সুজান ওয়াটকিনস
ট্রাম্পের কাজকর্ম ও কথাবার্তা দিয়ে যখন তাঁর বিচার করা হবে, তখন এই প্রশ্ন আরও জোরেসোরে হাজির করার একটা সুযোগ থাকছে— ওয়াশিংটনের বিশ্ব-হেজিমনির জন্য তিনি ঠিক কতটা কার্যকর? মূল বিষয়গুলিতে, বিশেষ করে চিনের ক্ষেত্রে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দিকনির্দেশনা এখনও স্পষ্ট নয়— এই বাস্তবতা স্বীকার করে এই প্রবন্ধ একটি প্রাথমিক পর্যালোচনা করার চেষ্টা করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার চারটি প্রধান ক্ষেত্রের— লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া— ভূ-অবস্থান অনুযায়ী রেকর্ড যাচাই করার উদ্দেশ্যে তৈরি, কোনও প্রাথমিক নির্দেশনা পাওয়া যায় কিনা তা দেখার জন্য, এবং বিশ্বাস রাখে যে ভবিষ্যতের গবেষকরা এতে সমালোচনা ও সংশোধন আনবেন
২০১৮ সালে ডিলান রাইলির What Is Trump? প্রবন্ধে ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আমেরিকার শাসনব্যবস্থার জন্য অকার্যকর উপাদান বলা হয়েছিল।[1] মূলত আর্থিক উদ্ধার প্যাকেজ এবং গ্রেট রিসেশন মোকাবিলায় মৃদুভাষী ডেমোক্র্যাটদের ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে জনরোষের কারণে রিয়েল-এস্টেটের অন্ধকার জগৎ এবং বিনোদন শিল্পের এক সংকর উৎপাদন হিসেবে তাঁর উত্থান ঘটে। রাইলির যুক্তি ছিল, ট্রাম্পকে সাধারণ কোনও রাজনৈতিক ক্যাটেগরির মধ্যে— যেমন কর্তৃত্ববাদী, পপুলিস্ট, ফ্যাসিস্ট বা আধা-ফ্যাসিস্ট— ফেলে বোঝার চেষ্টা করা বিভ্রান্তিকর হবে। ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ নিয়ে গবেষণার সুবাদে তিনি এই বিষয়ে বেশ দৃঢ় ছিলেন। বরং ট্রাম্পকে বোঝা যেতে পারে শাসনের তিনটি ভিন্ন ‘রূপ’-এর এক উদ্ভট সংমিশ্রণ হিসেবে— যেভাবে ম্যাক্স ওয়েবার সংজ্ঞায়িত করেছিলেন— ফেডারেল আমলাতন্ত্রের ভেতরে যেন এক বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। একদিকে এক সম্ভাব্য ক্যারিশম্যাটিক নেতা, যিনি ব্যক্তিনির্ভর ও নব্য-পিতৃতান্ত্রিক ভঙ্গিতে একটি আইন-যুক্তিসম্মত রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসে পড়েছেন; অন্যদিকে সেই রাষ্ট্রটি আবার একটি গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে অবস্থিত— এই সংমিশ্রণের মধ্যেই বহু বিরোধ নিহিত ছিল। প্রশাসনের অসঙ্গতি ছিল কাঠামোগত। লুম্পেন মিলিওনেয়ার এবং অতি-ডানপন্থী উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের যে ছোট ও অনভিজ্ঞ গোষ্ঠী ট্রাম্পের চারপাশে থাকত, তা ফেডারেল প্রশাসনিক যন্ত্র চালানোর জন্য খুবই অপ্রতুল; বরং সেই প্রশাসনযন্ত্র নিজেই গর্বের সঙ্গে জানাত যে তারা ট্রাম্পের কর্মসূচি আটকে দিচ্ছে।[2] চিনের উপর শুল্ক আরোপ এবং ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান— এর সঙ্গে দেশের ভেতরে করছাড়, ভোটারদের ডোল এবং ডানপন্থী বিচারপতি নিয়োগ— এসব ছাড়া ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারেনি।
খুব কম মানুষই তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদকালকে অকার্যকর বলবে। বিদেশে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ প্রতিষ্ঠানের ওপর বোমা বর্ষণ করেছে, ইয়েমেনে গোলাবর্ষণ করেছে, ক্যারিবীয় সাগরে ডজনখানেক বা তারও বেশি নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে, কারাকাসে বোমাবর্ষণ করেছে, ভেনেজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করেছে, তেলের ট্যাঙ্কার ছিনতাই করেছে, সিরিয়া, সোমালিয়া এবং নাইজেরিয়ায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, ইরান ও কিউবার ওপর অবরোধ আরোপ করেছে এবং উভয় দেশেই শাসক পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছে। আর এই লেখা লেখার সময়ে, ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
দেশের ভেতরে, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) এজেন্সিকে সম্প্রসারিত করে এক ধরনের যুদ্ধবাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্টের নীতির বিরোধীদের গুলি করে মেরে দিচ্ছে। ১৯৬৫ সালে যেমন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন, ট্রাম্পও তেমনই করেছেন— কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত উদ্দেশ্যে। তখন দক্ষিণে বর্ণবৈষম্য ভাঙার জন্য তা করা হয়েছিল; আর এখন ICE লাতিনো শ্রমিকদের অ্যাডহক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে উদারপন্থী শহরগুলিকে আবারও এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দুই.
কিন্তু এই সব কিছু আমেরিকার শাসনের পক্ষে কতটা প্রয়োজনীয়? মোটামুটি বলতে গেলে, এগুলিকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। ১৯৪৫ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল— প্রথমত, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা ও রক্ষা করা; এবং দ্বিতীয়ত, সেই ব্যবস্থার ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্বার্থ সম্প্রসারিত করা।[3] প্রথম অর্ধশতকে, যাত্রা কিছুটা কঠিন হলেও, এই দুই ক্ষেত্রেই আমেরিকার শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অভিনন্দন জানাতে পারে। সোভিয়েত ব্লকের পরাজয়, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের বিশ্বায়ন— যা যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ঋণের সমুদ্রে ভাসছিল, এবং সব বড় শক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন এক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা— যাকে এক অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষক ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ নামে অলঙ্কৃত করেছিলেন। এই পথ চলতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কয়েকটি অতিরিক্ত দায়িত্বও এসে পড়েছিল। এর মধ্যে ধরা যায় ইজরায়েলের প্রতি প্রতিশ্রুতি, যা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঘাড়ে কিছু বাড়তি দায়িত্ব চাপায়। কিন্তু একটি সুসজ্জিত রাজনৈতিক-বৌদ্ধিক পরিকাঠামো-সহ এক সামরিক মহাশক্তির পক্ষে এইসব দায়িত্ব সহজেই সামলানো সম্ভব ছিল।
কিন্তু ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই বিপুল সাফল্যগুলিই কিছু অনভিপ্রেত ফলের জন্ম দিয়েছে। একদিকে চিনের উত্থান— এক বিশাল এবং সম্ভবত দুর্ভেদ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তঃস্থ অঞ্চলগুলির অবক্ষয়— বিশেষ করে আপার মিডওয়েস্টের প্রাক্তন শিল্পাঞ্চলগুলি, যেখানে শিল্পীয় শ্রমিকশ্রেণি বাস করত, এবং যা ক্রমহ্রসমান বৃদ্ধির হার, স্থবির মজুরি, ক্রমবর্ধমান অসুস্থতা ও মৃত্যুহার-সংক্রান্ত সমস্যা, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার খরচ এবং তীব্রতর বৈষম্যের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছে।[4] পরে, ডানপন্থী আমেরিকান রাজনৈতিক আলোচনায় এই দুই ঘটনাকে একসূত্রে বাঁধা হয় এই স্লোগানে— ‘চিন আমাদের চাকরি চুরি করেছে’। এতে উৎপাদন শিল্পকে বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার পেছনে কর্পোরেট বোর্ড এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থই যে ছিল প্রধান দায়ী, সেই সত্যকে সুবিধাজনকভাবে আড়াল করা হয়।
এই দ্বৈত সংকট— যা সবচেয়ে ভালোভাবে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়, আর সবচেয়ে খারাপভাবে বলতে গেলে তার অবক্ষয়ের সূচনার— আরও একজোড়া নতুন অপরিহার্যতার জন্ম দেয়: একদিকে দেশের ভেতরে শ্রমজীবী মানুষের অসন্তোষের নিচে একটি ভিত্তি তৈরি করা, এবং অন্যদিকে চিনের উত্থান সত্ত্বেও— বা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই— যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য বজায় রাখা।
ট্রাম্পের অকার্যকর প্রথম মেয়াদ এই দ্বৈত সংকটেরই একটি লক্ষণ। এবং তার সঙ্গে এই সংকট সমাধানের একটি অতি-দক্ষিণপন্থী ব্যর্থ প্রচেষ্টাও। বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি মূল নীতি চালিয়ে গেছিল এবং তাদের আরও তীব্র করেছিল— ইরানের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা আরোপ; গাজায় ইজরায়েলের নির্যাতনকে সমর্থন; চিনের জন্য উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপের উপর অবরোধ; এবং তথাকথিত “মধ্যবিত্তের জন্য বিদেশনীতি”— যা আসলে ট্রাম্পিয়ান রূপকরণ অনুসরণ করে শ্রমজীবী শ্রেণির জন্য সঙ্কেত। এগুলোর সঙ্গে বাইডেন কিছু নিজস্ব স্বাক্ষর যুক্ত করেছিলেন— যেমন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের ন্যাটো-প্রতিরক্ষার জয়গাথা। ট্রাম্পের নীতিগুলোকে চুপচাপ বজায় রাখা— যদিও সবুজ ছায়াপথের আড়ালে, যার মূল্য এখনও হিসাব হতে বাকি[5]— সেই নীতিগুলোকে বৈধতা দিয়েছে।[6] সেই অর্থে বলা যায়, অন্তত ট্রাম্পের শাসনধারার অকার্যকারিতার মধ্যেও, আমেরিকার শাসক-ব্যবস্থার জন্য তিনি কিছু কার্যকরী ভূমিকা রেখেছেন। একটি স্বাভাবিক প্রশাসন, যেমনটি বাইডেন গর্বের সঙ্গে দাবি করেন, ট্রাম্প যে পথ আবিষ্কার করেছিলেন তা ধরে আরও স্থিরভাবে এগোতে পারত।
এখন ট্রাম্প যখন আবার ফিরে এসেছেন, তাঁর কাজকর্ম ও কথাবার্তা দিয়ে যখন তাঁর বিচার করা হবে, তখন এই প্রশ্ন আরও জোরেসোরে হাজির করার একটা সুযোগ থাকছে— ওয়াশিংটনের বিশ্ব-হেজিমনির জন্য, অর্থাৎ আমেরিকার দ্বৈত অপরিহার্যতা অগ্রসর করার ক্ষেত্রে তিনি ঠিক কতটা কার্যকর? কিছু নির্ণায়ক সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া শুরু হয়ে গেছে— যেমন, ট্রাম্প একটি নিয়মানুগ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার শেষের সূচক, নতুন এক শোষণমূলক বা অ-উদার প্রকারের রাজতন্ত্রের আগমনের সূচক, বা একটি দীর্ঘ বিলম্বিত বহু-মেরু যুগের উত্থান-নির্দেশক। এসব নিয়ে দাভোসে আলোচনাও হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ পত্রপত্রিকায় বিশ্লেষণও প্রকাশিত হয়েছে।[7] কিন্তু মূল বিষয়গুলিতে, বিশেষ করে চিনের ক্ষেত্রে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দিকনির্দেশনা এখনও স্পষ্ট নয়— এই বাস্তবতা স্বীকার করে এই প্রবন্ধ একটি প্রাথমিক পর্যালোচনা করার চেষ্টা করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার চারটি প্রধান ক্ষেত্রের— লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া— ভূ-অবস্থান অনুযায়ী রেকর্ড যাচাই করার উদ্দেশ্যে তৈরি, কোনও প্রাথমিক নির্দেশনা পাওয়া যায় কিনা তা দেখার জন্য, এবং বিশ্বাস রাখে যে ভবিষ্যতের গবেষকরা এতে সমালোচনা ও সংশোধন আনবেন।

তিন.
তবে প্রথমে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে পঞ্চম বছরে ট্রাম্পের শাসনপদ্ধতির স্বতন্ত্র ধরনটি কীভাবে বদলেছে, সে বিষয়ে সংক্ষেপে একটু দেখা যাক। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সাংবাদিক মহলের গসিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, দু-পক্ষই ট্রাম্পের ক্ষমতার রহস্য খুঁজে বের করার জন্য তাঁর হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালীর দিকে নজর দিয়েছে। অনিবার্যভাবেই, একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা চরিত্রনির্ভর বিশ্লেষণই প্রাধান্য পায়— যাকে বলা যেতে পারে “ট্রাম্প হিমসেলফিজম”— যা মূলত সেই নব্য-পিতৃতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপরই দাঁড়িয়ে আছে, যার কথা রাইলি উল্লেখ করেছিলেন। ট্রাম্পের প্রদর্শনপ্রিয়তা ও ক্ষমতার দাপট দেখানোর প্রবণতা, অনিশ্চয়তাকেই শক্তি বলে মনে করার বিশ্বাস, নিয়মকানুনের প্রতি তাঁর অস্থিরতা এবং দ্রুত ফল পাওয়ার প্রতি তাঁর ঝোঁক— এই সব বৈশিষ্ট্যেরই প্রভাব পড়ছে বাস্তব জগতে; শুল্কনীতি থেকে শুরু করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ— সব ক্ষেত্রেই। তাঁর এই পদ্ধতিকে প্রায়ই লেনদেনভিত্তিক বলা হয়; কিন্তু আসলে তো সেটাই রাজনীতির স্বাভাবিক ধরন। বরং বলা যায়, তিনি অর্থনৈতিক জবরদস্তি বেশি পছন্দ করেন— ক্ষমতার প্রকাশ্য প্রদর্শন, যা সমাজবিজ্ঞানী চার্লস টিলি-র সেই ধারণার কথা মনে করিয়ে দেয় যেখানে তিনি রাষ্ট্রের সহিংসতাকে প্রোটেকশন র্যাকেট-এর মডেলের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।[8]
তবে “ট্রাম্প হিমসেলফিজম” অতিরঞ্জিতও হতে পারে। নির্বাহী প্রশাসনের অনেক কাজই তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই চলতে থাকে; বলা হয়, তাঁর সহকারীরাই নাকি তাঁকে ব্যস্ত রাখতে ইস্ট উইং-এর আড়ম্বরপূর্ণ কর্মসূচিগুলো উৎসাহিত করেন, যাতে তাঁরা নিজেদের নীতি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিতে পারেন— কারণ ট্রাম্পের আসল আগ্রহ শুধু কথা বলা। তার উপর, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিশ্লেষণের একটি ঝুঁকিও আছে: এতে ট্রাম্পের বক্তব্যকে অনেক সময় তিনি নিজে যতটা গুরুত্ব দেন, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলা হয়।
আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি, যা রাইলির বিশ্লেষণের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াটির উপরই নজর দেয়। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর গবেষকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রক্রিয়া একটি টেকনোক্র্যাটিক মডেল থেকে সরে এসে তারা যাকে দলাদলি-প্রবণ মডেল বলে, তার দিকে ঝুঁকেছে।[9] তাঁর ‘রাজনৈতিক নির্বাসন’-এর বছরগুলিতে ডেমোক্র্যাটদের ধারাবাহিক পক্ষপাতদুষ্ট আইনি লড়াই নিশ্চিত করেছিল যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ও তাঁর অনুগত দলবল যখন আবার হোয়াইট হাউসে ফিরে আসবে, তখন তারা আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে আসবে। তাদের হাতে তখন ছিল মার্কিন রক্ষণশীলতার বৌদ্ধিক ও মানবসম্পদ, এবং ফেডারেল রাষ্ট্র কীভাবে চালাতে হবে সে বিষয়ে হেরিটেজ ফাউন্ডেশন-এর একটি কার্যত পাঠ্যপুস্তক।
দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন কেন্দ্রীভূত করা হয় কঠোর ডানপন্থী এক প্রায় যান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব স্টিফেন মিলার-এর হাতে— যাকে দেশীয় বিষয়ে কার্যত ট্রাম্পের প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। প্রথম পাঁচ মাসেই জারি করা শত শত ওক-বিরোধী ও প্যালেস্তাইন-বিরোধী নির্বাহী আদেশের খসড়া তিনিই আগে থেকে প্রস্তুত করেছিলেন। আরও উদ্বেগজনকভাবে, মিলার হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কাঠামো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। এটি তৈরি করেছিলেন জুনিয়র বুশ এবং লালনপালন করেছিলেন বারাক ওবামা। মিলার এটিকে এক ধরনের আধা-সামরিক বাহিনীতে পরিণত করেছেন যাকে বহিষ্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।[10]
এদিকে বিদেশনীতি এর মধ্যে বিকেন্দ্রীভূত ও খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের দল ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এনএসসি) এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট-এর শীর্ষ স্তরগুলো কার্যত ভেঙে ফেলার কাজে নেমে পড়েছে, অর্থাৎ ‘আইন ও যুক্তিসম্মত’ আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শীর্ষ কাঠামোটিই তারা দুর্বল করে দিয়েছে। এর ফলে এনএসসি আর আগের মতো সামরিক, রাজনৈতিক এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন মতামত সংগ্রহ ও বাছাই করে কমান্ডার ইন চিফের সামনে সুস্পষ্ট বিকল্প উপস্থাপনের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। তার বদলে, বিভিন্ন গোষ্ঠী সরাসরি প্রেসিডেন্টের অনুমোদন পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে।
ফলস্বরূপ, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এক ধরনের ‘কৌশলগত কোলাহল’ তৈরি হয়েছে— হঠাৎ হঠাৎ তৎপরতার ঝড়, তার পরেই আবার অদ্ভুত বিলম্ব; পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও একাধিক পরিকল্পনা; আর এর ওপর ট্রাম্পের হঠাৎ করে বলা মন্তব্য বা মাঝরাতের টুইট যেন বিভ্রান্তিকে আরও চূড়ান্ত করে তুলেছে। আর তখন পর্দার আড়ালে কোন পথ নেওয়া হবে তা নিয়ে চলছে তীব্র লড়াই।[11]
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বিদেশনীতি নিয়ে তিনটি পরস্পরবিরোধী মতাদর্শ প্রেসিডেন্টের সমর্থন পাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মাগা ‘রেস্ট্রেইনার’রা— যাদের আমেরিকা ফার্স্টার বা ‘কনসলিডেটর’ও বলা হয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এরা সবচেয়ে প্রান্তিক। এদের মত, যুক্তরাষ্ট্রের আর সারা পৃথিবী চালানোর চেষ্টা করা উচিত নয়; বরং নিজের ঘরোয়া সমস্যার দিকে মন দেওয়া দরকার, খুব বেশি হলে দক্ষিণ সীমান্ত আর তার সঙ্গে সম্পর্কিত লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দিকে তাকানো যেতে পারে। ক্যাবিনেটে এদের প্রতিনিধি জেডি ভান্স। দ্বিতীয় গোষ্ঠী হল ‘প্রায়োরিটাইজার’রা— অর্থাৎ চিন-বিরোধী কট্টরপন্থী বা China hawks। তাদের মতে, ওয়াশিংটনের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত চিন, কারণ তারাই সবচেয়ে গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বী। সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে তার অতিরিক্ত বিস্তার কিছুটা গুটিয়ে নেওয়া। এই মতের প্রতিনিধিত্ব করত পেন্টাগনের নীতিনির্ধারণ বিভাগ। পিট হেগসেথ এদের নেতা হলেও তাঁর ডেপুটি এলব্রিজ কোলবি তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর সংগঠক। সবশেষ হল ‘প্রাইমাসিস্ট’রা— অর্থাৎ আন্তর্জাতিকতাবাদীরা— যারা ঐতিহ্যগত মার্কিন বিদেশনীতি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। তারাও চিনের গুরুত্ব স্বীকার করে, কিন্তু তাদের যুক্তি হল: বেইজিংয়ের মোকাবিলা করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার বিশ্বব্যাপী প্রাধান্য বজায় রাখতেই হবে, এবং কোনও অঞ্চলেই নিজেদের দুর্বল দেখানো চলবে না। তারা মনে করে, মিত্রদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দক্ষভাবে ব্যবহার করলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান অবস্থান বজায় রাখা কঠিন নয়। এই গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি স্টেট ডিপার্টমেন্ট, যেখানে তাদের প্রধান মুখ মার্কো রুবিও। একই সঙ্গে তারা বাইরে থেকেও রাজনৈতিক সমর্থন পায়— বিশেষত ইজরায়েল এবং ইউরোপের বড় রাষ্ট্রগুলো— যাদের ‘চিন-প্রথম’ নীতির সমর্থকেরা প্রান্তিক করে দেওয়ার হুমকি দেয়— তাদের কাছ থেকে।
এর সঙ্গে আমাদের ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন ও রাতের আড্ডাসঙ্গীদেরও ধরতে হবে, যাদের সম্পর্কে বলা হয় তারা হোয়াইট হাউসের ভেতরেই ‘তাঁর নিজস্ব এক ছোট সুপারস্ট্রাকচার’ গড়ে তুলেছে।[12] এঁদের মধ্যে রয়েছেন স্টিভ উইটকফ, জারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত মন্ত্রণাদাতা রোনাল্ড লডার। আরও আছেন একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্লোরিডাভিত্তিক জায়নবাদী ব্যবসায়ী, যাঁদের উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। আছে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর বিবরণে অনুপস্থিত থাকা একটি সুসংগঠিত ইজরায়েলপন্থী গোষ্ঠী, যার মধ্যে স্টিফেন মিলারও অন্তর্ভুক্ত; পাশাপাশি আছেন সেই সব আস্থাভাজন ব্যক্তিরা, যাঁদের চিনে বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এঁরাও ট্রাম্পের কাছে নিজেদের পছন্দের নীতিপথকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন, যা তাঁকে আকৃষ্ট করবে— এবং, এক সংশয়বাদীর ভাষায়, বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে তাঁর ক্রমবর্ধমান কিন্তু ভুল জায়গায় স্থাপিত আত্মবিশ্বাসকেও তুষ্ট করবে।[13]

চার.
এই ‘দলাদলি-প্রবণ মডেল’-এর একটি সুবিধা হল, ট্রাম্পের বিদেশনীতি কেন কখনও এগোয়, কখনও থমকে যায়— এটি তার একটি ব্যাখ্যা দেয়। যেমন, ইরান প্রসঙ্গটি। ২০২৫ সালের মার্চে, যখন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইজরায়েলের হাতে হেজবোল্লার নেতৃত্ব ধ্বংস এবং বাশার আল-আসাদ-এর পতনে উজ্জীবিত হয়ে ওয়াশিংটনকে চাপ দিচ্ছিলেন যে হুথিদের বিরুদ্ধে যে সামরিক শক্তি জড়ো করা হয়েছে, তা এবার ‘সাপের মাথা’, অর্থাৎ তেহরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হোক— তখন ট্রাম্প মাগা ‘রেস্ট্রেইনার’ এবং চিন-প্রথম গোষ্ঠীর পক্ষেই দাঁড়ান। এই ‘রেস্ট্রেইনার’দের মধ্যে ছিলেন ভান্স, কার্লসন, ব্যানন এবং টেলর গ্রিন; আর চিন-প্রথম গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছিল পেন্টাগন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। তাদের যুক্তি ছিল— ইরানে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ঠিক হবে না; বরং অর্থনৈতিক চাপে ফেলা এবং কঠোর পারমাণবিক বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়াই ভালো। ফলে ইজরায়েলকে তখন তার আক্রমণ স্থগিত রাখতে বলা হয়। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান ক্রমশ কঠোর হয়ে ওঠে— সম্ভবত ইজরায়েলের চাপেই— এবং তারা দাবি তোলে যে সব ধরনের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। জুনের শুরুতে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইজরায়েলের আক্রমণে সম্মতি দেন; এবং সেই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে তিনি ওবামার আমলের ফোর্ডো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা আবার বের করে আনেন।
এটি ছিল জায়নবাদী এবং ‘প্রাইমাসিস্ট’ গোষ্ঠীর জয়, আর মাগা ‘রেস্ট্রেইনার’দের জন্য এক বড় ধাক্কা— যার মধ্যে ছিলেন তুলসি গাবার্ড। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না— যা সবাই জানত— সে-কথা বলার জন্য ট্রাম্প তাঁকে তীব্রভাবে আক্রমণও করেন। শেষ পর্যন্ত রেস্ট্রেইনারদের অবস্থান রক্ষা করার দায় পড়ে ভান্সের ওপর; তিনি ট্রাম্পের তথাকথিত নিখুঁত ‘সার্জিক্যাল হামলা’-র তুলনা করেন বুশ ও ওবামার দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরন্তন যুদ্ধ’-এর সঙ্গে।
একইভাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ক্যারিবীয় অভিযানের ঘটনাটিকেও এই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া যায়। এখানে মিলারের অ্যান্টি-নার্কো কৌশল ও ‘রেস্ট্রেইনার’দের সঙ্গে রুবিওর ‘প্রাইমাসিস্ট’দের এক ধরনের জোট দেখা যায়। তারা ‘প্রায়োরিটাইজার’দের প্রতিরোধ অতিক্রম করে কারাকাসের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণ চালানোর যুক্তি দেয়— এই দাবি তুলে যে এর ফলে চিনের ভেনেজুয়েলার তেলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করা যাবে। রুবিও নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন মাদুরোকে অপহরণ করানোর মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পকে একটি বড় সাফল্য এনে দিয়েছেন— এবং একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট-প্রার্থিতা নিয়ে লড়াইয়ে ভান্সকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যও তাঁর ছিল। কিন্তু এরপর কী করা হবে সে বিষয়ে কোনও ঐকমত্য তৈরি হয়নি, ফলে ভেনেজুয়েলা নীতি এক ধরনের অচলাবস্থায় ঢুকে পড়েছে।
একইভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ভেতরে ভেতরে মতবিরোধ দেখা যায়। ‘রেস্ট্রেইনার’ (ভান্স), ‘প্রায়োরিটাইজার’ (কোলবি) এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা (উইটকফ, কুশনার) ট্রাম্পের দ্রুত একটি চুক্তি করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছিল। অন্যদিকে ন্যাটোপন্থী ‘প্রাইমাসিস্ট’রা— রুবিও, যিনি ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলির ও জেলেনস্কির সমর্থন পেয়েছিলেন, এবং কংগ্রেসের কট্টরপন্থী সদস্যরা যেমন লিন্ডসি গ্রাহাম— তাঁরা যে কোনও সমঝোতা বিলম্বিত করার জন্য লবি করছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, ইউক্রেনের জন্য ন্যাটোর আর্টিকেল ফাইভের মতো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং দূরপাল্লার অস্ত্র সরবরাহ করতে হবে। একজন মার্কিন দূতের ভাষায়, লক্ষ্য ছিল— “উত্তেজনা বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা কমানো।”[14] ২০২৫ সালের গ্রীষ্মের শুরুতে যখন পেন্টাগনের চিন-অগ্রাধিকারবাদীরা ইউক্রেনের জন্য মার্কিন অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে বলেন, তখন ট্রাম্প তা বাতিল করে দেন। সেই একই ধরন: উইটকফ রাশিয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতার খসড়া তৈরি করেন— যেমন ২০২৫ সালের শেষদিকে মিয়ামি বিচে তাঁর বাসভবনে রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান কিরিল দিমিত্রিয়েভের সঙ্গে তৈরি হওয়া ২৮ দফা পরিকল্পনা। কিন্তু ইউরোপীয় শক্তিগুলি দ্রুত সেই পরিকল্পনাটি জেলেনস্কির পক্ষে নতুন করে লিখে দেয়। ফলাফল— যুদ্ধ চলতেই থাকে। আর যুদ্ধ চলতে থাকাটাই আসলে প্রাইমাসিস্টদের জন্য কার্যত এক ধরনের বিজয়।
তবু এই ধরনের ‘পুলিশি বিশ্লেষণ’— মার্কস যেমন এর নাম দিয়েছিলেন— তারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এমনকি তা সঠিক হলেও। কারণ এই পদ্ধতি রাজনৈতিক ফলাফলকে প্রায়ই বৃহত্তর সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তির প্রেক্ষাপটে স্থাপন করার বদলে বন্ধ দরজার আড়ালের ষড়যন্ত্রের সরাসরি ফল হিসেবে মনে করে।[15] আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রকৃত অর্থ মূল্যায়ন করতে হলে কেবল নীতিনির্ধারকদের অভিপ্রায় নয়, তাদের কার্যকলাপকেও দেখতে হবে— যেগুলি বাস্তব বিশ্বের বিকাশের যে দ্বন্দ্বগুলি রয়েছে, বামপন্থী চিন্তার ধ্রুপদী ঐতিহ্যের ভাষায় যেগুলিকে বলা হয় বাস্তব বিকাশের অন্তর্নিহিত বিরোধ, তার ওপর প্রভাব ফেলে। এখানে কার্যকর রাজনৈতিক যুক্তিগুলির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তৈরি করতে গেলে দুটি পার্থক্যের কথা মনে করা উপযোগী হতে পারে—
প্রথমত, একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে যে ‘প্রধান দ্বন্দ্ব’ নিয়ন্ত্রণ করে— অর্থাৎ কোনও নির্দিষ্ট সময়ে যে নির্ধারক সংগ্রামটি কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে— তার সঙ্গে পাশাপাশি চলতে থাকা বহু গৌণ দ্বন্দ্বকে আলাদা করে দেখা।
দ্বিতীয়ত, সেই প্রধান দ্বন্দ্বের মধ্যেই যে দুই বিপরীত শক্তি বা ‘দিক’ পরস্পরের সঙ্গে সংগ্রামে যুক্ত থাকে, তাদের মধ্যে কোনটি বেশি সক্রিয় ও চালিকাশক্তি— অর্থাৎ কোনটি ‘প্রধান দিক’— তা নির্ধারণ করা।[16]
এই ধরনের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করলে লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ায় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপগুলোকে আমরা কীভাবে আরও স্পষ্ট করে বুঝতে পারি?

পাঁচ.
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হল— গত পঁচিশ বছরে কত বিপুল সংখ্যক রাষ্ট্র ওয়াশিংটন কনসেনসাসের নব্যউদারবাদী নীতির বিকল্প হিসেবে বামপন্থী পথ অনুসরণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হুগো শাভেজের ভেনেজুয়েলা, ইভো মোরালেসের বলিভিয়া, লুলার ব্রাজিল, কোরিয়ার ইকুয়েডর এবং নেস্টর কির্শনার-এর আর্জেন্টিনা। মহাদেশটির বিপ্লবী-গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, আন্দীয় অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংগ্রামী ঐতিহ্য এবং শহুরে শ্রমিকদের স্ব-সংগঠনের শক্তিকে ভিত্তি করে এই সরকারগুলি জল ও জমির বেসরকারিকরণ কিংবা সংকটজনিত কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে কল্যাণমূলক ব্যবস্থার বিস্তার, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি এবং সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কিছু সীমিত অগ্রগতিও সম্ভব হয়েছে।[17]
এই প্রক্রিয়াকে শক্তি জুগিয়েছিল সেই সময়কার পণ্যদ্রব্যের আন্তর্জাতিক চক্র, যা আবার অনেকটা ত্বরান্বিত হয়েছিল চিনের এক উচ্চ-প্রযুক্তি সম্পন্ন মেট্রোপলিটান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দ্রুত রূপান্তরের ফলে।
এই বামপন্থী উত্থান একই সঙ্গে কাস্ত্রোর কিউবাতে চলা বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র-সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষাকেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবার যুক্ত করেছিল— অর্থনৈতিক, বৌদ্ধিক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে তাকে নতুন প্রাণ দিয়েছিল।
প্রতিক্রিয়ায় দেখা দেয় নতুন, তীব্র ডানপন্থী শক্তির উত্থান। শুরুতে এর ভিত্তি ছিল খুবই সঙ্কীর্ণ— পুরনো শাসক অভিজাতদের মধ্যে— যেমন, কারাকাসের পূর্বাঞ্চলের ধনী পাড়া, বলিভিয়ার নিম্নভূমির কৃষি-ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, এবং ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জমিদারশ্রেণি ও গণমাধ্যম মালিকগোষ্ঠী। কিন্তু ২০১০-এর দশকে এই ডানপন্থী শক্তি তাদের ভিত্তি বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়। তারা সমর্থন পায় সেই ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত স্তরগুলির মধ্যে, যারা সাধারণ মানুষের সামাজিক অধিকার ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ ছিল; সেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, যাদের উচ্চাশা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সীমাবদ্ধতায় ভেঙে পড়েছিল; এবং ইভানজেলিক্যাল ধর্মীয় গির্জাগুলির মধ্যে, যাদের ধর্মপ্রচারকদের উগ্র কমিউনিজম-বিরোধী বক্তব্য তাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
লাতিন আমেরিকার এই উগ্র ডানপন্থীদের চরিত্র— যেমন বলসোনারো, মিলেই, বুকেলে, কাস্ট— ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উগ্র ডানপন্থীদের চেয়ে যথেষ্ট আলাদা।[18] এখানে অভিবাসন খুব বড় কোনও ইস্যু নয়; বরং নতুন নেতাদের অনেকে নিজেরাই ইতালীয় বা লেবানিজ অভিবাসীদের সন্তান। যখন বর্ণবাদ সামনে আসে, তা প্রধানত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। বরং, এদের চালিকাশক্তি হল বামপন্থার প্রতি এক গভীর ও স্বতঃস্ফূর্ত ঘৃণা।
এখানে প্রধান দ্বন্দ্বটি দাঁড়ায় একদিকে ওয়াশিংটন এবং স্থানীয় উগ্র ডানপন্থী শক্তিগুলি আর তাদের নিজ নিজ বুর্জোয়ারা, আর অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার অবশিষ্ট বামপন্থী রাষ্ট্র ও আন্দোলনগুলি। বলাই বাহুল্য, এই দুই ‘দিক’-এর মধ্যে প্রথমটিই গতিশীল ও শক্তিশালী।
এই শিবিরের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন লাতিন আমেরিকার উগ্র ডানপন্থীদের বিপুল আর্থিক সহায়তা দিয়ে শক্তিশালী করেছে— যেমন ২০২৫ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মিলেইকে সাহায্য করার জন্য মার্কিন করদাতাদের অর্থ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। ভেনেজুয়েলা ও কিউবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে তারা আরও কঠোর করেছে— যেখানে আগে ধীরে ধীরে চাপ বাড়ানোর নীতি ছিল, সেখানে এখন সরাসরি সরকার উৎখাতের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এক অর্থে এটিকে বলা যায় প্রতিবিপ্লবের মধ্যেই আরেক প্রতিবিপ্লব— যার অনুপ্রেরণা সরাসরি এসেছে বৃহত্তর মিয়ামিতে অবস্থিত তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি থেকে। যেখানে সমুদ্রতীরবর্তী প্রাসাদে ট্রাম্প, উইটকফ ও কুশনার থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলীয় টিভি ব্যবসায়ী এবং কিউবান নির্বাসিত মাফিয়া পর্যন্ত সবাই রয়েছে।[19] ট্রাম্পপন্থী ডানপন্থার অধীনে মার্কিন নীতির এই ‘ফ্লোরিডাকরণ’ যুক্ত হয়েছে আরও বিস্তৃত এক ধরনের ‘দক্ষিণি’ জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের সঙ্গে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণবাদ চালানোর যার নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে।
কিউবাই হল আসল পুরস্কার, এবং তা অর্জনের জন্য কোনও মূল্যই যেন যথেষ্ট নয়। দ্বীপটির ওপর অপরাধমূলক অবরোধ আরোপ, জ্বালানি সরবরাহ ছিনতাই, এমনকি কিউবান চিকিৎসকদের স্বাগত জানানো তৃতীয় দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা— সবই করা হচ্ছে কিউবার অর্জিত সামাজিক সাফল্যগুলো ধ্বংস করার জন্য, যদিও সেগুলি আমলাতান্ত্রিক জড়তার কারণে অনেক সময় সীমাবদ্ধ হয়েছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে একমাত্র কিউবাই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক ঘূর্ণিঝড় প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় গণভিত্তিক উন্নতির পথ দেখিয়েছে। ১৯৯১-৯৪ সালের সংকটের পরও দ্বীপটি পর্যটন শিল্পের বিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবা রপ্তানির মাধ্যমে কিছুটা সাফল্যের সঙ্গেই বিপ্লবের এই অর্জনগুলি রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল।
কিউবার নেতৃত্ব ২০১৬ সালে ওবামার ‘উন্মুক্ততার’ উদ্যোগে অনেকটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল— যা তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বছর, অর্থাৎ কার্যত বিদায়ের সময়ে চালু করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কিউবার শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা। এক অর্থে, সেই কৌশল কাজও করেছিল। হাভানা তখন ব্যাপকভাবে হোটেল নির্মাণ কর্মসূচি শুরু করে এবং ২০২১ সালে একটি কঠোর মুদ্রা সংস্কার চালু করে, যার ফলে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বেতন ও পেনশনের ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। পর্যটন তখনও নবজাত— একদিকে মহামারির আঘাত, অন্যদিকে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের কারণে পর্যটকেরা সেলফি পোস্ট করতে পারছিলেন না। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কিউবার অর্থনীতি ১১ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়— যা পশ্চিমি বিশ্বের গ্রেট রিসেশন-এর তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। ২০২৫ সালে অর্থনীতি আরও ৫ শতাংশ কমে যায়। ক্ষুধা আবার ফিরে এসেছে; বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্নতার সময় খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর ও চিকুনগুনিয়ার মতো মহামারিও ছড়াচ্ছে। শহরগুলোতে আবর্জনা জমে আছে— ময়লা বহনের ট্রাকে জ্বালানি নেই। একসময় কিউবার গর্ব ও আনন্দ ছিল যে স্কুলশিশুরা, আজ তারা রাস্তায় ভিক্ষা করছে।
গুজব হল, রাউল কাস্ত্রোর ছেলে— বা হয়তো নাতি— রুবিওর সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। রুবিও নাকি ডিসেম্বরের মধ্যে শাসন পরিবর্তনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন— যাকে বলা হচ্ছে প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের জন্য এই অঞ্চলে নতুন ব্যবস্থা গড়ার ‘নির্ধারক পরীক্ষা’।[20]

ছয়.
মধ্যপ্রাচ্যে, উন্নয়নের গতিপথ নিয়ে নানা ধরনের সংগ্রামের ভেতরেও বর্তমান পরিস্থিতিতে যে বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়ে তা হল ইজরায়েলের সামরিক সম্প্রসারণবাদ। একদিকে এটি একটি ঔপনিবেশিক শক্তির মতো স্থানীয় প্যালেস্তিনীয় জনগোষ্ঠীকে দমন করছে; অন্যদিকে এটি একটি আঞ্চলিক আধিপত্যশালী শক্তি হিসেবে একসময়কার শক্তিশালী জাতীয়-ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগত রাষ্ট্রের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে রূপান্তরিত করছে।[21]
এটি আসলে সাম্রাজ্যবাদী-ঔপনিবেশিক শক্তির ভেতরকার ভারসাম্যের একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ অন্তত ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ইজরায়েল ছিল তুলনামূলকভাবে এক অরক্ষিত বসতি-বিশেষ, যা প্রথমে ব্রিটিশদের এবং পরে আমেরিকান সুরক্ষার আড়ালে টিকে ছিল। তবে তেল আভিভের কার্যকর রাজনৈতিক যুক্তিটা বরাবরই ঔপনিবেশিক দখল ও সংহতকরণের। অর্থাৎ স্থানীয় বিদ্রোহকে দমন করা, আপস করতে রাজি এমন স্থানীয় নেতৃত্ব খুঁজে বের করা, এবং একই সঙ্গে আশপাশের সেই রাষ্ট্রগুলিকে দুর্বল করে দেওয়া— যারা তাদের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে— এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই তার মূল কৌশল।
যে-কোনও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডেই এই নীতি মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়নের জন্য অকার্যকর এবং ওয়াশিংটনের বৃহত্তর স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ এতে অতিরিক্ত সময় ও সামরিক শক্তি ব্যয় হয় এবং এর ফলে মুসলিমবিশ্বের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ফলও তৈরি হয়। সরকারি মার্কিন নীতির লক্ষ্য বরাবরই একটি ‘চূড়ান্ত সমাধান’— যেখানে প্যালেস্তিনীয়দের কোনও না কোনওভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা হবে এবং আরবরাষ্ট্রগুলি ইজরায়েলের সঙ্গে এক ধরনের সহাবস্থানের সমঝোতায় পৌঁছাবে। সেই ব্যবস্থায় ইজরায়েল পুরো অঞ্চলে তার পারমাণবিক ও সামরিক-গোয়েন্দা শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তুলনামূলকভাবে ‘স্বাভাবিক’ ভূমিকায় সরে যেতে পারবে। কিন্তু গত কুড়ি বছরে ইজরায়েলের বিপুল সম্পদবৃদ্ধির পেছনে থাকা শক্তির সমর্থনে ইজরায়েলপন্থী লবির মার্কিন কংগ্রেসে এবং ওয়াশিংটনের বিস্তৃত পরিসরে ব্যাপক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রকে এই প্রশ্নে কোনও বাস্তব বিচ্ছিন্নতা বা দূরত্ব তৈরি করতে দেয়নি।
তার উপর, ইজরায়েলের কৌশলগত পরিকল্পনাকারীদের কাছে এই ‘চূড়ান্ত সমাধান’ ধারণাটি বরাবরই অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। তাদের কল্পনায় রয়েছে— জর্ডন নদীর পূর্বতীরের অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত সীমানা-সহ একটি ইহুদি রাষ্ট্র; দক্ষিণ সিরিয়া ও লেবাননের কিছু অংশ পর্যন্ত তার সম্প্রসারণ; প্যালেস্তিনীয় জনগোষ্ঠীর অধিকাংশকে জর্ডনে বা তারও বাইরে বহিষ্কার করা; এবং অঞ্চলের বাকি বহু-সাংস্কৃতিক প্রজাতন্ত্রগুলিকে ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের ভিত্তিতে ভেঙে টুকরো করা— সুন্নি, শিয়া, আরব, দ্রুজ, আলাওয়ি, কুর্দ, তুর্কি, আজারি, পারসিক, আর্মেনীয়, বালুচ ইত্যাদি বিভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে। এর ফলে তৈরি হবে ছোট ছোট জাতিগত-ধর্মীয় রাষ্ট্রের এক জটিল জাল, যা হবে ইজরায়েলের নিজস্ব মডেলে— আর যেগুলির উপর সে থাকবে সর্বোচ্চ প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে, এবং একটিকে আরেকটির বিরুদ্ধে ব্যবহার করে নিজের আধিপত্য বজায় রাখবে।
বাস্তবে, এই দুই প্রশ্নে— প্যালেস্তিনীয় প্রতিরোধ এবং পার্শ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলি— আমেরিকার নীতি ঐতিহাসিকভাবে দুটি মেরুর মধ্যে দোদুল্যমান থেকেছে: একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ, অন্যদিকে ইজরায়েলের লক্ষ্য। জিমি কার্টারের আমলে মিশরকে অক্ষত রাখা হয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে বাধ্য করা হয় যাতে সে ১৯৬৭ সালে ইজরায়েলের প্যালেস্তিনীয় ভূখণ্ড দখলকে কার্যত মেনে নেয়। সিনিয়র বুশের সময় ইরাককে পরাজিত করা হয়, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং তার কুর্দ-অধ্যুষিত উত্তরাঞ্চল আলাদা করে দেওয়া হয়— যা ইজরায়েলের জন্য প্রভাব ও গোয়েন্দা তৎপরতার এক দৃঢ় ঘাঁটিতে পরিণত হয়। প্যালেস্তাইনের ‘শান্তি প্রক্রিয়া’ শুরু হয়, যা অসলোতে ক্লিন্টনের সময় সম্পন্ন হয়। তবে ইজরায়েলি আলোচকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এই চুক্তি ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের বসতি স্থাপনের প্রকল্পকে কোনওভাবেই সীমাবদ্ধ করবে না। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগের ঢল নামে, যার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আগত প্রায় দশ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত রুশ ইহুদির আগমন। জুনিয়র বুশের সময় ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী ইরাককে সম্পূর্ণভাবে দখল করে এবং ভেঙে ফেলে— এক ফোঁটা ইজরায়েলি রক্ত না ঝরিয়েই। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানকে শিয়া অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে দেন এবং নিজের প্রকল্পকে ‘গণতান্ত্রিক’ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে ভুল করেন। এর ফলে প্যালেস্তিনীয়রা নির্বাচনের মাধ্যমে হামাস-কে তাদের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে নির্বাচিত করে— যাদের পরে গাজা উপত্যকায় সীমাবদ্ধ করতে সশস্ত্র সংঘর্ষের প্রয়োজন হয়। ওবামা ২০০৯ ও ২০১৪ সালে গাজার বিরুদ্ধে ইজরায়েলের বিমান হামলাকে মেনে নেন এবং অর্থনৈতিকভাবে সহায়তাও করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন— যার ফলে দেশটির তেল-আয় ৪৫ শতাংশ কমে যায়।[22] পরে তিনি জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (JCPOA) চুক্তি সম্পন্ন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ইজরায়েলের পারমাণবিক একচেটিয়া অবস্থান বজায় রাখা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে দুর্বল অবস্থায় হলেও টিকিয়ে রাখা— কিন্তু সেটা ইজরায়েলের পছন্দ ছিল না।
ট্রাম্প ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে JCPOA বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২০১৮ সালে তা বাস্তবায়ন করেন। তিনি পুরনো নিষেধাজ্ঞার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করেন, যার ফলে ইরানে দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রা-অস্থিরতা, দ্রুতগতির মুদ্রাস্ফীতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পতন দেখা দেয়; প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়।[23] পরবর্তীতে বাইডেনও এই চাপ বজায় রাখেন এবং একই সঙ্গে গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার ইজরায়েলি অভিযানে সহায়তা করেন— যার ফলে ৭০,০০০-এরও বেশি প্যালেস্তিনীয় নিহত হন।
এই ধারাবাহিকতাতেই ক্ষমতার পঞ্চম বছরে ইজরায়েলের চাপে ট্রাম্প এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন যত দূর ইরাক আক্রমণের পর আর কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট যাননি। এটা ঠিক যে ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে শেষ পর্যন্ত তিনি সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলিকে কিছুটা স্বস্তি দেন। এর ফলে সেখানে ইজরায়েলি বাহিনীর হত্যার হার প্রতি সপ্তাহে কয়েক হাজার থেকে কয়েক ডজনের মধ্যে নেমে আসে এবং ইজরায়েল গাজা উপত্যকার অর্ধেকেরও বেশি অংশ নিজের দখলে নেয়। তিনি দোহায় গোলাবর্ষণ করে হামাসের প্রধান আলোচককে হত্যার চেষ্টা করার জন্য নেতানিয়াহুকে তিরস্কারও করেন। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষয়যুদ্ধের কৌশল থেকে সরাসরি সামরিক আক্রমণের দিকে ট্রাম্পের মোড় নেওয়া স্পষ্টতই নেতানিয়াহুর চাপের ফল। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই ইজরায়েল— লেবানন ও সিরিয়ায় তার বোমাবর্ষণের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে এবং তাদের নাসারাল্লাহ-কে হত্যার প্রতিশোধমূলক পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার পর— এই অঞ্চলে তার ক্রমবর্ধমান আকাশ-প্রাধান্যকে কাজে লাগাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে আকাশ ও সমুদ্রপথে হামলায় জড়িয়ে পড়েন।[24] গাজার প্রতি সংহতি জানিয়ে হুথিরা সুয়েজ খালের দিকে যাওয়া ইজরায়েলি জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছিল। নেতানিয়াহু তখন তাঁকে উৎসাহ দেন ‘সাপের মাথায়’ আঘাত হানতে। ১৩ জুন ট্রাম্পের অনুমোদন নিয়ে ইজরায়েল প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায়, আর মোসাদ-এর গুপ্ত এজেন্টরা নাশকতার অভিযান শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের উচ্ছ্বসিত পোস্টগুলো থেকেই বোঝা যায়, তিনি সেই মুহূর্তটাকে কতটা উপভোগ করছিলেন।[25] কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম সরাসরি সামরিক আক্রমণে যুক্ত করেন। ২২ জুন সাতটি B-2S বোমারু বিমান ফোর্ডো এবং নাতানজ-এর নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টগুলির ওপর ৪ লক্ষ পাউন্ডেরও বেশি বিস্ফোরক নিক্ষেপ করে।[26]
ট্রাম্পের এই যুদ্ধকে ‘সমাপ্ত বলে বিবেচনা করা হোক!’ বলে করা জোরালো দাবির সামনে নতিস্বীকার করলেও, নেতানিয়াহু ইজরায়েলিদের উদ্দেশে আরেকটি বার্তা দেন: ‘আমাদের ইরানি অক্ষের বিরুদ্ধে অভিযান সম্পূর্ণ করতে হবে।’[27] স্টারমার, ম্যাক্রঁ এবং মার্জ ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে তোলেন।[28] কোনও পথ খোলা না পেয়ে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা এবং তার সামরিকীকৃত নিরাপত্তাবাহিনী ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ওপর কঠোর দমননীতি চালায়। এর ফলে যে সামাজিক স্তরগুলো একসময় তাদের ভিত্তি ছিল— সরকারি খাতের কর্মচারী, শ্রমিক এবং দরিদ্র জনগণ— তাদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়; একই সঙ্গে সংসদীয় সংস্কারের যে পথের পক্ষে এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিত, সেটিও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।[29] ২০২৫ সালের শেষদিকে যখন বাণিজ্য ভেঙে পড়া ও ব্যাঙ্কিং সংকটের মধ্যে ইরানি মুদ্রা রিয়াল ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৪ লক্ষে নেমে আসে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের ট্রেজারি সেক্রেটারি গর্ব করে বলেন যে চাপ কাজ করছে— ডিসেম্বরের বিক্ষোভগুলি নাকি সেই আমেরিকান প্রচেষ্টার ‘মহা পরিণতি’।[30] বিক্ষোভগুলি ব্যাপক আকার নেওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের প্রচারযন্ত্র একের পর এক প্রচারণা চালিয়ে সেগুলোকে উস্কে দিচ্ছিল। ট্রাম্প টুইটে লিখেছিলেন, ‘আমরা প্রস্তুত— অস্ত্রভাণ্ডার প্রস্তুত, যে কোনও মুহূর্তে এগোতে পারি।’ পরে তিনি আবার লেখেন: ‘তোমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করো! সাহায্য আসছে।’ কিন্তু সেই মিলনের মুহূর্ত আর আসেনি। ৭-৮ জানুয়ারি প্রতিবাদকারীরা IRGC-র গুলিবৃষ্টিতে নিহত হয় এবং সরকার ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়।
এই সংখ্যাটি যখন মুদ্রণের জন্য যাচ্ছে, তখন উভয় পক্ষই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার যে আলোচনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে অনেকেই সম্ভাব্য মার্কিন-ইজরায়েলি আক্রমণের একটি আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছেন— যা কয়েক সপ্তাহ বা এমনকি কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটতে পারে। ট্রাম্পের কথা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের লক্ষ্য দোদুল্যমান— কখনও শাস্তিমূলক সামরিক আঘাত, কখনও বা শাসনব্যবস্থা উত্খাত। ইজরায়েল আর কোনও নতুন পারমাণবিক চুক্তি মেনে নিতে রাজি নয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ৯ কোটি মানুষের একটি দেশ— যার আয়তন ইরাকের তিন গুণ— পুরোপুরি দখল করার ধারণা থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ দেশটি রক্ষা করছে আদর্শগত ও ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত প্রায় দেড় লক্ষ সদস্যের IRGC বাহিনী।
এই দুই সম্ভাবনার মাঝখানে রয়েছে সিরিয়া মডেলের এক তীব্রতর সংস্করণ— অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী গোলাবর্ষণ, গণতান্ত্রিক বিদ্রোহকে সামরিকীকরণ, রাষ্ট্রকে চারদিক থেকে দুর্বল করে ফেলা, তার আয়ের উৎস বন্ধ করে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত তাকে এমন এক অকার্যকর ও বৈধতাহীন শাসনব্যবস্থায় নামিয়ে আনা, যা নিজের জনগণের ওপরই গোলাবর্ষণ করছে। তথাকথিত ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও সমৃদ্ধির ট্রাম্প-রুট’ ইতিমধ্যেই ইরানের উত্তরের সীমান্তে আর্মেনিয়ার দিকে চাপ সৃষ্টি করছে, যেখানে এখন উল্লেখযোগ্য মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি রয়েছে। আজারবাইজান থেকে মোসাদ ইরানের প্রায় দুই কোটি আজেরি সংখ্যালঘুর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দেওয়ার কাজ করছে। পশ্চিমদিকে আবার তথাকথিত আইসিস যুদ্ধবন্দিদের শিয়া রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে আরেকটি গোষ্ঠীগত সেনাবাহিনী হিসেবে সংগঠিত করার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
ইজরায়েলের এই ধ্বংসাত্মক কৌশল— যা মার্কিন সামরিক শক্তির সমর্থনে কার্যকর হচ্ছে, যেন লেজই কুকুরকে চালাচ্ছে— তার ফলে এই বিশাল অঞ্চলের ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, তার হিসাব করা প্রায় অসম্ভব।

সাত.
ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের হেজিমনি প্রতিষ্ঠিত সেইসব শক্তির ওপর যারা ১৯৪৫ সালের আগে তারই শক্তিধর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল— এর মধ্যে একটি হল তার প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক, যারা এখন প্রধান ভৃত্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ।
ঐতিহাসিকভাবে, রাষ্ট্রগুলির এই পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শীতল যুদ্ধের সময় পুঁজিবাদ ও কমিউনিজমের বৃহৎ মেরুকরণের মধ্যে চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই দ্বন্দ্বের অবসানের পরও ইউরোপীয় শাসকশ্রেণির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলার শক্তিশালী প্রণোদনা রয়ে গেছে। কারণ তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে রয়েছে ব্যাপক মার্কিন পুঁজি-বাজার; আর রয়েছে ক্রমবিবর্তিত এক আদর্শিক কাঠামো— ১৯৬০-এর দশকে ‘মুক্ত বিশ্ব’, ১৯৯০-এর দশকে ‘উদার গণতন্ত্র’, ২০১০-এর দশকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের শাসন’— যেগুলির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা তাদের পক্ষে সহজ।
এখানে আমেরিকান হেজিমনি এমন এক আদর্শ অবস্থার কাছাকাছি অবস্থান করে যেখানে সর্বাধিক সম্মতি এবং সর্বনিম্ন জবরদস্তি রয়েছে; মূলত শুধু ব্যাপক সামরিক ঘাঁটির অধিকারের বিনিময়ে— মার্কিন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবাহিনী মোতায়েনের জন্য।
সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপীয় অভিজাতদের সামনে একটি উপ-সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা খোলা রাখা হয়েছে— যেখানে তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে পারবে, অবশ্য যতক্ষণ তা আমেরিকার স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে। ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ও দখল অভিযানে সহায়ক ভূমিকায় থাকবে। ফ্রান্স তার ভূমধ্যসাগরীয় ও আরব-বিশ্বের অভিজ্ঞতাকে ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ কাজে লাগাবে। জার্মানিকে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে মধ্য ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে বড় ভূমিকা নিতে দেওয়া হবে। এই স্বেচ্ছাসেবী অধীনস্থ শক্তিগুলোকে— আমেরিকার বিশ্বশক্তির জন্য বিশাল সম্পদ হিসেবে দেখা হত। বিশেষ করে তারা নিজেরাই দেখত। তারা দিত ৫০ কোটিরও বেশি মানুষের এক সমৃদ্ধ বাজার, ইউরেশিয়ার পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে অসংখ্য বিমানঘাঁটি, বন্দর ও নজরদারি কেন্দ্র, ন্যাটোর অধীনে আমেরিকান কমান্ডে থাকা ত্রিশটি জাতীয় সেনাবাহিনী, বিশ্বের প্রতিটি মঞ্চে কূটনৈতিক সমর্থন এবং ‘পশ্চিম’কে পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরার এক আদর্শিক প্রতিধ্বনি।
সোভিয়েত ব্লকের পতনের পর ইউরোপের পুনর্মিলন একই সঙ্গে এক ধরনের নতুন বিভাজনও নিয়ে আসে— যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল ওয়াশিংটনের হাতে। প্রথমে পূর্ব জার্মানিকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়, পরে সেই সুবিধা অন্য সাবেক সোভিয়েত উপগ্রহ রাষ্ট্রগুলোর দিকেও বাড়ানো হয়। একই সময়ে মাসট্রিখট চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় সরকারগুলো নিজেদের ভোটারদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অতিরাষ্ট্রিক কর্তৃত্বের অধীনে সমর্পণ করে, যা স্পষ্টভাবে এক ধরনের নব্যউদারবাদী রূপ ধারণ করেছিল। এর বিনিময়ে ২০০০ সালে ইউরো চালুর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঋণের এক বিশাল স্রোত ইউরোপে প্রবাহিত হয়। এতে সবারই কিছুটা লাভ হয়, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় ও আটলান্টিক উপকূলের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলির। কিন্তু ২০১০ সালের ইউরোজোন ক্রাইসিস-এর সঙ্গে সেই স্রোত হঠাৎই শুকিয়ে যায়, এবং তার পর ইউরোপের অর্থনীতি ও সমাজ আগের যে-কোনও সময়ের চেয়ে আরও খারাপ অবস্থায় পড়ে— আরও বেশি শিল্পহীন, আরও স্থবির, আরও অসম এবং আরও ক্ষুব্ধ।
এই দ্বিগুণভাবে ক্ষুণ্ণ সার্বভৌমত্বের অধীনে মহাদেশটির ধীর অবনমন ইউরোপীয় শ্রমজীবী শ্রেণিকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দেয়— তারা অতীতের অর্জনগুলি ধরে রাখার চেষ্টা করতে থাকে, ফলে বস্তুনিষ্ঠভাবে আরও রক্ষণশীল হয়ে ওঠে। এর ফলে তারা অনেক সময় চরম ডানপন্থার ‘অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ’ সমাধানের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি উন্মুখ হয়ে পড়ে, যেখানে চরম বামপন্থার মৃদু সামাজিক গণতন্ত্রের কর্মসূচি তাদের কাছে আবেদন রাখতে ব্যর্থ হয়।
অন্যদিকে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতারা ক্রমশ আরও উদারপন্থী, বিশ্বনাগরিক এবং পরিবেশবাদী হয়ে ওঠেন— তুলনা করে দেখুন— মর্কেল বনাম কোল; ক্যামেরন বনাম থ্যাচার। এই নেতারা আফগানিস্তান, ইরাক এবং লিবিয়াতে উপ-সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং একই সঙ্গে বলকান অঞ্চল, বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহ ও ইউক্রেনের দিকে উদার-পুঁজিবাদী সভ্যতার বিস্তারের প্রতিশ্রুতি দেন।
তবু একটি বড় বৈপরীত্য রয়ে গিয়েছিল— একদিকে ইউরোপের আইনগত স্বাধীনতা, আর অন্যদিকে মহাদেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রকৃত নিয়ন্ত্রক বসে আছে সমুদ্রপারে। বিষয়টি আরও গুরুতর তাদের বিশাল প্রতিবেশী রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে।
ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে ন্যাটো সম্প্রসারণের সীমা নিয়ে যে দরকষাকষি চলছিল, তার বড় অংশই ইউরোপীয় নেতাদের মাথার উপর দিয়ে সম্পন্ন হয়। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের বুখারেস্ট সামিটে মর্কেল এবং সারকোজিকে চাপ দিয়ে এই ঘোষণা মানতে বাধ্য করা হয় যে ইউক্রেন এবং জর্জিয়া ন্যাটোতে যোগ দেবে।[31] ২০১৪ সালে যখন ওয়াশিংটন কিয়েভে নির্বাচিত সরকারকে ডানপন্থী মিলিশিয়াদের মাধ্যমে উৎখাতে সমর্থন দেয়, এবং তার প্রতিক্রিয়ায় মস্কো রুশভাষী ক্রিমিয়া দখল করে নেয়, তখন ইউরোপীয় নেতাদের উপ-সাম্রাজ্যবাদী প্রবৃত্তিই নিশ্চিত করে যে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই দাঁড়াবেন।[32] ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের সংকট দেখা দিলে ইউরোপের নেতারা নিজেদের আদর্শিক অঙ্গীকারকে— অর্থাৎ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন ‘পশ্চিমি’ শিবিরের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকে— নিজেদের জনগণের স্বার্থের ওপরে স্থান দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। জ্বালানির দাম বিপুলভাবে বেড়ে যাওয়া, যা বিশেষ করে জার্মানির মাঝারি আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ছিল, সেটিকেও তাঁরা তুলনামূলক ছোট মূল্য হিসেবেই দেখেন। এর পাশাপাশি যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে বুকা-তে রুশ বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত বলে প্রচারিত নৃশংস ঘটনাগুলোও স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপীয় সমাজকে ইউক্রেনের পক্ষেই সমবেত করেছিল।
এর পরেই ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে দেখা গেল আঘাত, ক্ষোভ এবং প্রায় স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া— ‘ড্যাডি, ট্রাম্প!’— এবং তাঁরা ঘোষণা করতে লাগলেন যে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটছে। কারণ তাঁদের আত্মত্যাগী আনুগত্যের প্রতিদানে ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা শুল্ক আরোপ করছেন, নগদ অর্থ দাবি করছেন, সামরিক বিচ্ছিন্নতার হুমকি দিচ্ছেন, ওভাল অফিস ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতীকী ইউক্রেনীয় নেতাকে অপমান করছে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছেন, তাঁদের অভিবাসন নীতির নিন্দা করছেন, সভ্যতার বিলুপ্তির অভিযোগ আনছেন এবং লুম্পেন অতি-ডান নেতাদের সমর্থন দিচ্ছেন। অনেক ভাষ্যকারের মতে, মিত্রদের প্রতি এই আচরণ প্রশাসনের অকার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ, যা অকারণে ‘মার্কিন শক্তি ও প্রভাবের নেটওয়ার্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে।’[33] আরও নির্দিষ্ট করে তাঁরা বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও মানবসম্পদের দিক থেকে বিশাল শক্তি চিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন তার মিত্রদের অতিরিক্ত সক্ষমতার।[34]
কিন্তু এই প্রশ্নে হয়তো ট্রাম্পের প্রবৃত্তির তীক্ষ্ণতা বেশি। বাস্তবে ইউরোপীয় মিত্ররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত তাঁর নির্দেশ মেনে চলেছে— অনুকূল বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে— অবশ্যই ভোটারদের সঙ্গে কোনও পরামর্শ ছাড়াই।[35] আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের কথা তাঁরা যতই বলুন না কেন, মাদুরোর অপহরণ, কিউবার ওপর অবরোধ বা ইরানে হামলার প্রশ্নে তাঁদের কেউই কার্যত কোনও প্রতিবাদ করেনি। লক্ষণীয়ভাবে, যে একমাত্র বিষয়ে তাঁরা কিছুটা দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছিলেন তা হল গ্রিনল্যান্ডের ওপর কিংডম অফ ডেনমার্কের ঐতিহাসিক অধিকার নিয়ে— যেখানে তাঁদের উপ-সাম্রাজ্যবাদী ইগো আহত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সত্যিকারের বিচ্ছিন্নতার কৌশল নিলে তা সম্পূর্ণ ভিন্নরকম দেখাত। প্রথম পদক্ষেপ হতে পারত ন্যাটোর সম্প্রসারণ এবং জোটের বাইরের অঞ্চলে সামরিক অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা। এরপর আসত জার্মানি, পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াতে থাকা মার্কিন বাহিনী ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করতে বলা।[36] আর ইউরোপের যে বামপন্থা সত্যিই মহাদেশটিকে গণতান্ত্রিক করতে চাইবে, তারা লড়াই করবে যাতে ইউরোপ সমস্ত বিদেশি সামরিক ঘাঁটি থেকে মুক্ত হয়।
বাস্তবে, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদও ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানো অব্যাহত রেখেছে— দূরপাল্লার অস্ত্র ও রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য-সহ— যার ফলে যুদ্ধটি আরও অন্তত এক বছর দীর্ঘায়িত হয়েছে। এই নীতিগত অসঙ্গতি আসলে ওয়াশিংটনের ভেতরে রাশিয়া-নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভেদের প্রতিফলন, যার সূত্রপাত ১৯৯০-এর দশকেই— ব্রেজিনস্কি এবং কেনানের মতপার্থক্যের মধ্যে দিয়ে। ট্রাম্প হয়তো মনে করেন কারও কারও সঙ্গে পুতিনের ব্যক্তিগত সখ্যতা রয়েছে, কিন্তু এই ফ্রন্টে মার্কিন শক্তির সীমা থাকতে পারে— এ কথা স্বীকার করার জন্য তিনি বাইডেনের চেয়ে— বা ওবামা, বুশ বা ক্লিন্টনের চেয়েও— বেশি সক্ষম নন।
আলাস্কার ঝলমলে সম্মেলনের মতো নাটকীয় ঘটনাগুলো সত্ত্বেও, এই ক্ষেত্রে তার নীতির গতিপথ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর থেকে প্রতিটি মার্কিন প্রশাসনের পথই অনুসরণ করেছে— পূর্বদিকে এগোও— যতক্ষণ না বাধ্য হয়ে থামতে হয়।

আট.
যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে অসংখ্য দ্বন্দ্ব বর্তমানে দ্রুতগতিতে আবর্তিত হতে শুরু করেছে। উনিশ শতকে তারা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিল দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে— পূর্ব এশিয়ার প্রাচীনতম শক্তি বনাম উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে সম্প্রসারণবাদী শক্তি। ১৮৫০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল জুড়ে দ্বীপের পর দ্বীপ দখল করে নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তোলে। এই অঞ্চলের জন্য তাদের কৌশল ছিল জয় ও বাণিজ্যের সমন্বয়, যা অনেকটা ব্রিটিশ গানবোট কূটনীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ঘাঁটিগুলোর মতোই ছিল। ১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব এশিয়ার শিল্পকেন্দ্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে— জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দখল করে, এবং ওকিনাওয়া ও তাইওয়ান থেকে শুরু করে ফিলিপাইনস দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত সামরিক ঘাঁটির বিস্তার ঘটায়। একই সময়ে চিন কমিউনিস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে নিজেকে আধুনিক করে তুলছিল। ১৯৭২ সাল নাগাদ শীতল যুদ্ধের সময়কালে দুই দেশের মেরুকরণ উল্টে যায় এবং তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক ধরনের রাষ্ট্রিক জোট গড়ে তোলে। পরবর্তীতে সেই সম্পর্ক আরও বিকশিত হয়ে একটি বহু-ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহাবস্থানে পরিণত হয়— একদিকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম কমিউনিস্ট শাসিত সমাজ চিন।
এর ভেতর থেকেই, ২০০৮ সালের দিকে, এমন এক মহাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা জন্ম নেয় যা আজ তাদের পারস্পরিক প্রধান দ্বন্দ্বকে নির্ধারণ করছে— এবং যেখানে চিন ক্রমশ সেই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে গতিশীল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
এই দুই শক্তির মেরুকরণের মধ্যে একাধিক অসাম্য বিদ্যমান। চিনের জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় চারগুণ, আবার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নৌবাহিনী কার্যত এশিয়ার উপকূলীয় সমুদ্রসীমার ওপর আধিপত্য বজায় রেখেছে— তার যুদ্ধজাহাজগুলো নিয়মিতভাবেই চিনের উপকূলের কাছাকাছি টহল দেয়। যদিও দুই পক্ষই বিশ্বাস করে যে সময় শেষ পর্যন্ত তাদেরই পক্ষে, তবু আমেরিকান ও চিনা কৌশলগত লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
১৯৪০-এর দশক থেকে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে ইউরেশীয় স্থলভাগের ওপর সমুদ্রপারের শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত ছিল— মহাদেশের ভেতরে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্যশালী রাষ্ট্রের উত্থান ঠেকানো। এর জন্য তাদের কৌশল ছিল সেই শক্তির সম্প্রসারণকে বাধা দেওয়া (containment) এবং তার বিরুদ্ধে তার প্রতিবেশীদের লেলিয়ে দেওয়া (balancing)। এর লক্ষ্য হল তাকে দুর্বল করা এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করে সুবিধামতো পুনর্গঠন করা— যেমনটি করা হয়েছিল জার্মানি ও জাপানের ক্ষেত্রে— যাতে তারা আরও অনুগত রূপে ফিরে আসে। আর যদি সেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রটি এমন কোনও শাসনব্যবস্থার অধীনে থাকে যা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনা করে, তবে এই লক্ষ্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে— অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে দুটিকেই উৎখাত করা।
তবে চিনের বিশাল আকার, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার কূটনৈতিক ইতিহাস এবং দেং-এর পুঁজিবাদী পথ গ্রহণের সুস্পষ্ট আগ্রহ— এসবের সঙ্গে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুক্তবাজার ব্যবস্থার শক্তির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস— সব মিলিয়ে অনেকের কাছে মনে হয়েছিল যে এর ফল আরও ইতিবাচক হতে পারে। জুনিয়র বুশের বক্তৃতা-লেখকরা যেমন বলেছিলেন: ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা স্বাধীনতার অভ্যাস তৈরি করে, আর সেই অভ্যাস গণতন্ত্রের প্রত্যাশা সৃষ্টি করে।’ এর বিপরীতে প্রকাশ্য সংঘর্ষের কৌশল নিলে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির ‘কট্টরপন্থী’ অংশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে— এমন আশঙ্কা ছিল। ১৯৯৩ সালের একটি NSS নথিতে তাই মূল নীতিটি নির্ধারিত হয়েছিল: ‘সমর্থন, নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য’। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও এক ধরনের পরামর্শদাতার ভূমিকার পাশাপাশি সবসময়ই বিপুল সামরিক শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন নেভির সবচেয়ে বড় জাহাজগুলোর প্রায় অর্ধেকই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন ছিল এবং সেখানে প্রায় এক লক্ষ মার্কিন সেনা অগ্রবর্তী অবস্থানে ছিল।
আমেরিকার আশা ছিল যে সম্পৃক্ততার কৌশল ধীরে ধীরে সিপিসি-নেতৃত্বকে নমনীয় করে তুলবে। তাঁদের সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে তারা আমেরিকান পদ্ধতি ও চিন্তাধারা শিখতে পারে। এইভাবে একসময় চিনা ইয়েলৎসিন এবং গর্বাচেভদের একটা স্তর তৈরি হবে— যারা কমিউনিস্ট মতবাদ ত্যাগ করবে, একদলীয় ব্যবস্থাকে ভেঙে দেবে এবং এক ধরনের সমুদ্রপারের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে।
আর্থিক সংকটের সময়ে এসে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই কৌশল কার্যকর হচ্ছে না। তখনও প্রায় ১০ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে চিন ক্রমশ আরও দৃঢ়ভাবে জোর দিতে শুরু করে যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেশনগুলোকে তার শর্ত মানতে হবে, এবং মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমি সমালোচনার প্রতিও সে ক্রমশ কম সাড়া দিতে থাকে। তারা আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা জুড়ে বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে থাকে, সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণ করে এবং অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা আরও শক্ত করে তোলে। ২০০৯ সালে জাপানে হাতোইয়ামা-র অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী জয় জাপানের সঙ্গে মার্কিন নিরাপত্তা জোটের শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত করে। ওয়াশিংটনে বিপদের অনুভূতি আরও বেড়ে যায়।
তবে চিন-প্রশ্নটির গুরুত্ব বুঝলেও মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এর মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তাঁরা যে সব পদ্ধতি নিয়েছিলেন তার মধ্যে ওবামার ‘কনগেজমেন্ট’-ই সবচেয়ে ভালো ছিল। যদিও সেটাও এক ধরনের অস্পষ্ট সংমিশ্রণ, যেখানে সম্পৃক্ততার চেয়ে নিয়ন্ত্রণের দিকটি— যেমন, দক্ষিণ চিন সাগরে নৌচাপ বাড়ানো— বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সিপিসি-র শক্তি ও দুর্বলতা— সংগঠনের ঐক্য, দুর্নীতি(?)— এমনকি তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যও বোঝা কঠিন হচ্ছিল। অনিচ্ছা বা অনিশ্চয়তা যে কারণেই হোক, নেতৃত্বের প্রকৃত মতামত দলীয় সর্বোচ্চ স্তরের অপ্রবেশ্য গোপনীয়তা এবং হাজার বছরের চিনা রাষ্ট্রচালনার ঐতিহ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকত।
ফলে প্রত্যাশিত ‘চিনা ইয়েলৎসিন’দের পরিবর্তে তৈরি হলেন পুলিশ-সুলভ মানসিকতার শি জিনপিং।
অন্যদিকে তাইওয়ানে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ এবং শিনজিয়াং-এ নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতিও এই সামগ্রিক শক্তি-ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছিল।
২০১০ সালের মধ্যে ক্রমশ একটি মতৈক্য তৈরি হতে থাকে যে ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হবে চিনের বিরুদ্ধে অবস্থান আরও কঠোর করা। গ্রেট রিসেশনের মন্দা-পরিস্থিতিতে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল, যখন নতুন ডানপন্থী শক্তিগুলো স্লোগান তুলতে শুরু করে যে চিন আমেরিকার চাকরি ‘চুরি’ করছে। এই ঢেউয়ের ওপর ভর করেই ট্রাম্প ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসেন। তাঁর প্রথম NSS নথিতে পূর্বসূরিদের চিনকে নিয়ে উদার-গণতান্ত্রিক শান্তির আশা সম্পর্কে তীব্র সমালোচনা করা হয় এবং ঘোষণা করা হয় মহাশক্তির নতুন প্রতিযোগিতার যুগের সূচনা হয়েছে। শুরু হয় ‘মুক্ত বিশ্বের’ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দমনমূলক ব্যবস্থার সংঘর্ষ। হুয়াওয়েই-এর সিইও-র সঙ্গে প্রায় ক্রিমিনালের মতো আচরণ করা হয় এবং ২০১৮ সালের ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে চিন।[37]
পরবর্তীতে বাইডেনের উপদেষ্টারা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর করেন। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো প্রায় প্রতি মাসেই চিনের উপকূলের কাছাকাছি গিয়ে শক্তি প্রদর্শন করতে থাকে; সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়; এবং মিত্রদেশগুলোকে একটি আক্রমণাত্মক ন্যাটো কৌশলগত নথি[38]-তে স্বাক্ষর করানো হয়, যেখানে চিনের বিরুদ্ধে আটলান্টিক নিরাপত্তার জন্য হানিকর ‘জবরদস্তিমূলক নীতি’ ও ‘ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড’-এর অভিযোগ আনা হয়।
অন্যদিকে, নানা সমস্যার মধ্যেও চিন এগিয়ে যেতে থাকে— সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতির মাধ্যমে। একই সঙ্গে তার দক্ষিণ উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠে অত্যাধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নতুন ধরনের ড্রোন প্রযুক্তির ঘন উপস্থিতি।
একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চিনের লক্ষ্য নীরবে নিজের জাতীয় শক্তিকে এমন পর্যায়ে উন্নীত করা, যেখানে তার বিরুদ্ধে শক্তির ভারসাম্য গড়ে তোলার চেষ্টা সম্পূর্ণ আশাহীন বলে মনে হবে এবং তার ইচ্ছার সঙ্গে সমঝোতা করা ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না। অর্থাৎ ধ্রুপদী কথায়, লড়াই না করেই জয়লাভ করা। অর্থনৈতিক সক্ষমতাই হল মূল ভিত্তি, যার ওপর সামাজিক সংহতি ও সামরিক প্রতিরক্ষা ভর করে দাঁড়াবে। বাস্তবে চিনের লক্ষ্য ছিল তিনটি প্রধান বিষয় নিশ্চিত করা— তাইওয়ানকে নিজের পরিসরের মধ্যে রাখা; জাপানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা; এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে রাখা। অথবা অন্ততপক্ষে, যতদিন না আরও অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, ততদিন এই প্রশ্নগুলোতে এক ধরনের অস্পষ্ট ও অমীমাংসিত অবস্থা বজায় রাখা। কৌশলগতভাবে, অগ্রাধিকার ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল বা পশ্চাৎভূমিকে স্থিতিশীল করা এবং উপকূলীয় দিক থেকে আসা সম্ভাব্য হুমকির দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে চিনা স্ট্র্যাটেজিস্টরা— যেমনটা বলা হয়— আমেরিকান মডেলের মতো কোনও পূর্বনির্ধারিত নীতিগত বাধ্যবাধকতা থেকে শুরু করেননি। বরং তাঁরা শুরু করেছিলেন সেই যুগকে সংজ্ঞায়িত করা বাস্তব ঘটনাবলির সতর্ক মূল্যায়ন থেকে— যেখানে বিভিন্ন প্রবণতার প্রধান ও গৌণ দিকগুলি এবং কার্যরত শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিগুলিকে কাজে লাগানো এবং প্রতিকূল সময়ে নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখা।[39]
১৯৮৫ সালে দেং এবং তাঁর কমরেডরা তখনকার যুগের প্রধান প্রবণতা বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন যে পৃথিবী মাও সেতুং-এর ‘যুদ্ধ ও বিপ্লব’-এর যুগ পেরিয়ে ‘শান্তি ও উন্নয়ন’-এর যুগে প্রবেশ করেছে। যদিও তখনও দেং ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে সীমান্তে টুকরোটাকরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা এই ধারণার সঙ্গে কিছুটা অসঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে এক বড় ধাক্কা আসে, যখন ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভ যুদ্ধের সময়ে ন্যাটো বেলগ্রেডের চিনা দূতাবাসে বোমাবর্ষণ করে। এই ঘটনা নতুন করে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। যদিও শান্তি ও উন্নয়নই প্রধান প্রবণতা হিসেবে রয়ে যায়, এবং মনে করা হয় এর মধ্যে দিয়ে জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ, রাশিয়ার পুনরুত্থান, এবং চিনের নিজের বিশ্বমঞ্চে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে একটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। তবে একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছিল যে এই প্রবণতাগুলি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনুমান করা হচ্ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত আরও বিশ বছর সুপারপাওয়ার হিসেবে তার অবস্থান ধরে রাখবে। পাশাপাশি চিনের ভাষায় তার ‘আধিপত্যবাদ’— অর্থাৎ নিজের পথে যা-ই আসুক বলপ্রয়োগ করে তাকে দমন করার প্রবণতা— এবং সামরিক হস্তক্ষেপের বাড়তে থাকা ঘটনাগুলিও ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছিল।[40]
একই সময়ে, জিয়াং জেমিন ২০০২ সালে CCP-র ১৬তম পার্টি কংগ্রেসে ঘোষণা করেন, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র তখন মধ্যপ্রাচ্যে নানা সমস্যায় ব্যস্ত, তাই পরবর্তী দুই দশক হবে চিনের জন্য ‘বড় বড় কাজ সম্পন্ন করে নেওয়ার এক কৌশলগত সুযোগের সময়’। আর ২০২২ সালের শেষদিকে, যখন রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ তীব্রভাবে চলছে, তখন শি জিনপিং আরও এক নতুন এবং কঠিন বিন্যাসের ঘোষণা করলেন— যেখানে একসঙ্গে রয়েছে ‘সুযোগ, ঝুঁকি ও বিপদ’। যে পরিস্থিতির মোকাবিলায় তাঁর মতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং— বুদ্ধিমানের কাজ হোক বা না হোক— ক্ষমতা আরও বেশি করে বিশ্বস্ত পার্টিনেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে হবে।[41]
২০২৫ সালে ট্রাম্পের পুনরাগমনে প্রথমে মনে হয়েছিল ঝুঁকি ও বিপদের সেই পূর্বাভাসই সত্য হতে চলেছে। তার দ্বিতীয় মেয়াদ প্রত্যাশিতভাবেই শুরু হয়— সামরিক নিয়ন্ত্রণ কৌশলের এক ভয়াবহ পরিকল্পনা[42] এবং চিনের ওপর শুল্ক ১৪৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু বেইজিং বিরল মাটির খনিজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে পাল্টা জবাব দিলে— যা যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন শিল্প প্রায় থামিয়ে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছিল— ট্রাম্প প্রশাসন চরিত্রবিরুদ্ধভাবে নীরব হয়ে যায়। এরপর কিছু ইউ-টার্নের লক্ষণ দেখা যায়— উন্নত Nvidia চিপের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়; তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের মধ্য আমেরিকা সফরের সময় তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। এই নাটকীয় পরিবর্তনকে ‘মহাকৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার কিছুটা মুখরক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কৌশলগত সংহতি’। লেখকের ভাষায়, চিনের বিরুদ্ধে শুল্কযুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের এই পশ্চাদপসরণ আসলে এক ধরনের ভূ-অর্থনৈতিক সাময়িক সমঝোতা। তাঁর সাফাই— এটি বড় শক্তিগুলির এক সাধারণ কৌশল— যেখানে তারা একদিকে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা চালায়, আবার অন্যদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতিও নেয়:
এখন যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা শ্বাস নেওয়ার সময়ের প্রয়োজন। প্রয়োজন নিজেদের অবহেলিত প্রতিরক্ষা-শিল্পভিত্তি পুনর্গঠন করা, জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো, এবং একই সঙ্গে চিনের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতের জন্য একটি সহাবস্থানের পথ খুঁজে নেওয়া— যখন দীর্ঘমেয়াদে শক্তি সঞ্চয়ের ভিত্তিও গড়ে তোলা হবে।[43]
এই আত্মপক্ষ সমর্থন অবশ্য ট্রাম্পের সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য নীতির আলোকে স্পষ্টতই মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কিন্তু তবুও বেইজিং-এর প্রতি তাঁর মনোভাব নিয়ে এখনও একটি প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেছে।

নয়.
সব নিষ্ঠুরতা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের নীতিগুলি মোটের ওপর আমেরিকার মৌলিক স্বার্থের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ থেকেছে। লাতিন আমেরিকায় তিনি বামপন্থী শাসনব্যবস্থাগুলির বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষা ও বিস্তার করার চেষ্টা করছেন, ফলে আমেরিকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্বার্থই লাভবান হচ্ছে।
দাবি করা হয়েছিল যে ভেনেজুয়েলাতে ক্যু ঘটাতে পারলে চিনকে মারাকাইবো-র তেল থেকে বঞ্চিত করা যাবে, একই সঙ্গে মাদক পাচারকারী ও অভিবাসীদের— যাদের পরে কারাকাসে ফেরত পাঠানো হবে— থেকে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। মধ্যপ্রাচ্যে বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের শাসকেরা তাঁদের জাতীয়তাবাদী নীতির একটি ব্যতিক্রম তৈরি করেছেন এই দাবি করে যে সেখানে ইজরায়েলের স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াতেই নাকি আমেরিকার স্বার্থও এগিয়ে যাবে। কিন্তু ইউরোপে পুঁজিবাদ এখন আর আমেরিকার সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়; ফলে এখানে ট্রাম্পের নীতি আদৌ আমেরিকার স্বার্থকে এগিয়ে দিয়েছে কি না, তা বিতর্কের বিষয়।
যদি আন্তর্জাতিক হেজিমনির অর্থ হয় একটি কার্যত অধীনস্থ রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে প্রধানত অ-জবরদস্তিমূলক রাজনৈতিক, আদর্শিক ও অর্থনৈতিক উপায়ে পরিচালনা করা— আর আধিপত্য বলতে বোঝায় নিয়মিত জবরদস্তিমূলক উপায়ের আশ্রয় নেওয়া, তাহলে ট্রাম্প সেই ধারার মধ্যে স্পষ্টভাবে আধিপত্যের দিকে ঝোঁকার এক পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর পরামর্শদাতারা প্রকাশ্যেই সেই উদার-কসমোপলিটন বিশ্বদৃষ্টিকে পরিত্যাগ করেছেন, যা গ্রহণ করতে আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় অভিজাতদের শিক্ষা দিয়েছিল। এবং লক্ষণীয় যে ইউরোপের নেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্প-শিবিরের আক্রমণাত্মক বক্তৃতা চিনের বিরুদ্ধে করা বক্তৃতার চেয়েও অনেক বেশি কঠোর।
ট্রাম্প বলতে পারেন যে তিনি তো শেষ পর্যন্ত এই মঞ্চেই নির্বাচিত হয়েছিলেন— যে উদার-আন্তর্জাতিকতাবাদী মতাদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ তো হয়েইছে, বরং তা চিনের উত্থানকে উৎসাহ দিয়েছে এবং মধ্য আমেরিকার শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির অবক্ষয় ঘটিয়েছে। সুতরাং তিনি অন্য একটি পন্থা পরীক্ষা করার জন্য গণসমর্থনের ম্যান্ডেট পেয়েছেন এবং এভাবে তিনি গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিই বেশি বিশ্বস্ত থেকেছেন— যতটা ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাঁকে হতে দিতে চায়, তার চেয়েও বেশি।
তাঁর কৌশল কিছুটা সফলও হয়েছে— এই অর্থে যে এর ফলে এমন কিছু বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে যা নির্দিষ্ট কিছু মার্কিন সংস্থার পক্ষে লাভজনক, এবং শত শত বিলিয়ন ডলার মার্কিন অস্ত্রশিল্পে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও আদায় করা গেছে। দ্বিতীয়টিকে তো ইউরোপের উদারপন্থী সংবাদমাধ্যমও স্বাগত জানিয়ে বলেছে— “এটা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।” অবশ্য অপমানিত ইউরোপীয় নেতারা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সাড়ম্বরে বেইজিং-এ সফর করেছেন, কিন্তু সেখান থেকেও তেমন কোনও বাস্তব ফল আসেনি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা আশা করছেন যে এই পরিস্থিতি আর মাত্র ত্রিশ মাস চলবে— শুধু শর্ত এই যে ২০২৮ সালে যেন ভান্স ক্ষমতায় না আসেন।
তৃতীয় অপরিহার্য বিষয়— অর্থাৎ চিনকে ঘিরে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— তা নিয়ে ট্রাম্পের কার্যকর কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে অস্পষ্ট অবস্থান আগামী কয়েক বছরে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠতে পারে। বোধগম্য, যে কেন অনলাইনে অনেক চিনা ভাষ্যকার বিদ্রূপাত্মকভাবে তাঁকে ‘নেশন বিল্ডার’— অর্থাৎ, চিনকে আরও শক্তিশালী করে তুলছেন বলে প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি-র মধ্যেও ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি রয়েছে, কারণ তাদের চিন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে।[44] ট্রাম্পের সমর্থকেরা অবশ্য পাল্টা যুক্তি দিতে পারেন যে ওবামা-বাইডেন যুগের নীতিও এর চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল না। কিন্তু এই যুক্তি সমানভাবে— বরং আরও বেশি করে— ট্রাম্পের নিজের প্রথম মেয়াদকালের জন্যও প্রযোজ্য।

দশ.
চতুর্থ অপরিহার্য প্রশ্ন— যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমজীবী শ্রেণির অবস্থাকে উন্নত না করা গেলেও অন্তত স্থিতিশীল করা। এই ক্ষেত্রে মসনদের পঞ্চম বছরেও ট্রাম্প সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
OBBB Act-এ তাঁর প্রকল্পের শ্রেণিচরিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে: শীর্ষ ০.১ শতাংশ ধনীদের জন্য করছাড় প্রায় ৯৭,২৬০ ডলার; সাধারণ মানুষের জন্য করছাড় প্রায় ২,০০০ ডলার; আর দরিদ্রদের ক্ষেত্রে নেট ৬০০ ডলার পর্যন্ত কেটে নেওয়া; ফুড স্টাম্প ও মেডিকেইড-এ কাটছাঁট; এবং ব্যক্তিগত জেটবিমানও এখন করছাড়ের আওতায়।[45] সব মিলিয়ে যেন ক্ষমতায় থাকা অতিধনী লুম্পেন ডানপন্থীদের একটি কার্টুন চিত্র— একটি এমন দেশে, যেখানে উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি, ধনী ও গরিবের বৈষম্যের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি, স্বাস্থ্যসেবার কভারেজ সবচেয়ে দুর্বল, দীর্ঘস্থায়ী রোগের হার সবচেয়ে বেশি, গড় আয়ু সবচেয়ে কম, মদ-মাদক বা আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, এবং সবচেয়ে বেশি শিশু অনাহারে থাকে।[46]
OBBB আইনের অধীনে ট্রাম্পের বহিষ্কার কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য ১৭০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়। এই কর্মসূচির ফলে এখন পর্যন্ত ২০,০০০-এরও বেশি মুখোশধারী ICE কর্মকর্তা মোতায়েন হয়েছে— যারা স্বল্প বা অ-প্রশিক্ষিত, বিপুলভাবে সশস্ত্র, এবং নির্বাচিত শহর বা অঙ্গরাজ্য সরকারের কাছে যাদের জবাবদিহি করার কোনও দায় নেই। তাদের বস হোমল্যান্ড সিকিউরিটির উপদেষ্টা মিলার, তাদের আইনগত দায়মুক্তির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে এবং ওয়ারেন্ট ছাড়াই রাস্তা, বাড়ি বা কর্মস্থল থেকে ‘বিদেশি’ বলে সন্দেহভাজন মানুষদের ধরে আনার কোটা পূরণ করতে উৎসাহিত করেছেন।[47] এইভাবে আটক করা মানুষদের যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থিত ডিটেনশন সেন্টারগুলিতে রাখা হচ্ছে— যেখানে বর্তমানে প্রায় ৬৭,০০০ জন আটক রয়েছেন; আর পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষকে ইতিমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে।[48]
এ-ধরনের নীতির অকার্যকারিতা খুবই স্পষ্ট— সহিংস অভিযানের মাধ্যমে বিভিন্ন পাড়াকে বিভক্ত করে এমন তরুণ ও শক্তিশালী (এবং সস্তা) শ্রমশক্তিকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাদের ওপর অনেক ব্যবসা নির্ভর করে। ফলে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসমালোচনা তৈরি হয়েছে। মিনেসোটায় এই বছরের জানুয়ারিতে ICE অভিযানের সময় প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলিবর্ষণে মৃত্যুর ঘটনার পর জনমত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ৬৫ শতাংশ আমেরিকান জানান ICE “অতিরিক্ত মাত্রায় এগিয়ে গেছে”; ৬২ শতাংশ মনে করেন এর ফলে আমেরিকানরা আরও কম নিরাপদ হয়ে পড়ছে। এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৪ শতাংশ জনগণ মনে করেন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা, যেখানে মাত্র ২২ শতাংশ বলেন অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।[49]
আমেরিকার চিন্তাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সচেতন ছিলেন যে কৌশলগত অঙ্গীকারগুলোর সঙ্গে একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি— অর্থাৎ, যেমনটি ওয়াল্টার লিপমান ১৯৪৩ সালেই বলেছিলেন, “সামর্থ্য যেন প্রয়োজনীয়তার সমান থাকে।” এতে ব্যর্থ হলে সাম্রাজ্যিক অবক্ষয়ের পথ খুলে যায়।[50] ২০১৬ সাল থেকে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং তার শ্রমজীবী শ্রেণির ক্রমাবনতিশীল অবস্থার মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটিকেই ব্যাপকভাবে তার প্রধান দ্বন্দ্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু বিলিয়নিয়ার দাতাদের প্রভাবাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বড় ব্যবসার নির্দেশনায় পরিচালিত কংগ্রেস এই সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। ওবামা ফিনানসিয়াল সেক্টরের জন্য সর্বোচ্চ বেইলআউট দিয়ে আর সংকটে পড়া গৃহঋণগ্রহীতাদের জন্য খুব সামান্য সহায়তা এবং একই সঙ্গে চক্রবৃদ্ধি মিতব্যয়িতা-র নীতি অনুসরণ করে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছিলেন। তিনি চূড়ান্ত এলিটপন্থী হিলারি ক্লিন্টনকে— যিনি রাজনৈতিকভাবে তাঁর চেয়েও বেশি সংবেদনহীন— নিজের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে শ্রমজীবী ভোটারদের ডেমোক্র্যাটদের থেকে আরও দূরে ঠেলে দেন।
ট্রাম্পের প্রথম দফা গ্রেট রিসেশনের পর বহুপ্রতীক্ষিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সময়ের সঙ্গে সমাপতিত হয়, ফলে কিছুটা স্বস্তি আসে। কিন্তু সামাজিক সংকটের ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান অবদান ছিল মূলত আদর্শগত— যেমন “Build the wall”— এবং করছাড়ের মাধ্যমে আর্থিকভাবে পশ্চাদমুখী নীতি।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় কংগ্রেস সামাজিক ব্যয়ের এক অভূতপূর্ব কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল— যা প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক সহায়তাকে ইউরোপের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল।[51] বাইডেনের আমলে সেসব বন্ধ হয়। ফলে, কংগ্রেস আবারও নির্ভরযোগ্যভাবে কর্পোরেট আমেরিকার ইচ্ছা কার্যকর করে, এবং শ্রমজীবী মানুষদের ওপর নেমে আসে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট, যার একটি কারণ ছিল কোভিড-সময়ের আর্থিক সহায়তার অবশিষ্ট মুদ্রাস্ফীতিমূলক প্রভাব।[52]
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তথাকথিত MAGA কৌশল— যেখানে শুল্ক বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি কমানো এবং করছাড় দিয়ে অর্থনীতিকে উদ্দীপিত করার কথা বলা হচ্ছে— বাস্তবে কেবল K-আকৃতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকেই আরও শক্তিশালী করছে, এবং এটিকে বদলানোর কোনও পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে না। আমেরিকার অর্থপোষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং মাথাভারি অর্থনীতি এখন এতটাই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে যে পুরো ব্যবস্থাটিই হয়তো সংস্কারের অযোগ্য হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে একটি পুনর্বণ্টনমূলক ‘Come Home America’ নীতি কার্যকর করে এই অচল রাজনৈতিক-কর্পোরেট পারস্পরিক নির্ভরতাকে মোকাবিলা করতে পারে— অথবা, অন্তত প্রথম ধাপে, সেটিকে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করে তুলতে পারে। আর তা করতে পারে একটি সুসংহত বামপন্থী নীতি।

এগারো.
এই ২০২৬ সালের বসন্তের শুরুতে ট্রাম্পের নীতির দিকনির্ধারণ নিয়ে যে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও উপদল প্রতিযোগিতা করছে, তাদের মধ্যে আপাতত ইজরায়েলি সম্প্রসারণবাদই সবচেয়ে প্রাধান্যকারী অবস্থানে। তবে ওয়াশিংটনের অন্যান্য নীতিগুলির— যেমন চিন বা রাশিয়া-সম্পর্কিত নীতির ক্ষেত্রে ইজরায়েলি স্বার্থ কী ভূমিকা পালন করবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। ইজরায়েলের সামরিক-শিল্প-ইন্টেলিজেন্সের জটিল কাঠামো চিনের সঙ্গে প্রচুর ব্যবসা করে, আবার চিনও মধ্যপ্রাচ্যে প্রচুর ব্যবসা করে। স্বাভাবিকভাবেই এখানে আরও অনেক স্বার্থ জড়িত রয়েছে— যেমন পেন্টাগনের অস্ত্রভাণ্ডারের বাস্তব সীমাবদ্ধতা। কিন্তু চায়না হক-রা এবং MAGA রেস্ট্রেইনার-রা— দুই পক্ষই— প্রথম বছরে খুব একটা সাফল্য পায়নি বলেই মনে হচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ামি রিয়্যাকশন রুবিওর নেতৃত্বে অগ্রসর হচ্ছে। এই প্রাইমাসিস্ট পররাষ্ট্রসচিব দাভোসে ইউরোপীয় অভিজাতদের কাছ থেকেও স্ট্যান্ডিং ওভেশন আদায় করেছেন তারা এখনও “পশ্চিমের” অংশ বলে।
এর বাইরে, ক্ষমতায় থাকা ট্রাম্পপন্থী অতি-ডানপন্থী গোষ্ঠী মোটের ওপর ওয়াশিংটনের বন্ধু ও শত্রুর তালিকায় খুব বেশি পরিবর্তন আনেনি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য-নীতি বর্তমানে আগের যে-কোনও সময়ের তুলনায় আরও সরাসরি তেল আভিভ থেকে নির্ধারিত হচ্ছে। ক্যারিবীয় অঞ্চল ও লাতিন আমেরিকায় ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’-সমর্থক দলগুলোর প্রতি বস্তুগত সহায়তা এবং কিউবা ও ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক বা গোপন অভিযান পরিচালনার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ন্যাটোর ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে ইউরোপীয় জোট আগের চেয়েও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে হয়।
রাশিয়া এখনও সেই দ্ব্যর্থবোধক প্রাক্তন প্রতিদ্বন্দ্বীই রয়ে গেছে— যার সঙ্গে ঠিক কীভাবে আচরণ করা উচিত, তা ওয়াশিংটন জানে না। চিন এখনও সেই প্রাক্তন শিক্ষানবিশ, যে এখন বড় প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখলে, ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলো মূলত আগের নীতিগুলোর আরও তীব্র রূপ— গোপন হত্যাকাণ্ড থেকে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড; নিষেধাজ্ঞা থেকে অবরোধ; অবরোধ থেকে সরকার উত্খাত। কিন্তু লক্ষ্যবস্তুর ধরন এখনও মোটামুটি সেই ক্লিন্টন, বুশ বা ওবামার আমলের মতোই: তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক রাষ্ট্র, যেগুলি দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়যুদ্ধের ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে পেড়ে ফেলা সহজ।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এই কঠোরতর রূপ কি তবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সূচনা বোঝায়— অথবা অন্ততপক্ষে, যেমন কার্নি এবং মার্জ ঘোষণা করেছেন, পুরনো ব্যবস্থার মৃত্যু? ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’[53] আসলে একটি আদর্শগত ধারণা— যেমন আগে ছিল ‘মুক্ত বিশ্ব’ বা ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়’— এবং সেই অর্থে এর প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু ঘটতে পারে না।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে বিশ্বশক্তির কার্যকর কাঠামো ছিল এক ধরনের একমেরু ব্যবস্থা, যার কেন্দ্রে অবস্থান করছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিগত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্র-নির্মিত আন্তর্জাতিক ও অতিরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও চুক্তি-সংগঠনগুলোর— যেমন রাষ্ট্রপুঞ্জ, IMF, বিশ্বব্যাঙ্ক, NPT, ন্যাটো— মধ্যে কাকে কখন সামনে আনা হবে আর কখন অবহেলায় পড়ে থাকতে দেওয়া হবে, তা নির্ভর করত নির্দিষ্ট মুহূর্তে ওয়াশিংটনের কাছে সেগুলোর কতটা উপযোগিতা রয়েছে তার ওপর।
এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের এই ক্ষমতার পঞ্চম বছরে অন্যান্য শক্তিগুলির প্রতিক্রিয়া বরং এই একমেরু বিশ্বব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী করেছে। গ্লোবাল সাউথ-এর মাধ্যমে যে মতামতের এক ধরনের জোট গড়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছিল— বিশেষ করে গাজা ও রাশিয়া-সম্পর্কিত পশ্চিমি নীতির বিরুদ্ধে— তা শেষ পর্যন্ত কিউবা বা মাদুরোকে রক্ষা করতে পারেনি। একইভাবে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু যখন ইরানকে সামরিকভাবে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছেন, তখনও এই শক্তিগুলো কার্যত মুখে হাত দিয়ে বসেছিল। দাভোসে কার্নি ২০০০-এর গোড়ার দিকের ইউরোপীয় ধারণা— এক ধরনের পরিবর্তনশীল জোটব্যবস্থার কথা— পুনরাবৃত্তি করে খুব হাততালি পেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে কল্পনা করাও কঠিন যে কানাডা ও জার্মানির নেতৃত্বে কোনও তৃতীয় শক্তি কিউবার ওপর অবরোধ ভাঙতে নৌবহর পাঠাচ্ছে, অথবা ইরানের পক্ষে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযান সংগঠিত করছে। বরং রেজিস ডেব্রে যেমন বলেছেন— ইইউ-এর মতো তারাও আমেরিকান বাহিনীর একটা ব্যাগেজ ট্রেন হিসেবেই কাজ করবে— প্রথমিক চিকিৎসা ও ফাঁপা নীতিবাক্য নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।
এই অর্থে, ক্ষমতায় থাকা মার্কিন অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলো এখনও বড় রাষ্ট্রগুলোর উদারপন্থী নেতৃত্বের সঙ্গে একই প্রবাহে চলছে। ট্রাম্পের অধীনেও আমেরিকান হেজিমনি ক্রিয়াশীল রয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে সবকিছু ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন অনেক সময় ধাপে ধাপে ঘটতে পারে— যেমন ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে IMF ও বিশ্বব্যাঙ্কের স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম জাতীয় অর্থনীতিগুলির ওপর উন্মুক্তকরণ এবং পুনর্গঠনের জন্য যে নীতিগুলো চাপিয়ে দিয়েছিল, তার মধ্যে দিয়ে একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছিল। আবার কখনও এই পরিবর্তন বিপর্যয় ও ভাঙনের মধ্যে দিয়েও আসতে পারে। আধুনিক বিশ্বে এমন একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে একটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব-হেজিমন দ্রুত উত্থানশীল প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হয়েছিল— যে ঘটনা এই কথারই ইঙ্গিত করে।
ব্রিটেন তার সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ অনেক বছর ধরে এবং অনেকটা এলোমেলোভাবে গড়ে তুলেছিল। আয়ারল্যান্ডের প্রাক-আধুনিক বিজয়, ক্যারিবিয়ানে জলদস্যুতা ও দাসভিত্তিক প্ল্যান্টেশন অর্থনীতি, বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ, যুদ্ধ এবং জোটের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে বিস্তার— এসবের ওপর ভিত্তি করে এই সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। এর পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্যভিত্তিক এক অনানুষ্ঠানিক সাম্রাজ্যও বিস্তৃত হয়েছিল— যার কেন্দ্রে ছিল লন্ডন শহর, আর যার শক্তির পেছনে ছিল রয়্যাল নেভি। এই ব্যবস্থা বুয়েনস এয়ার্স থেকে সাংহাই পর্যন্ত বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। কিন্তু ১৮৭০-এর দশক থেকে দ্রুত শিল্পায়িত নতুন শক্তিগুলো— নতুন বাজার ও প্রভাবক্ষেত্রের সন্ধানে— হঠাৎ করেই এই ঢিলেঢালা সাম্রাজ্যিক কাঠামোর ওপর হুমকির মতো দেখা দিতে শুরু করে: মহাদেশীয় যুক্তরাষ্ট্র নজর দেয় ক্যারিবীয় অঞ্চলের দিকে, জার্মানি ও রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, ফ্রান্স আফ্রিকায় তার বিস্তার বাড়াতে থাকে। ব্রিটেন এর প্রতিক্রিয়ায়, ইতিমধ্যেই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের মালিক হওয়া সত্ত্বেও, আগে থেকেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিয়ে রাখার জন্য অন্যরা দখল করার আগেই কৌশলগত অঞ্চলগুলোতে ভূমি-দখল অভিযান শুরু করে। নতুন করে দখল করা হয় সাইপ্রাস, মিশর, পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও নাইজার-বদ্বীপ, বার্মা, সারাওয়াক, উত্তর বোর্নিও এবং ব্রুনেই। ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী প্রতিরোধ দমন করতে ব্রিটেনকে আল আরাবি, মাহদি-দের, বোয়ের্স-দের বিরুদ্ধে আরও কঠোর দমননীতি নিতে হয়েছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অস্ত্র-প্রতিযোগিতা ও ভূখণ্ড দখলের যে হিড়িক শুরু হয়, সেখানে ব্রিটেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক মুক্ত-বাণিজ্যভিত্তিক সাম্রাজ্য থেকে জাতীয় সাম্রাজ্যবাদগুলোর সংঘর্ষময় নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটে— যেখানে গঠিত হয় বিভিন্ন শক্তির ব্লক ও মেরুকৃত জোট। জিওভানি আরিঘি-র ভাষায়, তখন বিশ্ব-হেজিমন ‘পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটাকেই নিজের প্রভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।’[54]
যদি এই কঠোরতা ব্রিটেনের আপেক্ষিক পতনের সূচনা চিহ্নিত করে থাকে, তাহলে ট্রাম্পপন্থীরা যুক্তি দিতে পারে যে সেটি তার নিজস্ব শর্তে একটি সফল পদক্ষেপ ছিল। কারণ লন্ডনের তার সাম্রাজ্য থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ও রক্তাক্ত প্রক্রিয়া শুরু হতে আরও সত্তর বছর এবং পঞ্চাশ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু লেগেছিল— এরপরই ক্ষমতার দণ্ডটি হস্তান্তরিত হয় আরও শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
আজকের বৈশ্বিক গতিবিধিকেও এমনভাবে কল্পনা করা সম্ভব যে তা ধীরে ধীরে মুক্ত-বাজারভিত্তিক বিশ্বায়ন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদী ব্লক গঠনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে— যেমনটি The Geometry of Imperialism-এ আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি চালিত হচ্ছে পুঁজিবাদী সঞ্চয় ও বিকাশের অসমতার দ্বারা, যা আগেই বিদ্যমান জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক ভৌগোলিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছে— এবং পশ্চিমি বিশ্বের সাম্প্রতিক পুনরায় অস্ত্রসজ্জার ঐকমত্য এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
তবে যদি ট্রাম্প সত্যিই বিশ্বকে এই পথে ঠেলে দেন— অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নিজের প্রভাবে টেনে নিয়ে আসেন— তাহলে এটিকে এখনও কেবল প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা যায়। অনেক কিছু নির্ভর করবে পরবর্তী প্রশাসন একই পথে এগোবে কি না তার ওপরে— যেমন বাইডেন করেছিলেন— যেখানে ভেনেজুয়েলার তেল-শিল্পের বেসরকারিকরণ মেনে নেওয়া হবে, হাভানায় শাসন পরিবর্তন করা হবে, ইরানের সিরিয়া-করণ ঘটবে, এবং চিনের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য নিজেকে সংহত করা হবে।
এই মুহূর্তে সামনে কোন পথ তৈরি হবে তা এখনও অনিশ্চিত ও অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে।

[1] Riley, Dylan. What is Trump? NLR 114. Nov-Dec 2018.
[2] Anonymous. I am Part of the Resistance inside the Trump Administration. NYT. Sep 5, 2018.
[3] Anderson, Perry. American Foreign Policy and Its Thinkers. London and New York 2017. ক্ল্যাসিকাল মার্কিন নীতিনির্ধারণের চিন্তাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে দেখুন: Stephanson, Anders. American Imperatives: The Cold War and Other Matters. London and New York 2025; আরও দেখুন: Stephanson, Anders and Kennan, George. ‘Correspondence, 1981-97’. NLR 156. Nov-Dec 2025.
[4] যে পরিস্থিতি ট্রাম্পের উত্থানের পথ সুগম করেছে তা জানার জন্য দেখুন: Kunkel, Benjamin. Great Griefs: Notes on the US Election. Salvage. Mar 10, 2021.
[5] Meaney, Thomas. Fortunes of the Green New Deal. NLR 138. Nov-Dec 2022.
[6] অনেকটা ক্লিন্টন যেভাবে রেগানের নীতিগুলি রূপায়ণ করেছিলেন, সেরকম, যদিও অনেক দুর্বল ক্ষয়াটে কায়দায়। ক্লিন্টনের বিষয়টা জানতে পড়ুন: Brenner, Robert. Structure vs Conjuncture. NLR 43. Jan-Feb 2007.
[7] French, Howard. Trump’s National Security Strategy Is a Blueprint for the Demise of the West. Foreign Policy. Dec 11, 2025; Walt, Stephen. The Predatory Hegemon: How Trump Wields American Power. Foreign Affairs. Feb3, 2026; Acharya, Amitav. The World-Minus-One Moment. Foreign Policy. Jan 5, 2026; Hirsch, Michael. No, the International Community Isn’t Dead Yet. Foreign Policy. Jan 28, 2026; Carney, Mark. Special Address. World Economic Forum, Davos. Jan 20, 2026; Merz, Friedrich. Special Address. World Economic Forum, Davos. Jan 23, 2026.
[8] ‘সমসাময়িক মার্কিন কথোপকথনে “প্রোটেকশন (নিরাপত্তা)” শব্দটি দুই বিপরীত অর্থ বহন করে। একটি শুভ, আরামদায়ক; অপরটি অমঙ্গলজনক। এক অর্থে “নিরাপত্তা” বলতে এমন ছবি ভেসে ওঠে যে বিপদের সময়ে কোনও শক্তিশালী বন্ধু ছাতা বাড়িয়ে দিয়েছে, কোনও বড়সড় বিমা, বা মাথার ওপরে শক্ত ছাদ। আর এক অর্থে এটা সেই র্যাকেট মনে করায় যেখানে কোনও স্থানীয় গুন্ডা ব্যবসায়ীদের থেকে জোর করে টাকা আদায় করছে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য— যে বিপদ সে নিজেই ঘটাবে বলে তার হুমকি।’— Tilly, Charles. ‘War Making and State Making as Organized Crime’, in Peter Evans, Dietrich Rueschemeyer and Theda Skocpol, eds, Bringing the State Back In. Cambridge 1985.
[9] Shapiro, Jeremy. How the Trump Administration Makes Foreign-Policy Decisions: The Technocratic versus Factional Processes. Blue Blaze. Feb 23, 2025. শাপিরোর ECFR-এর সহকর্মী মাজদা রুজ যুক্তিটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান তাঁর One Battle After Another, ECFR, Feb 6, 2026 নিবন্ধে। হোয়াইট হাউজ গসিপ বোঝার আর একটি উৎস এজরা ক্লাইন-এর NYT পডকাস্ট।
[10] আগের টীকায় উল্লিখিত এজরা ক্লাইনের পডকাস্ট দেখুন।
[11] Ruge, One Battle After Another.
[12] Klein et al.-এ Scherer, Michael. Who Has the Power in Trump’s White House? NYT. Feb 20, 2026.
[13] Walt, Predatory Hegemon.
[14] দ্রষ্টব্য, টীকা ১১। জেনারেল কিথ কেলোগ-এর উদ্ধৃতি।
[15] Marx, Karl. ‘The Civil War in France’ [1871]. The First International and After: Political Writings, Volume 3. London and New York. 2010.
[16] Tse-Tung, Mao. ‘On Contradiction’ [1937]. collected in Mao Tse-Tung, On Practice and On Contradiction. intr. Slavoj Zizek. London and New York. 2007. pp. 67-102.
[17] স্বীকৃতি: শাভেজ কারাকাসে জনসভায় বলতেন, “ওরা বলে আমি কুৎসিত— আমার ঠোঁট মোটা, আমার নাক থ্যাবড়া। মেনে নিলাম— আমরা কুৎসিত। কিন্তু আমরা ভেনেজুয়েলান!”
[18] দেখুন, Mosquera, Martín. The Meaning of Milei. NLR 155. Sep-Oct, 2025.
[19] এই মুখ্য রাজনৈতিক-মতাদর্শগত ফোকাসের মধ্যে কিন্তু ব্যবসায়ীসুলভ নিগ্রহগুলিকে ধরা হয়নি। যার মধ্যে পড়বে পানামা খালে জোর করে চিনা সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া এবং মেক্সিকোর কাছ থেকে বাণিজ্য ছাড় আদায় করার জন্য ড্রাগ-কার্টেলের ওপর একপক্ষীয় ড্রোন হামলার হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাগুলি।
[20] de Córdoba, José et al. The US Is Actively Seeking Regime Change in Cuba by the End of the Year. WSJ. Jan 22, 2026.
[21] দেখুন, Israel after Fordow. NLR 154. July-Aug 2025.
[22] ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক এবং স্ট্যাটিসক্যাল সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণ করে রাফসানজানি এবং খাতামির সময়কার ইরানের প্ল্যানিং বডির ডেপুটি হেড এবং রৌহানির মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মাসুদ নিলি তাঁর ২০২৫-এর ‘ইকোনমি অফ ইরান’ নিবন্ধে দেখিয়েছেন ইরানের মূল শিল্পগুলি— কেমিক্যাল, অটোমোবাইল, ধাতু এবং বৈদ্যুতিক পণ্য, তার সঙ্গে খাদ্যদ্রব্য এবং বস্ত্রশিল্পও— ২০১২-র নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অনুবাদের জন্য কেভান হ্যারিস-কে ধন্যবাদ।
[23] Parsi, Trita. Iran’s Despair Is US Policy. Foreign Policy. Feb 4, 2026; Gharagozlou, Leila. How Western Sanctions Undermined the Middle Class That Could Push for Reform. CNN. Oct 19, 2025.
[24] জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়ালৎজ আটলান্টিক-এর সম্পাদকের সঙ্গে আকস্মিক বিবাদে জড়িয়ে পড়লে ইয়েমেনে হামলা নিয়ে সিগনালগেট গ্রুপ চ্যাট ফাঁস হয়ে যায়। তাতে দেখা যায় এই হামলা নিয়ে ভান্সের বিরোধিতাকে দাবিয়ে দিয়েছিলেন মিলার। দেখুন, Full Transcript of Trump Team’s Yemen Attack Plan That Was Shared on Signal. Al-Jazeera. Mar 27, 2025.
[25] Ali, Marium. 12 Posts from “12-Day War”: How Trump Live-Posted Israel-Iran Conflict. Al-Jazeera. June 25, 2025.
[26] “Nobody Knows What I’m Going to Do”: Trump Embraces Ambiguity towards Iran. Al-Jazeera. Jun 18, 2025; Stein, Amichai. “Finish the Job”: How Netanyahu Convinced Trump to Strike Iran’s Nuclear Sites— Exclusive. Jerusalem Post. Jun 22, 2025. এছাড়াও দ্রষ্টব্য, টীকা ২১।
[27] Statement by PM Netanyahu. Israeli Ministry of Foreign Affairs. Jun 24, 2025.
[28] ২০২৫-এর আগস্টে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি ইরানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রউঞ্জের নিষেধাজ্ঞা আবার কার্যকর করার জন্য প্রচার শুরু করে। এই নিষেধাজ্ঞা দশ বছর আগে যখন JCPOA স্বাক্ষরিত হয়, তখন উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যদিও ট্রাম্প ২০১৮ সালেই JCPOA বাতিল করে দেন, তবুও স্টারমার, ম্যাক্রঁ এবং মার্জ দাবি করেন যে ইরান ওই চুক্তির শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, এবং তার জন্য শাস্তিস্বরূপ রাষ্ট্রপুঞ্জের সেই নিষেধাজ্ঞা আবার বলবৎ করতে হবে। সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রপুঞ্জ নিরাপত্তা পরিষদ সেটা কার্যকরও করে দেয়। Quillen, Stephen. UN Security Council Rejects Resolution to Extend Iran Sanctions Relief. Al-Jazeera. Sep 19, 2025.
[29] ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী সংসদীয় বিষয় দেখভালের জন্য বরিষ্ঠ আমলাদের নিয়ে গঠিত দ্য কাউন্সিল অফ গার্ডিয়ানস ২০২১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সমস্ত সংস্কারবাদী প্রার্থীদের বাতিল করে দেয়। ফলে ভোট পড়ে মাত্র ৪৮ শতাংশ, যেখানে ২০১৩ এবং ২০১৭-তে দুবারই ৭৩ শতাংশ করে ভোট পড়েছিল এবং দুবারই সংস্কারবাদী রৌহানি যথাক্রমে ৫১ এবং ৫৯ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে আরেক সংস্কারবাদী পেজেশকিয়ান-কে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২২-এর বিখ্যাত গান বারায়ে-কে— যা নারী, জীবন এবং স্বাধীনতার ওপর রচিত— পেজেশকিয়ান তাঁর প্রচারসঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করেন। ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল, এবং তার ৫০ শতাংশ পেয়ে পেজেশকিয়ান নির্বাচিত হন।
[30] Parsi, Trita. Iran’s Despair Is US Policy. Foreign Policy. Feb 4, 2026; Sharma, Yashraj. US Says It Caused Dollar Shortage to Trigger Iran Protests. Al-Jazeera. Feb 13, 2026.
[31] Bucharest Summit Declaration. NATO. Apr 3, 2008.
[32] পরে মর্কেল নিজেই বলেন, একটি ফেডারেল ইউক্রেনীয় প্রজাতন্ত্র গঠনের জন্য করা মিনস্ক চুক্তি আসলে মস্কোকে সময়ক্ষেপণে আটকে রাখার জন্যই ছিল— যতক্ষণ না ইউক্রেনকে ভবিষ্যৎ রুশ আক্রমণের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে প্রস্তুত করা যায়।
[33] দ্রষ্টব্য, টীকা ১৩।
[34] Campbell, Kurt and Doshi, Rush. America Alone Can’t Match China, but With Our Allies, It’s No Contest. NYT. Sep 7, 2025.
[35] মার্টিন স্যান্ডবু এবং এডওয়ার্ড লুস-এর মতো উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম বাদে ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর সমস্ত ভাষ্যকাররাই ট্রাম্পের প্রতি ইউরোপীয় তোষামোদকে ‘বাস্তববাদ’ নামক ইন্টেলেকচুয়াল আচ্ছাদনে আবৃত করেছেন।
[36] এইরকম একটা কর্মসূচির বিষয়ে জানতে পড়ুন: Slezkine, Peter and Kavanagh, Jennifer. The Fatal Flaw in the Transatlantic Alliance. Foreign Affairs. Sep 30, 2025.
[37] National Security Strategy of the United States of America. Washington DC 2017. চিনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান আটলান্টিক এস্টাবলিশমেন্টের ‘আমেরিকার শক্তিশালী হওয়া উচিত’ অবস্থানের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে বলে মন্তব্য করা হয়েছিল Economist-এর সম্পাদকীয়তে।
[38] NATO 2022 Strategic Concept, adopted at the Madrid Summit, June 2022.
[39] Friedberg, Aaron. A Contest for Supremacy: China, America and the Struggle for Mastery in America. New York. 2011. pp. 119, 147, 174, 167.
[40] Friedberg. Contest for Supremacy. pp. 124-38. হেজিমনি শব্দের ক্ল্যাসিক্যাল এবং সমসাময়িক চিনা অর্থ এবং ব্যবহার জানার জন্য দেখুন: Anderson, Perry. The H-Word: The Peripeteia of Hegemony. London and New York. 2017. Chap. 9.
[41] Friedberg. Contest for Supremacy. p. 146.
[42] Rea, Joel. A Forward Denial Defence: Inside the First Island Chain. USNI. Mar 2025.
[43] Mitchell, Wess. The Grand Strategy Behind Trump’s Foreign Policy. Foreign Policy. Jan 14, 2026.
[44] দেখুন, যথাক্রমে, Yongle, Zhang. Reconfiguring Hegemony: Modes of Winning from Fukuyama to Trump. NLR 153. May-June 2025. pp. 5-6; Friedberg, Aaron. The Trump Administration’s Surprising China Policy. on Conversations with Bill Kristol. Sep 11, 2025.
[45] Henwood, Doug. Trump’s Big Beautiful Bill Will Deepen Inequality. Jacobin. Jul 11, 2025.
[46] OECD ডেটা।
[47] ২০২৬-এর ১৩ জানুয়ারি ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি থেকে মিলার আইসিই অফিসারদের উদ্দেশে পাঠানো বার্তায় বলেছেন: ‘আপনাদের কর্তব্য পালনের জন্য আপনাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় অনাক্রম্যতা প্রদান করা হচ্ছে। যে-কোনও ব্যক্তিই যে আপনাদের গায়ে হাত দেবে, বা আপনাদের থামাতে চাইবে, বা আপনাদের কাজে বাধা দেবে সে-ই গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হবে। আপনাদের করত্তব্য পালনে আপনারা সম্পূর্ণ অনাক্রম্য, এবং কেউই— কোনও সিটি অফিসিয়াল, কোনও স্টেট অফিসিয়াল, কোনও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, কোনও বামপন্থী বিক্ষোভকারী, কোনও ঘরোয়া বিদ্রোহী— কেউই আপনাদের আইনি বাধ্যতা এবং কর্তব্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।’ Klein, Ezra. Trump Has Overwhelmed Himself. NYT. Feb 1, 2026.-এ উল্লিখিত।
[48] Wypijewski, JoAnn. Life in Death. NLR–Sidecar. Feb 11, 2026.
[49] The Actions of ICE. Marist Poll. Feb 5, 2026. এর সঙ্গেই, ৫৬ শতাংশ মনে করেন শুল্ক অর্থনীতির ক্ষতি করছে এবং ৬৭ শতাংশ গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন।
[50] Lippmann, Walter. US Foreign Policy: Shield of the Republic. New York. 1943. p. 7. D’Eramo, Marco. American Decline? NLR 135. May-June 2022. p. 5.-এ উল্লিখিত।
[51] Paradigm Shifts. NLR 128. March-April 2021.
[52] ডেমোক্রাটদের দুর্নীতি এই পর্যায়ে এত দূর পৌঁছেছিল যে বাইডেনের কিচেন ক্যাবিনেট যখন তাঁকে দ্বিতীয় দফার জন্য গুরুতর অসুস্থ এবং মানসিকভাবে অপ্রস্তুত একজন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরল, তখনও পার্টির নেতৃত্ব এমনই শ্রদ্ধাবনত হয়ে থাকল যে সে বিষয়ে সিদ্ধান্তই নিয়ে উঠতে পারল না, এবং প্রাইমারি সিজন পার হয়ে গেল।
[53] আদর্শ গঠন অনুসারে এই ব্যবস্থার ভিত্তি হল রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বাস্তব এবং আকাঙ্ক্ষিত আইনের শাসনের প্রক্ষেপণ। আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিষ্ঠিত এই শাসনের হাতে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ থাকবে— যেমন, সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে গৃহীত একটি আইনবিধি, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা এবং দণ্ডবিধি। এবং যার পরিপূরক অন্য কিছু থাকবে না।
[54] Arrighi, Giovanni. The Geometry of Imperialism: The Limits of Hobson’s Paradigm. London and New York. 1983. rev. ed, trans. Patrick Camiller.

*নিবন্ধটি নিউ লেফট রিভিউ ১৫৭ (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০২৬)-র সম্পাদকীয় নিবন্ধ

