চক্রব্যূহে ভারতের অর্থনীতি— ব্যাঙ্কের ঋণ: কর্পোরেট হাঙরদের যা শোধ দিতে হয় না

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 


ব্যাঙ্ক যখন কাউকে টাকা ধার দেয়, তখন তার মধ্যে রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে, এবং সেই রিস্ক যতটা সম্ভব কমানোর জন্য নানান ধরনের ব্যবস্থা থাকে। একটি ক্ষুদ্র ঋণ তামাদি হয়ে গেলে ব্যাঙ্কের আর্থিক ক্ষতি নগণ্য, কিন্তু একটি বড় মাপের ঋণ তামাদি হলে তা সরাসরি ব্যালেন্স শিটে প্রভাব ফেলে। আজ তাই হিসাবের খাতা থেকে তামাদি হয়ে যাওয়া ঋণ মুছে ফেলে (write-off) সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এই কর্পোরেট লুঠ বন্ধ করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কর্পোরেট-অনুগত সরকারগুলো সে কাজ করবে না

 

পূর্ব-প্রসঙ্গ: টাকার ধারাবাহিক মূল্যহ্রাস

৮ ডিসেম্বর (২০২৫) কেন্দ্রীয় অর্থ-প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী লোকসভায় এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো গত সাড়ে পাঁচটি আর্থিক বছরে (৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ পর্যন্ত) ৬.১৫ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ তাদের হিসাবের খাতা থেকে মুছে (write off) ফেলেছে।[1] সোজা কথায়, এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে জমা রাখা আমজনতার টাকা ঋণগ্রহীতাদের দৌলতে ইতিমধ্যেই ‘ব্যাড লোন’-এ রূপান্তরিত হয়েছে।

মন্ত্রীমশাই আবার বড় মুখ করে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে হিসেবের খাতা থেকে ঋণ মুছে ফেলা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং এই টাকা ব্যাঙ্কে ফেরত আনার জন্য সরকার রীতিমতো তৎপর। এজন্য ‘Securitization and Reconstruction of Financial Assets and Enforcement of Security Interest’ (SARFAESI Act, 2002)-এর অধীনে ‘Debt Recovery Tribunal’ এবং ‘Insolvency and Bankruptcy Code, 2016’-এর অধীনে ‘National Company Law Tribunal’-এ মামলা করা হচ্ছে। ব্যাঙ্কের খাতা থেকে এই ঋণ অবলেপন, মন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য জরুরি।[2]

এই সংকটের স্বরূপ আমাদের কারও অজানা নয়। এ-বছরই মে মাসে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনের দিকে আমরা নজর ফেরাতে পারি। সরকারি৮-বেসরকারি নির্বিশেষে সমস্ত ব্যাঙ্কেই ঋণ তামাদি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে। ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার ২০২৪ আর্থিক বছরে ঋণ মুছে দেওয়ার (write off) পরিমাণ ছিল ১৭,৬৪৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২৬,৫৪২ কোটি টাকা। আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে ২০২৪ থেকে ২০২৫-এ write-off হয়েছে ৬,০৯১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯,২৭১ কোটি টাকা। অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে ৮,৮৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১১,৮৩৩ কোটি টাকা।[3]

আলোচনার গভীরে প্রবেশের আগে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দুটি বিষয় বুঝে নেওয়া দরকার। প্রথমটি হল ‘waive-off’ (ঋণ মকুব) এবং দ্বিতীয়টি হল আমাদের আলোচ্য ‘write-off’, অর্থাৎ হিসাবের খাতা থেকে ঋণ মুছে ফেলা— কারণ এগুলো চরিত্রগতভাবে ব্যাড লোন। ঋণ মকুবের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাকে বাকি থাকা ঋণ শোধ দিতে হয় না। এই ঋণ ব্যাঙ্কের তরফ থেকে ক্যানসেল করা হয় এবং ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা যদি জামানত হিসেবে কোনও কিছু দিয়ে থাকেন, তবে তিনি তা ফেরত পান। এই মকুবের সিদ্ধান্তে সরকারের মুখ্য ভূমিকা থাকে।

অন্যদিকে, ঋণ মুছে ফেলা বলতে বোঝায়— এক্ষেত্রে ঋণদাতা (ব্যাঙ্ক) তার ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে ঋণ অবলেপন করে, কিন্তু এর অর্থ ঋণ ক্যানসেলেশন নয়। ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা জারি থাকে। ঋণ নেওয়ার সময় গ্রহীতার দেওয়া জামানত ব্যাঙ্ক বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এই তুলনা উল্লেখ করার কারণ হল— উদ্ধারের চেষ্টা আদৌ কতটা ফলদায়ক হচ্ছে, তাও আমাদের বিবেচনার মধ্যে আনতে হবে।[4]

পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে আলোচনার নিরিখে আমরা যদি ঋণের অবলেপন (write off) ও তার উদ্ধারের ছবিটা জানতে চাই, তাহলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার প্রদত্ত তথ্যের দিকে নজর ফেরাতে হবে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো মুছে ফেলেছে ১০.৪২ লক্ষ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় করতে পেরেছে মাত্র ১.৬১ লক্ষ কোটি টাকা। তাই বলা যায়, ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে নন-পারফর্মিং অ্যাসেট এবং অনাদায়ী ঋণের সমস্যা প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। এই মুছে ফেলার পরিমাণ বেড়েছে ৫৯ শতাংশ।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য অনুসারে ঋণ অবলেপন সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০১৯ সালে— পরিমাণ ১,৮৩,২০২ কোটি টাকা। আর ঋণ আদায় সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০২৩ সালে— পরিমাণ ৩৫,৩৭৮ কোটি টাকা। ঋণ মুছে ফেলে দেওয়ার তালিকায় প্রথম পাঁচটি ব্যাঙ্ক হল—

  1. স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া – ২,৮৬,১৪৪ কোটি টাকা;
  2. পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্ক – ১,০৫,৪৭৮ কোটি টাকা;
  3. ব্যাঙ্ক অব বরোদা – ৯২,১৭৪ কোটি টাকা;
  4. ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া – ৭৮,১৯৪ কোটি টাকা;
  5. ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া – ৬২,৫৩৭ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ঋণ উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচটি ব্যাঙ্ক হল—

  1. স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া – ৫৪,৪৮১ কোটি টাকা;
  2. পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্ক – ২৩,৭৭৯ কোটি টাকা;
  3. কানাড়া ব্যাঙ্ক – ১৫,০৫৪ কোটি টাকা;
  4. ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া – ১৩,০২৬ কোটি টাকা;
  5. ব্যাঙ্ক অব বরোদা – ১২,৩০৫ কোটি টাকা।[5]

মোদি সরকার এই বিপুল পরিমাণ ঋণ ও নন-পরফর্মিং অ্যাসেটের সমস্যা মেটানোর দাবি নিয়ে যে ‘Insolvency and Bankruptcy Code’ (IBC)-এর কথা বলছে, তার কার্যকারিতা বিচার করা জরুরি। এক প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে জানিয়েছেন, এই কোডের মাধ্যমে ১,১১৯টি কেসের সমাধান করা হয়েছে এবং ৩.৫৮ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কের কোষাগারে ফেরত এসেছে। এই তথ্য আপাতদৃষ্টিতে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, এর মধ্যে এক কর্পোরেট লুঠের গল্প জড়িয়ে আছে, যা সবার জানা দরকার।

এই আইনে বিবাদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে প্রাপ্য টাকার একটি বড় অংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কোডের পরিভাষায় এর নাম ‘hair cut’— আদতে ঋণ মকুব। আইবিসি কোড দেখাচ্ছে যে অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে (২০২৪) ব্যাঙ্কগুলোর টাকা পুনরুদ্ধারের হার ৩১ শতাংশ, যেখানে হেয়ার কাট (আদতে মকুব)-এর পরিমাণ ৬৯ শতাংশ।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের Trends and Progress of Banking in India Report (২০২৩–২৪) অনুযায়ী এনসিএলটির কাছে ১,০০৪টি কেস পাঠানো হয়েছিল, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ১.৬৩ লক্ষ কোটি টাকা। বাস্তবে উদ্ধার হয়েছে ৪৩,৩৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ২৮.৩ শতাংশ উদ্ধার হল, আর ৭১.৭ শতাংশ হেয়ার কাট ক্লজের মুখোশে উবে গেল। হিসাবটা একটু বড় করলে দেখা যাবে, এক দশকে (২০১৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত) ব্যাঙ্কগুলো ১৬.৬১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাড লোনকে তাদের হিসাবের খাতা থেকে মুছে ফেলেছে। এর মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে মাত্র ২.৬৯ লক্ষ কোটি টাকা— অর্থাৎ মোট ঋণের মাত্র ১৬ শতাংশ।[6]

আজকাল ভারতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলির সৌজন্যে বিভিন্ন ‘মানি হেস্ট’ সিরিজ জনপ্রিয়। কিন্তু এ-দেশে এই হেয়ার কাটের মাধ্যমে কীভাবে কর্পোরেট হাঙররা জনগণের লক্ষ কোটি টাকা হস্তগত করছে, তার কাহিনি কম নাটকীয় নয়। এই পর্বে আমরা কিছু নির্দিষ্ট উদাহরণ আলোচনা করব।

এক্ষেত্রে প্রথম উদাহরণটি হল অনিল আম্বানির রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। এই কোম্পানির মোট ঋণ ছিল ৪৭,২৫০ কোটি টাকা। সম্পদের মধ্যে ছিল ৪৩,৫০০টি টাওয়ার এবং ১,৭০,০০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ফাইবার অপটিক। একটি টাওয়ারের ইনস্টলেশন খরচ আনুমানিক ২৫ লক্ষ টাকা এবং জমির বিভিন্নতা অনুসারে এক কিলোমিটার ফাইবার অপটিক বসানোর খরচ গড়ে ৬,০০০ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই কোম্পানিকে নিলামে তোলার পর অনিল আম্বানির দাদা মুকেশ আম্বানি মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকার বিনিময়ে এই কোম্পানি দখল করেন। ব্যাঙ্কের হেয়ার কাটের হার ৯৯.১১ শতাংশ— অভাবনীয়, কিন্তু সত্য।[7]

দ্বিতীয় উদাহরণটি মোদি-ঘনিষ্ঠ আরেক কর্পোরেট গোষ্ঠী— আদানি গ্রুপ। দশটি ঋণগ্রস্ত কোম্পানির মোট ব্যাঙ্ক ঋণ ছিল ৬২,০০০ কোটি টাকা। এই অবস্থায় আসরে নামেন গৌতম আদানি। আদানি গ্রুপ এই কোম্পানিগুলো অধিগ্রহণ করার পর ব্যাঙ্কগুলিকে ১৬,০০০ কোটি টাকা দিয়ে দায়মুক্ত হয়। এক্ষেত্রে হেয়ার কাট, অর্থাৎ ছাড়ের পরিমাণ ৭৪ শতাংশ। কোম্পানিগুলোর নাম এবং আদানির কোন সংস্থা সেগুলি কিনেছে, তার তালিকা এখানে দেওয়া হল—

১. এইচডিআইএল (আদানি প্রপার্টিজ)
২. র‍্যাডিয়াস এস্টেট অ্যান্ড ডেভলপারস (আদানি গুডহোমস)
৩. ন্যাশানাল রেয়ন কর্পোরেশন (আদানি প্রপার্টিজ)
৪. এসার পাওয়ার এমপি লিমিটেড (আদানি পাওয়ার)
৫. দিঘি পোর্ট লিমিটেড (আদানি পোর্ট অ্যান্ড সেজ লিমিটেড)
৬. ল্যানকো অমরকন্টক পাওয়ার (আদানি পাওয়ার)
৭. কোস্টাল এনার্জেন লিমিটেড (আদানি পাওয়ার)
৮. আদিত্য এস্টেটস (আদানি প্রপার্টিজ)
৯. কারাইকেল পোর্ট (আদানি পোর্ট অ্যান্ড সেজ)
১০. কোরবা ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি (আদানি পাওয়ার)[8]

তৃতীয় উদাহরণটি হল লোকসভায় আপ সাংসদ সঞ্জয় সিংয়ের পেশ করা একটি তালিকা, যা হেয়ার কাটের নামে ঋণ মকুবের খেলাটাকে একেবারে নগ্ন করে দেয়। সঞ্জয় সিং সংসদে সেই ৪৩টি কোম্পানির নাম প্রকাশ করে দেন, যারা সরকারের নীতিকে ব্যবহার করে ৩,৫৩,৬৫৫ কোটি টাকা মকুব করে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি কোম্পানির নাম এখানে উল্লেখ করা হল—

  1. রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (৩৬,৮১৯ কোটি টাকা),
  2. ল্যানকো থার্মাল পাওয়ার লিমিটেড (৩৩,১৯৫ কোটি টাকা),
  3. ডিএইচএফএল – দেওয়ান হাউসিং ফিনান্স লিমিটেড (৪৯,২২২ কোটি টাকা),
  4. ভূষণ পাওয়ার অ্যান্ড স্টিল লিমিটেড (২৭,৯০৮ কোটি টাকা),
  5. অলোক ইন্ডাস্ট্রিজ (২৪,৪৭১ কোটি টাকা)।[9]

ভারতের মতো দেশে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাঁচতে বাধ্য হন, যেখানে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের মধ্যেকার সীমারেখা নেহাতই ভঙ্গুর, সেখানে এই ধরনের তামাদি ঋণ (bad loan) এক সার্বিক বিপর্যয়। বিভিন্ন ব্যাঙ্কের একীকরণ, তামাদি ঋণকে জামানত হিসেবে ব্যবহার— এসব আসল সত্যটাকে অস্বীকার করে। সেই সত্যটা হল, কীভাবে এই পর্বতপ্রমাণ ঋণ দেওয়া হল, কাদের দেওয়া হল এবং সেই দেওয়ার প্রক্রিয়াটাকেই প্রশ্ন না করা।

এই সমস্যার সমাধান বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়ার অর্থ হল কর্পোরেট লুঠকে মান্যতা দেওয়া। এমনিতে বিশ্বব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঋণের সাপেক্ষে নন-পরফর্মিং অ্যাসেটের পরিমাণ ২০২২ সালে ১০ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ছিল ৬.১ শতাংশ। এই হিসাব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। চিনের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ মাত্র ১ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা— প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই তা ৫ শতাংশের নিচে।[10]

ভারতে ঋণ শোধ না করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরুর সময় থেকেই। ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের ঘটনা মোদি জমানায় তামাদি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে চলেছে। নন-ব্যাঙ্কিং ফিনান্স সেক্টরে আইএল অ্যান্ড এফএস (IL&FS)-এর দেউলিয়া হয়ে যাওয়া আমাদের ঋণব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাকে সামনে আনে। আমাদের দেশে রিয়েল এস্টেট ও ক্যাপিটাল মার্কেটে যত ব্যাঙ্কের ঋণ বেড়েছে, ততই বেড়েছে ঋণ শোধ না করার ঘটনা। মনে রাখতে হবে, একটি তামাদি ঋণ (bad loan) শুধু ব্যাঙ্কের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে না, তার ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন বিশেষ করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তরা।

এটা সবার জানা যে ব্যাঙ্ক যখন কাউকে টাকা ধার দেয়, তখন তার মধ্যে রিস্ক ফ্যাক্টর থাকে, এবং সেই রিস্ক যতটা সম্ভব কমানোর জন্য নানান ধরনের ব্যবস্থা থাকে। একটি ক্ষুদ্র ঋণ তামাদি হয়ে গেলে ব্যাঙ্কের আর্থিক ক্ষতি নগণ্য, কিন্তু একটি বড় মাপের ঋণ তামাদি হলে তা সরাসরি ব্যালেন্স শিটে প্রভাব ফেলে। আজ তাই হিসাবের খাতা থেকে তামাদি হয়ে যাওয়া ঋণ মুছে ফেলে (write-off) সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এই কর্পোরেট লুঠ বন্ধ করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কর্পোরেট-অনুগত সরকারগুলো সে কাজ করবে না— তা বলাই বাহুল্য।[11]

 

[ক্রমশ]


[1] বাস্তবে গত ১০টি আর্থিক বছরে (২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪) ভারতের ব্যাঙ্কগুলো প্রায় ১৬.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাড লোন বলে রাইট-অফ করেছে। পড়ুন: Banks write off bad loans worth Rs 16.35 lakh crore in last 10 years. BFSI. Updated: Mar 17, 2025.
[2] PSBs Wrote-Off Rs 6.15 Lakh Crore in Loans in Five-and-a-Half Years: Govt Tells Lok Sabha. The Wire. Dec 9, 2025.
[3] Shukla, Piyush. Banks clean unsecured book with aggressive write-offs in FY25. Hindu Businessline. May 27, 2025.
[4] Difference Between Loan ‘Write-off’ & ‘Waive-off’. Moneyview.
[5] Rs 10.4 lakh crore NPAs, 9 years: Which banks wrote off, recovered how much? Newslaundry. Mar 1, 2024.
[6] Paul, Anusha. The Great Corporate Heist: How Taxpayers Foot the Bill for Billionaire Bailouts. Deshvimani. Mar 19, 2025.
[7] Anil, S S. Corporate Bailouts and Public Burden: The Hidden Truth of Loan Haircuts. Kanal. Mar 24, 2025.
[8] Companies Bought Over by Adani Group Got Massive ‘Haircut’ on Loans From Public Sector Banks: Cong. The Wire. Sep 5, 2024.
[9] Government has Written off Debts of Rs 3.53 Lakh Crore Owed by 43 Companies: AAP MP Sanjay Singh. The Wire. Aug 9, 2024.
[10] Bank nonperforming loans to total gross loans (%). World Bank Group.
[11] Raj, Pranay. Is RBI’s New Plan for Bad Loans Just Another Quick Fix? The Wire. May 24, 2025.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5245 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...