পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভা নির্বাচন অভূতপূর্ব কেন?

পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা

 


সরকারি মাধ্যমের অপব্যবহার করে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ভাষণ অত্যন্ত অনুচিত হয়েছে বলে আমি মনে করি। কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন চলাকালীন নির্বাচনী আচরণবিধি চালু থাকা অবস্থায় দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে দেশের সরকারি প্রচারমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সেই বিধি লঙ্ঘন করলেন, এ ঘটনাও অভূতপূর্ব। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন তাঁর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি এই সাংবিধানিক সংস্থাকে নির্বাচন জয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে

 

এই লেখাটা যখন লিখতে বসেছি তার আগে ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার নির্বাচন হয়ে গেছে। নানা দিক থেকে এই বিধানসভা নির্বাচন অভূতপূর্ব, অনেকগুলি ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের দেশে আগে কখনও হয়নি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা ছিল পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টির মধ্যে একটি তুল্যমূল্য সংঘর্ষ হবে, হিন্দিতে যাকে বলে একেবারে কাঁটে কি টক্কর! আমি ভেবেছিলাম, এমন একটা নির্বাচনী লড়াই হতে চলেছে, যার শেষে বিজেপি বা তৃণমূল, যেকোনও দলই জিতে যেতে পারে। কিন্তু প্রথম দফার নির্বাচনের পর আমি আমার মত বদলে ফেলেছি।

প্রথম দফা ভোটের পর ভারতের নির্বাচন আয়োগ যে তথ্য দিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে এই দফায় প্রায় ৯২ শতাংশ (৯১.৭৮ শতাংশ) ভোটদাতা ভোটদান করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ভোটদানের নিরিখে এত পরিমাণ ভোটদান নিঃসন্দেহে একটি রেকর্ড। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, এ-রাজ্যে মহিলারা এবার বেশি সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন। তামিলনাড়ুতেও একই চিত্র। সেখানে শতকরা ৮৫ জন মানুষ ভোট দিয়েছেন। এই দুই রাজ্যে এর আগে কখনও এত ভোট পড়েনি। ঘটনাটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

কয়েকদিন আগে আমাদের সংসদে সংবিধান সংশোধন করার জন্য একটা বিল আনা হয়েছিল। যা শাসক এনডিএ পাশ করতে পারেনি। বিলটিতে অনেকগুলি বিষয় জড়িয়ে ছিল যার মধ্যে প্রধান বিষয় ডিলিমিটেশন। লোকসংখ্যা যেহেতু বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোকসভায় সাংসদদের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। বর্তমান সাংসদ সংখ্যা ৫৪৩, সেটা বাড়িয়ে ৮০০ বা ৮৫০-র কাছাকাছি করার ইচ্ছে ছিল বিজেপির, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভিত্তিতে বেশি সিট বাড়ত মূলত উত্তর ভারতের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির, ফলে লোকসভা নির্বাচনে শুধুমাত্র বিজেপি-প্রভাবিত রাজ্যগুলি থেকে পাওয়া আসনের ভিত্তিতেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা যেত। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য বিরোধী রাজ্যগুলি থেকে যথেষ্ট আসন না পেলেও ক্ষমতা দখলে কোনও বাধা থাকত না। অর্থাৎ সংসদে ডিলিমিটেশন বিল পাশ হলে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হত শাসক দল বিজেপিরই। কিন্তু সমস্ত বিরোধীরা একজোট হয়ে ভোট দেওয়ায় এই বিলটি পাশ হল না। সমস্যা হল, এই ডিলিমিটেশন বিলটির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সরকার জড়িয়ে দিয়েছিল সংসদে ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিলটি। দুটি বিলকে অবান্তরভাবে একসঙ্গে জড়িয়ে দেওয়ার কারণে মহিলা সংরক্ষণের বিলটিও পাশ হল না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বিল পাশ করতে না পারায় বিরোধীদের ওপর প্রধানমন্ত্রী রাগ প্রকাশ করলেন জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর ভাষণে। জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের নাম করে তিনি যা বললেন তা বিজেপি দলের নেতা হিসেবে কোনও নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চ থেকে বললে তা মানানসই হত।

এই ভাষণের উদ্দেশ্য একটাই। ভোটের আগে তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের প্রভাবিত করার মরিয়া চেষ্টা করা। তিনি বললেন যে দেখো, বিজেপি সরকার তোমাদের জন্য সংরক্ষণ করতে চাইল, কিন্তু বিরোধীদের সমবেত প্রতিরোধে এই সংরক্ষণ করা গেল না। সরকারি মাধ্যমের অপব্যবহার করে নরেন্দ্র মোদির এই রাজনৈতিক ভাষণ অত্যন্ত অনুচিত হয়েছে বলে আমি মনে করি। কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন চলাকালীন নির্বাচনী আচরণবিধি চালু থাকা অবস্থায় দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে দেশের সরকারি প্রচারমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সেই বিধি লঙ্ঘন করলেন, এ ঘটনাও অভূতপূর্ব। পাশাপাশি, আমরা দেখেছি যখন কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে নির্বাচনী সভায় একটি ভাষণে বলেন যে মোদিজি সন্ত্রাসবাদীদের মতো ব্যবহার করছেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে নির্বাচন কমিশন থেকে কারণ দর্শানোর চিঠি পৌঁছে গেল। শ্রী খাড়্গেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিতভাবে উত্তর দিতে বলা হল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন তাঁর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি এই সাংবিধানিক সংস্থাকে নির্বাচন জয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

নির্বাচন কমিশনকে বিজেপি যে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে তার আরেকটি বড় প্রমাণ পশ্চিমবঙ্গের ভোটার রোলের বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। এসআইআর-এর মাধ্যমে ভুয়ো ভোটার ও অবৈধ ভোটার বাদ দেওয়ার নাম করে পশ্চিমবঙ্গের ৯১ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হল। ২০২১-এর তালিকায় ভোটারদের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। ২০২৬-এ সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৭৭ লক্ষ। যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের একটা বড় অংশ সংখ্যালঘু ও মহিলা, সঙ্গে বাদ গেছে বিরাট সংখ্যক নিম্নবর্গের হিন্দুদের নামও, যেমন মতুয়া গোষ্ঠীর অনেকের নাম বাদ গেছে। বিজেপি ধরেই নিয়েছে এদের ভোট তারা পাবে না, তাই এসআইআর-এর নামে আগেভাগে এদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপাতত ২৭ লক্ষ লোকের নামের পেছনে লেখা আছে “Under adjudication” অর্থাৎ বিচারাধীন। কারণ এই ২৭ লক্ষ মানুষ অভিযোগ জানিয়েছেন এবং আদালতের অনুমতিক্রমে গঠিত ট্রাইবুনাল বিচার করে দেখবে এইসব বাদ যাওয়া মানুষের আদৌ ভোট দেওয়ার অধিকার আছে কিনা। পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে ওড়িশা থেকে, ঝাড়খণ্ড থেকে বিচারপতিরা আসবেন এবং এইসব ট্রাইবুনালের কাজকর্ম তদারকি করবেন। ট্রাইবুনালের ওপর দায়িত্ব ছিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার দু-দিন আগে বিচার সম্পন্ন করে বৈধ ভোটারদের নামগুলি জানিয়ে দিতে হবে যাতে তারা নির্দিষ্ট দিনে ভোট দিতে পারেন। অত্যন্ত হাস্যকরভাবে, প্রথম দফা ভোটের আগে ট্রাইবুনাল্ মাত্র শ-দেড়েক মানুষের নাম ঘোষণা করতে পেরেছেন যাঁরা ভোট দিতে পারবেন। অর্থাৎ এক বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারকে বাদ রেখেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। মোটের ওপর, নির্বাচন কমিশনকে নির্লজ্জভাবে কাজে লাগিয়ে এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কার্যত পশ্চিমবঙ্গকে দখল করার জন্য বিজেপির এই যে পরিকল্পিত কর্মসূচি, তাও এদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে অভূতপূর্ব।

আরও যেটা অবাক করে দেওয়ার মতো তথ্য, সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ছাড়াও আরেকজন বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন, তাঁর নাম শ্রী জয়মাল্য বাগচী। উনি মামলা চলাকালীন প্রকাশ্য আদালতে একটা অদ্ভুত কথা বললেন। উনি বললেন যে যাঁরা এবার ভোট দিতে পারলেন না, তাঁরা না হয় সামনের বার ভোট দেবেন। অর্থাৎ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে দেশের ভোট দেওয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার— তাকে তিনি অত্যন্ত তুচ্ছ ও লঘু করে ফেললেন। সুপ্রিম কোর্টের একজন মাননীয় বিচারপতি নির্দ্বিধায় এরকম কথা বলতে পারেন, এ-কথা শোনার পর আমাদের বিস্ময়ের সীমা নেই। এখানেই শেষ নয়। বিচারপতির এই মন্তব্যে ওয়াকিবহাল মহল বিস্ময় প্রকাশ করল, সংবাদমাধ্যমেও প্রতিক্রিয়াগুলি উঠে এল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাত্র কদিন পরেই বিচারপতি বাগচীর মুখে একই কথা আবার শোনা গেল। ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের এক বিচারপতি যদি দেশের ভোটের অধিকারকে এত তুচ্ছ জ্ঞান করেন, এ দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এছাড়াও এবারের ভোটে নির্বাচন কমিশন আরও কটি আশ্চর্যজনক বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে যা সারা ভারতবর্ষে আগে কখনও প্রয়োগ করা হয়নি। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের সময় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দেশের সমস্ত আধাসামরিক বাহিনীর যেমন সিআরপিএফ, সিআইএসএফ, বিএসএফ ইত্যাদির বড়কর্তাদের কলকাতায় উড়িয়ে এনে নির্বাচনী নিরাপত্তা সংক্রান্ত সভা করল। কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করার সময়েও এত বড় জমায়েত হয়নি। পাশাপাশি, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর কমিশন এ-রাজ্যে যে পরিমাণ আমলা ও পুলিশ অফিসারদের বদলি করল, সেই সংখ্যাটাও বিপুল ও অভূতপূর্ব। এছাড়াও নির্বাচন কমিশন দুটি রাজ্যের মানুষের ওপর দুটি বিধি আরোপ করেছিল। যেমন, ভোটের দুদিন আগে থেকে সন্ধে ছটা থেকে সকাল ছটা অবধি বাইক বা স্কুটার চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এছাড়াও সকাল ছটা থেকে বিকেল ছটা অবধি বাইক নিয়ে রাস্তায় বেরোলেও পেছনে কোনও আরোহীকে বসানো যাবে না। শুধুমাত্র বিশেষ পরিষেবা, চিকিৎসা ও বাচ্চাদের স্কুল থেকে দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, নির্বাচন কমিশন প্রায় আটশোজন মানুষকে ট্রাবলমেকার বা সমস্যা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে দিয়েছিল, ভোটের সময় যাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এই ট্রাবলমেকারদের তালিকায় বেশিরভাগই তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য। কলকাতা হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের এই দুটি নির্দেশিকাই অবান্তর মনে করে নাকচ করেছে। আদালত যুক্তি দিয়েছে, নির্বাচনের নাম করে সাধারণ নাগরিকের অবাধে চলাফেরার অধিকার খর্ব করা যায় না। দ্বিতীয়ত, কোনওরকম সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া স্রেফ কমিশনের ইচ্ছেমতো একদল মানুষকে ট্রাবলমেকার ঘোষণা করে দেওয়া যায় না।

সব মিলিয়ে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এমন অনেক কিছু দেখতে পেলেন যা ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কোনওদিন ঘটেনি। যাই হোক, আপাতত আমাদের সকলের চোখ থাকবে মে মাসের ৪ তারিখের দিকে, যখন পশ্চিমবঙ্গ-সহ অন্য রাজ্যগুলির নির্বাচনের ফল বেরোবে। অবশ্য তার আগেই, ২৯ তারিখ দ্বিতীয় দফার ভোট শেষ হওয়ার পরপরই পেট্রোল ডিজেল ও জ্বালানির দাম বাড়ার ঘোষণা করা হতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোট এসআইআরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভোট। যেভাবে নির্বাচন কমিশন জোর করে এক বিপুল সংখ্যক রাজ্যবাসীকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত করেছে, এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্রোধ ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হতে পারে যা উল্টোদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সুবিধা করে দিতে পারে। যাই হোক, ফল যাই হোক না কেন, আপাতত ৪ মে অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5360 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...