যে বই পড়তে চাই, কিন্তু পড়িনি

নবিউল ইসলাম

 


অপঠিত বই ব্যর্থতার চিহ্ন নয়, পাঠকের কৌতূহল ও সীমার স্বীকৃতি। যে-পাঠক কোনও বই পড়তে চান, কিন্তু পড়েননি— তিনি আসলে নিজের বর্তমান অবস্থার বাইরে তাকাতে চেয়েছেন

 

 

প্রত্যেক পাঠকের জীবনে কিছু বই থাকে, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক অদ্ভুতভাবে অসম্পূর্ণ। সেই সব বই পড়া হয় না, অথচ অনুপস্থিতও নয়। আলমারির এক কোণে রাখা গোরা, বহুদিনের বুকলিস্টে ঝুলে থাকা পুতুলনাচের ইতিকথা, কিংবা মাঝপথে থেমে যাওয়া শ্রীকান্ত— এই বইগুলো কেবল অপঠিত নয়, পাঠকের মনে এক ধরনের সম্ভাব্য পাঠ হিসেবে বেঁচে থাকে। পড়া বই আমাদের স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। আর যে-বই পড়তে চাই, কিন্তু পড়িনি— সে-বই আমাদের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র তৈরি করে।

 

সাম্প্রতিক সময়ের একটি বইয়ের কথাই বলা যাক। দেবকুমার সোমের উপন্যাস চর লবণগোলা। সীমান্ত জনজীবন নিয়ে লেখা এই উপন্যাস হাতে পাওয়ার তীব্র বাসনা ভুলবার নয়। উপন্যাসটি সংগ্রহ করার দুর্নিবার আকর্ষণ পাঠক হিসেবে আমি বেশ উপভোগ করেছি। একটি অপঠিত বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পাঠের নয়, কল্পনার— সেটা উপলব্ধ হয়।

একটি অপঠিত বই কীভাবে খুলবে নিজেকে— তা আমরা জানি না। তবু আমরা ধরে নিই, আরণ্যক পড়লে প্রকৃতির ভাষা নতুন করে শিখব, চিলেকোঠার সেপাই পড়লে রাজনৈতিক রোমান্টিকতা ও ভাঙনের ইতিহাস বুঝব, তিতাস একটি নদীর নাম পড়লে জীবন ও লোকসংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় প্রবাহের মুখোমুখি হব। উমবের্তো একো বলেছিলেন, পাঠ মানে সহ-সৃজন। কিন্তু অপঠিত বইয়ের ক্ষেত্রে পাঠক বইকে পড়েন না— বইকে কল্পনা করেন। এই কল্পনাই বইটিকে মানসিক বাস্তবতা দেয়।

 

বাংলা সাহিত্যে কিছু লেখকের নামই এক ধরনের মানসিক ভার তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, তারাশঙ্করের গণদেবতা, জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সংকলন— এই বইগুলো পড়ার ইচ্ছে বহু পাঠকেরই থাকে, কিন্তু পড়ে ওঠা হয় না। কারণ প্রত্যাশা অত্যধিক। মনে হয়, এই বই পড়তে গেলে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে— একটা নির্দিষ্ট মনোযোগ, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট মানসিক পরিসর নিয়ে। হ্যান্স রবার্ট ইয়াউসের রিসেপশন থিওরি অনুযায়ী, পাঠকের প্রত্যাশা পাঠের অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রত্যাশা যত বেশি, পাঠ শুরু করার দ্বিধা তত প্রবল। এই কারণে অনেক ক্লাসিক বই অপঠিত থাকে— অবহেলায় নয়, অতিরিক্ত শ্রদ্ধায়।

 

কিছু বই পড়তে চাই বিষয়ের জন্য, কিন্তু পড়তে গিয়ে পিছিয়ে আসি নিজের অবস্থান রক্ষার তাগিদে। রণজিৎ গুহর ঔপনিবেশিক ভারতে কৃষক বিদ্রোহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের জাতীয়তাবাদের ইতিহাস, সুমিত সরকারের ইতিহাস গ্রন্থ, কিংবা অমর্ত্য সেনের ভারতবর্ষে যুক্তি ও ন্যায়— এই বইগুলো নিছক জ্ঞান দেয় না, পাঠকের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্ন করে। মিশেল ফুকোর ভাষায়, জ্ঞান কখনও নিরপেক্ষ নয়। ফলে, এই ধরনের বই পড়া মানে নিজের বিশ্বাসের আরামদায়ক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা। পাঠক বইটির দিকে আকৃষ্ট হন, আবার সরে যান। এই দ্বিধা আসলে সচেতন পাঠকের চিহ্ন।

শুধু তত্ত্বের বই নয়— কিছু উপন্যাসও অপঠিত থেকে যায়, কারণ সেই উপন্যাসগুলি অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসে। হাজার চুরাশির মা, একুশে ফেব্রুয়ারি, নীলদর্পণ, কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু— এই বইগুলো পড়া মানে সমাজ ও আত্মার মুখোমুখি হওয়া। এই ধরনের পাঠ এড়িয়ে যাওয়া এক ধরনের আত্মরক্ষা। পাঠক জানেন, এই বই পড়লে নিরপেক্ষ থাকা যাবে না।

 

আজকের দিনে অপঠিত বইয়ের একটি বড় কারণ মনোযোগের সংকট। যে বই পড়তে চাই কিন্তু পড়িনি, সেগুলো সাধারণত ধীর পাঠ দাবি করে— যেমন রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ সংকলন, অন্নদাশঙ্কর রায়ের পথে প্রবাসে, বা বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যতত্ত্ব। ডিজিটাল সময়ে খণ্ডিত মনোযোগ গভীর পাঠকে ক্রমশ দুর্লভ করে তুলেছে। নিকোলাস কার যেমন বলেছেন, আমরা পড়তে চাই দ্রুত, কিন্তু বুঝতে চাই ধীরে— এই দ্বন্দ্বেই বহু বই অপঠিত থেকে যায়।

অনেক পাঠক মনে করেন, কিছু বই পড়ার জন্য আগে ‘যোগ্য’ হতে হয়। ফলে মেঘনাদবধ কাব্য, আনন্দমঠ, কিংবা শরৎচন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস দীর্ঘদিন পড়া হয় না। রোলাঁ বার্ত বলেছিলেন, লেখক মৃত— পাঠকই অর্থ নির্মাণ করে। কিন্তু ক্লাসিক বইয়ের ক্ষেত্রে আমরা লেখককে এতটাই জীবিত রাখি যে, পাঠক নিজেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।

বই না পড়া নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের নৈতিক অপরাধবোধ আছে। কিন্তু আলবের্তো মাঙ্গুয়েল মনে করিয়ে দেন— সব পাঠই নির্বাচিত। সব বই পড়া সম্ভব নয়। অপঠিত বই তাই ব্যর্থতার নয়, বরং কৌতূহলের চিহ্ন। গোরা না পড়েও রবীন্দ্রনাথকে গুরুত্ব দেওয়া যায়; পদ্মানদীর মাঝি না পড়েও মানিকের সামাজিক দৃষ্টি অনুভব করা যায়— কারণ বইগুলো আমাদের মানসিক মানচিত্রে উপস্থিত।

এমন কিছু বই পড়তে চাই বিষয়ের কারণে, কিন্তু পড়ি না আত্মরক্ষার কারণে। রণজিৎ গুহর Elementary Aspects of Peasant Insurgency, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের The Nation and Its Fragments, কিংবা অশিস নন্দীর The Intimate Enemy— এই বইগুলো কেবল তথ্য দেয় না, পাঠকের বোধ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মিশেল ফুকো যেমন পাঠকে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর ‘জ্ঞান কখনও নিরপেক্ষ নয়’— সেই অর্থে এই ধরনের বই পড়া মানে নিজস্ব অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। ফলে পাঠক বইটির দিকে আকৃষ্ট হন, আবার পিছিয়েও যান। এই দ্বিধা আসলে চিন্তাশীল পাঠকের লক্ষণ। নিকোলাস কার The Shallows-এ দেখিয়েছেন, ডিজিটাল সংস্কৃতি কীভাবে গভীর পাঠের ক্ষমতা ক্ষয় করে। যে বই পড়তে চাই কিন্তু পড়িনি, সেগুলো সাধারণত ধীর পাঠ দাবি করে এই জন্য যে— যেমন ফার্নান্দ ব্রদেলের Mediterranean, বা কার্ল মার্ক্সের Capital— এই বইগুলো সময়ের অভাবে নয়, বরং একাগ্রতার অভাবে অপঠিত থাকে। ফলে অপঠিত বই ব্যক্তি-সমস্যা নয়, এটি সময়ের পাঠ, সংস্কৃতির দলিল।

 

অনেক ক্লাসিক বই পড়া পিছিয়ে যায় এই ধারণায় যে, ‘এখনও সময় আসেনি’। জয়েসের Ulysses বা দান্তের Divine Comedy কেবল পাশ্চাত্য পাঠেই নয়, বাংলাতেও এক ধরনের ‘ভয়ের পাঠ্য’। এই ভয় আসলে পাঠকে অযথা পবিত্র করে তোলার ফল। রোলাঁ বার্ত বলেছিলেন, লেখক মৃত— পাঠকই পাঠের অর্থনির্মাতা। কিন্তু ক্লাসিক বইয়ের ক্ষেত্রে আমরা লেখককে এতটাই জীবিত রাখি যে, পাঠক নিজেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে।

বই না-পড়ার সঙ্গে আমাদের সমাজে এক ধরনের নৈতিক অপরাধবোধ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আলবের্তো মাঙ্গুয়েল তাঁর A History of Reading–এ মনে করিয়ে দেন— সব পাঠই নির্বাচিত, সব বই পড়া অসম্ভব। অপঠিত বই তাই ব্যর্থতার চিহ্ন নয়, বরং পাঠকের কৌতূহল ও সীমার স্বীকৃতি। যে-পাঠক কোনও বই পড়তে চান, কিন্তু পড়েননি— তিনি আসলে নিজের বর্তমান অবস্থার বাইরে তাকাতে চেয়েছেন।

ইতালো ক্যালভিনো Why Read the Classics?–এ বলেছিলেন, ক্লাসিক সেই বই, যা কখনও শেষ হয় না। সেই অর্থে, কিছু বই হয়তো কখনও পড়া শেষও হবে না— কারণ শুরুই হবে না। তবু সেইসব বই পাঠকের জীবনে একটি মানসিক কাঠামো তৈরি করে দেয়। বইটি তাকেই থাকুক— তাতে ক্ষতি নেই। তার উপস্থিতিই পাঠকের চিন্তার পরিসরকে বড় করে।

যে বই পড়তে চাই, কিন্তু পড়িনি— সেগুলো আমাদের অসম্পূর্ণতার দলিল নয়, বরং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র। তারা মনে করিয়ে দেয়— পাঠ কেবল শেষ করার প্রক্রিয়া নয়, এটি চাওয়ার প্রক্রিয়াও।

আর সম্ভবত, একজন পাঠককে জীবিত রাখে এই অসম্পূর্ণতাই।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5300 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...