দম্ভ যাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি

অনর্ঘ মুখোপাধ্যায়

 



গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীতস্রষ্টা

 

 

 

আমার পক্ষে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে কোনও আলোচনা করার অর্থ হল ঘটি দিয়ে সমুদ্রের সমগ্র জলরাশির পরিমাণ নিরূপণ করার সমার্থক। তাঁর রেকর্ড শুনছি তিন বছর বয়স থেকে। তাঁর গলায় সুর থেকে সুরে সাবলীলভাবে চলাচল করার প্রক্রিয়া আমাকে ভাবিত করেছে মস্তিষ্কস্থিত চেতনা পরিপক্কতা লাভ করার অব্যবহিত পরবর্তী সময় থেকে। ভারতবন্দিত সঙ্গীতগুরু মহামতি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খান মনে করতেন যে “তানসেন হওয়ার আগে কানসেন হতে হবে”, অর্থাৎ, গুরুর কাছে প্রাপ্ত তালিম এবং রেওয়াজের পদ্ধতির মতই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিভিন্ন আঙ্গিকের সঙ্গীতকে শ্রবণেন্দ্রিয়ের সম্যক প্রয়োগ করে শনাক্ত করতে শেখা (বিশেষত, রাগসঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রায় সমান্তরাল দুই বা ততোধিক রাগকে স্বতন্ত্রভাবে বুঝতে পারা)। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, তাঁর গায়নশৈলী দিয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকের সঙ্গীতকে প্রকাশ করে গেছেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। ওস্তাদজির কাছে সঙ্গীতের দীক্ষাপ্রাপ্তা সন্ধ্যাদেবীর সঙ্গীতসাধনা এখানেই সার্থক। আমৃত্যু গুরুর শেখানো রেওয়াজ-পদ্ধতি অনুশীলন করে গেছেন তিনি। বৃদ্ধ বয়সেও সপ্তাহে বেশিরভাগ দিনই তিনি নিষ্ঠাভরে সাধনা করতেন। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খান সাহেব আর তাঁর অনুজ বরকত আলি খান সাহেবের বহু বন্দিশ বাংলায় পুনর্নির্মাণ করেছেন তাঁর রাগপ্রধান গানের অ্যালবামে।

রাজনীতির নামে বর্তমানে যে প্রহসন চলে, তিনি সেই প্রহসন এবং ভণ্ডামি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। আবার সেই আপাতদৃষ্টিতে “অরাজনৈতিক” সন্ধ্যাদেবীই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশি উদ্বাস্তুদের জন্য অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা গড়ে তোলা, সবেতেই অংশ নেন। এছাড়াও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের জন্য দেশাত্মবোধক গান রেকর্ড করেছিলেন তিনি।

তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পঙ্কজ মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, অনুপম ঘটক, রবীন চট্টোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ থেকে শুরু করে কবীর সুমন অবধি বিভিন্ন দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করেছেন বাংলার চলচ্চিত্র এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমাতে “গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু” গানটাকে ব্যবহার করার যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন মহামহিম কম্পোজ়ার অনুপম ঘটক, সেই চ্যালেঞ্জকে জয়যুক্ত করেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, তাঁর কণ্ঠের ট্রিলিং এবং গমকের সুদক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে। এর পরেই, বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন সুচিত্রা সেনের কণ্ঠস্বর।

তিনি নতুন জমানার শিল্পীদের সঙ্গে প্রায়শই যোগাযোগ করতেন, তাঁদের গান শুনতেন, মতামত দিতেন এবং একজন বিদূষী শিক্ষিকার মতো করে তাঁদেরকে তিনি অনুপ্রেরণা দিতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই মূল্যবোধ। সন্ধ্যাদেবী আজীবন তাঁর যাপনের মাধ্যমে শিখিয়ে গেলেন যে বয়স বা প্রভাব নয়; বরং, সৃজনশীলতা এবং শিল্পের সম্যক সাধনাই মানুষের পরিচয়। তাই তিনি, কোনও ছুঁৎমার্গ না রেখেই শুনতেন রূপম ইসলামের একক অ্যালবাম কিংবা তাঁর ব্যান্ড ‘ফসিলস্‌’-এর গান। তিনি নির্দ্বিধায় তাঁর চেয়ে বয়সে ঢের বেশি ছোট কবীর সুমনের কথা ও সুরে গান রেকর্ড করেছেন। সেই রেকর্ডিংয়ের দিনগুলির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এইচএমভি-র প্রাক্তন অধিকর্তা শুভজিৎ রায় লিখেছেন: “এক টেকে গান ওকে। তার পর সে দিনের মতো প্যাকআপ। এভাবেই প্রতি দিন একটা করে গান এক টেকে রেকর্ড করে গেলেন সন্ধ্যাদি…. গান শুরু করার সন্ধ্যাদি আগে মাইক্রোফোনে বলতেন ‘স্বপন/সুমন ভাই, ভুল করলে থামিয়ে দেবেন।’ ভুল? যার কণ্ঠে স্বয়ং দেবী সরস্বতীর বাস, রাগসঙ্গীতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাঁর অবাধ বিচরণ, রিহার্সাল যাঁর এমন নিখুঁত, তাঁর হবে ভুল? কিন্তু অপরকে সম্মান করার আর এক নাম যে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়! তাই স্বপনদা, সুমনদাকে এ ভাবে বলা। অনুভব করলাম— যিনি যত বড়, তিনি ততটাই বিনয়ী। দম্ভ যাকে স্পর্শ করতে ভয় পায়।”

সত্যিই তাই। কখনওই অহঙ্কার সন্ধ্যাদেবীকে স্পর্শ করতে পারেনি বলেই তিনি শ্রীকান্ত আচার্যকে দৃঢ়তার সঙ্গে উপদেশ দিয়েছিলেন ‘‘শোনো, পারতপক্ষে অন্যের গানের বিচারক হোয়ো না।’’

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...