অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কিছুদিন আগে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব শুরুর প্রাক-মুহূর্তে সেই উৎসবের জুরি বোর্ডের প্রধান সদস্য উইম ওয়েন্ডার্স মন্তব্য করেন, সিনেমা ও রাজনীতির পরস্পরের থেকে বিচ্যুত থাকা উচিত। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে লেখিকা ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি বোর্ডের সদস্যপদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। অস্কার মঞ্চে অবশ্য ওয়েন্ডার্সের এহেন মনোভাবের সরাসরি একশো আশি ডিগ্রি বিপরীতে হাঁটল হলিউড। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সঞ্চালক কোনান ও’ব্রায়েনের সতর্কবার্তা ছিল, আজকের রাত কিন্তু রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে! ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হতে অপেক্ষা করতে হল না বেশিক্ষণ
জেভিয়ার বারদেম যা পারেন, উইম ওয়েন্ডার্স তা পারেন না। অবশ্য হলিউডে যে প্রতিস্পর্ধী চোরাস্রোত জারি রয়েছে, বিগত বছরের বেশ ক-টি মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা, এমনকি সিরিজের নিরিখেও তা প্রমাণিত। অস্কার মঞ্চেও সেই স্পর্ধার উদযাপন সোচ্চারে জারি রইল।
শুরু থেকেই অবশ্য ইরান-যুদ্ধের আবহে নানান গুজব ও সতর্কতার মিশেলে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। ইরান খাস ক্যালিফোর্নিয়ায় অবধি ড্রোন-হামলা করতে পারে বলে, খোদ এফবিআইয়ের তরফেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। অবশ্য শেষাবধি তেমন কিছুই ঘটেনি। তবু মার্কিনকুলনায়ক ট্রাম্প ও বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে এই অনুষ্ঠানে সোচ্চার প্রতিবাদ জারি রইল। সদ্যসমাপ্ত বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্যোক্তা ও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক উইম ওয়েন্ডার্সকে এ যেন সরাসরি বার্তা হলিউডের, “সিনেমা ও রাজনীতি পরস্পরের একান্ত সম্পূরক।”
কিছুদিন আগেই বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব শুরুর প্রাক-মুহূর্তে সেই উৎসবের জুরি বোর্ডের প্রধান সদস্য উইম ওয়েন্ডার্স মন্তব্য করেন, সিনেমা ও রাজনীতির পরস্পরের থেকে বিচ্যুত থাকা উচিত। মূলত প্যালেস্তাইন সংকট ও গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে, উৎসব চলাকালীন চলচ্চিত্রশিল্পী ও কলাকুশলীরা যাতে প্রকাশ্যে কোনও অবস্থান না নেন, এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সেদিকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছিলেন। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে লেখিকা ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি বোর্ডের সদস্যপদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।
অস্কার মঞ্চে অবশ্য ওয়েন্ডার্সের এহেন মনোভাবের সরাসরি একশো আশি ডিগ্রি বিপরীতে হাঁটল হলিউড।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সঞ্চালক কোনান ও’ব্রায়েনের সতর্কবার্তা ছিল, আজকের রাত কিন্তু রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে! ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হতে অপেক্ষা করতে হল না বেশিক্ষণ।
অভিনেতা জেভিয়ার বারদেমের বক্তব্য নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা উঠে আসছে। ভারতীয় অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস ও অস্কার-বিজয়ী অভিনেতা জেভিয়ার বারদেম জুটি বেঁধে ৯৮তম অস্কার পুরস্কারের মঞ্চে ‘সেরা আন্তর্জাতিক ছবি’র বিজেতার নাম ঘোষণা করতে আসেন। সেই ঘোষণার মুহূর্তেই সরাসরি বারদেম বলে ওঠেন,
আমরা যুদ্ধ চাই না! আমাদের অবস্থান মুক্ত প্যালেস্তাইনের সপক্ষে!

মুহুর্মুহু করতালিতে প্রেক্ষাগৃহ ফেটে পড়তে থাকে। উপস্থিত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন কোন দিকে, তা বুঝে নিতে কারও অসুবিধে হয় না। যদিও হিন্দ রজাব নয়, ‘সেরা আন্তর্জাতিক ছবি’র অস্কার শিরোপা জিতে নেয় সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু। পুরস্কার নিতে উঠে নরউইজীয় পরিচালক বলেন,
সকল প্রাপ্তবয়স্কেরা আদতে ভবিষ্যৎ শৈশবের প্রতি দায়বদ্ধ। এ ধারণা যাঁদের নেই, আসুন আমরা সেই সব রাষ্ট্রনেতাদের নির্বাচন করা বন্ধ করি।

বারদেমের প্রতিবাদ আজ নতুন নয়। অস্কার অনুষ্ঠান-পরবর্তীতে ভাইরাল হওয়া একটি পুরনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ২০০৩ সালে ইরাক-যুদ্ধ বিরোধী মিছিলেও যুবক বারদেম অংশ নিয়েছিলেন। আজ অস্কার-মঞ্চেও তাঁর পোশাকের উপর, বুকপকেটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রইল যুদ্ধবিরোধী শ্লোগান। বারদেমের সঙ্গে একইভাবে অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বক্তব্য উত্থাপন জারি রাখেন সঞ্চালক কোনান ও’ব্রায়েন। একসময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, “২০১২র পর এই প্রথম কোনও ব্রিটিশ অভিনেতা বা অভিনেত্রী এবারের উৎসবে সেরা অভিনেতা বা অভিনেত্রীর মুকুটজয়ের দৌড়ে নেই,” পরক্ষণেই তাঁর স্বগতোক্তি, “তাতে কী! অন্তত ওদেশে তো শিশু-নিপীড়ক সেলিব্রিটিদের গ্রেপ্তার করা হয়!” এই ইঙ্গিত যে সরাসরি এপস্টাইন-কেলেঙ্কারি ও তাতে নাম জড়ানোর কারণে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রাক্তন সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে গ্রেপ্তারের ঘটনার অভিমুখেই, তা বুঝতে বিদগ্ধ হওয়ার দরকার পড়ে না।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও সরাসরি নিশানা করতে ছাড়েননি আরেক পুরষ্কার-ঘোষক জিমি কিমেল। সেরা তথ্যচিত্রের পুরষ্কার দিতে উঠে জিমি বলেন,
আমাদের সৌভাগ্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমন অসংখ্য চলচ্চিত্র পরিচালক ও নির্ভীক শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও সত্য-উদ্ঘাটনের কাজে রত। আবার এমনও অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের কাজ হোয়াইট হাউজে, সবুজ ঘাস-গালিচার উপর ঘুরে বেড়ানো ও নতুন আসা ডিজাইনার জুতোগুলি নিজের পায়ে পরে যাচাই করে দেখা!
ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও তাঁকে কেন্দ্র করে নির্মিত, সদ্য-মুক্তিপ্রাপ্ত তথ্যচিত্র মেলানিয়া-র প্রতিই যে কিমেলের এই স্পষ্ট ইঙ্গিত, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু কৌতুকশিল্পী কিমেল এখানেই থামেননি। এরপরেও তিনি বলেছেন, “এই যে লোকটার স্ত্রীকে এই অনুষ্ঠান-মঞ্চে মনোনয়ন দেওয়া হল না, লোকটা আবার রাগ করবে না তো?”

মিস্টার নোবডি এগেনস্ট পুতিন, এবারের অস্কার-মঞ্চে সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কারে এই ছবিটি সম্মানিত। পুরস্কার গ্রহণের সময় পরিচালক স্মরণ করিয়ে দেন—
যখন প্রকাশ্য রাস্তায় প্রতিবাদী কণ্ঠকে হত্যা করা হয়, আমরা নিশ্চুপ থাকি, যখন বৃহৎ পুঁজির নিয়ন্ত্রকেরা সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়, আমরা প্রতিবাদ করি না, বরং সেই বিকিয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের প্রচারকেই গলাধঃকরণ করি— এমন প্রত্যেক সময়ে আমাদের একটা নীতিগত অবস্থান নেওয়ার দায় থেকে যায়। আমরা ভুলে যাই, একজন ‘নোবডি’ বা ‘না-মানুষ’ও সেই সাধারণ, বোধগম্য ধারণাটির চেয়ে আদতে অনেকগুণে বেশি শক্তিশালী!

এবং অবশ্যই ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার। এক বছর আগে ছবিটি যখন প্রথম দেখেছিলাম, হলিউডি অ্যাকশন ও তেতো কমেডির আড়ালেও যে এমন সরাসরিভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া যেতে পারে, দেওয়া যায়— সে-কথাতেই বিস্ময় জেগেছিল। চলতি বছরে ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার জিতে নিয়েছে সেরা ছবি, সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্য-সহ মোট ছয়টি বিভাগের অস্কার পুরষ্কার। অভিবাসন, পরিযান, নাগরিকত্ব, জাতিবিদ্বেষ— উগ্র মার্কিন রাজনীতির সমকালীন প্রতিটি বিষয়কে এই ছবি ছুঁয়ে গিয়েছে চূড়ান্ত তীক্ষ্ণতায়। অনমনীয় ভঙ্গিতে সেগুলির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। পুরস্কার নিতে উঠে ছবির পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসনের তাই স্পষ্ট স্বীকারোক্তি—
এই ছবিটি আমি আমার ছেলেমেয়েদের জন্য বানিয়েছি। আমি তাদেরকে খোলাখুলি দেখাতে চেয়েছিলাম কী জঞ্জাল আমরা তাদের জন্য ফেলে যাচ্ছি। আশা করব তারা সেই জঞ্জাল পরিষ্কার করতে সফল হবে।

একাধিক মঞ্চে সারা বছর ধরেই ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার ছবিটি সম্মানিত হয়ে চলেছে। হয়তো এই ছবির এমন স্বীকৃতিই প্রমাণ করে দেয়, বারদেম বনাম ওয়েন্ডার্স দ্বৈরথে এখনও গড়পড়তা শিল্পীকুল বারদেম তথা শিল্পে রাজনীতির সরাসরি অনুপ্রবেশেরই সপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। অ্যাকশন ছবির পরিচিত মুখ ফ্লোরেন্স পুঘ থেকে শুরু করে ডিজনির ‘স্নো হোয়াইট’ র্যাচেল জেগলার, অথবা শার্লক-খ্যাত বেনেডিক্ট কুম্বারব্যাচ— মুক্ত প্যালেস্তাইনের সপক্ষে এঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন সময়ে সরব থেকেছেন। অস্কার মঞ্চেও এই প্রতিস্পর্ধী চোরাস্রোত অক্ষুণ্ন রইল। ষষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা হিসেবে ‘সেরা অভিনেতা’র পুরস্কার জিতে নিলেন মাইকেল বি জর্ডন। এমনকি প্রথম মহিলা, ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ কুশলী হিসেবে ‘সেরা সিনেমাটোগ্রাফি’র পুরস্কারে সম্মানিত হলেন অটাম ডুরাল্ড আর্কাপো।
পরিস্থিতি কি তবে আশার আলো দেখায়? মার্কিনি পুঁজিবাদ ছিল, আছে, থাকবে। এই বাস্তবকে অস্বীকার চলে না। কোনওবারের পুরস্কার অনুষ্ঠান এমন মাত্রায় রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে বলেই সে-দেশের জনমানসে অথবা তাবৎ শিল্পীকুলেরই মতাদর্শ-চিন্তায় বিরাট বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসে গেছে বলে মনে করছি না। অর্থের দৈত্যের সঙ্গে লড়াইটা যে কেবল কঠিন তাই নয়, রীতিমতো দীর্ঘমেয়াদিও বটে। তবু এমন এক দুঃসহ, ডিসটোপিয়ান সময়ে দাঁড়িয়েও এমন একেকটি অনুষ্ঠান, অনুষ্ঠান-চলাকালীন এমন একেকটি মুহূর্ত, আশার জন্ম দেয়। রাত ভোর হতে দেরি আছে অনেক। তবু রাত শেষে ভোর হয়, এই আশ্বাসবাণীটুকুই হয়তো মৃদুস্বরে অনুরণিত হয় কোথাও।
*মতামত ব্যক্তিগত

