দেবজিৎ ভট্টাচার্য
রাজ্যে এসআইআরের শুনানি প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। প্রায় ৫ লক্ষ নাগরিক শুনানিতে অংশ গ্রহণ করেননি। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ফাইনাল তালিকার দিকে তাকিয়ে সকলে। তবে গোটা প্রক্রিয়া চলাকালীন সময় জুড়ে রাজ্যের ১৫০ জনেরও বেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর দায় কে দেবে? এই পরিবারগুলোর কী হবে? এগুলো এখন পর্যন্ত শক্তপোক্ত রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেনি। এখন দেখবার— ভবিষ্যৎ কোনদিকে এগোয়। বাদ দেওয়ার রাজনীতিকেরা বিজয়ী হন, না কি নাগরিকের প্রতিবাদ, বিভিন্ন সামাজিক, গণ-সংগঠনগুলোর আন্দোলন গড়ে তুলে বেঁচে থাকবার চেষ্টা নতুন কিছু করে দেখায়, নাগরিকের চেতনার গুণগত মানের বিকাশ ঘটায়, নতুন রাজনীতির জন্ম দেয়
চাল থেকে কাঁকর বাছতে গেলে প্রথমে সেটাকে নিবিড়ভাবে খুঁজে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে বাইরে ফেলতে হয়। তবে সেই চালকে ভাত বানিয়ে মুখে পোড়া যায়। এমন ঢঙে চলছে এ-রাজ্যে নাগরিকের ঝাড়াই, বাছাই— অনুপ্রবেশকারীদের খোঁজার পালা, নতুন বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির কাজ। সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, তিনটি ‘ডি’-এর ফর্মুলার কথা— ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট।
এখন খোঁজা-খুঁজির প্রায় শেষ সময়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে এন্যুমারেশন ফর্ম পূরণের পর ঘটা করে ‘শুনানি’ হল। নতুন বছরের শুরুয়াত যে লাইনে দাঁড়িয়ে হবে তা কে জানত? জানত না কেউ, জানতেন না চটকলের শ্রমিকেরাও। গত বছরে প্রথম ও মাঝের দিকে এ রাজ্যে কাজ হারিয়ে অনেকে গেছিলেন অন্য রাজ্যে কাজের খোঁজে। কেউ কেউ গেছিলেন গ্রামে, কেউ-বা গেছিলেন অন্য জায়গায় বেশি পয়সার কাজ করতে। বছরশেষের সময় ঝাড়াই, বাছাই শুরু হতেই সিংহভাগই ফিরে এসেছেন নিজেদের বাসস্থানে।
নতুন বছরের নতুন মাসের শেষ সময় শুনানি শুরু হতেই রাজ্যের কিছু জেলা নাগরিকের প্রতিবাদে ক্রমশ উত্তাল হয়ে ওঠে। অনেক নাগরিক বিরক্তি প্রকাশ করেন, প্রতিবাদ-বিদ্রোহের পথ ধরেন। এমন সময় মুর্শিদাবাদ জেলার কয়েকটি সামাজিক ও গণ-সংগঠন একত্রিত হয়ে জেলা জুড়ে ১২ ঘণ্টার ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই ধর্মঘট সংগঠিত হয়েছে এসআইআর-এনআরসি বাতিল ও শুনানি বন্ধ করবার দাবিতে। এমনটাই তাঁরা বলছেন। এতে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সরকারি রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যূনতম সহযোগিতা ছিল না। এ-অভিযোগও মুর্শিদাবাদ জেলায় বসবাসরত নাগরিকদের। অন্যদিকে সেইদিন এ-রাজ্যের বাকি জেলাগুলো জুড়ে শুনানি হয়েছে।
মুর্শিদাবাদে ধর্মঘটের সকাল, সাতাশে জানুয়ারি (২০২৬)। সেইদিন হুগলির চাপদানি পৌরসভার অ্যাঙ্গাস অঞ্চলের অনেক শ্রমজীবীদের শুনানির ডাক আসে। যাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই উর্দুভাষী মুসলমান শ্রমিক। এই অঞ্চলে উর্দুভাষী মুসলমান শ্রমজীবীরাই বেশি থাকেন। সেইদিন পঁচাত্তর বছরের অসুস্থ এক মুসলমান বৃদ্ধ বৈদ্যবাটি শুনানিকেন্দ্রে পৌঁছান। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। হাতে প্লাস্টিক। তার ভেতরে ভোটার, আধার, প্যান ইত্যাদি নানা ধরনের নথিপত্র। কিন্তু, এসব নথিপত্র দেখাবার নির্দেশ দেয়নি নির্বাচন কমিশন। তাহলে এগুলো দিয়ে কী হবে? কর্মরত এক বিএলও জানান, নির্বাচন কমিশন যে যে নথিপত্র চেয়েছে তা এখানকার বেশিরভাগ গরিব মানুষের কাছে নেই। তাই তাঁরা এগুলো এখন জমা রাখছেন। অনুমতি পেলে এগুলোকে নথি হিসেবে কমিশনের কাছে পাঠাবেন। একই মত ইএলআর-এরও। তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, এ-রাজ্য থেকে মুছে যাবে অনেকে, এমনভাবে চললে আনুমানিক এক থেকে দেড় কোটি বাদ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হুগলির চাপদানির এই অঞ্চলে সিংহভাগ মুসলমানদের ঘরেই শুনানির ডাক এসেছে। নিম্নবর্ণের অনেক শ্রমিকেরাও একই সমস্যায় পড়েছেন। এর পেছনের যুক্তি হিসেবে প্রধানত খাড়া করা হয়েছে— ‘এক পিতার চার বা ছয় সন্তানের উপরে।’ নির্বাচন কমিশন বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরি করবার অতিরিক্ত তাগিদে যে পিতার দুই সন্তান রয়েছে তাঁদেরও শুনানিতে ডেকেছে। এমন উদাহরণও অনেক রয়েছে, কিন্তু, তা তাঁরা প্রথমে বুঝতে পারেননি অনেকে। আসলে এই অঞ্চলের শ্রমজীবীদের কাছে এন্যুমারেশন ফর্ম থেকে শুনানির নোটস বাংলা ভাষাতে আসে। যা তাঁরা পড়তে পারেননি। শুধু বিএলওর কথা শুনে বুঝেছেন যে, যে কোনও কারণে হোক নথিপত্র নিয়ে শুনানিতে যেতে হবে তাঁদের। মেয়েদের ক্ষেত্রে সমস্যা স্তর আরও গভীর, আরও বাড়াবাড়ি রকমের। বিয়ের পরে নাম ও পদবি পরির্বতন হওয়ার কারণেও তাঁদের ভুগতে হয়েছে। পুরুষ ও মেয়ে— প্রত্যেকেই শুনানির হাজিরা দিতে গিয়ে এবং ভালোভাবে কাজ না থাকবার সমস্যায় পরে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস মিলিয়ে ৬০ দিনে গড়ে ২৫-৩০ দিন করে কাজ পেয়েছেন। এখন রমজান মাস, তারপর ঈদ। ফলে, বেশিরভাগই নতুন করে ধারদেনা ও চড়া সুদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। এখন এখানকার অনেক নাগরিকদের অভিযোগ, এসআইআরের গোটা সময় জুড়ে রাজ্য সরকার, তৃণমূলের লোকেরাও তাঁদের ভালোভাবে দেখভাল করেনি।
এমনভাবে দেশের নাগরিকদের অসহায়তার ফেলে মুছে দেওয়াটা কোন গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে? কারা এতে মজা পেতে পারে? কোথাও কোথাও এই মজাই আবার সাজায় পরিণত হয়েছে। যেখানকার শ্রমজীবীরা বাংলাভাষা পড়তে পেরেছেন। এমনি একটা উদাহরণ বর্ধমানের কাটোয়া জেলার গাঙ্গুলিডাঙ্গা গ্রামের। এই অঞ্চল মুসলমান-প্রধান অঞ্চল, মূলত কৃষিজীবী জনগণের বসবাস। এখানে গড়ে ৬০-৭০ শতাংশ কৃষিজীবী মুসলমানের কাছে শুনানির নোটিস এসেছে। কারণ, একই, সমস্যার জায়গাগুলো এক। এখানকার বাংলাভাষী মুসলমান কৃষিজীবী নাগরিকরা জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, পথ অবরোধ করেন। দাবি একটাই— ‘শুনানি বন্ধ করো এক্ষুনি।’ পাশের গ্রাম সাহেবডাঙ্গা, সেইখানে কৃষিজীবী নিম্নবর্ণ, আদিবাসী নাগরিকদের বসবাস। তাঁদের সমস্যা মুসলমানদের থেকে কোনও অংশে কম নয়, আলাদাও নয়। তাঁরাও এর প্রতিবাদে রাস্তা দখল করেন। এইরকমভাবে গোটা রাজ্য জুড়ে প্রায় ছয়-সাতটি জেলার দশ থেকে পনেরোটি অঞ্চলের অনেক মুসলমান, নিম্নবর্ণ ও আদিবাসী নাগরিকেরা এসআইআর বাতিল ও শুনানি বন্ধের দাবিতে রাস্তায় নামেন। অনেক জায়গায় শুনানি কেন্দ্র জুড়ে টানা অবস্থান, বিক্ষোভ সংগঠিত হয়।
অর্থাৎ, এসআইআর-এনআরসির লক্ষ্য প্রধানত, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, শ্রমজীবী মুসলমান, নিম্নবর্ণ, আদিবাসী নাগরিকের দিকেই। তাই মুসলমান, আদিবাসী-প্রধান জেলাগুলোতে এবং অন্যান্য জেলার মুসলমান, আদিবাসী-প্রধান অঞ্চলগুলোতে ৩০ শতাংশ শুনানি নোটিস এসেছে, যা বাকি জেলা ও অঞ্চলগুলোর থেকে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। ফলে, অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ দেখা যায়। এ-রাজ্যে এন্যুমারেশন ফর্ম পূরণের সময় থেকে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহলের অনেক আদিবাসী নাগরিক সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ দেখিয়েছেন। প্রতিবাদের অপরাধে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকার সম্মিলিতভাবে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তথাপি, রাজ্যের ৬০ হাজার নাগরিক এন্যুমারেশন ফর্ম পূরণ করেননি। এখন মুখ্যমন্ত্রী সেই সব বাদ দিয়ে কেবলই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেনসি’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মুখ খুলেছেন। কিন্তু, মুছে দেওয়ার রাজনীতি, এসআইআর ও এনআরসি বন্ধ করবার, বাতিলের দাবি তোলেননি। এ এক ভয়ানক প্রবণতার লক্ষণ, আশ্চর্যজনক বিষয়, অনেক নাগরিকদের কাছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিশানায় নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকার (রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল) রয়েছে। যা থেকে পরিষ্কার হয় তিনি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের অঙ্ক কষেই এ নিয়ে মুখ খুলেছেন। যদিও এর বেশি কিছু বলবার, করবারও নেই। কারণ, উনি নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে এ রাজ্যে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ নিয়ে রাজনীতি করা শুরু করেছিলেন। আজ যেটাকে কেন্দ্র সরকার, আরএসএস-নিয়ন্ত্রিত বিজেপি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির রূপ দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে আরএসএসের মোহন ভাগবত এক সভা থেকে বিজেপির এ কাজের ভূয়সী প্রশংসা জানিয়ে বলছেন ভাষার ধরন দেখেই অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করবার কথা— এ-কাজ দক্ষতার সঙ্গে করে সঙ্ঘ পরিবার।
রাজ্যবাসীর বীভৎস বিপদের সময় রাজ্যের বাকি বিরোধী সরকারি দলগুলো এ ধরনের মুছে ফেলার নিকৃষ্ট মানের রাজনীতি নিয়ে তেমনভাবে প্রতিবাদ দেখাচ্ছে না। ফলে, আরও ভয়ঙ্কর পরিবেশ, সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সংকটও তৈরি হয়। এমনটা হওয়া যে অস্বাভাবিক ছিল না, তা আগে থেকে সিএএ(২০০৩) আইন পরিষ্কারভাবে জানান দেয়। সেই সময়ের সেই আইনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক সরকারি রাজনৈতিক দলই সম্মতি জানিয়েছিল। অথচ, এই আইনে নাগরিককে চিহ্নিত করা, মুছে ফেলা, বাদ দেওয়ার রাজনীতিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া রয়েছে। এমন ভয়ের সময় এটিকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে অনেক নাগরিকই চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রতিবাদের পাশাপাশি অনেক কয়েকটি সামাজিক, গণ-সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে এসআইআর-এনআরসি, মুছে দেওয়ার রাজনীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে, রাস্তায় নেমেছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিনব্যাপী কাজ করা সংগঠন ‘নো এনআরসি’ আন্দোলন-এর নেতৃত্বরা জানান, নির্বাচন কমিশন এসআইআরের মধ্যে নিয়ে আসলে এমএনআইসি (চিহ্নিত করা) ও এনআরসি (মুছে ফেলা, বাদ দেওয়া) করতে চাইছে। যে কারণে প্রত্যেক নাগরিকের যাবতীয় তথ্য, নথিপত্র নিখুঁতভাবে নেওয়া হচ্ছে। এর দ্বারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে এমএনআইসি কার্ড দিয়ে চিহ্নিত করবেন, পরর্বতীতে তাঁদের এনআরসি করে দেশ থেকে মুছে দেবেন। অথবা বাদ দেবেন।
রাজ্যে এসআইআরের শুনানি প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। প্রায় ৫ লক্ষ নাগরিক শুনানিতে অংশ গ্রহণ করেননি। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ফাইনাল তালিকার দিকে তাকিয়ে সকলে। তবে গোটা প্রক্রিয়া চলাকালীন সময় জুড়ে রাজ্যের ১৫০ জনেরও বেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর দায় কে দেবে? এই পরিবারগুলোর কী হবে? এগুলো এখন পর্যন্ত শক্তপোক্ত রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেনি। এখন দেখবার— ভবিষ্যৎ কোনদিকে এগোয়। বাদ দেওয়ার রাজনীতিকেরা বিজয়ী হন, না কি নাগরিকের প্রতিবাদ, বিভিন্ন সামাজিক, গণ-সংগঠনগুলোর আন্দোলন গড়ে তুলে বেঁচে থাকবার চেষ্টা নতুন কিছু করে দেখায়, নাগরিকের চেতনার গুণগত মানের বিকাশ ঘটায়, নতুন রাজনীতির জন্ম দেয়। যেখান থেকে বিকল্প রাজনীতি, লড়াইয়ের নতুন সন্ধান রাজ্যের নাগরিকেরা পেতে পারেন।
*মতামত ব্যক্তিগত

