দ্বিতীয় গুলবদন বেগমের অপেক্ষায়

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

 


ঘরে বসে নীরবে সংসার করে যাচ্ছেন যে নারী তিনি কি আবারও বই লিখতে পারেন? যে বই পড়ে কাঁদতে হবে? আফগানিস্তানের জন্য? তাদের মেয়েদের জন্য?

 

 

 

বিগত যুগে এক বই পড়েছিলাম। মার্কিন লেখক ডেবোরা রড্রিগজ লিখেছিলেন— দ্য কাবুল বিউটি স্কুল। এ ছিল এক স্মৃতিকথা।

২০০১ সাল। আমেরিকার টুইন টাওয়ার মাটিতে আছড়ে পড়া ভাঙা কাপের মতো চৌচির। মার্কিন নেতাদের টনক নড়েছে। তালিবানদের আনা হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে হটানোর জন্য, নাজিবুল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য। সেসব কাজ চুকে গেছে, এক দল উন্মাদ টুইন টাওয়ার ভেঙেছে। তালিবানের সেই উন্মাদদের আশ্রয় দিয়েছে আফগানিস্তানের পাহাড়ে পর্বতে। এখন যেভাবে হোক তালিবান হটাতে হবে।

 

তালিবানরা, তখনকার মতো, আফগানিস্তান থেকে ক্ষমতাচ্যুত হল। সেই সময়ে আফগানিস্তানের সামাজিক অবস্থা কেমন ছিল? এ অনেকটা শ্রোডিঞ্জারের প্লেট-এর মতো। আফগানিস্তানের পাহাড়ঘেরা বদ্ধ স্থানে খাতায়-কলমে তালিবান নেই, কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মননে তারা রয়ে গেছে।

সেই সময়ে ডেবোরা রড্রিগজ কাবুলে এক বিউটি স্কুল তৈরি করেন। তাতে আফগান নারীরা তালিম নিচ্ছেন কেশবিন্যাসের। শিখে নিচ্ছেন চুলে সামান্য পমেটম মাখার আদব-কায়দা।

সামান্য একটি বিউটি স্কুল। সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দমিত ও নমিত আফগান নারী আর্থিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে স্বনির্ভর হতে চেয়েছিলেন। যেমন চব্বিশ পরগনার স্বল্পশিক্ষিত নারীরা কাজ শেখার জন্য ভিড় করেন কলকাতার পার্লারগুলোতে। তবে আফগানিস্তানে বাড়ির পুরুষদের লুকিয়ে তাঁদের আসতে হয় স্কুলে; এসে কাজ শেখেন, গল্প করেন, ছোট ছোট সুখ দুঃখ আনন্দ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। তাঁরা কাজের তালিম নিচ্ছেন আবার একই সঙ্গে একটু নির্বিঘ্নে অবকাশ যাপন করছেন। বিউটি স্কুলের পাঠের সময়টাতে ছিল সংসারের নিত্যদিনের একঘেয়ে কোলাহল, দৈনন্দিনতা থেকে সাময়িক মুক্তি।

সামান্য এক বিউটি স্কুল ছিল আশাহীনদের বুকে স্বপ্ন জাগানোর ভরসা। অথচ এই নারীদের দিদিমা-ঠাকুমাদের কাছে কেশচর্চা কিছু বিজাতীয় ভাবনা ছিল না। তারা চুল কেটেছেন, চুল বেঁধেছেন, চোখে দিয়েছেন কাজল। ঠোঁট রাঙা করেছেন ওষ্ঠরঞ্জনী দিয়ে। তবে ১৯৯৬ সালের পরে, তালিবান শাসন জারি হওয়ার পর থেকে, দেশ সমাজ পাল্টে গেল। তখন বিউটি স্কুলের সামান্য শিক্ষা আয়ত্ত করার জন্য তাঁদের লাঞ্ছিত নির্যাতিত হতে হয়, উৎপীড়িত হতে হয়। তাঁরা ভয়ে থাকেন।

তালিবানরা রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা থেকে যেতে পারে, পারিবারিক তালিবানি শাসন তখনও জবরদস্তভাবে বিরাজমান।

 

বাজারে জোর গুজব, নারী নিজের ইচ্ছেতেই ধর্ম তথা সমাজের কঠিন অনুশাসন মেনে চলে। এই কথা শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও বিশ্বাস করেন। দক্ষিণ এশিয়াতে এখন এসব কথা হরবখত শুনতে পাবেন। তবে যদি কোনও নারী সেই ধর্মীয় তথা সামাজিক অনুশাসন মানতে না চায়, তখন নেমে আসে সামাজিক দণ্ড। তাই যে নারী চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বিধান মানে না, উপদেশ শোনে না সে হয় অবিদ্যা, পতিতা। সমাজ থেকে পতিত। পতিতা হওয়ার ভয়ে যুগে যুগে, দেশে দেশে অধিকাংশ নারী নিরুপায়ে নিরুচ্চারে অনুশাসন মেনে চলে। হতে পারে তা মহাভারতের যুগে ভারতবর্ষে। অথবা তিন দশক ধরে আধুনিক আফগানিস্তানে।

২০২১ সালে তালিবানরা আবারও কাবুল দখল করেছে। এখন আর মার্কিনিরা আফগানিস্তানে নেই। তারা সেই তালিবানদেরই হাতে মুলুক ছেড়ে দিয়ে স্বস্থানে গমন করেছে। দ্বিতীয় তালিবান শাসনে আফগানিস্তানে নারীদের অবস্থা আজ ভয়াবহ। নারী মনুষ্যেতর জীবন যাপন করছে; নারীর কোনও স্বাধীনতা আজ আর আফগানিস্তানে নেই। নারীশিক্ষার উপরে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ; মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রবেশ বারণ, কর্মসংস্থান মোটের উপরে নিষিদ্ধ। চলাফেরার স্বাধীনতা নেই। তাঁরা ঘরে রয়েছেন— রান্না করছেন, সংসার করছেন এবং সন্তান প্রসব করছেন। এই দেশে নারী-প্রতি জন্মহার ৫.৪— এটি পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। জাতিসংঘ আফগানিস্তানকে নারীদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক দেশ বলে চিহ্নিত করেছে, জনজীবন থেকে নারীদের প্রায় সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা হয়েছে; অবশ্য যখন-তখন সর্বসমক্ষে বেত্রাঘাত করতে রাষ্ট্র দ্বিধা করে না।

সেই বিউটি স্কুল ধুলোয় মিশে গেছে, সেই নারীরা হারিয়ে গেছেন। বিউটি স্কুল বইটা পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, আফগান নারীরা যেন বইটাতে ঠিক ধরা পড়েননি। সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার অভাব অনুভব করেছি। বোঝা যায় দেশটাকে লেখক চেনেন না। বইটিতে আফগান নারীদের সরাসরি পরিচয় তিনি দিয়েছেন, সেই পরিচয়ের জন্য তাঁরা পরবর্তী সময়ে বিপদে পড়েছেন।

নারীদের উপরে অবিশ্বাস্য অত্যাচার, আধুনিক সময়কালে মধ্যযুগের কানুন নিয়ে একটি দেশের অবস্থান।

 

অথচ বাবরকন্যা গুলবদন বেগম আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে, মধ্যযুগে, হুমায়ুননামা লিখেছিলেন। তিনি ছিলেন আফগান কন্যা। হুমায়ুননামা হল গুলবদন বেগম রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ, বইটিতে তিনি তাঁর সৎভাই সম্রাট হুমায়ুনের জীবন, শাসনকাল, জয় ও পরাজয়ের বিবরণ দিয়েছেন। প্রাথমিক মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস, বিশেষত হুমায়ুনের রাজত্বের সময়কার রাজকীয় হারেমের জীবন জানার জন্য এই গ্রন্থ এক অমূল্য দলিল।

 

ভাবনার কারণ নেই, আজকের আফগান নারীরা ভীতু, চিন্তাশক্তিহীন মানুষ। মার্কিনদের সঙ্গে চুক্তি করে দ্বিতীয়বার যখন তালিবানের ফিরে এল তখন লড়াই ছেড়ে দেশের প্রধান পালিয়ে গেলেন, সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করল, অথচ তখনও কিছু নারী জীবন বাজি রেখে লড়াই চালিয়ে গেছেন। তা ক্ষণস্থায়ী। তবু তাঁরা আশা দেখিয়েছিলেন— আফগান নারীও লড়তে পারে।

পৃথিবীর সমস্ত মানুষের শিক্ষা ও কাজের সমানাধিকার আছে— এ হল মানুষের মৌলিক অধিকার। দেশের আইন সময়ের সঙ্গে পাল্টায়, পাল্টাবে। তবে মানুষের অধিকার পাল্টায় না— নারীরাও মানুষ।

ঘরে বসে নীরবে সংসার করে যাচ্ছেন যে নারী তিনি কি আবারও বই লিখতে পারেন? যে বই পড়ে কাঁদতে হবে? আফগানিস্তানের জন্য। তাদের মেয়েদের জন্য।

বন্দুকের নলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসা সেখানকার মানুষের জন্য।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5300 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. যে বই পড়বই: মননবিশ্ব ও পাঠকের অ্যান্টি-লাইব্রেরি— নবম বর্ষ, ষষ্ঠ যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...