সাম্রাজ্যবাদী দাবার ছক ও সমাজতান্ত্রিক প্রতিরোধ: একমেরু ফাঁদের মধ্যে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা

বিবেক পরত

 


আমাদের স্বার্থ নিহিত রয়েছে এমন এক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে কোনও একক দেশ অন্যদের ওপর শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। আমাদের উচিত BRICS-কে কেবল একটি বাণিজ্যিক জোট হিসেবেই নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে আরও শক্তিশালী করা। আমাদের উচিত বিশ্বের শ্রমিক ও কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো— সমাজতান্ত্রিক বলয়ের মাথা নত করতে অস্বীকার করার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন এক পথ নির্মাণ করা, যেখানে ভারতের নাগরিক— শ্রমিক, কৃষক ও যুবসমাজ— আমাদের বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করবে

 

২০২৬ সালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ভূকম্পনের মতো বড় পরিবর্তনগুলো লক্ষ করছি, তখন আমেরিকান হেজিমোনির দাদাগিরিমূলক কৌশলের মুখে বিভিন্ন দেশ কীরকম ভিন্ন-ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে তা স্পষ্টভাবেই চোখে পড়ছে। এই ভূরাজনৈতিক ভাঙনগুলিকে অনুসরণ করা এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বৈপরীত্য অত্যন্ত প্রকট।

একদিকে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমের উন্নত দেশগুলিকে— যারা আপাতদৃষ্টিতে সার্বভৌম হলেও অর্থনৈতিকভাবে নিওলিবারাল ঐকমত্যের সঙ্গে বাঁধা— তারা একের পর এক ওয়াশিংটনের নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করছে। তা সে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসই হোক, কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদেশগুলির বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসন ছেড়ে দেওয়া— সব ক্ষেত্রেই যে ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হল আত্মসমর্পণের ধারা।

তবে এই আত্মসমর্পণের ঢেউয়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে কিছু শক্তি— যাদের শিকড় সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট মতাদর্শে নিহিত, অথবা অন্তত সেই মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত। প্রধানত গণপ্রজাতন্ত্রী চিন এবং রাশিয়ান ফেডারেশন। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্মম বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করল এবং শুল্ককে ব্যাপক অর্থনৈতিক ধ্বংসের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল, তখন এই দেশগুলিই মাথা নত করতে অস্বীকার করেছিল। কেন? কারণ তাদের প্রতিরোধ কেবল কৌশলগত নয়; আদর্শগত। যা এমন এক শাসনব্যবস্থা থেকে উৎসারিত, যেখানে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর কল্যাণ এবং শ্রমিকশ্রেণির নিরাপত্তাকে বহুজাতিক পুঁজির মুনাফার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই অস্থির প্রেক্ষাপটেই আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে ভারতের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক আগ্রহ ও উদ্যোগকে— যা বন্ধুত্বের করমর্দন নয়, বরং সমাজতান্ত্রিক বলয়কে ঘিরে ফেলতে এবং গ্লোবাল সাউথের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষয় করতে সাজানো এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ।

 

শুল্ক হ্রাসের ছদ্মবেশী ফাঁদ

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার যে ঘোষণা করেছে, তা কিছু উদারপন্থী মহলে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বস্তুবাদী বিশ্লেষণ করলে এর পেছনে অশুভ এক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই তথাকথিত “পারস্পরিকতা”-র সঙ্গে জুড়ে রয়েছে এক বিষমিশ্রিত শর্ত: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভারতের কাছে দাবি করা হচ্ছে— রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে এবং চিনের সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।

এটাই চিরাচরিত সাম্রাজ্যবাদী কৌশল। সামান্য একটি ছাড়ের প্রলোভন দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার কাঠামো ভেঙে দিতে এবং তার বৈদেশিক নীতিকে নতুনভাবে নিজেদের অনুকূলে সাজাতে চাইছে। দীর্ঘদিনের অংশীদার দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার এই দাবি আমাদের নিজস্ব বাণিজ্যপথ বেছে নেওয়ার সার্বভৌম অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত— যে অধিকারটি ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতের স্বাধীন বৈদেশিক নীতির ভিত্তি হয়ে রয়েছে।

ওয়াশিংটনের চাপে এই স্বায়ত্তশাসন সমর্পণ করা মানে সার্বভৌমত্বের ওপর এক গভীর সংকটকে আহ্বান করা। এতে গ্লোবাল সাউথের এক নেতৃত্বদানকারী শক্তি থেকে ভারতের অধঃপতন হবে এমন এক জুনিয়র অংশীদারের অবস্থানে, যে একটি ভূরাজনৈতিক খেলায় অংশ নিচ্ছে কেবল— যে খেলার উদ্দেশ্য কেবল আমেরিকার একমেরু আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখা।

 

সমাজতান্ত্রিক বলয়ের স্থিতিস্থাপকতা

চিন ও রাশিয়া যেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, সেখানে অন্যরা নতি স্বীকার করে কেন? কারণ তারা বোঝে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ কোনও “ন্যায্য বাণিজ্য”-এর প্রশ্ন নয়; এটি এমন এক আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার লড়াই, যা দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে। মার্কিন শুল্কের জবাবে চিনের প্রতিক্রিয়া ছাড় পাওয়ার জন্য কোনও মিনতি নয়; বরং তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা, উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনকে মজবুত করা এবং তাদের গ্রামীণ ভিত্তিকে সুরক্ষিত করার জন্য।

এই দৃঢ়তা উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সমাজতান্ত্রিক অভিমুখ— যেখানে অর্থনীতির প্রধান ক্ষেত্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র, ওয়াল স্ট্রিট নয়— এই দেশগুলিকে ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা জোগায়। তারা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে নিজেদের কৃষকদের সুরক্ষা দেয়। যার বিপরীতে, মার্কিন মডেল দেশগুলিকে বাধ্য করে তাদের কৃষিক্ষেত্রকে শিকারি কর্পোরেট স্বার্থের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে। যখন আমরা সমাজতান্ত্রিক বলয়ের এই প্রতিরোধ দেখি, তখন আমরা আসলে দেখি ‘ভাতের থালা’ রক্ষার এক সংগ্রাম— এক এমন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার লড়াই, যে ব্যবস্থা শ্রমকে কেবলমাত্র কমিয়ে আনার মতো একটি খরচ হিসেবে দেখে।

ভারতের অবস্থান আক্রমণকারীর পাশে নয়, বরং সেই প্রতিরোধের পাশে হওয়া উচিত— যে প্রতিরোধ কর্পোরেট মুনাফার চেয়ে জাতীয় দৃঢ়তাকে অগ্রাধিকার দেয়।

 

ভারতীয় কৃষির প্রতি হুমকি— এক সাংবিধানিক উদ্বেগ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি লুকিয়ে আছে কৃষিক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দুগ্ধ ও কৃষিপণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার দাবি করে আসছে। এটি নিছক বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়; বরং কোটি কোটি ভারতীয় কৃষকের জন্য এটি জীবন-মরণের প্রশ্ন।

আমাদের সংবিধান তার রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিসমূহে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেয়— আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষি ও পশুপালনকে সংগঠিত করতে, সেই সঙ্গে জনগণের জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখতে। আমাদের বাজারকে মার্কিন দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে সমবায়ভিত্তিক আমাদের দুগ্ধক্ষেত্র কার্যত ধ্বংস হয়ে যাবে। কৃষক-কেন্দ্রিক স্বদেশীয় উদ্যোগের এক উজ্জ্বল উদাহরণ আমুল-এর মডেল তখন ভেঙে পড়বে— কারণ বিপুল ভর্তুকিপ্রাপ্ত ও শিল্পায়িত মার্কিন কৃষি-ব্যবসার ভারের সামনে এই মডেল দাঁড়াতে পারবে না।

এছাড়া, মার্কিন বায়োটেক একচেটিয়া সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত (GM) ফসলের জন্য যে চাপ তৈরি করা হচ্ছে, তা আমাদের খাদ্য-সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর হুমকি। আমরা যে বীজ বপন করি, তার ওপর যদি আমেরিকান কর্পোরেশনগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়, তবে তা আমাদের স্বাধীনতাকেই সমর্পণ করার সামিল। এতে গর্বিত ভারতীয় কৃষক তাঁর নিজের জমিতেই একপ্রকার ভূমিদাসে পরিণত হবেন— তাঁর উৎপাদনের মৌলিক উপকরণের জন্য তাঁকে বিদেশি সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে।

এই সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ থেকে আমাদের কৃষকদের রক্ষা করা দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ প্রকাশ। দেশীয় বীজের বৈচিত্র্য ধ্বংস করে এক-জাতীয় চাষ চাপিয়ে দেওয়া কেবল বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলিরই লাভ ঘটায়; এতে ভারতীয় কৃষক বাজারের ওঠানামা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে আরও বেশি অসুরক্ষিত হয়ে পড়ে।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছায়া ও “ডিজিটাল সামন্ততন্ত্র”

যখন আমরা এই প্রচলিত বিপদগুলিকে বিশ্লেষণ করছি, তখন আমাদের সামনে আরেকটি নতুন ও আরও সূক্ষ্ম বিপদও এসে হাজির হয়েছে— প্রযুক্তির অস্ত্রীকরণ। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ক্রমশ উৎপাদনের উপকরণগুলির ওপর নিজের থাবা শক্ত করতে শুরু করেছে।

মার্কিনরা আমাদের কেবল শস্য বিক্রি করতেই চায় না; তারা কৃষির ডিজিটাল অবকাঠামোও বিক্রি করতে চায়। কৃষিক্ষেত্রে AI-এর সংযোজন— অর্থাৎ তথাকথিত প্রিসিশন এগ্রিকালচার, যা সিলিকন ভ্যালির বিগ টেক ডেটা সেন্টারগুলির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত— এক ধরনের “ডিজিটাল সামন্ততন্ত্র”-এর বিপদ ডেকে আনছে। যদি ভারতীয় কৃষি এমন আমেরিকান কর্পোরেশনগুলির মালিকানাধীন AI অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যারা ঠিক করবে কখন বপন করতে হবে, কীভাবে ফসল কাটতে হবে এবং কোথায় তা বিক্রি করতে হবে— তাহলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণই হারিয়ে যাবে।

এই প্রযুক্তিগত সাম্রাজ্যবাদ বিপুল মাত্রায় কৃষিশ্রমিকদের স্থানচ্যুত করার হুমকি তৈরি করছে। ভারতের মতো একটি দেশে, যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত, সেখানে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে অন্ধভাবে এরকম শ্রম-অপসারণকারী AI প্রযুক্তির পথ গ্রহণ করলে কৃষিক্ষেত্রে ভয়াবহ অরাজকতা সৃষ্টি হবে। এর ফলে ব্যাপক বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেবে, এমন এক সংকট তৈরি হবে যা কোনও পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ দিয়েই সমাধান করা সম্ভব নয়।

প্রযুক্তি সম্পর্কে সমাজতান্ত্রিক সমালোচনা আমাদের সতর্ক করে দেয়: শ্রমিকরা যদি প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে প্রযুক্তিই শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করবে। আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমাদের খাদ্যব্যবস্থা এমন সব অ্যালগরিদমের হাতে বন্দি হয়ে পড়বে যেগুলোর মালিক আমরা নই— এবং এই নির্ভরতা ঔপনিবেশিক ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

 

২০৫০— আসন্ন খাদ্যসংকট ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

সবশেষে আমাদের অবশ্যই দিগন্তের দিকে তাকাতে হবে। রাষ্ট্রপুঞ্জের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (FAO) বারবার কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে— ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির অবক্ষয় এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিশ্ব এক ভয়াবহ খাদ্যসংকটের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘আত্মনির্ভরতা’ কোনও স্লোগান নয়; এটি টিকে থাকার কৌশল। যদি আমরা আজ ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক অংশীদারদের খুশি করতে গিয়ে আমাদের নিজস্ব কৃষি-সক্ষমতাকেই ভেঙে দিই, তবে ২০৫০ সালে আমাদের ১.৬ বিলিয়ন মানুষকে খাদ্য জোগাবে কে? যুক্তরাষ্ট্র নয়। বৈশ্বিক পুঁজিও নয়। কেবলমাত্র একটি শক্তিশালী, সুরক্ষিত এবং সার্বভৌম ভারতীয় কৃষিব্যবস্থা-ই আমাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

বিশ্ববাজারের খামখেয়ালের হাতে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা সমর্পণ করা মানে আমাদের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত মৌলিক জীবনাধিকারকে লঙ্ঘন করা। জনগণকে খাদ্য জোগাতে যে রাষ্ট্র অক্ষম, সে রাষ্ট্রের কোনও বৈধতা থাকতে পারে না।

সুতরাং এই অসম বাণিজ্য চুক্তিগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এক সাংবিধানিক কর্তব্য। আজ শুল্কহ্রাসের সাময়িক স্বস্তির জন্য আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষুধাকে বন্ধক রাখতে পারি না। আমাদের মনোযোগ থাকা উচিত এমন এক টেকসই ও সার্বভৌম কৃষিব্যবস্থার দিকে, যা জলবায়ু সংকটের ধাক্কা সামলাতে সক্ষম— মুনাফা-কেন্দ্রিক এবং ক্রমশ ব্যর্থ হয়ে পড়া বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে অন্ধভাবে একীভূত হওয়ার দিকে নয়।

 

উপসংহার— নন-অ্যালাইনমেন্ট ২.০-এর পথ

পৃথিবী ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে রয়েছে পুরনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির শোষণ— যারা মরিয়া হয়ে তাদের দখলদারি বজায় রাখতে চাইছে। অন্যদিকে গড়ে উঠছে গ্লোবাল সাউথের ক্রমবর্ধমান সংহতি, যার ভিত্তি BRICS দেশগুলির উত্থান এবং সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার স্থিতিস্থাপকতা থেকে পাওয়া প্রেরণা।

ভারতকে চিন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অভিযানে একটি ঘুঁটি হয়ে উঠতে দেওয়া চলবে না। আমাদের স্বার্থ নিহিত রয়েছে এমন এক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে কোনও একক দেশ অন্যদের ওপর শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। আমাদের উচিত BRICS-কে কেবল একটি বাণিজ্যিক জোট হিসেবেই নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে আরও শক্তিশালী করা। আমাদের উচিত বিশ্বের শ্রমিক ও কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো— সমাজতান্ত্রিক বলয়ের মাথা নত করতে অস্বীকার করার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন এক পথ নির্মাণ করা, যেখানে ভারতের নাগরিক— শ্রমিক, কৃষক ও যুবসমাজ— আমাদের বৈদেশিক নীতির কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করবে।

আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমাদের স্পষ্টভাবে বলতে হবে— জ্বালানি সাম্রাজ্যবাদের প্রতি “না”, আমাদের দুগ্ধক্ষেত্র ধ্বংসের প্রতি “না”, এবং আমাদের কৃষির ডিজিটাল উপনিবেশায়নের প্রতি “না”। কেবল দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিলেই আমরা নিশ্চিত করতে পারব যে নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা যেন আমাদের কঠোর সংগ্রামে অর্জিত স্বাধীনতার সূর্যাস্ত হয়ে না ওঠে।

 

*নিবন্ধটি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পিপলস ডেমোক্রাসি-তে ইংরেজিতে প্রকাশিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5347 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...