অমৃতের সন্ধানে

Why, alone of all the more-than-five-hundred-million, should I have to bear the burden of history?

―Salman Rushdie, Midnight’s Children

ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ৭৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর এই বিশেষ সংখ্যাটি যখন প্রকাশ হতে চলেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ধেক গোলার্ধ দূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক সলমন রুশদি আততায়ীর ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে শুয়ে নিজের একটি চোখ, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের স্থিতি বাঁচাতে লড়াই চালাচ্ছেন৷

পাঠকের মনে হতেই পারে, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীতে সে বিষয়ে প্রকাশিতব্য লেখাপত্রের মুখবন্ধে এক বিদেশি লেখকের ছুরিকাহত হবার প্রসঙ্গ টেনে আনার যৌক্তিকতা কী? সরাসরি কোনও যোগসূত্র অবশ্যই নেই, কিন্তু অবশ্যই কিছু আশ্চর্য সমাপতন রয়েছে, এবং সেগুলি এতই প্রতীকী ও কৌতূহলকর যে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হল না।

রুশদির ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ উপন্যাসের উপজীব্য ছিল ভারতের স্বাধীনতার মাহেন্দ্রক্ষণে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট (অর্থাৎ ঠিক ১৪ আগস্ট মধ্যরাত্রে) জন্ম নেওয়া শিশুদের জীবনের কাহিনি। এই জাতকরা নবীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের সমবয়সী, তাদেরই সহোদর। তাই এইসব জাতকের জীবনকাহিনি এক হিসেবে এই উপমহাদেশেরই ইতিহাস, ঘাতে-প্রতিঘাতে, উত্থানে ও পতনে ভারতবর্ষের আখ্যান যা উপন্যাসটি জুড়ে কথিত হয়েছে। অর্থাৎ রুশদির উপন্যাসের মুল চরিত্র মধ্যরাত্রির সন্ততিরাও আজ ৭৫ বছর বয়সী, স্বয়ং লেখকও যেমন। স্বাধীনতার বছরে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালেই বোম্বেতে জন্মেছিলেন এই লেখক, ২০২২-এ এসে তাঁরও বয়স ৭৫ হল। সুতরাং বলা যায়, তিনি নিজেও যেন আরেক মিডনাইটস চাইল্ড। প্রসঙ্গত, বিদেশি নাগরিক ও বিত্তশালী লেখক রুশদি ব্যক্তিগতভাবে ভারতীয় সমাজের প্রতিনিধি না হলেও তিনি আজীবন যে চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও মুক্তবুদ্ধির স্বপক্ষে কথা বলেছেন, যা আজ থেকে ৭৫ বছর আগে অর্জিত স্বাধীনতার মূল নির্যাস। ১৯৪৭ সালে যে নীতি, আদর্শ ও দূরদর্শিতার উপর ভিত্তি করে আমাদের পিতৃপুরুষেরা দেশকে স্বাধীন করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে এক বহুত্ববাদী সংবিধান রচনা করেছিলেন, ৭৫ বছর পর সেই স্বাধীনতার চেতনা খোদ রাষ্ট্রের হাতেই নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। ভারত রাষ্ট্রের জন্মক্ষণে পশ্চিমি ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, জাতিবাদে বিভক্ত, সমস্যাজর্জর ভারতের পক্ষে স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বেশিদিন টিঁকে থাকা দুষ্কর। শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে আমরা হাজারো সমস্যা নিয়েও একত্রিত আছি, সঙ্ঘবদ্ধ আছি, খাতায় কলমে এখনও বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবেই বেঁচে আছি। অন্যদিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েও পাকিস্তান জন্মের আড়াই দশকের মধ্যেই ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেছে। এটা অবশ্যই রাষ্ট্র হিসেবে ভারতবর্ষের জোরের জায়গা। পাশাপাশি, যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির দৃঢ়তা এবং নিরপেক্ষ অভিভাবকসুলভ ভূমিকা আমাদের দেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দিয়েছিল, গত এক দশকেরও কম সময়ে সেই সংস্থাগুলিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্বল করা হয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে দেশের নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরকারের অনুগত আজ্ঞাবহে পরিণত। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের নির্ধারক প্রতিটি আন্তর্জাতিক সূচকে প্রায় মুক্তিবেগে নিচের দিকে নামছি আমরা। শিশুর পুষ্টি থেকে শুরু করে সাংবাদিকের স্বাধীনতায় ভারতের স্থান এখন একেবারে খাদের দিকে, প্রায় গৃহযুদ্ধদীর্ণ আফ্রিকার চরম দরিদ্র দেশগুলির সঙ্গে তুলনীয়। দেশে বেকারত্বের হার দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের সঙ্গে সমতুল, অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এত অন্ধকার সময় আমাদের স্বাধীন দেশে এর আগে আর আসেনি৷ কিন্তু যা সবচেয়ে আশঙ্কার তা হল, নিজের ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদী, আগ্রাসী ও একমাত্রিক রাজনীতির শিকার হচ্ছে আমাদের দেশ৷ আমরা দেখতে পাচ্ছি, ৭৫ বছরে পৌঁছে আমাদের দেশ মহাড়ম্বরে স্বাধীনতার উৎসব পালন করছে ঠিকই, কিন্তু তার আত্মা গুরুতর আঘাতে আক্রান্ত, ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত৷ ঠিক একইভাবে ৭৫ বছর বয়সী সলমন রুশদি এক চূড়ান্ত ধর্মীয় আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর সশস্ত্র মৌলবাদীর অতর্কিত আক্রমণে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন, পঙ্গুত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছেন। মিলগুলি কি আশ্চর্যজনকভাবে প্রতীকী, এবং ভয়াবহ, তাই না?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর এই বিশেষ সংখ্যায় উঠে এসেছে মধ্যরাত্রির সন্ততি ভারত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথা। প্রায় স্বাধীনতার সমবয়সী আশীষ লাহিড়ী লিখছেন নিজের স্মৃতি ও স্বাধীনতার উত্তরাধিকারের কথা। ৭৫ বছর পেরিয়ে এসে ছদ্ম-ক্ষমতায়ন ও ছলনাময় এই ডিজিটাল যুগে এসে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের অবস্থান ও অধিকার ঠিক কতটুকু— প্রশ্ন তুলেছেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব উদযাপনের আড়ালে কীভাবে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে সামগ্রিক অপশাসনের কদর্য মুখ, তা খুলে খুলে দেখাচ্ছেন অশোক মুখোপাধ্যায়। স্বাধীনতা বলতে আমাদের নতুন প্রজন্ম ঠিক কী বোঝে, ১৫ আগস্ট মানে কি স্রেফ আরেকটা ছুটির দিন, শনি-রবি সহযোগে এবছর কি শুধুই একটা লং উইকেন্ড, নাকি স্বাধীনতার চেতনার আদৌ কোনও অস্তিত্ব অবশিষ্ট আছে নবীন প্রজন্মের মনে? প্রশ্ন করেছেন চার্বাক মিত্র।

গরল উঠে আসছে হাতে। আমরা তা-ও হাল ছাড়িনি। যা হওয়ার কথা ছিল হয়নি। যা পাওয়ার কথা ছিল পাওয়া যায়নি। তা-ও এখনও অযুত সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের দেশের মানুষজনের মধ্যে। ইতিহাসের বিপুল ভার আমাদের বইতেই হবে, কিন্তু সার্থকতার খোঁজ তো বন্ধ করতে চলবে না। প্রিয় পাঠক, আপনার হাতে সবিনয়ে তুলে দেওয়া হল চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর বিশেষ স্বাধীনতা ৭৫ সংখ্যা— ‘অমৃতের সন্ধানে’৷

পড়ুন৷ পড়ান। মতামত দিন।

সূচি