চক্রব্যূহে ভারতের অর্থনীতি— চাহিদা, জোগান ও পুঁজির নিরন্তর সংলাপ: ভারতের বিবর্ণ চালচিত্র

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 


ভারতের অর্থনীতির মূল সমস্যা হল চাহিদা। সরকার এই সমস্যা মেটাতে রপ্তানি মডেলের উপর জোর দিয়েছে, যা নানা পরিকল্পনা ও ভর্তুকি সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। আবার অভ্যন্তরীণ বাজার গড়ে তুলতে যে ধরনের খরচ করা দরকার, উদারীকরণের জমানায় তা ব্রাত্য হয়ে রয়েছে। পলিসির মূল লক্ষ্য কর্পোরেট মুনাফা নিশ্চিতকরণ। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া চাঙ্গা হবে না

 

পূর্ব-প্রসঙ্গ: ব্যাঙ্কের ঋণ: কর্পোরেট হাঙরদের যা শোধ দিতে হয় না

পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠা এবং ক্রমবর্ধমান জিডিপির শূন্যগর্ভ আস্ফালন ভারতের অর্থনীতির মূলগত সমস্যাটিকে আড়াল করতে পারছে না। এই সমস্যা হল বাজারে পণ্যের চাহিদা ক্রমশ কমে যাওয়া— অর্থনীতির ভাষায় lack of demand। এই সমস্যাটিকে মূলগত বলার কারণ বহুমাত্রিক। বাজারে চাহিদা না থাকলে শিল্পপতিরা পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। ফার্মগুলো যদি চাহিদা সম্পর্কে আশাবাদী হয়, তবে তারা নতুন করে বিনিয়োগ করে; ফলত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আর যদি তারা বাজারের চাহিদা সম্পর্কে আশাবাদী না হয়, তবে পুঁজির পাহাড়ে বসে থাকলেও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় না। বরং তাদের মুনাফা বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থাগুলি শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। এমনকি যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের প্রকৃত মজুরিও বৃদ্ধি পায় না; ফলে তাঁরা খরচে সংযম দেখান। এর ফলে আবার চাহিদা কমে যায়। অর্থনীতির এই সাধারণ সূত্রটিকেই ধরে এই পর্বের আলোচনা।

একদিকে চাহিদার ঘাটতি, অন্যদিকে নতুন প্রকল্প ও বিনিয়োগের সংকট— এই দুয়ের যুগপৎ চাপ কীভাবে অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে, তা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের আর্তনাদ থেকেই স্পষ্ট। তিনি বলেন: “I would equally want to know from the Indian industry why they are hesitant (to invest)…. We will do everything to get the industry to invest here… (but) I want to hear from India Inc what’s stopping you? Is it like Hanuman? You don’t believe in your own capacity, in your own strength, and there’s got to be someone standing next to you and say, you are Hanuman— do it?”

সীতারামনের বক্তব্যের দুটি দিক আছে। প্রথমত, কর্পোরেটদের মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য সরকার যথাসর্বস্ব করেছে— বাস্তবে দেশের জল, জমি, খনিজ, বনজ ও মানবসম্পদ কর্পোরেটদের হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু এত কিছু করার পরও কর্পোরেটরা সরকারের ডাকে সাড়া দেয়নি; তারা বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। এই বক্তব্যই বৃহত্তর সংকটটিকে স্পষ্ট করে তোলে।

আমরা প্রথমে সরকার কর্পোরেটদের স্বার্থরক্ষায় কী করেছে, তা অতি সংক্ষেপে দেখে নেব। এক্ষেত্রে প্রথম বিষয়টি হল কর্পোরেট ট্যাক্সে ছাড়। এই ছাড় ভারতে নব্বইয়ের দশকে সূচনাপর্বে শুরু হলেও ২০১৯ সাল থেকে নতুন গতি পায়। সে-বছরই প্রথম পুরনো কর্পোরেট ফার্মগুলির ক্ষেত্রে করের হার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ শতাংশ এবং নতুন ফার্মের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়।

দ্য হিন্দু পত্রিকা এ-বিষয়ে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যাচ্ছে যে বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত প্রথম সারির ৫০০টি ফার্মের কর্পোরেট করের গড় হার ২০১৮-১৯ সালে ছিল ৩৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ২১ শতাংশে। এই সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই এই ৫০০টি ফার্ম সরকারের বদান্যতায় প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকা কর সাশ্রয় করেছে।[1]

এখন প্রশ্ন হল— এর ফলে সীতারামনের প্রত্যাশামতো কর্পোরেট ফার্মগুলি কি নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছে? রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য কিন্তু উল্টো ছবিই তুলে ধরে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে প্রাইভেট কর্পোরেট সেক্টরের বিনিয়োগ পরিকল্পনা তার আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কমে গেছে।[2] একই সঙ্গে আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হল— যেটুকু বিনিয়োগ হচ্ছে, সেক্ষেত্রেও উৎপাদনমুখী ক্ষেত্র ছেড়ে কর্পোরেটরা রিয়েল এস্টেটেই বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হল কর্পোরেট মুনাফা নিশ্চিত হওয়ার কারণে আজ কর্পোরেট ফার্মগুলো টাকার পাহাড়ে বসে আছে। মিন্ট পত্রিকা (জুলাই ৬, ২০২৫) নথিভুক্ত ২৮৫টি নন-ফিনানসিয়াল ফার্মের হিসাবখাতা পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছে যে ২০২৪–২৫ আর্থিক বর্ষের শেষলগ্নে এই কোম্পানিগুলোর হাতে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লক্ষ কোটি টাকা। পত্রিকার মতে, চাহিদার উন্নতি না হওয়ার কারণে এই মুনাফাকে পুনর্বিনিয়োগ করার কোনও ইচ্ছেই কোম্পানিগুলোর নেই।

তাহলে ফার্মগুলো কী করছে? এই বিপুল মুনাফা তারা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের চারটি বড় টেক ফার্ম— টিসিএস, ইনফোসিস, এইচসিএল এবং উইপ্রো— গত এক দশকে শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিয়েছে ৬.২ লক্ষ কোটি টাকা, অথচ পুঁজি বিনিয়োগে খরচ করেছে মাত্র ৯০,০০০ কোটি টাকা।[3] আর এই শেয়ারহোল্ডাররা মূলত ফার্মগুলোর প্রোমোটার তথা মালিক।

একটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ পর্বে এইচসিএলের ক্ষেত্রে নাদার পরিবার পেয়েছে ৯,৯০৬ কোটি টাকা, বেদান্তে অনিল আগরওয়ালের পরিবার ৯,৫৮৯ কোটি টাকা, উইপ্রোতে আজিম প্রেমজির পরিবার ৪,৫৭০ কোটি টাকা, এবং রিলায়েন্সে মুকেশ আম্বানির পরিবার ৩,৮০৫ কোটি টাকা, ইত্যাদি।[4]

এই অবস্থায় শিল্পের জন্য ব্যাঙ্ক-ঋণেরও চাহিদা নেই। এই মুহূর্তে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকা পড়ে আছে, কিন্তু কর্পোরেট ঋণগ্রহীতারা আগ্রহী নয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া সুদের হার কমিয়ে এবং ক্যাশ-রিজার্ভ রেশিওর হার কমিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বছরের শেষে (২০২৫) এই টাকার পরিমাণ ৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছে যাবে।[5]

একই সঙ্গে তথ্য দেখাচ্ছে, শিল্পের (ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ) জন্য ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বিগত বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে ৬ শতাংশ কমে গেছে।[6]

এই চাহিদা বৃদ্ধি না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনে ব্যবহৃত খুব সাধারণ জিনিসপত্র— বাজারের ভাষায় non-durables— যেমন সাবান, ডিটারজেন্ট, টুথপেস্ট, চা, গুঁড়ো দুধ, খাবার, ওষুধ ও কাগজের চাহিদাও কমছে।[7] কোভিড লকডাউনের সময় চাহিদা কমে যাওয়া অনিবার্য ছিল; তারপর বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু গত দু-বছর ধরে এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা আবার কমতির দিকে।

একইভাবে জামা-কাপড়, বাসনপত্র, চর্মজাত দ্রব্য— যেগুলো বাজারের ভাষায় durables— এবং যেগুলো মানুষ নিয়মিত ব্যবহার করে, সেগুলোর চাহিদাও কমছে। এই সমস্ত পণ্যের চাহিদা কমলে অনিবার্য ফল হিসেবে কর্মসংস্থানও কমে।

চাহিদা কমার সবচেয়ে বড় কারণ হল শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া। এখানে প্রকৃত মজুরি হিসাব করতে হয় মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে। কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক—

সংগঠিত কারখানা-ক্ষেত্রে ২০১৮-১৯ সালে একজন মজুরের যে মজুরি ছিল, তা ২০২২-২৩ সালে এসে ০.৫ শতাংশ কমেছে।

  • এক যুগ সময় ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষিমজুরের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ০.৩ শতাংশ, আর অকৃষি-মজুরের ক্ষেত্রে তা কমেছে ১.০ শতাংশ।[8]
  • সেন্টার ফর লেবার রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশনের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ দেখিয়েছেন যে অসংগঠিত ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিচের স্তরে— যেমন ইটভাটার মজুরদের— প্রকৃত মজুরি ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কমে গেছে।
  • ২০১৭-১৮ পরবর্তী সময় থেকে স্থায়ী মজুরিভিত্তিক শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মজুরি পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ কমেছে।[9]
  • ভারতে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ স্বনিযুক্ত। ২০১৭ সালে শ্রমশক্তির ৫২ শতাংশ ছিল স্বনিযুক্ত, যা ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ শতাংশে। এই সময়পর্বে স্বনিযুক্ত পুরুষদের আয় ৯ শতাংশ এবং মহিলাদের আয় ৩২ শতাংশ কমেছে।[10]
  • ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রকৃত দৈনিক মজুরি পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ২৪ শতাংশ বেড়েছে; কিন্তু একই সঙ্গে কাজ-পাওয়া দিনের সংখ্যা ২৫ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২০ শতাংশ।
  • আবার এই সময়ে সবচেয়ে পছন্দের কর্মক্ষেত্র— তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রেও— চিত্রটি স্বস্তিদায়ক নয়। টিসিএসে এন্ট্রি লেভেলে একজন সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার ট্রেনি ২০০৭ সালে যেখানে বার্ষিক ৩.১৫ লক্ষ টাকা মাইনে পেতেন, ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে বার্ষিক ২.৯৫-৩.৩৬ লক্ষ টাকায়। একইভাবে ইনফোসিসে ওই একই পদে একজন ট্রেনি ২০১০ সালে বার্ষিক ৩.২৫ লক্ষ টাকা পেলেও ২০২৪ সালে তা হয়েছে ৩.৬০ লক্ষ টাকা। প্রকৃত মজুরির হিসাবে টিসিএসে মজুরি কমেছে ৬০ শতাংশ এবং ইনফোসিসে ৪৯ শতাংশ।[11]

এই প্রকৃত মজুরি কমার ছবিটি বহুমাত্রিক।

মাইনে বৃদ্ধি না হওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থানে গতি না আসার ফলে চাহিদা যেমন কমছে, তেমনি শুধু পরিবার নিয়ে কোনওক্রমে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ ঋণ নিচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া প্রতি দু-মাস অন্তর Consumer Confidence Surveys নামে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে। জুলাই ২০২৫-এর সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, একটি প্রশ্নের উত্তরে ২০১২ সালে ৫০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছিলেন যে গত বছরের তুলনায় তাঁদের আয় হয় একই রয়েছে, নচেৎ কমেছে। কোভিড-সময়ে সেই সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ শতাংশে। কিন্তু সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল, ২০২৫ সালে ৭৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে গত বছরের তুলনায় তাঁদের মাইনে একই আছে বা কমেছে। এর অর্থ, দেশের ৭৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কার্যত কমছে।

মার্চ ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪-এর মধ্যে পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে জিডিপির অংশ হিসেবে গৃহস্থের ঋণ দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক জানিয়েছিল, এটি কোনও সংকট নয়— মানুষ আসলে ঋণ করে গাড়ি-বাড়ি কিনছে। কিন্তু যদি তা-ই হত, তাহলে বাজারে চাহিদা বাড়ার কথা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সমীক্ষা আসল সত্যটি ফাঁস করে দিয়েছে। তাদের Financial Stability Report (June 2025) অনুযায়ী:

Among broad categories of household debt, non-housing retail loans, which are mostly used for consumption purposes, formed 54.9 percent of total household debt as of March 2025, and 25.7 percent of disposable income as of March 2024.

ব্যক্তিগত ঋণ যেহেতু রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নতুন নিয়মের কারণে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে, তাই তারা মাইক্রোফিনান্সের সহজ শিকার হয়ে উঠছে। আমরা ক্ষুদ্র ঋণের চরিত্র, এজেন্টদের অত্যাচার এবং ঋণ শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যার লাখ লাখ গল্প শুনেছি। ২০১১ সালে মাইক্রোফিনান্স সংস্থাগুলোর উপর যে সব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, ২০২২ সালের সংশোধনীতে তা অনেকটাই হালকা করে দেওয়া হয়।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, ৫০,০০০ টাকার কম ঋণের বাজারের ৮৪ শতাংশ আজ নন-ব্যাঙ্কিং ও মাইক্রোফিনান্স সংস্থাগুলোর দখলে। একই সঙ্গে ভারতে আবার ভয়ঙ্করভাবে ফিরে আসছে সুদখোর মহাজনের রাজ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ রাজ্যে গ্রামীণ ঋণগ্রস্ততার পরিমাণ গড়ে ২০-৩০ শতাংশ। আবার স্বাধীন সমীক্ষাগুলো দেখাচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে ঋণগ্রস্ততার হার ৫০-৭০ শতাংশ। এই পার্থক্যের কারণ হল সুদখোর মহাজনদের ঋণের তথ্য সরকারি খাতায় না থাকা।[12]

এই সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সোনার পরিবর্তে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা। ২০২৪-২৫ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর ক্ষেত্রে স্বর্ণঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। আবার গ্লোবাল কনসাল্টিং ফার্ম পিডবলুসি তাদের আগস্ট ২০২৪-এর রিপোর্টে দেখিয়েছে যে স্বর্ণঋণের বাজারের ৬৩ শতাংশ অসংগঠিত ব্যক্তিগত ঋণদাতাদের দখলে এবং ৩৭ শতাংশ ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে।[13]

চাহিদার এই সমস্যা মেটাতে প্রথমে দরকার এমন নীতি গ্রহণ করা, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা হচ্ছে— মানুষের বিনিময়ে কর্পোরেট মুনাফার পথই আরও নিশ্চিত করা হচ্ছে। সরকার যদি জনস্বার্থে খরচ করে, তবে অর্থনীতির নিয়মে চাহিদা বাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর (স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর, মুডি ইত্যাদি) পরামর্শমতো জিডিপির শতাংশ হিসেবে মোট খরচ কমানো হচ্ছে।

একই সঙ্গে পরিকাঠামো খাতে ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার বাড়ানো হচ্ছে। এটি সম্ভব হচ্ছে কারণ সরকার জিডিপির অংশ হিসেবে ‘রেভিনিউ এক্সপেন্ডিচার’ কমাচ্ছে। এই খাতে খরচ বলতে বোঝায় মাইনে, জনকল্যাণ ও ভর্তুকি— যেগুলো সরাসরি মানুষের হাতে যায়। ফলে এই ব্যয় কমে গেলে চাহিদাও কমে।[14] সরকার তার পরিবর্তে বিশেষ ধরনের পরিকাঠামোতে ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা কর্পোরেটদের মুনাফা-বৃষ্টি ঘটাচ্ছে।

একই সঙ্গে সরকার ২০১৬ সালে নোটবন্দি, ২০১৭ সালে জিএসটি এবং ২০২০-২১ সালে লকডাউনের মতো অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্ত নেয়, যা কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস ক্ষুদ্র ফার্মগুলোর কোমর ভেঙে দেয়। ২০২২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৫ কোটি টাকার কম পুঁজি রয়েছে— এমন ফার্মের সংখ্যা কোভিডকালে ১৪ শতাংশ কমে গেছে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে অসংগঠিত ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে কাজ হারিয়েছেন ৫০ লক্ষ মানুষ।[15]

মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হল স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বেসরকারিকরণ। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের নামে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবাকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। রিমা নাগরজন টাইমস অব ইন্ডিয়া-য় (১০ জুলাই, ২০২৫) যথার্থভাবেই উল্লেখ করেছেন:

Thousands of crores worth of public hospital buildings built over decades of investment to strengthen the public health system and several lakh crores worth of public land are either in the process of being handed over or have already been given to private entities across India.

একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ভারতীয় পরিবারগুলির চিকিৎসাখাতে খরচ দ্বিগুণ হয়েছে।[16] একই কথা শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

দীর্ঘ আলোচনার শেষে এ-কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে ভারতের অর্থনীতির মূল সমস্যা হল চাহিদা। সরকার এই সমস্যা মেটাতে রপ্তানি মডেলের উপর জোর দিয়েছে, যা নানা পরিকল্পনা ও ভর্তুকি সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। আবার অভ্যন্তরীণ বাজার গড়ে তুলতে যে ধরনের খরচ করা দরকার, উদারীকরণের জমানায় তা ব্রাত্য হয়ে রয়েছে। পলিসির মূল লক্ষ্য কর্পোরেট মুনাফা নিশ্চিতকরণ। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া চাঙ্গা হবে না। এই পলিসির ফলাফল হিসেবে দেশ আরও গভীর সংকটের আবর্তে ডুবে যাচ্ছে।

 

[ক্রমশ]


[1] Francis, Nitika; Radhakrishnan, Vignesh; Wani, Samreen and Parthasarathi, S. Union Budget 2025: Income tax’s share in gross collections expected to rise, despite change in tax slabs. The Hindu. Feb 1, 2025.
[2] RBI Bulletin, August 2025.
[3] BusinessLine, July 27, 2025.
[4] Kant, Krishna. Nadar family tops cash-rich promoter dividend income list in FY25. Business Standard, Jul 12, 2025.
[5] Kumari, Anjali. Banking system liquidity surplus reaches Rs 4.09 trillion amid govt spending. Business Standard. Aug 4, 2025.
[6] RBI. Sectoral Deployment of Credit. July 2025.
[7] Index of Industrial Production data—IIP.
[8] Economic Survey 2024-25.
[9] পূর্বোক্ত।
[10] পূর্বোক্ত।
[11] K, Nitish. The Harsh Truth Behind College Placements with TCS, Infosys, Wipro, Accenture, Cognizant etc… Career 360. Jun 5, 2025.
[12] Chavan, Pallavi. Debt of Rural Households in India: A Note on the All India Debt and Investment Survey. Review of Agrarian Studies. January–June 2012.
[13] Two Faces of the Demand Problem (Part 2). RUPE India. Dec 28, 2025.
[14] RBI, Handbook of Statistics 2024-25.
[15] National Sample Survey, 73rd Round; Annual Survey of Unorganised Sector Enterprises, 2022-23.
[16] Mukhopadhyay, Indranil; Bose, Montu; Reddy Kadarpeta, Rahul S. Making Sense of the Decline in Out-of-pocket Expenditure. EPW, Vol 60, Issue 36. Sep 6, 2025.

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5300 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...