পলাশের রং

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 

এই দেশের ভালো, সবই ভালো। এই দেশ বলতে কানাডা। অন্টারিও শহর।

বিছানায় শুয়ে কথাগুলো ভাবছিল সঙ্গীতা। সঙ্গীতা কালেনবাখ। নামের পরে তার পদবিটা কখনও কানে ধাক্কা মারে কারও। সঙ্গীতার মারে না। সঙ্গীতাকে কেউ কোনওদিন ইমিগ্রান্ট বললেও ওর বিরক্ত লাগে না। নাকি আজকাল লাগে বোধহয়? এত বছরে এই শব্দটা কখনও তাকে শুনতে হয়নি। অথচ ইদানীং যেন শব্দটা ক্রমশ আরও বেশি করেই ওর আশেপাশে শোনা যাচ্ছে। নাকি আর সকলের আশেপাশেই? পাশের বাড়িতে থাকেন প্যাটেল দম্পতি। দুটো ব্লক পেরোলেই গুরপ্রীত আর ওর বউ। কানাডায় গুরুমুখী ভাষার চল এতটাই যে দেশজুড়ে বহুদিন যাবৎ ইংরেজি, ফরাসির পাশাপাশি গুরুমুখীতেও সরকারি পথনির্দেশ লেখা থাকে। সঙ্গীতার এই সময় ওর বাড়ির কথা মনে হয়। সেই পুকুরঘাট। সেই মরিচশাকের ঘ্রাণ। আর কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকলেও তো চলে। কিন্তু উপায় নেই তার।

—মম… দরজায় এসে ডাক দেয় পল। সঙ্গীতা ওর নাম রেখেছিল পলাশ। ও জানত সেই নাম বেশিদিন টিকবে না। তাই পল কালেনবাখ তার শিকড়কে জানবে কিনা, সেই নিয়ে সঙ্গীতা আর মাথা ঘামায় না। ইয়ান ওকে ভালোবাসে। ইয়ান এতদিন ওর পাশে থেকেছে। অনেকদিনের ভালোবাসা তাদের। সেই ভালোবাসার জন্য এতটুকু শিকড়ের টান, এতটুকু নস্টালজিয়া, বোধহয় ফিরিয়ে দেওয়াই যায়?

পৃথিবীটা পালটেছে অনেক।

বেরোতে হবে। সঙ্গীতা বিছানা ছেড়ে ওঠে। পলের সামারক্যাম্প। গাড়ি আসবে একটু পরেই। আজ শনিবার। ইয়ানের ভাগে আজ ব্রেকফাস্টের দায়িত্ব। সঙ্গীতা বাথরুমে যায়। ব্রাশ করে। মুখ ধুয়ে বেরোয়। পলের ব্রেকফাস্ট হয়ে গেছে। সঙ্গীতা পলকে বাড়ির সামনে ট্রাভেলারে তুলে দিয়ে আসতে যায়। ঘরে এসে দেখে ইয়ান ওর জন্য ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে ফেলেছে। গেলাসে ফলের রস। ফ্লাস্কে কফি। স্যান্ডুইচ, পোচ, মার্মালেড। বেকন। লুচি আর সাদা আলুর তরকারির জন্য মন কেমন করে সঙ্গীতার। যদিও গত সপ্তাহের শনিবারেই সেই মেনু বানানো হয়েছিল। ইয়ান-সঙ্গীতার সংসারে বাখ-লালনের সম্মিলিত যাতায়াত। তবু। ইয়ানের আচরণ কিছু মাস যাবৎ অদ্ভুত মনে হয়। কোনও টেনশন? সঙ্গীতাকে ইয়ান বলেনি। তবু আফরিন এদেশে আসার কিছুকাল পর থেকেই… মনে মনে শ্বাস ফেলে সঙ্গীতা। সঙ্গীতা কালেনবাখ রহমান। ওর মায়ের বয়স এখন আটাত্তর। বার্লিন, কলকাতা, বাংলাদেশ।

২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৮। পশ্চিম জার্মানির ডুসেলডর্ফ শহর। এক বন্ধুর বাড়িতে জমজমাট আড্ডায় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আবদুল গাফফার চৌধুরী। প্রমুখ। আফরিনের স্মৃতিতে সবাক ফুটে থাকা সেই দিন। সেই রাত। ডুসেলডর্ফে আফরিনদের বাড়িতেই আড্ডা জমেছিল সেদিন। আফরিন তখন সন্তানসম্ভবা। তারপর। সেই রাতেই সঙ্গীতার জন্ম। পরদিন হাসপাতালে আফরিনকে দেখতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফফার চৌধুরীই সঙ্গীতার নাম দিয়েছিলেন। হাফিজুর আপত্তি করেনি। বরং সে অদ্ভুত খুশি হয়েছিল বোধহয়। বৃদ্ধ বাবা আর সামান্য কিছু বহনযোগ্য জিনিস সঙ্গে নিয়ে, এর আগে ঊনসত্তরেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় হাফিজুর। দেশ ছাড়ে আফরিন-সহ আরও অনেকজন। প্রথমে তারা আসে কলকাতায়। তারপর জার্মানি। আফরিনের সঙ্গে হাফিজুরের বিয়েটা যদিও কলকাতাতেই হয়েছিল। আকাশে ভারি মায়াবী এক চাঁদ ছিল সেদিন। ডুসেলডর্ফের দিনগুলো আফরিনের খুব মনে পড়ে। তবু সে-কথা মুখ ফুটে বলে না কেউ। সঙ্গীতা তার মায়ের হাতটুকু ছুঁয়ে থাকে। বাইরে তাকিয়ে দেখে মেপলপাতার রং।

অনেক বছর আগে সঙ্গীতা প্রায় দেড় মাসের জন্য বাংলাদেশ গিয়েছিল। সেই তার প্রথম চেনা ভিটেমাটির সুখ। হাফিজুর ততদিনে আর নেই। মা আফরিনকে সঙ্গে নিয়েই দেশ, বাড়ি, গ্রাম চিনেছিল সঙ্গীতা। লালশাক, মরিচ-ঝালের ঘ্রাণ। এখনও যেন মায়ের গা থেকে সেই দেশ, মাটির গন্ধ পাওয়া যায়। ইয়ান এসব বোঝে বলে মনে হয় না। শনিবারের সকালগুলো আজকাল, সঙ্গীতা এভাবেই আফরিনের পাশে বসে থাকে। ডাক্তার সন্দেহ করছেন অ্যালঝাইমার্স। এদেশে আসার পর থেকেই আফরিনের রোগের প্রকোপ আরও বেড়েছে। এই রোগের কারণেই সঙ্গীতা আফরিনকে বাংলাদেশ থেকে কানাডা উড়িয়ে আনতে বাধ্য হয়। তারপর থেকেই।

ইয়ানের কথাও আমাদের বলা উচিত।

অদ্ভুত এক শহর। নাকি বলব একই শহরের বিরাট চৌহদ্দির ভিতর, দুই বিপরীত মহাদেশ? মানবসৃষ্ট এক বিরাট কাঁটাতারে সাজানো সীমান্ত, আধুনিক সেই ইউরোপীয় শহরের বুক চিরে চলে গেছে। এপার-ওপারে যাতায়াত কার্যত বন্ধ। বারোমাসই যেন সেখানে শীতের প্রকোপ খুব। দেওয়াল ভাঙছিল যেদিন, ইয়ান ও তার পরিবারও সেদিন রাস্তায় নেমে এসেছিল। অন্ধকার একেকটা গলির সুমুখে সাঁজোয়া গাড়ির যাতায়াত। চেকপোস্টের দিকে যাওয়ার রাস্তাগুলোয় অগণিত মানুষের ভিড়। বার্লিন, নভেম্বর, ১৯৮৯।

—ইয়ান, প্রিয় ইয়ান, কাটরিনার দুই হাত ওর গলা জড়িয়ে রয়েছে। ইয়ান আশ্লেষে তাকে চুম্বন করে। আমরা যাব না, যেতে হলেও আমরা পূবদিকে, অথবা আরও উত্তরদিকে এগোব। যেও না ইয়ান, কাটরিনা ইয়ানের হাত স্পর্শ করে। ওদের বাড়ির বাইরেটায় এখনও দারিদ্র্যের মলিনতা নেই। ওর বাবা সোভিয়েত দূতাবাসের উঁচু পদে আছেন। দেওয়াল সত্যি সত্যি ভাঙলেও কাটরিনা ও তার পরিবার মস্কো চলে যাবে। অথবা অতদূরে না হলেও, ইউক্রেন, বেলারুশের কোথাও। ইয়ান। ইয়ানের বাবা, মা, বোন খানিকদূরে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়ায়।

ইয়ানের বোনের হাতে ধরা মাঝারি মাপের, কাঠ আর লোহা দিয়ে তৈরি করা খাঁচায় ওদের পোষা ময়নাপাখিটা অন্ধকারে ঝটপট করে। হঠাৎ। কার সঙ্গে কথা বলছ কাট, এত রাত্তিরে? হের গুন্থার দরজায় এসে দাঁড়ান। ওহ! নাক দিয়ে একটা অবজ্ঞার শব্দ হয়। ওই পুঁজিবাদে-অন্ধ দালাল পরিবারের বখাটে ছেলেটার সঙ্গে? তা বেশ, বেশ। তাচ্ছিল্যের সুরে গুন্থার বলে ওঠেন। ইয়ান টের পায় অন্ধকারে খানিক দূরে দাঁড়ানো ওর বাবার শরীরটাও যেন ক্রমশ বহুক্ষণ ধরে চলে আসা পুরনো গাড়ির রেডিয়েটরের মতোই গরম হয়ে উঠছে। এই শীত-রাত্তিরেও। অন্ধকারে লাল আলোর রং। বিপদসঙ্কেত। আর কেন, দেওয়াল তো ভাঙল বলে, ইয়ানের বাবাকে উদ্দেশ্য করেই যেন হের গুন্থার বলে ওঠেন, যান! এবারে সরাসরি পুঁজি আর পুঁজির মালিকের একসঙ্গে পা চাটতে শুরু করুন! দাঁতে দাঁত চিপে হের গুন্থার আবারও বলে ওঠেন, বিশ্বাসঘাতক।

সেই কাটরিনাকেই …

মোড়ের মাথায় নতুন গজিয়ে ওঠা মোটেলের সামনে এত বছর পর কাটকে দেখে চিনতে ইয়ানের এতটুকুও অসুবিধা হয়নি। কেবল কাটের সঙ্গে ইয়ান যাকে দেখেছিল, অঙ্ক মেলেনি একেবারেই। আধিপত্যবাদ। স্থানীয় গাড়ি কারখানার পার্সোনেল অফিসার কাম হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার ইয়ান কালেনবাখ। সোশাল সিকিউরিটি কার্ড, ক্রিসমাস ভ্যাকেশনে লম্বা হাইওয়ে ড্রাইভ আর চিজবার্গারের সুখ। পূর্ব জার্মানি, পশ্চিম জার্মানি অথবা পুঁজিবাদ, সোভিয়েত আধিপত্যবাদ— এই সবকিছুকে ছাপিয়ে সে এখন অনেক, অনেক দূরের কোনও এক পৃথিবীর বাসিন্দা।

মাকে দেখে বেরনোর সময়ই মেয়েটার সঙ্গে ধাক্কা লাগল সঙ্গীতার। এস্কুজে মোয়া, মেয়েটা বলে ওঠে। দ্যাকর, ইটস ওকে! দুই ভাষাতেই ওকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে সঙ্গীতা ওর চোখের দিকে তাকায়। মেয়েটার বয়স ওর আশেপাশেই। মেয়েটা ভিতরে যাচ্ছিল বোধহয়। সে হাসে। সঙ্গীতা বাইরে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটাও ওর পিছন-পিছন ফিরে আসে হঠাৎ। এস্কুজে মোয়া, আবারও সে বলে ওঠে। সঙ্গীতা অবাক হয়ে তাকায়, উই? মেয়েটা হেসে ফেলে, আমিও যে ফরাসি খুব ভালো জানি তা নয়, স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণ, কিন্তু এদেশে ওই ভাষাটাই এত স্বাভাবিকভাবে সব জায়গায় ব্যবহার হয়, সে কাঁধ ঝাঁকায়, এনিওয়েজ, আমরা কি একটু কফি খেতে পারি, প্লিজ? একসঙ্গে? সঙ্গীতা অবাক হয় এবার। পাশ্চাত্যে বিশেষ কোনও মানুষ একে-অপরের সঙ্গে খুব সহজাতভাবে কথা বলে ঠিকই, তবু এতখানি সাবলীল আমন্ত্রণ— সঙ্গীতা হাতের স্মার্টওয়াচটার দিকে তাকায়। এখনও সময় আছে কিছুক্ষণ। ইয়ানের অফিস থেকে ফিরতে এখনও ঘন্টা-দুই। মাঝের সময়টা একটু নিজের মতো কাটানোই যায়। নিজের মতো করে সময় কাটানো!… সঙ্গীতা মেয়েটার দিকে তাকায়। যাওয়া যাক, পাশের ব্লকেই একটা ভালো কাফের সন্ধান জানা আছে আমার। প্যুর স্যুর! বলে উঠেই মেয়েটা আবারও নিজেকে সামলে নেয়, সিওর— অবশ্যই! মেয়েটা হাসে। ওরা দুজনে পায়ে হেঁটে হস্পাইস চত্বর থেকে বেরিয়ে যায়।

—আমার নাম কাট, উঁচু চেয়ারে বসে নিজেকে গোছাতে গোছাতেই মেয়েটা সঙ্গীতার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
—হ্যালো কাট, সঙ্গীতা হাত মেলায়, আগে কখনও এ-পাড়ায় তোমায় দেখিনি। নিউকামার?

কাট ঘাড় নাড়ে। বলতে পারো। সবে আমরা মাসখানেক হল এসেছি। এর আগে আমি ভ্যাঙ্কুভারে ছিলাম।

—আচ্ছা। আমরা বলতে?
—আমরা বলতে আমি আর আমার স্বামী। অরেলস্টাইন। নামটা চেনা লাগে সঙ্গীতার। ও অবশ্য এখানেই থাকত। আমি ছিলাম আমার কাজিনের সঙ্গে। হ্যাড টু অ্যাসিস্ট হার ইন সেটলিং ডাউন। সবে মাসছয়েক হল আমরা ভিসা ইত্যাদি সবকিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে অবশেষে মিনস্ক থেকে এখানে আসতে পেরেছি। জ্যাক অবশ্য, মেয়েটা একটু থামে, আমার স্বামীর কথা বলছি, সে এখানে আছে প্রায় এক বছর। উই হ্যাড টু ট্রাভল সেপারেটলি। সিচুয়েশনস, ইউ নো! মেয়েটা আবারও শ্রাগ করে। ও যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সঙ্গীতাকে মাপছে এখন।
—আচ্ছা…

সঙ্গীতা সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করে। মিনস্ক, মানে বেলারুশ। আবারও তার মাথার মধ্যে শব্দটা ভেসে ওঠে হঠাৎ। ইমিগ্রান্ট।… শরণার্থী। ইমিগ্রেশন।… অভিবাসন। বাইরে নরম রোদ। বাষ্পচালিত এঞ্জিনের আগের পৃথিবীটা অজস্র ছোট ছোট কুঠুরিতে যেন বিভক্ত ছিল বহুকাল। তারপর সেই কুঠুরির মানুষেরা একে-অপরের ফোকর থেকে বেরিয়ে, ভিন্ন ভিন্ন কুঠুরিতে যাতায়াত শুরু করে। আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যাতে বোধহয়। তারপর এই নতুন যাতায়াতও চলে আসে বহুকাল। বহুবছর। প্রাকৃতিক নিয়মেই এই যাতায়াতের সূত্রপাত। বেড়ে ওঠা। এক সংস্কৃতির সঙ্গে আরেকের মিশে যাওয়া। কিন্তু আজ। কাট আবারও কথা বলছে। ওদের টেবলে ওয়েটার কফি আর প্যানকেক সার্ভ করে গেছে কিছুক্ষণ। কথাগুলো সঙ্গীতার চারপাশে উড়ে উড়ে বেড়ায়।

পাশাপাশি দুটো পথ চলে গেছে। একপাশে ধানক্ষেত। আরেকপাশে তুষারে ঢাকা ধু ধু প্রান্তর। মধ্যে নয়ানজুলি-খাল। আকাশে বজ্রপাত হয়। ওরা দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে। সঙ্গীতা আর সঙ্গীতার মা বোধহয়। তুষারঝড়ে চারিদিক ঢেকে আসে। ওপাশ থেকে কারও গলার স্বর। কাট বলছে, তারপর আমি ওকে চুমু খেয়েছিলাম। ঝড় থেমে যাচ্ছে। তারপর আবারও অনেকগুলো হেমন্তকাল। খট করে গুলির শব্দ হয়। হের গুন্থারের দেহটা যেন ফুলে-ফেঁপে বিকৃত হয়ে ওঠে। কাট আবারও বলছে, তারপর আমি তাকে চুমু খেয়েছিলাম, সঙ্গীতা ওকে থামতে বলছে। প্যানকেকের গা বেয়ে গড়িয়ে নামছে মেপলপাতার রস। জ্যাকবের জন্য তুমি এটুকু পারবে না? কাট বলছে, এতে তো তোমাদেরই মঙ্গল বোধহয়! কাট! সঙ্গীতা যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দেখে গেলাসে ওর কফিটা আধ-খাওয়া হয়ে পড়ে আছে। কাট ওকে দেখছে। অপলকে। অবলীলায়।

—দ্যাখো এভাবে সত্যিই তোমরা এখানে বেশিদিন টিকবে না। তোমাদের সময় ফুরিয়েছে! কাটের গলার স্বর যেন অদ্ভুত মোলায়েম মনে হয়। সঙ্গীতা যেন তল পায় না কোথাও।

জ্যাকব অরেলস্টাইন। ইহুদিদের ইতিহাস অনুযায়ী ইজরায়েলের ১২টি জনজাতির পাট্রিয়ার্ক, প্রপিতামহ— মহামতি জ্যাকব। আইজাক ও রেবেকার পুত্র। আব্রাহামের পৌত্র— জ্যাকব।

জ্যাকব অরেলস্টাইন।

বর্তমানে ইয়ান কালেনবাখের ভবিষ্যৎ।

—তোমাদের সময় ফুরিয়েছে মঁ শের! প্রিয় উদ্বাস্তু-নাগরিক, বাদামি-রং বন্ধু আমার, কাটের গলার স্বর কেমন হিসহিস করে, আমার ভাবতে লজ্জাবোধ হয় একদিন আমিও এই দোঁ-আশলা, হিলহিলে মানুষটাকে ভালোবেসেছিলাম, ওর গলার স্বর আবারও বদলে যায়, তা, তোমার কেমন লাগছে শুনতে এসব? মঁ শের? ইয়ান তোমাকে কখনও বলেছিল এসব? নাকি তোমরা তো এরকমই? নিজেদের উদার, গ্রান্টেড বলে ধরে নাও সবসময়! নাও ডু ইউ ফিল জেলাস মাই ফ্রেন্ড? আর তোমার হেডড্রেসটাই বা কোথায়! কাটের অভিসন্ধি বুঝতে পারে না সঙ্গীতা। ইয়ান কখনও ওকে কাটের বিষয়ে বলেনি। কাট ইয়ানকে কারখানা থেকে তাড়াতে চায়। জ্যাকব ইয়ানকে কারখানা থেকে তাড়াতে চায়। কাট চায় ইয়ানের বিরুদ্ধে সঙ্গীতাকে বিষিয়ে তুলতে। প্রতিশোধের দুগুণ চাহিদা তার।

এত বছর পর, তবু কেন ইয়ানের অবজ্ঞা কাট আজ অবধি ভুলতে পারেনি? নাকি এই প্রতিশোধ হের গুন্থারের তরফে? পুঁজিবাদে-অন্ধ দালাল পরিবারের বখাটে ছেলেটা-র বিরুদ্ধে গুন্থারের যে নিষ্ফল রাগ, আজ এত বছর বাদে কড়ায়-গণ্ডায় গুন্থার-কন্যাই কি তার হিসেব বুঝতে চায়? কাফের বাইরে দিয়ে একটা হার্লে-বাইক চলে গেল। বাইকের পিছনে বসে থাকা মুশকোমতো লোকটা হঠাৎই গলা তুলে একটা সিটি বাজিয়ে দেয়। সঙ্গীতার গায়ের রং আর তার অভিবাসী পরিচয় নিয়ে আরও কয়েকটা গালাগালির মতো শব্দ ভেসে আসে। কাট হাসে। নিজের এঁটো কফির পড়ে থাকা তলানিটুকু সঙ্গীতার আধ-খাওয়া কফির কাপে সে ঢেলে দেয় হঠাৎ। পয়সাটা দিয়ে দিও। গোটা-কতক ডলারের বিল সঙ্গীতার প্লেটের তলায় গুঁজে ঢুকিয়ে দিয়ে ওর প্লেটের উপর আবারও একদলা থুথু ফেলে কাট কাফে থেকে বেরিয়ে যায়। সঙ্গীতা চুপ করে বসে থাকে। যেন ওর মায়ের নীরবতা ওকে পেয়ে বসে এবার।

ডাউনসাইজিং। শব্দটা ম্যানেজমেন্ট-শাখার। পড়তি অর্থনীতির দোহাই দিয়ে এখন এই শব্দটাই উন্নত-দেশের দক্ষিণপন্থীদের সবচেয়ে প্রিয় বোধহয়। জ্যাকব অরেলস্টাইন। সে যেদিন ইয়ানদের কারখানার দায়িত্ব নিয়ে, ফ্যাক্টরি-ফ্লোরের ঠিক ডানপাশে অনেকটা জায়গা-জুড়ে, কাচ-ঘেরা, সাজানো অফিসে এসে বসল, ইয়ান তখনও জ্যাকবের স্বরূপ বোঝেনি। অবশ্য জ্যাকব নিজেও কি নিজেকে বুঝেছিল? বা বুঝেছে এতদিন? এই সমস্ত কিছুর অধীনে সেও কি কেবল আরেকটা, প্রয়োজনে-ব্যবহারের যন্ত্র মাত্র নয়? পপুলিস্ট রাজনীতির অক্টোপাসের হাত, এখন বাদামি-রং উদ্বাস্তুদের ঠিকানা খোঁজে কেবল। লোকগুলো ইয়ানকে ঘিরে ধরে। গলির ভিতরটা শুনশান। কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা সবচেয়ে জোয়ান লোকটা এগিয়ে এসে ইয়ানকে ধাক্কা মারে হঠাৎ।

আশ্চর্য! এভাবে ফেরো! ফিরে যাও! তফাত যাও! বললেই দুম করে ফেরা যায় নাকি? ইয়ান ভাবে। তাছাড়া ফিরবেও বা কোথায়? টলতে টলতে ও সামনের দিকে এগোয়। ওদের সকলের সঙ্গে গায়ের জোরে এঁটে ওঠা ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না। পুলিশে গিয়েও কোনও লাভ নেই। সময় পালটেছে অনেক। হাতের পিঠ দিয়ে নাকের রক্ত মোছে ইয়ান। পরনের সাদা শার্টটার জন্য ওর কষ্ট হয়। রক্তে ভিজে সামনের দিকটা পুরো নষ্ট হয়ে গেল। জ্যাকব ওই ভিড়ের মধ্যে ছিল না। থাকার কথাও নয়।

কাট! কতটুকু ভালোবাসা ছিল ওদের? মানুষ কীভাবে বদলে যায়? কতদূর অবধি বদলে যায়?

কয়জনকে এভাবে উচ্ছেদ করবে মানুষ? কতদিক থেকে উচ্ছেদ করবে?

জ্যাকবেরা উচ্ছেদ হয়েছে জার্মানি থেকে। তারও পরবর্তীতে বেলারুশ থেকে।

কাট, জ্যাকব। এরাও যে উদ্বাস্তু ভিন্ন আর কিছুই নয়। ইয়ান-সঙ্গীতারাও তাই।

প্রাচ্য থেকে উচ্ছেদ হয়ে এদেশে এসেছে সঙ্গীতা কালেনবাখ। আফরিন মেহেরুন্নেসা রহমান।

সঙ্গীতা কালেনবাখ রহমান।

কালের পরিহাসে এরা সকলেই আজ অন্টারিও শহরের বাসিন্দা।

ভূমি থেকে তাদের প্রত্যেকের উচ্ছেদের কারণও বিভিন্ন।

তবু তারাই আজ, সকলে একে অপরের বিপরীতে ক্রমাগত ছুরি হাতে ঘুরে বেড়ায়।

ইয়ান পকেটে হাত ঢুকিয়ে ওর ফোনটা বের করতে চেষ্টা করে। সঙ্গীতাকে এখনই ফোন করা প্রয়োজন। এতদিন ও ভেবে এসেছে ওর মাকে এদেশে, ওদের পরিবারে, ওর পরিবারে এভাবে নিয়ে আসার কারণেই ইয়ানের নীরবতা। সেই ভুল ভাঙা প্রয়োজন আজ।

—ইমিগ্রান্টদের চামড়ার রং বাদামি, তুমি জানতে ইয়ান?

বারান্দার দুলুনি-চেয়ারে বসে সঙ্গীতা জিজ্ঞেস করে। সামনের বাগানে নরম গোধূলি-রোদ। ইয়ান কোনও জবাব দেয় না। সঙ্গীতা বলে আবার, তুমি জানতে? বলো আমায়। ইয়ান দুপাশে মাথা নাড়ে। সঙ্গীতা ফিরে বাইরের দিকে তাকায়। ওর হাতে ধরা শরবতের গ্লাসে চুমুক দেয়। অদ্ভুত, এই পাগলামি সবার— ইয়ান কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারে না— তোমার পরিচয় নিয়ে আজ টানাটানি চলছে! অথচ ওই অরেলস্টাইন, ওই ওদেরকেও তো একদিন, এই পরিচয়ের তাগিদেই দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। এখনও পৃথিবীর কোথাও না কোথাও আরও কারওকে পালিয়ে বেড়াতে হয়। আর, এখনও আমরা… নিজেদের সাচ্চা কম্যুনিস্ট মনে হয়, জানো! ইয়ান হঠাৎই যেন বিরক্ত হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে একসময় একটা রসিকতা শুনেছিলাম। কোনওদিন, কোনও ঘরে যদি দেখো তিনজন কম্যুনিস্ট বসে কথা বলছে— নিশ্চিত জানবে, সেই ঘরে অন্তত খানচারেক ভিন্ন-ভিন্ন কম্যুনিস্ট পার্টির বৈধ সদস্য রয়েছে! আজ মনে হয় মানুষ হিসেবে আমরা এতটাই, হ্যাঁ, এতটাই সেপারেটেড! জোর দিয়ে বলে ইয়ান। সে রাম খাচ্ছে। ওর মাথা এখনও ঠান্ডা নয়। সঙ্গীতা ওর দিকে তাকায়। হাত বাড়িয়ে ওর হাতের উপর হাত রাখে। তারপর বলে, তুমিও তো কাটের কথা কোনওদিন বলোনি আমায়।

ইয়ান চুপ করে যায়। সে সঙ্গীতার দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গীতার সঙ্গে ঘটে যাওয়া দুপুরের ঘটনাটা ও এখনও জানে না। ওর হাতে ধরা রামের গ্লাস। অল্প নড়ে বোধহয়। লাল রং চলকে যায়।

রিংটোন বাজছে। হাতের ব্যাগ থেকে সঙ্গীতা ফোনটা বের করে। হস্পাইসের নম্বর বলে মনে হয়। ইয়ান স্টিয়ারিং থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকায়।

ওরা সকালেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। গতকাল অনেক রাত অবধি ওরা কথা বলেছে। সঙ্গীতা প্রস্তাব দিয়েছিল, যদি ওরা এখানের চাকরি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও, অন্য কোনও শহরে চলে যায়। ইয়ান রাজি হয়নি।

সরাসরি, অকারণে জ্যাকব ওকে চাকরি থেকে তাড়াতে পারবে না। কতদিন এভাবে সে সন্ত্রাস চালাবে?

…ইয়ান দেখতে চায়।

—এভাবে লড়াই করে যাওয়া অসম্ভব! সঙ্গীতা বলে উঠেছিল।
—তাহলে এভাবে কতদূরে পালাবে আজ? জিজ্ঞেস করেছিল ইয়ান।

সঙ্গীতা জবাব দিতে পারেনি।

—আফরিন বাড়ি ফিরলেন? আমি নিজে ওঁকে নিয়ে ব্লকে হাঁটতে বেরুব। ইয়ান বলেছিল।

ওরা আজ পলের সঙ্গে দেখা করে আসবে। পলের মঙ্গলবার বাড়ি ফেরার কথা। তিনদিনের ক্যাম্প-শিডিউল ওদের। রবিবার। হাইওয়ে ধরে খানিকদূর এগোলেই, চমক দিয়ে পলের সঙ্গে দেখা করে আসা যাবে। আবারও রিংটোন বেজে ওঠে। সঙ্গীতা আগেরবার ধরেনি ফোন। আফরিন আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে থাকেন। তিনি বিড়বিড় করে কিছু বলতে যান।

কেউ ফোন ধরছে না। সঙ্গীতা জানে, আফরিন এবারে চুপ করে যাবেন। সাদা চাদরের বিছানাতে তিনি শুয়ে থাকবেন। নীল আকাশ আর জানালার স্বচ্ছ কাচের দিকে তাঁর চোখ থাকবে। তিনি বাড়ি ফিরে আসবেন। বিছানায় শুয়ে শুয়েই।

আফরিন চাঁপাফুলের গন্ধ ভালোবাসেন। আফরিন কোনওদিন আর মুখ ফুটে সেই চাঁপাফুলের গন্ধ নিতে চাইবেন না। একইভাবে তিনি শুয়ে থাকবেন কেবল। সাদা বিছানায় শীত-রাত্তিরের চাঁপাফুল হয়ে। স্যাচুরেশনের নম্বরের সঙ্গে সঙ্গে, নিয়মিত চলনে, শ্বাস উঠবে, নামবে তাঁর। সবকিছু থেমে যাবে। সবকিছু জারি থাকবে। ইয়ান অ্যাক্সিলেটরে চাপ বাড়ায়।

আফরিন ঘুমিয়েছেন। নার্স বলে, ছেড়ে দাও। আর কারওকে ফোন করার দরকার নেই এখন। পেশেন্টের এই কন্ডিশনে এমন পসিবিলিটির কথা আমরা ওঁকে গতকালই জানিয়ে দিয়েছিলাম।

কাট জ্যাকবকে ভালোবাসছে। অদ্ভুত শব্দে তবু ওরা তারই মধ্যে সঙ্গীতাকে গালাগাল করে। গালাগাল করে ইয়ানকেও। অনেকটা গালাগাল দিয়ে তাদের শান্তিবোধ হয়। ইয়ান অ্যাক্সিলেটরে আরও চাপ বাড়ায়। ওরা ছুটতে ছুটতে পেরিয়ে যাচ্ছে মেপলগাছের শহর। লালমরিচের দেশ। রোদ্দুরে ভরা সকাল। সবুজ ঘাসের উপর পলকে তাক করে একটা রঙিন ফ্রিসবি ছুঁড়ল কেউ। পল ধরতে পারে না। একপাশ থেকে ফ্রিৎজ চেঁচিয়ে বলে ওঠে, ওহ! ক্যাচ ইট প্লিজ, পল! ট্রাই!

পল ফ্রিৎজের দিকে তাকায়। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড ফ্রিৎজ। আমার নাম পলাশ।

বাইরে হু হু হাওয়া দিচ্ছে। ইয়ান আর সঙ্গীতা সেই হাওয়ার পৃথিবীতে হারিয়ে যায়। ওরা ওদের চারপাশে আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কেবল অনেকদূর থেকে ওরা যেন কান পেতে শুনতে পায়, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড ফ্রিৎজ। আমার নাম পলাশ। হাওয়ার জোর ক্রমশ বাড়তে থাকে।

 

ঋণস্বীকার:

  • রুশদি, সলমন। কি-শট। ২০১৯।
  • নইপল, ভিএস। মিগুয়েল স্ট্রিট। ১৯৫৯।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5348 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...