মোক্ষসাধনা

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 



গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

তখনও অতিমারির নিয়মকানুনের কড়াকড়ি আজকের মতো ঢিলেঢালা, শিথিল হয়ে যায়নি। মাস্ক, স্যানিটাইজার আর ভিড় এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকার বিধিনিয়মগুলোকে মেনে চলার বিষয়ে নানা মাধ্যমে নিরন্তর প্রচার চলছে। এমনই এক সময়ে হঠাৎ সাতসকালে বাল্যবন্ধু সুহাসের ফোন— আমার বাড়িতে চলে আয়, একটা ভালো খবর দেব। সুহাসের বাড়ি অবশ্য আমাদের বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়। তাই বিধিনিয়ম মেনে একবার ঘুরে আসা যেতেই পারে ভেবে বাজার সেরে চটি গলিয়ে বেরিয়ে পড়ি।

আধঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাই অকুস্থলে— সুহাসের আধুনিক সজ্জায় সুসজ্জিত ফ্ল্যাটে। সুহাস বাইরেই দাঁড়িয়েছিল। দূর থেকে দেখি বেশ গদগদ ভঙ্গিতে কয়েকজন প্রতিবেশী মানুষজনের সঙ্গে কথা কইছে।

আমাকে গুটিগুটি পায়ে আসতে দেখে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে সুহাস— ওয়েলকাম, ওয়েলকাম। প্রত্যভিবাদন জানিয়ে সুহাসের সঙ্গে পা মিলিয়ে হাজির হই ওদের বৈঠকখানায়।

চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে মালুম হয় আজকের এমন মন-খুশির কারণ। গুড নিউজের কথা জিজ্ঞেস করতেই সুহাসের স্ত্রী চন্দ্রিমা একগাল খুশি ছড়িয়ে উত্তর দেয়— আমাদের রাজ এবার আইআইটি ক্র্যাক করেছে। গতকাল ওদের ইনস্টিটিউট থেকে মেল করে জানিয়েছে খবরটা। আমি তো প্রথমে বিলিভ করতে পারিনি। আসলে বেশ কয়েকটা বছর লেগে গেল। কিছু অ্যাচিভ করতে গেলে কিছু স্যাক্রিফাইস তো করতেই হবে। তাই না?

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চন্দ্রিমার কথা শুনতে থাকি। পুত্রগৌরবে গরবিনী মায়েদের কথকতা হয়তো এমনই উজল, উছল হয়। আগে কখনও শোনার সুযোগ হয়নি, তাই কেমন বিমনা হয়ে পড়ি। ঘোর কাটে সুহাসের কথায়— বুঝলি, অল ক্রেডিট গোজ টু চন্দ্রিমা। ওর আনটায়ারিং এফোর্টের জন্যই আজ রাজের এমন একটা ড্রিম ফুলফিল করা সম্ভব হল। আমি তো কেবল ইনভেস্ট করেই খালাস। মডার্ন এডুকেশন ডিমান্ডস আ লট অফ ইনভেস্টমেন্ট।

খানিকটা মরিয়া হয়েই চলতি কথাস্রোতের বিপরীতে গিয়ে প্রশ্ন করি— রাজ এখনও সেতার বাজায়? রং-তুলি-ইজেল নিয়ে ব্যস্ত থাকে? আগের মতো ঘাড় দুলিয়ে আবৃত্তি করে?

আমার কথা শুনে কর্তা-গিন্নি দুজনেই হো হো করে হেসে ওঠে। আমি অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করি— না, আমি কি কিছু বেফাঁস কথা বললাম সুহাস? সুহাস হাসতে হাসতে উত্তর দেয়— না, তুই কিছু ভুল বলিসনি। তোর মাস্টারমশাইসুলভ পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে এমন প্রশ্ন করাটা খুব স্বাভাবিক। বাট দিজ আর ওল্ড, ট্র্যাডিশনাল আইডিয়াজ। যে ছেলে আইআইটি ক্র্যাক করবে বলে তৈরি হচ্ছে, তার হাতে অত ফালতু সময় কোথায়! আমি আমতা আমতা করে বলি— তা ঠিক। আসলে আমরা তো খানিকটা সাবেকি ভাবধারার মানুষ, তাই একালের পড়াশোনার স্ট্র্যাটেজিটা ঠিক বুঝতে পারি না। প্রসঙ্গ বদলানোর অছিলায় জিজ্ঞেস করি— রাজ বাড়ি নেই? একবার দেখা করতাম। এত বড় একটা সাফল্যের জন্য ওকে শুভেচ্ছা জানাতাম। আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই চন্দ্রিমা বলে ওঠে— না, আছে। তবে এখনোর ফ্রেন্ডসদের সঙ্গে ফিউচার প্ল্যান নিয়ে কথা বলছে। আমি আর কথা বাড়াই না। সুহাস ও চন্দ্রিমাকেই অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে বাড়ির পথ ধরি।

 

২.

একালের উচ্চাভিলাষী শিক্ষার জন্য এমনই কৃচ্ছসাধনার পথে হাঁটতে দ্বিধা করছেন না অভিভাবক-অভিভাবিকা আর তাঁদের সন্তানেরা। একটা পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে গত বছর সারা দেশে ১.৫ মিলিয়ন ছাত্রছাত্রী সর্বভারতীয় জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসেছে দেশের ২৩টি আইআইটির সাকুল্যে ১৩০০০ আসনের জন্য। একটা সহজ গাণিতিক হিসাব বলছে, আইআইটির প্রতিটি আসনের জন্য ১১৫ জন প্রত্যাশী প্রতিদ্বন্দ্বী লড়াই করছে। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আর ‘লড়াই’ শব্দদুটো খুব সচেতনভাবেই ব্যবহার করলাম কেননা একটি মহার্ঘ আসনপিছু গড়পড়তা শতাধিক শিক্ষার্থী যখন প্রবেশিকা পরীক্ষা নামক এক মারকাটারি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় তখন তাকে ‘লড়াই’ বলতে বাধা কোথায়? সাধে কি আর বলে দেশের প্রধান প্রযুক্তিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার তুলনায় আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের সুযোগ পাওয়া ঢের সহজ ব্যাপার! আন্তর্জাতিক মহলেই ভারতীয় প্রযুক্তিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে এমন তীক্ষ্ণ মন্তব্য করা হয়েছে নানা সময়ে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত এই প্রস্তুতির পর্বটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। দেশজুড়ে বিদ্যাব্যবসার বাজার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রমশই দ্রুত বাড়ছে। নবীন শিক্ষার্থীদের নিজেদের দখলে নিতে তারা অতি-তৎপর। ক্যাচ দেম ইয়ং— এই আপ্তবাক্যের কথা মাথায় রেখে ক্লাস এইট বা নাইন থেকেই এখন শিক্ষার্থীদের জালবন্দির পর্ব শুরু করে দেয় কোচিং সেন্টারগুলো। বৈতরণীর সিংহদ্বার পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেওয়ার ভার একালে এদের ওপরেই ন্যস্ত করে পরম নিশ্চিন্তে থাকেন অভিভাবকেরা। ‘শিক্ষার্থীদিগের কী হইল?’ একরাশ স্বপ্নের বোঝা নিয়ে চলতে গিয়ে তারা বিসর্জন দিল বয়ঃসন্ধির সমস্তরকম আবেগ, রহস্য, রোমাঞ্চ। ‘তাহারা গান ভুলিল, রংতুলির মায়াজগৎ ভুলিল, বয়সোচিত উচ্ছাস ভুলিল, মাঠ-ময়দানের উদার আহ্বান ভুলিল, সঙ্গোপনে আত্মনির্মাণ ভুলিল, সখা-প্রিয়জন সঙ্গ ভুলিল, সরল বিনোদন ভুলিয়া দূরগামী অনিশ্চিত অভীষ্ট অর্জনের অভিলাষে নিজের জীবনের এক আশ্চর্য যাপনের পর্বকে উৎসর্গ করিল।’ কষ্টকল্প ভবিষ্যতের আশায় সামাজিক মানুষ হয়ে ওঠার অতুলনীয় অনুশীলন পর্বটিকে এভাবে নষ্ট করার ফলে মাঠে-ময়দানের অমূল্য শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকছে আমাদের তরুণী শিক্ষার্থী প্রজন্মের একটা বড় অংশ। একালে গ্রাম-শহরের বিভাজন আর আগের মতো স্পষ্ট নয়; ফলে সর্বত্র একই ছাঁচে ভাবীকালের স্বপ্ন ঢালা হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক মানুষের নির্মাণপর্ব ব্যাহত হচ্ছে দারুণভাবে।

 

৩.

বিষয়টা যে উপেক্ষণীয় নয় তা স্পষ্ট করেছেন দিল্লি আইআইটি-র এক বরিষ্ঠ অধ্যাপক। দু দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করা মানুষটি অত্যন্ত হতাশ হয়ে জানিয়েছেন— “দু-তিন বছরের গৃহবন্দি প্রস্তুতির পর্ব সেরে যখন কৃতী(!) শিক্ষার্থীরা এখানে এসে হাজির হচ্ছে তখন সাধারণ সামাজিক আচরণবিধি সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকছে। চলতি বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তারা একদম অজ্ঞ, উদাসীন থাকায় শিক্ষার্থীদের নতুন করে সামাজিকীকরণের শিক্ষা দিতে হচ্ছে আমাদের। সন্দেহাতীতভাবে এই সমাজ-বিচ্ছিন্নতার অনিবার্য প্রভাব পড়বে তাদের ভাবী কর্মজীবনে, ফলে আখেরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও দেশের বিপুল সংখ্যক জনগণ।” মনে রাখতে হবে কর্মজীবনে সমাজ-সংযোগের দক্ষতা না থাকলে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। ২০১৯ সালে করা এক সমীক্ষা থেকে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে শতকরা ৮০ জন ইঞ্জিনিয়ার তাদের সামাজিক জ্ঞানের নিরিখে কোনওরকম কাজের পক্ষেই যোগ্য নয়। মাত্র ২.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (artificial intelligence) বিষয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে পারে— শিল্পক্ষেত্রে যার বিপুল চাহিদা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট পাঠক্রমে যা শিখছে আর কর্মক্ষেত্রে যে বিশেষ দক্ষতার চাহিদা রয়েছে তার মধ্যে বিপুল ফাঁক থাকায় অনেক সময়েই তারা কর্মহীন থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এমন একটা প্রেক্ষাপটেও বহু বছর জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী পরস্পরের সঙ্গে বার্ষিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হচ্ছে। সেইসঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে কোচিং সেন্টারের ব্যবসা।

এই প্রসঙ্গে শিক্ষার্থীরা কী বলছে? বছর ২৩-এর এক প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার অকপটে জানিয়েছে যে, সে যখন ক্লাস এইটের ছাত্র তখন থেকেই জয়েন্টের পড়া শুরু করে। কেন? এত আগে থেকেই কেন? তার কারণ প্রতিবেশী সহযোগীদের অনেকেই ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই এই বিশেষ পড়ার কাজ শুরু করে। তার বক্তব্য— “আমি জয়েন্টের পড়া নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি, ভালো পরিপোষণ কিংবা নতুন করে বন্ধুত্ব করা থেকেও নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলাম। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার প্রায় এক বছর সময় লেগেছিল নিজেকে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরিয়ে আনতে। এখন অনুভব করতে পারি নিজেকে পরীক্ষার উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে গিয়ে কত গুরুত্বপূর্ণ রঙিন অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থেকেছি।”

আর এক শিক্ষার্থীর একান্ত অভিজ্ঞতার কথা শুনে নেওয়া যাক। নাম শিবম নারাং। এখন বয়স ২৯। বর্তমানে মুম্বাই শহরের একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে প্রোকিওরমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে গড়পড়তা মাঝারি মেধার ছাত্র হিসেবে পরিচিত শিবম বিদ্যার্থীমহলে ক্রমশই পরিচিতি পাচ্ছিল একজন প্রতিশ্রুতিমান বাস্কেটবল খেলোয়াড় হিসেবে। ক্লাস টেনে উঠতেই এই জীবনছন্দে ছেদ পড়ল। অভিভাবকেরা কানে জপমন্ত্র দিলেন— আইআইটি ক্র্যাক করতেই হবে। ওসব বাস্কেটবল খেলে জীবনে কিছু হবে না, আগে স্বপ্নের জীবন গড়ো; তারপর খেলাধূলা। লম্বা দীঘল চেহারার শিবমের চোখে তখন ম্যাজিক জনসন-অস্কার রবার্টসন-মাইকেল জর্ডন হয়ে ওঠার স্বপ্ন। বাবা-মা ভাবলেন ছেলের মাথা বিগড়ে যাওয়ার আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর তাই বোর্ডের দশম শ্রেণির পরীক্ষা শেষ হতেই শিবমকে তার চেনা শহর দিল্লি থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হল মরুশহর কোটায়। একালের তরুণ সাধকদের মোক্ষলাভের সেরা ঠিকানায়! শুভার্থী অভিভাবকদের আন্তরিক উদ্যোগে শিবম নামক পক্ষীটির শিক্ষার আয়োজন সম্পূর্ণ হইল। পক্ষীশাবকদের উড্ডয়ন-কৌশল রপ্ত করিবার প্রয়োজন নাই, তাহাদের এখন আইআইটির স্বপ্নে বুঁদ হইতে দাও।

মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে এই যে সমাজবিচ্ছিন্ন যাপন, বিশেষ করে যখন ব্যক্তিমানুষ হিসেবে একজন পরিপূর্ণতার আস্বাদ লাভ করছে, মানুষকে স্বভাবগত আচরণের নিরিখে অপূর্ণ করে তোলে। পরবর্তীকালে যখন সম্পূর্ণ ভিন্নতর পরিস্থিতিতে বহুতর মানুষের সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপনের প্রয়োজন হয়, তখনই লাগে দ্বন্দ্ব, বিসংবাদ। শিবমের কথাতেই ফিরি— “দিল্লি থেকে আমাকে এক অচেনা, অজানা শহরে (কোটা) পাঠিয়ে দেওয়া হল এক আসমান ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে। এখানে অবসর বলে কিছু নেই, শখ-আহ্লাদ বলে কিছু নেই। এ এক আশ্চর্য যন্ত্রঘর। প্রথম-প্রথম কিছুটা সময় খেলাধূলা করে কাটাবার কথা ভেবেছিলাম। পরে দেখলাম আমার এমন ইচ্ছেকে সবাই সন্দেহের চোখে দেখছে। বাস্কেট-কোর্টে আমাকে একলা গা ঘামাতে দেখে সবাই ভাবতে শুরু করল— এ কোন বেয়াদবের আবির্ভাব ঘটল এ যন্ত্রপুরীতে! আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সাফল্যের শীর্ষে থাকার প্রবল অলিখিত চাপ, মনের পর্দায় ভেসে ওঠা ক্লান্ত-উদ্বেগাচ্ছন্ন বাবা-মায়ের মুখ, স্কোর-গ্রেড-র‍্যাঙ্কের নিরন্তর শাসানি— আমি কোটা ছাড়তে বাধ্য হলাম। ভর্তি হলাম এনআইটি-র একটি শাখায়।”

জীবনের শুরুতে এমন একটা লড়াইতে নেমে পড়ার বিষয়টি আজও শিবমকে তাড়া করছে— “ওই বন্দিজীবন আমার মূল্যবোধের স্তরে বড় রকমের বদল এনেছে— সহযোগী থেকে প্রতিযোগী হয়ে উঠেছি আমি।” তাই দলবদ্ধভাবে কাজ করতে আমি অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। সারাদিন টেবিল, চেয়ার, কম্পিউটারের সামনে বসে থেকে থেকে মাত্র কয়েক মাসে আমার ওজন ৩৫ কিলো বেড়ে ১২০ কিলো হয়ে গিয়েছিল। এই না হলে মোক্ষসাধনা!”

 

৪.

শিবম একটা প্রতীকী চরিত্র। এমন শিবমদের দেখা মিলবে আমাদের চারপাশে, হয়তোবা নিজেদের ঘরের একান্ত চৌহদ্দিতে। নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের অপূর্ণতার বোঝা আমরা চাপিয়ে দিচ্ছি আমাদের সন্তানদের ওপর। পরিণতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতটাই বিয়োগান্তক যে সেগুলো পুনরুল্লেখের প্রবৃত্তি হয় না। আসলে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা একটা ভ্রান্ত পথে চলছে। মানুষের শিক্ষা এক বহুমুখী বিকাশ দাবি করে। এমন দাবির বিষয়টিকে উপেক্ষা করে আমরা কতগুলো পুথির বিদ্যাকেই অবধার্য বলে মনে করছি। আর তাই আমাদের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত করছি একমুখী ভাবনায়, একমুখী লক্ষ্যে। ফলে মানবজীবনের বহুতর রঙে রঙিন হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের মন, চেতন, ভাবন, অনুশীলন। অবাস্তব-অসম্ভব ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে আমরা তাদের বর্তমানকে— নির্মিতির সবচেয়ে সুন্দর সময়টাকে বিলকুল নষ্ট করে ফেলছি।

 

৫.

ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পাশাপাশি ডাক্তারি শিক্ষার মাধ্যমে মোক্ষলাভের পথটি অপেক্ষাকৃত সহজ, প্রাণবান— এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। ইদানিং সর্বভারতীয় স্তরে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যে নিট (NEET) নামক বাছাইব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারেই সন্তানদের ভবিষ্যৎ-জীবনে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হয়। এমন স্বপ্নে বিভোর অভিভাবকেরা সাধ্যাতীত প্রয়াস করেন। খুব সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন থেকে বিপুল সংখ্যক মেডিক্যাল ছাত্রের দেশে প্রত্যাবর্তনের ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিয়ে গেল স্বপ্নের চারাগাছেরা হৃদয়ভূমির কতটা গভীরে নিভৃতে তাদের শিকড় ছড়িয়েছে। শুধু ইউক্রেন নয়, বিশ্বায়িত ভারতের শিক্ষার্থীরা রাশিয়া, চিন, সিঙ্গাপুর, ইজরায়েল সহ পৃথিবীর নানা দেশে পাড়ি জমাচ্ছে চিকিৎসক হয়ে ওঠার সাধনায়।

২০২০ সালে দেশের প্রায় ১.৫ মিলিয়ন শিক্ষার্থী নিট পরীক্ষা দিয়েছিল। দেশের ৫৪১টি মেডিক্যাল কলেজে সর্বমোট ৮২,০২৬ জনের ভর্তির ব্যবস্থা। মোট ৮০০০০০ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ভর্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, তাই প্রতি বছর গড়পড়তা ২৫-৩০ হাজার ছাত্রছাত্রী দেশান্তরী হয়। এ-ও এক তীর্থযাত্রা।

প্রতি বছরই দেশের নানা প্রান্ত থেকে অসফল পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর পাই আমরা। প্রাথমিক কিছু তৎপরতা লক্ষ করা যায়। দু-দিন বাদে সব বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।

মনে রাখতে হবে মেডিক্যাল পরীক্ষার্থীরাও নানান কোচিং সেন্টারের আওতায় থেকে চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। এখানেও সেই ফেলো কড়ি মাখো তেল-ব্যবস্থা। সাধারণ কোচিং-এর পাশাপাশি চলে স্পেশাল-সুপার স্পেশাল তালিম। এক লব্ধ-প্রতিষ্ঠ কোচিং সেন্টারের অধিকর্তার কথায়— “আমাদের এখানে সাধারণ ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে ষোলো ঘন্টা ক্লাস করতে হয়। এজন্য বার্ষিক খরচ গড়পড়তা ২ লক্ষ টাকা।” যে সমস্ত শিক্ষার্থী আরও বেশি সময় কোচিং নিতে আগ্রহী তাদের জন্য স্পেশাল-সুপার স্পেশাল ক্লাসেরও ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে কেবল কোচিং-এর সাপ্তাহিক সময়সীমা বাড়ে না, সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় সাম্মানিক দক্ষিণার পরিমাণও।

আসুন এই অবসরে আমরা প্রজ্ঞার কথা শুনে নিই। প্রজ্ঞা ভরদ্বাজ, বয়স ৩৫, বর্তমানে বেঙ্গালুরু শহরে একজন গাইনিকোলজিস্ট হিসেবে কাজ করছে। “আমি আমার প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সফলতা পাইনি। অথচ ডাক্তার আমাকে হতেই হবে। অবশেষে তৃতীয়বারের প্রচেষ্টায় আমি সফল হলাম। ভর্তি হলাম কর্নাটকের এক নামী মেডিক্যাল কলেজে। তবে এই সফলতার স্বাদ পেতে গিয়ে আমাকে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে— আমার ব্যক্তিত্ব, আমার সাধারণ স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, সামাজিকতা— এক কথায় সবকিছুই যা আমার বর্তমান কর্মজগতে দারুণ প্রভাব ফেলছে।”

আসলে এমন সমস্যা যে নিছক ব্যক্তিবিশেষের সমস্যা, তা কিন্তু মোটেই নয়— গলদটা একান্তভাবেই আমাদের প্রচল ব্যবস্থাপনার। পুনের বিশিষ্ট মনোচিকিৎসক ডাঃ সৌমিত্র পাঠারের মতে— “যদি কোনও কিছুর অভাব তৈরি করা হয় এবং যদি আপনি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বাধ্য করেন তা পাওয়ার জন্য এক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে তাহলে মানসিক অবসাদ আসতে বাধ্য। একজন শিক্ষার্থী যতই যোগ্য, সক্ষম হোক না কেন গোটা ব্যবস্থাপনাই যখন সহায়ক নয়, তখন অসফল শিক্ষার্থীদের ভেঙে পড়া ছাড়া অন্য পথ থাকে না।”

সন্তানদের প্রস্তুতির পর্বটি গোটা পরিবারের কাছেই এক গভীর কৃচ্ছসাধনার পর্ব হয়ে ওঠে। আমেদাবাদের জনৈকা অভিভাবিকার কথায়— “এ এক অজ্ঞাতবাস পর্ব। ছেলের জন্য আমরা বিগত কয়েক বছর সব আমোদ-আহ্লাদ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছি। আমরা কোনও আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি, বাড়িতে টেলিভিশনের কেবল-সংযোগ কেটে দিয়েছি। আমাদের প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে নানান প্রশ্ন করেছে কেন আমরা হঠাৎ এমন অসামাজিক হয়ে পড়েছি। আমাদের কেবল মোক্ষলাভের কথাই বারংবার আওড়াতে হয়েছে।”

 

৬.

মোক্ষলাভই বটে। এ-ও বোধহয় এক নিরাসক্তির সাধনা। মাঝে মাঝে খটকা লাগে এই ভেবে যে এতকাল এত দার্শনিক, শিক্ষাচিন্তক মানবশিক্ষাকে নিয়ে যে এত এত কথা বলে গেলেন সেসব কথা কি তাহলে মিথ্যে হয়ে গেল একালের এই ব্যস্ত, বৈষয়িক দরিয়ায় এসে? আজ এই মুহূর্তে সুপ্রিয়া রাজ জোশির সাহসী পদক্ষেপের কথা মনে পড়ে গেল। নিজের দুই মেয়েকে স্কুল ছাড়িয়ে নিয়ে এলেন বাড়িতে। বাড়িতেই শুরু হল পড়াশোনা। একদম নিজেদের মতো করে। বড় মেয়ে মালবিকার ঝোঁক কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এ। তিনবার কম্পিউটিং অলিম্পিয়াডে মেডেল জেতার সুবাদে এমআইটি তাকে সরাসরি ভর্তি করে নিল অথচ তখনও সে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়নি। কর্মজীবনের শেষবেলায় দেখেছি সারাদিনের দুরন্ত স্কুলবেলার পর কীভাবে ধ্বস্ত শরীরের সন্তানদের নতুন করে বোঝা চাপিয়ে ক্লান্ত অভিভাবিকারা মিছিল করে চলেছেন সান্ধ্যকালীন পাঠশালায়— কোচিং সেন্টারে। সুপ্রিয়া যথার্থই বলেছেন— “সন্তানের আজকের দিনটি সুন্দর, আনন্দময় করে তোলাই আমার কাজ। কালকের দিন আমার সন্তানই গড়ে নিতে পারবে।” যে শিক্ষায় কল্পনা নেই, উদ্ভাবন নেই, জিজ্ঞাসা নেই, সেই শিক্ষা আমাদের কোন মোক্ষপথে চালনা করে?

আমাদের আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কি তাহলে কতগুলো শূন্যগর্ভ মানুষে পরিণত হবে? আমরা অভিভাবকেরা কি এই বিষয়ে দায়মুক্ত হয়ে থাকতে পারি? খালি আঙুল তুলে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান কখনওই হবে না। জীবনকে অনেক, অনেক বড় ক্যানভাসে দেখতে হবে, দেখাতে হবে। যে মোক্ষসাধনায় আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়োজিত করছি, তা মুক্তির পথ নয়। শিক্ষাপথে মুক্তির আস্বাদ পেতে গেলে আনন্দের সন্ধান করতে হবে। কোচিং সেন্টার-এডু গুরু-এডু টেক কোম্পানির চটকদার বিজ্ঞাপন কখনওই সেই মুক্তিপথের সন্ধান দিতে পারে না। পথ সহজ নয় জেনেই আমাদের পথের সন্ধান করতে হবে নিরলসভাবে।

আজ এই কথকতা শেষ করব প্রখ্যাত চিন্তাবিদ, দার্শনিক জিড্ডু কৃষ্ণমূর্তির শিক্ষাভাবনার একান্ত নির্যাস দিয়ে। তিনি বলছেন— “শিক্ষা মানে তো কেবল কতগুলো পরীক্ষায় পাশ দেওয়া নয়, ডিগ্রি অর্জন করা নয়, চাকরি পাওয়া নয়, বিবাহ করা ও একটা সুস্থিত জীবনে থিতু হওয়া নয়— শিক্ষা মানে পাখির কুজনের সুরে সুর মেলানো, আকাশের বিস্তৃত পরিসর দেখা, পুষ্পিত বৃক্ষের অপরূপ সৌন্দর্যশোভা উপলব্ধি করা, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়-টিলার আকার-আকৃতি-অবয়বের বৈচিত্র নিজের হৃদয় দিয়ে অনুভব করা, এসবের সঙ্গে নিবিড় সখ্যতার বন্ধনে নিজেকে আবদ্ধ করা। এসবই হল পরিপূর্ণ শিক্ষা।”

আমরা কি আমাদের সন্তানদের এমন মুক্তশিক্ষার আস্বাদ দিতে পারি না?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. লেখা তো ভালো, কিন্তু আঙুল তোলা হয়েছে মূলত অভিভাবক-অভিভাবিকের ওপর। একবার মাত্র ‘ভ্রান্ত পথে চলেছে আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা’ ছাড়া আর ব্যবস্থা নিয়ে কোনও কথা নেই। অথচ মূল দায়টা কি তারই নয়? শিক্ষার্জনের একটা মূল লক্ষ্য ভবিষ্যৎ জীবনে অর্থোপার্জন। সেটা তো অস্বীকার করা যায় না। যদি অর্থোপার্জন নিয়ে চিন্তা না থাকত, তাহলে অধিকাংশ বাবা-মাই ছেলেমেয়েরা যাতে আনন্দ করে শিক্ষা অর্জন করতে পারে, সে-কথা ভাবতেন। কারণ সন্তানটা তো তাঁদেরই। আমাদের দেশের কর্ম-চিত্রে বহুদিন ধরেই এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে ভালো টাকা কামাতে চাইলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। কেন হল? সে দায় কি বাবা-মাদের? এখনও এসব প্রস্তুতির নামে যেসব কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলছে, তাতে লাগাম টানার দায়িত্বটা কার? বাবা-মাদের, না দেশের পরিচালকদের? সমস্যা নিয়ে হাহাকার করা সহজ, প্রয়োজনও, কিন্তু আঙুলটা সঠিক দিকে তোলা না হলে ওই হাহাকারই সার হয়…

আপনার মতামত...