ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধ ও ভারতের বিদেশনীতি

বর্ণিল ভট্টাচার্য

 


ফেব্রুয়ারির চমকপ্রদ আলিঙ্গন মার্চে এসে এক সংকটে দাঁড়িয়েছে। তেলের দাম যত আকাশচুম্বী হচ্ছে, বাণিজ্যের দুয়ারগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে, ততই ভারত এক রূঢ় শিক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বরাজনীতিতে, জনমানসে যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়, শেষ পর্যন্ত তার চড়া মাশুল দিতে হয়— আর সাধারণত সেই মূল্য চোকানোর সামর্থ্য কোনও রাষ্ট্রেরই থাকে না

 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নরেন্দ্র মোদি তেল আভিভে পৌঁছে রাজকীয় প্রথায় ‘লাল গালিচা’ সম্বর্ধনা পেলেন। নেতানিয়াহুর সে কি নিবিড় আলিঙ্গন; প্রথাগত কূটনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে এ যেন মোদির এক অর্থে নিজের ঘরে ফেরা। ইজরায়েলি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বেঞ্জামিনের আবেগপ্রবণ ভাষণ, “আপনি কেবল একজন বন্ধু নন, আপনি আমার ভাই।”

এ যেন বিশ্বকে বার্তা— পুরনো ‘জোট নিরপেক্ষ’ নীতিতে আর নেই ভারত; এখন খোলাখুলি শক্তিশালী দলের পাশে ভারত, যে জেতে তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলতেও পছন্দ করে সে। কিন্তু মার্চ মাস পড়তেই যুক্তরাষ্ট্র-ইজ়রায়েল এবং ইরানের মধ্যে শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ, এখন যা তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেই নিবিড় ‘ভ্রাতৃত্ব’ এখন সুচিন্তিত কৌশলগত পরিবর্তনের বদলে পায়ে জড়িয়ে যাওয়া শিকল হয়ে উঠছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে নতুন দিল্লি নানা দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুনিপুণ ও শীতল ভারসাম্য বজায় রেখে বিদেশনীতি পরিচালনা করে এসেছে। ভারত যেমন একদিকে ইজ়রায়েলের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনিভাবে ইরানের সঙ্গেও বজায় রেখেছে এক মজবুত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। এই অবস্থান কোনও নৈতিক দ্বন্দ্ব বা অনিশ্চয়তা থেকে আসেনি; বরং এটি ছিল ভারতের নিজস্ব অস্তিত্ব ও ভারসাম্য রক্ষার সুচিন্তিত গাণিতিক ছক।

ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি-চাহিদা, চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে কৌশলগত বাণিজ্যিক পথ এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত ৯০ লক্ষাধিক ভারতীয় শ্রমিকের জীবন— সবই মূলত এই অঞ্চলের প্রতিটি রাষ্ট্রের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল; যেখানে কোনও নির্দিষ্ট পক্ষে যোগ দেওয়ার পরিণাম নিজের পায়ে কুড়ুল মারার সমান। সেই পুরনো ভারসাম্যের হিসেবে ঠিক কতটা পরিবর্তন এসেছে, শেষ কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’— যা ছিল পহেলগাঁও হামলার মোক্ষম জবাব— তার সাফল্যের মূলে ছিল মূলত ইজরায়েলি সমরাস্ত্রের ব্যবহার। এর মধ্যে ছিল ‘লয়টারিং মিউনিশন’ (এক ধরনের ড্রোন যা অপেক্ষায় থেকে লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালায়) এবং ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজকের অত্যাধুনিক যন্ত্রমেধা (এআই) চালিত অস্ত্র পর্যন্ত, ইজ়রায়েলই একমাত্র অংশীদার যারা ভারতের সঙ্গে ‘ব্ল্যাক বক্স’ প্রযুক্তি (গোপন ও উচ্চতর প্রযুক্তি) ভাগ করে নিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, যা সাধারণত পশ্চিমি দেশগুলো ভারতকে দিতে অস্বীকার করে। নয়াদিল্লির কাছে তেল আভিভকে পাশে রাখা কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজনীয় আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র পাওয়ার এক অপরিহার্য শর্ত।

অন্যদিকে ভুলে গেলে চলবে না, প্যালেস্তাইন যখন ইজরায়েলি বোমাবর্ষণে ধূলিসাৎ, তখনও সেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং মানবিক সহায়তা সচল রাখতে ভারত আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য নয়াদিল্লি গত ১০ বছরে ৮০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল জোগান দিয়ে গেছে। তবে বর্তমানে সেই সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তা কেউ জানে না।

যা হতে চলেছিল একতরফা বন্ধুত্ব, আজ যুদ্ধের মুখে মোদি সরকার ফের ফিরে গেল ভারসাম্যের কাজে: এক দিকে ইজ়রায়েলি প্রযুক্তি, অন্য দিকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ এবং ইরানের মধ্যে দিয়ে কৌশলগত বাণিজ্যিক পথ। সংকট যেন প্রজ্ঞা ফিরিয়ে আনল। অজানা হিসেবের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালী, যা একসময় বাণিজ্যের প্রধান ধমনী ছিল, তা এখন এক “ভূ-রাজনৈতিক মরণফাঁদে” পরিণত হয়েছে।

এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন দিল্লি ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ বা সামরিক আস্ফালনের বদলে “শান্ত চায়ের টেবিলের কূটনীতি” বা ধীরস্থির আলোচনার পথ বেছে নিয়েছে। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত করতে যুদ্ধজাহাজের বহর পাঠানোর ডাক দিচ্ছেন, তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আস্থা রাখছেন যে, একটি টেলিফোন কল সম্ভবত সামরিক অভিযানের চেয়েও বেশি কার্যকর হবে।

১৬ মার্চ এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে। তেহরান এখন নয়াদিল্লিকে একটি বিপজ্জনক বিনিময় (Quid pro quo) চুক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত থাকার দায়ে আটক তিনটি ইরান-ঘনিষ্ঠ ট্যাঙ্কারকে ভারত মুক্তি দিলে তবেই কেবল ২২টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজকে নিরাপদে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে।

এই ভারতীয় জাহাজগুলোতে এলপিজি-র (রান্নার গ্যাস) মতো অত্যন্ত জরুরি রসদ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ভারতকে এক কঠিন ‘কূটনৈতিক টানাপোড়েন’-এর মুখে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। ভারত যদি ইরানের এই ‘ট্যাঙ্কার ডিপ্লোম্যাসি’-তে সম্মতি জানায়, তবে ৬১১ জন ভারতীয় নাবিককে নিরাপদে স্বদেশে ফিরিয়ে আনা এবং দেশজুড়ে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট নিরসন করা সম্ভব হবে।

আমেরিকার ভূমিকাও এখন মোদির শুরুর দিকের ছকগুলোকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। ৫ মার্চের রাইসিনা ডায়ালগ সম্মেলনে ওয়াশিংটন এক ‘কঠোর বাস্তব’ তুলে ধরেছে: তারা ভারতকে চিনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে গণ্য করলেও, সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে নারাজ। যুক্তরাষ্ট্র এখন বলছে যে, অতীতে চিনের জন্য তাদের বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া ছিল একটি মারাত্মক ভুল, যার পুনরাবৃত্তি তারা আর চায় না। এই কারণে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির চৌকাঠে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বমঞ্চে এক শক্তিশালী নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যে ভারতের রয়েছে, তা অনস্বীকার্য। তবে বৃহৎ শক্তি হওয়ার পূর্বশর্ত হল অন্যের যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ার মতো ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখা। রণহুঙ্কারের বিপরীতে শান্তি ও সংলাপকে অগ্রাধিকার দিয়ে নয়াদিল্লি প্রমাণ করতে চাইছে যে, চরম উত্তেজনার মাঝেও যুক্তিনির্ভর আলোচনার পথ এখনও প্রাসঙ্গিক। কেউ কি আজ আমাদের বার্তা আমাদের মুখ থেকে শুনতে প্রস্তুত?

স্প্যানিশ ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস দন কিহোতে-তে একটি অপূর্ব কথা আছে— ‘Dime con quién andas, y te diré quién eres’; অর্থাৎ, তোমার সঙ্গই বলে দেয় তোমার পরিচয়। ফেব্রুয়ারির চমকপ্রদ আলিঙ্গন মার্চে এসে এক সংকটে দাঁড়িয়েছে। তেলের দাম যত আকাশচুম্বী হচ্ছে, বাণিজ্যের দুয়ারগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে, ততই ভারত এক রূঢ় শিক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। বিশ্বরাজনীতিতে, জনমানসে যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়, শেষ পর্যন্ত তার চড়া মাশুল দিতে হয়— আর সাধারণত সেই মূল্য চোকানোর সামর্থ্য কোনও রাষ্ট্রেরই থাকে না। আমাদের নজর থাকবে, এই চরম সঙ্কটের মুহূর্তে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কতখানি ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে পারে, তার ওপর।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5319 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...