অঞ্জুশ্রী দে
অসংগঠিত ক্ষেত্রের বঞ্চনা থেকে শুরু করে সেবাক্ষেত্রের গ্লাস সিলিং— এই বৈষম্য দূর করতে গেলে কেবল আইনি দাওয়াইয়ে হবে না, বরং প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নারী আন্দোলন আজ এক নতুন বাঁকে। এই আন্দোলন আর কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনা নয়, এটি রাজপথের লড়াই। সিসিটিভি ক্যামেরা বা পুলিশি প্রহরা নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হবে যখন একজন পুরুষ তাঁর সহকর্মীকে বা পথচারী নারীকে একজন সমমর্যাদার মানুষ হিসেবে দেখতে শিখবেন
প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস ক্যালেন্ডারের পাতায় ফিরে আসে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা আর গতানুগতিক উদযাপনের জোয়ার নিয়ে। সোশাল মিডিয়ার ওয়ালে ‘উইমেনস ডে’-র রঙিন পোস্টার, কর্পোরেট অফিসে কেক কাটা, আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারীদের নিয়ে দীর্ঘ আবেগপূর্ণ বক্তৃতা— এ যেন এক বার্ষিক রুটিন। এ-বছরেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই উৎসব সম্পূর্ণ উল্টো এক ছবি ফুটিয়ে তুলছে। একদিকে বিশ্বজুড়ে নারীর ক্ষমতায়ন আর উন্নতির নানা প্রচার চলছে, অন্যদিকে রাজপথে নারীর নিরাপত্তা এবং মৌলিক আইনি অধিকার আদায়ের লড়াই আরও তীব্রতর হচ্ছে।
ঠিক এই সুরেই সুর মিলিয়ে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের নারী দিবসের থিম নির্ধারণ করেছে— “Rights, Justice, Action – For All Women and Girls”। অর্থাৎ মূল কথা হল— প্রতিটি নারী ও মেয়ের জন্য সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এই থিমটিই স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতীকী উদযাপন আর শুভেচ্ছার দিন ফুরিয়েছে। পরিসংখ্যানে বলছে, বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় মাত্র ৬৪ শতাংশ আইনি অধিকার ভোগ করেন এবং যদি বর্তমান গতিতে পরিবর্তন চলতে থাকে, তবে আইনি সুরক্ষার এই ব্যবধান ঘুচতে আরও ২৮৬ বছর সময় লাগবে।

কেন আন্দোলন?
নারী দিবস পালনের ১১৫ বছর পেরিয়েও আজও নারীদের অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন আজও তাঁদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথকেই বেছে নিতে হচ্ছে? কারণ আজও বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রে একজন নারী জন্মগতভাবেই পুরুষের সমান আইনি সুরক্ষা পান না। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি, পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলিতে আইন আজও নারীদের অনুকূলে নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন নারীর পরিচয় তাঁর যোগ্যতায় নয়, বরং লিঙ্গভেদে আইনের মারপ্যাঁচে আটকে থাকবে, ততক্ষণ খাতা-কলমের সমতা বাস্তব জীবনে ধরা দেবে না। এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ভাঙার জন্যই আজও রাজপথের লড়াই অপরিহার্য। কলকাতার আরজিকর-কাণ্ড পরবর্তী ‘রাত দখল’ আন্দোলন থেকে শুরু করে ইরানের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’— প্রতিটি আন্দোলনই প্রমাণ করছে যে বিশ্বব্যাপী নারীরা আজ কেবল বার্ষিক শুভেচ্ছায় তুষ্ট নন, বরং তাঁরা সমাজের প্রতিটি স্তরে কাঠামোগত পরিবর্তন চাইছেন।

বিশ্বের ২৪টি দেশব্যাপী একটি সমীক্ষায় চালিয়ে দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, নারী অধিকারের জন্য “যথেষ্ট করা হয়েছে” এবং এখন আর নতুন কোনও পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। এই বিপজ্জনক মানসিকতা উন্নতির চাকা পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। যখন সমাজ মনে করে সমস্যা মিটে গেছে, তখন নারীর ওপর হওয়া সূক্ষ্ম বৈষম্য ও হিংস্রতাগুলি অদেখা থেকে যায়। ভারতের National Crime Records Bureau-র তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫১টি এফআইআর নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত হয়। এই সংখ্যাটি কেবল আইনি লড়াইয়ে আসা সাহসীদের, এর বাইরে কয়েক গুণ বেশি নারী আজও লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে মুখ খুলতে পারছেন না। প্রতি দেড় মিনিটে একজন নারীর আর্তনাদ প্রমাণ করে, আমাদের সুরক্ষাব্যবস্থা কতটা নড়বড়ে। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অন্দরমহল— কোথাও যখন নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়, তখন কেবল একদিনের সংবর্ধনা বা কেক কাটা নিরর্থক। এই ভয়াবহ বাস্তবতাকে বদলাতেই আজ অধিকারের দাবিতে পথে নামা প্রয়োজন।

কী কী আন্দোলন?
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠবে পথে নামলেই কি বদল আসবে? ইতিহাস সাক্ষী দেয়, অনাচার যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে শোষিতের শেষ আদালত এবং পরিবর্তনের একমাত্র জায়গা। অভিজ্ঞতা বলছে, তুরস্ক থেকে ব্রাজিল, কিংবা ইরান থেকে দক্ষিণ কোরিয়া— প্রতিটি দেশই আজ পিতৃতন্ত্র আর শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক-একটি লড়াইয়ের ময়দান হয়ে উঠেছে। তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে শুরু করে আমেরিকার আলবুকার্কে যে আন্দোলনের ঢেউ আমরা দেখছি, তা মূলত বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক তীব্র চপেটাঘাত। ইস্তাম্বুলের ইস্তিকলাল অ্যাভিনিউতে হাজারো নারীর গগনবিদারী চিৎকার ছিল ‘ইস্তাম্বুল কনভেনশন’ থেকে রাষ্ট্রের সরে যাওয়ার বিরুদ্ধে এক বুকভরা ক্ষোভ। ব্রাজিলের কোপাকাবানায় ১৭ বছরের এক কিশোরীর ওপর হওয়া পৈশাচিক গণধর্ষণ পুরো দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে; সেখানে মোমবাতির আলোয় হাজারো মানুষের নীরবতা ছিল বিচারব্যবস্থার পচনের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত ধিক্কার। অন্যদিকে, আমেরিকার আলবুকার্কে ‘উইমেনস মার্চ’ মনে করিয়ে দিয়েছে যে, জেফ্রি এপস্টাইনের মতো প্রভাবশালী শোষকদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র এবার ভাঙার সময় এসেছে। মাদ্রিদের রাজপথে স্প্যানিশ নারীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে বৈশ্বিক সংহতি— নিজের দেশে ১৫-২০ শতাংশ মজুরি-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার পাশাপাশি তারা কান পেতেছেন আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের কান্নার প্রতি।

আন্দোলনের সাফল্য
এই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের পাশাপাশি বিশ্বে এমন কিছু আন্দোলন দানা বেঁধেছে যা কেবল দাবি জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সমাজের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” আন্দোলনটি ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হলেও ২০২৫ সালের মে মাসে তা এক ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। ইরান সরকার কঠোর হিজাব আইন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। রাজপথের সম্মিলিত জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রযন্ত্র নতিস্বীকার করেছে। এটি কেবল একটি আইন পরিবর্তন নয়, বরং হাজার বছরের সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার এক ‘অপরিবর্তনীয় বিপ্লব’। একইভাবে, দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা শুরু করেছেন ‘৪বি মুভমেন্ট’— যেখানে তারা সবসময় সাজগোজ করা, চুল লম্বা রাখা বা রোগা হওয়ার মতো সামাজিক বাধ্যবাধকতা সরাসরি নাকচ করেছেন। এমনকি বিয়ে, সন্তানধারণ এবং পুরুষতান্ত্রিক সম্পর্ককেও তাঁরা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার নিম্ন জন্মহার (০.৭২) আজ আর কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি নারীদের নীরব কিন্তু শক্তিশালী এক রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা। লাতিন আমেরিকার “নি উনা মেনোস” (একটি নারীও আর কম নয়) আন্দোলনটি আজ এক মহাদেশীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর্জেন্টিনা থেকে শুরু হওয়া এই লড়াই নারীহত্যার বিরুদ্ধে এক অভেদ্য দেওয়াল গড়ে তুলেছে, যার ফলে ২০২০ সালে দেশটিতে গর্ভপাত বৈধ করার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই আন্দোলনগুলি আমাদের শেখায় যে, কলকাতার ‘রাত দখল’ থেকে শুরু করে বিশ্বের যে-কোনও প্রান্তের লড়াই— সবই আসলে একই সুতোয় গাঁথা। অন্ধকার যত গভীরই হোক, ন্যায়ের মশাল হাতে নারীরা যখন রাজপথে নামে, তখন শোষকদের সিংহাসন টলতে বাধ্য।

অর্থনৈতিক বৈষম্য
অবিচারের অন্য আর একটা দিক হল অর্থনৈতিক বৈষম্য। মজুরি বা সুযোগের বৈষম্য অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট। যা অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে শুরু করে বড় কর্পোরেট সংস্থা, এমনকি সেবা-ক্ষেত্রেও সমানভাবে বিরাজমান। এখানে কাজ করে এক অদৃশ্য ‘গ্লাস সিলিং’ বা কাঁচের দেয়াল— যেখানে মেধা থাকা সত্ত্বেও লিঙ্গবৈষম্যের কারণে নারীরা উচ্চপদে পৌঁছাতে পারেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ৭০ শতাংশ নারী হলেও উচ্চপদে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ২৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ। ভারতের নথিভুক্ত চিকিৎসকদের মধ্যে মাত্র ১৪.২ শতাংশ নারী। একইভাবে, ২০২৫-২৬ সাল নাগাদ ভারতের আইটি সেক্টর ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল শিল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, এতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৯ শতাংশ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির (STEM) মতো উচ্চশিক্ষায় ৪৩ শতাংশ নারী ভর্তি হলেও, সামাজিক নানা বাধার কারণে শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৯ শতাংশ পড়াশোনা শেষ করতে পারছেন।
অসংগঠিত ক্ষেত্রে বৈষম্য খুবই প্রকট। নির্মাণশিল্পে নারী শ্রমিকরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কম মজুরি পান। এখানকার প্রায় ৯৭ শতাংশ নারীই অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, যার ফলে তাঁরা কোনও সামাজিক নিরাপত্তা বা মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা পান না। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় (অটোমেশন) অদক্ষ নারী শ্রমিকদের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। পোশাকশিল্পের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, তামিলনাড়ু ও দিল্লির কারখানাগুলিতে নারীরা কম মজুরি ও যৌন হেনস্থার পাশাপাশি অতিরিক্ত খাটুনির শিকার হন। বড় ব্র্যান্ডগুলির কাজের চাপ সামলাতে অনেক সময় তাঁদের দিনে ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ করতে হয়।
বেরোনোর উপায়
আন্তর্জাতিক স্তরে নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের সফল সমাধানগুলি লুকিয়ে আছে মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর— আইনি সুরক্ষা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক শিক্ষা। প্রথমত, আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে স্পেনের মতো ‘বিশেষায়িত আদালত’ এবং ইউরোপের ‘ইস্তাম্বুল কনভেনশন’ অনুসরণ করে একটি ভিক্টিম-বান্ধব কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এই ব্যবস্থায় শুধু অপরাধীর শাস্তি দিলেই কাজ শেষ হয় না। বরং পুলিশকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। যাতে তাঁরা ২৪ ঘণ্টা জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করে অপরাধ ঠেকানোর কাজ করতে পারেন। এতে বিচার পেতে দেরি হয় না এবং ভিক্টিমকেও নতুন করে হেনস্থার শিকার হতে হয় না।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ‘ব্র্যাক’ বা স্পেনের ‘মন্ড্রাগন’ মডেলের মতো শক্তিশালী সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কেবল ঋণ প্রদান নয়, বরং নারীদের হাতে-কলমে কারিগরি শিক্ষা দিয়ে তাদের সরাসরি উৎপাদন ব্যবস্থার অংশীদার করে তোলা এই মডেলগুলির মূল লক্ষ্য। বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ই-কমার্স সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের তৈরি পণ্য সরাসরি বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যখন একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তখন তিনি কেবল নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসই পান না, বরং যে-কোনও ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করেন।
সবশেষে, কেবল আইন বা অর্থ দিয়ে গভীর সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয় যদি না শৈশব থেকে জেন্ডার-সেনসিটিভ শিক্ষার প্রসার ঘটে। আমেরিকার ‘বাইস্ট্যান্ডার ইন্টারভেনশন’ শিক্ষা সাধারণ মানুষকে শেখায় কীভাবে নারীহেনস্থা দেখলে নীরব না থেকে প্রতিবাদ করতে হয়।
পাশাপাশি জাতিসংঘের ‘He For She’ আন্দোলনের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পুরুষদের এই লড়াইয়ে সক্রিয়ভাবে সামিল করতে হবে, যাতে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটে। মূলত, বিশেষ আদালতের ন্যায়বিচার, সমবায়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তি এবং সামাজিক শিক্ষার এই সম্মিলিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োগই নারীর জন্য একটি নিরাপদ ও সমতাপূর্ণ বিশ্ব নিশ্চিত করার একমাত্র টেকসই পথ।
যা বলতেই হয়
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা যখন নারীদের সম্মান জানানোর জন্য রঙিন উৎসব করি, তখন আরজিকরের সেই নিথর দেহটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নিরাপত্তার লড়াই আজও কতটা কঠিন। ‘রাত দখল’ আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে যে নারীরা আর ঘরের কোণে বসে সুরক্ষা ভিক্ষা করতে চান না, তাঁরা চান তাঁদের প্রাপ্য অধিকার। ইরানের মাহসা আমিনি থেকে কলকাতার তিলোত্তমা— তাঁদের প্রতি হওয়া অবিচার লাখো মানুষের প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়েছে, যা পিতৃতন্ত্রের কাঠামোগত শৃঙ্খল ভাঙার ডাক দিচ্ছে।
অসংগঠিত ক্ষেত্রের বঞ্চনা থেকে শুরু করে সেবাক্ষেত্রের গ্লাস সিলিং— এই বৈষম্য দূর করতে গেলে কেবল আইনি দাওয়াইয়ে হবে না, বরং প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নারী আন্দোলন আজ এক নতুন বাঁকে। এই আন্দোলন আর কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনা নয়, এটি রাজপথের লড়াই। সিসিটিভি ক্যামেরা বা পুলিশি প্রহরা নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হবে যখন একজন পুরুষ তাঁর সহকর্মীকে বা পথচারী নারীকে একজন সমমর্যাদার মানুষ হিসেবে দেখতে শিখবেন। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসবে যখন বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে নারীর নিরাপদে চলাফেরা করার স্বাধীনতা— তা দিনে হোক বা রাতে, ঘরে হোক বা বাইরে।
*মতামত ব্যক্তিগত

