দীপু দাসের লাশ ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন

মণিশংকর বিশ্বাস

 


বাংলাদেশে নির্বাচনে জামাতের হার হয়েছে। এপার-বাংলায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মানুষ খুব চিন্তায় ছিল, যে যদি সাম্প্রদায়িক জামাত জিতে যায় এ নির্বাচনে! অথচ আমরা ভেবে দেখি না, ভারতে আমরা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের রাজনৈতিক শাখাকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছি। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়। খুব হয়। দীপু দাস একটা ‘জ্বলন্ত’ উদাহরণ। দীপু দাসের পরে আরও অনেক সংখ্যালঘুর লাশ পড়েছে। কিন্তু মোদ্দা কথাটা হল বাংলাদেশ সম্পূর্ণত এবং স্বীকৃত চরম দক্ষিণপন্থী জামাতকে রুখে দিয়েছে। এপার-ভারত কিন্তু সেটা করে দেখাতে পারেনি। সাধারণ মানুষের কথা যদি বাদও দিই, রাজনৈতিক দলগুলি? দীপু দাস খুন হয়ে যাওয়ার পর বামপন্থী দলগুলি সর্বতো প্রতিবাদ করেছে। করা তো উচিতও। কিন্তু এই প্রতিবাদ-মিছিলে কোথাও সর্বত্র "সেকু-মাকু" গাল শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে যাওয়া নেই তো? না হলে এই একই সময়ে বাংলার নিম্নবর্গীয়, সংখ্যালঘু অভিবাসী শ্রমিক, ভিনরাজ্যে খুন হয়ে গেলেন শুধুমাত্র বাঙালি হওয়ার কারণে, বাংলাদেশি সন্দেহে! তা নিয়ে টিভি স্টুডিও ছাড়া, বামপন্থীদের সেরকম গণ-আন্দোলন চোখে পড়ল না কেন?

 

দীপু দাসকে খুন করে তাঁর লাশ উলটো করে ঝুলিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হল। হায় বাংলাদেশ! একজন বাঙাল ঘরের সন্তান, আমার রক্তেই আছে সংখ্যালঘুর বেদনা, আর্তনাদ! দীপু দাস মারা গেলেন ১৮ ডিসেম্বর। পরদিন যখন খবরটা পাই, এত কষ্ট পেয়েছিলাম, যে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল! তারপর সোশাল মিডিয়ায় এসে দেখি, তখনও বাংলাদেশের কেউ কেউ বলছেন যে শুধুমাত্র প্যাটিসে মাংস আছে এই সন্দেহে তো আপনারা একটা লোককে হেনস্থা করলেন! সঠিক কথা, কিন্তু একটা লোককে ধর্ম অবমাননার দায়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, আর সেটা নিয়েও হোয়াটাঅ্যাবাউট্রি করতে আসছে মানুষ, এও কী ভাবা যায়! কিন্তু দিব্যি ভাবা যাচ্ছে! সোশাল মিডিয়ায় উত্তরোত্তর টেনশন বৃদ্ধি পায় ও আক্রমণাত্মক বিবৃতি আসতে থাকে। লক্ষ করি পিটিয়ে মেরে ফেলা, অর্থাৎ হিন্দুকে মুসলমান বা মুসলমানকে হিন্দু পিটিয়ে মারবেন এর সপক্ষেও বহু মানুষ আছেন!

আমার এক প্রিয়জন, বাংলাদেশের, সে খুব দুঃখ করে। সে বলে মণিদা, এসব আর নেওয়া যাচ্ছে না! ওপারে আপনি, এপারে আমি, আমরাই প্রকৃত সংখ্যালঘু। লক্ষ করে দেখবেন মুহাম্মদ আখলাককে যখন পিটিয়ে মারা হয় তখন আপনাদের প্রধানমন্ত্রী একবারও বলেননি এই ঘটনায় জড়িত প্রত্যেকে উপযুক্ত শাস্তি পাবে। ডঃ ইউনুসও বলবেন না, দীপু দাসকে যারা মেরে ঝুলিয়ে দিল, আগুনে পুড়িয়ে দিল, তাদের উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে। উপমহাদেশে আজ এসব জলভাত! তবে দাদা একটা কথা মনে রাখবেন, পাদ্রি গ্রাহাম স্টেইনের খুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনকে আপনারা সংসদে পাঠিয়েছিলেন, আমি আপনাকে কথা দিতে পারি, দীপু দাসের খুনিরা কেউ জেলার নির্বাচনেও জয়ী হবে না। আমি অনলাইনে অধোবদন হয়ে থাকলাম।

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। দীপু দাসকে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে প্রায় ২ মাস আগে, আজও এখানে এক আড্ডায় গিয়ে শুনি, কীভাবে বাংলাদেশিরা পারল এভাবে একটা গরিব অসহায় নিম্নবর্গীয় খেটেখাওয়া মানুষকে পুড়িয়ে মারতে! সত্যিই মানুষ কি আর মানুষ থাকে না, যখন একটা মানুষকে এতজন ধরে ধরে মারে, উলটো করে ঝুলিয়ে দেয়, পুড়িয়ে মারে!!

অনলাইনে কিছু বয়ানে এমনকি এও দাবি করা হয়েছিল যে পুলিশ দীপু চন্দ্র দাসকে জনতার হাতে তুলে দিয়েছিল— কিন্তু ফ্যাক্ট-চেক থেকে জানা গেছে, এই দাবি সমর্থনে যে ভাইরাল ভিডিওগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে এই ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই এবং সেগুলো ভুয়ো বলে প্রমাণিত হয়েছে। যাইহোক, পুলিশ বা প্রশাসন একজন সংখ্যালঘু হিন্দুকে বাঁচাতে পারেনি। প্রশাসন একটি পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে এলিট বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), দীপু চন্দ্র দাসকে জনতার হাতে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা এখন জেল-হাজতে আছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীরা শাস্তি পাবেই।

অন্যদিকে অনেকেরই মনে আছে, এপার-বাংলায় সামসেরগঞ্জে কীভাবে হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাসকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল। সেখানে নিম্ন আদালত দ্রুত শাস্তি ঘোষণা করেছে। গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ১৩ জন অভিযুক্তকে জঙ্গিপুর আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছে। সবাইকে যাবজ্জীবন (life imprisonment) কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃতের পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলেছে আদালত। অবশ্যই এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। এই পর্যন্ত পড়বার আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন শাস্তি তো হচ্ছে অপরাধীদের, সমস্যাটা কোথায়?

সমস্যা আছে। ধর্মীয় সহিংসতার এই ঘটনাগুলিকে আমরা কী চোখে দেখছি, সেটাই সমস্যার!

আগেই বলেছি, গ্রাহাম স্টেইনের খুনের কথা। প্রতাপ সারঙ্গী লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। গর্ভবতী বিলকিস বানোকে জনতা গণ-ধর্ষণ করেছিল; একই সঙ্গে তারা তাঁর পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে খুন করে, যার মধ্যে তাঁর ৩ বছর বয়সী কন্যাশিশুটিও ছিল। কিন্তু যখন ২০২২-এর আগস্টে গুজরাত সরকার খুনিদের মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে, এই খুনি ও ধর্ষকদের স্থানীয় জনতা সংবর্ধনা দেয়। শেষে যদিও নরাধমরা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পুনরায় জেলে ফেরত যায়। ঠিক একইভাবে কাঠুয়ার নাবালিকা ধর্ষণে অভিযুক্তদের সমর্থনে আসামিদের পক্ষে কিছু স্থানীয় আইনজীবী ও কিছু মানুষ জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করে সমর্থন জানায়। মালদহের মহম্মদ আফরাজুলকে শম্ভুনাথ রেগার নৃশংসভাবে খুন করে জ্বালিয়ে দেয়। ভিডিও করে সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। এই শম্ভুনাথকেও স্থানীয় মানুষ সংবর্ধনা দিয়েছিল। আরও বলব? যারা মুহাম্মদ আখলাককে ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার ‘অপরাধে’ খুন করেছিলেন, তাদেরকে যাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তার জন্য উত্তরপ্রদেশ সরকার স্বতঃপ্রণোদিত আবেদন করেছে। সোশাল অ্যাক্টিভিস্ট গৌরী লঙ্কেশকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হরিয়ানার পুরসভার উপনির্বাচনে ভোটে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ সামাজিক বা প্রশাসনিক দিকে থেকেও, অনেক সময় এই অপরাধীরা প্রশংসিত হচ্ছেন। বেশিরভাগ সাম্প্রদায়িক ঘৃণা-হত্যার সঙ্গে জড়িত মানুষ, সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ রিজেক্টেড হচ্ছে না, উলটে সমাদর পাচ্ছে। আবার আইন-আদালত, পুলিশ, বিচারব্যবস্থাও সবসময় এদেরকে দোষী প্রমাণ করতে যথোচিত সচেষ্ট নয়। এরকম স্রেফ একটা ঘটনার কথা বললেই পুরো বিষয়টা বোঝা যাবে আরও পরিষ্কার করে।

১৪ সালের ২ জুন, মহারাষ্ট্রের সোলাপুরের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার মহসিন সাদিক শেখ অফিসের ছুটির পরে একটি মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। হিন্দু রাষ্ট্র সেনা নামক একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্যরা তাঁকে পাকড়াও করে এবং হকি স্টিক দিয়ে পিটিয়ে ও সিমেন্টের ব্লক দিয়ে মাথা থেঁতলে দিয়ে হত্যা করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ছত্রপতি শিবাজি ও প্রাক্তন শিবসেনা সুপ্রিমো বাল ঠ্যাকারে সম্পর্কে অসম্মানজনক পোস্ট করেছিলেন সোশাল মিডিয়ায়, যা প্রমাণিত হয়নি। নিউজলন্ড্রি-র এক প্রতিবেদন অনুসারে, একমাত্র রোজগেরে সন্তানের হত্যার বিচার পেতে অন্ততপক্ষে ৩০০ বারের বেশি পুনে এবং মুম্বাই কোর্টকাছারিতে চক্কর কাটতে কাটতে ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর মহসিন সাদিক শেখের বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগত হন।

প্রধান অভিযুক্ত এবং হিন্দু রাষ্ট্র সেনা-র প্রধান ধনঞ্জয় দেশাই-সহ মোট ২০ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন পৃথ্বীরাজ চৌহান সরকারের প্রশাসন। আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করা হয় উজ্জ্বল নিকমকে যিনি বর্তমানে বিজেপির সাংসদ। পরবর্তীতে উজ্জ্বল নিকম সন্ত্রাসী হিন্দু রাষ্ট্র সেনা-র অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে অস্বীকার করেন এবং নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নেন।

২০১৭ সালে অভিযুক্তদের তিনজন জামিনের জন্য বোম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেন। মুম্বাই হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি মৃদুলা ভাটকর তিনজনেরই জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনের আবেদন মঞ্জুর করার সময় বিচারপতি মৃদুলা বলেন, “নিহত ব্যক্তির একমাত্র ‘দোষ’ ছিল যে তিনি অন্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন। আমি এই বিষয়টি আবেদনকারী বা অভিযুক্তদের অনুকূলে বিবেচনা করছি।” বিচারপতি আরও বলেন, “অভিযুক্তদের সঙ্গে মহসিনের কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। মনে হচ্ছে, ধর্মের নামে তাদের প্ররোচিত করা হয়েছিল এবং সেই কারণেই তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে।”

একদিক থেকে দেখতে গেল, বিচারপতি মৃদুলা ভাটকর আসলে স্বীকার করে নিলেন, দাড়িটুপিওয়ালা মুসলমান দেখে একজন চরমপন্থী হিন্দু হত্যায় প্ররোচিত হলে, তা খুব অস্বাভাবিক নয়!

অবশ্য, ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বোম্বে হাইকোর্টের রায়ের কঠোর সমালোচনা করে অভিযুক্তদের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়। তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, বিচারপতি মৃদুলার বিতর্কিত বয়ানটির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই রায় দেয়নি। মৃত মহসিন সাদিক শেখের পরিবারকে সুপ্রিম কোর্টে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করতে হয়েছিল! অনেকেই জানতে চাইবেন, মহসিন সাদিক শেখের পরিবার শেষমেশ বিচার পেয়েছে কি?

না, বিচার পায়নি। দীর্ঘ ৯ বছর পর, ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি পুনের একটি সেশন আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে প্রধান অভিযুক্ত এবং হিন্দু রাষ্ট্র সেনা-র প্রধান ধনঞ্জয় দেশাই-সহ মোট ২০ জন অভিযুক্তকেই প্রমাণাভাবে ‘নির্দোষ’ ঘোষণা করে দেওয়া হয়।

আদালত জানায় যে, প্রসিকিউশন-পক্ষ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বর্তমানে মহসিনের মা এবং তার ভাই মুবিন শেখ পুনের সোলাপুরে বসবাস করছেন। মুবিন শেখ দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকার পর ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

এখন অনেকেই ভাবতে পারেন এই ঘটনাটার উল্লেখ আমি কেন করলাম? ৭-৮ বছর আগেকার ঘটনা! এটাও তো একধরনের হোয়াটঅ্যাবাউট্রি। না, তা নয়! আমি শুধু বুঝতে চাইছি, দীপু দাসের খুনের ঘটনায় যেমনটা হয়েছিল, মহসিন সাদিক শেখের হত্যার ঘটনা মনে পড়লে আমাদের রক্ত একইরকম খলবল করে ওঠে কিনা! অথবা মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনও দেশ, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, ধরা যাক ইরানে চাবাহার বন্দর (Chabahar Port) ব্যবহারের যদি অনুমতি প্রত্যাহার করে নিত সে সময়, বা বাহরিন থেকে সব হিন্দু শ্রমিকভাইদের যদি তখন দেশ ছাড়তে বলা হত, আমরা তা হজম করতে পারতাম কিনা! আজ দীপু দাসের মর্মান্তিক পরিণতিতে যারা দুঃখিত, “মানবতা বলে আর কিছু নেই বাংলাদেশে”, উন্মত্ত ‘কাফের’ জনতা একজন হিন্দুকে মেরে জ্বালিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কিছুতেই ভিক্টিমের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে না— এরকম যারা ভাবেন, তাদের ৯৯ শতাংশ বা আরও বেশি মানুষ জানেন না বা জানতে চান না যে, ভারতেও একজন সংখ্যালঘু বা দলিতের জন্য বিচার না-পাওয়ার ঘটনা কিছুমাত্র নতুন না! এখনকার ‘নতুন ভারতে’ একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অনায়াসে সংখ্যালঘু-গণহত্যার হুমকি দিতে পারেন! বিহার নির্বাচনে জয়ী পক্ষের সমর্থনে মন্ত্রী অশোক সিঙ্ঘল টুইট করেছিলেন, “Bihar approves Gobi farming”। কতখানি হিংস্র ও নারকীয় এই টুইট সেটা বুঝতে গেলে আমাদের বেশ কিছুটা পিছনের দিকে যেতে হবে, ২০০২-এর গুজরাত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গারও বেশ কিছু আগে। ১৯৮৯ ভাগলপুর গণহত্যায়, প্রায় ১০০ হিন্দু এবং প্রায় ৯০০ থেকে ১০০০ মুসলিম ধর্মাবলম্বীর নৃশংস মৃত্যু হয়। যার মধ্যে চান্ডেরি ও লোগাইনের ঘটনা দুটি ছিল নৃশংসতম। চান্ডেরিতে একটা পুকুরের মধ্যে ৬১ জন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ছিন্নবিচ্ছিন্ন লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে লোগাইনে ১১৬ জন সংখ্যালঘুর লাশ ক্ষেতের মধ্যে পুঁতে ফুলকপির চাষ করা হয়েছিল। সোশাল মিডিয়ার আগের যুগের এসব ঘটনা অনেকেই জানেন। কিন্তু অন্য দেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে যাঁরা ক্ষোভে ফোঁসেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো আসাম বিধানসভার সদস্য ও মন্ত্রী অশোক সিঙ্ঘলের টুইট নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন। ওদিকে অশোক সিঙ্ঘলদেরই মুখ্যমন্ত্রী, সংখ্যালঘুদের দিকে বন্দুক তাক করার অভিনয় করছেন গর্বিতভাবে, আর সেটা প্রচার করা হচ্ছে তাঁর নির্বাচনী প্রচারে! তিনি বলছেন, রিকশাওয়ালা যদি একটি নির্দিষ্ট কমিউনিটির (মিয়া) হয়, ৫ টাকার জায়গায় ৪ টাকা দিন, যাতে রিকশাওয়ালা ডিস্টার্বড হয়, সে যে স্বাধীন ভারতে অনাহূত তা যেন সেটা যেন সে বুঝতে পারে। এসব ঘটনা অনেকেই জানেন, কিন্তু আমাদের অধিকাংশের আবার ঠিক তক্ষুনি মনে পড়ে যায় পাকিস্তানে হিন্দু বা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা কী বিপজ্জনকভাবে কমেছে স্বাধীনতার পর থেকে। অথবা বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে কীভাবে সংখ্যালঘুর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।

অথচ ১৯৪৭ সালের ১৫ অক্টোবর— স্বাধীনতা ও দেশভাগের মাত্র দু-মাস পরে— ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রদেশগুলির মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন:

পাকিস্তান থেকে যতই উস্কানি আসুক, এবং সেখানে অ-মুসলমানদের উপর যতই অপমান ও নৃশংসতা চালানো হোক না কেন, আমাদের এই দেশের সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সভ্য আচরণ করতেই হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের কর্তব্য।

আজ এসব কথার কোনও মূল্য আছে কিনা সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে আমি তা জানি না! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দক্ষিণপন্থী সামাজিক সংগঠন (RSS) ও তাদের রাজনৈতিক দলটি ভারতের সংখ্যাগুরু মানুষের মনে এটা ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে যে, সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা নয়, এ ছিল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর সংখ্যালঘু-তোষণ!

এই লেখাটা লিখতে লিখতে খবর পেলাম বাংলাদেশে নির্বাচনে জামাতের হার হয়েছে। বিএনপি জিতেছে। এপার বাংলায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মানুষ খুব চিন্তায় ছিল, যে যদি সাম্প্রদায়িক জামাত জিতে যায় এ নির্বাচনে! অথচ আমরা ভেবে দেখি না, ভারতে আমরা সংখ্যাগুরু হিন্দুর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের রাজনৈতিক শাখাকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছি। এ-কথা আমি বলতে চাই না যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয় না। খুব হয়। দীপু দাস তো একটা ‘জ্বলন্ত’ উদাহরণ। দীপু দাসের পরে আরও আরও অনেক সংখ্যালঘুর লাশ পড়েছে। আরও অনেক মায়ের কোল খালি হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেধাবী সংখ্যালঘু ছাত্র আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। সবটা নিশ্চয়ই প্রচার নয়। পরে আবার হবে। এই নির্বাচনের পরেও হয়তো আবার এক দফা হবে। কিন্তু মোদ্দা কথাটা হল বাংলাদেশ সম্পূর্ণত এবং স্বীকৃত চরম দক্ষিণপন্থী জামাতকে রুখে দিয়েছে। এপার-ভারত কিন্তু সেটা করে দেখাতে পারেনি। আমার এক বন্ধু বলেছিল, যদি আমাদের বাড়িতে একটা ছোটখাটো আগুন ধরে আর পাশের বাড়িতে এক বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটে, আমার তো উচিত হবে, আগে আমার বাড়ির আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করা। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই পাশের বাড়িতে সুবিশাল এক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, আমরা কিন্তু সেই পাশের বাড়ির আগুন নিয়েই বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছি। তাছাড়া সাধারণ মানুষের কথা যদি বাদও দিই, রাজনৈতিক দলগুলি? দীপু দাস খুন হয়ে যাওয়ার পর বামপন্থী দলগুলি সর্বতো প্রতিবাদ করেছে। মিছিল করেছে। করা তো উচিতও। কিন্তু এই প্রতিবাদ-মিছিলে কোথাও পাড়ায় রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে স্টেশনে বাজারে সোশাল মিডিয়ায়, সর্বত্র “সেকু-মাকু” গাল শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে যাওয়া নেই তো? না হলে এই একই সময়ে বাংলার নিম্নবর্গীয় অভিবাসী শ্রমিক, সংখ্যালঘু অভিবাসী শ্রমিক, ভিনরাজ্যে, মানে নিজের দেশেই খুন হয়ে গেলেন শুধুমাত্র বাঙালি হওয়ার কারণে, বাংলাদেশি সন্দেহে! তা নিয়ে টিভি স্টুডিও ছাড়া, বামপন্থীদের সেরকম গণ-আন্দোলন চোখে পড়ল না কেন! কেন মেইনস্ট্রিম বামপন্থী দলগুলি সার্বিকভাবে সমাজের সর্বস্তরে গণমুখী আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে পারল না, অভয়ার সময়ে যেমনটা হয়েছিল? অবশ্যই তা ছিল “অরাজনৈতিক”। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলি নিজেরা, বিশেষত বামপন্থী দলগুলি, অকুতোভয় হয়ে এরকম আন্দোলন করতে পারবে না কেন? কেন শুধুই চরম দক্ষিণপন্থী শক্তির সেট করে দেওয়া প্রতিবাদী বিষয়ের উপরই সীমাবদ্ধ থাকবে আদর্শগত দিক থেকে সেকুলার দলগুলির প্রতিবাদ-প্রতিরোধ? আমাদের বাড়ির আগুন আমরা নেভাব না?

 

তথ্যসূত্র:


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5313 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...