সাধারণ মানুষও অঙ্ক কষেন

অশোক মুখোপাধ্যায়

 


আপাতত যতটা পাওয়া গেল, তাকে ধরে রাখতে হবে। ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী এবং এককাট্টা বিরোধী হিসাবে ভূমিকা পালনের জন্য এখন থেকেই তৈরি হতে হবে। ঘোড়া কিনে সরকার গঠনের দিকে না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সেটা করতে গেলে ইলেকটোরাল বন্ড এবং পিএম কেয়ার ফান্ড থেকে বিজেপি-র হাতে যে পরিমাণ টাকা, তার কাছে কেউ দাঁড়াতেই পারবে না। মাঝখান থেকে জোট আরও দুর্বল হবে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হবে। মোদি সরকারের প্রতিটি অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরেও ঝড় তুলতে হবে, বাইরেও রাস্তায় নামার পরিকল্পনা করতে হবে

 

অষ্টাদশতম লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলকে আমার মতে একমাত্র এইভাবেই এক কথায় প্রকাশ করা যায়: ডাকাত ধরা পড়েছে। জনতাই তাকে হাতেনাতে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু কোর্টে গিয়ে সে সহজেই জামিন পেয়ে আবার জেলঘানির বাইরে।

লক্ষ করলেই দেখতে পাবেন, ডাকাত সর্দারের দলটি সেখানেই সবচাইতে বড় আঘাত পেয়েছে, যেখান থেকে সে গত কয়েক দশক ধরে সংখ্যাগুরু ধর্মের তাস খেলে ভালই এগোচ্ছিল। শেষ দশকটাতে রামনাম করতে করতেই দেশ প্রায় সবটাই বেচে দেওয়ার উপক্রম করে ফেলেছিল। অযোধ্যায় অত ম্যানিপুলেট করে অস্তিত্বহীন রামমন্দিরের জন্য সঙ্ঘ পরিবারের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের জায়গা হাসিল করে নিয়েছিল। মন্দিরটাও এই বছর ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগেই বানিয়ে ফেলেছিল। প্রযুক্তিবিদদের ডেকে এনে রামনবমীতে সেই মন্দিরের মূর্তির মাথায় সূর্যের আলোও ফেলার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু হায়! সেই রাজ্যেই তাকে এবার ব্যাপক ধাক্কা খেতে হল। এমনকি সেই অযোধ্যার আসনেও।

স্বয়ং রামচন্দ্রও যেন তার এই ভোটোপাসককে নিত্য প্রাতঃকৃত্যের মতো করে বর্জন করেছে। ফলে সারা দেশেই এবার বিজেপি-কে বর্জন করার একটা হাওয়া উঠেছিল।

অব কি বার চারশও পার— তিনশো পার করাতেই গৃহপালিত ইসিকে বারো ঘন্টা ধরে গণনা চালাতে (আসলে, বন্ধ করে রাখতে) বাধ্য করেছে।

অনেকেই স্মরণ করতে পারবেন, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেও বিজেপি-র অবস্থা এরকমই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভাল নোট বাতিল করে এবং জিএসটি চালু করে দেশের জনসাধারণের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড প্রায় ভেঙে দিয়েছিল। লাভবান হচ্ছিল কেবল দেশের মুষ্টিমেয় কিছু কর্পোরেট পরিবার— বিশেষ করে আদানি আম্বানি প্রমুখ গুজরাতি দোস্তরা। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে হেরে যাওয়া যখন প্রায় নিশ্চিত সেই সময় ঘটানো হয় পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ের উপর পরিকল্পিত বিধ্বংসী হামলা। জন্ম ও কাশ্মিরের প্রাক্তন রাজ্যপাল বিজেপি-রই ঘরের লোক সত্যপাল মালিকের কথায় যে কনভয়ের গতিবিধির উপর নিয়ন্ত্রণের কথা বলায় স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি তাঁকে চুপ থাকতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, “ইস মেঁ অওর কুছ হ্যায়।” তার পর তাকে পাক জঙ্গিদের হামলা বলে দেখিয়ে পেটোয়া চ্যানেলসমূহের সাহায্যে সারা দেশ জুড়ে এক ঝুটা দেশপ্রেমের বাতাবরণ তৈরি করা হয়। সেই হাওয়াতেই মোদির দল ভোটে জিতে আসে।

এবারে আর ভোটের আগে সেরকম কিছু ঘটানো সম্ভব হচ্ছিল না। অথচ মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, দুর্নীতি এবং দেশ বেচার কাজ জোরশোর এগিয়ে চলেছে। মোদির ভারত যত বিকশিত হচ্ছে, ততই ক্ষুধার সূচকে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশ ভুটান শ্রীলঙ্কার নিচে চলে যাচ্ছে। নারী-সুরক্ষায়, সাংবাদিক-নির্যাতনে, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণে ভারত ক্রমশই তালিকার নিচের সারিতে জায়গা করে নিচ্ছে। এমন বিকাশ যা জি-২০ বৈঠকের সময়ে প্লাস্টিকের চাদর দিয়ে রাস্তার দুই ধারে উঁচু করে ঢেকে রাখতে হয়েছিল।

নরেন্দ্র দামোদরদাসও বুঝতে পারছিলেন দেশের মানুষের নাড়ির স্পন্দন। তাই সকলেই দেখেছেন, ভোটপর্ব যত এগিয়েছে, ততই প্রধানমন্ত্রীর প্রচারে বিকাশের বদলে উঠে এসেছিল হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের সেই চিরপরিচিত তাসের কারুশিল্প। মোদির লেখাপড়ার ইতিহাসটা যেহেতু পুরোটাই মেঘাচ্ছন্ন, তাই তিনি ছোটবেলায় সেই রাখাল বালকের গল্প পড়েছিলেন কিনা বলতে পারছি না। যে পশুচারণের মাঠে ভেড়া চড়াতে নিয়ে গিয়ে মাঝেমাঝেই “বাঘ বাঘ” বলে হাঁক পারত আর লোকজন আশেপাশের থেকে ছুটে এলে দাঁত বের করে হাসত। কিন্তু যেদিন সত্যিই বাঘ এল, সেদিন তার হাঁকে একজন লোকও বেরোল না। মোদি অ্যান্ড কোম্পানির এই মুসলিমবিদ্বেষের তাসও বহুব্যবহারে এখন জীর্ণ হয়ে গেছে। আর কাজ করে না। করে না বলেই মন্দির-তাসও মন্দিরের দেশেই কাজ করল না।

এই প্রসঙ্গেই এসে যাচ্ছে পশ্চিমবাংলার ভোটের ফল প্রসঙ্গ।

নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ— দুজনেই সন্দেশখালিকে বাজি ধরে একটা বড় ফল আশা করেছিলেন। তাঁরা বোধহয় বুঝতে পারেননি, সন্দেশখালিতে যাই হয়ে থাকুক না কেন, মোদিকোম্পানির ভূমিকা বিচার করতে গেলেই লোকের মাথায় মণিপুরের ঘটনা এসে যাবে। সেখানে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদেরই (ডবল ইঞ্জিন) সরকার থাকা সত্ত্বেও যেভাবে পাহাড়ি জনজাতি কুকি সম্প্রদায়ের উপর লাগাতার হত্যা ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ লুটপাট চলে আসছে, এই গুজরাতি দোস্ত একবারও গিয়ে উঠতে পারেননি। নির্যাতিতের প্রতি তাঁদের প্‌প্‌প্‌রেম এই ঘটনায় যে কতটা বে-আব্রু হয়ে পড়েছিল, এঁরা বোধহয় বুঝতেই পারেননি। অমিত শাহ আবার পশ্চিমবাংলায় এসে রবীন্দ্রজয়ন্তী করেছেন এবং কিছু সুনির্বাচিত দলিতজনের বাড়িতে বসে ডাল পোস্ত ভাত খাওয়ার অভিনয়ও সুচারু রূপে সম্পন্ন করেছিলেন।

সন্দেশখালিতে যারা স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের হাতে নানাভাবে লাঞ্ছিত নির্যাতিত হচ্ছিলেন, তারাও এই ডাল পোস্ত রাজনীতির মর্মার্থ ধরে ফেলতে দেরি করেননি। আর যে বামপন্থীরা এই ডাল পোস্তওয়ালাদেরই কার্যত মদত দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং ভাবছিলেন যে এবার হাওয়াই চটিকে বেশ বাগে পাওয়া গেছে, তাঁরাও বুঝতে পারেননি, সাধারণ মানুষও অঙ্ক কষে। অঙ্কের হিসাব করতে জানে। অভিজ্ঞতা থেকেই। আজকের নেটদুনিয়ার রমরমা বাজারের দিনে। ফলে সন্দেশখালির বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা ঘটনাবলি বাইরে এসে যাওয়ার পর পরই তাদের আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি।

এই কারণেই নরেন্দ্র মোদির কৃপাধন্য প্রার্থী রেখা পাত্রের পরিণতি সুখের হল না। তাদের সহযোগিতা করতে গিয়ে বামপন্থী (ব্যক্তিগত জীবনে যিনি খুবই সৎ এবং লড়াকু রাজনীতিবিদ) প্রার্থীর হালও খারাপ হয়ে গেল!

আরও খারাপ হতে পারত। মোদির দলকে বাংলার মাটিতে তামিলনাড়ু আর পাঞ্জাবের মতোই শূন্য করে দেওয়া যেত। দুঃখের বিষয়, সেটা বামপন্থীরাও চাননি, তৃণমূল নেত্রীও চাননি। দুই পক্ষই চেয়েছেন, নিজ নিজ রাজনৈতিক হ্রস্বনজরের ফলে, বিজেপি-কে খানিক উপরে তুলে প্রকল্পিত “বিপক্ষ”-কে শূন্যে বিলীন করতে। ঘটনাচক্রে তাতে এই মুহূর্তে টিএমসি-র অনেকটা লাভ হয়েছে, বিজেপি-র যতটা ক্ষতি হতে পারত তা হয়নি। কিন্তু বামপন্থার সর্বনাশ হয়ে গেছে। এটা নিয়ে পরে আরও বিশদে লিখতে হবে।

আপাতত যতটা পাওয়া গেল, তাকে ধরে রাখতে হবে। ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী এবং এককাট্টা বিরোধী হিসাবে ভূমিকা পালনের জন্য এখন থেকেই তৈরি হতে হবে। ঘোড়া কিনে সরকার গঠনের দিকে না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সেটা করতে গেলে ইলেকটোরাল বন্ড এবং পিএম কেয়ার ফান্ড থেকে বিজেপি-র হাতে যে পরিমাণ টাকা, তার কাছে কেউ দাঁড়াতেই পারবে না। মাঝখান থেকে জোট আরও দুর্বল হবে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হবে। মোদি সরকারের প্রতিটি অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরেও ঝড় তুলতে হবে, বাইরেও রাস্তায় নামার পরিকল্পনা করতে হবে। এখন থেকেই আগামী বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে বিজেপি-কে পর্যুদস্ত করার ব্যাপক পরিকল্পনা করে ফেলতে হবে। দিল্লির মতো যেসব জায়গায় ফল খারাপ হল সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়াতে হবে।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. এত জানেন একটু অহংকার নেই!
    নো ভোট্টুর দলের লোকেদের স্বভাব হচ্ছে তাঁরা যে তিনুদের চান সেটা না বলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নাক দেখানো।

আপনার মতামত...