“মঞ্চ-বহির্ভূত নাটকই আমাদের দেশে নাট্যচর্চার মূল ধারা”

প্রবীর গুহ

 


প্রথাবিরোধী নাট্যচর্চার ধারায় শ্রী প্রবীর গুহ আজ রাজ্য, দেশ তথা আন্তর্জাতিক মহলে একটি পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন ২০০৮ সালে। বাংলাভাষায় প্রসেনিয়াম-বহির্ভূত থিয়েটারের যে ধারাকে পুষ্ট করেছিলেন বাদল সরকার, সে ধারাতেই দেশজ সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিকতার সফল সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন প্রবীর গুহ। তাঁর নাট্যচর্চার অভিজ্ঞতা প্রায় অর্ধশতাব্দীর। এখনও তিনি একইরকম সক্রিয়, নতুন পথের সন্ধানে ব্যস্ত। নাটক নিয়ে প্রবীরবাবুর ভাবনাচিন্তার কথা জানার জন্য চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম সময় চেয়েছিল তাঁর কাছে, যাতে তিনি সহৃদয় প্রশ্রয়ে সম্মতি দিয়েছেন। এক বৃষ্টির সন্ধেয় আমরা উপস্থিত হয়েছিলাম মধ্যমগ্রামে প্রবীরদার ছিমছাম রুচিস্নিগ্ধ বাড়িটিতে, যে বাড়িটি থেকে তিনি মাত্র কিছুদিন আগে, মহামারি-আক্রান্ত সময়ে বিদায় জানিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও স্ত্রী শ্রীমতি আলপনা গুহ-কে। কিন্তু ঠিক এই সময় প্রবীরদার বাড়িটি ভরে আছে এক নতুন অতিথি, তাঁর আদরের নাতনি আয়না বিবি-র হাসিখেলায়। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়েই বোঝা গেল এ-বাড়ির নাম কেন ‘আয়না বিবির বাড়ি’। প্রবীর গুহ-র সঙ্গে দীর্ঘ ও অন্তরঙ্গ কথোপকথন ধরা রইল আগ্রহী পাঠকের জন্য।

 

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: প্রবীরদা, প্রথমেই যেটা আপনার কাছে জানতে চাইব তা হল ভারতবর্ষে মঞ্চ-বহির্ভূত নাটক বা প্রথাবহির্ভূত নাটকের ইতিহাস বিষয়ে। সাম্প্রতিককালে আমরা দেখেছি বাদল সরকার বাংলা নাটককে প্রসেনিয়ামের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন এবং তিনি সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু তা নিশ্চয়ই আমাদের দেশে মঞ্চ-বহির্ভূত নাটকের সূচনাকাল হতে পারে না, এর ঐতিহ্য নিশ্চয়ই অনেক পুরনো। এই ধারার নাট্যচর্চা প্রথম শুরু হয়েছিল কবে ও কীভাবে?

প্রবীর গুহ: প্রথমেই এই কথাটা স্পষ্ট করে বলে রাখা দরকার— শুরু থেকেই আমাদের দেশের নাট্যচর্চা কিন্তু মঞ্চ-বহির্ভূত নাটকেরই চর্চা। মঞ্চে অভিনীত নাটককেই আমরা এখন প্রথা বা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি বটে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ ভুল। মঞ্চ-নাটকের চর্চা সম্পূর্ণভাবে বিদেশি বা ইউরোপের নাটকের ধারার অনুসারী। মঞ্চ-বহির্ভূত নাটক কিন্তু আমাদের দেশে কোনও ব্যতিক্রমী ধারা নয়, বরং ১৮৫৭-র আগে সেটাই ছিল নাট্যচর্চার মূল ধারা। আমাদের দেশে মঞ্চে অভিনীত নাটকের ধারাটাই তৈরি হয়েছে সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে। তার আগে তো মঞ্চ বলেই কিছু ছিল না। তার আগে গাছতলা, মন্দিরতলা, মাচানতলা— এসবই ছিল আমাদের নাটক করার জায়গা। তারপর ছোট ছোট স্পেস তৈরি হল। ডেইটি তৈরি হল… পুজোর জন্য, সঙ্কীর্তনের জন্য… সেই জায়গাগুলো ব্যবহৃত হতে শুরু করল। বাড়ির উঠোনে থিয়েটার হত। থিয়েটার বলতে তখন পটের গান, রামকথা, নামসঙ্কীর্তন— মূলত এগুলোই হত। অনেকদিন ধরে এই ফর্মেই থিয়েটারটা ছিল। এইভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে চলতে আস্তে আস্তে যাত্রার ফরম্যাটটা এল। বলা যায় যে, বাংলায় চৈতন্য-পরবর্তী যুগ থেকে যাত্রাটা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। গ্রামাঞ্চলে যাত্রা, পালাগান ইত্যাদি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। যাত্রাপালা দুদিক থেকে আমাদের সংস্কৃতি ও সমাজের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা ছিল। প্রথমত, যাত্রার মাধ্যমে গ্রামের মানুষ প্রচুর খবরাখবর পেতে পারত, শিক্ষণীয় বিষয় জানতে পারত। যেমন— তখনকার দিনে রামায়ণ-মহাভারতের নানা ঘটনা নিয়ে তৈরি যাত্রাপালা মানুষের কাছে একটা নীতিশিক্ষার পাঠ ছিল। তারা জানতে পারত কোন জিনিসটা ঠিক, কোন জিনিসটা ভুল। পরের দিকে সেই যাত্রাই রূপান্তরিত হয়ে ঐতিহাসিক পালায় পরিণত হয়, ইতিহাসের নানা তথ্য মানুষ জানতে পারত এইসব পালার মধ্যে দিয়েই। ফলে দেশের কোথায় কী ঘটেছে, কোথায় কে কার রাজ্য আক্রমণ করেছে সেগুলো সাধারণ মানুষ জানতে আরম্ভ করল। এইভাবে একইসঙ্গে ইনফরমেশন ও এন্টারটেইনমেন্ট, এই দুধরনের কাজই যাত্রা সম্পন্ন করত এবং সাধারণ মানুষও এর প্রতি আকৃষ্ট হত। তারপর ১৮৫৭ সালে সাহেবরা এসে প্রথম বলল, এসব নেটিভদের কাজ, ওসব সিরিয়াস কিছু নয়, ‘যাত্রা করে ফাতরা লোকে’, থিয়েটার হচ্ছে আসলে হল এই, যা আমরা করছি। ফলে সাহেবদের দ্বারা শিক্ষিত হয়ে, সাহেবদের অনুকরণ করে, আমরা আমাদের নিজস্ব থিয়েটারের ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে ইউরোপের শেখানো থিয়েটারকে আপন করে নিতে শুরু করলাম। আর বিশেষ করে বাঙালিদের সাহেবপ্রীতি একটু বেশি— একটু মাত্রাতিরিক্ত বেশি। আমরা ইংরেজি না পারলেও, আমাদের কথাবার্তার মধ্যে একটা-দুটো ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে দিতে পারলেই খুব গর্ব অনুভব করি। দিয়েছি তো একটা ‘But’ ঢুকিয়ে, তারপর দেখা যাক…। ফলত, ওই সময় থেকেই আমরা সাহেবদের থিয়েটারকেই আমাদের নিজেদের থিয়েটার বলে মনে করতে আরম্ভ করলাম। এবং তারপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষিত মানুষ ভাবে যে এটাই একমাত্র থিয়েটার, এর বাইরে থিয়েটার বলে কিছু হয় না। এমনকি সেই প্রজন্মটাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ, যারা জানেই না যে এর বাইরেও থিয়েটার বলে অন্য কোনও কিছুর অস্তিত্ব আছে।

মিছিল; বাদল সরকার

এরপর বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, যখন সারা পৃথিবী জুড়েই সময় খারাপ হতে শুরু করেছে, একটা বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে, আমরা আস্তে আস্তে বাইরের জগতের খবর একটু-আধটু করে পেতে আরম্ভ করলাম। তখন আমরা আস্তে আস্তে শুনতে পাচ্ছি যে বিভিন্ন জায়গায় অন্যভাবেও নাটক হয়, পথনাটক হয়, ওপেন এয়ার নাটক হয়, সেখানে এই ধরনের বিদ্রোহের গল্প শোনানো হয়, নানা কথা উঠে আসে। সেইসব আঁচগুলো আস্তে আস্তে আমাদের কাছে এসে পৌঁছোচ্ছিল। ১৯৫১ সালে যখন আমাদের দেশে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন হল, আমরা দেখতে পেলাম, কমিউনিস্ট পার্টি সেই প্রথমবার পথ-নাটক শুরু করল। তবে তা ছিল একেবারেই ভোটের প্রচারের জন্য তৈরি নাটক। সেটার আর কোনও সাংস্কৃতিক বা শৈল্পিক মাত্রা ছিল না। সেইভাবেই অনেকদিন পর্যন্ত প্রচার-নাটিকা হিসেবেই এই পথনাটক হচ্ছিল, অনেক পরে উৎপল দত্ত এসে কিছু ওপেন এয়ার থিয়েটার করার চেষ্টা করলেন, যা অবশ্যই রাজনৈতিক, কিন্তু তা শুধুমাত্র ভোটের জন্য তৈরি নয়, তার বাইরেও সে নাটকের একটা বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল। এরপরে নিশ্চিতভাবে অন্যধারার নাটকে যিনি প্রাণসঞ্চার করলেন, তিনি বাদল সরকার। বাদলদা বিদেশ থেকে নানা নাটক দেখে এসেছিলেন, শিখে এসেছিলেন, এসে একটা নতুন থিয়েটারের কথা উনি বললেন। উনি একটা ইন্টিমেট স্পেস-এ থিয়েটার করা শুরু করলেন। ইন্টিমেট স্পেস বলতে খুব ছোট জায়গায় খুব অল্প সংখ্যক দর্শক নিয়ে নাটক করা শুরু হল, কোনও ক্লাবের জিবি মিটিং-এ যেমন অল্প লোক থাকে, অথবা পাড়ার পুজো মিটিং-এ যেমন লোকজন থাকে, যেখানে মনের কথা একটু খুলে বলা যায়, কোনও আলোচনা একটু বিস্তারিত করা যায়, তারই উপযোগী এবং অল্পসংখ্যক দর্শকই উপস্থিত সেখানে থাকত। এর মধ্যে দিয়ে থিয়েটারের একটা অন্য ভাষা, অন্য রূপ, এমনকি অন্য অর্থনীতিই আস্তে আস্তে ফুটে উঠছিল। সেই ইন্টিমেট স্পেসটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে বাদলদা কখনও কার্জন পার্কে নাটক করছেন, কখনও কোনও মাঠে করছেন, কখনও ফয়ারে করছেন, এইভাবে ব্যাপারটা চলতে শুরু করল। সেইসময় এই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অন্যান্য ছোটখাটো দল কাজ করতে শুরু করল, এই অন্য ধারার নাটক বিভিন্ন জায়গায় পুষ্ট হতে শুরু করল। আর এইভাবে কাজ করতে করতে প্রত্যেকেই নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল, কখনও রাজনৈতিক বাধা, কখনও থিয়েটার-জনিত কিছু বাধা, কখনও সামাজিক বাধা— এমন নানা বাধার সামনাসামনি হতে হচ্ছিল। এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই লড়ে যাচ্ছিল কী করে সেই বাধা অতিক্রম করা যায়। এই সময় আমি ও আমার দল লড়াই চালাচ্ছিলাম আমাদের নিজেদের মতো করে। এই চেষ্টা করতে করতেই প্রত্যেকের একটা নিজস্বতা তৈরি হল, প্রত্যেকে একেকটা নিজস্ব ঘরানায় থিয়েটার করতে আরম্ভ করল।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: অনেকখানি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল। আপনি কি একেবারে প্রথম থেকেই এই ধরনের মঞ্চ-বহির্ভূত থিয়েটার করবেন বলে ঠিক করে নিয়েছিলেন?

প্রবীর গুহ: একদমই। আলাদা করে আমার ক্ষেত্রে একটা সুবিধে ছিল যে প্রথম থেকেই আমার স্থির সিদ্ধান্ত ছিল যে, যাই হয়ে যাক না কেন, আমি এই থিয়েটারটাই করব। এবং এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণভাবেই আমার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। থিয়েটার দেখে ভালো লেগেছে— তাই থিয়েটার করতে এসেছি এমন কোনও ব্যাপার ছিল না। আমার কাছে থিয়েটার করা মানেই ছিল এই যে আমি থিয়েটারকে পলিটিকালি ব্যবহার করব। এই পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই আমি থিয়েটার করতে এসেছিলাম। ফলে আমার থিয়েটার করতে আসার পেছনে প্রথম থেকেই একটা দর্শন কাজ করেছিল। আমি জানতাম আমি কেন থিয়েটার করব, কাদের জন্য থিয়েটার করব, তাদের জন্য থিয়েটার করতে হলে আমাকে কোথায় গিয়ে থিয়েটার করতে হবে, তাদের কাছে গিয়ে কী কথা আমাকে বলতে হবে— এই সমস্ত কিছু আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার ছিল। এই কারণে থিয়েটার নিয়ে আমার ভাবনাচিন্তার সঙ্গে অন্যদের ভাবনাচিন্তার একটু হলেও ফারাক ছিল। আমি কখনও শহরমুখী নই, আমি প্রথম থেকেই গ্রামমুখী হয়ে গেলাম। কারণ আমি শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষদের বাইরে যে বৃহত্তর জনসাধারণ, মূলত তাঁদের জন্যেই থিয়েটার করতে চাইছিলাম। আমি থিয়েটারটা শিখেছিও ওইসব মানুষদের কাছেই। ভারতের যে আবহমান লোকসংস্কৃতি, তার থেকেই আমার থিয়েটার-শিক্ষা। আর সেই থিয়েটারের অস্তিত্ব শুধুমাত্র গ্রামেই ছিল, আজও কিছু কিছু জায়গায় তার অস্তিত্ব রয়ে গেছে। ফলে আমার থিয়েটারের কমিটমেন্টটাই ছিল মূলত গ্রামের মানুষদের প্রতি। এই কমিটমেন্ট থেকেই ধীরে ধীরে একটা অন্য ভাষা তৈরি হতে শুরু করল। এখন সেই ভাষাও নানা জায়গায় নানা রূপ নিচ্ছে, আরও উন্নত হচ্ছে। বহু মানুষ চেষ্টা করছেন অন্যভাবে কথা বলার জন্য। এখন অনেকেই জেনে গেছেন যে থিয়েটার মানেই সেটা শুধু প্রসেনিয়াম নয়, থিয়েটার অর্থে নানা কিছু হতে পারে, তা ইন্টিমেট হতে পারে, পথেও হতে পারে, পার্কে হতে পারে, বাড়ির উঠোনেও হতে পারে, ছাদেও হতে পারে, নৌকোতেও হতে পারে, সমবেতভাবে হতে পারে, একা একজন মানুষের দ্বারাও হতে পারে— থিয়েটারে এখন সবটাই সম্ভব।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: এবার সরাসরি আপনার থিয়েটার জীবনের প্রসঙ্গে আসি। ১৯৭৭ সালে যখন আপনি প্রথমবার স্বাধীনভাবে থিয়েটার করা শুরু করেন, আপনি তার নাম দিয়েছিলেন ‘লিভিং থিয়েটার’। পরবর্তীকালে, আরও কিছু থিয়েটারের নাম আপনার কাছ থেকে আমরা পেয়েছি— যেমন, ‘অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটার’, ‘জার্নি থিয়েটার’ এমনকি ‘ইনভিজিবল থিয়েটার’। এগুলো কি শুধুই একই থিয়েটারের বিভিন্ন নাম নাকি এগুলো আপনার থিয়েটারের কোনও চরিত্রগত গুণকে নির্দেশ করছে, যা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে? এই জায়গাগুলো যদি আপনি একটু বুঝিয়ে বলেন…।

প্রবীর গুহ: প্রথমত, ‘লিভিং থিয়েটার’ ছিল আমার দলটার নাম। নাটকের দল করছি যখন, দলের একটা নাম দিতে হবে তো! তখন অতশত না ভেবেই দলের নাম রেখেছিলাম ‘লিভিং থিয়েটার’। একটা ধারণা ছিল যে থিয়েটার মধ্য দিয়ে একটা লিভিং বা জৈব ব্যাপারস্যাপার ঘটবে। পরে দেখলাম এই একই নামে একটি নাটকের দল আগে থেকেই আছে। আমেরিকায়। তারা খুবই শক্তিশালী একটা নাটকের দল। সৌভাগ্যক্রমে, যদিও আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি না, তাও কথার কথা হিসেবে বলছি… সৌভাগ্যক্রমে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমি এই দলটির যিনি প্রতিষ্ঠাতা, জুলিয়ান বেক[1] এবং তাঁর স্ত্রী জুডিথ ম্যালিনা, এঁদের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলাম, তখন প্রায় জুলিয়ানের শেষ সময়। তিনি আমাকে একটা বইও উপহার দিয়েছিলেন, সেই বইতে তিনি লিখে দিয়েছিলেন যে আমি খুশি যে আমি চলে যাওয়ার পরেও পৃথিবীতে লিভিং থিয়েটার চলতে থাকবে। তিনি আমাকে বলেছিলেন— “আমি আর সামান্য কিছুদিন বাঁচব। তুমি যদি কিছু মনে না করো, তাহলে আমি তোমাকে নিজে হাতে এক কাপ কফি বানিয়ে খাওয়াতে চাই।“ আমার সেই সৌভাগ্য হয়েছিল, আমি তাঁর হাতে তৈরি কফি খেয়ে এসেছিলাম। যাই হোক, আমার ‘লিভিং থিয়েটার’ সে-সময় একটা দল হিসেবে কাজ করত। কারণ প্রথম দশ বছর আমি নানারকম জটিলতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। আর্থিক অসুবিধেয় পড়েছি, নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছি। এই চ্যালেঞ্জের সামনাসামনি হতে হতেই ভাবনাচিন্তা চলেছে যে আর কীরকমভাবে থিয়েটার করা যায়, আরও নতুন কিছু করা যায় কিনা, সেই প্রথম দশ বছর আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জের যুগ ছিল, যা আসলে নিজের কাছে নিজের চ্যালেঞ্জ। এইভাবে কি থিয়েটারটা করতে পারা যায়? নাকি ওইভাবে করব? উদ্দেশ্য ছিল নিত্যনতুন উদ্ভাবনের মধ্যে দিয়ে আমাদের থিয়েটারটাকে নতুন ও অন্যরকম করে তোলা, যার মধ্যে দিয়ে আমি যে কথাগুলো বলতে চাই সেগুলো সহজে বলতে পারব। শুধুমাত্র ফর্মের দিক থেকে নতুনত্বের জন্য নতুনত্বের খোঁজ নয়, বরং কী করে থিয়েটারটা করলে আরও ভালো করে, মানুষের সঙ্গে আরও সরাসরি কমিউনিকেট করতে পারব, সেটাই ছিল নতুনত্ব খোঁজার আসল কারণ। কীভাবে করলে খুব কম খরচে নাটকটা করা যেতে পারে, সেটাও ছিল একটা ভাবনার জায়গা। কারণ আমাদের তো তেমন কোনও টাকাপয়সা ছিল না। কীভাবে নাটক করলে আমি যে কথাটা বলতে চাইছি, তা দর্শকের মর্মে পৌঁছে দেওয়া যায়— এগুলোই ছিল আমাদের অনুসন্ধানের বিষয়। এই খোঁজ করতে গিয়ে নানা ধরনের থিয়েটার আমরা করেছি। এবং এক্ষেত্রে আমি একা নই, দেখা যাচ্ছে অগাস্টো বোয়াল[2] যখন থিয়েটার করেছেন, তিনিও নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়েই এগিয়েছিলেন। তাঁর নাটকরীতির নাম ছিল, আমার ক্ষেত্রেও নামগুলো আলাদা, যদিও অনেক জায়গায় আমরা কাছাকাছি গিয়েছি। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতেই আমার নাটকের নানা নাম এসেছিল, কখনও ইমিডিয়েট থিয়েটার, কখনও জার্নি থিয়েটার, কখনও বা ইনভিজিবল থিয়েটার। এই ইনভিজিবল থিয়েটার নামটা আমার দেওয়া নয়, এটা ওঁরই শব্দ মানে অগাস্টো বোয়ালের দেওয়া শব্দ, আমি ধার করেছিলাম বলতে পারা যায়। অর্থাৎ এইসবগুলোই আমার থিয়েটারের একেকটা প্রকরণ যা নিয়ে একেক সময় আমরা কাজ করেছি।

জুলিয়ান ব্লেক ও জুডিথ ম্যালিনা

এই সমস্ত প্রকরণ ও প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের অভীষ্ট নাটকে পৌঁছনোর চেষ্টা করছিলাম। যেমন, আমরা একটা নাটক করেছিলাম যেটার প্রতি শো করার খরচ ছিল মাত্র একশো টাকা। এটা আমি কিন্তু বেশিদিন আগের কথা বলছি না, মাত্র তিন-চার বছর আগের কথা বলছি। অর্থাৎ এই একশোটা টাকা খরচা করলে আমার থিয়েটারটা হয়ে যেত। আরেকটা থিয়েটার করতে আমার গোটা পঁচিশ টাকা লাগত। আর সাম্প্রতিক যে থিয়েটারটা করছি, ওটার খরচ শূন্য, আমার এক পয়সাও লাগছে না, একেবারে বিনেপয়সায় কাজ করতে পারছি। এরকম নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা আমরা করে যাচ্ছি।

অগাস্টো বোয়াল

যেটা বলছিলাম, এইভাবে দশ বছর চলার পরে নানা কাণ্ড, নানা বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে ১৯৮৭ সাল নাগাদ আমাকে খড়দহ থেকে উৎখাত করে দেওয়া হল। সেই উচ্ছেদের কারণ একেবারেই রাজনৈতিক। তারপর থেকে কখনও রাস্তায় থিয়েটার করছি, কখনও পার্কে করছি, কখনও বাড়ির ছাদে করছি এবং সেখান থেকেও আপত্তি আসছে। আমাকে টিঁকতেই দেওয়া হবে না এমন একটা অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। আমার থিয়েটারজীবন ওখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। তখনকার শাসক দল অর্থাৎ বামপন্থীরা, বিশেষ করে সিপিআই(এম) আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি আর দলটাকে ধরে রাখতে পারলাম না। দলটা ভেঙে গেল। কিছু ছেলেমেয়ে অবশ্য আমার সঙ্গে থেকে গেল। যাই হোক, পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে আমি যদি একটা স্পেস না পাই, তাহলে থিয়েটার করা আমাকে বন্ধ করে দিতে হবে। আমার সেসময় একটা সরকারি চাকরি ছিল। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে সেসময় চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। চাকরিটা ছাড়ার সময় অতি সামান্য টাকা পেলাম… সাকুল্যে লাখ দেড়েক কি দুয়েক টাকা পেয়েছি কি পাইনি… সেই টাকা দিয়ে মধ্যমগ্রামে একটা জমি কিনলাম… পুরনো পড়ে থাকা একটা জংলা জলা জায়গায় জমিটা কিনেছিলাম, সেখানেই আস্তে আস্তে ঘরটর তৈরি করে আমাদের নাটকের জন্য একটা স্পেস তৈরি করলাম, যেটার নাম দিয়েছি ‘আখড়া’। একটা সুবিধে হল, ওটা সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজেদের জায়গা, কেউ আর ওখান থেকে আমাদের সরাতে পারবে না। তারপর থেকেই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু হল। ‘লিভিং থিয়েটার’ নামটাও আর রাখলাম না। নতুন নাম রাখলাম ‘অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটার’ আর বললাম এটা শুধু আমাদের দলের নাম নয়, এটা আমাদের ফিলজফি। আমরা যা করতে চাইছি, এই নামটার মধ্যেই সেটা বলা আছে।

এইভাবেই শুরু করলাম। ‘আখড়া’-র উদ্বোধন করে দিলেন স্বয়ং হাবিব তনভীর। উনি এসে আমাদের একটা জায়গায় পৌঁছে দিয়ে গেলেন। আর এই স্পেস-এ কে না এসেছেন তারপর থেকে! নাটকের এমন কোনও বড় মানুষ নেই যিনি আমাদের এখানে আসেননি। এই জায়গাটা পাওয়ার পর থেকে আমাদের কাজটা একটা গতি পেল। তখনই আরও নতুন নতুন পরীক্ষানিরীক্ষার যুগ শুরু হল। এবার এটা করি, একটু ওটা করি, সেটা করি! তারপর থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাদের কাজ চলছে… সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে…।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: অর্থাৎ সবমিলিয়ে আপনার নাট্যচর্চার বয়স প্রায় চল্লিশ বছরেরও বেশি্‌… প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি আপনাকে একটা সরাসরি প্রশ্ন করছি, এই দীর্ঘ যাত্রার পর আপনার কী মনে হয়, আপনি ও আপনার থিয়েটার ঠিক কোথায়, কোন জায়গায় অন্যদের চেয়ে আলাদা?

প্রবীর গুহ: আমি কোথায় আলাদা, তা বলতে গেলে সেই আগের কথাটাই আরেকবার বলতে হয়, যে ১৮৫৭ সালে আমরা সাহেবদের থিয়েটারকে আপন করে নিয়ে আমাদের নিজস্ব থিয়েটারের ঘরানা থেকে সরে এসেছিলাম। আমার সবসময় মনে হত যে আমাদের একটা নিজস্ব থিয়েটার দরকার, যেটা হবে ভারতীয় থিয়েটার, বাঙালি থিয়েটার। তাই আমরা সবাই যখন হইহই করে আমাদের দেশে থিয়েটারের দুশো বছর পূর্তির উৎসব পালন করছিলাম, আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আমি তখন কয়েক জায়গাতেও লিখেছিলাম, থিয়েটারের দুশো বছর কেন বলছি আমরা? আমাদের থিয়েটারের ঐতিহ্য তো অনেক অনেক প্রাচীন। বাংলাদেশে আমার দুই বন্ধু ছিল। এক বন্ধু মারা গেছে। আমরা তিনজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলাম। ওখানে গেলেই তিনজনে একসঙ্গে আড্ডা, থাকা, খাওয়া, শোওয়া— এসব চলত। একজনের নাম নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। আরেকজন ছিল সেলিম আলদিন। আর আমরা তিনজনে বিশ্বাস করতাম যে একটা সম্পূর্ণ ভুল জিনিস আমাদের শোনানো হচ্ছে— আমাদের থিয়েটারের ইতিহাস মোটেই মাত্র দুশো বছরের নয়, তার চেয়ে অনেক অনেক পুরনো। এর মধ্যে সেলিম ছিল পণ্ডিত মানুষ, অধ্যাপনা করত। সে পুথিপত্র ঘেঁটে, নিজের লোকলস্কর লাগিয়ে গবেষণা করে সবকিছু খুঁজে বের করল, যে আমাদের থিয়েটারের ইতিহাস আসলে কী। সেই ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে যে ভারতবর্ষে থিয়েটারের ইতিহাস অনেক পুরনো, একদম প্রাচীনকালটা যদি আমি বাদ-ও দিই, তাহলেও দেড় হাজার বছর আগে আমাদের দেশে দেশীয় থিয়েটারের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে কেন সাহেবদের অনুকরণে আমরা দুশো বছরের থিয়েটার বলতে যাব? সেটা শুধু ভারতবর্ষে সাহেবি থিয়েটারের ইতিহাস মাত্র, ভারতীয় থিয়েটারের সামগ্রিক ইতিহাস নয়। তাহলে আমি কেন গর্বিত হব না আমাদের থিয়েটারের ঐতিহ্য নিয়ে?

তা সেইসময় আমাদের থিয়েটার কেমন ছিল? তা যখন খুঁজতে গেছি, আমার মনে হয়েছে, তখন এইভাবে থিয়েটার হত না আমাদের দেশে। টেক্সট আমাদের থিয়েটারে সেভাবে আসেনি, আমাদের ন্যারেটিভ তৈরি হত। সেই ন্যারেটিভের সঙ্গে নাচ, গান, বাদ্য ইত্যাদি জুড়ে দিয়ে আমরা সেটা enactment করি। ঠিক যেমন কীর্তনে হয়, তিজন বাঈ যেভাবে রামকথা শোনান, ভগবতলীলা অথবা ছৌ নাচেও যেভাবে নাচগানের মধ্যে দিয়ে একটা ন্যারেটিভ তৈরি হয়— এইভাবে একটা কথনের সঙ্গে অন্যান্য উপাদানগুলো জড়িয়ে থাকে। এইভাবে আমাদের থিয়েটার গড়ে উঠত। আর আমাদের থিয়েটার কোনও একটা বিশেষ চরিত্র বা কোনও একটা অভিনেতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সবাই মিলে একসঙ্গে নাটকটা তৈরি করে। কখনও এ অভিনয় করছে, কখনও ও অভিনয় করছে, কোনও নির্দিষ্ট একজনের ওপর থিয়েটারটা নির্ভর করছে না৷ অর্থাৎ একজন অভিনেতা শুধুমাত্র একটা চরিত্রেই অভিনয় করে যাবে এমন কোনও মানে নেই। আমাদের আদি থিয়েটারের এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা লক্ষ করলাম। আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, থিয়েটারটা ছিল সম্পূর্ণভাবে সমাজ-নির্ভর, community-based থিয়েটার। কমিউনিটির জন্যই থিয়েটার তৈরি হত, কমিউনিটিই থিয়েটার দেখত, আর এই কমিউনিটিই থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রাখত। আমাদের ছোটবেলাতেও দেখেছি, গ্রামে-গঞ্জে রামকথা, কৃষ্ণকথার আসর বসত, একেকটা গ্রামে একটা দল একমাস-দেড় মাস করে থাকত। আমরা ছেলেপুলেরাই বাড়ি বাড়ি চাল-ডাল তুলে তাদের খাবার জোগাড় করে দিতাম। দুটো পয়সা যা পারতাম, তুলে দিতাম। ওইটুকুই তাদের সম্বল ছিল। তারা ওইটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকত। বেশ কিছুদিন থাকবার পর আসর গুটিয়ে আবার তারা চলে যেত অন্য কোনও জায়গায়। এভাবেই সম্বৎসর কাটত, যা সামান্য পয়সাকড়ি জুটত তা দিয়ে কোনওক্রমে অন্যান্য খরচ চলে যেত। এইভাবে এক অদ্ভুত সুন্দর থিয়েটার হত তখন। কিন্তু এরপর আমরা যত আধুনিক হতে শুরু করলাম, থিয়েটারও তত ভাঙতে শুরু করল।

থিয়েটার ক্রমে গ্রাম থেকে নগরকেন্দ্রিক হয়ে পড়ল, থিয়েটারের ধরন বদলে গেল, মানে বদলে গেল, থিয়েটার ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ল। এখন থিয়েটার হয়ে গেছে এমন, লোকে টিকিট কাটতে এসে বলে— “একটা দেবশঙ্কর দেবেন?” আমি নিজে ফেস্টিভ্যালের সময় টিকিট বিক্রি হতে দেখেছি, দর্শক এসে বলছে— “ওই তো, গৌতম হালদার। দুটো গৌতম হালদার দিন তো! ও সোহিনী আছে, ওটা একটা দিন।” নাটকের নাম জানারও দরকার নেই। পরিচালক কে, দলটার পরিচয় কী— এসবও অপ্রয়োজনীয়। আমরা আজ এই জায়গায় এসে পৌঁছেছি। আমাদের থিয়েটার কমিউনিটি, বাজারি সংবাদমাধ্যম, আমাদের সরকার, দর্শককুল সকলে মিলে আমরা আমাদের থিয়েটারকে সফলভাবে এই জায়গায় পৌঁছে দিতে পেরেছি। তাই এখন আমরা দেখতে পাই, পুরুলিয়ার গ্রামে কোনও মহিলা দিনের পর দিন অভুক্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন, মিডিয়া জিজ্ঞেস করছে— “কৌশিক সেন, আপনি কী বলেন?” সেখানে মহিলাটির বাড়ির কোনও বক্তব্য নেই, এলাকার মানুষের কোনও বক্তব্য নেই, অথচ সে বিষয়ে দেবশঙ্কর হালদারের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আমি কিন্তু কৌশিক বা দেবশঙ্করকে কোনও দোষ দিচ্ছি না, দোষ দিচ্ছি আমাদের সস্তা সংবাদমাধ্যমের এই প্রবণতাকে, কারণ তারা জনপ্রিয়তাকে এইভাবে ব্যবহার করতে চাইছে। আজ যে জায়গায় কৌশিক আছে, কাল সেখানে অন্য কাউকে প্রোজেক্ট করা হবে৷ তখন হয়তো শ্রীজাতের মতামত নেবে— “শ্রীজাত, এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?” এমনকি আমাদের বামপন্থী মানুষদের মধ্যেও এই শহুরেপনা, এই দেখনদারিত্ব চলে এসেছে।

আমাদের সংস্কৃতিকে একেবারেই শহরকেন্দ্রিক করে তোলা হয়েছে, যেন কলকাতার বাইরে আর সমাজ-সংস্কৃতির কোনও অস্তিত্ব নেই। যা নাগরিক নয়, তা-ই অপাঙক্তেয়, অথবা অপ্রয়োজনীয়। একই প্রবণতা থেকেই আমাদের থিয়েটারকেও পরিকল্পিতভাবে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু থিয়েটারকে এভাবে মেরে ফেলা যায় না। থিয়েটার অত সহজে মরবেও না।

আশেপাশে এসব দেখতে দেখতেই আমার এক সময় মনে হয়েছিল, আমি যদি এরকম গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েই থিয়েটার করি, তাহলে আমি অকারণ থিয়েটার করতে এসেছি। আমাকে থিয়েটারের মূল লিগ্যাসিটা ধরতে হবে। কোথায় কোথায় আমাদের থিয়েটার মহান ছিল। কেন আমি এই থিয়েটারটা করব— কাজ শুরু করার সময় এই প্রশ্নটাই আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি ছিল।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: আপনারা নাটকের বিষয় কীভাবে নির্বাচন করতেন বা এখনও করেন?

প্রবীর গুহ: আমি আগেই বলেছি, ভারতবর্ষের প্রাচীন থিয়েটার প্রাথমিকভাবে টেক্সটের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। আমিও টেক্সটকে প্রাধান্য দিইনি। সাহেবদের মহামতি শেকসপিয়ার ছিলেন, যিনি একের পর এক মহান নাটক লিখে গেছেন। আমাদের কোনও শেকসপিয়ার ছিল না। আমি নিজেও লিখতে পারতাম না৷ আমরা সবাই মিলে মুখে মুখে নাটক বানাতাম। একটা কোনও বিষয় বা ঘটনা নিয়ে, এ বলত একটু, ও বলত একটু, আস্তে আস্তে একটা অবয়ব তৈরি হত। অর্থাৎ নাটক তৈরির একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল। আমি সেই প্রক্রিয়াতেই কাজ শুরু করেছিলাম। আমি নিজে কোনওকালেই নাট্যকার নই। তখন একদমই লিখতে পারতাম না। এর থেকে নিয়ে, ওর থেকে কিছুটা নিয়ে, মেরে-ধরে এখন তাও একটু-আধটু লিখতে পারি। তাই আমি কখনও দাবি করি না যে আমি নাট্যকার। আমি নাটক লিখতে পারি না। তবে হ্যাঁ, আমি একটা জিনিস শিখেছি। আমি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নাটক বানাতে পারি। একা একা পারি না। সবাই মিলে বসে, ভেবে, ছোট ছোট করে আমাদের নাটক তৈরি হয়। আমাদের তার জন্য সময় লাগে। আমরা খুব তাড়াতাড়ি কাজ করতে পারি না। সে অর্থে আমি একজন এক্সপেনসিভ ডিরেকটর (হাসি)। তবে সময় নিয়ে কাজ করে আমরা যেটা বের করে আনি সেটা কিন্তু সকলের ভাল লাগে। আমরা যেটুকু পরিচিতি বা খ্যাতি পেয়েছি, তা ওইটুকুর জন্যে, আমাদের কাজের পরিচ্ছন্নতার জন্যে। আমাদের কাজ দেখলে মানুষ বুঝতে পারে এই কাজের পেছনে কতটা শ্রম আছে, কতখানি অধ্যবসায় আছে, চিন্তা আছে, বুদ্ধি আছে, একটা কমিটমেন্ট আছে। দর্শকেরা ঠিক কোথায় একটা গন্ধ পায়, আমাদের থিয়েটারটা অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা, একটু নয়, অনেকটাই আলাদা।

এখন কেউ আমাকে এই প্রশ্নটা করতেই পারেন আপনারা কীসে কীসে অন্যদের চেয়ে আলাদা তা একটু বলুন দেখি! আমি তাকে পালটা উত্তর দিই— কীসে আলাদা না বলুন দেখি! আমি সবটাতেই আপনাদের থেকে আলাদা। আমি আমার জীবনযাপনে, চিন্তাধারায়, আমার আদর্শে, আমার কথা বলায়, আমার শয়নে-বসনে-সঙ্গমে— সব ব্যাপারে আমি আপনাদের থেকে একটু অন্যরকম। And I enjoy my অন্যরকম ধরন। আমি খুব ভাল আছি এটা নিয়ে। কারণ আমি এই যাপনটা শিখেছি ভারতীয় সংস্কৃতির থেকে। আমার গুরু কে, এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব সে অর্থে শ্রীচৈতন্যদেব হচ্ছেন আমার গুরু। আমি তাঁর কাছে জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছি, এমনকি থিয়েটার সম্পর্কেও অনেক কিছু শিখেছি। ত্যাগ করতে শিখেছি। রিজেকশন শিখেছি। আধুনিক থিয়েটারে গ্রটভস্কিও একই কথা বলেছেন। ত্যাগ করো, প্রত্যাখ্যান করো। ফলে আমি খুব ন্যূনতম উপকরণে বাঁচতে পারি, খুব কমের মধ্যে চলতে পারি, এমনকি খুব কম স্বাধীনতার মধ্যেও অসাধ্য কিছু ঘটানোর চেষ্টা করতে পারি। এগুলোই আমার বেঁচে থাকার প্রক্রিয়া। আমার জীবনযাপন আর আমার থিয়েটার আলাদা নয়, একই। আমার থিয়েটারে আমি যে কথাটা বলার চেষ্টা করি, সে কথাটা আগে আমাকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে হয়৷ আমি যা বিশ্বাস করি না, আমি তা আমার থিয়েটারে করে দেখাতে পারব না৷ আর শুধু বিশ্বাস করলেই হয় না, সেটা রীতিমতো প্র‍্যাকটিস করতে হয়। নিজের সাথে যুদ্ধ করে অভ্যেস করতে হত যে আমি এইভাবেই চলব। এবং সেটা করতে পারলেই তবেই তার ছাপ থিয়েটারের মধ্যে পড়ে। এই আমি, এই-ই আমার থিয়েটার।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: প্রবীরদা, আপনি যেমন ভারতের প্রাচীন লোকসংস্কৃতি থেকে আপনার নাটকের প্রকরণ খুঁজেছেন, একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরের প্রসেনিয়াম-বহির্ভূত নাট্যচর্চার সঙ্গেও আপনার গভীর পরিচয় ঘটেছে৷ ‘টুওয়ার্ডস আ পুওর থিয়েটার’ খ্যাত গ্রটভস্কি[3] কলকাতায় এসে আপনার নাটক দেখেছেন, আপনিও আমন্ত্রিত হয়ে পোল্যান্ড গেছেন, গ্রটের কাছে থেকে তাঁর কাজ দেখেছেন। আন্তর্জাতিক ধারার সঙ্গে ভাবনার এই দেওয়া-নেওয়া আপনার নাটককে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

প্রবীর গুহ: গ্রটের সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ হওয়ার পর উনি কলকাতায় এলেন…

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: আচ্ছা, এই যোগাযোগটা কীভাবে স্থাপিত হল?

প্রবীর গুহ: ওঁর একজন অ্যাম্বাসাডর… স্টিভ উইনস্টিন নামে একটি ছেলে প্রায় এক বছর ধরে ভারতবর্ষের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, নাটক দেখে বেড়াচ্ছিল, ওরা আসলে একটি পছন্দসই ভারতীয় নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করতে চাইছিল। পরিশেষে স্টিভ খড়দায় এসে আমাদের থিয়েটার দেখে। এবং থিয়েটার দেখার পর স্টিভের মনে হয় যে আমাদের দলটাই প্রকৃত দল যা ওঁদের মনোমতো কাজটা করতে পারে। গ্রটকে স্টিভ সবসময় খবর জানাত। আমাদের দলের কথা শুনে গ্রট খুব উৎসাহ বোধ করেন এবং আমাদের কাজ দেখার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন। তা উনি ভারতে এলেন, আমাদের কাজ দেখলেন এবং আমাদের কাজ তাঁর ভাল লাগল। কথাবার্তা হল যে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। তিনটে পর্যায়ে আমরা একসঙ্গে নাটক করলাম। আমরা প্রথমে খড়দায় কাজ করলাম, খড়দার ভেতরে গ্রামে গিয়ে কাজ করলাম, কেঁদুলিতে গিয়ে কাজ করলাম। আমাদের সঙ্গে কাজ করার পর উনি আমাকে পোল্যান্ডে ওঁর ওয়ার্কশপে আমন্ত্রণ করলেন। গেলাম, দেখলাম, কাজ করলাম। তারপর ওঁর যোগাযোগের সূত্রেই নানা আন্তর্জাতিক নাট্যদলের সঙ্গে আমার কথা হল, নামী নাট্যব্যক্তিত্বের সঙ্গে দেখা হল। পরবর্তীতে তাঁদের সঙ্গেও আমি কাজ করেছি, যেমন রিচার্ড শিজলাক[4], ইউজেনিও বারবা[5], পিটার ব্রুক[6] ইত্যাদি, এছাড়াও আরও অনেক বড় মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ঘটল। একমাত্র অগাস্টো বোয়ালের সঙ্গে কাজ করতে পারিনি। আমার দুঃখ, অগাস্টো বোয়াল এখানে, এই মধ্যমগ্রামেই একটি নাট্যোৎসবে এসেছিলেন এবং এসে আমার খোঁজও করেছিলেন উৎসবের উদ্যোক্তাদের কাছে। উনি বলেছিলেন, এখানে প্রবীর গুহ কোথায় আছে, আমি তাঁকে দেখতে চাই। আমি তখন সদ্য খড়দা থেকে মধ্যমগ্রামে এসেছি। কিন্তু সেইসব উদ্যোক্তারা চাননি আমাদের মধ্যে যোগাযোগ হোক। যদিও তাঁরা খুব ভালভাবেই জানতেন আমি কোথায় আছি। এসব আমি অনেক পরে বোয়ালের কাছ থেকেই শুনেছি, কিন্তু আমাদের সামনাসামনি কোনওদিন দেখা হয়নি। এই নিয়ে আমার আক্ষেপ আছে তা নয়, তবে ওঁর মতো মানুষের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলে অবশ্যই খুব ভাল লাগত।

জারজি গ্রটভস্কি

তবে এইসব মহান মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি বুঝেছি কীভাবে এঁরা যুদ্ধটা চালিয়েছেন। প্রত্যেকে নিজের মতো করে নিজের লড়াইটা করেছেন, গ্রট কীভাবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করেছেন, ব্রুক কীভাবে লড়াই করেছেন, বার কী করেছেন। এই লড়াইয়ের পর প্রত্যেকে নিজের নিজের ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন, কেউ কাউকে নকল করেননি। আর এই প্রত্যেকের লড়াই আমাকে সাহস জুগিয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি আমি যদি এঁদের কাউকে অনুকরণ করি, তাহলে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব না৷ প্রত্যেকের লড়াই থেকে আমি নির্যাস নিয়েছি, তারপর আমার নিজের লড়াইটাকে তৈরি করেছি। আর বারবার নিজেকে বলেছি, ওঁরা যদি পেরে থাকেন, আমি কেন পারব না?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: প্রবীরদা, এখানে আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে যাব। একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করব যা আপনারা ঘটিয়েছিলেন। মধ্যপ্রদেশে একটি সংস্থার আমন্ত্রণে আপনারা গিয়েছিলেন। সে এক প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানে শ্রমজীবী গ্রামবাসীরা অতি কম বেতনে পাথর ভাঙার কাজ করেন। আপনাদের নাটক নাকি তাঁদের এতটাই উদ্বুদ্ধ করেছিল, যে তাঁরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অফিস ঘেরাও করেছিলেন। আশ্চর্য ঘটনা। ঠিক কী ঘটেছিল আপনি যদি একটু বলেন…

প্রবীর গুহ: ঘটনাটা মধ্যপ্রদেশের চাঁপা জেলার পান্তোরা ব্লকের। তবে ওখানে একটা ক্যাটালিস্ট গ্রুপ ছিল যারা না থাকলে ঘটনাটা ঘটত না। আমাদের ওখানে যারা নেমন্তন্ন করেছিল, তারা একটা এনজিও, তাদেরই নাম— ‘লহর’। ‘লহর’-এর ছেলেটির নাম ছিল পি ভি রাজাগোপাল। এই মুহূর্তের খবর জানি না, তবে কয়েক বছর আগে অবধি খবর পেয়েছি যে পি ভি দিল্লির গান্ধি পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ছিল। ও তখন লহর-এ ছিল। ও-ই একদিন আমাকে ফোন করেছিল। প্রবীর, আমাদের এখানে একটা সমস্যা হচ্ছে, তুমি যদি এখানে আসো। সবাই মিলে যদি কিছু করা যায় কিনা…। সমস্যাটা ছিল ওখানকার পাথর ভাঙার শ্রমিকদের ম্যানেজার, ওভারশিয়ার এরা সকলে মিলে ঠকাচ্ছিল, প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করছিল। আমি খুব আগ্রহী হয়ে ওখানে গেলাম এবং আমাদের দল নাটক শুরু করল। নাটকে ওইসব শ্রমিকদের কথাই নানাভাবে উঠে এল। প্রথমে আমরাই খুব ফ্যাসাদে পড়ে গেছিলাম। শ্রমিকরাই ভয় পেতে শুরু করেছিল যে ওরা যেটুকু বেতন পাচ্ছে, আমাদের নাটকের জেরে সেটুকুও না বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আমরা আমাদের অ্যাপ্রোচটা একটু বদলালাম। তখন আমরা বলতে শুরু করলাম, যা পাওয়া যাচ্ছে তা তো ভালই, কিন্তু যদি ধরো তেরো টাকা করে পাওয়া যায়, তাহলে কী কী আরও ভাল হতে পারে? তাহলে একটা করে রুটি বেশি খেতে পাওয়া যাবে, মেয়েটার গায়ে একটা জামা হবে। আর ভাগ্যক্রমে, ওদের মধ্যেই একজনকে পেয়ে গেলাম যে পড়তে পারে। তাকে দিয়ে নাটকের মধ্যেই আমরা গেজেটটা পড়িয়ে দিলাম, যে হ্যাঁ, সরকারি কাগজে লেখা আছে যে তেরো টাকা করে পাওয়া সম্ভব। তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধি। ওরা প্রধানমন্ত্রী ব্যাপারটা বুঝত না, ইন্দিরা গান্ধিকে দেবী বা ভগবান মনে করত। আর খবরের কাগজ থেকে ইন্দিরা গান্ধির ছবি ছিঁড়ে নিয়ে দেওয়ালে সাঁটিয়ে রোজ পুজো করত, ফুলজল দিত, নমস্কার করত। আমরা বললাম, ওই যে তোমাদের দেবী, ওই দেবীই বলেছেন তোমাদের তেরো টাকা করে দিতে, আর যারা অসুর-দানব, তারা তোমাদের সেই টাকাটা দিচ্ছে না। সেই দানব হচ্ছে ওইসব ওভারশিয়ার, ঠিকেদার এরা। এইটুকু ওদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েই আমাদের কাজ শেষ হল। আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে আমরা ওখান থেকে ফিরে এলাম। বাকিটা অর্গানাইজ করল ‘লহর’। রাজাগোপাল শ্রমিকদের নিয়ে জেলাশাসকের দপ্তর ঘেরাও করেছিল। জেলাশাসক ভদ্রলোক ভাল লোক ছিলেন, তিনি সব শুনে এনকোয়ারি বসান এবং দোষীরা কালো তালিকাভুক্ত হয়। আর সবচেয়ে যেটা বড় ব্যাপার, শ্রমিকরা তেরো টাকা করে পেতে শুরু করে। নাটক করে এমন কিছু যে করা গেছে তা এক আশ্চর্য ঘটনা, তাই এটাকে আমরা আমাদের অন্যরকম একটা সাফল্য বলে মনে করি। পাশাপাশি এই ঘটনাগুলো আমাদের সাহস বাড়িয়ে দিল আর থিয়েটার করার নতুন একটা রাস্তা তৈরি করে দিল।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: প্রবীরদা, আমাদের কথা শেষ হবে না। আরও অনেক দিক, আপনার আরও অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা যায়। কিন্তু আমাদের কোনও একটা জায়গায় থামতে হবে। আমি শুধু একটা অন্যরকমের প্রশ্ন দিয়ে এই আলাপচারিতাটা আজকের মতো শেষ করব। প্রশ্নটা হল— আমরা যতদূর জানি আপনি অর্থের বিনিময়ে থিয়েটার করায় বিশ্বাসী নন। কিন্তু আপনার দলে আপনি ছাড়াও আরও অনেকে রয়েছেন, যাঁরা সহকর্মী, যাঁরা আপনার আদর্শে বিশ্বাস করেই আপনার সঙ্গে থিয়েটার করতে এসেছেন। কিন্তু একইসঙ্গে, তাঁদেরও নিশ্চয়ই পরিবার আছে। সেই পরিবারের মতো তাঁদেরও দায়দায়িত্ব আছে। গ্রাসাচ্ছাদন, বাচ্চাদের স্কুল, বছরে একবার দু-চারদিনের জন্য সপরিবার কোথাও ঘুরতে যাওয়ারও প্রয়োজন আছে। কিন্তু এই থিয়েটার থেকে কোনওরকম অর্থোপার্জন হয় না। সেক্ষেত্রে থিয়েটারকর্মীরা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে নাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন?

প্রবীর গুহ: আদর্শগতভাবে আমরা সবাই চাই যে যদি থিয়েটার থেকেই দু-পয়সা উপার্জন করা যায়, অন্য কিছু না করতে হয়, তাহলে তো প্রত্যেকের জন্য খুবই ভালো হয়। কিন্তু কাজ করে আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বুঝেছি যে শুধুমাত্র টিকিট বিক্রি করে এটা করা সম্ভব নয়। শুধু আমরা কেন, কোনও গ্রুপ থিয়েটারের ক্ষেত্রেই এটা করা সম্ভব নয়। কর্পোরেট থিয়েটারের ক্ষেত্রে হয়তো অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি হতে পারে, কিন্তু কর্পোরেট থিয়েটার করতে গেলে যে যে বিষয়ে আমাদের আপস করতে হবে, তারপরে ওটা আর থিয়েটার থাকবে না। তাছাড়া আমরা যদি হাজার টাকা টিকিটের দাম রাখি, তাহলে কটা সাধারণ মানুষ, যাদের কথা আমরা আমাদের থিয়েটারে বলতে চাই, তারা সেই থিয়েটার দেখতে আসতে পারবেন? আমাদের দলের নবীন ছেলেমেয়েরাই একসময় টিকিটের বিনিময়ে থিয়েটার করার কথা বলেছিল। প্রস্তাব দিয়েছিল, একবার চেষ্টা করে দেখলে কেমন হয়! আমি রাজি হয়েছিলাম। কারণ দলগত কাজে তো আমি একা একা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। সেটা গণতান্ত্রিক কাজও নয়। আমরা মেনে নিয়েছিলাম, দেখাই যাক না টিকিট করে কী হয়! দু-তিনবার চেষ্টা করার পর আমরা সবাই আবার হাড়ে হাড়ে বুঝেছি যে টিকিট করে থিয়েটার চালানো যায় না। এরপর দেখা হল, অনুদান পাওয়া যায় কিনা। দেখা গেল, তাও ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ নাটক দেখে কিছু না দিয়েই চলে যায়। তার চেয়ে না চাওয়াই ভালো। কোনও একটা নাটক করব, বা উৎসব করব, সেই পরিকল্পনা করলে আমরা আগে থেকে তৈরি হয়েই নামি, বাজেটও করা থাকে। আমরা এত টাকা তুলব, আর সেই টাকা এই এইভাবে খরচা হবে। যদি একটু আধটু ধার হয়, আমরা নিজেরাই চেষ্টা করব তা মিটিয়ে দেওয়ার৷ বাইরের মানুষজনকে জড়াব না এর মধ্যে। এইভাবেই চলে, এতদিন এইভাবেই চলছিল।

এছাড়া আরেকটা বিশ্বাস আমাদের ছিল যে এই ধরনের নাটকের একটা পৃষ্ঠপোষকতা লাগে, এটা একটা প্যাট্রনাইজড আর্ট। তা কে পৃষ্ঠপোষকতা করবে? কোনও ব্যক্তিমালিকানা বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করলে একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও থাকবে। সবচেয়ে ভাল হয়, যদি সরকার সহযোগিতা করেন। যেকোনও সরকারেরই উচিত এই ধরনের শিল্পমাধ্যম যাতে বেঁচে থাকে তার চেষ্টা করা। কারণ দেশের চরিত্র, দেশের অভিমুখই তো তৈরি করে দেশের সংস্কৃতি। ফলে সরকারের একটা দায়িত্ব থেকেই যায় আমাদের মতো দলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার। বলা দরকার, আমাদের সরকার সে কাজটা করে থাকে। খুব কম পরিমাণে অর্থসাহায্য হলেও, অনেক বছর ধরে অনেকগুলি দল নিয়মিত সেই সাহায্য পায়। এখন সাহায্যপ্রাপ্ত দলের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। কলকাতার বড় দলগুলি বহুদিন ধরে, প্রায় তিরিশ চল্লিশ বছর ধরে এই টাকা পেত কিন্তু নিজেদের বাইরে খবরটা চাউর করেনি এবং এই সুযোগসুবিধাগুলো নিজেরদের মধ্যে কুক্ষিগত করে রেখেছিল। অনেক পরে গোবরডাঙ্গার কয়েকটা দল প্রথম এই খবরটা পায় এবং তারাই আমাদের সবাইকে বলে সরকারের কাছে আবেদন করতে। এখন অনেকগুলো দলের মতো আমরাও সরকারি অনুদান পাই, সেটা আমাদের দলের সমস্ত কর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। খুব বড় টাকা সেটা নয়, কিন্তু তার মধ্যেই আমরা কোনওক্রমে চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। কর্মীদের নামে নামেই টাকা আসে এবং আমরা প্রত্যেককে পুরো বেতন দিই, কারও কাছ থেকে কোনও টাকা কাটি না। শুধুমাত্র দলে যারা নতুন যোগ দিয়েছে, বিগিনার্স হিসেবে তাদের কিছু কম টাকা দিই, সামান্য যেটুকু বাঁচে তা দল চালানোর কাজে লাগে।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম: প্রবীরদা, একটু বাধা দিচ্ছি আপনাকে। একটা কথা শোনা যায়, যে সরকারের কাছ থেকে সাহায্য নিলে কোথাও একটা রাজনৈতিক চাপ চলে আসে, যে আপনাদের সরকারি লাইন মেনে চলতে হবে বা এরকম কিছু…?

প্রবীর গুহ: না, এখনও অবধি এরকম কোনও ঘটনা ঘটেনি। তবে যে মুহূর্তে আমরা বুঝব যে এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, কোনও ধরনের কোনও চাপ আসছে, সেইসময় আমরা তা দেখে নেব, আমরা ওসবের কোনও ভয় করি না। অনুদান বন্ধ হলে হবে, কী আর করা যাবে। আমরা তখন নিজেদের রাস্তা নিজেরাই দেখে নেব।

আরেকটা কথা এখানে বলে রাখা দরকার, যে টাকা আমরা সরকার থেকে পাই তা দিয়ে আমাদের দিন চলে না, জল গরম হয় না বললেই চলে। সেক্ষেত্রে প্রত্যেককেই কিছু না কিছু কাজ করতে হয়। এটাও লোকসংস্কৃতি থেকে আমাদের আরেকটা শিক্ষা। লোকশিল্পীরা সকলে কাজ করে খান— কারও ছোট কোনও দোকান, কেউ বা চাষি বা মজুর। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু পেশার সঙ্গে যুক্ত। কাজ সেরে বিকেলে একজায়গায় জমায়েত হয়ে তারা সকলে মিলে গান করেন, কীর্তন করে, পালায় অভিনয় করেন। আমরা সেইভাবে কিছু না কিছু কাজ করি, যা দিয়ে আমাদের সংসার চালানোর খরচটা উঠে আসে। বাকি সময়টা আমরা থিয়েটারকে দিই। একজন কর্মী ২৪ ঘণ্টা থিয়েটার করবে তা আমি দাবি করতেও পারি না। কারণ থিয়েটার করে কারও সংসার চলে না। আবার অন্যদিকে, থিয়েটার থেকে আমাকে মুনাফা করে সংসার চালাতে হবে এই চাপটা যখন আমার ওপর থাকছে না, আমি থিয়েটারের কমার্শিয়াল সাফল্য নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছি না। থিয়েটার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছি, কিন্তু আমার থিয়েটারকে আমি পণ্য করে তুলছি না যে যেকোনও মূল্যে তা থেকে আমাকে পয়সা উপার্জন করতেই হবে। এইভাবে আমরা সবাই মিলে আমাদের ভালবাসা দিয়ে থিয়েটারটা করি। আজ অবধি যতটুকু করতে পেরেছি, তা এই সকলের ভালোবাসা আর শ্রম ছাড়া সম্ভব হত না।

…কথা শেষ হয় না। কারণ এখনও অনেক কিছু জানার বাকি রয়ে গেল। কিন্তু সময়ের বাধ্যবাধকতায় আমাদের থামতেই হল। অবশ্য প্রবীরদার পরবর্তী কোনও ওয়ার্কশপে বা নাট্য উৎসবে শিগগিরই আমাদের দেখা হবে, কথা শুরু হবে আবার, আমরা সমৃদ্ধ হব।


[1] জুলিয়ান বেক (১৯২৫-১৯৮৫): মার্কিন নট, কবি, গায়ক ও চিত্রকর। ‘লিভিং থিয়েটার’-এর জনক।
[2] অগাস্টো বোয়াল (১৯৩১-২০০৯): ব্রাজিলের নাট্যব্যক্তিত্ব, নাট্যতাত্ত্বিক, ও রাজনৈতিক কর্মী। ‘থিয়েটার অফ দি অপ্রেসড’ নাট্যধারার উদ্গাতা।
[3] জারজি গ্রটভস্কি (১৯৩৩-১৯৯৯): পোলিশ নাট্যনির্দেশক ও তাত্ত্বিক। ‘টুওয়ার্ডস আ পুওর থিয়েটার’ তত্ত্বের উদ্গাতা।
[4] রিচার্ড শিজলাক (১৯৩৭-১৯৯০): পোলিশ নাট্য ও চলচ্চিত্র অভিনেতা ও নির্দেশক।
[5] ইউজেনিও বারবা (১৯৩৬- ): ইতালীয় লেখক, নাট্যব্যক্তিত্ব ও নির্দেশক। ডেনমার্ক-এ ওডিন থিয়েটার ও ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অফ থিয়েটার অ্যানথ্রোপলজি-র প্রতিষ্ঠাতা।
[6] পিটার ব্রুক (১৯২৫-২০২২): ব্রিটিশ নাট্যব্যক্তিত্ব, নাট্যনির্দেশক ও চিত্রপরিচালক।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...