অংশুমান দাশ
'মানুষে মানুষে' নাটক, শান্তিনিকেতনের সময়ে বাদলদার সঙ্গে কাটানো সময়, আমার নাটকের দলের বন্ধুদের সাঙ্গে কাটানো সময়— সেই অর্থে ধরলে দু-তিন বছর সময়— আমার জীবনকে আমূল বদলে দেয়। এবং আমার বিশ্বাস বাদল সরকার মাস্টারমশাই হিসাবে এই বদলটা সকলের মধ্যে আসুক এই চেষ্টা করেছেন সচেতনভাবে। আমি এখন যা ভাবি, যা করি, যা দেখি— তার অনেকটাই ওই সময়ের রাজনৈতিক চিন্তার সেচের ফসল। আর তার মধ্যে এখনও এক-দুজনের সঙ্গে ও জন্যে আমি জাহান্নামেও দাঁড়াতে পারি— সেটুকুও বাদলদার সাজিয়ে দেওয়া ওই অমূল্য সময়টার জন্য, সে-কথা বলাই বাহুল্য
কলাভবন অফিসের বারান্দায় বসে খয়েরি কর্ডের প্যান্ট আর গোলাপি জামা পরে পা দুলিয়ে দুলিয়ে সিগারেট খাচ্ছেন যে ভদ্রলোক— আন্দাজ করে নেওয়া গেল তিনিই বাদল সরকার। তখন ইন্টারনেট ছিল না যে চট করে গুগল করে নেব। আবার মঞ্চের তারকাদের মতো বিনোদন-পাতার মুখও নন তিনি, তাই চিনে নেব এমন সুযোগও কম ছিল। প্রায় বছর তিরিশ আগের কথা। আমি তখন নেহাত কিশোরত্বের চৌকাঠ পেরিয়েছি। মাথায় শ্যাম্পু করা ওড়ানো মফস্বলি চুল। মুখে রং মেখে দাড়ি লাগিয়ে নাটক করতে ভীষণ উত্তেজনা বোধ করি— মেকআপ রুমে আঠা আর রঙের গন্ধে রক্ত গরম হয়ে যায়। এখান-ওখান থেকে খেপ খেলার, থুড়ি নাটকের ডাক আসে। রেডিওতে ত্রিংশ শতাব্দী শুনেছি— আর কয়েকবার ভোমা ইত্যাদি নাটকের নাম। চলে গেলাম বাদল সরকারের ওয়ার্কশপ করতে। ওয়ার্কশপ কী জিনিস? জানি না। কুড়ি-বাইশটা অচেনা ছেলেমেয়েও হাজির। তার মধ্যে ঠিক প্যান্টের মতোই খয়েরি রঙের একটা ব্যাগ থেকে কাঁচি বার করে একটা সিগারেট মাঝখান থেকে কেটে আধখানা ধরিয়ে বাকি আধখানা যত্ন করে আবার প্যাকেটে ঢুকিয়ে রেখেছেন ভদ্রলোক।
খাতাপত্র নিয়ে আমি প্রস্তুত। এবার নিশ্চয় গুরুগম্ভীর কথাবার্তা শুরু হবে। হল না। লাফালাফি গড়াগড়ি যা ইচ্ছে তাই শুরু হল। এ কী পাগলামো! তারপর একটা খেলা। তারপর আর একটা। নাটক কোথায় গেল?— আমি সন্দিগ্ধ হয়ে উঠি। কিন্তু খেলতে দিব্যি লাগে। হাতের পায়ের কোমরের গিঁট খুলে যায়। এই গিঁট খুলে যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে আর একবার আলোচনায় ফিরব। নতুন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। পরের দিন আবার গুটি গুটি ফিরে আসি। পর পর তিনদিন বিকালে তিন-চার ঘন্টার ওয়ার্কশপ। সকালে ক্লাসে বসে ফিজিক্স পড়ি। শেষ ক্লাস কেটে বিকেলে নাটকের ওয়ার্কশপ। না, ঠিক তা নয় বোধহয়। ‘বিকেলে বাদল সরকার’— এইরকম বলাই ভালো।
শেষ দিনে বললেন— আমি কাল সন্ধ্যায় চিনভবনে হট্টমালার ওপারে পড়ব। তোমরা আসতে পারো। গেলাম। তারপর এমনি করে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় বাকি ইতিহাস, এবং ইন্দ্রজিৎ, পাগলা ঘোড়া, ভোমা… আরও অনেক। শান্তিনিকেতনে ভীষণ লোডশেডিং হয়। কোনও কোনও দিন ঝড় হলে আলো চলে যায়। বাদলদা ঝোলা থেকে মোমবাতি বার করে ছোট্ট টেবিলের ওপর জ্বালিয়ে নেন। ছোটখাটো বাদলদার ছায়া চিনভবনের দেওয়ালে মস্ত হয়ে কাঁপতে থাকে। যেরকম নাটক শুনেছি, করেছি, পড়েছি— তার সব কিছুর চেয়ে এগুলো আলাদা। কেন আলাদা? বুঝতে পারি না ঠিক— কিন্তু একটা ঘোর লাগতে থাকে। চরিত্রগুলো ঘুরঘুর করতে থাকে। মিছিলের খোকা, সারারাত্তিরের বুড়ো, হট্টমালার বড় চোর, অমল বিমল কমল ইন্দ্রজিৎ, ত্রিংশ শতাব্দীর শরৎ, খাট্মাট্ ক্রিং-এর প্রহ্লাদ। হচ্ছেটা কী? নাটকগুলো এমনি কেন? মিলছে অথচ মিলছে না কেন? ধরতে পারছি অথচ ফসকে যাচ্ছে কেন? কোনও দূরতর কুয়াশার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেন? চিনভবন থেকে রতনকুঠি— যেখানে বাদলদা থাকেন— সেই অবধি হেঁটেই ফেরেন। নানকিদার দোকানে থামেন চা খেতে। আমি আবিষ্কার করি। পিছু নিতে থাকি। পিছু নিতে নিতে একদিন পাশাপাশি। একদিন পাশাপাশি চায়ের দোকানে। আমি একা নই। এমনিই ঘোরলাগা সব বাউন্ডুলের দল। হা হা হি হি হয়। আমি লাজুক— দেখি, শুনি, ভাবি। বোঝার চেষ্টা করি— ওই যে, হচ্ছেটা কী! খবর নিই— আচ্ছা সঙ্গীতভবনের যে নাটকের ক্লাস নিচ্ছেন বাদলদা, সেখানে কি অনাহূত হাজির হওয়া যায়?
—হ্যাঁ, আয় না, চলে আয়। কে কী বলবে— আমিই তো ক্লাস নিই।
রিলেটিভিটির তত্ত্বের বেড়া ভেঙে নাটকের ক্লাসে হাজির। ট্যারা হয়ে মেপে নেয় নাটকের স্নাতকরা। দেখুক গে। এই বেড়া টপকানোর ছলে আমি এবার বুঝতে থাকি থিয়েটারের শুরু— গ্রিক থিয়েটার, ইউরোপিয়ান থিয়েটার, লোকনাট্য, মঞ্চ, অগস্ত্য বোয়াল, পিটার শ্যুম্যান, তৃতীয় থিয়েটার। নাটকের রাজনীতি, হাতিয়ার, বেড়া— এবং আবার বেড়া টপকানো। এইবার যেন কুয়াশা সরে যাচ্ছে একটু একটু। সরে গিয়ে এত কিছু দেখতে পাচ্ছি যে বেড়ে যাচ্ছে দেখার নেশা।
—হ্যাঁ রে তোর ক্লাস নেই?
—তা আছে, কিন্তু জট ছাড়ছে না তাই… আমতা আমতা করে বলি। তারপর একদিন লাইব্রেরিতে হাতেনাতে ধরে ফেলেন— পরীক্ষার মধ্যে আমি থার্মোডাইনামিক্সের বই না তুলে শম্ভু মিত্র আর গ্রিক নাটকের ইতিহাসের বই ইস্যু করছি। পরের দিন সঙ্গীতভবনের ক্লাসে যথারীতি সব ফাঁস করে দিয়ে খ্যা খ্যা করে হাসতে থাকেন। আমি বেড়া টপকানো ছাগল, কচি লাউপাতা পেয়েছি— আমাকে আটকায় কে?
এর মধ্য শুরু করছেন এস্পারান্তো ক্লাস। এস্পারান্তো আন্তর্জাতিক ভাষা। পৃথিবীর একটাই ভাষা হতে পারে কিনা— এই চিন্তা থেকে এই ভাষার শুরু। বাদলদা তাকে শিখেছেন দারুণভাবে— এখন আমাদেরও শেখাবেন। সেই চর্চা করতে গিয়ে আবার আর একদফা বেড়ার চর্চা, গণ্ডির চর্চা। ভাষার দাদাগিরি, মানুষের দাদাগিরি। সব মানুষের একজায়গায় আসা, একরকম হওয়া— এই সব। এস্পারান্তো ক্লাস হয় রতনকুঠির বারান্দায়। কখনও বাদলদার এক কামরার অতিথিঘরে। নানা ডিসিপ্লিনের ছেলেমেয়েরা আসে। ইংরেজি, বাংলা, ভূগোল, অর্থনীতি— আমি ফিজিক্স। যাদের সঙ্গে আলাপ হয়নি, আলাপ হওয়ার কোনও কারণ নেই— তাদের সঙ্গে ভাবভালোবাসা হয়ে যায়। সাইকেল চেপে ক্লাস শেষে আমরা সবাই চলে যাই কোপাই, ক্যানেলপাড়।
—অংশু, ফেলে দিস না যেন। সামনে শো আছে— সাইকেলের ক্যারিয়ারে চাপতে চাপতে বলেন বাদলদা। আমি থাকলে আমার (নাট্যপ্রতিভার থেকে) সাইকেল চালানোর দক্ষতায় বাদলদার অসীম ভরসা ছিল।
কোপাইয়ের জলে ঝাঁপাঝাঁপি করি আমরা বালক-বালিকার দল, বাদলদা পাড়ে বসে জামাকাপড় সামলান। ফিরতে ফিরতে কখনও সন্ধ্যারাত ঘনিয়ে আসে। অন্ধকার রাস্তায়, আরও অন্ধকার হয়ে গাছগুলো মাথার উপর ঝুঁকে আসে। তাতে টিপ টিপ জোনাকি জ্বলে। সাইকেলে ওঠার সাহস নেই এই অন্ধকারে। হেঁটে চলি। বাদলদা তার লম্বা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নানা গল্প বলতে থাকেন। গল্পবলিয়ে বাদলদার কোনও জুড়ি নেই। আমরা শুনতে শুনতে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে শুনি। কতগুলো একই আকাশ বাতাসের তলায় থাকা বিচ্ছিন্ন মানুষের বিন্দুগুলোকে বাদলদা এমনি করে জুড়ে দেন।

আমিও বিন্দু জুড়ে জুড়ে আমার মতো করে তৃতীয় থিয়েটারের যুক্তিগুলি গড়ে তুলতে থাকি। শেষমেশ বাদলদাকে অভিনয় করতে দেখার সুযোগও জুটে যায়। এক সন্ধ্যায় ভুল রাস্তা— বাদলদার একক পারফরমেন্স। অন্য সন্ধ্যায় শতাব্দীর মিছিল। আজ পর্যন্ত যত নাটক দেখেছি— মিছিল তার কন্টেন্ট ও প্রেজেন্টেশন নিয়ে একেবারে সামনের সারিতে। আর বাদলদার করা মিছিলের বুড়ো— আমার কাছে অভিনয়ের শেষ কথা বলে মনে হয়। এইবারে সব খাপে খাপে মিলে গেল। এইবারে স্পার্টাকাস কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে উঠল— ফিরে আসব, লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি হয়ে ফিরে আসব। এইবার মিছিলের খোকা মিছিলের আওয়াজ শুনে বলে উঠল— মনে হচ্ছে মানুষের মিছিল!
তৃতীয় থিয়েটারের তত্ত্বগত আলোচনা করতে বসিনি এখন— বলছি মাস্টারমশাই বাদল সরকারের কথা। কিন্তু মাস্টারমশাই বাদল সরকার তাঁর তৃতীয় ধারার থিয়েটারের চিন্তাভাবনা থেকে আলাদা নন— একবারেই নন। তাঁর যাপনও সেই অর্থে তাঁর থিয়েটারের ভাষার থেকে আলাদা নয়, বরং চামড়ার মতো জড়িয়ে। সেই বিশ্বাস থেকে যেমন বিচ্ছুরিত হওয়া আলো দিয়ে তিনি যেমন তাঁর অনুগামীদের রাস্তা দেখাচ্ছেন— তেমনি তা কখনও কখনও বাধা হয়েও দাঁড়াচ্ছে। সে-কথায় আবার ঘুরে আসব’খন।
বলছিলাম বেড়ার কথা— বেড়া ভাঙার কথা। বলছিলাম বিন্দু জুড়ে জুড়ে বৃত্ত বানানোর কথা। ‘আমি যেখানেই যাই— চেষ্টা করি এইরকম বৃত্ত বানানোর।‘ যেখানে মানুষ জুড়ে থাকবে। বৃত্তের কোনও শুরুও নেই, শেষও নেই। বৃত্তে কেউ ছোট-বড় নেই— সব বিন্দু সমান। মঞ্চ ছেড়ে এমন একটা স্পেসে থার্ড থিয়েটার নেমে আসছে (বা উঠে আসছে) যেখানে অভিনেতা ও দর্শক একই তলে। ফারাক থাকছে না— এটা একটা মস্ত রাজনীতি। তাই এই থিয়েটার অর্থের বশ্যতা থেকে বেরোতে পারছে। তাকে মুখোশ খুলে ফেলতে হচ্ছে। মেকাপের আড়াল নিতে পারছে না— কারণ সে একেবারে মানুষের ছোঁয়ার মধ্যে। কোনও দল, কোম্পানি, বিজ্ঞাপন তাকে বাধ্য করতে পারছে না। সমস্ত একচেটিয়াপনা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে থিয়েটার ও থিয়েটারস্পেস— ভীষণভাবে একটা প্লুরালিস্টিক ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই উন্মুক্ত করে দেওয়া, বাঁধন ছিন্ন করে দেওয়া, বেড়া ভেঙে দেওয়ার কাজ বাদলদা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্বভারতীতে করেছিলেন— বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত পাঁচিলের ধারণাকে তুচ্ছ করে। তখন বুঝিনি— এখন বুঝছি, শুধু মুখে বলে আমাদের মধ্যেকার বেড়া ভাঙার কাজ বাদলদা করতে পারতেন না— তাই তাকে এইভাবে আমদের সামনে এনে দিচ্ছিলেন।
বিশ্বভারতীর নাট্যবিভাগ তাঁকে ডাকল, বাদলদা তাঁর ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে সব ছাত্রছাত্রীদের জন্য ওয়ার্কশপ করতে শুরু করলেন। তিন মাসের চুক্তি ছিল বোধহয়— বললেন— আচ্ছা, তিনমাস মানে তো নব্বই দিন— আমি নব্বই দিন সময় দেব। ফলে তিনমাস বেড়ে গিয়ে দাঁড়াল এক বছর। সেই সুযোগে তিনি আমাদের মধ্যের বেড়াগুলো উপড়ে দিতে থাকলেন। নাটক পড়া, এস্পারান্তো ক্লাস, কোপাই, খোয়াই, ফিজিক্সের ছেলেকে ডেকে এনে নাটকের স্নাতক ক্লাস করতে দেওয়া— সবচেয়ে জরুরি— নাটক যে নাটকের ছাত্রছাত্রীরা ছাড়াও সকলে করতে পারে— এই ব্যাপারটাকে প্রতিষ্ঠা করা। তৃতীয় ধারার নাটকের বেড়া মুছে দেওয়ার প্র্যাকটিস মাস্টারমশাই বাদল সরকার নানা প্রক্রিয়ায় প্রতীষ্ঠা করে চলেছেন। তার মধ্যে তাঁর অসম্ভব আকর্ষণীয় পারসোনালিটি, গপ্ল বলার ক্ষমতা। বাদলদা কথা বললে হাঁ করে শোনা ছাড়া উপায় নেই।
এরই মধ্যে আমি বারবার ওয়ার্কশপ করছি, একই কাজ হয়তো— কিন্তু নতুন বন্ধু। তাই অন্যরকম লাগছে। আমরা কয়েকজন ঠিক করলাম এবার তাহলে একটা নাটকের দল করা যাক। নানা ডিসিপ্লিন থেকে নানা ছেলেমেয়ের দল জুটে গেল— ১৫ জন। বলাবাহুল্য— নাটকের স্নাতক কেউ এল না। এই তৃতীয় থিয়েটার বিষয়টিকে যথেষ্ট নাটকীয় মনে হয়নি হয়তো। ঠিক একই জিনিস বাদলদা নিশ্চয় পাত্তা না দিয়ে এসেছেন। বাংলা থিয়েটারের রথী-মহারথীরা তৃতীয় থিয়েটারে থিয়েটারের মুক্তিকে ভালো চোখে দেখেন না। অর্থের দাসত্ব, সরকারি ফান্ডিং-এর দাসত্ব, দলদাসত্ব, মঞ্চ পাওয়ার জন্য হাত পাতার দাসত্ব, সস্তা বিনোদনের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য চমক দেওয়ার দাসত্ব, বিজ্ঞাপনের দাসত্ব… এই সব কিছুর উজানে দাঁড়ানোর ঔদ্ধত্যকে মেনে নেওয়ার ধক বাংলা নাটকের ছিল না। আজও নেই। তাই তাঁর মূল্যায়নে আরও সময় লাগবে। বাংলার বাইরে তাঁর কাজের প্রতি শ্রদ্ধা অনেক বেশি। যাই হোক, এসব বিতর্কে বাতাস দেওয়ার কথা বরং তোলা থাক। আমি ফিরি মাস্টারমশাইয়ে।

নাটকের দল শুরু হওয়ার পর মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে নতুন ইনিংস। ততদিনে নব্বই দিনের কোটা পেরিয়েছে। বিশ্বভারতী আর পয়সা দেয় না। বাদলদা একটা এককামরার বাড়ি ভাড়া নিলেন। প্রতি দু-মাসে একবার করে আসেন বেশ কিছুদিনের জন্য। আমরা তখন মানুষে মানুষে নাটক তুলছি। তুলতে গিয়ে অনেক ওয়ার্কশপ করতে হচ্ছে। নানা ধরনের খেলা, কসরত— যাতে স্পেস সম্পর্কে ধারণা তৈরি হচ্ছে। মানে ফিজিক্যাল স্পেস— যেখানে নাটকটা বা বলা যাক ঘটনাটা ঘটছে— সেই জায়গাটাকে আমি কীভাবে বুঝছি আমার শরীরের অবস্থান দিয়ে— এবং ওই স্পেসে থাকা আমার অন্য বন্ধুদের অবস্থান দিয়ে। একটা চৌকো/গোল/লম্বাটে/তিনকোনা খালি জায়গা, একটা সাদা বা কালো পর্দা, কতগুলো মানুষ— কিছু ওই স্পেসটার ভিতরে, কিছু বাইরে— এই সবটা মিলে সম্পর্কটা কীরকম— তা বোঝার জন্য, অ্যাস্থেটিক্যালি তৈরি করার জন্য ওয়ার্কশপ। এই স্পেসের নানা এন্টিটির প্রতিটা মুহূর্তের অবস্থানের সঙ্গে এবার জুড়ছে রং, গতি, ছন্দ। সম্পর্ক প্রতি ক্ষণে বদলে যাচ্ছে— ডাইনামিক হয়ে যাচ্ছে। এবার জুড়ছে সংলাপ। স্পেস, সংলাপ, মানুষ— তাদের মধ্যে সম্পর্ক— এই পুরো ব্যাপারটা রপ্ত করে নেওয়ার, বুঝে নেওয়ার জন্য লাগাতার দলগত অনুশীলন। এবং এই সবকিছুর উপরে এই স্পেসটার রাজনীতি, এই স্পেসটায় দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় আমার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সততার নির্মাণ। এইখানে আমি ওই গিঁটের কথায় আর একবার ফিরে আসব। গিঁট শুধু শরীরের নয়— শরীরের গিঁট ছাড়ানো সহজ— মনের গিঁট, নিজের অসততার সঙ্গে লড়াই করতে করতে সমস্ত গিঁট খুলে মুখোশবিহীন হয়ে স্পেসে দাঁড়ানো— ওইটা একটা বড় গিঁট। গিঁটটা না খুলতে পারলে মানুষের কাছে ধরা পরে যাব। যে গিঁটটা নানারকম ইন্টারনাল ওয়ার্কশপে খোলার চেষ্টা করেছেন বাদলদা— তার মধ্যে দিয়ে আমরা বারবার নিজের সামনে, নিজের বোধ ও চেতনার সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়াতে পেরেছি। এখন মজা হচ্ছে, সূত্র ধরিয়ে দেবেন মাস্টারমশাই— কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখোশ তো নিজেকেই খুলতে হবে। শুধু ওয়ার্কশপ নয়— নানাভাবে বাদলদা আমাদের সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন— আমরা একেকজন একেকভাবে নিয়েছি। মানুষে মানুষে নাটক অনুশীলন করে তোলা এবং তার ‘অভিনয়’ (যখন স্পেসের বাইরে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে)— দুটো অন্য ও অনন্য অভিজ্ঞতা আমার কাছে। এই নাটক, শান্তিনিকেতনের সময়ে বাদলদার সঙ্গে কাটানো সময়, আমার নাটকের দলের বন্ধুদের সাঙ্গে কাটানো সময়— সেই অর্থে ধরলে দু-তিন বছর সময়— আমার জীবনকে আমূল বদলে দেয়। এবং আমার বিশ্বাস বাদল সরকার মাস্টারমশাই হিসাবে এই বদলটা সকলের মধ্যে আসুক এই চেষ্টা করেছেন সচেতনভাবে। আমি এখন যা ভাবি, যা করি, যা দেখি— তার অনেকটাই ওই সময়ের রাজনৈতিক চিন্তার সেচের ফসল। আর তার মধ্যে এখনও এক-দুজনের সঙ্গে ও জন্যে আমি জাহান্নামেও দাঁড়াতে পারি— সেটুকুও বাদলদার সাজিয়ে দেওয়া ওই অমূল্য সময়টার জন্য, সে-কথা বলাই বাহুল্য।
শান্তিনিকেতনের নাটকের দলে মানুষে মানুষে-র পরেও করেছি খাট্মাট্ ক্রিং— সে প্রায় এপিক নাটক। লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালী, হট্টমালার ওপারে— বাদলদা নির্দেশনা দিতে ধূমকেতুর মতো এসে হাজির হতেন— আমরা যৌথ নির্দেশনা দিতাম। সকলে মিলে নাটক তৈরি করতাম, মেরামত করতাম। বাদলদার সঙ্গে তর্ক করতেও অসুবিধা হত না। এই মাস্টারমশাইকে শান্তিনিকেতনের বাইরের ছাত্ররা পাননি। বাদলদাও আমাদের মতো আনকোরা ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে নিশ্চয় কিছু পাচ্ছিলেন— তাই তাঁর দল শতাব্দীর বাইরে তাঁর এতটা সময়, পরিশ্রম ও মেধা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। লম্বা লম্বা চিঠি লিখেছি বাদলদাকে— নিজের নানা সমস্যা নিয়ে। বাদলদা তার লম্বা লম্বা উত্তর দিয়েছেন। শুধু তো আমি নই— আরও অনেককেই দিয়েছেন নিশ্চয়। এই সময়টা ইনভেস্ট করছেন বোধহয় তিনি তাঁর মানুষ তৈরির অদম্য ইচ্ছে থেকে— একেবারে ভিতর থেকে মাস্টারমশাই ছিলেন ভদ্রলোক— যেটা নাট্যকার নাট্যকর্মী বাদল সরকারের তলায় বেমালুম চাপা পড়ে যায়।

এই বাদলদার অভাব আমি বোধ করলাম কলকাতায় এসে। শতাব্দীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে। এখানে বাদলদা অনেক বেশি নাট্যকার-পরিচালক। নাটক যেন উঠছে কোরিওগ্রাফি তৈরি করার মতো করে— স্পেস-কন্টেন্ট-বোধের সংঘর্ষ ও নির্মাণ থেকে যেন উঠে আসছে না নাটকের শরীর। তাঁকে যেন পেডেস্ট্রালে চড়িয়েছেন তাঁর সঙ্গে কাজ করতে থাকা মানুষজন, তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। সব মিলিয়ে বাদলদার অনুসারী হয়ে থেকেছি প্রায় দশ বছর সরাসরি— শেষে যেন মনে হয়েছে যেমনভাবে হোক এই ধারার নাটককে টিকিয়ে রাখাই একটা দায় ও দায়িত্ব হিসেবে চেপে বসেছিল তাঁর কাঁধে। ফলে এক পুনরাবৃত্তির চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকছে তৃতীয় থিয়েটার। মানুষ হিসাবে সকলেরই কিছু না কিছু দুর্বলতা থাকে, বাদলদারও ছিল— কিন্তু তাঁকে ভগবান করে তোলার দায় অবশ্য তাঁর নিজের হতে পারে না। ওই সময় আমাকে বেরিয়ে আসতে হয়। তারপর আর দেখা করিনি। একদম শেষ বয়সে যখন বাদল সরকার আর ভালো করে হাঁটতে পারছেন না— নাট্যশোধের এক সংবর্ধনা সভায় দূর থেকে একবার দেখার জন্যই গেছিলাম। তারপর চলে যাওয়ার পরে— সেই ১এ পিয়ারি রোডের বাড়ি থেকে সেই প্রথমদিন দেখা খয়েরি ব্যাগটা চেয়ে নিয়ে এসেছি বাদলদার মেয়ের কাছ থেকে।
মাস্টারমশাইকে এখনও স্বপ্নে দেখি। আবার কবে ওয়ার্কশপ করব বাদলদা?
*ভেতরের ছবিগুলি লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে

