পাঠকের কাণ্ডজ্ঞান, আনন্দমঠ-এর পুনর্পাঠ ও বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ে পুরনো বিতর্ক নিয়ে নতুন তর্ক

রণজিৎ অধিকারী

 


এ নিদারুণ সত্য যে, বাঙালির যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকত তাহলে বাংলা ভাগ হত না; বাঙালির যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকত স্বদেশপ্রেমের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের মিশেল ঘটত না; বাঙালি কখনওই সমাজ অর্থে সমগ্র বাঙালিকে বোঝেনি; হিন্দু-মুসলমানে, উচ্চবর্ণে-নিম্নবর্ণে ভাগ হয়ে থেকেছে সমাজ। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের আগে পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই হিন্দু-মুসলমান মিলিত সমাজের ছবি উঠে এসেছে। বঙ্কিমচন্দ্রে না, রবীন্দ্রনাথে না, শরৎচন্দ্র-বিভূতিভূষণেও না; সাহিত্যে সমগ্র সমাজের চিত্র উঠে এসেছে অনেক পরে— সাহিত্যের এই সমস্যা বাঙালি পাঠকের মননেও সঞ্চারিত হয়েছে। সেই প্রভাব সমাজে পড়েছে। তাই অবচেতনে কিংবা সচেতনভাবে এখনও বাঙালি মানে খণ্ডিত একটা সম্প্রদায়। তার দায় নিতে হবে আমাদের, প্রায়শ্চিত্তও করতে হবে

 

এ কথা সত্য, কিন্তু বড় পরিষ্কার নহে। লোকসংখ্যা গণনায় স্থির হইয়াছে যে, যাহাদিগকে বাঙ্গালী বলা যায়, যাহারা বাঙ্গালাদেশে বাস করে, বাঙ্গালাভাষায় কথা কয়, তাহাদিগের মধ্যে অর্দ্ধেক মুসলমান।[1]

আধুনিকতার সংজ্ঞা স্পষ্ট না করেও আমরা বহুদিন থেকেই আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছি বলে দাবি করে আসছি এবং আমাদের চিন্তাভাবনা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্যে আধুনিকতার সন্ধান করছি। কিন্তু এইসব সন্ধানকর্মে প্রায়শই কাণ্ডজ্ঞানের ঘাটতি দেখা যায়। কাণ্ডজ্ঞান বা বিচারবোধের অভাব কেবল যে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায় তা নয়, বরং যাঁরা প্রতিভাবান শিল্পী এবং বিপুল কল্পনাশক্তির অধিকারী তাঁদের মধ্যেও প্রকট ছিল বলে আমরা ঘটনাবহুল সমাজ-রাজনীতি বদলের বছরগুলো পেরিয়ে এসেও তাঁদের তৈরি মায়াজাল থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারি না।

বেরোতে পারি না তার প্রধান দুটি কারণ সম্ভবত— আমাদের ইতিহাসচেতনার অভাব এবং সমাজবাস্তবতা বিষয়ে ধারণা না থাকা। স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসচেতনা ও সমাজবাস্তবতার ধারণা থাকা ও না-থাকা এই দু-শ্রেণির পাঠক বা উপভোক্তার মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হয় এবং এতটাই যে তাদের মধ্যে কোনও আলাপ বা সংযোগ তৈরি হয় না কখনওই। এই কথাগুলি শুরুতে বলছি এইটা বুঝে নেওয়ার জন্য যে, আমরা যে তথাকথিত আধুনিক যুগের প্রান্তে অবস্থান করছি, এইখানে দাঁড়িয়ে, বাঙালি সমাজে যে স্বীকৃত জাগরণ এসেছিল কিংবা যুক্তিবাদের সূত্রপাত ঘটেছিল, সেই সময়ের কোনও সাহিত্যকে আমরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করব? ‘সেকালের’ প্রতিভাধরেরা কি দেড়শো বছর পরও আমাদের একইভাবে আচ্ছন্ন করতে পারছেন? তাঁদের সৃষ্টির দিকে কি আমরা মুগ্ধ দৃষ্টিতেই তাকাব? নাকি একুশ শতকের নতুন বিচারবোধ বা কাণ্ডজ্ঞান আমাদের নতুনভাবে সবকিছু দেখতে প্ররোচিত করবে?

এসব কথা উঠছে, যখন আমাদের সত্তা ক্রমেই এক-জাতিসত্তা নির্মাণে উদ্যত রাষ্ট্রের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। উনিশ শতকের অন্তত শেষ দু-দশকের মতোই তার দেড়শো বছর পরে পুনরায় আমরা মোহমুগ্ধ দৃষ্টিতে অতীতের দিকে তাকাচ্ছি এবং ইতিহাস পুরাণ থেকে বেছে বেছে হিন্দুজাতিসত্তা নির্মাণের উপযোগী ঘটনা ও তথ্যের খোঁজ করছি এবং তার সঙ্গে অর্ধসত্য-অসত্যের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক নতুন কল্প-ইতিহাস নির্মাণের প্রচেষ্টা চলছে। আসলে সেই সময়েও, অর্থাৎ উনিশ শতকেও—

ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে হিন্দুধর্মের যে পাঠটি গড়ে তোলা হয়েছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রগুলির অধ্যয়ন ও চর্চা। ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম যে আদতে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশের ধর্ম, সেই সীমাবদ্ধতাটির দিকে আদপেই নজর দেওয়া হয়নি।[2]

একইভাবে আজও একরৈখিক রাষ্ট্রগঠনের অতিচেষ্টায় ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রগুলিকেই প্রাধান্য দেওয়া এবং উনিশ শতকী হিন্দু-জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটেছে এমন গ্রন্থগুলিকে নতুনভাবে আলোচনায় আনার চেষ্টা লক্ষ করার মতো। এমন একটা ভাষ্য তৈরির চেষ্টা যে, আধুনিক যুক্তিবাদের মাপকাঠিতে কোনও কোনও গ্রন্থের বিচারে সেই গ্রন্থটির প্রতি সুবিচার হয়নি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও বন্দে মাতরম গান। এই দুটি বিষয়ে এতই আলোচনা হয়েছে যে, হয়তো নতুন করে আর কিছু বলারই নেই। কিন্তু আগের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সাহিত্যিক ব্যাখ্যাগুলিকে আড়াল করে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুনভাবে বিতর্ক উস্কে দেওয়ার অপচেষ্টা দেখলে সংশয় জাগে। কেননা ধর্মীয় চেতনা যেমন সমাজকে খণ্ড করে দেখতে অভ্যস্ত, তেমনি ধর্মনির্ভর সাহিত্যবিচারও খণ্ডিত চেতনা ও অপরের প্রতি বিদ্বেষকে চাগিয়ে তোলে!

স্বভাবতই আমাদের মনন ও কাণ্ডজ্ঞান নতুন এক ঘোর সংকটের মুখোমুখি— যেখান থেকে নিজেদের চেতনাকে মুক্ত রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আমরা ঘরপোড়া গরু, আমরা তথাকথিত নবজাগরণকে হিন্দু-পুনরুজ্জীবনবাদে মুখ থুবড়ে পড়তে দেখেছি; দেখেছি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন কীভাবে হিন্দু উচ্চবর্গের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, ও সাধারণ মুসলমান সে-আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকেছে; আমরা পেরিয়ে এসেছি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন; সাম্প্রদায়িক ভাগ-বাঁটোয়ারা ও কংগ্রেসের প্রবল হিন্দুত্ববাদী ঝোঁক; এবং অবশেষে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের মতো নিদারুণ পরিণতি!

কিন্তু এই সমস্ত ঘটনার জন্য কি উনিশ শতকের সাহিত্য-সংস্কৃতিক্ষেত্রের প্রধান ব্যক্তিদের দায়ী করা যায়? নিশ্চয়ই তা করা যায় না। যাঁরা সলতে পাকান তাঁদের পক্ষে কখনওই চরম পরিণতির আন্দাজ পাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু তাঁদের নির্মিত কল্পলোক যে সমাজের পক্ষে অনিষ্টকর এটুকু উপলব্ধি করার ক্ষমতা প্রতিভাবান ব্যক্তিদের থাকা উচিত। আমরা এই কয়েকটি জরুরি কথা বলে উনিশ শতকের প্রবল ব্যক্তিত্ব সাহিত্যিক ভাষাশিল্পী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ উপন্যাস বিষয়ে কিছু জরুরি কথা আলোচনা করব। আনন্দমঠ-কে বেছে নেওয়ার কারণ হল, বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাস সাহিত্যিক কারণেই এতদিন পরও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক থাকলেও আনন্দমঠ ও এই উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত বন্দে মাতরম গান সাহিত্যিক কারণে তত নয়, বরং রাজনৈতিক ও হিন্দু-সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারের আগ্রাসী প্রয়াসের কারণে অনেক বেশি আলোচিত। এবং বর্তমানে ভারতে যে ফ্যাসিস্ট শক্তি নতুন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের কাছেও গানটি গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি তাঁরা যদি আনন্দমঠ মন দিয়ে পড়েন, স্বাভাবিকভাবেই এই উপন্যাস থেকেও উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতো বহু উপকরণ ও প্ররোচনা পাবেন। তবে আমরা মূলত আলোচনা সীমিত রাখব— এই উপন্যাসকে আজকের পাঠক কীভাবে পড়বেন কিংবা মুসলিম পাঠকেরা ঠিক কী কারণে এই উপন্যাস পড়ে ‘আহ্লাদিত’ হতে পারেন— তার মধ্যে।

 

দুই.

ভাদ্র, ১২৮০ বঙ্গাব্দের বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত শ্রীমীর মশাররফ হোসেন কর্তৃক প্রণীত জমীদার দর্পণ নাটক আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র লিখছেন:

জনৈক কৃতবিদ্য মুসলমান কর্ত্তৃক এই নাটকখানি বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষায় প্রণীত হইয়াছে। মুসলমানি বাঙ্গালার চিহ্ন মাত্র ইহাতে নাই। বরং অনেক হিন্দুর প্রণীত বাঙ্গালার অপেক্ষা, এই মুসলমান লেখকের বাঙ্গালা পরিশুদ্ধ।

জমীদারদিগের অত্যাচারের উদাহরণের দ্বারা বর্ণিত করা উহার উদ্দেশ্য। নীলকরদিগের সম্বন্ধে বিখ্যাত নীলদর্পণের যে উদ্দেশ্য ছিল, সাধারণ জমীদার সম্বন্ধে ইহারও সেই উদ্দেশ্য।

এই দর্পণে জমীদারের যে প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে তাহা বিকৃত কি প্রকৃত সে বিষয়ের আমরা কিছুমাত্র আলোচনা করিতে চাহি না, এ তাহার সময় নহে। বঙ্গদর্শনের জন্মাবধি, এই পত্র প্রজার হিতৈষী। এবং প্রজার হিতকামনা আমরা কখন ত্যাগ করিব না। কিন্তু আমরা পাবনা জেলায় প্রজাদিগের আচরণ শুনিয়া বিরক্ত এবং বিষাদযুক্ত হইয়াছি। জ্বলন্ত অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়া নিষ্প্রয়োজনীয়। আমরা পরামর্শ দিই যে, গ্রন্থকারের এ সময়ে এ গ্রন্থ বিক্রয় ও বিতরণ বন্ধ করা কর্ত্তব্য।…[3]

জনৈক মুসলমান যে বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষায় লিখতে পেরেছেন, এই বক্তব্যের মধ্যে প্রশংসার ছলে যে অবজ্ঞার ভাব আছে তা নিয়ে এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করতে চাই না, তবে এই ভাব বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে যে হিন্দু আধিপত্যের জন্ম দিয়েছিল তা আমরা এর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে নজরুল ইসলামের প্রশংসা করার ক্ষেত্রেও নিদারুণভাবে লক্ষ করি। পাবনা জেলার প্রজাদের আচরণে বঙ্কিমচন্দ্রের বিরক্ত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনার যোগ্য, তবে তা অন্য প্রবন্ধের বিষয়। এই উদ্ধৃতি থেকে শুধু এইটুকু এখানে নেব, জমিদারদের অত্যাচারের কাহিনি বর্ণনার উদ্দেশ্যে এই নাটক রচিত বলেই কি জমীদার দর্পণ বিক্রয় ও বিতরণ বন্ধ হওয়া উচিত? তাহলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত আনন্দমঠ-ও কি একই দোষে বা ততোধিক দোষে দুষ্ট নয়?

সন্তানদল সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে দেশে বনে বনে বন্দুক ঘাড়ে করে প্রাণীহত্যা করে চলেছে, তা সত্ত্বেও পৃথিবী সন্তানদের আয়ত্ত হবে কিনা আশঙ্কা করে জীবানন্দ! এই উপন্যাসের ‘বিজ্ঞাপন’-এ লেখক জানিয়েছেন— “সমাজবিপ্লব, অনেক সময়েই আত্মপীড়ন মাত্র। বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী। ইংরেজরা বাঙ্গালাদেশ অরাজকতা হইতে উদ্ধার করিয়াছেন।”[4] আর উপন্যাসের প্রথম খণ্ড সপ্তম পরিচ্ছেদে জানাচ্ছেন যে, ১১৭৬ সালে বাঙ্গালা প্রদেশ ইংরেজের শাসনাধীন হয়নি। টাকা নেওয়ার ভার ইংরেজের “আর প্রাণ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ভার পাপিষ্ঠ নরাধম বিশ্বাসহন্তা মনুষ্যকুলকলঙ্ক মীরজাফরের উপর।”[5] তাহলে এই উপন্যাসে বিরোধ ইংরেজের সঙ্গে নয়, মুসলমানের সঙ্গে। যেহেতু মুসলমান শাসক, এবং শাসক বাংলাকে রক্ষা করতে অক্ষম। কিন্তু শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চাওয়া সন্তানদল প্রায়ই শাসক ও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে গুলিয়ে ফেলে কেন?

ওই খণ্ডের দশম পরিচ্ছেদে মহেন্দ্রর প্রশ্নের উত্তরে ভবানন্দ যথার্থই বলছে যে, “আমাদের মুসলমান রাজা রক্ষা করে কই? ধর্ম্ম গেল, জাতি গেল, মান গেল, কুল গেল, এখন ত প্রাণ পর্য্যন্তও যায়। এ নেশাখোর দেড়েদের না তাড়াইলে আর কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?”[6] ভালো কথা! যদি এইসমস্ত কারণে দেড়েদের তাড়ানোর জন্য যুদ্ধ করা যায়, তাকে বিষয় করে উপন্যাস রচনা করা যায় তাহলে প্রজাকৃষকদের উপর পীড়ন অত্যাচার করলে জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রজাদের ক্ষোভ বা বিক্ষোভ বিরক্তির কারণ হয় কীভাবে? তার কারণ কি এই হতে পারে যে— জমিদারদের অধিকাংশ হিন্দু আর ক্ষুব্ধ পীড়িত প্রজাদের অধিকাংশ মুসলমান? তাহলে যে অত্যাচারের কারণ দেখিয়ে সন্তানদের বিদ্রোহকে মহৎ করে তোলা যায়, তবে একই কারণে সেই সময় ও পরবর্তীকালে জমিদারদের বিরুদ্ধে (যাদের অধিকাংশ হিন্দু) পূর্ববঙ্গের মুসলমান চাষিদের বিক্ষোভকে সমর্থন করা স্বাভাবিক, অবশ্য সেই নিদারুণ ঘটনার সাক্ষী বঙ্কিমচন্দ্রকে হতে হয়নি! আসলে দুর্ভিক্ষ পীড়ন অত্যাচারের চেয়েও এই উপন্যাসে প্রধান হয়ে ওঠে ধর্মবিষয়ক ভীতি। মুসলমানদের জন্য হিন্দুদের ধর্মাচরণ হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল বলে মনে করতেন উনিশ শতকের বহু প্রধান সমাজচিন্তক। তাই তাঁরা চতুরতার সঙ্গে যে-কোনও প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেলেই হিন্দুত্বের প্রতীক ব্যবহারের চেষ্টা করতেন। গান, নাটক, উপন্যাসে এর ঢের উদাহরণ আছে। আছে আনন্দমঠেও।

কিন্তু দুর্ভিক্ষ ধর্মনিরপেক্ষ। সে হিন্দু-মুসলমান ভেদ করে আসে না। অথচ দুর্ভিক্ষের সময় সন্তানদল দেশকে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তা স্পষ্ট করা হয়েছে উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের একাদশ পরিচ্ছেদে। এখানে দেশকে মাতৃভূমি শুধু নয়, একেবারে মায়ের রূপ দেওয়া হয়েছে। মা যা ছিলেন— হিন্দুর অতীত গৌরবের দিন। যবনের হাতে পড়ে দেশ অর্থাৎ মা যা হয়েছেন— “কালী— অন্ধকারসমাচ্ছন্না কালিমাময়ী। হৃতসর্বস্বা, এই জন্য নগ্নিকা। আজি দেশে সর্বত্রই শ্মশান — তাই মা কঙ্কালমালিনী।”[7] এই দৃশ্য দেখিয়ে ব্রহ্মচারীর চোখে দরদর ধারা, স্বাভাবিক যে পড়তে পড়তে হিন্দু-পরিচিতি যে পাঠকের প্রধান তারও এখানে চোখে জল আসবে এবং মায়ের এই দুরবস্থার জন্য ক্রোধ জাগবে। এরপর ব্রহ্মচারী সত্যানন্দ মা যা হবেন তার রূপ বর্ণনা করেছেন— “দশ ভুজ দশ দিকে প্রসারিত, — তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানা শক্তি শোভিত, পদতলে শত্রু বিমর্দ্দিত, পদাশ্রিত বীর কেশরী শত্রুনিপীড়নে নিযুক্ত। দিগ্ভুজা —” এই পর্যন্ত বলে সত্যানন্দ আবার গদগদ কণ্ঠে কাঁদতে লাগলেন। এবং বলে চললেন “… নানাপ্রহরণধারিণী শত্রুবিমর্দ্দিনী — বীরেন্দ্র-পৃষ্ঠবিহারিণী — দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিণী — বামে বাণী বিদ্যা-বিজ্ঞানদায়িনী— সঙ্গে বলরূপী কার্ত্তিকেয়, কার্য্যসিদ্ধিরূপী গণেশ; এস, আমরা মাকে প্রণাম করি।”[8] কিন্তু এই যে মায়ের রূপ, এই মায়ের কোনখানে বা কোনদিকে মুসলমান প্রজাদের ঠাঁই হবে? কেন না এই মা তো সম্পূর্ণরূপে সনাতন ধর্মের!

এই মায়ের প্রতিষ্ঠায় হিন্দুধর্মের উন্নতি হলেও, সমগ্র ভারতের বা সমগ্র বাঙালি সমাজের কী ধরনের উন্নতি হবে! ঐতিহাসিক অশীন দাশগুপ্ত এই জায়গাটা চমৎকার ধরেছেন—

ভারতবর্ষে জাতি-প্রতিষ্ঠা করতে গেলে গরিব মানুষের জীবন-সমস্যার সমাধান করতেই হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তায় সেই সমাধানের নির্দেশ নেই।… জাতি-প্রতিষ্ঠার অন্য পথ নেই। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস সবসময় শত্রুসন্ধান করে। জাতির নায়ক-চরিত্রগুলিকে বিজাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে হয় এবং সেই অবস্থায় নায়কের গুণবর্ণনা করতে হয়, আত্মত্যাগের ফিরিস্তি লিখতে হয়, বীরত্বের প্রশংসা করতে হয়। জাতীয়তাবাদী শত্রুসন্ধান ছাড়া বাঁচে না, বাড়ে না।[9]

এই কথাগুলি সরাসরি আনন্দমঠ সম্পর্কে না হলেও আনন্দমঠ সম্পর্কে প্রযোজ্য এবং সাম্প্রতিক ভারতের জাতীয়তাবাদী চরিত্র সম্পর্কে আরও সত্য। আসলে গরিব মানুষের জীবনসমস্যার কথা প্রকৃতই যদি বঙ্কিমচন্দ্রকে পীড়িত করত তাহলে পাবনার কৃষক বিদ্রোহ তাঁকে কোনওভাবেই বিরক্ত ও বিষাদযুক্ত করত না।

এখন অনেকে প্রশ্ন তুলবেন যে, এ তো সন্তানদলের কল্পলোক মাত্র। তারা যা দেখতে চেয়েছিল মা ও মাতৃভূমিকে। তবে তো এক্ষেত্রে আরও দুটি মূল্যবান প্রশ্ন উঠে যাবে। বঙ্কিমচন্দ্র কি ঐতিহাসিকভাবেই সন্তানদলের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করেছেন নাকি ইতিহাসের প্রেক্ষাপট, তাও অংশবিশেষ নিয়েছেন বটে, কিন্তু কাহিনি ও সংলাপ ইত্যাদি সবই লেখকের কল্পনার নির্মাণ! এ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র কী বলছেন দেখা যাক। পরবর্তী উপন্যাস দেবী চৌধুরাণী-র ‘বিজ্ঞাপন’-এ লেখক লিখছেন—

“আনন্দমঠ” প্রকাশিত হইলে পর, অনেকে জানিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন, ঐ গ্রন্থের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কিনা। সন্ন্যাসী-বিদ্রোহ ঐতিহাসিক বটে, কিন্তু পাঠককে সে কথা জানাইবার বিশেষ প্রয়োজনের অভাব। এই বিবেচনায় আমি সে পরিচয় কিছুই দিই নাই। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, সুতরাং ঐতিহাসিকতার ভাণ করি নাই।… পাঠক মহাশয় অনুগ্রহপূর্ব্বক আনন্দমঠকে বা দেবী চৌধুরাণীকে “ঐতিহাসিক উপন্যাস” বিবেচনা না করিলে বড় বাধিত হইব।[10]

অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্র এ-কথা জানালেও আজও বঙ্কিমপ্রেমী কিছু অধ্যাপক আনন্দমঠের ঘটনা সংলাপে মুসলমান-বিদ্বেষকে সন্তানদের বলে বঙ্কিমকে আড়াল করতে চান। আসলে কাঠামোর কিছুটা সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে নিলেও বঙ্কিমচন্দ্র তার ওপর নানা রং চড়িয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদকেই গড়ে তুলতে চেয়েছেন, আর সেটা করতে গিয়ে, সন্তানদের মুখে এমন সব সংলাপ বসিয়েছেন, যেখান থেকে মুসলমান পাঠক ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন পাঠকের রসগ্রহণের বিশেষ কিছু থাকে না। কখনও সত্যানন্দ বলেন— “আমরা রাজ্য চাহি না — কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদের সবংশে নিপাত করিতে চাই।”[11] এই সংলাপে কিন্তু মুসলমান শাসকের দ্বারা সার্বিক অরাজকতা সৃষ্টির কথা নেই, কেবল ভগবান বিদ্বেষের কথাই প্রধান হয়ে উঠেছে। আরেক স্থানে সত্যানন্দকে সিপাহি ধরে নিয়ে গেলে জ্ঞানানন্দের চিন্তা হয় “যদি তিনি মুসলমানের হাতে পড়েন।”[12] যদিও ‘অরাজক’ পরিস্থিতি তবুও ভবানন্দের গর্বোদ্ধত উচ্চারণ খেয়াল করার মতো— “তাঁহাকে আটক রাখে, এমন মুসলমান বাঙ্গালায় নাই।”[13]

আবার সন্তানদের দৌরাত্ম্যের কথাও লেখক চিত্রিত করেন, তৃতীয় খণ্ড প্রথম পরিচ্ছেদে সন্তানদের সংঘবদ্ধ হওয়া প্রসঙ্গে লেখক বর্ণনা করছেন— “এদিকে সন্তানসম্প্রদায় নিত্য সচন্দন তুলসীদলে বিষ্ণুপাদপদ্ম পূজা করে, যার ঘরে বন্দুক পিস্তল আছে, কাড়িয়া আনে।… তার পর তাহারা গ্রামে গ্রামে চর পাঠাইতে লাগিল। চর গ্রামে গিয়া যেখানে হিন্দু দেখে, বলে ভাই, বিষ্ণুপূজা করবি? এই বলিয়া ২০।২৫ জন জড় করিয়া, মুসলমানের গ্রামে আসিয়া পড়িয়া মুসলমানদের ঘরে আগুন দেয়। মুসলমানেরা প্রাণরক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়, সন্তানেরা তাহাদের সর্বস্ব লুঠ করিয়া নূতন বিষ্ণুভক্তদিগকে বিতরণ করে।”[14] এখান থেকে আমরা সন্তানদের আরও ক্ষমতাপ্রাপ্তি হলে কী ঘটতে পারে তার আন্দাজ পাই এবং বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যে কী ভয়ানক রূপ নিতে পারে তার একটা সাহিত্যিক নির্মাণ দেখতে পাই উনিশ শতকের সাহিত্যে, যদিও একতরফা, অবশ্যই বিশ শতকের দাঙ্গাগুলি একতরফা ছিল না। সে ভয়াবহ রূপ বঙ্কিমচন্দ্রকে দেখে যেতেও হয়নি। না হোক, তবু সেইসময় প্রধান প্রধান হিন্দু সাহিত্যিকদের রচনায় যে সাম্প্রদায়িকতা প্রকট হয়ে উঠছিল শিক্ষিত মুসলমান সমাজ থেকে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। এ-প্রসঙ্গে মুসলিম সাহিত্য সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক আনোয়ারুল কাদীরের ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধটি মনে পড়বে আমাদের।

এখানে তিনি লিখছেন—

সোজা কথায়, আমাদের সাহিত্যে যেখানে হিন্দু মুসলমান উভয়কে আঁকা হয়েছে সেখানে হিন্দুকে শুধু হিন্দু বলেই বড় করার চেষ্টা হয়েছে। বাঙালী জাতির কল্যাণকে উদ্দেশ্য করে আমাদের সাহিত্য গড়ে ওঠেনি।… বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের প্রতি অবিচার করা হয়েছে এবং তাতে করে যে প্রেমের অভাবের পরিচয় দেওয়া হয়েছে তা যে হিন্দু-মুসলিম-বিরোধের জন্য কিয়দংশ দায়ী এ-বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।[15]

সন্দেহ আমাদেরও নেই তবে মুসলিম সমাজের অনেক বিদ্বান ব্যক্তিই বঙ্কিমচন্দ্রের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তুলনায় অনেক নমনীয় ছিলেন। পরবর্তীতে আমরা তা নিয়ে আলোচনা করব।

তবে এখানে অষ্টাদশ শতকে মুসলমান শাসকের দ্বারা পীড়িত হিন্দুদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিষয়ে কিছু ঐতিহাসিক সত্য রাখা যেতে পারে। বাংলার মুসলমান সমাজ নিয়ে গবেষণা করেছেন ঐতিহাসিক অসীম রায়। তাঁর ইসলাম ও বাঙালি মুসলমান সমাজ গ্রন্থ থেকে জানতে পারছি—

আঠারো শতকের প্রথম ভাগে নওয়াব মুর্শিদ কুলী খান (১৭০০-২৭ খ্রিঃ) ও পরে নওয়াব আলীবর্দ্দী খান (১৭৪০-৫৬ খ্রিঃ) রাজস্ব-সংগ্রহ ও রাজস্বের হিসাব রাখার কাজে আমিন, জমিদার ও কানুনগো হিসাবে হিন্দুদের নিয়োগ করার পক্ষপাতী ছিলেন। জমিদারীর দশ ভাগের নয় ভাগ হিন্দুদের অধিকারে ছিল বলে ধরা হয়। সবচেয়ে বড় পনেরটি জমিদারীর মধ্যে মাত্র দুটিতে মুসলিম অধিকারী ছিলেন। মুসলিম-প্রধান পূর্ববঙ্গে শতকরা মাত্র দশজন মুসলমান জমিদারী-ব্যবস্থাপনার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম-প্রধান চট্টগ্রাম জেলায় ভূমি-রাজস্ব সংগ্রহের কাজে ৩৯ জনের মধ্যে মাত্র ১০ জন ছিলেন মুসলিম।[16]

এই তথ্য সত্য হলে বাংলার হিন্দু প্রজাদের দুর্দশা দুরবস্থার জন্য শুধু মুসলমানই দায়ী থাকে না। তবে শাসক দুর্বল হলে সমাজে অরাজকতা তৈরি হয় সত্য, কিন্তু সেই অরাজকতা থেকে মুক্তির পথ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নাকি শাসকের ধর্ম অনুসারে মুসলমানবিদ্বেষ কিংবা পাল্টা মুসলমান সাধারণ প্রজার ওপর পীড়ন অত্যাচার— তা কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন পাঠকেরা বিবেচনা করবেন।

আনন্দমঠ-এর কাহিনিতে যে সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের ছায়া আছে তা তো লেখকই স্বীকার করেছেন, তবে পুরোপুরি তিনি যে ইতিহাস অনুসরণ করেননি তা তাঁর স্বীকারোক্তি থেকেই কেবল নয় যাঁরা সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের ইতিহাস কিছুটা জানেন তাঁরাই উপলব্ধি করবেন। কেন বঙ্কিমচন্দ্র ফকিরদের বাদ দিয়ে কেবল সন্ন্যাসীদের বীরত্ব ত্যাগ বা লুঠতরাজের ঘটনাবলির দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেন, নাকি হিন্দু পাঠককে অনুপ্রাণিত করার জন্য সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেতা মজনু শাহ-চেরাগ আলিদের ভুলে কেবল ভবানী পাঠক-দেবী চৌধুরাণীদের অংশ কেটে নিয়েছিলেন? ইতিহাস কী বলে— সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ পরস্পরবিচ্ছিন্ন কোনও বিদ্রোহ ছিল? সুপ্রকাশ রায়ের ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম গ্রন্থ থেকে জানা যায়— মুঘল যুগের প্রায় শেষের দিকে নানা সন্ন্যাসী ও ফকিরের দল উত্তর ভারত, বিহার ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জমিজমা দখল করে এবং শাসকদের কাছ থেকে দান হিসেবে জমি নিয়ে চাষবাস করত এবং বছরের বিভিন্ন সময়ে তারা তীর্থভ্রমণে যেত। মুঘল সেনাবাহিনী থেকে কর্মচ্যুত বেকার সৈন্যরাও এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল।[17] অর্থাৎ শোষিত জমিহারা কৃষক, কর্মচ্যুত সৈন্য ও নানা ধর্মানুষ্ঠান তীর্থযাত্রা ইত্যাদিতে বাধাপ্রাপ্ত সন্ন্যাসীরা মিলিত হয়েই এই আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এরা দলবদ্ধভাবে প্রায়ই অত্যাচারী জমিদার ও ধনী ব্যক্তির ধনসম্পদ লুণ্ঠন করত।

ইংরেজ শাসকগণ এই বিদ্রোহীদের ‘সন্ন্যাসী’ বা ‘ফকির’ নামে অভিহিত করেছে। কিন্তু এই বিদ্রোহীরা ফকিরও নয় কিংবা গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীও নয়। এরা ছিল গৃহবাসী সাধারণ মানুষ, বাংলা ও বিহারের আজীবনের দুঃখ-লাঞ্ছনার ভারে প্রপীড়িত কৃষক-কারিগর জনসাধারণ। উইলিয়াম হান্টার, টমসন্ গ্যারাট প্রভৃতি ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ এই বিদ্রোহীদের জমিহারা, গৃহহারা কৃষক ও মোগল সাম্রাজ্যের ধ্বংসোন্মুখ সৈনবাহিনীর কর্মহারা সৈনিক বলে উল্লেখ করেছেন।[18]

নিখিল সুরের সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ বিষয়ক গ্রন্থ থেকেও জানা যায়, এই বিদ্রোহ বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা ছিল না, সন্ন্যাসী-ফকিরদের মধ্যে মাঝেমধ্যে বিরোধ দেখা গেলেও আসলে তাদের বিদ্রোহের কারণ ও উদ্দেশ্য ছিল একই। এমনকি প্রধান দুই নেতা মজনু শাহ ও ভবানী পাঠকের মধ্যে নিবিড় সৌহার্দ্য ছিল। তারা কেবল কোম্পানি নয় জমিদারদের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ত, কারণটা ছিল পুরোপুরি অর্থনৈতিক।

কৃষকের সঙ্গে সন্ন্যাসী-ফকিরদের সম্পর্ক ছিল বেশ জটিল। কখনও তারা সন্ন্যাসী-ফকিরদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করে। আবার কখনও পরিকল্পনা করেছিল সন্ন্যাসী-ফকিরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। বেশ বোঝা যায়, সন্ন্যাসী-ফকিরদের বিদ্রোহের সঙ্গে কোনও উচ্চভাবনা বা আদর্শের সম্পর্ক ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ কিংবা ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে সন্ন্যাসীদের যে জীবনাদর্শের ছবি এঁকেছেন, তা লেখকের নিছক কল্পনাপ্রসূত।[19]

স্বাভাবিকভাবেই সন্ন্যাসীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মুসলিমরা নির্যাতিত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিজেদের ‘হেঁদু’ বলে পরিচয় দিচ্ছে এ-ধরনের ইচ্ছাপূরণের চিত্র সম্ভবত বঙ্কিমচন্দ্রের দূর-কল্পনা মাত্র!

 

তিন.

এখন এমন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আজও যে লেখক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের অটুট খ্যাতি তার কারণ কি কেবল তিনি ছিলেন হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রধান উদ্‌গাতা? নিশ্চয়ই তা নয়, এক্ষেত্রে আমাদের সচেতন ও সাবধান হতে হবে। উনিশ শতকে বাংলায় উচ্চবর্ণের মধ্যে যে একপ্রকার জাগরণ এসেছিল, চিন্তাচেতনায় বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রধানতম একজন ব্যক্তি। মধুসূদন দত্ত যদি হন বাংলা কাব্য ও নাট্যসাহিত্যের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব তবে একথাও বলা যায় যে বাংলা গদ্যসাহিত্যের প্রধান শিল্পী ও নির্মাতা বঙ্কিমচন্দ্র। ফলে সাহিত্যিক কারণেই বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ও প্রবন্ধগুলির কাছে আধুনিকতর পাঠককে বারবার ফিরে যেতে হবে। আর ভাষানির্মাণের দক্ষতা! ভাষা যে কী মোহ বিস্তার করতে পারে, তা আনন্দমঠ পড়তে পড়তেও পাঠক উপলব্ধি করবেন। একটু অংশ উদ্ধৃত করি—

মঠে না গিয়া ভবানন্দ গভীর বনমধ্যে প্রবেশ করিলেন। সেই জঙ্গলমধ্যে এক স্থানে এক প্রাচীন অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ আছে। ভগ্নাবশিষ্ট ইষ্টকাদির উপর, লতাগুল্মকণ্টকাদি অতিশয় নিবিড়ভাবে জন্মিয়াছে। সেখানে অসংখ্য সর্পের বাস। ভগ্ন প্রকোষ্ঠের মধ্যে একটি অপেক্ষাকৃত অভগ্ন ও পরিষ্কৃত ছিল, ভবানন্দ গিয়া তাহার উপরে উপবেশন করিলেন। উপবেশন করিয়া ভবানন্দ চিন্তা করিতে লাগিলেন।

রজনী ঘোর তমোময়ী। তাহাতে সেই অরণ্য অতি বিস্তৃত, একেবারে জনশূন্য, অতিশয় নিবিড়, বৃক্ষলতা দুর্ভেদ্য, বন্য পশুরও গমনাগমনের বিরোধী। বিশাল জনশূন্য, অন্ধকার, দুর্ভেদ্য, নীরব![20]

বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার ঐশ্বর্য বোঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। এর সঙ্গে কাহিনিনির্মাণের দক্ষতা যা চরম রূপ পেয়েছে দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, কৃষ্ণকান্তের উইল প্রভৃতি উপন্যাসে; সেই দিক থেকে আনন্দমঠ-এর কাহিনি কিন্তু বেশ দুর্বল।

এটা মুশকিলের যে, বাংলা ভাষায় উপন্যাস রচনার দেড় শতাধিক বছর পেরিয়ে এলেও আমাদের ভাষায় উপন্যাসের গঠন নিয়ে আলোচনা খুবই কম হয়েছে। কেন একটি উপন্যাস রচনার সময় অতিক্রম করে ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে উপন্যাসের বিচারেই উত্তীর্ণ হয়ে উঠবে? উপন্যাসের কলাকৌশল কিংবা ভাষা ও সমাজবাস্তবতার কারণে? ভাষা যে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের অন্যতম একটা শক্তির জায়গা এটা আমরা স্বীকার না করে পারি না। কিন্তু তাঁর উপন্যাসগুলির কাহিনিনির্মাণে অলৌকিক ঘটনার সমাবেশ এবং চরিত্রকে লেখকের ইচ্ছাধীন করে তোলা কিংবা নীতি-নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা ইত্যাদি একুশ শতকের পাঠকের কাছে কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে! এ বিষয়ে দেশভাগ-পরবর্তীকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অনেকের সাহিত্যপাঠেই আখতারুজ্জামান গুরুত্বপূর্ণ এক অন্তর্ভুক্তি কিন্তু তাঁর সাহিত্যের ভাষা, রাজনীতি ও চিন্তার ধরনকে আমরা আত্মস্থ করতে পেরেছি কি এখনও! তাঁর ‘উপন্যাস ও সমাজবাস্তবতা’ প্রবন্ধটি একটু পড়া যেতে পারে—

কৃষককে শোষণ করার জন্য ইংরেজদের প্রবর্তিত বন্দোবস্ত সমর্থন করা সত্ত্বেও বাঙলার কৃষক সম্বন্ধে তাঁর লেখা প্রবন্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের ওপর নির্যাতন ও শোষণের অসামান্য পর্যবেক্ষণের পরিচয় মেলে। ‘সাম্য’ অথবা বঙ্গদর্শন-এর কোনও কোনও সম্পাদকীয়তে সমাজ সম্বন্ধে তাঁর যে-গভীর মনোযোগ ও উদ্বেগ প্রকাশিত হয় তাতে তাঁকে আধুনিক বুর্জোয়া মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু উপন্যাসে তাঁর এই পরিচয় অনুপস্থিত। উপন্যাসে তিনি প্রধানত কাহিনীকার। রাষ্ট্রীয় সংঘাত দেখাতে হলে চলে যান কমপক্ষে একশো বছর পেছনে এবং সেই সময়কার সমাজবাস্তবতাও সেখানে নেই বললেই চলে। আশ্চর্য আশ্চর্য সব বীরত্বপনা এবং অবিশ্বাস্য প্রেমের ভিয়েন চড়িয়ে তিনি যা প্রস্তুত করেন বাংলা ভাষায় মহা মহা পণ্ডিত সমালোচকরা ভক্তিগদগদ গলায় তাতেই তাঁকে বন্দনা করেন ‘ঋষি’ বলে। পরে সমকালীন বা প্রায় সমকালীন প্রেক্ষিতে যেসব উপন্যাস লেখেন সমালোচকরা আদর করে সেসবকে বলেন সামাজিক উপন্যাস। কিন্তু সমাজের যে-কোনও ধরনের বিবর্তন তিনি সহ্য করতে পারেন না।[21]

এ-কালের একজন শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিকের উনিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক সম্পর্কে এই মূল্যায়ন অনেকেরই পছন্দ হবে না। এমন পাঠকও বিরল নয় যে, এই লেখা পড়ে আখতারুজ্জামানকে ‘বঙ্কিমবিদ্বেষী’ এমনকি ‘হিন্দুবিদ্বেষী’ হিসেবে দেগে দিতে পারেন। কিন্তু তাতে সেই পাঠকের মনন ও কাণ্ডজ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন উঠে যাবে। তিনি আদৌ আধুনিক সাহিত্য-পাঠের উপযোগী কিনা!

 

চার.

জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও সমস্যা নিয়ে আগে আমরা অশীন দাশগুপ্তর বক্তব্য দেখেছি। আরও দু-একটি কথা এখানে বলা যেতে পারে। ভারতের সমাজ বহুত্ববাদী হলেও উনিশ শতকে তথাকথিত নবজাগরণের সঙ্গে সঙ্গে যে একধরনের একবগ্‌গা জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা হচ্ছিল তাতে মুসলমানদের কোনও অংশগ্রহণ ছিল না। শিক্ষিত ভারতীয়দের একটা অংশ ব্রিটিশদের প্রতি ছিল অনুগত।

…দেশীয় ভাবনার মধ্যে জাতীয়তাবাদের বীজের অন্বেষণ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে মিশ্রিত জাতীয়তাবাদের জাগরণ এবং বিশেষ করে ভারতীয় জাতি সৃষ্টির পথে হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবন বঙ্কিমের চিন্তার বৈশিষ্ট্য। প্রাক-আধুনিক যুগে ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেনি। তাই নব জাতীয়তাবাদকে বঙ্কিম হিন্দুধর্মের আধারে স্থাপন করেন। ধর্ম যেহেতু ভারতীয় চেতনার পরতে পরতে মিশে আছে তাই জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাদের উদাসীনতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব একমাত্র জাতীয়তাবাদকে ধর্মীয় আদর্শে প্রতিষ্ঠা করে।[22]

আনন্দমঠ পড়তে গিয়েও আমরা তা টের পাই। উপন্যাসের শেষে সত্যানন্দের কাতরোক্তি— “আবার কি মুসলমান রাজা হইবে?” এর উত্তরে চিকিৎসক বলেন— “ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতনধর্ম্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই।… ইংরেজ বহির্ব্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত, লোকশিক্ষায় বড় সুপটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব। ইংরেজি শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্তত্ত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্তত্ত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতনধর্ম্ম প্রচারের আর বিঘ্ন থাকিবে না।… যত দিন না তা হয়, যত দিন না হিন্দু আবার জ্ঞানবান্, গুণবান্ আর বলবান্ হয়, তত দিন ইংরেজরাজ্য অক্ষয় থাকিবে। ইংরেজরাজ্যে প্রজা সুখী হইবে — নিষ্কণ্টকে ধর্ম্মাচরণ করিবে।”[23] সুতরাং এই যুক্তিতেই হিন্দু শিক্ষিতরাও মনে করত ব্রিটিশ শাসন হল ‘বিধিনির্দিষ্ট’।[24]

নেশন গড়তে গিয়ে ব্রিটিশ যদি শত্রু না হয় তবে মুসলমানদের সেই স্থান নিতে হল। বাংলার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু চেতনা দিয়েই গড়ে তোলা হচ্ছিল জাতীয়তাবাদী প্রতীক। সেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রকাশ আমরা দেখতে পাই বন্দে মাতরম ইত্যাদি গানে এমনকি ‘ভারতমাতা’ চিত্রেও। জাতীয়তাবাদ বা স্বাদেশিকতার নামে এই হিন্দু প্রতীকের ব্যবহার স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় তৎপর মুসলমানদের পক্ষে সেদিন মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং স্বাতন্ত্র্যচেতনা গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কিন্তু জাতীয়তা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নে হিন্দুরাও তা মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সাম্প্রদায়িকতা যেমন সরাসরি অন্য সম্প্রদায়কে শত্রু মনে করে, আধিপত্য তেমন নয়, তা বরং তার একরোখা সংস্কৃতির ভেতরে ভিন্ন সংস্কৃতির অবলুপ্তির সঙ্গে সেই জনগোষ্ঠীর আনুগত্য এবং অন্তর্ভুক্তি দাবি করে। সাম্প্রদায়িক সমস্যা বা দাঙ্গা ইত্যাদি যেমন সহজ চোখে ধরা পড়ে, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ব্যক্তিকে এমনভাবে ঘিরে থাকে যে তাকে চিহ্নিত করা সচেতন প্রয়াস ছাড়া সম্ভব নয়। তাকে গড়ে তোলা হয় অতি ধীরে এবং সুচতুরভাবে। সমাজে শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কর্তৃত্বের জায়গায় থাকা সম্প্রদায় এটা করতে গিয়ে এমন একটা পরিমণ্ডল তৈরি করে যে, ভিন্ন গোষ্ঠী বা সংস্কৃতির অনেক শিক্ষিত মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই নিজেদের শিক্ষিত ভদ্রলোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের ধারণাকে অস্বীকার করতে পারে না।

স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাসম্পদে হিন্দুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকা বাঙালি মুসলমান সমাজ উনিশ শতকের শেষ দু-দশক থেকে এই সমস্যার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কেননা সেই সময় তাঁদের সামনে অনুসরণ করবার জন্য নিজেদের ধর্মের মধ্যে থেকে বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথের মতো মহাপ্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব ছিল না। আর যে-কয়েকজন ছিলেন, যেমন মীর মশাররফ হোসেন, আবদুল রসুল, নজরুল ইসলাম— তাঁরাও এই হিন্দু আধিপত্যের বাইরে বেরোতে পারেননি। তাঁদের কর্মকাণ্ড সাহিত্য ইত্যাদির মূল্যায়ন করা হচ্ছিল হিন্দু দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই। যেমন গো-রক্ষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শান্তিরক্ষার জন্য মীর মশাররফ মুসলমানদেরই গো-হত্যা না-করার আবেদন করলেন, আবদুল রসুল সাধারণ মুসলমানদের বঙ্গভঙ্গ সমর্থনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন দিলেন এবং নজরুল ইসলাম হিন্দু ভদ্রলোকি সংস্কৃতির দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে দরিদ্র মুসলমানদেরই সমালোচনা করে বসলেন—

হিন্দু আমাদের অপরিচ্ছন্ন অশিক্ষিত কৃষাণ-মজুরদের— আর তাদের সংখ্যাই বেশি দেখে মনে করে, মুসলমান মাত্রই এইরকম নোংরা, এমনই মূর্খ, গোঁড়া? হয়তো বা যথা পূর্বং তথা পরং। দরিদ্র মূর্খ কলিমুদ্দি মিয়াঁই তার কাছে অ্যাভারেজ মুসলমানের মাপকাঠি।[25]

অনেক সময়ই দেখা যায়, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ভেতরে যাকে উদারতা বলে চিহ্নিত করা হয় তা হয়তো অবমাননারই সামিল। যেখানে হিন্দু-মুসলমান মিলিত হতে পারে সেখানে হিন্দু প্রতীকের ব্যবহার, যেমন মাতৃভূমিকে ঐশী সত্তা হিসেবে দেখা, সাহিত্যে মুসলিম শাসন সম্পর্কে অতিশয়োক্তি ইত্যাদি একই সমাজের অন্তর্গত অন্য সম্প্রদায় ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে না। ঐতিহাসিক সুগত বসু তাঁর ‘ভারতমাতা’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে গান্ধিবাদী কংগ্রেসের মধ্যেও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা প্রকট হয়ে উঠেছিল।

কাজেই ‘বন্দে মাতরম’ গাইলে মুসলমানরা অবধারিতভাবেই ক্ষিপ্ত হতেন। নেহরু দেখিয়ে দিয়েছিলেন, এর মূল কারণটি নিহিত ছিল বঙ্কিমের দুঃখজনক উপন্যাসটির অনুষঙ্গর মধ্যে। নেহরু কষ্ট করে ওই উপন্যাসের একটি ইংরেজি অনুবাদ সংগ্রহ করেন এবং তাঁর বুঝতে বিশেষ সময় লাগেনি যে ওর পটভূমিটা মুসলমানদের বিরক্ত করার পক্ষে স্বাভাবিক।[26]

সেইসময় মুসলমানদের স্পষ্ট বিরক্তি বা প্রতিবাদের কারণ হল, ততদিনে বাংলায় বেশ কয়েকটি দাঙ্গা সংঘটিত হয়ে গেছে, মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের মতো ঘটনা রাজনীতির পরিবেশকে আমূল বদলে দিয়েছে, ফলে তখন নজরুল ইসলামের মতো সমন্বয়বাদী উদার ব্যক্তিত্বরাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এবং ততদিনে সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ রাজনীতি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের কল্যাণ ও দেশাত্মবোধের প্রকাশ ও প্রসারের নামে হিন্দুত্ববাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। কোনওভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, আরও অনেককিছুর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের এই ব্যাপক শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দীপনা জুগিয়েছে আনন্দমঠ উপন্যাসও।

 

পাঁচ.

এখন আমরা দেখব আনন্দমঠ-এর মতো একটি উদ্দেশ্যমূলক উপন্যাস একজন ভিন্ন সম্প্রদায়ের পাঠক কীভাবে গ্রহণ করবেন— যেখানে স্পষ্টতই একটি ধর্মগোষ্ঠীর মঙ্গলের কথা ভাবা হয়েছে শুধু তাই নয়, মুসলমান সম্পর্কে নানা কটুকাটব্য করা হয়েছে সুযোগ পেলেই। যেমন একটি উদাহরণ নিয়ে মুসলিম পাঠকের বঙ্কিম-বিচারে যাব।

কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্ব্বস্ব লুঠিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবন নিহত হইল, অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল, “মুই হেঁদু।”[27]

কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন পাঠক এই অংশ পড়তে পড়তে শিউরে উঠবেন, সাহিত্যপ্রতিভা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র যত বড়ই হোন তাঁর অবচেতন প্রকল্পের মধ্যে যে কী বিষম অবজ্ঞা আছে মুসলমান সমাজ সম্পর্কে তা অনেকটা ধরা পড়ে এই অংশে। যেন অবদমিত একটা ধর্মীয় স্বেচ্ছাচার যা উনিশ শতকে হয়তো অসম্ভব ছিল কিন্তু মনের মধ্যে লালন করতেন, হিন্দুদের দৌরাত্ম্যে মুসলমানরাও কাঁপতে কাঁপতে হরিনাম বলবে, নিজেকে ‘হেঁদু’ বলে ঘোষণা করবে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক মুসলিম পাঠক এই বিদ্বেষকে কীভাবে গ্রহণ করতেন!

শ্রীসুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কাজী আবদুল ওদুদ সম্পর্কে লিখেছিলেন:

ওদুদ সাহেবের সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক এবং রাজনীতি ও ধর্মনীতি বিষয়ক অনেকগুলি প্রবন্ধ অবশ্য আমি দেখিয়াছি। তিনি নিজে পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম সম্বন্ধে মিত্রভাব পোষণ করিতেন এবং সকল ধর্মের মধ্যেই যে শ্রেষ্ঠবস্তু আছে তাহার প্রশংসা করিতেন কিন্তু একটি বিষয়ে বিতর্ক তাঁহাকে বিশেষ ব্যথা দিত। মুসলমান ধর্ম সম্বন্ধে যেখানে কোনও অবুঝ ও অসহিষ্ণু অ-মুসলমান লেখকের নিন্দ্যোক্তি তিনি পাঠ করিতেন, ভদ্রভাবে ও সংযত ভাষায় তাহার প্রতিবাদ না করিয়া তিনি পারিতেন না।[28]

অংশটি উদ্ধৃত করলাম এটা বোঝাতে যে, আজ যদি তিনি জীবিত থাকতেন বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘মুসলিমরা ভুল পড়েছেন’ বলে যে অভিযোগ উঠছে ‘শিক্ষিত’ হিন্দুদের মধ্যে থেকেই— তিনি তাঁর শান্ত সংযত ভাষায় এর নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করতেন। আচ্ছা কাজী আবদুল ওদুদ বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে কী লিখেছিলেন একটু-আধটু নিশ্চয়ই পড়া আছে আমাদের! একটু পড়ি—

…মুসলমান নামে একটি সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের অপরাধ তাঁর না থাকলেও হিন্দু নামে আর একটি সম্প্রদায়ের ভালোর জন্যে তাঁর যে মাত্রাতিরিক্ত উৎকণ্ঠা প্রতিভাবান হিসেবে সেটি তাঁর একটি অপরাধ।… তাঁর শেষ বয়সের কয়েকখানি উপন্যাসে তাঁর অঙ্কন-কৃতিত্ব যথেষ্ট প্রকাশ পেলেও, মোটের উপর তাঁর দৃষ্টি অতীতমুখী। অমোঘ বিশ্ববিধানে যে-জীবন হিন্দুরও জন্য সত্য হয়েছে বা হতে চলেছে, তার প্রতি শ্রদ্ধার চেয়ে অতীতের মোহ যে তাঁর হৃদয় বেশি অধিকার করেছে এজন্য তাঁর এইসব রচনা হয়েছে অনেকখানি শৌখিন —  হিন্দুরও জন্য তা অনিষ্টকর ভিন্ন আর কিছু নয় যদি হিন্দু এ-সবের এই অন্তর্নিহিত ভাববিলাস সম্বন্ধে সজাগ না থাকে।[29]

এই অংশের মধ্যে আপনারা কেউ যদি বঙ্কিমচন্দ্রকে ভুল পড়া হয়েছে মনে করেন, আমার তাতে কিছু বলার নেই। আচ্ছা আরেকজন ‘মুসলিম’ লেখক রেজাউল করিমের বঙ্কিম-পড়া কেমন দেখি—

…বঙ্কিম সম্বন্ধে আরও বলা হয় যে, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনের পথে বঙ্কিম-সাহিত্য খুব একটি বড়ো বাধা। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন; এবং আমার তাহা মনে হয় না। বাংলা দেশের বাহিরেও তো সাম্প্রদায়িক সমস্যা আছে, সেখানে কোন বঙ্কিম ‘বিষকুম্ভের’ অন্তরাল থেকে সাহিত্যের পাতার ভিতর বিদ্বেষবিষ ছড়াইতেছেন? এ দেশের সাম্প্রদায়িক সমস্যার সহিত রাজনীতি ও অর্থনীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাহার জন্য বঙ্কিমচন্দ্রকে দায়ী করিলে চলিবে কেন? সাহিত্যকে সাহিত্যভাবেই পড়িতে হইবে, দেশের কোনও সমাজের সহিত তাহাকে জড়াইতে যাওয়া ভুল, তাহাতে সাহিত্যের অবমাননা করা হয়, সাহিত্যিক সৌন্দর্য উপভোগের পথে অনর্থক বাধার সৃষ্টি হয়।… সুতরাং এ-কথা জোর করিয়াই বলিব, বিদ্বেষ-প্রচারকগণ শত চেষ্টা করিয়াও বঙ্কিম-প্রতিভাকে ম্লান করিতে পারিবেন না। বঙ্কিম-সাহিত্যের ভবিষ্যৎ মোটেই ঘোর ঘনঘটাচ্ছন্ন নহে। তাহা উজ্জ্বল, সুন্দর ও মধুর।[30]

খেয়াল করুন, বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যে যে-সমাজ বা সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের অভিযোগ, সেই সমাজের বিদ্বান লেখকেরা কী শ্রদ্ধার সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের মূল্যায়ন করছেন!

আমি বছর দুয়েক আগে বদরুদ্দীন উমরের একটি সাক্ষাৎকার নিতে তাঁর ঢাকার বাড়িতে গেলে তিনিও বলেছিলেন— বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যে মুসলমানবিদ্বেষ আছে সত্য, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র অনেক বড় সাহিত্যিক, একজন শিল্পী, এ-কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। যদিও তাঁর লেখকজীবনের একেবারে শুরুর দিকের রচনা ‘সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় রাষ্ট্র’-তে বদরুদ্দীন উমর বঙ্কিমচন্দ্রের যে মূল্যায়ন করেছেন তা বেশ কঠোর। লিখছেন—

রাজনীতি সর্বপ্রথম সার্থকভাবে সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করলো বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ও অন্যান্য লেখায়। তাঁর আনন্দমঠই ভারতীয় মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক চেতনার মধ্যে সর্বপ্রথম নিয়ে এলো ধর্মীয় বিভ্রান্তি।

এই প্রসঙ্গে তিনি ভূপেন্দ্রনাথ দত্তর সাহিত্য ও প্রগতি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যেখানে ভূপেন্দ্রনাথ লিখেছেন—

হিন্দুরা স্বদেশপ্রীতি ও স্বধর্মপ্রীতিকে তফাৎ করে দেখেনি এবং এই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গীর ফলে পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ধর্মীয় প্রভাব দেশের বৃহত্তর স্বার্থের সমূহ ক্ষতিসাধন করে।[31]

সাম্প্রতিক অতীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার হাসান আজিজুল হক ১৯৯৭ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিনে বঙ্কিম ভবনের এক অনুষ্ঠানের ভাষণে ‘পূর্ব-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বঙ্কিম-চর্চা’ নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। নিজে বঙ্কিমের ভক্ত পাঠক জানিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন বঙ্কিম-আলোচকের সমালোচনা করেছেন। এমনকি বঙ্কিম নিয়ে বাংলাদেশের নীরবতায় তিনি কষ্ট পেয়েছেন। তিনি রাজনীতি সরিয়ে ‘বঙ্কিমচন্দ্রের চর্চার জন্যই বঙ্কিমচন্দ্রের চর্চা’ চেয়েছেন, পাননি। বরং রাজনৈতিক কারণেই বঙ্কিম-চর্চা নিয়ে শীতলতা অথবা বিদ্বেষ তাঁকে ব্যথিত করেছে। ভাষণের শেষে তাঁর এই উচ্চারণ মনে রাখবার মতো—

বাংলাদেশ তাঁকে স্বীকার করছে কী করছে না, কোন রাজনৈতিক কারণে তাঁকে সিলেবাস থেকে বের করে দিচ্ছে, কখনও প্রকাশককে বলছে বই ছাপতে পারবে না— এসব একেবারেই অবান্তর। যদি চোখের সামনে কালটাকে দেখি, যে কালের পটে আমি-আপনি ক্ষুদ্র পিপীলিকাবৎ– আজ আছি কাল বুদবুদের মতো। ওই কালের দিকে যদি তাকাই তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র চিরকাল অপ্রতিরোধ্য, অপরাভূত একজন সাহিত্যিক, একজন শিল্পী, একজন প্রবল মানুষ হিশেবে আমাদের মধ্যে জীবিত থাকবেন।[32]

উপরের উদ্ধৃতিগুলির মধ্যে কাজী আবদুল ওদুদ ও রেজাউল করীমের বঙ্কিম-বিচারে যে গভীর শান্ত সংযত উচ্চারণ দেখি তা আমাদের আশ্চর্য করে, সে-তুলনায় হাসান আজিজুল হকের বঙ্কিম-শ্রদ্ধা অনেক ব্যক্তিগত ও ভাসাভাসা। তিনি যেভাবে পূর্ব-বঙ্গের বঙ্কিম-সমালোচনাকে সমালোচনা করেন, তাতে আবেগ আছে, উদারতার ভাব আছে কিন্তু তত যুক্তির জোর নেই। এখন আরেকজন সাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ প্রবন্ধ থেকে একটু অংশ পড়ব। যুক্তিতে অনেক বেশি তুখোড় ছফা শুরুতে বঙ্কিমচন্দ্রের গুরুত্ব স্বীকার করে নিচ্ছেন—

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উনিশ শতকী বাঙালি সমাজের জাগ্রত জিজ্ঞাসাসমূহের অনেকগুলোই ধারণ করেছিলেন। যেসকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্তানদের অমরতার বসনে আবৃত করেছিলো, বঙ্কিম সে রকম গুণ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।[33]

ওই একই প্রবন্ধে আনন্দমঠ প্রসঙ্গে ছফা লিখছেন—

সন্ন্যাসীদের মতো এক রকম ফকিরেরাও বারংবার ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। ফকির মজনু শাহ এবং তাঁর পালক পুত্র চেরাগ আলি ছিলেন ফকিরদের নেতা। সন্ন্যাসী এবং ফকিরদের মধ্যে বোঝাপড়ার ভাবটি ছিল চমৎকার। কোনও কোনও সময়ে সন্ন্যাসী এবং ফকিরেরা মিলিতভাবে ইংরেজ সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।… বঙ্কিম একটা বিশ্বাসযোগ্য এবং সত্যনির্ভর পটভূমি বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে সন্ন্যাসী এবং ফকিরেরা মিলিতভাবে ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। সেই বাস্তবতা থেকে ঘটনা আহরণ করে স্বদেশের যে উজ্জ্বল চিত্রপট নির্মাণ করলেন মুসলমান সমাজের তাতে কোনও অংশ নেই। আর চিত্রপট এমনভাবে নির্মাণ করলেন যাতে মুসলমান সমাজে বঙ্কিমের কাল্পনিক স্বপ্নমূর্তিকে আপনার বলে মনে না করতে পারে। হিন্দু মুসলমান মিলিত সংগ্রাম থেকে মুসলমানের ভূমিকা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সমস্ত লড়াইটা হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াস বলে চিহ্নিত করলেন।[34]

বঙ্কিমচন্দ্রের এই সমালোচনা করেই ছফা ক্ষান্তি দেননি, এর পরে একজন মুক্তচিন্তকের দায়িত্ব নিয়ে এ-কথাও লিখছেন যে—

বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের শেষের দিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এককালীন কংগ্রেস নেতা মাওলানা আকরাম খানের নেতৃত্বে একদল মুসলিম রাজনীতিবিদ এবং সংস্কৃতিকর্মী বঙ্কিম-লিখিত আনন্দমঠ পুস্তকের বহ্ন্যুৎসব সম্পন্ন করেছেন। পুস্তক পোড়ানোর ব্যাপারটি একটি বর্বর পদ্ধতি।[35]

চিন্তাবিদ লেখক হিসেবে আহমদ শরীফ ছিলেন শিবনারায়ণ রায়ের মতো অনমনীয় অকপট, যাঁরা তাঁর প্রবন্ধ পড়েছেন তাঁরা এ-কথা স্বীকার করবেন। তাঁর বঙ্কিম-মূল্যায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মের সার্ধশতবর্ষে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় তিনি বলছেন—

বঙ্কিমচন্দ্রের মতো অত বড় মহামানব উনিশ শতকে বাঙলাদেশে দ্বিতীয়টি জন্মায়নি। এবং এই শতকেও সামগ্রিকভাবে দৈশিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী তাঁর সমকক্ষ কোনও রাজনৈতিক-দার্শনিক-চিন্তাবিদ আমি দেখি না।

এরপর আনন্দমঠ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলছেন—

যে আনন্দমঠ লিখে বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দুদের কাছে ঋষি হয়ে গেলেন, সে আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র তখনই দেশের স্বাধীনতা চাননি। তিনি হিন্দুকে বলেই দিলেন, তোমরা এখনও স্বাধীনতার যোগ্য হওনি। ইউরোপীয় বিদ্যা অর্জন কর, শিক্ষিত হও। স্বাধীনতার যোগ্য হও। তারপরে স্বাধীনতা চাও এবং অর্জন কর। কিন্তু তারপরেও হিন্দুরা মনে করলেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদেরকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। কাজেই হিন্দুরা তাঁকে ঋষি বানালেন। বানালেন বটে, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠে সন্ন্যাসীদের ক্ষমা করেননি। আনন্দমঠে হিন্দুয়ানি কাজ করেনি, বরং মানবিক বিবেক কাজ করেছে।

এই বক্তব্য পড়ে কোথাও কি মনে হতে পারে যে আহমদ শরীফ বঙ্কিমবিদ্বেষী! কিংবা সচেতন পাঠক যিনি আহমদ শরীফের বিপুল রচনার কিছু অংশও পড়েছেন, তিনি কি এই যুক্তিবাদী মানুষটিকে ‘হিন্দুবিদ্বেষী’ মনে করতে পারেন?

আরেকজন প্রাবন্ধিকের বঙ্কিম-আলোচনা দিয়ে এই পর্ব শেষ করব। প্রাবন্ধিক শান্তনু কায়সারের একটি মূল্যবান গ্রন্থ বঙ্কিমচন্দ্র, প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮-এ। আমরা দেখতে পাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান মানসে বঙ্কিম-বিষয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ অনেকটাই কমে এসেছে, বরং যুক্তি ও মুক্তবুদ্ধি দিয়েই বঙ্কিমকে তাঁরা গ্রহণ করছেন। একটি প্রবন্ধে সন্তানদের অর্থাৎ সন্ন্যাসীদের কার্যক্রম আলোচনা প্রসঙ্গে কায়সার লিখেছেন—

সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ এবং ১৮৫৭-এর জাতীয় মহাবিদ্রোহের শক্তির উৎস ছিল হিন্দু মুসলমানের ঐক্য। বৃটিশ শাসকেরা ভারতীয় জনগণের সংগ্রাম-শক্তির এই মূল উৎসকে সাম্প্রদায়িকতার সাহায্যে চিরতরে রুদ্ধ করতে চেয়েছে এবং তাদের অনুগত সহযোগী শ্রেণীর একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রও ‘আনন্দমঠ’-এ তাই করেছেন।[36]

এটা ঠিকই যে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের বঙ্কিম-মূল্যায়নে একটা দোলাচলতা ধরা পড়ে। উনিশ শতকের শেষ থেকে দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত হিন্দু-উচ্চবর্ণ সংস্কৃতির আধিপত্য থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলার প্রশ্নে এবং রাজনৈতিক কারণেও বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ-এর প্রতি উদার মনোভাব দেখানো বাঙালি মুসলমানের পক্ষে সহজ ছিল না। আবার বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টিপ্রতিভা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাও অসম্ভব ছিল। যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে তাঁর সৃষ্টির মূল্যায়ন মুসলিম সমাজকে করতেই হয়েছে। ফলে বারবার শেষপর্বের বঙ্কিমচন্দ্রে হিন্দুত্বের দিকে ঝোঁকটার মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে এসব প্রশ্নে অমুসলিম ‘হিন্দু’ ঐতিহাসিক লেখক বুদ্ধিজীবীরা যত অকপট দ্বিধাহীন, তুলনায় মুসলিম লেখকেরা দ্বিধাযুক্ত।

 

ছয়.

উপরে প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন লেখক-চিন্তকের কিছু লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিলাম এ-জন্য যে, আমরা বুঝে নিতে চাই, যে-গ্রন্থে কোনও অংশেই মুসলিম সমাজের প্রতি ভালোবাসার চিহ্নমাত্র নেই, বরং কিছু কিছু অংশ মুসলিম পাঠক কেন এইসময়ের কোনও মুক্তচিন্তককেও বিষণ্ণ করে তোলার পক্ষে যথেষ্ট, সেই গ্রন্থ সম্পর্কে তাঁরা কী ধরনের ভাবনচিন্তা করেছেন! তাঁরা কি অযথাই যুক্তিহীনভাবে বঙ্কিম সম্পর্কে বিদ্বেষ ভাব পোষণ করেছেন নাকি উত্তেজিত হওয়ার মতো উপাদান থাকা সত্ত্বেও শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কিছুটা আন্দাজ আমরা করতে পেরেছি। বিরোধের ভাব আছে, বিদ্বেষের সুযোগ আছে, তা সত্ত্বেও তাঁদের শ্রদ্ধাও কম ছিল না সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে।

এই প্রসঙ্গেই এবার এসে পড়বে আরেকটি বিচারের কথা— মুসলিম বুদ্ধিজীবী লেখকেরা যে-চোখে দেখেছেন বঙ্কিমচন্দ্রকে, তাঁদেরই প্রায় সমকালের বাঙালি অমুসলিম বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ বিচার করেছেন! যদি তাঁদের লেখাতেও যুগপৎ শ্রদ্ধা ও সমালোচনা লক্ষ করি আমরা তাহলে বঙ্কিম-সমালোচনার জন্য মুসলিম-আলোচকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বঙ্কিমবিদ্বেষী’ বা ‘হিন্দুবিদ্বেষী’ হিসেবে দেগে দেওয়ার কোনও যুক্তিই থাকে না।

এই প্রবন্ধেই নানা প্রসঙ্গে সুমিত সরকার, অশীন দাশগুপ্ত, সুগত বসু প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মন্তব্য আমরা লক্ষ করেছি। বঙ্কিম-পড়া নিয়ে আমরা এখন দুজন রায়ের বক্তব্য উল্লেখ করব। প্রথমে শিবনারায়ণ রায়ের ‘মনীষার দায়িত্ব’ প্রবন্ধ থেকে— প্রথম বাক্যেই শিবনারায়ণ লিখছেন,

উনিশ-শতকী বঙ্গীয় রেনেসাঁসের সবচাইতে ভাস্বর ও স্থায়ী কৃতি আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্য, এবং বাংলা গদ্যসাহিত্যের প্রধান নির্মাতা ও সর্বোত্তম শিল্পী বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের চিন্তা এবং চরিত্র কূটাভাসচিহ্নিত। তাঁর কোনও কোনও যুক্তি ও সিদ্ধান্ত আমার বিচারে অগ্রহণীয় ঠেকে। বাঙালি শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর তাঁর পরাক্রান্ত প্রভাব সর্বদা সুফলপ্রদ হয়েছে, একথা বলা চলে না।[37]

শিবনারায়ণের প্রথম বাক্যটি নিয়ে কারও হয়তো দ্বিমত নেই, তবে পরের তিনটি বাক্য অনেকেরই পক্ষে মেনে নিতে অসুবিধা হলেও আমার যে নেই, সে-কথা স্বীকার করছি। যাঁরা মননে হিন্দুত্ব টিকিয়ে রাখতে চান এই ২০২৬-এ এসেও তাঁদের সাহিত্যবিচারও হিন্দুগন্ধী হওয়া স্বাভাবিক। যাই হোক, আরেকটু শিবনারায়ণকে পড়া যাক—

কিন্তু ভারতবর্ষ তো শুধু হিন্দুদের দেশ নয়। বিশেষ করে বঙ্গদেশের অর্ধেক অধিবাসী মুসলমান। ‘বাঙালীর উৎপত্তি’ বিষয়ে বিচারবিবেচনা করে বঙ্কিম সিদ্ধান্তে আসেন যে চার প্রকারের বাঙালি আছে: ‘এক আর্য, দ্বিতীয় অনার্য হিন্দু, তৃতীয় আর্যানার্য হিন্দু আর… এক চতুর্থ জাতি বাঙালি মুসলমান।’ প্রথম তিন প্রকারের হিন্দু বাঙালি হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতেও পারে, কিন্তু বাঙালি মুসলমান কীভাবে তাদের সঙ্গে মিলিত হবে?… বঙ্কিমের সত্যানন্দের, ‘আনন্দমঠে’র এই মা একান্তভাবেই হিন্দুপরম্পরার দুর্গা— যার ডাইনে লক্ষ্মী, বাঁয়ে সরস্বতী, সঙ্গে কার্তিক ও গণেশ, যিনি শিবানী, সিংহবাহিনী এবং মহিষাসুরমর্দিনী— কিন্তু বঙ্কিমী কল্পনার সামর্থ্যে যিনি একই সঙ্গে জন্মভূমি বা দেশমাতৃকা— হিন্দু স্বজাতিতন্ত্রের যিনি উৎস ও ধারক। বন্দে মাতরম্ গান দুর্গা এবং জন্মভূমির এই মিলিত-প্রতিমার বন্দনা। … তাঁর কল্পিত স্বদেশ শুধুমাত্র হিন্দুর স্বদেশ।[38]

এই পর্যন্ত পড়ে একবার ‘হিন্দুবিদ্বেষী’ তকমা পাওয়া সাম্প্রতিককালের বলিষ্ঠ চিন্তাবিদ আহমদ শরীফের প্রসঙ্গে আসা যায়। আমার মনে হয় আহমদ শরীফ সঠিকভাবেই উনিশ শতকী হিন্দুজাগরণকে চিহ্নিত করেছিলেন, কথা হচ্ছে প্রায় একই কথা তো শিবনারায়ণ রায়ও বলেছেন, তবে তিনিই বা বাঁচেন কী কারণে? পড়ি আরেকটু—

তাঁর জীবনের শেষপর্বে বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দুত্বের প্রধান প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তাঁর অভিপ্রায় যাই থাক, হিন্দুত্ব এবং দেশপ্রেমের মিশ্রণে যে আগ্রাসী মানসিকতা বিশ শতকের সূচনায় শিক্ষিত হিন্দু বাঙালির ভিতরে প্রবল হয়ে ওঠে তার প্রধান উৎস ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস, বিশেষ করে তার অন্তর্ভুক্ত সঙ্গীত বন্দে মাতরম্। যুক্তিশীলতা এবং বিজ্ঞানবুদ্ধিকে বঙ্কিম প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তার বনিয়াদ পোক্ত হবার আগেই তাঁর শেষপর্বের ভক্তিবাদ এবং স্বাদেশিকতার আবেদন শিক্ষিত হিন্দু বাঙালির চেতনাকে আপ্লুত করে… তাঁর আগ্রাসী ভক্তিবাদী হিন্দু স্বাজাতিকতাই এদেশে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রধান সূত্র।[39]

কথাটা যে কতটা ঠিক এখন এই ভারতরাষ্ট্রে আমার মতো সাধারণ লোকজনও হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও কীভাবে হিন্দুত্ববাদের বন্দনায় আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। এবার এই প্রসঙ্গে আমার নিজের কয়েকটি অবলোকন এখানে রাখি। গত দেড়শো বছরে বাংলায় অন্তত তিনটি ফেজে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা আগ্রাসী হয়ে উঠেছে: প্রথম— উনিশ শতকের শেষ কুড়ি-পঁচিশ বছর, দ্বিতীয়— সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের পর দেশভাগ পর্যন্ত, এবং সর্বশেষ ফেজটি এসেছে ২০১৪-পরবর্তীতে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সম্প্রতি নতুন করে সবকিছু দেখার একটা চেষ্টা প্রকট হয়েছে।

কীরকম বলি— আমরা জানি, যে-কোনও সাহিত্যকে ফিরে পড়ার সময় যে-সময়ে পড়ছি সেই সময়ের নিরিখে বিচার করে দেখতে হয়। লেখার সময়েও আমি যদি কোনও অতীতের ঘটনা বা বিষয় নির্বাচন করি, তা ইতিহাস থেকে কিংবা পুরাণ থেকে হতেই পারে, তবে তাকে সমকালের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বাস চেতনার মাপকাঠিতে কতখানি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ তার বিচার করতে হয়। কেউ মহাভারত থেকে কাহিনি চরিত্র নির্বাচন করতে পারেন কিন্তু তাকে সমকালে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা। তার তাৎপর্য বিচার অতীতের নিরিখে হয় না। আনন্দমঠ লিখবার কালে বঙ্কিমচন্দ্র অতীত থেকে কাহিনি নিয়েছেন কিন্তু অতীতকেই আমাদের সামনে তুলে ধরতে চাননি নিশ্চয়ই। এ-কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন পূর্বেই তা আমরা দেখেছি। সে-কালে তাঁর মনে হয়েছিল হিন্দুত্বের শক্তির কাহিনি তুলে ধরে উজ্জীবিত করতে চাইলে অতীতে ফিরে যেতে হবে। তিনি তাই-ই করেছিলেন। কিন্তু আজ এতদিন পরে ভিন্ন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আনন্দমঠ, সীতারাম প্রভৃতি উপন্যাসের মুসলিমবিদ্বেষকে ঢাকা দেওয়ার জন্য অতীতের দৃষ্টিভঙ্গিতে তার বিশ্লেষণ করা চলে না। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আজকের মূল্যবোধ দিয়েই উনিশ শতকের সাহিত্য কতখানি প্রাসঙ্গিক তা বিচার করে দেখা উচিত আমাদের। কিংবা তার সাহিত্যগুণ, তার ভাষা ও কাহিনিনির্মাণ দক্ষতা একালের সাহিত্যিক বা পাঠককেও মুগ্ধ করতে পারে কিনা, এই মূল্যে। নিশ্চয়ই ধর্মীয় চেতনা স্বজাতিপ্রীতি ইত্যাদি কোনও সাহিত্যপাঠের প্রধান আকর্ষণ হতে পারে না। পাঠক যে-কোনও সাহিত্য পাঠ করেন তিনি যে সময়ের মধ্যে বাস করছেন সেই সময়কে অস্বীকার করে নয়। এবার প্রশ্ন উঠবে সাহিত্যিক কি যুগের সৃষ্টি? বঙ্কিমচন্দ্র যুগ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন? তাহলে আমাদের বাংলা সাহিত্য ঘেঁটে দেখতে হবে দাঙ্গাকালে রচিত ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ ওই দোষে দুষ্ট কিনা! সতীনাথ ভাদুড়ীর গল্প-উপন্যাস, নজরুল ইসলাম, ওয়ালীউল্লাহর কবিতা-গল্প-উপন্যাসেও সময়ের দোষ আছে কিনা! তাঁদের সাহিত্যে কি হিন্দুবিদ্বেষ বা মুসলিমবিদ্বেষ আছে? সাহিত্যিক মানের বিচার এখানে হচ্ছে না। সে তো যার যার রুচি ও রুচির বিকার অনুসারে হবে।

যাই হোক, এবার সুপ্রকাশ রায়ের কিছু কথা উদ্ধৃত করব, কেন না তিনি একেবারে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্কিমের সাহিত্যবিচার করতে চেয়েছেন—

বঙ্কিমচন্দ্র তাহাঁর আনন্দমঠ-এ এই বিরাট গণ-অভ্যুত্থানকে পাশ কাটাইয়া গিয়া এই উপলক্ষে আধ্যাত্মিক ভক্তিতত্ত্ব প্রচার করিয়াছেন। ইংরেজের হস্তের ক্রীড়নক মীরজাফরের শাসনের বিরুদ্ধে নির্যাতিত কৃষক জনসাধারণের সংগ্রামকে তিনি এরূপভাবে অঙ্কিত করিয়াছেন যেন তাহা মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুর সংগ্রাম এবং মুসলমান শাসনের কবল হইতে রক্ষা পাইবার জন্যই প্রয়োজন ইংরেজ-প্রভুত্বকে বরণ করা…। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, দেশ ইংরেজ শাসনের পদানত হইবার ফল ভালই হইবে। কারণ, ইংরেজ না আসিলে সনাতন-ধর্মের জয়ের সম্ভাবনা নাই। বঙ্কিমচন্দ্র বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, মুসলমান শাসনে হিন্দুধর্ম বিনষ্ট হইয়াছিল, কিন্তু ইংরেজ শাসন তাহা পুনরুদ্ধার করিবে এবং তাহা জয়যুক্ত হইবে। যে সময় মুসলমান সম্প্রদায় ইংরেজ-বিরোধী সংগ্রামে ব্যস্ত সেই সময় এইভাবে তিনি হিন্দুদের মুসলমান-বিদ্বেষে ইন্ধন যোগাইয়া ভারতে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করিয়াছেন।[40]

নরহরি কবিরাজ আনন্দমঠ-বিষয়ক বিতর্ক সম্পর্কে লিখছেন—

…স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও একথা কেউ বলতে পারবে না যে ‘আনন্দমঠ’ ইংরেজ রাজের কাছে আত্মসমর্পণের এক দলিল। স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও আনন্দমঠে যে মূল সুর ধ্বনিত হয়েছে তা জাতীয়তাবাদের সুর, দেশপ্রেমের সুর এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই। মুসলমান শাসন সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে ইতিহাস বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন, এমনকি মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ উক্তি উচ্চারণ করেছেন— কিন্তু তা সত্ত্বেও বলতে হয়— আনন্দমঠের সুর সাম্প্রদায়িকতার সুর নয়— মুসলমান শাসন এখানে পরশাসন হিসাবে চিত্রিত, এটি উপলক্ষ মাত্র— আসল লক্ষ্য জাতীয়তাবাদের উদ্বোধন— যে জাতীয়তাবোধ ইংরেজরাজ যে পরশাসন ও দেশ যে পরাধীন— এই সাদা কথাটি বুঝে নিতে দেশবাসীকে সাহায্য করেছিল।[41]

একই ধারার মতাদর্শে বিশ্বাসী নন এমন কয়েকজন ঐতিহাসিক বুদ্ধিজীবীর মতামত এখানে তুলে ধরতে চেয়েছি যাতে, বঙ্কিমের বিচারে একরৈখিক বিরুদ্ধতার অভিযোগ না ওঠে। কেউ নমনীয়ভাবে, কেউ কঠোর যুক্তি দিয়ে আনন্দমঠ-এর মূল্যায়ন করেছেন। এঁরা প্রত্যেকেই একপেশে জাতীয়তাবাদ গঠনের প্রয়াস সম্পর্কে সচেতন; সাহিত্যসৃষ্টির দোহাই দিয়ে কেউই হিন্দুত্বের নির্মাণ প্রয়াসকে আড়াল করার চেষ্টা করেননি। যাঁরা তা করেছেন, এখনও করে চলেছেন, তাঁদের সংখ্যা কম নয়, বরং অনেক বেশি, তাঁদের বঙ্কিমবিচারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। আরেকজন ঐতিহাসিকের বঙ্কিম-বিষয়ক প্রবন্ধের একটু অংশ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে করি:

The novel itself is ambiguous about whom the Mother is fighting. It is set in the transitional historical moment of the late 18th century, against the backdrop of the famine of 1770 and the armed combat by marauding ascetics of Naga Dashnami orders against the puppet Muslim Nawab and the indirect control of the British in Bengal. Bankim makes no mention of the role of Muslim fakirs who also led plundering bands of starving people. Even though the sanyasis were from Saivite orders, here they are worshippers of Vishnu, with a brand of militant, war-like bhakti of their own. Leaders are recruited from Bengali, upper caste, landed origins and they have transformed themselves with devotional and rigorous physical and martial training, with the vocation of ascetic celibacy for the duration of the struggle, which is meant to restore Hindu rule.[42]

এখানে সঠিকভাবেই উচ্চবর্ণের প্রসঙ্গটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। উনিশ শতকে নতুন করে যে হিন্দুত্বের নির্মাণ হচ্ছিল তার মধ্যে উচ্চ বর্ণ তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী ধ্যান-ধারণাগুলিকেই কেন্দ্রে রাখা হচ্ছিল, ফলে ভারতের সমাজগঠনের যে বৈচিত্র্য তাকে উপেক্ষা করেই  জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ গড়ে উঠছিল। তার প্রতিরূপ সঙ্গীত চিত্রকলা সাহিত্য ইত্যাদি নানা সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে ছড়িয়ে আছে। আর স্বাভাবিকভাবেই তুলনায় বেশি শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রতিভাবান উচ্চবর্ণ হিন্দু লেখকদের অবদানের সঙ্গে সঙ্গে এক সাংস্কৃতিক আধিপত্য সমাজকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। যেখানে দাঁড়িয়ে সমাজের অবহেলিত অন্যান্য বর্গ সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনযাপন দাবি স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষার কথা অবান্তর মনে হল। সাহিত্য হয়ে উঠল উচ্চবর্ণের বিত্তবান মানুষদের সুখ-দুঃখেরই রূপায়ণ যেন!

দুঃখের কথা যে, এত দিন পরে, এত এত সাহিত্য রচিত হওয়ার পরও— বাংলা সাহিত্যে সাধারণ মানুষ দলিত শ্রমজীবী কৃষকের জীবন তাদের আশা স্বপ্ন কতখানি রূপায়িত হল, কেন বাংলা গল্প-উপন্যাসে অত দেরিতে হাসু-কাশুরা তাদের দুঃখ নিয়ে এসে পৌঁছাতে পারল, কেন এক মাঝির ছেলের গল্প শুনতে আমাদের বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল— সে-বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা নেই, কেন নেই? আমরা এখনও সাহিত্যের ব্রাহ্মণ্যবাদী বিচার হিন্দু-জাগরণ ইত্যাদি নিয়ে মশগুল আছি। এতে সাহিত্যচর্চারও অগ্রগতি নেই, বাঙালির মননেরও নয়। বুঝতে পারি, কেন আবদুল ওদুদ লিখেছিলেন, হিন্দুদের জন্য মাত্রাতিরিক্ত উৎকণ্ঠা হিন্দুর পক্ষেও মঙ্গল ডেকে আনেনি। অতীতের দিকে তাকালে আমরাও তা টের পাই।

 

সাত.

এ নিদারুণ সত্য যে, বাঙালির যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকত তাহলে বাংলা ভাগ হত না; বাঙালির যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকত স্বদেশপ্রেমের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের মিশেল ঘটত না; বাঙালি কখনওই সমাজ অর্থে সমগ্র বাঙালিকে বোঝেনি; হিন্দু-মুসলমানে, উচ্চবর্ণে-নিম্নবর্ণে ভাগ হয়ে থেকেছে সমাজ। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের আগে পর্যন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই হিন্দু-মুসলমান মিলিত সমাজের ছবি উঠে এসেছে। বঙ্কিমচন্দ্রে না, রবীন্দ্রনাথে না, শরৎচন্দ্র-বিভূতিভূষণেও না; সাহিত্যে সমগ্র সমাজের চিত্র উঠে এসেছে অনেক পরে— সাহিত্যের এই সমস্যা বাঙালি পাঠকের মননেও সঞ্চারিত হয়েছে। সেই প্রভাব সমাজে পড়েছে। তাই অবচেতনে কিংবা সচেতনভাবে এখনও বাঙালি মানে খণ্ডিত একটা সম্প্রদায়। তার দায় নিতে হবে আমাদের, প্রায়শ্চিত্তও করতে হবে। হিন্দুধর্মের পুনর্গঠন ঘটানোর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে রোমিলা থাপার বলেছেন—

ধর্মকে যদি রাজনৈতিক সক্রিয়তার মাধ্যম হয়ে উঠতে হয়, তাহলে ধর্মের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি থাকা আবশ্যক। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটাই আবার জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় মতাদর্শের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ধর্মকে নতুনভাবে সংগঠিত করে তোলার কাজটি করতে হবে। আর হিন্দুত্বের নির্মাণের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়াটিই শুরু হয়েছিল।[43]

শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে, তা প্রবল হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি অনুসারে— সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ-দেশভাগ হয়ে একেবারে সম্প্রতি ভারতরাষ্ট্র গঠনের নতুন হিন্দুত্ববাদী তোড়জোড়ে।

স্বভাবতই বাঙালি হিন্দুর আধিপত্য— সমাজে শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতিতে, সর্বোপরি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। এখান থেকে বেরিয়ে নতুনভাবে মুক্তমনা পাঠক হয়ে উঠতে হবে আমাদের, কোনও খোঁয়ারি ছাড়াই আমাদের অতীত সাহিত্যকৃতিগুলিকে বিচার করতে হবে। কাজটা কঠিন। রাষ্ট্র হিন্দুত্ববাদী মনন গঠনে যত্নশীল আর সেই পরিমণ্ডলে অশিক্ষিত-আধাশিক্ষিত-পণ্ডিত সবাই একইসঙ্গে উল্লসিত। ২০২৬-এ এসেও যদি আমরা সেই ভয়ঙ্কর উল্লাসকে ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারি, ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না।

 


[1] চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র। ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’। বঙ্গদর্শন। ১২৮৭ পৌষ।
[2] থাপার, রোমিলা। বিরুদ্ধতার স্বর। অনুবাদ: যশোমতী দেব, প্রসিত দাস। কলকাতা: প্রতিক্ষণ। প্রথম বাংলা অনূদিত সংস্করণ ২০২৩। পৃঃ ৯৩।
[3] চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র। গ্রন্থ সমালোচনা, বঙ্কিমচন্দ্র রচনাবলী, ষষ্ঠ খণ্ড। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। পৃঃ ৪৭৪।
[4] পূর্বোক্ত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃঃ ১৫০।
[5] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৬৫।
[6] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৭৩।
[7] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৭৬।
[8] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৭৭।
[9] দাশগুপ্ত, অশীন। ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও নিবারণ চক্রবর্তী’। প্রবন্ধ সমগ্র। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স। পৃঃ ১৪৫।
[10] চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র। দেবী চৌধুরাণী, বঙ্কিমচন্দ্র রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। পৃঃ ২৮১।
[11] চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র। আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। পৃঃ ২১১।
[12] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৯৬।
[13] পূর্বোক্ত, পৃঃ ১৯৬।
[14] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২২১।
[15] কাদীর, আনোয়ারুল। আমাদের  দুঃখ। ঢাকা: অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। পৃঃ ৬৭-৬৮।
[16] রায়, অসীম। ইসলাম ও বাঙালী মুসলমান সমাজ। সম্পাদনা: হাবিব আর রহমান। কলকাতা: রেডিয়্যান্স। পৃঃ ৫৭।
[17] রায়, সুপ্রকাশ। ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। ২০১২। পৃঃ ২০-২১।
[18] রায়, সুপ্রকাশ। বিদ্রোহী ভারত। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। ২০১৩। পৃঃ ১৫-১৬।
[19] সুর, নিখিল। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ। সুবর্ণরেখা। তৃতীয় সংস্করণ, ২০২৫। পৃঃ ৭৮-৭৯।
[20] দ্রষ্টব্য, টীকা ১১। পৃঃ ২৩৫।
[21] ইলিয়াস, আখতারুজ্জামান। ‘উপন্যাস ও সমাজবাস্তবতা’। রচনাসমগ্র ৩। ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স। পৃঃ ৩৫-৩৬।
[22] সুর, নিখিল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পটভূমি। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ। ২০১২। পৃঃ ১৩৫-১৩৬।
[23] দ্রষ্টব্য, টীকা ১১। পৃঃ ২৭৯-৮০।
[24] বন্দ্যোপাধ্যায়, শেখর। পলাশি থেকে পার্টিশন ও তারপর: আধুনিক ভারতের ইতিহাস। কলকাতা: ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান। পৃঃ ২৫২।
[25] ইসলাম, কাজী নজরুল. ‘অভিভাষণ’, ‘মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা’। কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। পৃ ৪৭০-৪৭১।
[26] বসু, সুগত। ‘ভারতমাতা’, ভারতমাতা। অনুবাদ: আশীষ লাহিড়ী। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স। পৃঃ ১৫।
[27] দ্রষ্টব্য, টীকা ১১। পৃঃ ২৫১।
[28] চট্টোপাধ্যায়, শ্রীসুনীতিকুমার। ‘ভূমিকা’, কাজী আবদুল ওদুদ (আবদুল কাদির প্রণীত)। ঢাকা: বাংলা একাডেমী। প্রথম সংস্করণ, ১৯৭৬।
[29] ওদুদ, কাজী আবদুল। ‘বঙ্কিমচন্দ্র’, শাশ্বত বঙ্গ। সম্পাদনা: আবুল কাসেম ফজলুল হক। ঢাকা: ভাষাপ্রকাশ। ২০২০। পৃঃ ১৫৫।
[30] করীম, রেজাউল। ‘অহিন্দুর দৃষ্টিতে বঙ্কিম-প্রতিভা’, প্রবন্ধ সংগ্রহ। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি। তৃতীয় মুদ্রণ ২০১৮। পৃঃ ১০৪-১০৫।
[31] উমর, বদরুদ্দীন। ‘সাম্প্রদায়িকতা’। বদরুদ্দীন উমর রচনাবলী, খণ্ড ১। ঢাকা: বাঙ্গালা গবেষণা। পৃঃ ২৭-২৮।
[32] বঙ্গদর্শন ষাণ্মাসিক। সম্পাদক, সত্যজিৎ চৌধুরী। নৈহাটি: বঙ্কিম-ভবন গবেষণা কেন্দ্র। পৃঃ ৮১-১০০।
[33] ছফা, আহমদ। আহমদ ছফার প্রবন্ধ। ঢাকা: স্টুডেন্ট ওয়েজ। দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০০। পৃঃ ১৭।
[34] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২২-২৩।
[35] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২৪।
[36] কায়সার, শান্তনু। বঙ্কিমচন্দ্র। ঢাকা: কথাপ্রকাশ। প্রথম প্রকাশ ২০০৮। পৃঃ ১২৫।
[37] রায়, শিবনারায়ণ। ‘মনীষার দায়িত্ব: বঙ্কিমচন্দ্র’। প্রবন্ধ সংগ্রহ। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স। দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০৭। পৃঃ ১৯৮।
[38] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২১২।
[39] পূর্বোক্ত, পৃঃ ২১২।
[40] রায়, সুপ্রকাশ। ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। দ্বিতীয় প্রকাশ ২০১৮। পৃঃ ২০৮-২০৯।
[41] কবিরাজ, নরহরি। ‘আনন্দমঠ নিয়ে বিতর্ক’। অতলান্ত জিজ্ঞাসা ইতিহাস-সমাজ-মার্কসবাদ: অগ্রন্থিত লেখাপত্র। সেরিবান। ২০২৩। পৃঃ ১৫৩।
[42] Sarkar, Tanika. Imagining a Hindu Nation: Hindu and Muslim in Bankimchandra’s Later Writings. Economic & Political weekly, Vol 29, No 39. Sep 24, 1994.
[43] Thapar, Romila. Voices of Dissent. Seagull Books. 2020.

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5342 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...