কেন চিন ইরানকে সাহায্য করবে না?

ইউন সুন

 


ইরানে জমানা পরিবর্তনকে বেইজিং সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বলে মনে করে না। হামলার পর যে নেতৃত্বই ক্ষমতায় আসুক, যদি তারা তেল সরবরাহের প্রবাহ বজায় রাখে এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে চিন তাদের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। কেবল তখনই বেইজিংকে তার এই পাশ-কাটিয়ে-থাকা অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে— যদি এই স্বার্থগুলো হুমকির মুখে পড়ে, অথবা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করে

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ইরানে বোমাবর্ষণের দিকে চিন গভীরভাবে নজর রাখছে। বেইজিংই তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। যৌথ ইতিহাস ও অভিন্ন লক্ষ্য— এই দুইয়ের ভিত্তিই দুই দেশকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। উভয়েরই শিকড় প্রোথিত প্রাচীন অ-পশ্চিমি সভ্যতার অগ্রগণ্য ধারায়, এবং বর্তমানেও তারা পশ্চিমি আধিপত্যে পরিচালিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরোধী।

চিনের জ্বালানি-নিরাপত্তাও ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে চিনের মোট তেল আমদানির ৫৫ শতাংশেরও বেশি এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ সরাসরি ইরান থেকে। এই তেলের অধিকাংশই ইরানঘেঁষা সঙ্কীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। সাম্প্রতিক বোমা হামলার ফলে ইরানের তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামগ্রিক উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে, এতে ওই অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনও বেইজিংয়ের পক্ষে সমস্যার হতে পারে। সেইসব কারণেই কিছু বিশ্লেষক ধারণা করছেন, চিন হয়তো তেহরানের সাহায্যে এগিয়ে আসবে— হয় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে, নয়তো অন্তত দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (dual-use) সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশের মতো বস্তুগত সহায়তা দিয়ে, যেমনটি ইউক্রেন যুদ্ধের সময় চিন রাশিয়াকে দিয়েছে।

তবে চিন উদ্বিগ্ন হলেও, সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম। ২০২৫ সালের জুনে ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়েও চিন ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির সমর্থনে কিছু প্রচলিত কূটনৈতিক বক্তব্যই দিয়েছিল। একইভাবে, এই সপ্তাহে চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়েও দেখা গেছে— মন্ত্রণালয় সবচেয়ে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাতে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামগ্রিক সামরিক অভিযানের নিন্দায় নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে “সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সামরিক অভিযান বন্ধ করার” আহ্বান জানানো হয়েছে— যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যেমন পড়ে, তেমনি ইরানও পড়ে। এবং উপসাগরীয় দেশগুলির “সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা” সম্মানের পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে, যা এই ইঙ্গিতই দেয় যে, চিন ইরানের পাশাপাশি অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে।

ইরানের প্রতি এই ‘হাত গুটিয়ে থাকা’ নীতি দীর্ঘ সময় ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাস যখন ইজরায়েলের ওপর হামলা চালায়, তার পর থেকেই বেইজিং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তেহরানের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে উঠেছে। চিনা স্ট্র্যাটেজিস্টদের আস্থা আরও নড়বড়ে হয়েছে, কারণ তাঁদের মতে ইরান পশ্চিমি দাবির সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বদলে প্রায়ই আপস করে— ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রতি তার অবিরাম আগ্রহ তারই প্রকাশ। ফলত, ইরানে জমানা পরিবর্তনকে বেইজিং সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বলে মনে করে না। হামলার পর যে নেতৃত্বই ক্ষমতায় আসুক, যদি তারা তেল সরবরাহের প্রবাহ বজায় রাখে এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে চিন তাদের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। কেবল তখনই বেইজিংকে তার এই পাশ-কাটিয়ে-থাকা অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে— যদি এই স্বার্থগুলো হুমকির মুখে পড়ে, অথবা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করে।

 

ইরানের প্রতি হতাশা

মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার জন্য ইরান একটি শক্ত ঘাঁটি হতে পারে— এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই দীর্ঘদিন ধরে চিনের ইরান-কৌশল গড়ে উঠেছিল। ২০২১ সালে তাদের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতাকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে দুই দেশ একটি ২৫ বছর মেয়াদি, ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও মজবুত করা। কিন্তু তেহরানের আশঙ্কা ছিল যে চিনের প্রভাব ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে— এই কারণে চুক্তিতে পরিকল্পিত বহু প্রকল্পই বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে তেহরানের অসঙ্গতিপূর্ণ ও অবিশ্বস্ত আচরণে বেইজিংও ক্রমে হতাশ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চিনের ধারণা— ইরানের শক্তি ও তার বিপ্লবী ভাবমূর্তি দুইই অতিরঞ্জিত। ইরানের জনসংখ্যা ইজরায়েলের প্রায় দশগুণ এবং সৌদি আরবের প্রায় তিনগুণ হলেও, তার জিডিপি ইজরায়েলের জিডিপির ৯০ শতাংশেরও কম এবং সৌদি আরবের জিডিপির মাত্র ২৫ শতাংশ। বেইজিংয়ের মূল্যায়নে, ইরান প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতিরোধ করার জন্য প্রক্সি যুদ্ধ ও অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করেছে— যার ফলে তার প্রকৃত সক্ষমতা অনেক বেশি বলে মনে হয়েছে এবং একই সঙ্গে তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলিও আড়াল হয়েছে।

চিন আরও মনে করে, ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার যে কৌশলগত লক্ষ্য ইরানের, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতির সঙ্গে একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। নিংশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন-আরব গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নিউ শিনচুন-এর প্রকাশ্য মন্তব্য ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইরানি শাসনব্যবস্থার ইসলামি আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও পারমাণবিক প্রশ্নে আপস বা ছাড় দেওয়ার সুযোগই প্রায় রাখে না। কিন্তু কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি উন্নত করা, শক্তি বৃদ্ধি করা এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পথে যে বাহ্যিক চাপ বাধা হয়ে আছে তা লাঘব করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপনই আসলে মৌলিক পূর্বশর্ত। ফলে ইরান এক ধরনের দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে আছে— একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রয়োজন; একদিকে তার ধর্মতাত্ত্বিক রক্ষণশীল শিকড়, অন্যদিকে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা।

এ ছাড়া অনেক চিনা বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে, প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়ে সরাসরি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ইরান যথেষ্ট দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ সামরিক জেনারেল কাশেম সোলেইমানিকে হত্যা করে, কিংবা ২০২৪ সালে যখন ইজরায়েল সিরিয়ায় ইরানের দূতাবাসে হামলা চালায়, তখন ইরানের পক্ষ থেকে ইরাকের মার্কিন ঘাঁটি ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যে পাল্টা আঘাত হানা হয়, তা তেহরানের ক্ষমতার তুলনায় বেশ দুর্বল বলেই মনে করা হয়। অনেক চিনা পর্যবেক্ষক আবার ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের প্রতিক্রিয়াকেও অত্যন্ত অকার্যকর ও দুর্বল বলে মনে করেছেন— বিশেষত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের আগে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ঘটনাকে তাঁরা এর উদাহরণ হিসেবে দেখান। চিনা নেটিজেনরা এমন প্রতিক্রিয়াকে “মঞ্চস্থ প্রতিশোধ” বলে ব্যঙ্গ করে থাকে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে চিনের মূল্যায়নে এখন ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাবাদ প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে চিনের পরিচিত মতামতদাতা হু সিজিন-এর মতো ব্যক্তিত্বও ইরান ও তার জনগণের সামনে তৈরি হওয়া জটিল অচলাবস্থা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এবং দেশটিকে এই পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার জন্য তেহরানকেই দায়ী করেছেন।

ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তার আচরণও চিনের আস্থা আরও দুর্বল করেছে। ২০২৩ সালের পর থেকে এই গোষ্ঠীগুলো একের পর এক হামলার লক্ষ্য হয়ে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইজরায়েলি বাহিনী হামাস ও হেজবোল্লা-কে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে, তবু ইরান তাদেরকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিতে বা কার্যকর প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে চিন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করে, ইরানের উপ-রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জাভাদ জারিফ অঞ্চলজুড়ে তথাকথিত “প্রতিরোধ অক্ষ”-এর অন্তর্ভুক্ত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক অস্বীকার করেন এবং ঘোষণা করেন যে তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর ইরানের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার মধ্যেই ইরান ইয়েমেন থেকে নিজের সামরিক কর্মীদের সরিয়ে নেয়। এর অর্থ ছিল, ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা না বাড়াতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা বজায় রাখতে গিয়ে ইরান তার হাউদি মিত্রদের কার্যত পরিত্যাগ করেছিল।

বেইজিং ইরানি শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা নিয়েও হতাশ। চিনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যদিও প্রকাশ্যে ইরানি শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করা হয় না, তবু মধ্যপ্রাচ্য-সংক্রান্ত চিনা নীতিনির্ধারণী মহল তেহরানের দুর্বল সিদ্ধান্তগ্রহণ, ব্যাপক দুর্নীতি এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট পরিষ্কার ধারণা রাখে। ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইজরায়েল যে সহজেই ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে পেরেছিল— যার ফলে তারা ইরানি সামরিক নেতাদের ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়— তা থেকে বোঝা যায়, অনেক ইরানি কর্মকর্তাই নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন না এবং প্রয়োজনে নিজেদের দেশকেই বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত। এই সব কারণেই চিনা নেতারা এমন একটি ইরানি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান, যে রাষ্ট্রের প্রতি তার নিজের কর্মকর্তাদেরই আস্থা নেই।

ইরানের নেতৃত্বের প্রতি চিনের এই হতাশার অর্থ হল— বেইজিং নীতিগতভাবে ইরানে শাসন পরিবর্তনের বিরোধী নয়। চিনের প্রধান অগ্রাধিকার হল ইরান যেন একটি কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে টিকে থাকে; শাসনব্যবস্থা-নিরপেক্ষভাবে। বাস্তবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলা ইরানের বেপরোয়া সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমিত করে এবং দেশটি নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে পুনর্গঠিত করতে পারে, তবে এমন একটি ভবিষ্যৎকে চিন স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চিনের সম্পর্কের কারণেও বেইজিং ইরানি শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসবে— এমন সম্ভাবনা কম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের নেতা শি জিনপিং-এর মার্চের শেষদিকে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে— যে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৃহৎ সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘ আট বছরের তীব্র মহাশক্তি-প্রতিযোগিতার পর বাস্তব কোনও উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুলে যেতে পারে। বেইজিং চায় না যে মধ্যপ্রাচ্যে কোনও যুদ্ধ তার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার এই প্রচেষ্টাকে বিপর্যস্ত করে দিক।

 

হিসাবের পরিবর্তন

চিনের কাছে ইরানের গুরুত্ব প্রধানত জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গেই যুক্ত। যদিও চিন তার জ্বালানির বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে এবং কয়লা, সৌর, বায়ু ও পারমাণবিক শক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে— ২০২৫ সালে কয়লার পর নবায়নযোগ্য জ্বালানি তেলকে ছাড়িয়ে চিনের জ্বালানি ব্যবহারের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসে পরিণত হয়েছে— তবু চিনের অর্থনীতিতে তেলের ভূমিকা এখনও অপরিবর্তনীয়। এখনও জেট বিমান চালানো, জাহাজ পরিচালনা করা এবং পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের জন্য চিন আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভর করে। অনুমান করা হয়, চিনের মজুত তেলের পরিমাণ প্রায় ১.৩ থেকে ১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল, যা ২০২৫ সালে তার মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশের সমান। এই মজুত মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে স্বল্পমেয়াদি বিঘ্ন সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলার জন্য নয়।

চিন যে বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন— এবং যা বেইজিংয়ের হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়ে তাকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারে— তা হল হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে থাকা। এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে চিনের তেল আমদানির অর্ধেকেরও বেশি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। চিনা তেল-সংস্থার নির্বাহীরা এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে আসছেন যে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সময়ের জন্য নৌ-পরিবহন পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের যুক্তি হল, যদি মধ্যপ্রাচ্যের কোনও যুদ্ধের ফলে এই প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়, তবে তা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করবে এবং দ্রুতই একটি সম্মিলিত আন্তর্জাতিক সমাধান বেরিয়ে আসবে। উদাহরণস্বরূপ, ১২ দিনের যুদ্ধের সময় চিনা বিশেষজ্ঞরা ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার প্রস্তাবে সায় দেননি, কারণ তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে এতে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলই ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে এবং একই সঙ্গে ইরানের নিজের আয়ের পথও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চিন এই অঞ্চলে একটি সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারে বলে তাদের নিজের দেশে একটা আহ্বান আছে এবং পশ্চিমি বিশ্লেষকদের জল্পনাও রয়েছে। বেইজিং কিন্তু এই যুক্তি দিয়েই সেই আহ্বান এবং জল্পনার বিরোধিতা করে থাকে।

এই ধারণা— যে বৈশ্বিক জ্বালানি উৎপাদক ও ভোক্তারা কখনওই অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে দেবে না— এখন বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে। বেইজিং তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যাতে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা হয় এবং জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এমন কোনও পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। যদি এই অঞ্চল থেকে চিনের তেল সরবরাহ বিঘ্নের মুখে পড়ে, তবে বেইজিং বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকতে পারে— বিশেষ করে রাশিয়ার দিকে, যেখান থেকে বর্তমানে চিনের মোট তেল আমদানির ১৭ শতাংশেরও বেশি আসে। কিন্তু কোনও একক সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চিন স্বস্তি বোধ করে না, কারণ এতে আবারও বড় ধরনের সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

চিনের জন্য আরও বড় পরীক্ষা হবে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। যদি ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও টিকে থাকে এবং পাল্টা আঘাতে প্রকৃত ক্ষতি করতে সক্ষম হয়, তবে তা বেইজিংয়ের জন্য একটি জটিল দ্বিধা তৈরি করবে। যদি তেহরান আপসের প্রবণতা ত্যাগ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং আক্রমণের মুখেও টিকে থাকতে পারে, তাহলে চিনের পক্ষে একেবারে পাশ কাটিয়ে থাকা এবং ইরানকে কোনও সহায়তা না দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ ইরান এখনও চিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার। ইরান যদি আক্রমণ সহ্য করার দৃঢ়তা ও সক্ষমতা দেখায়, তবু তাকে সহায়তা না করা হলে তা চিনের প্রতিশ্রুতিভঙ্গেরই সামিল হয়ে দাঁড়াবে।

আর যদি চিন শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ে, তবে তেহরানের প্রতি তার সহায়তা অনেকটা সেই ধরনেরই হতে পারে, যেমনটি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে দেখা গেছে: ড্রোনের মতো দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা, ইরানের তেল ক্রয় করা, এবং ইরানের স্থানীয় প্রতিরক্ষাশিল্প গড়ে তুলতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া।

ইরান যত দীর্ঘ সময় টিকে থাকবে, চিনের ওপর তত বেশি চাপ তৈরি হবে তাকে সমর্থন করার জন্য— আর এতে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। কিন্তু যদি ইরান দ্রুত ভেঙে পড়ে, যেমনটি বাশার আল-আসাদ-এর সিরিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল; অথবা পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে যায়, যেমনটি ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের সময় ঘটেছিল বলে মনে করা হয়; তাহলে বেইজিং এমন ফলাফল নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাবে না।

চিন ইতিমধ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছে। এখন বেইজিংয়ের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল— মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের প্রবাহ যাতে অব্যাহত থাকে, সে জন্য পরবর্তী জমানার সঙ্গে কীভাবে কাজ করা যায় তা নির্ধারণ করা।

 


*নিবন্ধটি ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ গত ৫ মার্চ ইংরেজিতে প্রকাশিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5342 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...