স্বাধীনতা-উত্তর কালের বাংলা গান: বিবর্তনের ধারা ও পরম্পরা— ৬

অনর্ঘ মুখোপাধ্যায়

 



লেখক ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতে মগ্ন, কথা ও সুরে সঙ্গীতস্রষ্টা, একটি বাংলা ব্যান্ডের ভোকালিস্ট, গীতিকার, সুরকার এবং পিয়ানিস্ট

 

 

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ছেলেবেলায় তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ক্যাসেটের অন্তর্গত “পান্না হীরা চুনী তো নয় তারার মালা” গানটার মাধ্যমে। তখন সঙ্গীতের জ্যঁর এবং বিভিন্ন ব্যকরণগত বিষয়ে জ্ঞান না থাকলেও, বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতের শ্রেণিবিভাগ সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান হওয়ার পর বুঝতে পেরেছি যে, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এই লিরিকে যখন সুর দিয়েছেন, তখন তিনি খুব সাবলীলভাবে রাগসঙ্গীতের উপাদান ব্যবহার করে মধ্য এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের জিপসিদের লোকগানের সঙ্গে উপমহাদেশের কাওয়ালির সুরবিন্যাসকে সমন্বিত করেছেন।

তারপর সুবীর সেনের রেকর্ডে শুনেছি, “চাঁদ তুমি এত আলো কোথা হতে পেলে” কিংবা “সারাদিন তোমায় ভেবে”-র মতো কালজয়ী গান। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আঙ্গিক বলে মনেই হয়নি প্রাথমিক শ্রবণে। মনে হল, এই সুর তো খুব সহজেই গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠা যায়— কোনও কালোয়াতি লাগে না, ওস্তাদি গানের মতো এই গান কোনও ছুঁৎমার্গ-শুচির পরোয়া করে না। মনের অন্তরতম কোণে নিহিত যৎসামান্য সুরবোধ থেকেই গেয়ে ওঠা যায় এই সুর। যখন তাঁর সুরে, এবং শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে শুনলাম “ছিপখান তিনদাঁড় তিনজন মাল্লা”, সেখানে দেখলাম, অভিজিৎবাবু যেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে ছন্দের খেলায় মেতে কবিতার ছন্দের সঙ্গে সাঙ্গীতিক ছন্দের সওয়াল-জবাব করছেন। আবার, এই একই অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় “মোনালিসা, তুমি কে বলো না” গানে সুর দেওয়ার সময়ে কিন্তু ছন্দের আজ্ঞাবহ সত্তা হিসেবে গানের সুরবিস্তারকে নির্মাণ করছেন না— সুর এখানে ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে এগোলেও, তাঁর চলন স্বাধীন। অভিজিৎবাবুর সুর আরও স্বাধীন চলন খুঁজে নিয়েছে “এ যেন সেই চোখ” গানের ক্রোম্যাটিক গতিতে। এরকম বক্রগতির সুরসজ্জা খুবই কম পরিলক্ষিত হয়েছে বাংলা গানে। “তোলপাড় তোলপাড় মনের কথা” গানটার অর্কেস্ট্রেশন শ্রোতাকে নৃত্যশীল করে তোলে রক অ্যান্ড রোলের ছন্দে। “নগর জীবন ছবির মতো” গানের অ্যারেঞ্জমেন্ট বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় স্যুইংয়ের ছন্দকে। “তুমি বলেছিলে” গানটা অভিজিৎবাবুর অন্যতম কালজয়ী সৃষ্টি। গানটার গতি ৬/৮ ছন্দে। মূল মেলোডির সাথে কাউন্টারপয়েন্ট হিসাবে সঙ্গত করছে স্ট্রিংস্‌ এন্সেম্বল্‌ (Strings Ensemble) এবং বাঁশি, আর তার সাথে তবলা বেজে চলেছে কীর্তনে ব্যবহৃত শ্রীখোলের মতো করে। “চম্পা, শোনো শোনো, বলি ফাল্গুন এসেছে” গানটা নির্মিত হয়েছে বিশুদ্ধ ওয়ালৎস্-এর আঙ্গিকে। “তুমি আকাশপারে আছো” গানটা প্রধানত পাশ্চাত্য শৈলীতে সৃষ্ট হলেও তার মধ্যে মিশে রয়েছে রাগ আলাহিয়া বিলাবল, রাগ তিলং, রাগ শঙ্করা এবং রাগ শ্যামকল্যাণের অংশবিশেষ।

আবার রাগসঙ্গীতের আঙিনায় যদি চোখ রাখি, তবে দেখা যাবে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানেও স্বমহিমায় বিদ্যমান। “নয় থাকলে আরও কিছুক্ষণ” গানের সুরে আপাতভাবে পাশ্চাত্যের আঙ্গিক প্রতিভাত হলেও সেখানে রয়েছে তিলং, ইমন, কেদার, ছায়ানট এবং আলাহিয়া বিলাবল রাগের সংক্ষিপ্ত খণ্ডাংশের প্রয়োগ: সংক্ষিপ্ত কিন্তু যথার্থ প্রয়োগ। আমরা পাশ্চাত্য সঙ্গীতে যাকে মেজর ফ্রিজিয়ান স্কেল বলে ডাকি, তাঁকেই উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীতে বলা হয় বসন্তমুখারি। এই স্কেলের সঙ্গেই পিলু রাগ মিশিয়ে অভিজিৎবাবু সৃষ্টি করলেন “চন্দ্রাবতী তুমি কোথায়?”-এর মতো কালজয়ী গান। গানের ছন্দ মনে করিয়ে দেয় এলভিস প্রেসলির কথা। ভাবা যায়! পাশ্চাত্যের রক অ্যান্ড রোল সঙ্গীতের আবহে এবং ছন্দে ধ্বনিত হছে রাগ বসন্তমুখারি এবং পিলু, স্বয়ং তরুণ বদ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, সেই রক্ষণশীল সময়ে? এ তো সাক্ষাৎ বিপ্লব!

“হংসপাখা দিয়ে ক্লান্ত রাতের তীরে” গানে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় মিয়াঁ মল্লার রাগের কাঠামোর ওপরে রাগ দেশী, জয়জয়ন্তী এবং পিলু রাগকে ব্যবহার করেছেন। এই গানটাকে আরও বেশি করে সমৃদ্ধশালী করে তুলেছে দুটো বাঁশির প্রয়োগ, যার মধ্যে একটা বাঁশিতে ধ্বন্ত হয়েছে কাউন্টারপয়েন্ট।

এমন একটা ঝড় উঠুক” গানটার পাশ্চাত্য গঠনকে সূক্ষ্মভাবে অলঙ্কৃত করে যায় ছায়ানট, বৃন্দাবনি সারং আর পটদীপ রাগের অংশবিশেষ। রাগ কেদার, শুদ্ধ কল্যাণ, ছায়া এবং রাগ আনন্দের সমন্বয়ে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন “এখনও সারেঙ্গীটা বাজছে”। কিন্তু তার মধ্যেই রয়েছে চিরায়ত রাগসঙ্গীতের উপরিকাঠামোকে বিনির্মাণ করার প্রচেষ্টা। আবার “আমি ভাবি শুধু ভাবি” পানটি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আধারে গড়ে উঠলেও পিলু, জয়জয়ন্তী আর আশাবরীর নির্যাসকে ধারণ করেছে।

 

 

প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্ধভাবে রাগানুগত্য করেননি, বরং অনবরত চেষ্টা করে গেছেন প্রাচ্যকে একাধারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গে একীভূত করতে। এই ক্ষেত্রে তিনি আক্ষরিক অর্থেই সলিল চৌধুরীর ভাবশিষ্য হয়ে উঠেছেন। যদি ওঁর অধিকাংশ গানের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে প্রিলিউড এবং ইন্টারলিউডে আমরা দেখতে পাব নাটকীয়তার ছাপ। তবে, পরবর্তীকালে তিনি হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র, পরিচয় দিয়েছেন গবেষণাধর্মী মনন এবং পরীক্ষণমুখী সঙ্গীতযাপনের।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3842 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...