর্থনৈতিক জীবনকেই ব্যাহত করেনি, বরং বাঙালির আত্মপরিচয়েও আঘাত হেনেছে। কেরালায় গিয়ে কাজ করা একদল যুবক জানিয়েছেন, তাঁদের ট্রেনের টিকিট না পেয়ে ওড়িশায় যেতে হয়েছিল, আর সেখানে পৌঁছনোমাত্রই তিন দিনের জন্য আটক রাখা হয়েছিল। গুরুগ্রামের মতো অভিজাত শহরাঞ্চলে যখন আবর্জনা জমতে শুরু করেছিল— কারণ পরিষ্কার করার লোকই পাওয়া যাচ্ছিল না— তখন কিছু মানুষের চোখ খুলেছিল। কিন্তু ততদিনে হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হয়রানি করা হয়েছে, আটক করা হয়েছে, কাউকে কাউকে সীমান্তের ওপারেও ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্ব এই আক্রমণকে ‘বাঙালি অস্মিতা’র ওপর আঘাত বলে চিহ্নিত করেছেন, অভিবাসীদের রাজ্যে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন, এমনকি ফিরে আসা প্রতিটি অভিবাসীকে ৫,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কাছে এই প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর?

 

গঙ্গা পেরিয়ে গঞ্জের বাতাস: বাংলাদেশের বদলে যাওয়া মানসিকতা

‘আমরা— এক সচেতন প্রয়াস’-এর শুভপ্রতিম রায়চৌধুরী যখন বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় লালন মেলায় যান, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বেশ কিছু সঙ্গীতজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেন, এবং তাঁরা জানান যে আগে তাঁরা হিন্দু ও মুসলিম জমিদার ও পুরোহিতদের দ্বারা আক্রান্ত হতেন, কিন্তু গত চার দশক ধরে তারা ইসলামপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছেন। কেন বাউল-ফকির সম্প্রদায়গুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গের বাউল-ফকির সম্প্রদায়ের একটি সংগঠনের সচিব আকবর খান বলেন— “আমরা মুসলিম পরিবারে জন্মাই, কিন্তু নামাজ পড়ি না, রোজা রাখি না। আর এখানেই তো সমস্যা।” কুষ্টিয়ার শিক্ষাবিদ লালিম হকের ব্যাখ্যা আরও স্পষ্ট: “বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি পুরোপুরি ইসলামিকৃত হয়ে গেছে। জামায়াতের ইসলামির অনুসারীরা বলছে, সঙ্গীত হারাম।”

এই পরিবর্তন কি শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ? নাকি তার আঁচ এসে লাগছে গঙ্গার এপারেও? মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার আখড়ায় বসে আমানত ফকির বলছিলেন, “ইসলামপন্থীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে হিন্দুত্ব গোষ্ঠীগুলোও পশ্চিমবঙ্গের ময়দানে নেমেছে— আক্রমণ করতে নয়, আত্মীকরণ করতে। আরএসএস বাউল-ফকির সম্প্রদায়কে প্রলোভন দেখিয়ে সংগঠিত করছে, তাদের নিজস্ব মতাদর্শের গান গাওয়াচ্ছে।” আরএসএস-পোষিত ‘ভারতীয় কীর্তন, বাউল ও ভক্তিগীত কল্যাণ সমিতি’ ইতিমধ্যেই রাজ্য জুড়ে সদস্য সংগ্রহ শুরু করেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে দেশটিতে যা ঘটছে, তা নজিরবিহীন। শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৈতৃক বাড়িই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়নি, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ১,৫০০-এর বেশি ভাস্কর্য ও ম্যুরাল (এমন এক ধরনের শিল্পকর্ম যা সরাসরি কোনও দেওয়াল, ছাদ বা অন্য কোনও স্থায়ী সমতলের উপর আঁকা বা খোদাই করা হয়। ল্যাটিন শব্দ ‘মুরাস’ [Muras] থেকে এর উৎপত্তি হয়েছে) ধ্বংস করা হয়েছে। বাউল-ফকির সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বেড়েছে। ২০১১ সালে একটি ১৫ বছর বয়সি বাংলাদেশি মেয়ে কীভাবে সীমান্ত পারাপারের সময় নিহত হয়েছিল, যখন সে কাঁটাতারের বেড়ায় জড়ানো তার কাপড় খোলার চেষ্টা করছিল— সেই ঘটনাটি অনেক বাংলাদেশির স্মৃতিতে জ্বলন্ত আছে। সীমান্তে প্রতিটি সহিংসতার ঘটনা বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ঢাকার রাস্তায় হোক বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা সেখানে ইজরায়েলি জ়ায়নবাদ ও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার সঙ্গে একই সুরে উচ্চারিত হয়। এমনটা কেন হচ্ছে? ১৯৭১-এর পরে বেশ কয়েকটি ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারত-বিরোধী মনোভাবের ভিত্তি মজবুত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফারাক্কা বাঁধ, বিএসএফ-এর নৃশংসতা এবং ছিটমহলের ইস্যু। ভারত, একটি বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে, কি তার উচিত উদারতা দেখিয়েছে, বা বাংলাদেশকে কি তার প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে? একইসঙ্গে প্রকাশ্যে ভারত-বিরোধী বক্তৃতা তীব্রতর হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ, বিএসএফের কড়াকড়ি, সীমান্তে গুলি, ছিটমহল বিনিময়ের জটিলতা— এই সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি যে ক্ষোভ জমেছিল, তা এখন সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির রূপ নিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য এর অর্থ কী? ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রামনবমী শোভাযাত্রার ব্যাপ্তি নিয়ে একটি বিস্তৃত সমীক্ষা বলছে, এই শোভাযাত্রাগুলো এখন বড় শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলিম-বিরোধী ঘৃণামূলক স্লোগান, উস্কানিমূলক ব্যানার আর উত্তেজক সঙ্গীত এখন রামনবমীর শোভাযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ যেখানে সমাজের ইসলামিকরণের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, পশ্চিমবঙ্গ এখন হিন্দুত্বের সামাজিকীকরণের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। দুই বাংলার মাঝে যে সাংস্কৃতিক সেতুটি ছিল— যার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন ফকিরেরা— সেই সেতুটি এখন যেন দুই বিপরীত মতাদর্শের প্রাচীরে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশের এই পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিজেপির ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’-এর আখ্যান যত জোরালো হচ্ছে, ততই বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদের (যেমন মতুয়া সম্প্রদায়) ভোটার হিসেবে ব্যবহারের রাজনীতি তীব্রতর হচ্ছে। অথচ এই একই মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্যরাই এসআইআর প্রক্রিয়ায় ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন— কারণ বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষ হিসেবে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় পূর্বপুরুষের নাম প্রমাণ করা তাঁদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯ তাঁদের ‘হিন্দু শরণার্থী’ হিসেবে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিলেও, ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়ার আতঙ্ক তাঁদের তাড়া করে ফিরছে। তাঁরা আদৌ নাগরিক হতে পারবেন কিনা জানা নেই তবে ১৯১৯ সালের নাগরিকত্ব আইনের ১৪(ক) ধারায় বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে যাঁরা এই দেশে এসেছেন কেবল তাঁরাই বৈধ নাগরিক হতে পারবেন। বর্তমান CAA-তে এই পাসপোর্ট নিয়ে এদেশে আসার ব্যাপারটা কিন্তু অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় শাসক দল যতি প্রতিশ্রুতি দিক না কেন, এই দ্বন্দ্বেই আটকে আছে লাখ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ।

 

দলই শেষ কথা: বাংলার ভোটারদের অদ্ভুত আনুগত্যের সমাজতত্ত্ব

ঐতিহাসিক এবং সাংবাদিক সুহিত কে সেন তাঁর গভীর বিশ্লেষণে একটি বিষয় তুলে ধরেছেন যে উত্তর ভারতের বাকি অংশ থেকে, বিশেষ করে ‘হিন্দি’ বলয় থেকে দীর্ঘ ইতিহাসের বিচ্যুতির দ্বারা পোষিত বাঙালি ‘ব্যতিক্রমবাদ’-এর পক্ষে একটি যুক্তি দেওয়া যায়। এই বিষয়টি সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সংবাদ ও সাহিত্য উভয় স্থানেই ফলপ্রসূভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। শুরুতে এই যুক্তি দিতে চাই যে নির্বাচনী রাজনীতির ক্ষেত্রেও একটি বাঙালি ‘ব্যতিক্রমবাদ’ কাজ করছে, এবং এর ফলাফলের চেয়েও গভীর বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সুতরাং, যে তিনটি বৈশিষ্ট্য ঐতিহাসিকভাবে বাংলার ভোটিং আচরণকে উত্তর ভারতের বাকি অংশ থেকে আলাদা করে, সেগুলি সবই গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, বাংলার রাজনীতি সবসময়ই তীব্রভাবে দলকেন্দ্রিক হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলার ভোটাররা সর্বদা বিজয়ীদের দীর্ঘ সুযোগ দিয়েছে, শাসনের মান বা মানুষের জীবনে সাধারণ উন্নতির দিক থেকে কোনও স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়াই একই দল/জোটকে বারবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছে। এবং তৃতীয়ত, সম্পর্কিতভাবেই, বাংলার ভোটাররা সর্বদা বিজয়ীদের একটি জোরালো আদেশ দিয়েছে, দুটি সম্পর্কিত ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। কংগ্রেস, অবশ্যই, ১৯৫২ সালে জয়লাভ করে তখনকার বিধানসভার শক্তি ২৩৮টি আসনের মধ্যে ১৫০টি আসন পেয়ে, যা মোট আসনের ৬৩ শতাংশ, ভোট শেয়ার প্রায় ৩৯ শতাংশ ছিল। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৯টি আসন জিতেছিলেন। ১৯৫৭ সালে, কংগ্রেস সম্প্রসারিত সদনে ২৫২টি আসনের মধ্যে ১৫২টি আসন জেতে, বাম জোট শক্তি বাড়িয়ে ৭৫টি আসন জেতে। কংগ্রেসের ভোট শেয়ার ছিল ৪৬ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২৫টি আসন জিতেছিলেন। ১৯৬২ সালে, কংগ্রেস ২৫২টি আসনের মধ্যে ১৫৭টি আসন জেতে, ভোট শেয়ার ৪৭ শতাংশ ছিল। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১১টি আসন জিতেছিলেন। ১৯৬৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী ১৯৬৯ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলি ব্যতিক্রম ছিল, কারণ কংগ্রেস থেকে দলত্যাগ এবং অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রেস গঠন অমীমাংসিত ফলাফল সৃষ্টি করে এবং দুটি স্বল্পস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার ও আরও স্বল্পস্থায়ী কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হয়।

১৯৭২ সালে, আমি উপরে যে প্রবণতাগুলির কথা উল্লেখ করেছি, যা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট, সেগুলি জমাট বাঁধতে শুরু করে। সেই বছরের বিধানসভা নির্বাচনে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে, কংগ্রেস ৪৯ শতাংশ ভোট শেয়ার নিয়ে ২১৬টি আসন জেতে, অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সিপিআই), যা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল, ৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ৩৫টি আসন জেতে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পাঁচটি আসন জিতেছিলেন। সূত্রগুলি ২৮০টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের হিসাব দেয়, যদিও সদনের শক্তি বর্তমান ২৯৪-তে বেড়ে গিয়েছিল। এই অসঙ্গতি রেকর্ডে রয়ে গেছে। ১৯৭৭ থেকে ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, বামফ্রন্ট ভোটে আধিপত্য বিস্তার করে, বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জেতে। কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন, তবে তাঁদের অনেকেই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাতটি নির্বাচনে— ১৯৭৭, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৯১ (এক বছর আগে ডাকা), ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৬— বামফ্রন্ট যথাক্রমে ২৩১, ২৩৮, ২৫১, ২৪৫, ২০৩, ২০৬ ও ২৩৫টি আসন পায়। সব নির্বাচনেই বামফ্রন্ট ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১-এ সামান্য পতনের পর, বামফ্রন্ট ২০০৬ সালে একটি বিশাল সংখ্যা পোস্ট করে, যদিও এটি তার শেষ গান (সোয়ানসং) হিসেবে প্রমাণিত হয়, যা প্রায় বিলুপ্তির দিকে যাত্রার ইঙ্গিত দেয়।

এর পেছনে কাজ করছে ‘পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি’ নামে পরিচিত এক গভীর প্রক্রিয়া। বামফ্রন্ট সরকার তার ৩৪ বছরের শাসনকালে যে মডেল তৈরি করেছিল, তা ছিল একইসঙ্গে সূক্ষ্ম ও সর্বগ্রাসী। প্রথমত, তারা রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করতে শুরু করেছিল— ট্রেড ইউনিয়ন, সরকারি কর্মচারী সমিতি, শিক্ষক-ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে পাড়ার ক্লাব ও পূজা কমিটি পর্যন্ত। দ্বিতীয়ত, আমলাতন্ত্র ও পুলিশের নিম্নস্তর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বত্র অনুগতদের দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল। তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দল ও সরকারের মধ্যে পার্থক্যটাই অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল— যে কাজটি সিপিআই(এম)-এর সদর দপ্তর আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে নিয়ন্ত্রিত হত। আর তৃণমূল ২০১১ থেকে এখন পর্যন্ত— এই ধারাবাহিকতা নিছক কাকতালীয় হতে পারে না।

তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর ঠিক এই ছাঁচটাই নিজেদের মতো করে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। পার্থক্য শুধু এই যে সিপিআই(এম) ছিল একটি ক্যাডার-ভিত্তিক দল, তাদের ছিল কিংবদন্তিতুল্য সাংগঠনিক কাঠামো— যার ধারেকাছে তৃণমূল পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু পৃষ্ঠপোষক-মক্কেল সম্পর্কের যে বন্ধন, সেটা দুই শাসনকালেই অটুট থেকেছে। ভোটাররা বুঝে গেছেন যে ক্ষমতাসীন দলই সেই মাধ্যম যা তাদের কাছে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে পারে। তাই তাঁরা সেই দলকেই ভোট দিতে থাকেন, শাসনের মানের প্রশ্নটি গৌণ হয়ে যায়।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের কিছু পরিসংখ্যান এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে। ৬৪ জন ‘দলত্যাগী’ প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩২ জন বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু মাত্র আটজন জিতেছিলেন। বিজেপির টিকিটে লড়া ১৮ জন তৃণমূল দলত্যাগীর মধ্যে জিতেছিলেন মাত্র চারজন। রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সামলানো নেতাও হেরে যান। অন্যদিকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া দলত্যাগীদের সাফল্যের হার ছিল ৭০ শতাংশ। বাবুল সুপ্রিয় বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়ে দূরবর্তী এক বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতে গেলেন, যে এলাকার সঙ্গে তাঁর কোনও পূর্বপরিচয় ছিল না। সৌমিত্র খান তৃণমূল থেকে বিজেপিতে গিয়েও নিজের আসন ধরে রাখতে পেরেছিলেন, কিন্তু অনুপম হাজরা একই পথে হেঁটে হেরে যান। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলার ভোটার ব্যক্তিকে নয়, দলকেই ভোট দেন। এই ‘পার্টি লয়্যালটি’ বা দলভক্তি বাংলার নির্বাচনী রাজনীতির সবচেয়ে গভীরে প্রোথিত বৈশিষ্ট্য।

বর্তমান দ্বিমেরুকরণের প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে। বলা হয় যে বামফ্রন্ট ছিল দৃঢ়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, আর তৃণমূল হিন্দু-মুসলমান উভয়ের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলে। সমালোচকরা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সীমিত রাজস্ব ধর্মীয় কাজে ব্যয় করা, বিশাল মন্দির নির্মাণ করা অনুচিত। কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সিপিআই(এম)-এর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ছিল মূলত ধর্মনিরপেক্ষ দল— কংগ্রেস, তৃণমূল। বিজেপি তখন ছিল একেবারেই প্রান্তিক শক্তি। এখন যখন বিজেপি প্রধান বিরোধী দল, যার ভোট শেয়ার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি, তখন তৃণমূলের পক্ষে ধর্মীয় অনুভূতির কারসাজি থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা প্রায় অসম্ভব। সিপিআই(এম)-এর ক্রমাগত ভাঙন ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থানকে মেনে নেওয়ার রাজনীতি এই দ্বিমেরুকরণকে আরও তীব্র করেছে। এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতা কোনও মূল ইস্যু নয়; বরং প্রতিযোগিতা চলছে নরম হিন্দুত্ব বনাম কট্টর হিন্দুত্বের মধ্যে।

 

ফাটলের গভীরে: নিরাময়ের পথ কি এখনও খোলা?

২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যু হয়েছিল ৫০ জনের। দলীয় ও আন্তঃদলীয় সংঘর্ষে গ্রামগুলো পরিণত হয়েছিল রক্তাক্ত ময়দানে। ১১ বছরের তামান্না খাতুন মারা গিয়েছিল স্থানীয় নির্বাচনের জয়োল্লাসে দেশি বোমা ছোড়ার ঘটনায়। আরজিকর মেডিকেল কলেজের মহিলা চিকিৎসকেরা এখনও কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অভিবাসী শ্রমিকেরা ভিড় জমান স্টেশনে, ট্রেন ধরবেন বলে— কিন্তু জানেন না গন্তব্যে পৌঁছে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক হবেন কি না।

পশ্চিমবঙ্গের এই সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, অস্তিত্বেরও। যে বাংলা ছিল নবজাগরণ ও সংস্কারের পীঠস্থান— যে বাংলা ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাত ধরে সামাজিক সংস্কারের পথ দেখিয়েছিল, যে বাংলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিতে বিশ্বসংস্কৃতিতে অবদান রেখেছিল, যে বাংলা সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিহত করেছিল আর জাতি-সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল— সেই বাংলাই এখন দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা মোড়ে।

নীতি আয়োগের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন কিছুটা আশার কথাও শোনায়। রাজ্যটি শিশুমৃত্যুর হার ও প্রজনন হারে উন্নতি করেছে। ২০২৩ সালের এসআরএস রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে শিশুমৃত্যুর হার ১৭ (জাতীয় গড় ২৫)। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হারও কমে দাঁড়িয়েছে ১১.৮৯ শতাংশ। কিন্তু এই উন্নতির সূচকগুলো কি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তাহীনতা, কাজের অভাব, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা— এই সবকিছুকে ছাপিয়ে যেতে পারবে?

সুশীল সমাজের ভূমিকা এখানে অপরিহার্য। গড় বাঙালি, যিনি প্রতি সুযোগেই রাজ্য ছাড়তে ব্যস্ত বলে মনে হয়, তিনিও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এই বিভেদরেখাগুলো মেরামত করতে হবে রাজ্যের বৈচিত্র্যময় মানুষকেই। প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যা ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে সহাবস্থানের পথ খোঁজে। প্রয়োজন এমন এক অর্থনৈতিক নীতি যা শুধু নগদ অর্থ বিতরণ করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। প্রয়োজন এমন এক সামাজিক উদ্যোগ যা বাউল-ফকিরদের আখড়া, পাড়ার ক্লাব, স্কুল-কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে।

দীঘার জগন্নাথ মন্দিরের চূড়ায় আলো যেমন পড়ে, তেমনি আলো পড়ুক মুর্শিদাবাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলোতে। সীমান্তে আটকে পড়া অভিবাসীদের মুখে ফুটে উঠুক নিরাপত্তার হাসি। আর সেই শিশুটির কবরে যে বোমার আওয়াজকেই জীবনের শেষ শব্দ হিসেবে শুনেছিল— তার স্মৃতি যেন আগামী প্রজন্মকে শেখায় যে বিভাজনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে।

পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরেই— রাজ্যটি কি ফিরে পাবে তার পুরনো চরিত্র, সেই উদার, সহিষ্ণু, সৃষ্টিশীল বাংলার স্বরূপ? নাকি বিভাজনের এই নতুন বলয়েই চিরস্থায়ী হবে তার পরিচয়? সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, আর ঘড়ির কাঁটা যে দিকে ঘুরছে, তা খুব আশাপ্রদ নয়। তবু, ইতিহাস সাক্ষী, বাংলা বারবার ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগেও কি তেমনই কোনও জাগরণ সম্ভব? সেই উত্তর লুকিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় দশ কোটি মানুষের সমষ্টিগত ইচ্ছাশক্তির মধ্যে— যাঁদের অনেকেই এখনও ভাবেন, “বাংলা তার মেয়েকেই চায়” কি না, সেই স্লোগানের রাজনীতি ছাড়িয়ে আরও গভীর কিছু চায় বাংলা— চায় একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ, যেখানে ধর্ম হবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাজনীতি হবে জনকল্যাণের মাধ্যম, আর অভিবাসন হবে পছন্দের বিষয়, বাধ্যবাধকতা নয়।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: দ্য হিন্দু-র West Bengal change and continuity ই-বুক

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5364 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...