সঙ্কীর্ণতার পাকদণ্ডীতে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের রাজনীতি?

সুমন নাথ

 


পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষেত্র বরাবরই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক। বর্তমানে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতীয় জনতা পার্টি উভয়েই বাঙালি পরিচয়ের শক্তিশালী অস্ত্রকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। যদিও বাঙালি আত্মপরিচয়ের উত্থান অপেক্ষাকৃত নতুন বলে ভ্রম হতে পারে, কিন্তু এটি কোনও আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়। এর মূল রাজ্যের ইতিহাসের গভীরে নিহিত। এর সাম্প্রতিক উগ্র রূপ বাংলা পক্ষের মতো নতুন জাতি-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই গভীর পরিবর্তনটি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” এবং “বহিরাগত” দ্বন্দ্বে উক্ত নির্বাচনটি বাংলার আত্মপরিচয়কেন্দ্রিক একটি গণভোটে পরিণত হয়

বাংলা এবং তার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র কলকাতা বিগত প্রায় ২০০ বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের চেতনায় এক বিশ্বজনীনতার ছবি তুলে ধরেছে। কলকাতা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল বঙ্গীয় রেনেসাঁসের সূতিকাগার হওয়ার দরুন, বঙ্গদেশ এক প্রাণবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পীঠস্থান হয়ে ওঠে। এই বৌদ্ধিক চর্চার প্রতিফলন আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বজনীন মানবতাবাদ, রামমোহন রায়ের যুক্তিবাদী সংস্কারবাদ এবং শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের সমন্বয়ী আধ্যাত্মিকতার মধ্যে আজও খুঁজে পাই। ভদ্রলোকের যুগ বলতে যা বোঝায় তা অন্তত সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীগত বিভাজনকে ছাপিয়ে যেতে পেরেছিল। ভদ্রলোক সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা আত্মপরিচয়কেন্দ্রিক সঙ্কীর্ণতাকে অতিক্রম করার এক সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে এই উচ্চপ্রশংসিত “বাংলার ধারণা”, কতটা কলকাতা এবং শহরকেন্দ্রিক আর কতটা বৃহত্তর বাংলাকে উপস্থাপিত করতে পারে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই আপাত উদারপন্থী সংস্কৃতি আজ এক অস্তিত্বের সংকটের মুখে। এক উগ্র, আগ্রাসী, এবং জাতি-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জোয়ার পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূ-দৃশ্যকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে এবং ক্রমান্বয়ে তা বিশ্বজনীনতার ভাষাকে প্রতিস্থাপিত করছে পরিচয়ের ব্যাকরণ দিয়ে।

এ-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষেত্র বরাবরই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক। বর্তমানে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতীয় জনতা পার্টি উভয়েই বাঙালি পরিচয়ের শক্তিশালী অস্ত্রকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। যদিও বাঙালি আত্মপরিচয়ের উত্থান অপেক্ষাকৃত নতুন বলে ভ্রম হতে পারে, কিন্তু এটি কোনও আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়। এর মূল রাজ্যের ইতিহাসের গভীরে নিহিত। এর সাম্প্রতিক উগ্র রূপ বাংলা পক্ষের মতো নতুন জাতি-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই গভীর পরিবর্তনটি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” এবং বহিরাগত দ্বন্দ্বে উক্ত নির্বাচনটি বাংলার আত্মপরিচয়কেন্দ্রিক একটি গণভোটে পরিণত হয়।

এই পরিস্থিতিতে “বাঙালি পরিচয়”কে একটি সুনির্দিষ্ট, অপরিবর্তিত, আদিম সত্তা হিসেবে না দেখে, একটি গতিশীল, পরিবর্তনশীল এবং সদাবিতর্কিত কাঠামো হিসেবে দেখা জরুরি। এই সদা-পরিবর্তনশীল কাঠামোটি এক বিশেষ ধরনের প্রতীকী পরিবেশনায় ন্যস্ত। কাল্পনিক আত্মীয়তায় আমন্ত্রণ— সকলের মেয়ে/দিদি, এবং “অপরায়ন”— বহিরাগত— এর ক্রমাগত নির্মাণের মাধ্যমে আত্মপরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতি বাংলায় রূপায়িত ও পুনর্গঠিত হচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সাম্প্রতিক বাঙালি পরিচয়-ভিত্তিক রাজনীতির বিস্তারকে কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে নয়, বরং রাজ্যের অর্থনৈতিক অবক্ষয়, সাংস্কৃতিক প্রান্তিকতা এবং আধুনিক ভারতে ভারতীয় হয়ে ওঠার সংজ্ঞার গভীরে সন্ধান করতে হবে।

 

বাংলার বর্তমান পরিচয়-ভিত্তিক রাজনীতির উৎস— ভদ্রলোক-সংস্কৃতি

ভদ্রলোক-সম্পর্কিত তাত্ত্বিক ধারণাটি শুধুমাত্র শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি বিশেষ শ্রেণি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত, এমনটি নয়। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ওয়েবারের ধারণা অনুযায়ী এটিকে একটি ধ্রুপদী “অবস্থান গোষ্ঠী” (status group) হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। এর সদস্যপদ কিছু কিছু সাংস্কৃতিক পরিচায়ক দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়, যেমন, কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলায় দক্ষতা; বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবিঠাকুর পর্যন্ত বিস্তৃত সাহিত্য ক্যাননের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা; একটি বিশেষ নান্দনিক সংবেদনশীলতা; এবং ভদ্রতা নামক একটি আচরণবিধির প্রতি আনুগত্য। ঔপনিবেশিক পটভূমিতে তৈরি এই পরিচয়টি ছিল সহজাতভাবেই স্ববিরোধী। এটি পশ্চিমি চিন্তাভাবনা এবং উদার আদর্শের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে শুধুমাত্র যে বিশ্বজনীন ছিল তা নয়, বরং এর সামাজিক বিন্যাসের কারণে ভদ্রলোক-সংস্কৃতি গড়েই ওঠে একটি তীব্র অপরায়নের ভিত্তিতে। বাংলা হিন্দুদের মুলত তিনটি উচ্চবর্ণের ব্যক্তিরাই এর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই এর সাংস্কৃতিক মূলধন রাজ্যের বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ ও নিম্নবর্ণের বাঙালি এবং মুসলিম জনসংখ্যার কাছে কখনওই সহজলভ্য নয়।

ভারতীয় আধুনিকতার অগ্রদূত হিসেবে এই অভিজাত গোষ্ঠীর আত্ম-উপলব্ধি যে “বাংলার ধারণা” তৈরি করে তা অচিরেই বাঙালি সংস্কৃতিকে ভদ্রলোক সংস্কৃতির সমার্থক করে তোলে। এর ফলে একটি স্তরবিন্যস্ত সামাজিক ব্যবস্থার নির্মাণ সম্ভব হয়। এই স্তরের বিন্যাস এমন যে, এখানে সাংস্কৃতিক বৈধতা জাতি ও শ্রেণির সঙ্গে জড়িত অথচ প্রায় অদৃশ্য। বাংলার বিশ্বজনীনতা অতএব কখনওই সর্বজনীন নয়। বরং এই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত সামাজিক গোষ্ঠী যেভাবে বাকিদের বাদ দিয়ে নিজেরা সমাজের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে তা এই ভদ্রলোকবৃত্তের বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে একটি চাপা অসন্তোষ এবং বর্জিত-অবহেলিত হয়ে পড়ার অনুভূতি তৈরি করে। আধুনিক পরিচয়-ভিত্তিক রাজনীতি এই অনুভুতিকে সহজেই কাজে লাগিয়ে ফেলে।

 

দেশভাগের ক্ষত এবং সাংস্কৃতিক বিভাজন

‘ভদ্রলোক’ যেমন একটি উল্লম্ব শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করেছিল, তেমনই ১৯৪৭ সালের বাংলা বিভাজন একটি আনুভূমিক বিভেদ তৈরি করেছিল। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি কেবল রাজনৈতিক সীমানা পুনর্নির্মাণ নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক বিভাজন। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে একটি গভীর ও স্থায়ী “শরণার্থী চেতনা” তৈরি হয়। দেশভাগ বাঙালি পরিচয়কে দুটি পরস্পর বিরোধী উপ-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে: ঘটি— পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দা; এবং বাঙাল— পূর্ববাংলা, এখন বাংলাদেশের শরণার্থী।

বাঙাল সম্প্রদায়ের জীবন্ত অভিজ্ঞতা ছিল ট্রমা, ভিটেমাটি হারানোর কষ্ট, এবং পশ্চিমবঙ্গে টিকে থাকা ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার মরিয়া সংগ্রাম। এই অভিজ্ঞতা, যা প্রফুল্ল চক্রবর্তীর দ্য মার্জিনাল মেন-এর মতো অসংখ্য স্মৃতিকথা এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজে নথিভুক্ত হয়েছে। জমি, অস্তিত্ব এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ সম্পর্কে সে সময় যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয় তা ঘটি-বাঙাল আন্তঃক্রিয়া, প্রত্যক গোষ্ঠীর স্টিরিওটাইপ এবং তা সম্পর্কিত সামাজিক উত্তেজনা নিয়েই এ রাজ্যের সামাজিক কাঠামোর একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। এই ঐতিহাসিক ক্ষত, সমষ্টি-সম্মিলিত উদ্বেগের একটি ভাণ্ডার তৈরি করেছে, যেমন— বাস্তুচ্যুতি, বঞ্চনা, এবং সাংস্কৃতিকভাবে পরাভূত হওয়ার ভয়— যা বাঙালি মননে চিরস্থায়ী। সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রায় সমগ্র দেশ জুড়ে এই ট্রমাকে পুনরায় সক্রিয় করেছে, যা বাঙালি পরিচয়ের প্রতি অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে বারবার উঠে এসেছে।

 

বামফ্রন্ট আমলে পরিচয়-এর সূক্ষ্ম ব্যবহার

বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসন (১৯৭৭-২০১১) এই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) প্রাথমিক মতাদর্শ শ্রেণি-সংগ্রামে নিহিত ছিল, যা “বুর্জোয়া” পরিচয়-ভিত্তিক রাজনীতিকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তবে, বামফ্রন্ট কখনই বাঙালি পরিচয়কে মুছে ফেলেনি; বরং, এটিকে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক আলোচনা শ্রেণিনির্ভর হলেও, রাজ্য সক্রিয়ভাবে ভদ্রলোক সংস্কৃতির একটি নির্দিষ্ট, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্করণকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে প্রায় সমগ্র শাসনকালে। বামফ্রন্ট ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমা, থিয়েটার, এবং সাহিত্যকে রক্ষা করার কৌশলে বাংলার উচ্চ সংস্কৃতির অভিভাবক হয়ে ওঠে। নৃতাত্ত্বিকভাবে, এই সময়কালকে অর্থনৈতিক স্থবিরতার পাশাপাশি “সাংস্কৃতিক সংরক্ষণবাদ” হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বামফ্রন্ট সরকার বাঙালি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক গরিমাকে সংরক্ষণ করেছিল, কিন্তু শিল্প বৃদ্ধি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমসাময়িক অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। এর ফলে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয় যারা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে গভীরভাবে গর্বিত, কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। ভারতের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কলকাতার পতন হয় এবং মূলধন ও চাকরির বহির্গমন ক্রমান্বয়ে একটি শূন্যতা তৈরি করে। ২০১১ সালে যখন বামফ্রন্টের শ্রেণি-ভিত্তিক রাজনৈতিক আখ্যান ভেঙে পড়ে, তখন এটি এমন একটি জনগোষ্ঠীকে রেখে যায় যারা সাংস্কৃতিক দিক থেকে সচেতন এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ। পরিচয়ের উদ্যোক্তাদের উত্থানের জন্য আসলেই এটি একটি উপযুক্ত পরিস্থিতি, যারা সাংস্কৃতিক গর্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষোভকে একত্রিত করতে পারে।

 

বাংলা পক্ষ ও ‘বাঙালিকরণ’

বামফ্রন্ট কর্তৃক সৃষ্ট শূন্যতায় নতুন রাজনীতি প্রবেশ করে যা বাঙালি পরিচয়কে রাজনৈতিক সংহতির প্রাথমিক অক্ষ হিসেবে পুনরায় কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বাংলা পক্ষ, একটি জাতি-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী সংগঠন যা ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বাঙালির ‘অভিযোগের জাতিসত্তা’ হিসেবে কাজ করছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শিকার হওয়ার একটি আখ্যানকে এরা সূক্ষ্মভাবে নথিভুক্ত, প্রসারিত এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন।

গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে, বাংলা পক্ষের প্রকল্পকে বাঙালিত্বের সীমানা-নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের একটি অনুশীলন হিসেবে বোঝা যেতে পারে। এর কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হল বাঙালি “অন্তর্ভুক্ত গোষ্ঠী”-র সঙ্গে বিভিন্ন “বহির্ভূত গোষ্ঠীর” মধ্যেকার রেখাগুলিকে আরও তীক্ষ্ণ ও সুস্পষ্ট করে তোলা। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য দুটি: ১) “হিন্দি-হিন্দুস্তানি” বলয়ের সাংস্কৃতিক জীবনধারা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ, এবং ২) অবাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে মাড়ওয়াড়ি এবং গুজরাতিদের দ্বারা কথিত অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। বাংলা পক্ষের আখ্যানটি সহজ এবং শক্তিশালী: বাঙালিরা, একটি উচ্চতর সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী, এবং বাইরের লোকেরা তাদের নিজেদের মাতৃভূমিতে পদ্ধতিগতভাবে প্রান্তিক করেছে। এই গল্পে, বাঙালিরা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি উপনিবেশিত জাতি হিসেবে উপস্থিত। এই আখ্যানটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহার এবং মাঠে নেমে প্রতিবাদী সক্রিয়তার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে প্রচারিত হয়।

বাংলা পক্ষের উল্লিখিত পদ্ধতির ব্যবহারে পশ্চিমবঙ্গে একটি সমৃদ্ধ প্রতীকী ভাণ্ডার আত্মপ্রকাশ করে। বাংলা ভাষাকে, বাংলাভাষীদের একটি পবিত্র, আঞ্চলিক চিহ্ন ও তার ধারক হিসেবে তুলে আনা হয়। সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রচারাভিযানগুলিতে দোকানপাটের সাইনবোর্ড, ব্যাঙ্কিং পরিষেবায় এবং সরকারি কার্যালয়গুলিতে বাংলা ভাষার প্রাধান্য দাবি করা হয়। ভাষাকে কেবল যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি পবিত্র বস্তু, বাঙালি ‘উপজাতির’ একটি ‘টোটেম’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বহু অঞ্চলে একটি হিন্দি বা ইংরেজি সাইনবোর্ডের ওপর বাংলা লিপিতে রং করা অত্যন্ত প্রকট। এটিকে আমরা একটি অঞ্চল পুনরুদ্ধার এবং বিদেশি দূষণমুক্তিকরণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে পারি। স্থানীয় চাকরিতে “ভূমিপুত্রদের” জন্য ৮০-৯০ শতাংশ সংরক্ষণের দাবি কেবল একটি অর্থনৈতিক নীতির প্রস্তাব নয়, ন্যায়বিচার পুনরুদ্ধারের জন্য একটি আচারগত দাবি হিসেবে উঠে আসে। এটি বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সরাসরি বস্তুগত কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে।

বাংলা পক্ষ ফেসবুক এবং টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মগুলিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে একটি “ডিজিটাল বাঙালি উপজাতি” তৈরি করেছে। এখানে মিম, ঐতিহাসিক অভিযোগ (কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তর, মাল পরিবহনের চার্জ সমতুল্য করা), এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভিডিও বাঙালি বনাম নির্দিষ্ট “অপর”কে নির্মাণ করে। এমতাবস্থায় বাংলা পক্ষ তাদের অনলাইন উপস্থতির মাধ্যমে একটি প্রতিধ্বনি কক্ষ (echo chamber) হিসেবে কাজ করে। এখানে একটি সুসংহত গোষ্ঠীগত পরিচয় অপরায়নের প্রক্রিয়ার মারফত নির্মিত হয়ে চলে।

এই প্রক্রিয়াতে “বহিরাগত”-কে অপরায়নের মাধ্যমে নির্মাণ, নির্দিষ্ট এবং স্টিরিওটাইপে পরিপূর্ণ। “হিন্দিভাষী” ব্যক্তিকে প্রায়শই সাংস্কৃতিক দিক থেকে স্থূল এবং বাঙালির পরিশীলনহীন পরিপন্থী হিসেবে চিত্রিত করা হয়। মাড়ওয়াড়ি বা গুজরাতি ব্যবসায়ীকে একজন অসাধু শোষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধরনের অপরায়ন, বহির্ভূত গোষ্ঠীকে তার মানব অস্তিত্ব থেকে বিচ্যুত করে কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যে নামিয়ে আনে, যা তাদের প্রতি ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। বাংলা পক্ষ বাঙালির প্রতিনিয়ত অভিযোগের মাটিতে কর্ষণ করে উপ-জাতীয়তাবাদের বীজ রোপণ করেছে।

 

পরিচয়ের মহাযাজিকা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘বাঙালিয়ানা’র পরিবেশনা

যদি বাংলা পক্ষ চিত্রনাট্য লিখে থাকে, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেস তার চূড়ান্ত পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির পুরো শক্তির মুখোমুখি হয়ে, তৃণমূল একটি কৌশলগত পরিবর্তন ঘটায়। এরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে governance-এর লড়াই থেকে বাংলার আত্মার সংরক্ষণের সাংস্কৃতিক যুদ্ধে রূপান্তরিত করে। তৃণমূলের ২০২১-এ নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে ছিল একটি কাল্পনিক আত্মীয়তার সূক্ষ্ম ব্যবহার। যে আত্মীয়তার শর্ত ও বাধ্যবাধকতা অ-আত্মীয়দের ওপর প্রয়োগ করা সম্ভব। বছরের পর বছর ধরে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বজনীন “দিদি” ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। এটি একটি সচেতনভাবে নির্মিত রাজনৈতিক পরিচয়। এই পরিচয় তাঁকে বাঙালি পরিবারের কাঙ্ক্ষিত কাঠামোর মধ্যে বারবার পুনঃস্থাপন করে। দিদি হলেন কর্তৃত্বের প্রতীক এবং একই সঙ্গে তিনি যত্ন, স্নেহ এবং সুরক্ষারও প্রতীক। তিনিই পরিবারের দেখাশোনা করেন, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি pre-political ভূমিকা। তিনি তাঁর এই ভাবমূর্তির নির্মাণ আনুগত্য এবং মানসিক সংযোগ দিয়ে গড়ে তুলেছেন। ২০২১ সালে, “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” স্লোগানের মাধ্যমে এটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। নিজেকে বাংলার “মেয়ে” হিসেবে উপস্থাপন করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যকে একটি প্রশাসনিক ইউনিট থেকে একটি প্রতীকী পরিবারে, এবং নির্বাচনকে একটি পারিবারিক ঘটনায় রূপান্তরিত করেন। এ-প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে, “কন্যা” পরিবারের সম্মানের প্রতীক। স্লোগানটি ইঙ্গিত দেয় যে এই সম্মান বহিরাগতদের দ্বারা হুমকির মুখে, এবং শুধুমাত্র “নিজের মেয়ে”ই এটি রক্ষা করতে পারে, এবং তা পারে যদি পরিবার তাঁর পাশে থাকে। এই অনুভুতি গভীরভাবে অনুরণিত হয়েছিল রাজ্যজুড়ে। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক পছন্দকে “পরিবার” রক্ষা করার একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত করে। “নিজের মেয়ে” শব্দটি আত্মীয়তা এবং একটি আঞ্চলিকতার মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সংযোগ তৈরি করে। মমতা কেবল কোনও মেয়ে নন; তিনি এই মাটির, এই রক্তের— এই অনুভূতি হয়ে ওঠে সর্বজনীন। “কন্যা” আখ্যানটি ব্যবহার করে তৃণমূল বিজেপিকে বহিরাগত হিসেবে পদ্ধতিগত, আচারগত অপর হিসেবে ঘোষণা করে। এটি একটি বহু-পাক্ষিক পরিবেশনা।

প্রথমত, তৃণমূল নেতা এবং সমর্থকরা বিজেপির জাতীয় নেতাদের বাংলা শব্দ এবং নাম ভুল উচ্চারণের জন্য সর্বদা বিদ্রূপ করেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক রসিকতা নয়; এটি তাঁদের সাংস্কৃতিক অক্ষমতার চিহ্ন, বাঙালি হয়ে ওঠার মৌলিক পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার নিদর্শন হিসেবে উঠে আসে।

দ্বিতীয়ত, তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির আগ্রাসী, পুরুষালি “জয় শ্রী রাম” স্লোগানকে বাংলার নিজস্ব ভক্তিপূর্ণ ঐতিহ্যের সঙ্গে তুলনা করে, মিলিয়ে দেখায় দেবী দুর্গার পূজার সঙ্গে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ্যে চণ্ডীপাঠ করা একটি শক্তিশালী counter-ritual হিসেবে উঠে আসে। এটি মমতাকে আমদানিকৃত, বিজাতীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একটি দেশীয় বিশ্বাসের প্রধান পুরোহিত হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত স্টাইল এই পরিবেশনার একটি মূল অংশ হয়ে ওঠে। তার সাধারণ, সাদা সুতির শাড়ি, সাধারণ রবারের চপ্পল, এবং সাধারণ মানের বাংলা একটি নিখাদ সর্বজনীন বাঙালিয়ানার একটি প্রতিনিধি হিসেবে তুলে আনে। এটি বিজেপির জাতীয় নেতাদের পরিষ্কার, পেশাদারভাবে পরিচালিত ভাবমূর্তির সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে। ফলত তৃণমূল বিজেপিকে সফলভাবে একটি কর্পোরেট দ্বারা পরিচালিত, বিচ্ছিন্ন শক্তি হিসেবে চিত্রিত করে ফেলে।

২০২১ সালের বাংলার বিজেপির ফলাফল গভীর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অনুসন্ধানের একটি উদাহরণ হিসেবে অধ্যয়ন করা যেতে পারে। দলটি, তার দেশব্যাপী হিন্দুত্ব আখ্যানের সাফল্যের সঙ্গে অভ্যস্ত, ফলে বাংলার অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে এরা ব্যর্থ হয়।

 

হিন্দুত্ব-বাঙালি ভদ্রলোকবাদের সমন্বয়ের সমস্যা

বিজেপির মূল আদর্শ হল হিন্দুত্ব, যা একটি এক-হিন্দু পরিচয় তৈরি করতে চায়। এই প্রকল্পটি বাংলা ভদ্রলোক ঐতিহ্যের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ভদ্রলোক সংস্কৃতি তার সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও, একটি সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাতন্ত্র্যের জন্য গর্বিত। বিজেপির মডেল, যা হিন্দু ভোটকে সংহত করতে কাজ করেছিল এর আগের ভোটগুলিতে, বাংলায় ২০২১-এ সেটি হিন্দু পরিচয়ের উদযাপন হিসেবে নয়, বরং অনন্য বাঙালি রূপকে মুছে ফেলার বোধ হিসেবে উঠে আসে। সাধারণ মানুষ একে একটি উত্তর-ভারত-প্রভাবিত monolith-এর মধ্যে বাঙালিয়ানা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে থাকে।

বিজেপি প্রাথমিক পাল্টা কৌশলে বাংলার আইকনগুলিকে তার নিজস্ব আখ্যানের জন্য পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেগুলি সাংস্কৃতিক অনুবাদের ত্রুটিতে জর্জরিত হয়ে পড়ে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি জাতীয়তাবাদী? সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রধান সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি তাঁকে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সংযুক্ত একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে করার চেষ্টা করে। প্রধানমন্ত্রী মোদির ছবির ওপরে রবিঠাকুরের ছবিযুক্ত বিজ্ঞাপনগুলি তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বিজেপি বাঙালি আইকনের “পবিত্রতা” লঙ্ঘন করে ফেলে। তারা রবিঠাকুরকে তাঁর স্থানীয়, সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করে একটি জাতীয় রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য বিনির্মাণ করার চেষ্টা করে, যা একটি সামগ্রিক ক্ষোভের জন্ম দেয়। একইভাবে, স্বামী বিবেকানন্দের হিন্দুত্বকে উল্লেখ করা হলেও তাঁর সর্বজনীন এবং syncretic বার্তাগুলি উপেক্ষা করা হয়। সুভাষচন্দ্র বসুকে প্রাথমিকভাবে নেহেরু-গান্ধি ‘রাজবংশের’ শিকার হিসেবে দেখানো হয়। তাঁকে বিজেপির জাতীয় কংগ্রেস বিরোধিতার আখ্যানে বসানো হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই, এই জটিল ব্যক্তিত্বগুলিকে রাজনৈতিক ম্যাসকটে পরিণত করা হয়, যা বাঙালি সংবেদনশীলতাকে আঘাত করে।

সম্ভবত এই সাংস্কৃতিক ফারাকের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ ছিল “জয় শ্রী রাম” স্লোগান। উত্তর ভারতের বেশিরভাগ অংশে, এই স্লোগান সফলভাবে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের একটি সমন্বয়ক হিসেবে সফল হলেও বাংলায় তা বিফল। বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্য প্রায়শই শাক্তবাদ এবং নরমপন্থী বৈষ্ণববাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় যা উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ থেকে আলাদা। যদিও রাম একজন সম্মানিত দেবতা, কিন্তু বিজেপি এবং এর সহযোগীদের দ্বারা আয়োজিত আগ্রাসী রামনবমী মিছিলকে সাধারণ বাঙালি একটি বহিরাগত সংস্কৃতি হিসেবেই দেখে। এগুলিতে দুর্গাপূজার আবেগের অভাব অত্যন্ত প্রকট। জয় শ্রী রাম ধ্বনি হিন্দুদের সংহত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলেও বিজেপির সাংস্কৃতিক অপরত্বকে তুলে ধরে। যা বহিরাগত আখ্যানকে মান্যতা দেয়।

পরিশেষে বলা যায় পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশকের রাজনৈতিক নাট্য, যা ২০২১ সালের নির্বাচনে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে, তা কেবল নির্বাচনী জয় ও পরাজয়ের ধারাবাহিকতার চেয়ে অনেক বেশি। এটি জনচেতনার মধ্যে একটি মৌলিক পরিবর্তনকে নির্দেশিত করে। এটি কেবল রাজনীতি নয়, বাঙালি পরিচয়ের পুনর্নির্মাণের একটি বহমানতা, যা ভবিষ্যতের ঐতিহাসিকের জন্য রেখে যাবে অজস্র ধাঁধা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5333 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...