নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের অধিকার ও মাফিয়াতন্ত্র

শুভজিৎ বিশ্বাস

 


আমরা আর চুপ করে বসে থাকতে পারি না। যদি আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ না হই, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা যখন অক্সিজেনের সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাবে, তখন তারা আমাদের ভীরু ও মেরুদণ্ডহীন বলে চিহ্নিত করবে। আমরা কি সত্যিই তাদের জন্য এমন এক মরুভূমি রেখে যেতে চাই? মাফিয়া-তন্ত্র যতই শক্তিশালী হোক, যত কোটি টাকাই তাদের তহবিলে থাকুক, প্রকৃতির আদিম শক্তির কাছে তারা নগণ্য। আমাদের সংহতি, আমাদের তথ্যের লড়াই এবং আমাদের অস্তিত্বের দাবি যখন এক হবে, তখন কোনও নেক্সাসই আমাদের রুখতে পারবে না। আমাদের শপথ নিতে হবে— আমাদের পাহাড় আমরা রক্ষা করব, আমাদের নদীকে আমরা বন্দি হতে দেব না, আর আমাদের জঙ্গলকে কয়লা-মাফিয়াদের কবলে যেতে দেব না

 

আমি কোনও মস্ত বড় লেখক নই, বিজ্ঞানী বা পরিবেশবিদও নই। আমি একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ— রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে যার দিন কাটে। কিন্তু আজ আমার হাতে কলম তুলে নিতে হয়েছে, কারণ আমার বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার— আমার নিঃশ্বাসটুকু আজ নিলামে উঠেছে। আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ভারত এক সুজলা-সুফলা দেশ। কিন্তু আজ বড় হয়ে দেখছি, সেই সুজলা-সুফলা মাটির বুক চিরে রক্ত বের করা হচ্ছে। পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ির মতো মানুষদের কাছ থেকে যখন জানতে পারি যে, বছরে প্রায় ৫ লক্ষ কোটি টাকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে, তখন বুকটা কেঁপে ওঠে। এই প্রবন্ধ আমার একার কথা নয়; এটি ভারতের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের বুক-ফাটা আর্তনাদ ও প্রতিবাদের দলিল।

 

উন্নয়নের মরীচিকা: কার লাভ, কার ক্ষতি?

আমরা যারা দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষ, আমাদের কানে যখন ‘উন্নয়ন’ শব্দটা পৌঁছায়, তখন আমরা বড় বড় স্বপ্ন দেখি। আমাদের পাড়ায় যখন মাইক বাজিয়ে ঘোষণা করা হয় যে এখানে একটা বিশাল হাইওয়ে হবে বা একটা বড় খনি হবে, তখন আমাদের মনে হয়— এই বুঝি আমাদের দুঃখের দিন ঘুচল। আমরা ভাবি, আমাদের সন্তানদের আর ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে যেতে হবে না; তারা নিজের গ্রামেই কাজ পাবে। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে আমরা যা দেখে আসছি, তা হল এক চরম প্রতারণা। এই ‘উন্নয়ন’ আসলে এক মরীচিকা— দূর থেকে সোনালি দেখালেও সামনে গেলে তপ্ত বালু আর হাহাকার ছাড়া আর কিছুই মেলে না।

উন্নয়নের প্রথম ধাপ হিসেবে বেছে নেওয়া হয় বিশাল চওড়া রাস্তা। বলা হয়, রাস্তা হলে ব্যবসা বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? রাস্তার জন্য যখন হাজার হাজার বিঘা চাষের জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তখন সেই ক্ষতিপূরণের টাকাটা পায় কেবল জমির মালিকরা। কিন্তু সেই জমিতে যে ক্ষেতমজুররা বছরের পর বছর কাজ করে পেট চালাত, তারা রাতারাতি হয়ে যায় বেকার। রাস্তা তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু সেই চকচকে পিচের রাস্তায় আমাদের মতো মানুষের সাইকেল চালানোর জায়গাটুকুও থাকে না। সেই রাস্তা দিয়ে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে চড়ে যখন কর্পোরেট কর্তারা যাতায়াত করেন, তখন রাস্তার ধারের ধুলোবালিতে আমাদের ছোট ছোট ঝুপড়িগুলো ঢেকে যায়। আমাদের বসতিগুলো উচ্ছেদ করা হয় ‘সৌন্দর্যায়ন’-এর নামে। অর্থাৎ, রাস্তা হয় ধনীদের জন্য, আর বাস্তুচ্যুত হতে হয় গরিবদের।

প্রজেক্ট শুরু হওয়ার আগে বড় বড় কথা বলা হয়— চাকরিতে ‘স্থানীয়রা অগ্রাধিকার পাবে’। কিন্তু যখন কাজ শুরু হয়, তখন দেখা যায় সব বড় বড় পদেই বাইরের লোক। আমাদের মতো মানুষদের কপালে জোটে কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি আর সামান্য দৈনিক মজুরি। সবচেয়ে বড় অন্ধকার হল এই প্রজেক্টগুলোর পেছনে থাকা ‘সাব-কন্ট্রাক্টর’ বা ঠিকাদার মাফিয়ারা। এদের ক্ষমতার উৎস হল রাজনৈতিক মদত। এরা একদিকে শ্রমিকের রক্ত চোষে, আর অন্যদিকে পাহাড়-জঙ্গল লুট করে সেই সম্পদ বিক্রি করে দেয়। সরকার যে বছরে প্রায় ৫ লক্ষ কোটি টাকার লোকসানের কথা বলছে, তার মানে হল— এই সম্পদ আসলে আমাদের ছিল, যা আজ মাফিয়ারা চুরি করে বিদেশে পাচার করছে। আমাদের খনি থেকে কয়লা বের হচ্ছে, লোহা বের হচ্ছে, কিন্তু আমাদের ঘরে আজও আঁধার। বিদ্যুতের মাশুল বাড়ছে, চালের দাম বাড়ছে, অথচ আমাদের মাটির সম্পদ লুট করে মাফিয়ারা দুবাই বা লন্ডনে সম্পত্তি কিনছে।

উন্নয়নের এই মরীচিকায় সবথেকে বড় আঘাতটা আসে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর। বড় বড় ফ্যাক্টরি বা খনি যখন তৈরি হয়, তখন তার দূষিত জল মিশে যায় আমাদের গ্রামের পুকুরে বা নদীতে। বড়লোকেরা বোতলের জল কিনে খেতে পারে, কিন্তু আমাদের ওই বিষাক্ত জলেই স্নান করতে হয়, ওই জলই খেতে হয়। ফলে আমাদের ঘরের শিশুরা অপুষ্টি আর চর্মরোগে ভোগে, আর বাড়ির বড়রা শ্বাসকষ্টে ভুগে অকালে প্রাণ হারায়। আমরা যখন এর প্রতিবাদ করি, তখন আমাদের বলা হয়— উন্নয়নের জন্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। প্রশ্ন হল, ত্যাগের দায় কি সবসময় কেবল শ্রমজীবী মানুষের? কেন কর্পোরেট মালিকরা তাদের বিলাসবহুল জীবনের একটুকুও ত্যাগ করেন না?

 

আসলে এই উন্নয়ন হল একধরনের ছিনতাই। আমাদের আদিম সম্পদ, আমাদের নদী, আমাদের পাহাড়— যা আমাদের পূর্বপুরুষরা রক্ষা করে গেছেন, তা আজ উন্নয়নের নামে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ি একটি ভিডিওতে যে নেক্সাসের কথা বলেছেন, সেখানে তিনি দেখিয়েছেন— কীভাবে আমাদের চোখে উন্নয়নের ঠুলি পরিয়ে আমাদের সর্বস্ব লুটে নেওয়া হচ্ছে। আমরা আজ বুঝে গেছি— যে উন্নয়নে মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার থাকে না, যে উন্নয়নে গরিবের থালা থেকে অন্ন কেড়ে নেওয়া হয়, সেই উন্নয়নের জয়গান আমরা গাইব না। আমাদের উন্নয়ন মানে কেবল চওড়া রাস্তা নয়; আমাদের উন্নয়ন মানে বিষহীন বাতাস, তৃষ্ণা মেটানোর জল এবং নিজের মাটির ওপর নিজের অধিকার।

 

হিমালয়ের কান্না: চারধাম ও উন্নয়নের বলি

আমরা যারা মাটির মানুষ, তারা জানি— হিমালয় মানে কেবল একটা পাহাড়ের সারি নয়; হিমালয় হল আমাদের দেশের রক্ষাকবচ, আমাদের গঙ্গা-যমুনার উৎস। কিন্তু গত কয়েক বছরে উন্নয়নের যে বুলডোজার হিমালয়ের ওপর চালানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রজেক্টের জন্য, তাতে এই নবীন মহাপর্বত আজ ক্ষতবিক্ষত। সরকার যখন ‘চারধাম অল-ওয়েদার রোড’, অর্থাৎ সর্বঋতুতে যাতায়াতের রাস্তার কথা ঘোষণা করল, তখন আমরা সাধারণ মানুষ ভেবেছিলাম— আমাদের তীর্থযাত্রা নিরাপদ হবে, পাহাড়ে কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু আজ আমরা দেখছি, সেই রাস্তার পিচ আসলে আমাদের হিমালয়ের রক্ত দিয়ে মাখানো।

হিমালয় পৃথিবীর অন্যান্য পাহাড়ের মতো শক্ত নয়; এটি একটি ভঙ্গুর ও নবীন পর্বতমালা। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিয়ম হল, পাহাড়ে রাস্তা বানাতে হলে ঢালু করে (sloping) কাটতে হয়। কিন্তু মাফিয়া ঠিকাদাররা তাদের মুনাফা বাড়াতে এবং সময় বাঁচাতে পাহাড়কে প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে খাড়া করে কাটছে। একে বলা হয় ভার্টিকাল কাটিং। এতে পাহাড়ের ওপরের যে মাটির স্তর গাছপালা ধরে রাখে, তা আলগা হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই আলগা পাহাড় হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ছে আমাদের মাথার ওপর। যখন ধসে মানুষ মারা যায়, সরকার বলে— প্রকৃতি রুষ্ট হয়েছে। কিন্তু আসলে কি প্রকৃতি রুষ্ট হয়েছে, নাকি ঠিকাদার মাফিয়ারাই পাহাড়ের ভিত কেটে দিয়েছে? বাজপেয়ি যে ৫ লক্ষ কোটি টাকার নেক্সাসের কথা বলেন, এই খাড়া পাহাড় কাটার পেছনেও রয়েছে সেই সাশ্রয় করা দুর্নীতির টাকা।

আমাদের শ্রমজীবী ভাইদের ঘরবাড়ি যেখানে ছিল, সেই পবিত্র শহর জোশিমঠ আজ ধ্বংসের মুখে। কেন? কারণ এনটিপিসি (NTPC) ও অন্যান্য বড় বড় কোম্পানি সেখানে তপোবন-বিষ্ণুগড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পাহাড়ের পেটের ভেতর দিয়ে বিশাল সব সুড়ঙ্গ খুঁড়ছে। এই সুড়ঙ্গ খোঁড়ার জন্য যে শক্তিশালী ডিনামাইট বিস্ফোরণ করা হয়, তার কাঁপুনিতে পাহাড়ের ভেতরকার জলস্তর ফেটে গেছে। জোশিমঠের সাধারণ মানুষের দেওয়াল ফেটে যখন জল বেরোতে শুরু করল, তখন আমরা বুঝলাম— পাহাড়ের ভেতরটা ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে। আজ হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন। যে মানুষগুলো সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটা ছোট ঘর বানিয়েছিল, তাদের আজ রিফিউজি ক্যাম্পে দিন কাটাতে হচ্ছে। মাফিয়ারা প্রজেক্টের টাকা পকেটে পুরে সটকে পড়েছে, আর জোশিমঠের শ্রমিকরা আজ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব।

পাহাড় কেটে যে লক্ষ লক্ষ টন পাথর আর মাটি (যাকে কারিগরি ভাষায় ‘মাক’ বলা হয়) বেরোচ্ছে, তা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা থাকার কথা। কিন্তু মাফিয়ারা খরচ বাঁচাতে সেই সব রাবিশ সরাসরি নিচের অলকানন্দা বা মন্দাকিনী নদীতে ফেলে দিচ্ছে। ফলে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে। আপনারা ভেবে দেখুন— নদী যদি তার স্বাভাবিক পথ না পায়, তবে সে তো লোকালয়েই ঢুকবে। ২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয়ে আমরা দেখেছি, কীভাবে নদী তার সবটুকু ফিরিয়ে নিয়েছিল। আজ আবার সেই একই ভুল করা হচ্ছে। নদীর বুক পাথর দিয়ে ভরাট করার ফলে সামান্য হড়পা বান বা বৃষ্টি হলেই তা ভয়ঙ্কর বন্যায় রূপ নিচ্ছে। ঋষিগঙ্গায় যে হড়পা বান আমরা দেখলাম, তাতে বহু শ্রমিকের ওই সুড়ঙ্গের ভেতরেই জ্যান্ত সমাধি হয়েছে। মাফিয়াদের কাছে শ্রমিকের জীবনের কোনও দাম নেই; তাদের কাছে কেবল পাথরের দাম আর টেন্ডারের হিসেবটাই বড়।

 

সুপ্রিম কোর্টে যখন পরিবেশবিদরা এই ধ্বংসলীলা নিয়ে সওয়াল করলেন, সরকার তখন নিরাপত্তার দোহাই দিল। বলা হল, বর্ডারে সেনা পাঠাতে চওড়া রাস্তা চাই। কিন্তু সেনাবাহিনীর বড় বড় জেনারেলরাই বলছেন— পাহাড়ের এই ভঙ্গুর অবস্থায় এত চওড়া রাস্তা ধসের কারণে বারবার বন্ধ হয়ে যাবে, যা আসলে নিরাপত্তার পক্ষেই হুমকি। আসল সত্যিটা হল, এই চওড়া রাস্তার আড়ালে রয়েছে বিশাল কর্পোরেট পর্যটন ও খনিজ সম্পদ লুটের ব্লু-প্রিন্ট। বাজপেয়ি ঠিকই ধরিয়ে দিয়েছেন— রিপোর্টিং সিস্টেমে দেখানো হচ্ছে সব ঠিক আছে, কিন্তু হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্র আজ আইসিইউ-তে।

হিমালয় যদি ভেঙে পড়ে, তবে উত্তরভারত মরুভূমি হতে সময় লাগবে না। আমরা যারা পাহাড়ে বা সমতলে কায়িক শ্রম করি, আমাদের মনে রাখতে হবে— হিমালয় বাঁচলে তবেই ভারত বাঁচবে। মাফিয়াদের এই ‘ডেথ প্রজেক্ট’ বা মৃত্যু-প্রকল্প, যার গায়ে সরকারি সিলমোহর আছে, তার বিরুদ্ধে যদি আমরা আজ রুখে না দাঁড়াই, তবে আগামী দিনে গঙ্গা-যমুনায জলের বদলে কেবল পাথর আর কাদা বইবে। হিমালয়ের কান্না আসলে আমাদের সবার ভবিষ্যৎ বিনাশের সঙ্কেত।

এই পরিপ্রেক্ষিতে, ২০১৩ সালের কেদারনাথ এবং সাম্প্রতিক সিকিমের হড়পা বানের মতো ভয়াবহ উদাহরণ— অর্থাৎ ধ্বংসলীলার কিছু বর্ণনা— প্রসঙ্গত তুলে ধরা হল। আমরা যারা পাহাড়ে বা নদীর ধারে মেহনত করি, আমরা জানি প্রকৃতির একটা সহ্যক্ষমতা আছে। সেই সীমা যখন মাফিয়াদের লালসা আর সরকারি বুর্জোয়া-প্রেমে অতিক্রান্ত হয়, তখনই নেমে আসে প্রলয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় গত এক দশকে আমরা একের পর এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি দেখেছি— যেগুলো আসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের তৈরি ধ্বংসলীলা।

ক) ২০১৩-র কেদারনাথ ট্র্যাজেডি: কেদারনাথের সেই ভয়াবহ হড়পা বানের কথা মনে পড়লে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। আমরা দেখলাম— গঙ্গা আর মন্দাকিনী যখন ফুঁসে উঠল, তখন তারা তাদের পুরনো পথ খুঁজে নিতে চাইল। কিন্তু সেই পথে মাফিয়ারা গড়ে তুলেছিল হোটেল, লজ আর বড় বড় কংক্রিটের কাঠামো। নদী যখন তার নিজস্ব জায়গা ফিরে পেতে চাইল, তখন চোখের নিমেষে হাজার হাজার মানুষ আর অট্টালিকা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। বাজপেয়ি যে ৫ লক্ষ কোটি টাকার নেক্সাসের কথা বলেন, সেই নেক্সাসই নদীর বুকে বালি-পাথর ফেলে তাকে অগভীর করেছিল। নদী তার জায়গা না পেয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল। আমরা হাজার হাজার মেহনতি মানুষ আর তীর্থযাত্রীকে জ্যান্ত সমাধিস্থ হতে দেখলাম— কেবল পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের জন্য। তীর্থযাত্রীরা তো হিন্দুই ছিলেন, তাই না?

 

খ) ২০২৩-এর সিকিম বিপর্যয়: সিকিমের লোনাক হ্রদ যখন ফাটল, তখন ‘তিস্তা-৩’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। যে বাঁধ নিয়ে মাফিয়ারা বা রাজনৈতিক নেতারা গর্ব করত, সেই বাঁধই সিকিমকে ভাসিয়ে দিল। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট কয়েক সেকেন্ডে জলে মিশে গেল। কেন এমন হল? কারণ বাঁধ তৈরির সময় সিমেন্ট-বালির মান-এর দিকে নয়, মাফিয়ারা নজর দিয়েছিল মুনাফার দিকে। নিম্নমানের কাজ আর পাহাড়ের বাস্তুসংস্থানকে উপেক্ষা করার ফলেই আজ সিকিমের মানচিত্র বদলে গেছে। কয়েকশো সেনাসদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিক— কারও প্রাণ বাঁচেনি এই সস্তা উন্নয়নের কামড়ে।

 

এইরকম আরও অজস্র উদাহরণ আছে। আসলে, এই ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে মাফিয়া তথা রাজনৈতিক নেতাদের, কিংবা উচ্ছিষ্টভোগী আমলাদের সাজানো রিপোর্ট আর গ্রাউন্ড রিয়ালিটির মধ্যে আসমান–জমিন তফাত। কেদারনাথ থেকে সিকিম— প্রতিটি বিপর্যয়ই আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পাহাড়ের কান্না আজ আর কেবল শব্দের অলঙ্কার নয়; এটি এক রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা। আমরা শ্রমজীবী মানুষরা যখন দেখি আমাদের ভাইদের রক্তে নদী লাল হচ্ছে, তখন বুঝতে পারি— তথাকথিত এই উন্নয়ন আসলে আমাদের মৃত্যুর ওয়ারেন্ট নিয়ে আসছে।

 

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প: বন্দি নদী ও শুকিয়ে যাওয়া জীবন

আমরা যারা নদীর পারে বড় হয়েছি, তারা জানি— নদী মানে কেবল বয়ে চলা জল নয়; নদী হল একটা আস্ত সভ্যতা। কিন্তু আজকের ভারতে ‘উন্নয়ন’ আর ‘সবুজ শক্তি’ (Green Energy)-র নামে আমাদের সেই চিরচেনা নদীগুলোকে লোহার খাঁচায় বন্দি করা হচ্ছে। আমাদের এই মালদা জেলাতেই মহানন্দা নদী আজ কংক্রিটের জালে বন্দি। এই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কথাটা ‘সহকার’রা অকারণ বলছে না। যাই হোক, হিমালয়ের গঙ্গা, অলকানন্দা বা ভাগীরথীর মতো খরস্রোতা নদীগুলোর ওপর এখন শয়ে-শয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অভিশাপ নেমে এসেছে। সরকার আর মাফিয়া কোম্পানিগুলো মিলে নদীকে তার স্বাভাবিক পথ থেকে সরিয়ে পাহাড়ের ভেতর মাইলের পর মাইল লম্বা সুড়ঙ্গে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ‘রান অব দ্য রিভার’ (Run of the River) প্রযুক্তির দোহাই দেওয়া হয়। বলা হয়, এতে নদী বাঁধানো হয় না; শুধু জলটুকু সুড়ঙ্গ দিয়ে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু এই সুড়ঙ্গ বানাতে গিয়ে যে কী পরিমাণ হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঝুঁকি আমাদের মতো শ্রমিকদের নিতে হয়, তার খবর এসি-ঘরের বড় সাহেবরা রাখেন না। পাহাড়ের পেটের ভেতর মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ খোঁড়ার জন্য যে শক্তিশালী ডিনামাইট বিস্ফোরণ করা হয়, তাতে গোটা পাহাড়টাই থরথর করে কাঁপে। এই কম্পনে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ জলস্তর বা মাটির তলার যে প্রাকৃতিক শিরাগুলো থাকে, সেগুলো ছিঁড়ে যায়। এর ফলে পাহাড়ের ওপরে থাকা গ্রামগুলোর কয়েকশো বছরের পুরোনো ঝরনা আর কুয়োগুলো রাতারাতি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। নদী এখন বইছে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে, আর পাহাড়ের ওপরে থাকা আমাদের মতো মেহনতি মানুষেরা এক ফোঁটা পানীয় জলের জন্য হাহাকার করছে।

নদী যখন সুড়ঙ্গে ঢোকে, তখন মাইলের পর মাইল নদীপথ পাথুরে মরুভূমিতে পরিণত হয়। নদীর যে স্রোত আগে মাছ আর জলজ প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখত, তা আজ স্থির ও মৃত। মাফিয়ারা এখানেই থামে না; সুড়ঙ্গ আর বাঁধ বানাতে গিয়ে যে লক্ষ লক্ষ টন পাথুরে কাদা বা ‘মাক’ বের হয়, তা তারা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার বদলে খরচ বাঁচাতে সরাসরি নদীর বুকে ফেলে দেয়। বাজপেয়ি যে ৫ লক্ষ কোটি টাকার নেক্সাসের কথা বলেন, সেই নেক্সাসই এই সব বিষাক্ত কাদা আর পাথর ফেলে নদীর নাব্যতা কমিয়ে দেয়। নদী যখন অগভীর হয়ে পড়ে, তখন সামান্য বৃষ্টিতেই সেই নদী বিধ্বংসী রূপ নেয়।

২০২১ সালের ঋষিগঙ্গা বা তপোবনের কথা আগেই বলেছি— সেদিন সুড়ঙ্গের ভেতর কাজ করা আমাদের শত শত শ্রমিক ভাই বেরোনোর সুযোগটুকুও পায়নি। মাফিয়া কোম্পানিগুলোর কাছে শ্রমিকের জীবনের দাম একটা টিনের কৌটোর চেয়েও কম। তারা কয়েক কোটি টাকার ইন্স্যুরেন্স করিয়ে খালাস, কিন্তু যে মা তার ছেলেকে হারাল— তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

এই সব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে যে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তা যায় বড় বড় শহরের কলকারখানা আর বিলাসবহুল শপিং মলে। কিন্তু যে নদীর জল দিয়ে এই বিদ্যুৎ তৈরি হল, সেই নদীর পাড়ের গ্রামগুলো আজও অন্ধকারে ডুবে থাকে। আমাদের বিদ্যুতের বিল দিন দিন বাড়ছে, অথচ আমাদের ঘরের নদী আজ আমাদের জন্য পর হয়ে গেছে। মাফিয়ারা নদীকে লিজ নিয়েছে, পাহাড়কে লিজ নিয়েছে, আর আমরা আমাদের নিজেদের গ্রামেই আজ ভিনদেশি শ্রমিক। নদীর স্রোত আজ বন্দি, আর আমাদের জীবনটাও আজ এই কর্পোরেট সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। নদী শুকিয়ে গেলে মাফিয়াদের কিছু যায় আসে না— তারা কেবল পাওয়ার গ্রিডের মিটার দেখে মুনাফা গোনে। কিন্তু আমরা জানি, নদীহীন পাহাড় মানে এক প্রাণহীন শ্মশান।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে হিমালয়ের এই শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়া আসলে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, যা রাজনৈতিক নেতারাই নিয়ে থাকেন। নদীকে বন্দি করার অর্থ হল প্রকৃতির হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়া। বাজপেয়ি ঠিকই দেখিয়েছেন— তথ্যের জালিয়াতি করে নদীকে ‘রিনিউয়েবল এনার্জি’-র নাম দিয়ে মাফিয়ারা তাদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। আমরা শ্রমজীবী মানুষরা এই বন্দি নদীর মুক্তি চাই। কারণ নদী না বাঁচলে আমাদের জল বাঁচবে না, আর জল না বাঁচলে আমাদের নিঃশ্বাসটুকুর অধিকারও একদিন কেড়ে নেওয়া হবে।

উন্নয়নের এই যে বিশাল যজ্ঞ চলছে, এর আসল জ্বালানি হল আমাদের মতো হাড়ভাঙা খাটুনি দেওয়া শ্রমিকদের জীবন। সুড়ঙ্গ নির্মাণের গালভরা গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক-একটা অন্ধকার মৃত্যুফাঁদ। গত কয়েক বছরে উত্তরাখণ্ডের সুড়ঙ্গগুলোতে যা ঘটেছে, তা কেবল দুর্ঘটনা নয়; তা হল কর্পোরেট গাফিলতির চূড়ান্ত নিদর্শন।

ক) তপোবন সুড়ঙ্গের হাহাকার (২০২১): তপোবন-বিষ্ণুগড় প্রকল্পের সেই কালো দিনটির কথা ভাবলে আজও মেহনতি মানুষের বুক কাঁপে। হঠাৎ আসা হড়পা বানের জল আর কাদা যখন সুড়ঙ্গের ভেতর হুড়মুড়িয়ে ঢুকল, তখন ভেতরে কাজ করছিল শয়ে শয়ে শ্রমিক। মাফিয়া কোম্পানিগুলো সুড়ঙ্গের ভেতরে কোনও ‘ইমার্জেন্সি এক্সিট’ বা জরুরি নির্গমনের পথ রাখেনি। কাদার স্রোতে আটকে পড়া আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা সুড়ঙ্গের দেওয়ালে হাতড়ে মরেছে একটু নিঃশ্বাসের জন্য। মাসের পর মাস ধরে সেখান থেকে পচা-গলা লাশের স্তূপ বের করা হয়েছে। যে হাতগুলো পাহাড় খুঁড়ে বিদ্যুৎ আনার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই হাতগুলোই কর্পোরেট লোভের নিচে চাপা পড়ে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল।

 

খ) সিল্কিয়ারা সুড়ঙ্গের শ্বাসরুদ্ধকর ১৭ দিন (২০২৩): উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারা সুড়ঙ্গে যখন ৪১ জন শ্রমিকভাই আটকা পড়লেন, তখন গোটা বিশ্ব দেখল আধুনিক প্রযুক্তির অসহায়তা। ১৭ দিন ধরে তাঁরা ওই অন্ধকার গহ্বরে বন্দি ছিলেন। কেন এই ধস নামল? কারণ পাহাড়ের ভঙ্গুর প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে মাফিয়ারা পাহাড়ের ভিত মজবুত না করেই খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। মজার বিষয় হল, যে কোম্পানি কয়েক হাজার কোটি টাকার মেশিন দিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধার করতে পারল না, শেষ পর্যন্ত ‘র‍্যাট হোল’ মাইনাররাই (শ্রমিকরা) নিজেদের হাতে পাথর খুঁড়ে তাঁদের বের করে আনলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, মাফিয়াদের কাছে বড় বড় মেশিন আছে ঠিকই; কিন্তু মেশিন যখন ফেল মারে, তখনও শ্রমিকের প্রাণের সুরক্ষা দেওয়ার মতো ন্যূনতম নৈতিকতাও মাফিয়াদের নেই।

 

এই সব ঘটনায় দেখা যায়, কোম্পানিগুলো কয়েক লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলে। বাজপেয়ি যে ৫ লক্ষ কোটি টাকার নেক্সাসের কথা বলেন, সেই নেক্সাস আসলে আমাদের জীবনের ওপর বাজি ধরে ব্যবসা করে। সুড়ঙ্গের ভেতর যে শ্রমিকভাইটি ঘাম ঝরাচ্ছে, তার নিরাপত্তা নিয়ে কোনও ‘অডিট’ হয় না— কারণ অডিট করতে গেলে মাফিয়াদের মুনাফা কমে যাবে। আমরা শ্রমজীবী মানুষরা আজ বুঝে গেছি, এই সুড়ঙ্গগুলো আসলে উন্নয়নের রাস্তা নয়; এগুলো হল আমাদের মতো গরিব মানুষদের জ্যান্ত সমাধি দেওয়ার একেকটা গভীর গহ্বর।

 

হাসদেও আরণ্য: ভারতের ফুসফুসে বিষের ধোঁয়া

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের উত্তর অংশে অবস্থিত হাসদেও আরণ্যকে ‘মধ্যভারতের ফুসফুস’ বলা হয়। প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই ঘন অরণ্য কয়েক হাজার আদিবাসী পরিবারের— মূলত গোণ্ড, রাজগোণ্ড এবং ওরাওঁ সম্প্রদায়ের— একমাত্র আশ্রয়। আমরা যারা মাটি কামড়ে পড়ে থাকা মানুষ, তারা জানি প্রকৃতির সঙ্গে আদিবাসীদের সম্পর্কটা লেনদেনের নয়, বরং ভক্তি ও শ্রদ্ধার। এই জঙ্গল হাসদেও নদীর উৎসস্থল, যা ওই অঞ্চলের কয়েক হাজার একর চাষের জমির জল জোগায়। আজ কয়লাখনির জন্য সেই নদী আর জঙ্গলকে বলি দেওয়ার আয়োজন চলছে।

একজন শ্রমিকের কাছে উন্নয়ন মানে হল দু-বেলা পেট ভরে খাওয়া আর নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু হাসদেওতে উন্নয়নের যে সংজ্ঞা সরকার দেখাচ্ছে, তা হল ‘কয়লা উত্তোলন’। পারসা এবং কেতে (PEKB Coal Block) এক্সটেনশন ব্লকের মতো বিশাল এলাকা আদানির মতো বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ভারতের সংবিধানে ‘গ্রামসভা’-কে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, আদিবাসীদের জমি নিতে গেলে গ্রামসভার সম্মতি বাধ্যতামূলক। সঠিক অভিযোগ উঠেছে যে, প্রশাসন ও কোম্পানি মিলে ভুয়ো স্বাক্ষর এবং জাল রেজোলিউশন তৈরি করে গাছ কাটার অনুমতি জোগাড় করেছে। যখনই মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন, তখনই পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠকে ‘উন্নয়ন-বিরোধী’ বলে দমন করা হচ্ছে। চালানো হচ্ছে পুলিশি অত্যাচার।

 

হাসদেও অরণ্য হল হাতির একটি বড় বিচরণক্ষেত্র। যখন জঙ্গলের বুক চিরে বিশাল বিশাল কয়লাখনি খোঁড়া হয়, তখন হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডোর’ নষ্ট হয়ে যায়। বাসস্থান হারানো হাতিগুলো তখন দিগভ্রান্ত হয়ে গ্রামের দিকে ছুটে আসে। গত কয়েক বছরে এই এলাকায় হাতি-মানুষের সংঘর্ষে বহু দিনমজুর এবং প্রান্তিক কৃষক প্রাণ হারিয়েছেন।

মাফিয়ারা জঙ্গল ধ্বংস করে কালো টাকা নিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে, আর গ্রামের গরিব মানুষগুলোকে বুনো হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মরতে হচ্ছে। এ কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং মানুষের তৈরি এক ভয়াবহ সংকট।

কয়লাখনি থেকে যে পরিমাণ ধুলো এবং বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, তা ওই অঞ্চলের আকাশকে কালো করে ফেলেছে। খনির বিশাল বিশাল গর্তের ফলে মাটির তলার জলস্তর অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাচ্ছে। ফলে চাষের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। যে দিনমজুররা চাষের কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা আজ কর্মহীন। সরকার বলে, গাছ কাটলে গাছ লাগানো হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি, কয়েকশো বছরের পুরনো শালজঙ্গল ধ্বংস করে সেখানে যে ইউক্যালিপটাসের চারা লাগানো হয়, তা কখনও জঙ্গলের মর্যাদা পায় না। এটি কেবল পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক এবং সামাজিক এক চরম অপরাধ।

হাসদেও-এর মানুষেরা পিছু হটেননি। তাঁদের লড়াই আজ ভারতের প্রতিটি প্রান্তের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এক শিক্ষা। হাসদেও-এর মায়েরা এবং বোনেরা যখন হাতে কুড়ুল নিয়ে বা গাছকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়েন, তখন তা প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। তাঁরা বলছেন, “আমাদের আগে মারো, তারপর জঙ্গল কাটবে।” তাঁরা গান বেঁধেছেন— “কোন্‌ বাঁচাহি হাসদেও লা?” (হাসদেও-কে কে বাঁচাবে?)। এটি এই আন্দোলনের অন্যতম জনপ্রিয় গান। ছত্তিশগড়ি ভাষায় গাওয়া এই গানের মূল কথা হল— জঙ্গল যদি কেটে ফেলা হয়, নদী যদি শুকিয়ে যায়, তবে আমাদের জীবন আর প্রকৃতিকে কে রক্ষা করবে? গানে বারবার প্রশ্ন করা হয়, কর্পোরেটদের লোভে যদি ছায়া কেড়ে নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী পড়ে থাকবে? এই গানটি আজ ছত্তিশগড়ের গ্রামগুলিতে সংহতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

“হাসদেও কি কাহানি” (হাসদেও-র গল্প) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গান। বর্তমান প্রজন্মের প্রতিবাদী শিল্পীরা— যেমন, মাহি জি— র‍্যাপ বা আধুনিক লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে এই গানটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। এতে বলা হয়, হাসদেও কোনও সাধারণ খনি অঞ্চল নয়— এটি আদিবাসীদের মন্দির। কীভাবে কয়েকশো বছরের পুরনো গাছগুলোকে রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হচ্ছে, আদিবাসীদের অধিকার এবং সরকারের প্রতিশ্রুতিভঙ্গের গল্প এই গানের ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে।

হাসদেও-এর আদিবাসীরা মূলত তাঁদের নিজস্ব মাতৃভাষা ‘গোণ্ডি’-তে গান গেয়ে থাকেন। এই গানগুলোতে কোনও জটিল বাদ্যযন্ত্র থাকে না; থাকে মাটির মাদল আর সম্মিলিত কণ্ঠের হুঙ্কার। তাঁরা জঙ্গলকে দেবতা মনে করেন, তাই গানগুলো শুরু হয় জঙ্গলকে প্রণাম জানিয়ে। বিরসা মুন্ডা বা গুন্ডাধুর-এর মতো মহান বিপ্লবীদের কথা গানে গানে মনে করা হয়, যাতে লড়াই করার জেদ আরও দৃঢ় হয়। এছাড়াও, আন্দোলনের পদযাত্রা বা ধরনা-মঞ্চে ছোট ছোট চার–ছয় লাইনের গান গাওয়া হয়, যা আসলে স্লোগান। যেমন—

জল, জঙ্গল, জমিন হামারা হ্যায়, ইসপে অধিকার হামারা হ্যায়।
(জল, জঙ্গল, জমি আমাদের, এর ওপর অধিকারও আমাদের।)

বা—

পেড় নেহি কাটনে দেঙ্গে, জঙ্গল নেহি ছিনেঙ্গে।
(গাছ কাটতে দেব না, জঙ্গল ছিনিয়ে নিতে দেব না।)

৩০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করে তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে সাধারণ মানুষের পায়ের তলায় সর্ষে থাকলে বড় বড় রাজপ্রাসাদও থরথর করে কাঁপে। তাঁরা দাবি তুলেছেন—

হাসদেও কি লড়াই, হামারি লড়াই
(হাসদেও-র লড়াই, আমাদের লড়াই)

আমরা যারা ঘাম ঝরিয়ে দেশ গড়ি, তারা জানি এই দেশটা কেবল কয়লার নয়— এই দেশটা বাতাসের, জলের এবং মানুষের। আজ যদি হাসদেও ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তার আঁচ কেবল ছত্তিশগড়ে থেমে থাকবে না। কার্বন নিঃসরণ বাড়বে, গরম বাড়বে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। এসি-ঘরে বসে যাঁরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁরা জানবেন না যে দুপুরের রোদে কাজ করা মানুষের কাছে একটা গাছের ছায়া কত দামি। হাসদেও রক্ষা করা মানে হল আমাদের নিজেদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসটুকু রক্ষা করা। আদিবাসীদের এই লড়াই কেবল তাদের জমি বাঁচানোর লড়াই নয়; এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটু বিশুদ্ধ অক্সিজেন বাঁচিয়ে রাখার শেষ সংগ্রাম।

 

আরাবল্লি পর্বত ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা

একজন শ্রমজীবী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে, সুপ্রিম কোর্টের এই “১০০ মিটারের উচ্চতা” নির্ধারণের বিষয়টি কেবল একটি আইনি সংজ্ঞা নয়; বরং এটি একটি পরিকল্পিত প্রতারণা বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। কেন একজন সাধারণ মেহনতি মানুষ একে সন্দেহের চোখে দেখবেন, তার কারণগুলো নিচে তুলে ধরার চেষ্টা করছি—

ক) সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে সংঘাত: একজন শ্রমজীবী মানুষ পাহাড়কে উচ্চতা দিয়ে চেনেন না, চেনেন তার উপযোগিতা দিয়ে। পাহাড় ছোট হোক বা বড়— সেটি ধুলো আটকায়, বৃষ্টির জল ধরে রাখে এবং সেই অঞ্চলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। যখন কোনও রাষ্ট্র প্রাকৃতিক সম্পদকে কেবল ‘পণ্য’ হিসেবে দেখে, তখন সেটির সুরক্ষাবলয় দুর্বল করা হয়। পাহাড়ের ১০০ মিটারের নতুন সংজ্ঞাটি আসলে একটি আইনি ধোঁকা, যা দিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদকে ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন’ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সাধারণত সারা বিশ্বে যে-কোনও পাহাড় বা পর্বতের উচ্চতা মাপা হয় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আরাবল্লি পাহাড়ের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নয়, বরং পাহাড়টি যে সমতলে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ‘আশেপাশের এলাকা’ থেকে মাপা হবে। আরাবল্লি অঞ্চলটি এমনিতেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচুতে অবস্থিত (প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মিটার)। এখন যদি কোনও পাহাড়ের উচ্চতা ১৯০ মিটার হয়, কিন্তু তার চারপাশের সমতলভূমি ১৫০ মিটার উঁচু হয়, তবে নতুন নিয়মে সেই পাহাড়ের উচ্চতা এসে দাঁড়ায় মাত্র ৪০ মিটার (১৯০–১৫০ = ৪০)। যেহেতু তা ১০০ মিটারের কম, তাই সরকারি খাতায় সেটি আর ‘পাহাড়’ থাকল না। এই হিসাবে রাজস্থানের ১,২৮১টি পাহাড়ের মধ্যে কেবল ১৪৪টি পাহাড় ১০০ মিটারের বেশি উঁচু হওয়ায় প্রায় ৯১ শতাংশ পাহাড়কে আরাবল্লির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ১০০ মিটারের নিচের পাহাড়গুলোকে যদি ‘পাহাড়’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তবে সেগুলোকে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া, গাছ কাটা— সবই সহজ হয়ে যাবে। তাছাড়া ১১০ মিটার উঁচু পাহাড়গুলোকে যদি মাত্র ১০-১৫ মিটার কেটে দেওয়া যায়, তাহলে সেগুলোও আর আরাবল্লির অংশ থাকবে না। তখন অবাধে লুঠতরাজ চালানো যাবে।

গত ৫০ বছরে শুধু আলওয়ার জেলাতেই ৩১টি পাহাড় কেটে সাফ করে দিয়েছে মাফিয়ারা। তাছাড়া, ১ হেক্টর আরাবল্লি-জমি প্রায় ২০ লক্ষ লিটার জল রিচার্জ করতে পারে। পাহাড় কেটে কংক্রিটের কাঠামো করায় জল আর নিচে যেতে পারছে না; ফলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর ১,০০০ থেকে ২,০০০ ফুট নিচে নেমে গেছে। তাই শ্রমিকের চোখে এটি প্রকৃতির ওপর নয়, বরং তার টিকে থাকার ন্যূনতম রসদগুলোর ওপর সরাসরি আঘাত।

খ) মাফিয়াদের জন্য আইনি সেফ প্যাসেজ: শ্রমজীবীদের অভিজ্ঞতা বলে যে, আইন প্রায়ই ধনীদের জন্য পথ প্রশস্ত করে। ১০০ মিটারের এই মাপকাঠিটি মাফিয়াদের জন্য একটি ‘লাইসেন্স’ হিসেবে কাজ করবে। পাহাড়ের উচ্চতা কে মাপবে? সেই মাপজোকের রিপোর্টে কি কারচুপি হবে না? একজন দিনমজুর বা কৃষক জানেন যে, যখন বড় বড় বিল্ডার বা খনি-মালিকদের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে, তখন সরকারি ফিতে বা মাপজোক প্রায় সব সময় মালিকপক্ষের হয়েই কথা বলে।

গ) জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব: আরাবল্লি ধ্বংস হওয়া মানে দিল্লির মতো শহরের জলস্তর আরও নিচে নেমে যাওয়া। একজন ধনী মানুষ জল কিনে নিতে পারেন বা গভীর বোরিং পাম্প বসাতে পারেন। কিন্তু একজন শ্রমিককে এক বালতি জলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয় অথবা চড়া দামে জল কিনতে হয়। পাহাড় কাটার ফলে তাপমাত্রা বাড়লে শ্রমিককে সেই লু-র মধ্যেই কাজ করতে হয়, ধুলোর মধ্যেই কাজ করতে হয়। তাই এই আইনি সিদ্ধান্ত সরাসরি শ্রমিকের পকেটে এবং শরীরে আঘাত করে।

ঘ) বৈষম্যমূলক বিচার: একজন গরিব মানুষ যদি বনের এক টুকরো জমি দখল করে ঝুপড়ি বানায়, তবে আদালত দ্রুত উচ্ছেদের আদেশ দেয়। কিন্তু যখন কর্পোরেট সংস্থাগুলো মাইলের পর মাইল পাহাড় ধ্বংস করে, তখন ‘উন্নয়ন’ আর ‘সংজ্ঞা’-র দোহাই দিয়ে তাদের ছাড় দেওয়া হয়। তথ্য বলছে, ১৯৭৩ সালে যেখানে এই অঞ্চলে বর্ষা থাকত গড়ে ১০১ দিন, ২০০৯ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছিল গড়ে ২৫ দিন, আর বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১৮–১৯ দিনে। আর দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় এই এলাকার জমির দাম আকাশচুম্বী। বড় বড় কোম্পানিগুলো এই সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে— বা সরাসরি দখল করা সম্ভব না হলে, কেনা সম্ভব না হলে— ‘শেল কোম্পানি’ ব্যবহার করে মধ্যস্বত্বভোগী বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে (যেমন, পতঞ্জলি) শত শত একর বনভূমি নিজেদের কব্জায় নিয়েছে। কেউ কেউ সেখানে বিলাসবহুল ফার্মহাউস, রিসোর্ট এবং ওয়েডিং (Wedding) ভেন্যু তৈরি করেছে। এই অঞ্চলে যে হাউজিং প্রোজেক্টগুলো হচ্ছে, তাতে দেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, এমপি, বিখ্যাত ক্রিকেটার এবং উচ্চপদস্থ সেনাকর্তারাও প্লট কিনছেন। এই বৈষম্যই একজন সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পীড়াদায়ক।

 

একজন শ্রমজীবী মানুষের কাছে পাহাড় বা প্রকৃতি হল “কমন প্রপার্টি” (Common Property) বা সবার সম্পদ। সুপ্রিম কোর্টের উচিত ছিল কোনও উচ্চতার মাপকাঠি না রেখে পুরো ভূখণ্ডটিকে একটি ইকোলজিক্যাল সেনসিটিভ জোন হিসেবে ঘোষণা করা। কারণ প্রকৃতি কোনও জ্যামিতিক উচ্চতা মেনে চলে না। ছোট ছোট টিলাগুলোই বড় পাহাড়ের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই ‘টেকনিক্যাল’ মারপ্যাঁচ আসলে সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার একটি পদ্ধতি, যাতে উন্নয়নের আড়ালে লুটপাট বৈধতা পায়। আর এই মারপ্যাঁচের আড়ালেই চলে সেই ‘নেক্সাস’।

 

রিপোর্টিং সিস্টেমের শুভঙ্করের ফাঁকি[1]: এক পরিকল্পিত জালিয়াতি

আমরা যারা সাধারণ মানুষ, যারা প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে দেশ গড়ি, তারা বিশ্বাস করি— ‘সত্য’ মানে যা আমরা চোখে দেখি। কিন্তু বর্তমান ভারতে পরিবেশরক্ষার ক্ষেত্রে ‘সত্য’ আজ এক গোলকধাঁধায় বন্দি। পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ি যখন তথ্যের অধিকার (RTI) এবং ভেতরের খবরের ভিত্তিতে বলেন যে ভারতের সরকারি রিপোর্টিং সিস্টেম আসলে একটি ‘মিথ্যার কারখানা’, তখন আমাদের বুঝতে হবে আমাদের সঙ্গে কত বড় জালিয়াতি করা হচ্ছে।

সরকারের ‘ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট’ (ISFR) প্রতি বছর মহা ধুমধাম করে প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয় যে ভারতে বনাঞ্চল বাড়ছে। কিন্তু আমরা যখন আমাদের চোখের সামনে পাহাড় ন্যাড়া হতে দেখি, জঙ্গল উজাড় হতে দেখি, তখন প্রশ্ন জাগে— এই বাড়তি জঙ্গলগুলো আছে কোথায়? এখানেই লুকিয়ে আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। আধুনিক রিপোর্টিং সিস্টেমে যে-কোনও ঘন সবুজ অংশকেই ‘জঙ্গল’ (Forest Cover) হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, একটা প্রাচীন শাল বা পিয়ালের অরণ্য— যেখানে বাঘ-হাতি থাকে— আর একটা বড়লোকের বাড়ির বাগান বা রাস্তার ধারের ইউক্যালিপটাস ঝোপ— সবই আজ সরকারি খাতায় এক। মাফিয়ারা এই সুযোগটাই নেয়। তারা একটা আদিম জঙ্গল কেটে সাফ করে দেয়, আর কাগজে-কলমে অন্য কোথাও কয়েকটা চারা গাছ লাগিয়ে দাবি করে যে ‘বনায়ন’ হয়ে গেছে। বৃক্ষরোপণের নামে আমাদের শহুরে মধ্যবিত্তরাও তাতে সামিল হয়— বোধহয় ওই একই ন্যারেটিভের জায়গা থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হল, একটা কয়েকশো বছরের পুরনো বাস্তুসংস্থান কি কয়েকটা টব বা চারায় ফিরে পাওয়া সম্ভব?

আজকাল রিপোর্টিং হয় স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের ছবির মাধ্যমে। ওপর থেকে যখন দেখা হয়, তখন সব সবুজই একরকম লাগে। মাফিয়ারা, আমলারা, রাজনৈতিক নেতারা জানেন কীভাবে এই সিস্টেমকে ধোঁকা দিতে হয়। তারা ঘন জঙ্গলের মাঝখানে ‘খনি’ বানাচ্ছে, আর চারপাশের কিছু গাছ রেখে দিচ্ছে— যাতে স্যাটেলাইটে জঙ্গলই মনে হয়। বাজপেয়ি যে ৫ লক্ষ কোটি টাকার নেক্সাস-এর কথা বলেন, সেই নেক্সাস আসলে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে নিজেদের দাসে পরিণত করেছে। তারা রিপোর্টিং সিস্টেমে এমন তথ্য পেশ করে যাতে মনে হয়— উন্নয়নও হচ্ছে, আবার প্রকৃতিও বাঁচছে। অথচ আমরা যারা মাটিতে দাঁড়িয়ে কাজ করি, আমরা দেখি নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, হাতির পাল পথ হারিয়ে গ্রামে ঢুকছে, আর বাতাসের বিষে আমাদের ফুসফুস পচে যাচ্ছে— শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, সিলিকোসিস হচ্ছে, ক্যানসার হচ্ছে। এই যে কাগজে-কলমে ‘সব ঠিক’, আর মাটির তলায় ‘সব শেষ’— এই ব্যবধানটাই হল মাফিয়া-তন্ত্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

যে-কোনও বড় প্রোজেক্টের আগে ‘এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ (EIA) বা পরিবেশগত প্রভাবের অডিট করতে হয়। কিন্তু এই অডিট রিপোর্টগুলো কারা লেখে? যারা মাফিয়াদের থেকে বেতন পায় (পড়ুন— ঘুষ খায়), অথবা যাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ থাকে। শ্রমজীবী মানুষের কথা সেখানে নেই। অডিটে দেখানো হয় যে এই প্রোজেক্টের ফলে কোনও ক্ষতি হবে না। জোশিমঠের ক্ষেত্রেও কি রিপোর্ট একই কথা বলেনি? কিন্তু আজ জোশিমঠ ধ্বংসের মুখে। যখন কোনও বড় দুর্যোগ ঘটে, তখন এই রিপোর্ট-লেখকরা আর সামনে আসে না। তখন দায় চাপানো হয় ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা’ বা ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’-এর ওপর। আর তা হলেই বিষয়টি ইনস্যুরেন্স কভারেজের বাইরে চলে যায়। তাই আমরা আজ বুঝে গেছি— এই রিপোর্টিং সিস্টেম আসলে একধরনের ‘বৌদ্ধিক মাফিয়া-গিরি’, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

আমরা যদি কেবল সরকারি রিপোর্টের ওপর ভরসা করি, তবে একদিন দেখব— আমাদের দেশটা কাগজে-কলমে খুব সবুজ, কিন্তু বাস্তবে একটা জলহীন, বনহীন মরুভূমি। পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ির সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া সতর্কবাণী আমাদের ভাবায়— যখন সিস্টেম নিজেই মিথ্যার বর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের ‘চাক্ষুষ প্রমাণ’ আর ‘সোশাল অডিট’-ই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা। আমাদের হাতে ক্যামেরা আছে, ইন্টারনেটের শক্তি আছে। তাই আমাদের নিজেদের রিপোর্টিং আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। মাফিয়াদের ফাইল যদি আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস কেড়ে নিতে চায়, তবে আমাদের প্রতিরোধ হবে সেই ফাইলের মিথ্যেগুলো জনসমক্ষে টেনে আনা।

তাই একটা সহজ প্রশ্ন— আপনি কি আপনার চারপাশে গাছ কাটা দেখেও বিশ্বাস করবেন যে জঙ্গল বাড়ছে?

 

মাফিয়া নেক্সাস ও রাজনৈতিক তহবিল: লুটের গোপন রসায়ন

আমরা যারা শ্রমজীবী মানুষ, আমাদের সারাদিন কাটে মালিকের হুকুম আর সিস্টেমের প্যাঁচে। আমরা প্রায়ই ভাবি— এত বড় বড় জালিয়াতি পুলিশ কেন দেখে না? আদালত কেন নীরব থাকে? কেন খবরের কাগজগুলো চিল্লামিল্লি না করে শান্ত হয়ে থাকে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে সেই বিষাক্ত চক্রে, যাকে আমরা ‘মাফিয়া নেক্সাস’ বলছি। এই চক্রের তিনটি মাথা— একদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, অন্যদিকে লোভী কর্পোরেট মাফিয়া, আর মাঝখানে দায় এড়ানো কিছু আমলা।

ভারতে ভোট হওয়া মানেই হাজার হাজার কোটি টাকার খেলা। আমরা দেখি, ভোটের সময় পাড়ায় পাড়ায় টাকা ওড়ে, দেদার মদ আর বিরিয়ানি বিলি হয়। কিন্তু এই বিপুল টাকা আসে কোথা থেকে?

এই টাকার সবচেয়ে বড় উৎস হল আমাদের পাহাড় আর জঙ্গল। মাফিয়ারা যখন অবৈধভাবে পাহাড় কাটে বা নদী থেকে বালি তোলে, সেই লুটের টাকার একটা বড় অংশ ‘ইলেকটোরাল বন্ড’ কিংবা অন্য গোপন তহবিলের (যেমন PM CARES) মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের কোষাগারে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রি করে যে টাকা তোলা হয়, সেই টাকাতেই ভোট কেনা হয়।

যখন কোনও রাজনৈতিক দল কোনও মাফিয়ার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেয়, তখন ক্ষমতায় এসে সেই দলের আর ক্ষমতা থাকে না ওই মাফিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। ফলে মাফিয়ারা আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যায়— তাদের জন্য আইন প্রযোজ্য হয় না, বরং তারাই আইন তৈরি করে।

এই নেক্সাস কীভাবে কাজ করে?

প্রথমে কোনও মাফিয়া গোষ্ঠী একটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিত করে— হাসদেও, আরাবল্লি কিংবা কোনও নদীর অববাহিকা। তারপর তারা ওপরতলার রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে রফা করে নেয়। এর পরের ধাপ হল আমলাদের হাত দিয়ে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট তৈরি করা— যাতে কাগজে-কলমে সবকিছু ‘নিয়মমাফিক’ দেখায়।

পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ি যে ৫ লক্ষ কোটি টাকার লোকসানের কথা বলেছেন, তা আসলে আমাদেরই পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া টাকা। নদী থেকে বালি চুরি হওয়া মানে শুধু পরিবেশ ধ্বংস নয়; এর অর্থ হল সরকারের রাজস্ব ক্ষতি। আর সেই ক্ষতির সরাসরি ফল ভোগ করে সাধারণ মানুষ— স্কুল তৈরির টাকা কমে যায়, হাসপাতালের বাজেট কাটছাঁট হয়, সামাজিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে।

এই বাস্তবতায় আজ ‘বেসরকারিকরণ’কে একটা ‘সংস্কার’। সত্যিটা হল— মাফিয়ারা কেবল নদী-শাসন করছে না, তারা নদীকে শোষণ করছে। আর এই শোষণের বখরা পৌঁছে যাচ্ছে ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে।

আমরা যারা খনিতে বা সুড়ঙ্গে কাজ করি, আমাদের প্রাণের কোনও বিমা করা হয় না। আমাদের হাতে দেওয়া হয় না ন্যূনতম সুরক্ষা সরঞ্জামও। কারণটা খুব সোজা— ওই সুরক্ষার টাকা বাঁচিয়েই তো মাফিয়ারা রাজনৈতিক নেতাদের তহবিলে চাঁদা দেয়। আমরা মারা গেলে নেতাদের মুখে কিছু আনুষ্ঠানিক ‘শোকবার্তা’ শোনা যায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। উল্টে যারা প্রতিবাদ করে, যারা জল–জঙ্গল–জমিন রক্ষার দাবি তোলে, তাদের গায়ে ‘উন্নয়ন-বিরোধী’ কিংবা ‘দেশদ্রোহী’ তকমা সেঁটে দেওয়া হয়। জেলে ভরার জন্য প্রয়োগ করা হয় UAPA বা সিডিশনের মতো কঠোর আইন। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য এসব প্রতিবাদী মানুষের গায়ে ‘মাওবাদী’ তকমাও লাগিয়ে দেওয়া হয়।

মাফিয়া-তন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল ভয়। আর সেই ভয়কে তারা শাসনযন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের ওপর প্রয়োগ করে— যাতে আমরা চুপ থাকি, মাথা নিচু করে খুঁড়ে যাই, আর নিজের কবর নিজেই গভীর করি।

এই লড়াইটা কেবল কয়েকটা পাহাড় বাঁচানোর নয়; এটা হল এমন এক সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই, যা আমাদের ভবিষ্যৎকে নিলামে তুলে দিচ্ছে। মাফিয়ারা জানে, পাঁচ বছর পর সরকার বদলাতে পারে— কিন্তু এই নেক্সাস কখনও মরে না। তারা সব দলের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখে, সব শাসনের সঙ্গেই মানিয়ে নেয়। তাই এই চক্র ভাঙতে গেলে কেবল ভোট দিলেই হবে না; দরকার সাধারণ মানুষের সচেতনতা, আর তথ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ লড়াই। যেদিন আমরা বুঝতে পারব যে আমাদের চোখের সামনে থাকা পাহাড়টা আসলে আমাদের সন্তানদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস কেড়ে নিয়ে কারও নির্বাচনী তহবিল ভরছে, সেদিন আমাদের প্রতিরোধের ভাষাও বদলে যাবে।

রাজনৈতিক তহবিল আর মাফিয়া-মুনাফার এই যে গাঁটছড়া, তা আমাদের গণতন্ত্রকে ক্যানসারের মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা শ্রমজীবী মানুষরা হয়তো নিরক্ষর হতে পারি, কিন্তু আমরা বোকা নই। আমরা জানি— যে হাতটা ভোটের সময় আমাদের পিঠ চাপড়ায়, সেই হাতটাই গোপনে মাফিয়াদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাদের পাহাড় কাটার লাইসেন্স দেয়। তবু আমরা উঠি–খাই–কাজে যাই–ফিরে আসি–ঘুমাই— এই ঘ্যানঘ্যানে চক্রে বারবার ভুলে যাই।

কিন্তু এই নেক্সাস ভাঙার অর্থ শুধু দুর্নীতির বিরোধিতা নয়; এর মানে হল— মাটির অধিকার আবার মানুষের হাতে ফিরিয়ে আনা।

 

সামাজিক মালিকানা ও দায়বদ্ধতা (Social Ownership)

মানুষ যখন জানবে যে বনের হিসেব নেওয়ার দায়িত্ব তাদের নিজেদের, তখন বনের প্রতি তাদের মমত্ববোধ আরও গভীর হবে।

রাজস্থানে ‘মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন’ (MKSS) দেখিয়ে দিয়েছে— সাধারণ মানুষ যখন সরকারি খরচের হিসেব (অডিট) চাইতে শুরু করে, তখন কীভাবে দুর্নীতি কমে যায়। এই আন্দোলন থেকেই ভারতে ‘তথ্য জানার অধিকার’ (RTI) আইনের জন্ম হয়েছিল। পরিবেশরক্ষার ক্ষেত্রেও যদি একই মডেল প্রয়োগ করা যায়, তবে সরকার ও মাফিয়ারা অনেক বেশি সতর্ক হতে বাধ্য হবে।

সরকারি রিপোর্ট সাধারণত বছরে একবার বা কয়েক বছর পরপর প্রকাশিত হয়। ততদিনে পাহাড় বা জঙ্গল অনেক সময় পুরোপুরি সাফ হয়ে যায়। তাই দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া, নাগরিক কমিটি যদি সার্বক্ষণিক নজরদারি চালায়, তবে ধ্বংসের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিবাদ গড়ে তোলা সম্ভব। এই ব্যবস্থা অনেকটা একটি ‘ডিজিটাল পাহারাদার’-এর মতো কাজ করতে পারে।

একজন শ্রমজীবী নাগরিক হিসেবে যখন আমরা অডিটিং বা তদারকির ক্ষমতায় বসি, তখন আমরা আর অসহায় থাকি না; আমরা তখন সিস্টেমেরই অংশ হয়ে উঠি। আমাদের মতে, গণতন্ত্র তখনই সফল হয় যখন সেখানে প্রকৃত অর্থে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স’ কার্যকর থাকে। বর্তমানে সরকারি রিপোর্টিং সিস্টেম ভেঙে পড়েছে, কারণ সেখানে সাধারণ মানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই স্বাধীন নাগরিক অডিটই হতে পারে মাফিয়া নেক্সাস ভাঙার একমাত্র অব্যর্থ ওষুধ।

প্রশ্ন হল— ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সরকার কি স্বেচ্ছায় এই ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে ছেড়ে দেবে, নাকি এটিও আন্দোলনের মাধ্যমেই ছিনিয়ে নিতে হবে? আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক ও করপোরেট সংস্কৃতি বিবেচনা করলে এটি স্পষ্ট যে কোনও সরকারই স্বেচ্ছায় তার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে ছেড়ে দিতে চায় না। কারণ, ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া মানেই হল নিজের জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং মাফিয়া-তহবিলের পথ বন্ধ হওয়া।

তবু আশার কথা হল, ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এই অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে এবং সফলভাবে ‘সোশাল অডিট’ বা গণ-তদন্ত পরিচালনা করেছে। নিচে কয়েকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হল—

ক) রাজস্থানের ‘জন-শুনানি’ (মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন – MKSS): ভারতে ‘গণ-তদন্ত’ বা সোশাল অডিটের জন্ম রাজস্থানের খরা-প্রবণ এলাকায় শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে হয়েছিল, যা আগেই উল্লেখ করেছি। ৯০-এর দশকে অরুণা রায় এবং তাঁর সহকর্মীরা সাধারণ শ্রমিকদের বোঝান যে, সরকার যে রাস্তা বা খালের জন্য টাকা খরচ করছে, তার হিসাব নেওয়ার অধিকার তাঁদের আছে। এর ফলে তাঁরা প্রকাশ্য দিবালোকে ‘জন-শুনানি’ আয়োজন করেন। সরকারি ফাইলগুলো গ্রামবাসীর সামনে পড়া হত। দেখা যেত, যে ব্যক্তি মারা গেছেন, তাঁর নামেও মজুরি তোলা হয়েছে! এই প্রবল চাপের মুখে পরে ভারত সরকার RTI (তথ্য জানার অধিকার) আইন তৈরি করতে বাধ্য হয়। যদিও এখন সেই আইন প্রায় রসাতলে। যাই হোক, এটি বিশ্বের অন্যতম সফল গণ-তদন্তের উদাহরণ।

খ) মেঘালয়: ভারতের প্রথম সোশ্যাল অডিট আইন (২০১৭): মেঘালয় হল ভারতের প্রথম রাজ্য যা সরকারিভাবে একটি আইন পাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে কোনও সরকারি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর তার ‘সোশাল অডিট’ করা বাধ্যতামূলক। সেখানে সাধারণ নাগরিক এবং স্বাধীন কমিটি মিলে খতিয়ে দেখে কাজটি ঠিকমতো হয়েছে কি না। এটি বর্তমানে একটি সফল মডেলে পরিণত হয়েছে।

গ) অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার ‘মনরেগা’ (MGNREGA) অডিট: ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি রুখতে এই রাজ্য দুটিতে সাধারণ শ্রমিকদের দিয়েই অডিট করানো হয়। সেখানে শ্রমিকরাই যাচাই করেন যে কতটুকু মাটি কাটা হয়েছে এবং কতটুকু টাকা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ধরা পড়েছে এবং অনেক অসাধু কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এবার শীতকালীন অধিবেশনে এর নাম পাল্টে দেওয়া হয়েছে। সেটা একটি আলাদা নেক্সাস। অন্য কোনও সময় তার ঠিকুজি-কুষ্ঠি লেখা যাবে।

ঘ) আমাজন রেইনফরেস্ট (ব্রাজিল): আন্তর্জাতিক স্তরে উদাহরণ দিতে গেলে ব্রাজিলের আদিবাসীদের কথা বলা যায়। তাঁরা সরকারি রিপোর্টের ওপর ভরসা না করে নিজস্ব ড্রোন এবং স্যাটেলাইট ট্র্যাকার ব্যবহার করে জঙ্গল পাহারা দেন। যখনই কোনও অবৈধ খনি মাফিয়া জঙ্গল কাটতে আসে, তাঁরা সরাসরি সেই ফুটেজ ইন্টারনেটে আপলোড করে বিশ্বজুড়ে চাপ তৈরি করেন।

কেন এই গণ-তদন্ত ছিনিয়ে আনতে হবে? কারণ যে নেক্সাস চলছে, সেই নেক্সাস ভাঙার জন্য সরকার কখনও নিজে থেকে নিয়ম করবে না। কারণ প্রথমত সরকার নিজেই সেই লুটের অংশীদার। দ্বিতীয়ত, ভয়। ভয় এই যে, সাধারণ মানুষ যদি প্রতিটি গাছের হিসাব নিতে শুরু করে, তবে হাজার হাজার কোটি টাকার খনিপ্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবে।

আরাবল্লি বা হাসদেও-এর ক্ষেত্রেও সরকার ততক্ষণ পর্যন্ত নমনীয় হবে না, যতক্ষণ না মানুষ “হিসাব চাই” স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নামছে। ইতিহাস বলছে, অধিকার কখনও ভিক্ষা করে পাওয়া যায় না, তা সংঘবদ্ধভাবে আদায় করে নিতে হয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাধারণ মানুষের হাতে স্মার্টফোন আছে, যা দিয়ে তারা প্রতিটি ধ্বংসলীলা রেকর্ড করতে পারে— এটিই হতে পারে আজকের ‘গণ-তদন্ত’-এর প্রথম অস্ত্র।

আপনার কি মনে হয় ভারতের বর্তমান যুবসমাজ কি এই ধরনের ‘গণ-তদন্ত’ বা সোশাল অডিটের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে তৈরি? নাকি তারা সিস্টেমের ওপর পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে? বর্তমান যুবসমাজকে কেন এই দায়িত্ব নিতে হবে এবং এই অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে, তার পেছনে কিছু অত্যন্ত বাস্তব এবং শক্তিশালী উদাহরণ রয়েছে। অতীতে এবং বর্তমানেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা প্রমাণ করে যে, যখন যুবসমাজ এবং সাধারণ মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে, তখন সিস্টেম নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

ক) সেভ মোলেম আন্দোলন (গোয়া, ২০২০-২১): গোয়ার ভগবান মহাবীর অভয়ারণ্য এবং মোলেম ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে তিনটি বড় প্রোজেক্ট (রেললাইন ডবল করা, হাইওয়ে চওড়া করা এবং পাওয়ার লাইন) নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সরকার। গোয়ার হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, শিল্পী এবং ছাত্রছাত্রীরা একজোট হয়ে ‘Amche Mollem’ নামক একটি সোশাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু করল। তারা কেবল রাস্তায় নামেনি, বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে প্রমাণ করে দিল যে এই প্রোজেক্টগুলো পরিবেশের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক। তার ফলে সুপ্রিম কোর্ট-নিযুক্ত একটি কমিটি শেষ পর্যন্ত এই প্রোজেক্টগুলোর ওপর স্থগিতাদেশ দিল। এটি ছিল আধুনিক ভারতের একটি সফল ‘গণ-তদন্ত’ এবং যুবশক্তির জয়।

 

খ) ফ্রাইডেস ফর ফিউচার (Fridays for Future – India): সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতের যুবসমাজ (যেমন, গ্রেটা থুনবার্গের আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে) বড় বড় শহরে পদযাত্রা করল। যেমন, মুম্বাইয়ের আরে ফরেস্ট (Aarey Forest) বাঁচানোর লড়াইয়ে ছাত্রছাত্রীরা যখন রাত জেগে গাছ পাহারা দিল এবং পুলিশের লাঠিপেটা সহ্য করল, তখন আদালত মেট্রো কারশেড তৈরির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিতে বাধ্য হল। এটি প্রমাণ করে যে যুবসমাজ বিচ্ছিন্ন নয়, তারা লড়তে জানে। যদিও শেষ পর্যন্ত এটি টেকেনি। মেট্রো শেড হয়েছে।

 

গ) রাইট টু ইনফরমেশন (RTI) যোদ্ধা: ভারতের বহু তরুণ এখন আরটিআই (RTI) ব্যবহার করে সিস্টেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজস্থান বা বিহারের অনেক গ্রামে শিক্ষিত যুবকরা আরটিআই করে বের করছে যে তাঁদের গ্রামের খালের সংস্কারের টাকা কোন ঠিকাদার চুরি করল। এটিও এক ধরনের ‘সোশাল অডিট’।

ঘ) লাদাখের আন্দোলন (২০২৪): সোনম ওয়াংচুকের নেতৃত্বে লাদাখের যুবসমাজ যেভাবে হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রায় অনশন করল এবং পদযাত্রা করল, তা ভারতের ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রতিবাদ। তারা কোনও ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বরং হিমালয়ের হিমবাহ এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য লড়াই করছে। এর সঙ্গে অবশ্যই 6th Schedule-এর দাবিও ছিল।

 

কেন আমি মনে করি এটিই একমাত্র পথ?

আমি এই কথাগুলো বলছি কারণ সিস্টেমের ভেতর থেকে সংস্কারের আশা এখন ক্ষীণ। কেন?

  • ডেটা ম্যানিপুলেশন: সরকার যখন নিজেই রিপোর্টিংয়ে কারচুপি করছে (এখন তো IMF-ও বলছে), তখন বাইরের থেকে ‘তৃতীয় পক্ষ’ (Third Party) হিসেবে সাধারণ মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া সত্য জানা সম্ভব নয়।
  • পরিবর্তনের অভাব: যদি সাধারণ মানুষ নিজের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের হিসাব নিজে না রাখে, তবে মাফিয়ারা আপনাকে ‘উন্নয়ন’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে আপনার ফুসফুস বিক্রি করে দেবে। আমাদের ফুসফুস কি বলিপ্রদত্ত?

উদাহরণগুলো বলছে যে লড়াই সম্ভব। তবু এখনও বড় পরিবর্তন আসছে না, কারণ এই আন্দোলনগুলো এখনও ছোট ছোট পকেটে সীমাবদ্ধ। বাজপেয়ি যে বৃহত্তর নেক্সাসের কথা বলেছেন, তাকে ভাঙতে হলে দিল্লির এসি রুম থেকে শুরু করে রাজস্থানের খনি এলাকা পর্যন্ত— সব জায়গায় একযোগে সাধারণ মানুষের ‘সোশাল অডিট’ শুরু করতে হবে।

আপনার কি মনে হয়, এই সব বিচ্ছিন্ন আন্দোলনকে একত্রিত করে একটি বড় ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল মুভমেন্ট’ বা জাতীয় পরিবেশ আন্দোলন গড়ে তোলার সময় এখন আসেনি? আপনি কি এর বাস্তব সম্ভাবনা দেখছেন, না কি বেশিরভাগ মানুষ এখনও ধর্মের মোহে অন্ধ হয়ে আছে?

 

আন্দোলন কোন পথে?

জাতীয় পরিবেশ আন্দোলন গড়ে তোলার সময় শুধু আসেনি— এটি এখন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে অনিবার্য হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হল, এই বিশাল নেক্সাস বা মাফিয়া-তন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের মতো শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ “কেমনভাবে” সংগঠিত হবে।

ক) “আবেগ” থেকে “অর্থনীতি” ও “অধিকারের” লড়াইয়ে রূপান্তর: পরিবেশ আন্দোলনকে কেবল ‘গাছ বাঁচানো’ বা ‘পাখি বাঁচানো’-র আবেগপ্রবণ লড়াই হিসেবে দেখলে চলবে না। একে শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার ও জীবনযাপনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সেটা কেমনভাবে সম্ভব? মানুষকে বোঝাতে হবে— এবং নিজেদেরও বুঝতে হবে— যে, পাহাড় কাটা মানে নিজের চাষের জমি নষ্ট হওয়া, জঙ্গল ধ্বংস হওয়া মানে নিজের গবাদি পশুর খাদ্য কেড়ে নেওয়া। পরিবেশ ধ্বংস যখন সরাসরি ‘রুটি-রুজি’-র প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখনই এই লড়াই আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়।

খ) ডিজিটাল নেটওয়ার্কিং ও ‘ডেটা শেয়ারিং’: আগেকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল— তথ্য পৌঁছাতে সময় লাগত। আজ সেই বাধা আর নেই। আমাদের হাতে প্রযুক্তি আছে। প্রশ্ন হল, আমরা সেটা কেমনভাবে ব্যবহার করব?

একটি সর্বভারতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যেখানে হাসদেও আরণ্যের আদিবাসী, আরাবল্লির পরিবেশকর্মী এবং লাদাখের আন্দোলনকারীরা নিজেদের তথ্য ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন। এক জায়গার লুটপাটের খবর যেন অন্য জায়গায় মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায়— এবং তাতে সরকারের ওপর সম্মিলিত চাপ তৈরি হয়। রাজনৈতিক পার্টিগুলো এত শক্তিশালী, কারণ টেকনোলজি তাদের হাতে আছে। আছে সেই টেকনোলজিকে অপারেট করার জন্য ভাড়াটে বেকার টিম— যাদের টাকা দিয়ে পোষা হয়। সাধারণ মানুষের আন্দোলন যদি এই ডিজিটাল অস্ত্র ব্যবহার করতে না শেখে, তবে শক্তির ভারসাম্য কখনওই বদলাবে না।

গ) স্থানীয় সংহতি বনাম কেন্দ্রীয় চাপ: আন্দোলন হবে স্থানীয়, কিন্তু তার দাবি হবে জাতীয়। কেমনভাবে হবে এটি? প্রতিটি গ্রাম বা শহরে ‘পরিবেশ পঞ্চায়েত’ বা ‘নাগরিক কমিটি’ গঠন করতে হবে। এই কমিটিগুলো স্থানীয় স্তরে গাছ কাটা, পাহাড় ভাঙা বা জলাধার নষ্ট হওয়ার হিসাব রাখবে— অর্থাৎ সোশাল অডিট করবে। এই ছোট ছোট কমিটিগুলো যখন একটি বৃহত্তর ফেডারেশনের ছাতার তলায় একত্রিত হবে, তখন সরকার আর তাদের উপেক্ষা করতে পারবে না।

ঘ) আইনি লড়াই ও রাজপথের মেলবন্ধন: কেবল আদালত বা কেবল আন্দোলন— কোনওটিই একা যথেষ্ট নয়। তাহলে করব কী? এই আন্দোলনের সঙ্গে একদল তরুণ আইনজীবী এবং পরিবেশবিজ্ঞানীকে যুক্ত করতে হবে। রাজপথে যখন মানুষ প্রতিবাদ করবে, তখন আদালতে সেই আন্দোলনের সপক্ষে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শক্ত আইনি যুক্তি পেশ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট যখন ‘উচ্চতা’ বা ‘সংজ্ঞা’ নিয়ে টেকনিক্যাল তর্কে ব্যস্ত থাকবে, তখন বিশেষজ্ঞদের কাজ হবে সেখানে পরিবেশগত ধ্বংসের প্রকৃত ও সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা। যদিও আরাবল্লির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট নিজেদের বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশও মানেনি।

ঙ) রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা (Green Manifesto): ভারতের রাজনীতিতে পরিবেশ এখনও কোনও বড় ইস্যু নয়। এই বাস্তবতাকে বদলানোর সময় এসেছে। কেমনভাবে তা করা যেতে পারে? আগামী যে-কোনও নির্বাচনে— পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা পর্যন্ত— রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করতে হবে যাতে তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশরক্ষার সুনির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য অঙ্গীকার রাখে। যে প্রার্থী পাহাড় কাটা বা জঙ্গল ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত মাফিয়াদের মদত দেবে, তাকে স্পষ্টভাবে ‘পরিবেশ-বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করতে হবে। কাজটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু পারতেই হবে— কারণ পরিবেশ রক্ষা ছাড়া গণতন্ত্রও শেষ পর্যন্ত টিকবে না।

একজন সচেতন শ্রমজীবী নাগরিক হিসেবে আমরা যখন এই প্রশ্নগুলো করব এবং আলোচনার গভীর পর্যন্ত যাব, তখনই আন্দোলনের প্রথম ধাপটি শুরু হয়ে যাবে। ভয়টাই মাফিয়াদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আমরা যখন প্রশ্ন করতে শুরু করি, তখন সেই ভয়ের দেওয়াল ভাঙতে থাকে। তাই এটি কেবল মিছিলে যাওয়ার লড়াই নয়; এটি তথ্য, বিজ্ঞান এবং সংহতির লড়াই। আমরা যদি স্থানীয় স্তরে ‘গণ-তদন্ত’ শুরু করতে পারি এবং সেই তথ্যগুলো জনসমক্ষে আনতে পারি, তবে সেই ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ থেকেই একদিন জাতীয় স্তরে দাবানল তৈরি হবে, যা এই দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।

 

প্রমিনেন্ট ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা: এক অদৃশ্য বৌদ্ধিক বর্ম

আমরা যারা রোদে পুড়ে কাজ করি, আমাদের গলার জোর অনেক সময় ওপরতলার এসি ঘরে পৌঁছায় না। আমরা যখন চিৎকার করে বলি, “পাহাড় কাটবেন না”, তখন মাফিয়ারা আমাদের দিকে তাচ্ছিল্যের হাসিতে তাকায়। তারা ভাবে, “এই অশিক্ষিত লোকগুলো উন্নয়নের কী বোঝে?” ঠিক এই জায়গাতেই আমাদের প্রয়োজন এমন কিছু মানুষকে, যাদের কথা কেবল সরকার নয়, গোটা বিশ্ব শুনতে বাধ্য হয়। বাজপেয়ির মতো নির্ভীক সাংবাদিকদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমাদের এমন এক ‘জাতীয় পরিবেশ ফোরাম’ দরকার, যা হবে আমাদের মতো শ্রমজীবীদের এক আশ্রয়স্থল।

কেন এঁদের আমাদের দরকার? মাফিয়ারা যখন আইনি মারপ্যাঁচে আমাদের জঙ্গল দখল করে, তখন আমাদের হয়ে লড়ার জন্য প্রশান্ত ভূষণের মতো আইনজীবীর দরকার হয়। তিনি যখন সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মাফিয়াদের জালিয়াতি ফাঁস করেন, তখন বিচারকরাও নড়েচড়ে বসেন। ADR, NFSRU বা NTUI (ডলু চা বাগানের লড়াই) কিংবা যোগেন্দ্র যাদব, সুধা ভরদ্বাজ, ভারভারা রাও, রাভিশ কুমার, ডাঃ রাম পুনিয়ানি বা মৌমিতা আলমরা যখন সেটা করেন বা করবেন, তখন সেটা হল আমার আর আপনার অস্তিত্বরক্ষার লড়াই। এঁরা হলেন সেই মানুষ, যারা বিজ্ঞানের ভাষায় আর তথ্যের শক্তিতে মাফিয়াদের মিথ্যা রিপোর্টগুলোকে ছিঁড়ে ফেলতে পারেন।

আমাদের দরকার অঞ্জলি ভরদ্বাজ বা পুনম আগরওয়ালের মতো কর্মীদের, যাঁরা আরটিআই (RTI) দিয়ে মাফিয়া-সরকার আঁতাতের অন্ধকার দলিলগুলো আলোর নিচে নিয়ে আসবেন। আর যখন এই পরিবেশের লড়াইকে মেহনতি কৃষকের ভিটেমাটির লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন যোগেন্দ্র যাদবের মতো ব্যক্তিত্বরা, তখন মাফিয়াদের বুক কাঁপে। কারণ তারা জানে, মেধা আর জনবল যখন এক হয়, তখন কোনও মাফিয়া-তন্ত্রই টিকে থাকতে পারে না। এঁরা আমাদের শেখান যে উন্নয়ন মানে কেবল সিমেন্ট আর কংক্রিট নয়, উন্নয়ন মানে হল মাটির সঙ্গে মানুষের নাড়ির টান।

বাজপেয়ি যে ৫ লক্ষ কোটি টাকার নেক্সাসের কথা বলেছেন, সেই নেক্সাস আসলে আমাদের ‘বৌদ্ধিক দেউলিয়া’ করে রাখতে চায়। তারা চায় আমরা কেবল ধর্ম আর জাতপাত নিয়ে ঝগড়া করি, আর সেই ফাঁকে তারা আমাদের পাহাড়গুলো চুরি করে নিয়ে যাক। তাই জন্যেই তৈরি হল পুঁজিবাদের শ্রেষ্ঠ সমর্থক ফ্যাসিবাদ। এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা আমাদের সেই মোহভঙ্গ ঘটান। তাঁরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, আপনার মন্দির বা মসজিদের চেয়েও আপনার সন্তানের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়াটা আজ বেশি জরুরি।

এঁরা যখন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান, তখন আমরা অনুভব করি যে আমরা একা নই। আমাদের লড়াইয়ের পেছনে এক বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার আর নৈতিক সাহস রয়েছে। বিপ্লবী পলিটিক্যাল পার্টিগুলো এই কাজ করতে পারত। কিন্তু অনুকূল সময়ে তারা নিজেদের মধ্যেই সংঘাত চালিয়ে গেছে, শ্রমজীবী মানুষদের ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ না করে। ফলে বিশ্বাসযোগ্যতা বা জনাধার, ক্ষেত্রবিশেষে তৈরি হলেও ‘মাস’-এর কাছে— অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষের একটা বিরাট অংশের কাছে— নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু যদি বিকল্প হতে পারত, বর্তমান ব্যবস্থার যে কাঠামো, সেটার নিশ্চিত পরিবর্তন হত। এই নেক্সাস থাকত না— আমরা বিশ্বাস করি।

আমরা শ্রমজীবী মানুষরা হয়তো সংবিধানের সব ধারা জানি না, কিন্তু আমরা জানি কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়। এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা আমাদের সেই অনুভূতিকে আইনি আর বৈজ্ঞানিক রূপ দিতে পারেন। আমাদের আজ এমন এক সংহতি দরকার, যেখানে কোদাল চালানো হাত আর কলম চালানো হাত এক হয়ে মুষ্টিবদ্ধ হবে। এই নেক্সাস ভাঙতে হলে আমাদের ‘সাদা কলারের’ বুদ্ধিজীবী আর ‘ঘাম ঝরানো’ শ্রমিকের এক হওয়া ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। হয়তো এঁদের নেতৃত্বেই আমরা গড়ে তুলব এক নতুন ভারত, যেখানে পাহাড় থাকবে পাহাড়ের জায়গায় আর নদী বইবে তার আপন বেগে।

 

শেষ কথা

এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে বলা যায়, আমরা আজ এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে রয়েছে টাকার পাহাড় আর ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ এক মাফিয়া-তন্ত্র, যারা লক্ষ কোটি টাকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে আমাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে দিচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে আমাদের মতো কোটি কোটি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস, আর নিজের ভিটেমাটি ও নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের অধিকারটুকু বাঁচিয়ে রাখার এক অসম লড়াই।

ইতিহাস সাক্ষী আছে— যখনই কোনও সভ্যতা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছে, সেই সভ্যতা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে গেছে। হিমালয় থেকে আরাবল্লি, কিংবা হাসদেও অরণ্য থেকে কেদারনাথ— প্রকৃতি বারবার আমাদের সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে। আমরা যারা মাটির মানুষ, যারা কায়িক শ্রমে বিশ্বাস করি, আমরা বুঝে গেছি যে মাফিয়াদের এই তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ আসলে আমাদের মৃত্যুর ওয়ারেন্ট। আমরা কোনও আকাশকুসুম বিলাসিতার দাবি করছি না; আমরা কেবল দাবি করছি বিষহীন বাতাস, তৃষ্ণা মেটানোর জল, আর আমাদের সন্তানদের জন্য এক নিরাপদ পৃথিবী।

এই প্রবন্ধ কেবল কাগজের ওপর কালির আঁচড় নয়— এটি এক জেগে ওঠার ডাক। পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ির মতো মানুষরা যখন তথ্যের আলো দেখান, তখন আমাদের কাজ হল সেই আলো হাতে নিয়ে মাফিয়াদের অন্ধকার গুহাগুলোতে হানা দেওয়া। আমরা আর চুপ করে বসে থাকতে পারি না। যদি আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ না হই, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা যখন অক্সিজেনের সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাবে, তখন তারা আমাদের ভীরু ও মেরুদণ্ডহীন বলে চিহ্নিত করবে। আমরা কি সত্যিই তাদের জন্য এমন এক মরুভূমি রেখে যেতে চাই?

মাফিয়া-তন্ত্র যতই শক্তিশালী হোক, যত কোটি টাকাই তাদের তহবিলে থাকুক, প্রকৃতির আদিম শক্তির কাছে তারা নগণ্য। আমাদের সংহতি, আমাদের তথ্যের লড়াই এবং আমাদের অস্তিত্বের দাবি যখন এক হবে, তখন কোনও নেক্সাসই আমাদের রুখতে পারবে না। আমাদের শপথ নিতে হবে— আমাদের পাহাড় আমরা রক্ষা করব, আমাদের নদীকে আমরা বন্দি হতে দেব না, আর আমাদের জঙ্গলকে কয়লা-মাফিয়াদের কবলে যেতে দেব না।

নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের অধিকার কোনও সরকারের দেওয়া দান নয়— এটি আমাদের জন্মগত অধিকার। আর সেই অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার সাধ্য কারও নেই। লড়াই দীর্ঘ হতে পারে, পথ হতে পারে পিচ্ছিল; কিন্তু শ্রমিকের ঘাম আর সত্যের জেদ যখন মিলবে, তখন জয়ের সূর্য আমাদের দিগন্তেই উঠবে।

লড়াই চলছে, লড়াই চলবে।
আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস— আমাদেরই লড়াই!


[1] ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলতে আসলে একটি গাণিতিক বা পদ্ধতিগত চালাকিকে বোঝানো হয়েছে, যা দিয়ে সরকার এবং মাফিয়ারা সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেয়। সহজ কথায়, কাগজে-কলমে সব ঠিক দেখানো হয়, কিন্তু বাস্তবে অবস্থা হয় তার উল্টো।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5306 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...