শুভাশিষ দে
বীরভূমের মাঠ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক গবেষণাসাহিত্য— সব জায়গায় একই সত্য প্রতিষ্ঠিত: মনরেগা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনেছে, তাদের ঋণযোগ্যতা বাড়িয়েছে, ভোগব্যয়ের স্থিতিশীলতা দিয়েছে, এবং মজুরির উপর দরকষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে। ভারতের গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ— বিশেষত নারী, দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়— যাঁরা মনরেগার মাধ্যমে একটু মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছিলেন, তাঁদের জন্য এই পরিবর্তন গভীর উদ্বেগের
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের সংসদে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে গেল, যা গ্রামীণ ভারতের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকার উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার মহাত্মা গান্ধি জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন (মনরেগা, ২০০৫) বাতিল করে তার জায়গায় নিয়ে এল ‘বিকশিত ভারত — গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ বা সংক্ষেপে ভিবি-জির্যামজি আইন, ২০২৫। একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে, যিনি বছরের পর বছর ধরে মনরেগার কার্যকারিতা ও প্রভাব নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেছেন, এই পরিবর্তনকে আমি কেবল একটি নামবদলের ঘটনা হিসেবে দেখতে পারছি না। এটি ভারতের কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তির উপর একটি মৌলিক আঘাত।
মনরেগা: একটি অধিকারের দলিল
মনরেগাকে বোঝার জন্য আমাদের আগে বুঝতে হবে এটি শুধু একটি ‘কর্মসংস্থান প্রকল্প’ ছিল না। এটি ছিল একটি আইনি অধিকার— গ্রামীণ পরিবারের যে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য বছরে ১০০ দিনের কাজ দাবি করতে পারতেন, এবং সরকার ১৫ দিনের মধ্যে কাজ না দিতে পারলে বেকারত্ব ভাতা দিতে বাধ্য ছিল। এই ‘ডিমান্ড-ড্রিভেন’ বা চাহিদা-চালিত কাঠামোটিই ছিল মনরেগার প্রাণ। গ্রামের মানুষ নিজেরাই ঠিক করতেন কখন, কোথায় কাজ করবেন; গ্রাম পঞ্চায়েত প্রকল্প নির্বাচন করত; এবং সামাজিক অডিটের মাধ্যমে স্থানীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হত।
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের তথ্য বলছে, মনরেগার আওতায় ২৮৬ কোটিরও বেশি ব্যক্তি-দিবস কাজ তৈরি হয়েছে, উপকৃত হয়েছেন ৫ কোটি ৭৮ লক্ষ পরিবার, কাজ পেয়েছেন ৭ কোটি ৮৮ লক্ষ মানুষ। এঁদের মধ্যে ৫৮ শতাংশই নারী, ১৮ শতাংশ তফসিলি জাতি এবং ১৮ শতাংশ তফসিলি উপজাতির মানুষ। কোভিড অতিমারির সময় যখন গোটা অর্থনীতি বিপর্যস্ত, তখন মনরেগা গ্রামীণ ভারতের জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি আর্থিক ত্রাণকবচ হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে গ্রামীণ বেকারত্বের হার ৭.৫ শতাংশে উঠেছে এবং মনরেগার চাহিদা গত অর্থবর্ষে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে— এই প্রেক্ষাপটে মনরেগা বিলোপের যৌক্তিকতা কোথায়?
গবেষণা কী বলে? মাঠের সাক্ষ্য
মনরেগার কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাসাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বলিষ্ঠ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্তিক মুরলীধরন এবং তাঁর সহযোগীরা (২০২৩) Econometrica-য় প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মনরেগার উন্নত বাস্তবায়ন কম আয়ের পরিবারগুলির মোট উপার্জন ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে এবং দারিদ্র্য ২৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আরও চমকপ্রদ তথ্য হল, এই আয়-বৃদ্ধির ৮৬ শতাংশই এসেছে কর্মসূচির বাইরের— অর্থাৎ বেসরকারি শ্রমবাজার থেকে। মনরেগা একটি ‘জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম’ বা সাধারণ ভারসাম্য-প্রভাব তৈরি করে: সরকার যখন বড় নিয়োগকর্তা হিসেবে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, তখন সামগ্রিক মজুরির হার বৃদ্ধি পায়, এমনকি যাঁরা মনরেগায় কাজ করছেন না তাঁদের জন্যও।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় আমার নিজের গবেষণা[1] মনরেগার মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এক বিশদ চিত্র তুলে ধরেছে। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে মনরেগা গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলির নিকট একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করেছে এবং অঞ্চলভেদে বাস্তবায়নের মানের উপর প্রকল্পের কার্যকারিতা নিরভরশীল। কংক্রিটভাবে, যেসব গ্রামে পঞ্চায়েতের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা বেশি ছিল, সেখানে সুফলভোগীরা অনেক বেশি কার্যকরভাবে প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। এই অনুসন্ধান একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-শিক্ষা দেয়: মনরেগার সমস্যা ছিল প্রকল্পের কাঠামোতে নয়, বরং বাস্তবায়নের অসমতায়। সমাধান ছিল আরও ভালো বাস্তবায়ন, বিলোপ নয়।
ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে করা আমার আরেকটি গবেষণায়[2] পশ্চিমবঙ্গের ৪৯টি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৫০০টি পরিবারের তিন দফা (২০০৯, ২০১০, ২০১২) প্যানেল তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে মনরেগায় নিরন্তর অংশগ্রহণ দরিদ্র পরিবারগুলির ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি করেছে, আয় ও ভোগব্যয় বাড়িয়েছে এবং ভোগব্যয়ের ওঠানামা (consumption variability) হ্রাস করেছে। এই গবেষণার মূল প্রস্তাবনাটি অভিনব: মনরেগায় সুনিশ্চিত ও নিয়মিত কর্মসংস্থান দরিদ্র পরিবারের জন্য এক ধরনের ‘জামানত’ (collateral) হিসেবে কাজ করে। ঋণবাজারে যাঁদের জামানত দেখানোর মতো কোনও সম্পদ নেই, তাঁদের কাছে মনরেগার কাজ একটি নির্ভরযোগ্য আয়ের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়— ফলে তাঁরা ঋণ পেতে সক্ষম হন যা আগে সম্ভব ছিল না।
ইমবার্ট ও প্যাপ (২০১৫) তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মনরেগা গ্রামীণ মজুরি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে এবং distressed migration বা দুর্দশাগ্রস্ত পরিযান হ্রাস পেয়েছে। ‘স্টার স্টেট’গুলিতে (মানে যে রাজ্যগুলো খুব ভালো কাজ করেছিল) শহরাভিমুখী পরিযান ২২ শতাংশ কমেছে। সামগ্রিকভাবে, এই সমস্ত গবেষণা একই সত্য প্রতিষ্ঠা করে: মনরেগা একটি কার্যকর কর্মসূচি ছিল যা গ্রামীণ দরিদ্রদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনেছিল।
ভিবি-জির্যামজি: পরিবর্তনের আসল চেহারা
সরকার দাবি করছে নতুন আইনটি উন্নত। ১২৫ দিনের কাজের গ্যারান্টি, সাপ্তাহিক মজুরি প্রদান, এবং প্রযুক্তি-চালিত পরিচালনা— এগুলো দেখতে ইতিবাচক মনে হলেও, বিস্তারিত বিশ্লেষণে গভীর উদ্বেগের কারণ আছে।
প্রথমত, সবচেয়ে মৌলিক পরিবর্তন হল অধিকার থেকে প্রকল্পে রূপান্তর। মনরেগায় কাজের দাবি করা ছিল আইনি অধিকার— আদালতে প্রয়োগযোগ্য। নতুন আইনে সেই অধিকার মুছে দিয়ে একটি ‘স্কিমেটিক এনটাইটেলমেন্ট’ বা প্রকল্পগত সুবিধায় রূপান্তরিত হয়েছে। এর মানে হল, বাজেট বরাদ্দ শেষ হলে কাজ নাও মিলতে পারে। একটি ‘ডিমান্ড-ড্রিভেন গ্যারান্টি’কে দিল্লি-নিয়ন্ত্রিত রেশনকৃত প্রকল্পে পরিণত করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থায়নের কাঠামো পরিবর্তন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মনরেগায় কেন্দ্রীয় সরকার ১০০ শতাংশ মজুরি খরচ এবং ৭৫ শতাংশ উপকরণ-ব্যয় বহন করত— মোট খরচের প্রায় ৯০ শতাংশ। নতুন আইনে এই অনুপাত ৬০:৪০ (কেন্দ্র:রাজ্য) করা হয়েছে। এই পরিবর্তনে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ওডিশার মতো দরিদ্রতম রাজ্যগুলি— যেখানে মনরেগার চাহিদা সবচেয়ে বেশি— তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি একটি নিষ্ঠুর পরিহাস: যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার, তাদের রাজ্যগুলিই সবচেয়ে কম সামর্থ্য রাখে এই অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বহন করার।
তৃতীয়ত, ‘নর্মেটিভ অ্যালোকেশন’ বা নিয়মভিত্তিক বরাদ্দ ব্যবস্থা মনরেগার ‘ওপেন-এন্ডেড’ চরিত্রকে নষ্ট করে দেয়। মনরেগায় চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ হত— গ্রামের মানুষ বেশি কাজ চাইলে, বেশি টাকা আসত। নতুন ব্যবস্থায় কেন্দ্র ‘কেন্দ্রের ঠিক করে দেওয়া সূত্র ও শর্ত’-এর ভিত্তিতে রাজ্যভিত্তিক বরাদ্দ ঠিক করবে— যার অর্থ হল দিল্লি থেকে কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ, এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ ওঠানামার আশঙ্কা।
চতুর্থত, শস্য মৌসুমে কাজ বন্ধের বিধান (৬০ দিন পর্যন্ত) কৃষিমালিকদের স্বার্থে শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতাকে দুর্বল করবে। মনরেগার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলির একটি ছিল ‘রিজার্ভেশন ওয়েজ’ বা সংরক্ষণ মজুরি বৃদ্ধি— অর্থাৎ শ্রমিকরা মনরেগায় কাজের বিকল্প থাকায় কম মজুরিতে কাজ করতে অস্বীকার করতে পারতেন। ফসল কাটার মৌসুমে এই বিকল্প কেড়ে নেওয়া মানে জমির মালিকদের হাতে শ্রমিকদের আরও অসহায় করে দেওয়া।
নামের রাজনীতি: গান্ধি মুছে রাম— এবং পঞ্চায়েতের ভূমিকা
এই পরিবর্তনকে সম্পূর্ণরূপে বুঝতে হলে বিজেপি সরকারের নামকরণের রাজনীতিটি বিশ্লেষণ করা জরুরি। মনরেগা থেকে ‘মহাত্মা গান্ধি’ নাম বাদ দেওয়া এবং সেখানে ‘বিকশিত ভারত’ যুক্ত করা নিছক প্রশাসনিক পুনর্গঠন নয়। এটি একটি সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কৌশল।
কিন্তু এই রাজনৈতিক মাত্রাটি কেবল নামের মধ্যে সীমিত নয়— এটি মনরেগার বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। অধ্যাপক কুণাল সেনের সঙ্গে আমার যৌথ গবেষণায়[3] পশ্চিমবঙ্গের ৫৬৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত ওয়ার্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে পঞ্চায়েতের শাসক দল তাদের নিজস্ব দলীয় ওয়ার্ডগুলিতে মনরেগার তহবিল বণ্টনে স্পষ্ট পক্ষপাত দেখিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি তাদের নিজের দলের ওয়ার্ডে বার্ষিক অতিরিক্ত ১ লক্ষ টাকা মনরেগা বরাদ্দ করে ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট শেয়ার ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এই গবেষণা একটি মৌলিক সত্য উদঘাটন করে: মনরেগার মতো বড় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যখন কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঝুঁকি অনেক বেশি।
নতুন ভিবি-জির্যামজি আইনে বরাদ্দ নির্ধারণের ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বায়ত্তশাসন হ্রাস পেয়েছে। আমাদের গবেষণার আলোকে বলা যায়, এই কেন্দ্রীভূতকরণ পক্ষপাতের ঝুঁকি কমাবে না— বরং জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক পক্ষপাতকে আরও বড় ক্যানভাসে সম্ভব করে তুলবে। ২০১৫ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদি মনরেগাকে ‘কংগ্রেসের ব্যর্থতার জীবন্ত স্মারক’ বলে উপহাস করেছিলেন। অথচ এই একই কর্মসূচিকে দশ বছর পর নিজেদের রাজনৈতিক মোড়কে পুনরায় পেশ করতে হল— কারণ গ্রামীণ মানুষের কাছে মনরেগার জনপ্রিয়তা এতটাই গভীর যে এটি সরাসরি বাতিল করলে নির্বাচনী বিপদ ছিল।
কল্যাণরাষ্ট্র ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন
স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার উপর জোর দিয়ে এসেছে। মনরেগা সেই ঐতিহ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক— এটি রাষ্ট্রের কল্যাণকর দায়বদ্ধতাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপান্তরিত করেছিল। কল্যাণরাষ্ট্রের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয় যখন নাগরিকরা অনুভব করেন যে রাষ্ট্র তাঁদের পাশে দাঁড়ায়, বিশেষত সংকটের মুহূর্তে। মনরেগা সেই বৈধতার একটি শক্তিশালী স্তম্ভ ছিল।
অধিকারভিত্তিক কর্মসূচিকে প্রকল্পভিত্তিক সুবিধায় নামিয়ে আনার এই প্রবণতা একটি বৃহত্তর নয়াউদারনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন— যেখানে সামাজিক সুরক্ষাকে ‘দক্ষতা’ ও ‘বাজেট শৃঙ্খলা’র যুক্তিতে সঙ্কুচিত করার প্রয়াস চলে। কিন্তু অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও প্রমাণ উভয়ই বলে যে গ্রামীণ শ্রমবাজারে মনোপসনি বা একচেটিয়া ক্রেতাদের আধিপত্য থাকে— মাত্র কয়েকজন জমির মালিক বহু শ্রমিকের মজুরি নিয়ন্ত্রণ করেন। এই প্রেক্ষাপটে মনরেগার মতো একটি বিকল্প নিয়োগকর্তার উপস্থিতি বাজারে প্রতিযোগিতা আনে এবং শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ায়। এই অর্থে মনরেগা কেবল দারিদ্র্য সহায়তার হাতিয়ার নয়, এটি কাঠামোগত বৈষম্য সংশোধনের একটি যন্ত্র।
বাস্তব আশঙ্কাগুলি কোথায়?
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: নতুন আইনে দাবি করা হচ্ছে যে মাত্র ৭ শতাংশ পরিবার ১০০ দিনের কাজ সম্পূর্ণ করতে পারত— অতএব বর্তমান ব্যবস্থা ব্যর্থ। কিন্তু এই যুক্তি বিভ্রান্তিকর। বীরভূমে আমার মাঠ গবেষণা[4] এবং পরবর্তীতে রাজ্যব্যাপী পঞ্চায়েত তথ্য বিশ্লেষণ[5]— উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে কমসংখ্যক পরিবার ১০০ দিন পূর্ণ করতে পারার পেছনে ছিল বাজেটের কৃত্রিম সঙ্কোচন এবং প্রশাসনিক বাধা— রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক ওয়ার্ডগুলিতে কাজের বরাদ্দ কম পেতেন শ্রমিকরা। এই সমস্যার সমাধান না করে কাঠামো ভেঙে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়, আরও গভীর সমস্যার সূচনা।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হল প্রযুক্তিনির্ভরতা। বায়োমেট্রিক হাজিরা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যেসব অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল বা অনুপস্থিত, সেখানে কার্যকরভাবে কাজ করবে কি না সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। ডিজিটাল বিভাজনের কারণে সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষগুলিই এই ব্যবস্থার বাইরে পড়ে যেতে পারেন। আমাদের গবেষণায়[6] দেখা গেছে, সর্বনিম্ন আয়ের পরিবারগুলিই মনরেগার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ঋণযোগ্যতা অর্জন করেছিল— অর্থাৎ প্রকল্পটি সত্যিকার অর্থেই সবচেয়ে প্রান্তিকদের কাছে পৌঁছেছিল। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় এই নিম্নতম স্তরের মানুষগুলির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার: অধিকারের ভাষায় কথা বলতে হবে
মনরেগা ত্রুটিমুক্ত ছিল না। মজুরি-বিলম্ব, দুর্নীতি, এবং বাস্তবায়নের অসমতা— এগুলো বাস্তব সমস্যা ছিল এবং এর সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংস্কারের পথ হওয়া উচিত ছিল কাঠামো শক্তিশালী করা, অধিকারের ভিত্তি আরও মজবুত করা, এবং গ্রাম পঞ্চায়েতকে আরও ক্ষমতায়িত করা। তার বদলে যা হল, তা হল অধিকারের ভাষাকে প্রকল্পের ভাষায় প্রতিস্থাপিত করা— এবং এই প্রতিস্থাপন শুধু একটি আইনের পরিবর্তন নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক পুনর্সংজ্ঞায়ন।
বীরভূমের মাঠ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক গবেষণাসাহিত্য— সব জায়গায় একই সত্য প্রতিষ্ঠিত: মনরেগা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনেছে, তাদের ঋণযোগ্যতা বাড়িয়েছে, ভোগব্যয়ের স্থিতিশীলতা দিয়েছে, এবং মজুরির উপর দরকষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে। ভারতের গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ— বিশেষত নারী, দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়— যাঁরা মনরেগার মাধ্যমে একটু মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছিলেন, তাঁদের জন্য এই পরিবর্তন গভীর উদ্বেগের।
একটি কল্যাণরাষ্ট্র তখনই তার বৈধতা প্রমাণ করে যখন সে নিজের সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকের পাশে দাঁড়ায়— অধিকারের ভাষায়, করুণার ভাষায় নয়। সেই অর্থে ভিবি-জির্যামজি আইন ভারতের কল্যাণরাষ্ট্রের ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি মৌলিক বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে, এবং এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুশীল সমাজ, গবেষক, সাংবাদিক এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব এই পরিবর্তনকে প্রশ্ন করা, বিতর্ককে জীবন্ত রাখা এবং গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে আসা।
তথ্যসূত্র ও আলোচিত গবেষণা
- Dey, S. and Bedi, A.S. (2010). ‘The National Rural Employment Guarantee Scheme in Birbhum‘. Economic and Political Weekly, XLV(41), pp. 19–25.
- Dey, S. and Imai, K.S. (2014). ‘Workfare as “Collateral”: The Case of the National Rural Employment Guarantee Scheme (NREGS) in India’. Economics Discussion Paper Series 1412, University of Manchester.
- Dey, S. and Sen, K. (2016). ‘Is Partisan Alignment Electorally Rewarding? Evidence from Village Council Elections in India’. IZA Discussion Paper No. 9994/ESID Working Paper No. 63, University of Manchester.
- Muralidharan, K., Niehaus, P. and Sukhtankar, S. (2023). ‘General Equilibrium Effects of (Improving) Public Employment Programs: Experimental Evidence From India’. Econometrica, 91(4), pp. 1261-1295.
- Imbert, C. and Papp, J. (2015). ‘Labor Market Effects of Social Programs: Evidence from India’s Employment Guarantee’. American Economic Journal: Applied Economics, 7(2), pp. 233-263.
- Ministry of Rural Development, Government of India (2025). MGNREGA Annual Report 2024-25. New Delhi.
[1] Dey & Bedi, Economic and Political Weekly, 2010.
[2] Dey & Imai, 2014.
[3] Dey & Sen, 2016.
[4] দ্রষ্টব্য, টীকা ১।
[5] দ্রষ্টব্য, টীকা ৩।
[6] দ্রষ্টব্য, টীকা ২।

