ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি— আশা কম, আশঙ্কাই বেশি

দেবাশিস মিথিয়া

 


ভারত-ইইউ চুক্তিটি কেবল বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের লেনদেন নয়; এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার এক অগ্নিপরীক্ষা। ভারত যদি তার কোটি কোটি কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত না করে কেবল বড় কর্পোরেটদের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে দৌড়াতে চায়, তবে সেই উন্নয়ন সুস্থায়ী হবে না

 

 

দীর্ঘ ১৮ বছরের টালবাহানা ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে গত ২৭ জানুয়ারি ২০২৬-এ ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে সেই বহুপ্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরিত হল। এই চুক্তিকে ‘মাদার অফ অল ডিলস’ বলা হলেও, সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে— এটি কি শুধুই অর্থনীতির অগ্রগতি, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনও আশঙ্কা?

২০০৭ সালে ব্রাসেলসে এই আলোচনার সূত্রপাত হলেও, ২০১৩ সালে আমদানি শুল্ক ও বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নে মতভেদের জেরে তা ঠান্ডা ঘরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু কোভিড-পরবর্তী সময়ে বদলে যাওয়া বিশ্ব-অর্থনীতি এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধজনিত অস্থিরতা ভারতের জন্য নতুন সমীকরণ তৈরি করে। ২০২২ সালে নতুন করে শুরু হওয়া সেই আলোচনা ২০২৬-এ এসে বিনিয়োগ সুরক্ষা ও ভৌগোলিক স্বত্ব (জিআই)-এর মতো বিষয়গুলোকে সঙ্গী করে পূর্ণতা পেল। কিন্তু এই ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তির চাকচিক্যের আড়ালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ কি আজ সত্যিই সংকটের মুখে? নাকি বামপন্থী দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরোধিতার সুর অমূলক?

ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটি ‘সোনালি সুযোগ’ হতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করা মানেই নিশ্চিত সাফল্য নয়; এর প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হল ডেয়ারি ও অটোমোবাইল খাত। এই সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোকে সুরক্ষা দিতে ভারত যে উচ্চ শুল্কনীতি বজায় রাখতে চায়, তা ইউরোপের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। পাশাপাশি, ইউরোপের কঠোর পরিবেশ সুরক্ষা ও শ্রম আইন ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বড় এক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শুধু কূটনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ না থেকে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন এবং বিশ্বমানের পরিকাঠামো নিশ্চিত করাই হবে এই চুক্তির সাফল্যের আসল চাবিকাঠি।

প্রকৃত অর্থে, এই চুক্তিকে সফল করতে হলে ভারতকে তার অভ্যন্তরীণ নীতিতে আমূল সংস্কার এবং পরিকাঠামোগত বিপ্লব ঘটাতে হবে। প্রথমত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ‘রেড টেপ’-এর ফাঁস কমিয়ে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘসূত্রিতার ভয়ে পিছিয়ে না যান। দ্বিতীয়ত, চিন বা ভিয়েতনামের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে ভারতের উচ্চ লজিস্টিক খরচ কমিয়ে পরিবহন ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করতে হবে।

এছাড়া ইউরোপের বাজারে প্রবেশের জন্য কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত শর্ত (যেমন, কার্বন ট্যাক্স) পূরণ করতে ভারতীয় পণ্যগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করা আবশ্যিক। বিশেষ করে ইউরোপের ‘CBAM’ বা কার্বন বর্ডার ট্যাক্সের খাঁড়া ভারতের লোহা, ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থা দ্রুত পরিবেশবান্ধব না হলে, শুল্কমুক্তির সুবিধা পাওয়ার আগেই ভারতীয় পণ্য অতিরিক্ত করের চাপে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

সর্বোপরি, উন্নত ইউরোপীয় প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ শ্রমশক্তি, যা আমাদের বর্তমান শিক্ষা ও কারিগরি ব্যবস্থার আমূল আধুনিকীকরণের দাবি রাখে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই চুক্তি কেবল একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে; কিন্তু পরিকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে না পারলে, এই সুযোগের সুফল অন্য দেশগুলিই লুফে নেবে।

ভারত এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— ভারত এখনও সঠিকভাবে প্রস্তুত নয়। এর অন্যতম প্রধান কারণ ভারতের নীতিগত অস্থিরতা। হুটহাট রপ্তানি বন্ধ করা (যেমন চাল বা পেঁয়াজ) কিংবা কর-কাঠামোয় ঘনঘন পরিবর্তন ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থাহীনতার জন্ম দিতে পারে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং নতুন শ্রম আইন সব রাজ্যে কার্যকর না হওয়ায় বড় শিল্পকারখানা স্থাপনের পথ এখনও কণ্টকাকীর্ণ।

ভারতের বিশাল জনসংখ্যা থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব একটি বড় বাধা; কারণ শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে ইউরোপের উন্নত বাজারের মানদণ্ড পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে ভিয়েতনাম বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো— যারা অনেক আগেই শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা নিয়ে বাজার দখল করে রেখেছে— তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভারত অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

বাণিজ্যের পাশাপাশি এই চুক্তিতে ইউরোপের কঠোর GDPR বা ডেটা সুরক্ষা আইন মেনে চলার যে চাপ রয়েছে, তা ভারতের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের উদীয়মান স্টার্টআপগুলো যদি ইউরোপের জটিল আইনি শর্ত পূরণ করতে না পারে, তবে আমাদের বিশাল তথ্যভাণ্ডার ও ডিজিটাল বাজার পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় টেক জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

অবশ্য সরকার যে একেবারে হাত গুটিয়ে বসে আছে, এমনটা নয়। লজিস্টিক খরচ কমাতে ‘গতি শক্তি’ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা চলছে। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ‘পিএলআই’ স্কিমের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হাইওয়ে ও ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডোর নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। তবে এই উদ্যোগগুলোর সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনও দীর্ঘ সময় লাগবে, যা বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব-অর্থনীতিতে ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আসল সত্যটা হল, ভারত বর্তমানে “এক পা এগোলে দু-পা পিছিয়ে যাওয়ার” মতো এক দোদুল্যমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে। একদিকে বড় বড় স্বপ্ন ও ডিজিটাল বিপ্লবের হাতছানি, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের আমলাতন্ত্র এবং সেকেলে আইনি ব্যবস্থা উন্নয়নের গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই চুক্তিকে কেবল একটি ‘ফটো-সেশন’-এ পরিণত হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে, ভারতকে নিছক কাগজের লড়াই ছেড়ে জোরালো রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি দেখাতে হবে। ব্যবসায়িক পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে নিজেদের বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে না পারলে, এই সুবর্ণ সুযোগের সঠিক ব্যবহার ভারতের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হল— বড় কর্পোরেট হাউসগুলোর জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুললেও, ভারতের কোটি কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ শ্রমিকের জন্য এটি গভীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের চুক্তিতে প্রায়ই দেখা যায়, বড় পুঁজির ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে অস্তিত্বসংকটে ভোগে।

ইউরোপের আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত মানের সস্তা পণ্য যখন শুল্কমুক্তভাবে ভারতীয় বাজারে ঢুকবে, তখন আমাদের পাড়ার মোড়ের ছোট কারখানাগুলো দাম ও মানের লড়াইয়ে টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর এক প্রবল ঝুঁকি তৈরি হবে।

এখানে আরও একটি বড় ফাঁক তৈরি হতে পারে ‘Rules of Origin’ বা পণ্যের উৎস সংক্রান্ত নিয়মে। চিন যদি ইউরোপীয় বিনিয়োগের আড়ালে, অথবা তৃতীয় কোনও দেশের মাধ্যমে, তাদের সস্তা কাঁচামাল ভারতে শুল্কমুক্তভাবে পাঠাতে শুরু করে, তবে ভারতের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা বা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

সবচেয়ে বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে কৃষি ও ডেয়ারি খাতের ক্ষেত্রে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের বিশাল বাজারে তাদের দুধ, চিজ ও কৃষিজাত পণ্য বিক্রির জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু ভারতের ডেয়ারি শিল্প মূলত ছোট ছোট দুগ্ধচাষিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই খাত কোটি কোটি প্রান্তিক কৃষকের রুটিরুজির সঙ্গে জড়িত। এক্ষেত্রে ইউরোপের বিশাল ও আধুনিক খামারগুলোর সঙ্গে আমাদের সাধারণ কৃষকদের অসম লড়াই শুরু হলে গ্রামীণ অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

এছাড়া ইউরোপের কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড ও শ্রমাধিকার-সংক্রান্ত শর্তগুলো ভারতের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এক ধরনের ‘নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার’ বা অদৃশ্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অভাব এবং দামী সার্টিফিকেশনের কঠিন শর্তের কারণে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পণ্য পাঠাতে পারবে না; অথচ ইউরোপের পণ্য অনায়াসেই আমাদের বাজার দখল করে নেবে।

অন্যদিকে, এই চুক্তির ফলে আইটি বা সার্ভিস সেক্টরে বড় কোম্পানিগুলোর উন্নতি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য তা আশীর্বাদ নাও হতে পারে। ইউরোপীয় প্রযুক্তির প্রভাবে উৎপাদনব্যবস্থা যদি অতিমাত্রায় ‘অটোমেটেড’ বা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে, তবে কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাজের সুযোগ সঙ্কুচিত হবে। এই ডিজিটাল বৈষম্য বেকারত্ব আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

তাই ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান্তরাল সুযোগ নিশ্চিত করা। সরকার যদি বড় কোম্পানিগুলোর স্বার্থ দেখতে গিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ভর্তুকি বা টেকনিক্যাল সাপোর্টের মতো রক্ষাকবচ তৈরি না করে, তবে এই চুক্তি ভারতের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়েই দেখা দেবে।

ভারত সরকার কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বড় বড় কর্পোরেট হাউজগুলোর লাভকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকারের ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ বা ব্যবসা সহজ করার নীতিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেগুলি মূলত বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়েই তৈরি। একজন সাধারণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য আজও লাইসেন্স পাওয়া বা ব্যাঙ্ক-ঋণ পাওয়া এক দীর্ঘ লড়াইয়ের সমান। সরকারের বড় বড় সংস্কারের সুফল যেন কেবল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট অফিসের চার দেওয়ালেই আটকে রয়েছে, তৃণমূল স্তরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিশেষ করে ‘পিএলআই’ স্কিমের মতো বড় ভর্তুকি প্রকল্পগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যার সুবিধা সিংহভাগই লুফে নিচ্ছে বিশাল কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। ভারতের জিডিপিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য হলেও, এই ধরনের বড় স্কিমগুলোর জটিল শর্ত পূরণ করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এর ফলে সরকারি অর্থ বা পুঁজি বড়দের পকেটেই জমা হচ্ছে, আর ছোট ব্যবসায়ীরা আধুনিকীকরণের অভাবে ধীরে ধীরে বাজার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অতীতে নোটবন্দি বা জিএসটি-র মতো সিদ্ধান্তগুলো বড় কোম্পানিগুলো সামলে নিলেও, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য তা ছিল মরণকামড়— যা বহু ছোট কারখানাকে স্থায়ীভাবে তালা ঝোলাতে বাধ্য করেছে।

অনেকে মনে করেন, এই ‘কর্পোরেট-ঘেঁষা’ নীতির নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ ও নির্বাচনী তহবিলের ভূমিকা। বড় কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক দলগুলিকে বিপুল অনুদান দেওয়ার বিনিময়ে নিজেদের অনুকূলে নীতি নির্ধারণ করিয়ে নেয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অসংগঠিত হওয়ার কারণে তাদের দাবিগুলো প্রায়ই নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় চুক্তির আগে ছোটদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ তৈরি না করে, কার্যত বড় মাছকে ছোট মাছ খাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এই বৈষম্যমূলক নীতি চলতে থাকলে ভারতের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি— অর্থাৎ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনজীবিকার ভিত্তি— ভবিষ্যতে ধসে পড়ার গুরুতর আশঙ্কা থেকেই যায়।

পরিশেষে বলি, ভারত-ইইউ চুক্তিটি কেবল বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের লেনদেন নয়; এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার এক অগ্নিপরীক্ষা। ভারত যদি তার কোটি কোটি কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত না করে কেবল বড় কর্পোরেটদের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে দৌড়াতে চায়, তবে সেই উন্নয়ন সুস্থায়ী হবে না। মনে রাখতে হবে, এই চুক্তির প্রকৃত সার্থকতা কেবল জিডিপির পরিসংখ্যানে নয়, বরং ভারতের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের মধ্যেই নিহিত।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5300 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...