পার্থজিৎ চন্দ
যতবার তার কাছে আসি ততবার প্রথমে আত্মপ্রশ্নে, তারপর অদ্ভুত এক নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনা, সৌন্দর্য-সন্ধান ও কাব্যতত্ত্বে ছারখার হয়ে যাই। তথাকথিত অবক্ষয়ী আধুনিকতা বা আধুনিকোত্তর জগৎ থেকে সে-জগৎ সম্পূর্ণ পৃথক। এতটাই পৃথক যে তার পাশাপাশি অনেক ‘সন্ধান’কেই রীতিমতো লিলিপুট বলে মনে হয় আজকাল
যে-গ্রন্থ ‘পড়িনি’, অথচ যে-গ্রন্থের কাছে এসে আমি মাঝে-মাঝেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি, তার সঙ্গে আমার সংযোগ বহুদিনের। একটি গ্রন্থের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সংযোগ না-থাকলে সেটিকে পাঠ না-করার অনুভূতিও জাগতে পারে না। কারণ, গ্রন্থটি পাঠ না-করার ভেতর যে আক্ষেপ লুকিয়ে থাকে তাকে জন্ম দিয়েছে ওই ‘সংযোগ’ই। সে-গ্রন্থ থেকে অপরের করা উদ্ধৃতি, লোকমুখে বারবার শোনা অথবা রেফারেন্স— সাধারণত এই বিষয়গুলিই সে সংযোগ তৈরি করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু, আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ অদ্ভুত।
এই গ্রন্থটি আমি ‘সম্পূর্ণ’ পাঠ করে উঠতে পারিনি, এই গ্রন্থটির সঙ্গে আমার সংযোগ প্রাথমিক পর্বে রয়েছে এখনও, তার সবচেয়ে বড় কারণ গ্রন্থটির বহুরৈখিকতা ও বহুমাত্রিকতা।
যতবার তার কাছে আসি ততবার প্রথমে আত্মপ্রশ্নে, তারপর অদ্ভুত এক নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনা, সৌন্দর্য-সন্ধান ও কাব্যতত্ত্বে ছারখার হয়ে যাই। তথাকথিত অবক্ষয়ী আধুনিকতা বা আধুনিকোত্তর জগৎ থেকে সে-জগৎ সম্পূর্ণ পৃথক। এতটাই পৃথক যে তার পাশাপাশি অনেক ‘সন্ধান’কেই রীতিমতো লিলিপুট বলে মনে হয় আজকাল। এই গ্রন্থে আসলে ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’ হয়ে ‘শিল্প-সত্য’ হয়ে উঠেছে। বারবার মনে হয় এই গ্রন্থটিও এক সুবর্ণ-হরিণ; মায়ামারিচের ছদ্মবেশ তাকে ধারণ করতে হয়নি।
তার অন্তর্গত সম্পদ ও সৌন্দর্যই তাকে হাজার-হাজার বছর আয়ু দিয়েছে।
গ্রন্থটির নাম নাট্যশাস্ত্র, রচয়িতা ভরত মুনি। আমার যে গ্রন্থটি বারবার ‘শপথ’ করার পরেও পড়া হয়ে ওঠেনি সেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫১ সালে, অনুবাদ করেছিলেন মনমোহন ঘোষ (এমএ, পিএইচডি)। প্রকাশক ‘এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল’।
এবার ধীরে-ধীরে প্রবেশ করা যাক সেই প্রসঙ্গে— কেন এটি আমার কাছে সদর্থে একটি ‘ঘাতক’ গ্রন্থ হয়ে উঠেছে এবং কেন এই গ্রন্থটি পাঠ করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে দিনের পর দিন। একটি গ্রন্থের ভূমিকা কী পরিমাণ চিন্তার খোরাক জোগাতে পারে তার দিকে নজর দেওয়া যাক, মনমোহন ঘোষ লিখছেন,
ট্র্যাজেডির ছয়টি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করতে গিয়ে অ্যরিস্টটল বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন প্লট বা কাহিনির ওপর; মঞ্চসজ্জা যে কাজ করতে পারে নাটকের প্লটও সে কাজ করতে পারে। ‘টেরর’, বা ‘পিটি’ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে অহেতুক মঞ্চসজ্জা বা নাটকের চরিত্রদের পোশাকে গুরুত্ব দেওয়া অর্থহীন, বস্তুত যিনি যত ‘বড়’ কবি তিনি তত সার্থকভাবে শুধুমাত্র ‘কাহিনি’কে আশ্রয় করে নাটকে অভিঘাত ফুটিয়ে তুলতে পারেন। একজন শিল্পবোধহীন নাট্যকার বা কবিই শুধুমাত্র দামি পোশাকের বিনিময়ে সে কাজ করতে চান।

শুধুমাত্র এই অংশটি উল্লেখ করেই অনুবাদক ও চিন্তক থেমে থাকেননি। তিনি এরপর পাঠককে আরও চিন্তার সন্ধান দেবেন। তিনি গ্রিক-নাটক ও ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য, সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম সব বৈপরীত্য দেখাতে গিয়ে সঠিকভাবে উল্লেখ করেছেন ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে ‘রূপক’ ও ‘প্রেক্ষা’র গুরুত্ব ও ভূমিকা। গ্রিক নাট্যকারদের এক বড় অংশের কাছে যেখানে ‘নট’-এর ভূমিকা ছাড়াই ট্রাজেডির বোধ অনুভূত হওয়ার বিষয়টি একমাত্র সত্য হয়ে রয়েছে সেখানে ভরত মুনির কাছে (যা আসলে ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রের অন্দরমহলের সন্ধান) নৃত্য, গীত থেকে শুরু করে শারীরিক অভিনয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু তাই নয়, গ্রিক নাট্যকাররা যখন সময়, ঘটনাস্থল, কাহিনির সঙ্গে একটি যোগসূত্র বাঁধতে তৎপর ছিলেন এই ভূখণ্ডে তখন চলেছে এই তিনটি শর্তকে ‘মুক্ত’ করার উৎসব।
কোন নিগূঢ় সত্যের সন্ধান দেয় এই পর্যবেক্ষণ? এই ভূখণ্ডের ভেতর, এই প্রকৃতি ও জীবনধারার ভেতর তা হলে কি এমন আনন্দের স্রোত রয়েছে যা জীবনের ওপর ঘন হয়ে থাকা বিয়োগাত্মক ছায়াটিকে প্রতিহত করে চলেছে দিনের পর দিন? তথাকথিত ভাববাদী দর্শন বলে আমরা যাকে চিহ্নিত করি তাই-ই কি এই ভূখণ্ডে নাটকের সার্বিক চরিত্র স্থির করে দিয়েছিল বহু আগেই? এই ভূখণ্ডের ‘সচ্চিদানন্দ’র যে ধারণা, যাকে স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, “…সচ্চিদানন্দ-এর সমুদ্র— সৎস্বরূপ, চিৎস্বরূপ ও আনন্দস্বরূপের একীভাব। ইনি স্থান-কালের সমস্ত ভেদের (বা বৈশিষ্ট্যের) ওপারে থেকেও নিজেকে নানা বৈশিষ্ট্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেন।” স্থান, কাল অতিক্রম করে ‘তাঁর’ অবস্থান এবং যেহেতু তিনি সমস্ত ‘জ্ঞানের’ অতীত, যেহেতু তিনি ‘পূর্ণ’ সেহেতু টাইম, প্লেস ও অ্যাকশনের ‘সংকীর্ণ’ পরিসর তাঁর জন্য নয়। তিনি একই সঙ্গে বহু এবং ‘একক’। এই দর্শনের কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে এই ভূখণ্ডের নাট্যকাররাও যে চরিত্রদের ক্ষেত্রে স্থান, কাল ইত্যাদির বিষয়ে ‘শিথিল’ মনোভাব পোষণ করবেন তাই হয়তো স্বাভাবিক।
আমাদের স্মরণে রাখা জরুরি, নাট্যশাস্ত্র-কে পঞ্চম বেদ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। ক্রমশ ক্লিন্ন হয়ে যাওয়া জীবনকে দিশা দিতে স্বয়ং ইন্দ্র ও ব্রহ্মাকে কেন্দ্রে রেখে এই ‘বেদ’ নির্মাণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ভরত মুনির কথানুসারে। একই সঙ্গে দৃশ্য ও শ্রাব্য মাধ্যম হলে সে কাজটি যে সব থেকে বেশি সার্থক হয়ে উঠতে পারে এই সহজ কথাটি অনুধাবন করেছিলেন এই শাস্ত্রটিকে ক্রমশ রূপ দিতে ব্যস্ত ‘ক্ষমতা’। কেন ‘ক্ষমতা’ শব্দটির কাছে গিয়ে পৌঁছেছিলাম এই গ্রন্থটির ‘অসম্পূর্ণ’ পাঠের সময়ে তা উল্লেখ করা দরকার।
শূদ্রের যে বেদ-অধ্যয়নের অধিকার ছিল না তা মুক্ত-কণ্ঠে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এখানে। ইন্দ্রই বেশ কিছুটা প্ররোচিত করেছিল ব্রহ্মাকে এমন একটি ‘বেদ’ নির্মাণ করতে যাতে একই সঙ্গে চারটি বর্ণেরই অধিকার থাকবে।
এই গ্রন্থটির বহুমাত্রিকতা এবং এক-একটি পৃষ্ঠা থেকে উঠে আসা চিন্তাসূত্র কেন আমাকে গ্রন্থটি পাঠ করার ক্ষেত্রে ধনাত্মক-প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে তার একটি নমুনা দেওয়া যাক।
এই যে ‘ব্রহ্মা’ নামক এক বিপুল ক্ষমতা ইন্দ্রকে বিদায় জানিয়ে চিন্তায় মগ্ন হলেন এবং চারটি বেদ স্মরণ করে পঞ্চম বেদ নির্মাণে মগ্ন হলেন তা কি ক্রমে এক ‘অল-ইনক্লুসিভ’ ফ্রেমের দিকে অগ্রসরতার ইঙ্গিত? শূদ্রের বেদপাঠের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পর ‘ক্ষমতা’ কি অনুধাবন করেছিল এমন একটি বেদ সৃষ্টির যার মধ্যে শূদ্রদের ‘ইনক্লুড’ করে নেওয়া যাবে?
যে পদ্ধতিতে নাট্যশাস্ত্র গড়ে উঠেছে তাতে এই বিষয়টিকে ফেলে দেওয়া যায় না। এখানে আরও একটি বিষয় উঠে আসে। শূদ্র-বর্ণ কি নৃত্য-গীতে বিশেষ পারদর্শী ছিল?
আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবা দরকার, শূদ্র-সহ আরও দুটি বর্ণের মানুষকে এই বেদের মধ্যে ইনক্লুড করে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে কি সংস্কৃতির আগ্রাসনের প্রাচীন পদ্ধতিটি সম্পন্ন হয়েছিল? আসলে ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতির ভেতরে ক্রমে আরও তিনটি বর্ণের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহকে ধারণ করে নেওয়ার প্রবল প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার কারণেই কি নাট্যশাস্ত্রের উদ্ভব? এবং যেহেতু ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতি প্রবল শক্তিশালী তখন, তাই ব্রহ্মা ও ইন্দ্রকে কেন্দ্রে রেখে তাদের হাত দিয়েই এই ‘জন্মদান’-এর বিষয়টিকে সাধিত করা হয়েছিল!

দুই.
এই সাধিত হওয়ার বিষয়টির পিছনে যে রাজনৈতিক কারণ ছিল তাও কি এক অর্থে স্বীকারই করে নেয়নি নাট্যশাস্ত্র? দীর্ঘ উপনিবেশের দিনকাল ও রূপকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্যসন্ধানের পরিবর্তিত ধারা আমাদের ভুলিয়ে দিয়েছে মিথোলজির ভেতর বাসা বেঁধে থাকা সত্যের রূপ।
আমি এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণ পাঠ করে উঠতে পারিনি; কিন্তু আমি কি কোনও একদিন পাঠ করিনি যে এই শাস্ত্রপাঠে (যা স্বয়ং ব্রহ্মা উচ্চারণ করেছেন) প্রভূত সুফল লাভ হওয়ার কথা! মালাচন্দনের গন্ধে ভরে থাকা এই শাস্ত্রের প্রয়োগে শুধুমাত্র যে দেবতারাই খুশি হন, শাস্ত্রচর্চাকারী সুফল ভোগ করেন তাই নয়, ‘রাজা’ও গূঢ় পদ্ধতিতে লাভবান হন।
দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যম কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল এবং কীভাবে তাকে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষজন তার দিকে তাকিয়ে আরও একবার হতবাক হয়ে যেতে হয়।
ছত্রিশতম অধ্যায়ে যখন স্পষ্ট উল্লেখিত হয়ে থাকে, রাজার সমস্ত কাজের মধ্যে এই কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল (‘মহাফল’) দান করে তখন এই শাস্ত্রের গুরুত্ব আরও বেশি করে ধরা দেয় আমাদের কাছে। জনগণকে রাজার দেওয়া সমস্ত উপহারের মধ্যে এই ‘উপহার’ সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়ে থাকে।
এই শাস্ত্রের ভিত যে কতদূর পর্যন্ত গভীর ছিল তার নিদর্শনও কি পাওয়া যায় না মঞ্চের নির্দিষ্ট পরিমাপের মধ্যে দিয়ে? ভাবতে অবাক লাগে সেই কবে শাস্ত্রে ভরত মুনি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন মঞ্চের মাপ; তিন ধরনের মঞ্চ নির্মাণ ‘বৈধ’ ছিল। তারা যথাক্রমে অবলঙ্, চতুর্ভুজাকার ও ত্রিকোণাকার।
মনমোহন ঘোষ তাঁর এই গ্রন্থে বহু রেফারেন্স এবং ক্রস-রেফারেন্স ঘেঁটে একে-একে উন্মোচিত করছেন তাদের বৈশিষ্ট্য। এই মঞ্চনির্মাণের ব্যাপারটি ভরত মুনি ছেড়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকর্মার উপর। স্বয়ং বিশ্বকর্মার দ্বারা নির্দেশিত মাপের বাইরে মঞ্চ নির্মাণ করলে কী প্রমাদ ঘটতে পারে তারও উল্লেখ রয়েছে গ্রন্থটিতে, বলা হচ্ছে, “এই মাপ লঙ্ঘন করে মঞ্চ নির্মাণ করলে অভিনয়ের সময় অভিনেতাদের দ্বারা উচ্চারিত শব্দেরা হারিয়ে যেতে পারে। দর্শকদের কাছে ‘enunciated syllables’-গুলি ‘অস্পষ্ট’ হয়ে ধরা দিতে পারে।” শুধু এখানেই থেমে থাকেননি ভরত মুনি, তিনি ঘোষণা করেছেন, প্রেক্ষাগৃহ বা প্রেক্ষাঙ্গন খুব বেশি বড় হলে অভিনেতাদের ‘এক্সপ্রেশন’ মঞ্চ থেকে দূরে বসে থাকা দর্শকদের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
আলোকসম্পাতের বিষয়টির সঙ্গে মঞ্চকে মিশিয়ে দেওয়ার আধুনিকতাও ভরত মুনির দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। মঞ্চ যেমন নির্মিত হবে সমতল, বেশ শক্ত ভূমিতে, তেমনই তার সঙ্গে-সঙ্গে স্মরণে রাখতে হবে কালো অথবা সাদা রঙের বিষয়টিও।
এই প্রায় না-পড়া গ্রন্থটির প্রতি আমার মুগ্ধতা এবং কেন যে-কোনও সময়েই আমি এই বইটি পাঠ করে ফেলতে পারি, পাঠের পর আবার পাঠে ডুবে যেতে পারি তার আরও একটি কারণের দিকে যাওয়া যাক। ভরত মুনি মঞ্চনির্মাণের সময়ে যে স্তম্ভ ও তার নির্মাণ-পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন তা অনেকেরই জানা। বৈদিক যজ্ঞ-প্রক্রিয়া এবং আরাধনার সঙ্গে তার গতি সমান্তরাল। মনমোহন ঘোষ-কৃত এই প্রায়-অসাধ্য কাজটিতে আমি পেয়েছিলাম এক-একটি স্তম্ভ-নির্মাণে ব্যবহৃত দ্রব্যের রং-বিষয়ে এক চমৎকার এবং গূঢ় ভাবনার খোরাক।
ব্রাহ্মণের ক্ষেত্রে সাদা শুদ্ধতা ও জ্ঞানের প্রতীক।
ক্ষত্রিয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত দ্রব্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া লাল-রং শৌর্য ও শক্তির প্রতীক।
বৈশ্যদের ক্ষেত্রে যে স্তম্ভ, তার সঙ্গে হলুদ রং যুক্ত করার পিছনে রয়েছে স্বর্ণের ইশারা এবং সম্পদ।
নীল-রং অনার্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে (মূলত শূদ্র) যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।
এই রঙের খেলা একটি স্তর পর্যন্ত আমার কাছে নিছক রঙের খেলাই ছিল। কিন্তু একদিন ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্র-র এই অদ্ভুত রং নির্বাচন আমাকে বাধ্য করেছিল আরও একটি ভাবনার ভেতর প্রবেশ করতে।
আমরা এই শতাব্দীর দুটি দশক পেরিয়ে যে পলিটিক্যাল কারেক্টনেস নিয়ে সামাজিক-চিহ্নগুলির অর্থ উন্মোচন করি আজ থেকে অতদিন আগে তার কোনও ‘চিহ্ন’ থাকা সম্ভবপর নয়। কিন্তু চারটি বেদের বাস্তবতাকে অতিক্রম করার পরেও পঞ্চম-বেদ সৃষ্টি করে এবং তাকে সবকটি বর্ণের কাছে ‘অ্যক্সেসেবল’ করে দেওয়ার পরেও কেন এই শাস্ত্রে এই রঙের প্রভেদ চিহ্নিত করা হল? তা কি শুধুই ব্রাহ্মণ্যবাদকে পুষ্ট করতে?
দুটি ব্যাখ্যা উঠে আসতে পারে। পঞ্চম-বেদ সৃষ্টি হওয়ার পরেও তা আসলে হয়ে উঠেছিল ব্রাহ্মণদেরই হাতিয়ার এবং কৌশলে ইনক্লুশনের ভেতর দিয়ে অন্যান্য বর্ণগুলির স্বাতন্ত্র্য ধ্বংস করে দেওয়ার উপকরণ।
আরও একটি ব্যাখ্যাও জন্ম নেয় ধীরে আমার মধ্যেই। না কি সেই আধুনিকতম ‘মুনি’ ব্রাহ্মণ্যবাদের ভেতরেও আসলে প্রাণপণে রক্ষা করতে চাইছিলেন চারটি বর্ণের স্বাতন্ত্র্য?


