সম্প্রীতি চক্রবর্তী
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তালিবান নেতা হিবাতুল্লা আখুন্দজাদা নতুন পেনাল কোড আনেন যেখানে আফগান জনগণকে চারটি স্তরে ভাগ করা হচ্ছে। কারা সেই দেশে কার্যত মুক্ত আর কারাই বা দাস (স্লেভ) তা নির্দিষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে আইনে। প্রত্যেক স্তরের মানুষ পৃথক পৃথক সুবিধা, আইন বা ন্যায়ের অধিকারী। বলা বাহুল্য, এই স্তরীয় বিভাজনে মহিলারা আছে একেবারে তলানিতে; স্বামীদের অধিকার দেওয়া হয়েছে নিজেদের স্ত্রীদের ইচ্ছামতো শাস্তি দেওয়ার। উল্টোদিকে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অপরাধে একজন পুরুষকে মাত্র ২১ দিনের জেল হেফাজতে রাখা যাবে আর পশুদের নির্যাতন করলে জেলে থাকার মেয়াদ অনেক বেশি
I would love to be anything in this world
But not a woman.
I could be a parrot,
I could be a female sheep,
I could be a deer or
A sparrow living in a tree
But not an Afghan woman.—রোয়া মেহবুব
‘তোতাপাখি, ভেড়া, হরিণ বা চড়ুইপাখি, যা কিছু হতে পারি এই বিশ্বে, শুধু আফগান মহিলা হয়ে জন্মাতে চাই না…’— এমনই লিখেছিলেন আফগানিস্তানের কবি রোয়া। এই উপলব্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে আমরা ফিরে যেতে পারি ২০২৫ সালে হওয়া এক মর্মান্তিক ভূমিকম্পের জবানবন্দিতে। চিরাচরিত ক্ষয়ক্ষতির প্রসঙ্গ ছাড়াও অন্য এক বিষয় সকলের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারও হাত থাকে না, নিঃশব্দে মেনে নিতে হয় আপনজনের মৃত্যু বা নিজের বসতের বিপন্নতা। কিন্তু আফগানভূমে ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকার্যের সময় এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়; পুরুষকর্মীরা ইট, কাঠ, পাথরের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া মহিলাদের স্পর্শ করতে পারবে না, অন্তত দেশের আইন তাই বলছে। সুতরাং বেছে বেছে পুরুষদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হল। জরুরি অবস্থাতেও কোনও পুরুষ, পারিবারিক আত্মীয়তা না থাকলে, কোনও মহিলাকে স্পর্শ করবে না, আর তাই সারা বিশ্ব এই নারকীয় ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকল। ইন্টারভিউ বা মিডিয়া ফুটেজ বলছে ভূমিকম্পের পর আহত মেয়েরা যেন একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে থেকে গেল, তাদের পাশে দাঁড় করিয়ে শুধু পুরুষদেরই শুশ্রূষা চলল। এ ঘটনা যেন ভারতের নিরিখে বিচার করলে সতীদাহের নামান্তর। মনে পড়ে যায় ভারতেও একসময় মহিলারা দুরারোগ্য রোগের শিকার হয়ে, অন্দরমহলে পচে গলে মৃত্যুবরণ করতেন। পুরুষ কবিরাজ স্পর্শ করতে পারবে না সম্ভ্রান্ত পরিবারের কুলনারীকে, আর তাই প্রসূতিমৃত্যু থেকে ছোট মেয়ের অকালে চলে যাওয়া, কোনও কিছুই বাদ যায়নি এই দেশে। কিন্তু ১৮২৫ আর ২০২৫-এর মধ্যে রয়েছে দুই শতাব্দীর বহমান ইতিহাস। পৃথিবীর কোথাও, কোনও প্রান্তে, কোনও এক নারীকে যে আজও শুধু বেঁচে থাকার জন্য লড়ে যেতে হয়, ভূমিকম্পের পর নিজেকে রক্ষার জন্য এমন কাকুতিমিনতি করতে হয়, তা কল্পনাতীত।
২০২৫-এ বিবিসিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এক ২৮ বছরের আফগান মেয়ের অকপট স্বীকারোক্তি—
যুগ যুগ ধরে সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ, অসাম্য, অন্যায়গুলি আফগান মহিলাদের সঙ্গেই হয়ে এসেছে।
এই কথা ধরে যদি ফিরে যাওয়া যায় ঠান্ডা লড়াইয়ের ইতিহাসে, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের আবহে, তাহলে মুজাহিদিন ওয়ারলর্ডদের অকথ্য অত্যাচারের দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। পৃথিবীর যে কোনও যুদ্ধে শুধু সৈনিকরা মারা যায় না; ধর্ষণ, যৌন হিংসা বা শ্লীলতাহানির ভয়ঙ্কর রূপ নজরে আসে, যেমন ঘটেছিল ১৯৮০ সাল নাগাদ। একদিকে সোভিয়েত সৈন্যদের লুঠতরাজ, অপরদিকে মুজাহিদিন নেতাদের জেন্ডার ভায়োলেন্সের নানা নজির। মনে করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তালিবানরা ক্ষমতায় এলে হয়তো এই অবস্থা থেকে মুক্তি মিলতে পারে। কিন্তু সেই আশাভঙ্গের কাহিনি আর তালিবানদের অজস্র নারীবিদ্বেষী আইন সম্পর্কে সকলেই কম-বেশি অবগত। জন ও লিন্ডা শোল্টসের বিখ্যাত বই দ্য ডার্কেস্ট অফ এজেস: আফগান উইমেন আন্ডার দ্য তালিবান-এ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যবর্তী সময় আফগান মহিলাদের করুণ অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। কীভাবে তাঁদের আজকের মতোই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ, বা তালিবান পতাকার রং সাদা হওয়ায় মহিলাদের সেই রং ব্যবহার করতে না দেওয়া; জামাকাপড়, গয়না, পোশাক সবকিছুতেই নানা প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করেছে লেখক দম্পতি। ২০২১ সালে তালিবানদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার যেন আবার সেই কালা আইন ফিরিয়ে আনল।
এগুলি শুধু ইতিহাস বইয়ের ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবে দেখলে বড্ড ভুল হয়ে যাবে। ধরা যাক ২০০১ সালে আফগানভূমিতে জন্মানো একটি মেয়ে, আজ যার ২৫ বছর বয়স, যে মুজাহিদিন বা তালিবানদের ভয়ঙ্কর দিনের সাক্ষী কোনওদিন ছিল না, তার পক্ষে হঠাৎ করে স্কুল, কলেজ, চাকরি সবটা চলে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডের নামান্তর। সোশাল কন্ডিশনিং বা সামাজিক মূল্যবোধ অনেক সময় মেয়েদেরও পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব বহন করতে সাহায্য করে। তাই ১৯৯৬ সালে, প্রথমবার তালিবানরা ক্ষমতায় আসার পর, কিছু সাক্ষাৎকারে মহিলাদেরও নাবালিকা বিবাহ বা বোরখা পরা কিংবা চাকরি না করার মতো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে, কোনও পঁচিশ বা তিরিশ বছরের আফগান মেয়ের পক্ষে এই মনোভাবগুলি বহন করা যে ৯৬ সালের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি এক ২১ বছরের মেয়ে গোপন সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তালিবানরা যখন ক্ষমতা দখল করল তখন সে ক্লাস ইলেভেনে পড়ত। স্কুল শেষ করার পর কার্যত গৃহবন্দি দশা, দেশের আইন বলছে ক্লাস সিক্স পাশ করলে মেয়েরা আর স্কুলে যেতে পারবে না। কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনওভাবেই যাতে ছাত্রীরা নাম না লেখায়, এমনও নির্দেশিকা রয়েছে— ইঞ্জিনিয়ারিং, এগ্রিকালচার, জার্নালিজম, ভেটেনিয়ারি সায়েন্স বিষয়ের প্রথাগত শিক্ষা সেকেন্ডারি এডুকেশন থেকে বাদ রাখতে হবে। এমন দুর্বিষহ দিনে ২১ বছরের মেয়েটি জানায় যে উচ্চশিক্ষা বা চাকরি যেহেতু কল্পনার বাইরে, তাই সময়-সুযোগ পেলে বাড়িতে বসেই সে নভেল পড়ে। ফিকশনে ডুবিয়ে রাখে নিজেকে যাতে বাস্তবের ভয়াবহতা থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পাওয়া যায়।
এই সাক্ষাৎকার পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় বেগম রোকেয়ার সুলতানা’স ড্রিম-এর কথা। পর্দানশীন, অবরুদ্ধ মেয়েদের জীবনকে উল্টো করে দেখিয়েছিলেন রোকেয়া। এই স্কুলছুট মেয়েটিও কি রোকেয়ার মতো স্বপ্ন খোঁজে মনগড়া গল্পে? সুলতানার রচয়িতা তাঁর স্বামীর সাহচর্যে লেখাপড়া করত, পত্তন করেছিল মেয়েদের স্কুল, আফগান মেয়েটির পক্ষে নিশ্চয়ই এমনটা সম্ভব নয়, তাও আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঘেরাটোপ পেরিয়ে।
এই যদি হয় মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থার হাল আফগানভূমে, তাহলে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরিকাঠামো আরও বীভৎস দৃশ্য দেখায়।
জিল নামক এক অবসরগ্রহণকারী মহিলা ডাক্তার নিজের কথা বলেছেন সংবাদমাধ্যমে, কীভাবে ভয়ঙ্কর পরিণতির পথে আফগানিস্তানের প্রসূতিবিভাগ। মেয়েদের উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা মানে গ্রামেগঞ্জে মিড-ওয়াইফারি বা দাইমায়েদের কাজ আরও কঠিন হয়ে যাওয়া। নার্স বা আয়া, যাঁরা মেডিকেল ট্রেনিং বা আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত, তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। কোনওরকম প্রশিক্ষণ ছাড়া অদক্ষ মিড ওয়াইফেরা সি সেকশন, আলট্রাসনোগ্রাফি ইত্যাদি করতে পারেন না; প্রযুক্তির অভাব বা তা পরিচালনা করবার মতো মহিলারাও নেই। সুতরাং আফগানিস্তানে প্রসূতি মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বগামী। শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের হাল নিয়ে মনোবিদ জারিনা (আফগানিস্তানের বাসিন্দা) বলছেন যে অবসাদ ও মানসিক ব্যাধি একপ্রকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গেছে মহিলাদের ক্ষেত্রে, এর কারণ অবশ্যই তাদের কাজের পরিবেশ থেকে ব্রাত্য রাখা এবং গৃহকর্মে একপ্রকার বন্দি করে ফেলা। আত্মপরিচিতি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থেকে, সর্বস্তরে পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি গ্রহণ এবং হীনম্মন্যতা ক্রমশ গ্রাস করছে তাঁদের। এই সবই সুনিপুণভাবে রাষ্ট্রীয় আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তালিবান নেতা হিবাতুল্লা আখুন্দজাদা নতুন পেনাল কোড আনেন যেখানে আফগান জনগণকে চারটি স্তরে ভাগ করা হচ্ছে। কারা সেই দেশে কার্যত মুক্ত আর কারাই বা দাস (স্লেভ) তা নির্দিষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে আইনে। প্রত্যেক স্তরের মানুষ পৃথক পৃথক সুবিধা, আইন বা ন্যায়ের অধিকারী। বলা বাহুল্য, এই স্তরীয় বিভাজনে মহিলারা আছে একেবারে তলানিতে; স্বামীদের অধিকার দেওয়া হয়েছে নিজেদের স্ত্রীদের discretionary punishment বা ইচ্ছামতো শাস্তি দেওয়ার জন্য। উল্টোদিকে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অপরাধে একজন পুরুষকে মাত্র ২১ দিনের জেল হেফাজতে রাখা যাবে আর পশুদের নির্যাতন করলে জেলে থাকার মেয়াদ অনেক বেশি। সিমন দ্য বোভেয়ার লিখেছিলেন দ্য সেকেন্ড সেক্স, ১৯৪৯ সালে; কিন্তু আফগানিস্তানে ২০২৬ সালের নয়া আইনে দ্বিতীয় নাগরিক হওয়া তো দূরের কথা, মেয়েদের অবস্থা পশুদের চেয়েও নিকৃষ্ট। গৃহ-হিংসায় একুশ দিনের জেল হবে তখনই, যখন অভিযোগকারিণী শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ দিতে পারবে। স্পষ্টভাবে উল্লিখিত যে, ওপেন উন্ডস এবং ব্রোকেন বোনস ছাড়া খুব সহজেই অভিযোগ লেখানো যাবে না। সারা পৃথিবীতে এই নিয়মকে গার্হস্থ্য হিংসা সর্মথকারী কালো আইন বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। মহিলাদের শরীর, মন, চলাফেরার ওপর এমন মৌলবাদী নিয়ন্ত্রণের নজির বোধহয় আর কোথাও দেখা যায় না। নতুন পেনাল কোডের আর্টিকেল ৩৪ বলছে কোনও আফগান মহিলা তাঁর স্বামীর অনুমতি ছাড়া নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকলে তিন মাস পর্যন্ত জেল হতে পারে মেয়েটির, শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাবে না মেয়েটির পরিবারও।
তালিবান আইন অনুযায়ী মহিলারা কতটা নির্যাতিত তার বয়ান দিতে গেলে হয়তো একটা আস্ত বই লেখা হয়ে যাবে। তবু কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা আবশ্যক, যেগুলো আর পাঁচটা সাধারণ পরিবেশে ভাবা অসম্ভব। যেমন, মহিলারা কোনও অবস্থাতেই ৭২ কিলোমিটারের বেশি একা কোথাও যেতে পারবেন না, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া। আল জাজিরা-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী পার্ক বা কোনও পাবলিক রিক্রিয়েশনের জায়গায় একজন মহিলা প্রবেশ করতে পারবে সপ্তাহে মাত্র দুদিন। কোনও ক্যাফে, খাবার জায়গা, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, এমনকি হেলথ সেন্টারে প্রবেশ করতে গেলেও পরিবারের পুরুষকে দরকার। অর্থাৎ পুরুষ আত্মীয়ের অনুমতি-ব্যতীত দুরারোগ্য রোগেও একজন নারী নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন না। লেখার একেবারে শুরুতে ভূমিকম্পের করুণ পরিণতির কথা বলেছি, আবারও দেখা যাচ্ছে যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বামী, পিতা বা পারিবারিক পুরুষ অভিভাবকেরা আফগান মহিলাদের জীবন সর্বস্তরে নিয়ন্ত্রণ করেন। মবিলিটি, হেলথ সেন্টারে যাওয়া, পড়াশোনা করা, সবক্ষেত্রেই যে নিয়ন্ত্রণের কথা আইনে বলা হচ্ছে এবং সমাজে কার্যকর হচ্ছে তা কিন্তু প্রাচীন ও মধ্যযুগের দাসপ্রথার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। স্লেভ বা দাস বলতে যে যে অধিকার হরণের কথা আমরা ইতিহাসে পড়ে এসেছি, আফগানিস্তানের মেয়েদের অবস্থাও নথি মিলিয়ে দেখলে একেবারে অভিন্ন ঠেকবে।
National public radio (of America) বা NPR-এর ২০ ফেব্রুয়ারির (২০২৬) রিপোর্টে বলা হচ্ছে নারীবিদ্বেষী নানা আইন বলবৎ করার জন্য কীভাবে আফগান সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে সম্প্রতি। এতদিন বোরখা পরা বা পুরুষ অভিভাবক সঙ্গে রাখা— এই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে অন্তত রক্ষী বা পুলিশ মোতায়েন করা হত না। কিন্তু ২০২৬ সালে হাসপাতালে অসুস্থ রোগীকেও বোরখা ছাড়া ঢুকতে না দেওয়া বা বোরখা পরলেও মুখ সম্পূর্ণ ঢাকতে হবে— এমন সব আইন অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে সারা দেশে। এই নিয়মগুলিকে একত্রে বলা হয় law on the promotion of virtue and prevention of vices. এই আইন সর্বতোভাবে পালন হচ্ছে কিনা তার জন্য এজেন্টদেরকে নিয়োগ করা চলছে। হাসপাতালের বাইরে, রাস্তাঘাটে, মসজিদে ও স্কুলে তারা দণ্ডায়মান। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চেকিং পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়; বাস বা প্রাইভেট গাড়ি থেকেও মহিলাদের নামিয়ে দেখা হচ্ছে যে তাদের পোশাক বা মুখ সম্পূর্ণ ঢাকা কি না। সর্বদা নজরদারির মধ্যে থাকা এই ভয়াবহ পরিবেশ জেলবন্দি কয়েদিদের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। পঞ্চম শ্রেণির একটি বাচ্চা মেয়েকে যদি স্কুলের বাইরে দ্বাররক্ষীকে রোজদিন প্রমাণ দিতে হয় যে তার বোরখা ঠিকমতো পরা হয়েছে কিনা, মুখ বা হাত কতটা আড়ালে, তাহলে সেই শিশুর মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। মার্গারেট আর্টউড ফেমিনিস্ট ডিস্টোপিয়া: দ্য হ্যান্ডম্যাডস টেল লিখেছিলেন। নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ আর মেয়েদেরকে সেক্সুয়াল লেবার হিসেবে গণ্য করার এক ভয়াবহ অবস্থা। আফগান মেয়েদের কথা পড়ে সেই ফিকশনে ফিরে যেতে হয়, তফাৎ শুধু এটাই যে গালগল্প নয় ঘোর বাস্তব বয়ান পড়ে চলেছি আমরা।
আলোচনার একেবারে শেষভাগে কিছু ইতিবাচক দিক নিয়েও কথা বলা জরুরি, আফগানিস্তানে গত চার বছরে যেভাবে কিছু প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে, তা অনুধাবনের চেষ্টা প্রয়োজন। যেমন, পারওয়ানা নিজরাবির কথা, তালিবানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন এবং পরে মুক্তি পেয়ে তৈরি করেন Women Movement for Freedom and Peace. মহিলাদের সুরক্ষা-সংক্রান্ত নানা গঠনমূলক কাজ করে যাচ্ছে এই সংস্থা, এর প্রণেতা পারওয়ানা তাঁর ভাষ্যে জেন্ডার অ্যাপার্থাইড কথাটা বারবার ব্যবহার করছেন।
জার্মানি থেকে আমেরিকা, বিভিন্ন দেশে দেখা মিলেছে নারীবাদী সংহতির। এই কাজের পাশাপাশি যদি কিছু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব বা গবেষণা নজরে পড়ে। ১৯৯০ সাল থেকে ইজিপ্ট, মরক্কো, টিউনিশিয়া, ইরান ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় মহিলাদের দ্বারা এবং মহিলাদের নিয়ে অজস্র লেখাপত্র সামনে এসেছে, যাকে একত্রে বলা হয় ‘ইসলামিক ফেমিনিজম’। স্কলার বা তাত্ত্বিক আমিনা ওয়াদুদ, আসমা বার্লাস এবং ফাতিমা মারন্নিসি হলেন ইসলামি নারীবাদী লেখক। এঁরা একাধারে যেমন আফগানিস্তানে হয়ে চলা চরম পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে সমালোচনা করেন, অপরদিকে পাশ্চাত্য ফেমিনিজমের ধারণাকেও নাকচ করেন। এঁরা অনেকেই মনে করেন যে আফগানিস্তানের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা বা সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেও নারী অধিকার নিয়ে কথা বলা যায়। ইসলাম বা যে কোনও ধর্ম যে একশিলাবিশিষ্ট/মনোলিথিক কোনও ধারণা নয়, সবটাই নির্ভর করে ইন্টারপ্রিটেশন বা ব্যাখ্যার ওপর, সেই কথা বলতে চান আমিনা ওয়াদুদরা। আফগানিস্তানে কোনওদিনও মহিলারা পড়াশোনা করতেন না এমনটা নয়, সবধরনের নারী অধিকারের প্রশ্ন যে পশ্চিমেই উত্থিত হয়েছে এমনটাও নয়; তাহলে এশিয়া, আফ্রিকা, ইরান বা আফগান মেয়েরাও যে নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারে, সেই বিষয়ে জোর দেয় ওয়াদুদ, বার্লাস বা মারন্নিসির লেখাপত্র। এই ধারণা বা তত্ত্বগুলি মোটেই উড়িয়ে দেওয়ার নয়, ২০২১-এর পর তালিবানের ক্ষমতা দখল এমন গবেষণাকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নারীবিদ্বেষী আইন, গার্হস্থ্য হিংসাকে মান্যতা দেওয়া, মেয়েদের পড়াশোনা, চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা এবং এই সমস্ত কিছুকে ইসলামপ্রদত্ত একমাত্র পথ বলে দেগে দেওয়ার বিরুদ্ধে ইসলামিক ফেমিনিজম কিছুটা হলেও ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই ধরনের বিকল্প স্বর বোঝাতে চায় যে ইউরোপ বা আমেরিকার ত্রাতারূপে এগিয়ে আসার যে অবয়বটি সারা বিশ্বের কাছে পেশ করা হয়, তার মধ্যেও এক রাজনীতি রয়েছে।[1] তাই আফগান মেয়েদের অত্যাচার বন্ধ করবার জন্য শুধু পশ্চিম নয়, আমেরিকা নয় বরং তথাকথিত তৃতীয় বিশ্ব এবং সর্বোপরি মুসলিম মহিলাদের মতামত শোনা দরকার। এক্ষেত্রে অবশ্যই সারা বিশ্বের মানুষের সংহতি প্রয়োজন, এও মাথায় রাখতে হবে যে শুধু তত্ত্ব দিয়েই সমাধান খোঁজা যায় না, বরং দরকার নারীবাদী কর্মসূচির। কীভাবে বিকল্প পড়াশোনার জায়গা তৈরি করা যায়, গ্রাসরুটে কাজ করা, আঞ্চলিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, অনলাইনে যোগাযোগের চেষ্টা এবং সমাধান খোঁজা আবশ্যক। এই সব পন্থাতেই আফগান মেয়েদের মতামত, বিচার বা সিদ্ধান্তকে সামনে আনা জরুরি; যেভাবে গোপনে বা নানা ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সাক্ষাৎকার ও নির্যাতনের ইতিহাস দেশের বাইরে আসছে মেয়েদের বয়ানে। সমাধানের পথ আজ না হোক কাল মিলবে, ততদিন পর্যন্ত মিনা কাশ্যের কামাল[2]-এর মতো ব্যক্তিত্বরা আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকতে পারে। আরও বেশি আলোচনা হোক জাইনা আনোয়ারের তৈরি SIS[3] নিয়ে কিংবা মুসাওয়া সংস্থা, ২০০৯ সালে এই দল গড়ে ওঠে ১২ জন আরব-মহিলার চেষ্টায়।
অর্থাৎ, এটাই বলার যে কেবল নিগ্রহের ইতিহাস নয়, উৎপীড়নের গাঁথা নয়, বিদ্রোহের নজিরও রয়েছে আমাদের আশেপাশেই, সেই স্বর যেন কোনওভাবেই উপেক্ষিত না হয়।
[1] যেমন, মালালা ইউসুফজাই।
[2] প্রখ্যাত আফগান বিপ্লবী যিনি ১৯৭৭ সালে তৈরি করেন Revolutionary Association of the Women of Afghanistan.
[3] sisters in Islam, যারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে কর্মসূচি চালায়।
*মতামত ব্যক্তিগত

