স্টেশনমাস্টারের কলাম
…অর্থাৎ না-পড়া বই এক অর্থে পাঠকের পড়তে চাওয়া বই। আর পাঠকের বইয়ের তাকে না-পড়া বইয়ের সংখ্যা আসলে পাঠকের আকাঙ্ক্ষার সীমা যা আদতে সীমাহীন। সদ্য শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। তার রেশ ধরেই ‘যে বই পড়বই’— এই চাবি-শব্দবন্ধ নিয়ে গড়ে উঠেছে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের নতুন সংখ্যার প্রচ্ছদভাবনা। মনে পড়ে গেল, আমাদের দেশে বই পড়া বা না-পড়া আলোচনা হয়তো অনেকের কাছে শুধুমাত্র এক বৌদ্ধিক পেশিপ্রদর্শন। কারণ এখনও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন পাঠ্যপুস্তকের বাইরে একটি বইও না-পড়ে দিব্যি কেটে যায়। কিন্তু কাউকে বিন্দুমাত্র জ্ঞানবিতরণের পথে না হেঁটে আমরা নিজেদের, শুধুমাত্র নিজেদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে বই পড়াও আসলে একটি শ্রেণিকর্ম, একটি জরুরি class activity। তাই দশদিনের বইমেলা যেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালির হুজুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, ছড়িয়ে পড়ুক বই পড়ার রোগ। আর শুধুমাত্র পঠিত বই দিয়েই যেন পাঠকের সংজ্ঞা নিরুপিত না হয়, পাঠককে চেনা হোক তাঁর এখনও অপঠিত বই পড়ার আকাঙ্ক্ষাটুকু দিয়েও।…
এই বিশ্বে প্রতিটি শিক্ষিত মানুষের মাতৃভাষায় প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়। যে-ভাষার বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার যত বেশি, সে-ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি। যেমন, শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার কদিনে প্রকাশিত বাংলা বইয়ের সংখ্যায় কয়েক হাজার। প্রতিটি পাঠকের নিজস্ব পাঠরুচি অনুযায়ী এই কয়েক হাজার বইয়ের মধ্যে নব্বই শতাংশ বই তাঁর কাছে অপাঠ্য ধরে নিলেও বাকি দশ শতাংশ বইয়ের সংখ্যাটাও বড় কম নয়। আবার একজন জ্ঞানপিপাসু শুধুমাত্র একটি ভাষার পাঠক হবেন তাও নয়, মাতৃভাষা ছাড়াও আরও একটি-দুটি ভাষায় তাঁর ব্যুৎপত্তি, নিদেনপক্ষে ইংরেজি ভাষায় তো বটেই। সেক্ষেত্রে পাঠরুচির এক্তিয়ারের মধ্যে পাঠযোগ্য বইয়ের সংখ্যা এক ধাক্কায় অনেক গুণ বেড়ে গেল। অর্থাৎ, কোনও নির্দিষ্ট স্থান ও কালে যে-কোনও নিবিড় পাঠকের জীবনেও তাঁর পঠিত বইয়ের সংখ্যা তাঁর না-পড়া কিন্তু পাঠযোগ্য বইয়ের তুলনায় নগণ্য।
প্রথমত, একজন পাঠক ও ক্রেতার বই কেনা নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর। আমরা যখন কলেজে পড়ি বা কাঠবেকার, কলকাতা বইমেলা ছিল আমাদের কাছে এক স্বর্গীয় ভোজসভার হাতছানি, যে রেস্তোরাঁর কাচের দেওয়ালে গাল ঠেকিয়ে আমরা দরিদ্র অভুক্ত বালকের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, কিন্তু দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার প্রবেশাধিকার ছিল না। অবশ্য প্রবেশাধিকার একেবারে ছিল না বলাটা ভুল হবে। এমন ঘটনাও ঘটেছে, মফস্বল থেকে আগত কপর্দকশূন্য নবীন পাঠক স্টলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে একটি বা দুটি বই সম্পূর্ণ পড়ে শেষ করে আবার তা যথাস্থানে রেখে সন্তর্পণে ফিরে গেছে, এবং পুরো ঘটনাটিই ঘটেছে বইবিক্রেতার উদার ও প্রশ্রয়ী চোখের সামনে। পরবর্তীকালে যখন একটা চাকরি-বাকরি জোটানো গেল, সামান্য বেতনের একটা অংশ ব্যয় হত বেশ কিছু পুরনো বই ও সামান্য কিছু নতুন বই কেনার মাধ্যমে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো বইয়ের অনুপাত কমতে শুরু করল, বাড়ল নতুন বইয়ের সংখ্যা। কিন্তু তখনও পড়া বই বনাম না-পড়া বইয়ের সংখ্যার অস্তিত্ববাদী সংকটটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেনি। সংগ্রহে থাকা সব বইই পড়ে ফেলা হত, কোনও-কোনওটা তো একাধিকবার। সমস্যাটা প্রথমবার দার্শনিক স্তরে পৌঁছল, যখন পেশাগত চাপে ও পরবর্তীকালে সাংসারিক টানাপোড়েনে সারস্বত সাধনায় ব্যাঘাত ঘটল, কিন্তু সাধ কমল না একবিন্দুও। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও পড়ুয়া যুবক বা যুবতীটি এখন ইচ্ছেমতো এবং খোলাহাতে নিজের পছন্দের বইটি করায়ত্ত করতে পারে, বিশেষত মাসের প্রথমে, এ তার কাছে এক স্বপ্নের দিন। কিন্তু বই পড়ার সাধের সঙ্গে বই পড়ার সময় আজকাল আর পাল্লা দিতে পারে না। ফলে বেড়ে ওঠে কেনা অথচ পড়তে না-পারা বইয়ের সম্ভার। দু-কামরার ছোট আটপৌরে ফ্ল্যাটে বই রাখার জন্য যথেষ্ট স্থানসঙ্কুলান নেই। ফলত নিরুপায় পাঠিকা বা পাঠকের আপিসের ব্যাগে লুকিয়ে অপরাধবোধ নিয়ে ঘরে ঢোকে অরুন্ধতী রায়ের প্রকাশিত আত্মকথা অথবা জন লে কারের চিঠিপত্রের সঙ্কলন। অভিসারের উপযুক্ত সময়ে বইটিকে বের করা যাবে ভেবে আপাতত গোঁজা হয় আলমারির ফাঁকে। কিন্তু অতিথিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারার আগেই হয়তো-বা তার ঠিক পাশে স্থান পায় শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ, কিংবা দেবারতি মিত্রের শেষতম কবিতার বই। কেনা বই দ্রুত পড়ে ফেলতে না-পারার গ্লানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠে পাঠকের অ্যান্টি-লাইব্রেরি।
ঠিক সে-সময় মসিহার মতো দেখা দেন উমবের্তো একো। অথবা নাসিম তালেব। The Black Swan গ্রন্থের লেখক তালেব খুব শান্তভাবে মনে করিয়ে দেন—
…তুমি যত বুড়ো হবে, তোমার জ্ঞানগম্যি তত বাড়বে, বাড়বে তোমার কেনা বইয়ের সংখ্যাও। ঠিক তেমনি, আপনা-আপনি বেড়ে যাবে তোমার সংগ্রহের না-পড়া বইয়ের সংখ্যাটাও। সেই না-পড়া বইগুলি বইয়ের তাক থেকে তোমার দিকে ভয়ঙ্কর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। কিছু করার নেই, তুমি যতখানি জানো, তোমার না-পড়া, না-জানা বইয়ের সংখ্যাও ঠিক ততটাই।
অর্থাৎ না-পড়া বই এক অর্থে পাঠকের পড়তে চাওয়া বই। আর পাঠকের বইয়ের তাকে না-পড়া বইয়ের সংখ্যা আসলে পাঠকের আকাঙ্ক্ষার সীমা যা আদতে সীমাহীন। সদ্য শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। তার রেশ ধরেই ‘যে বই পড়বই’— এই চাবি-শব্দবন্ধ নিয়ে গড়ে উঠেছে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের নতুন সংখ্যার প্রচ্ছদভাবনা। মনে পড়ে গেল, আমাদের দেশে বই পড়া বা না-পড়া আলোচনা হয়তো অনেকের কাছে শুধুমাত্র এক বৌদ্ধিক পেশিপ্রদর্শন। কারণ এখনও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন পাঠ্যপুস্তকের বাইরে একটি বইও না-পড়ে দিব্যি কেটে যায়। কিন্তু কাউকে বিন্দুমাত্র জ্ঞানবিতরণের পথে না হেঁটে আমরা নিজেদের, শুধুমাত্র নিজেদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে বই পড়াও আসলে একটি শ্রেণিকর্ম, একটি জরুরি class activity। তাই দশদিনের বইমেলা যেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালির হুজুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, ছড়িয়ে পড়ুক বই পড়ার রোগ। আর শুধুমাত্র পঠিত বই দিয়েই যেন পাঠকের সংজ্ঞা নিরুপিত না হয়, পাঠককে চেনা হোক তাঁর এখনও অপঠিত বই পড়ার আকাঙ্ক্ষাটুকু দিয়েও। এতদিন মগ্ন পাঠকের কাছে চর্চার বিষয় ছিল শুধুমাত্র যে বই তিনি পড়েছেন, সেগুলিই। এবার তাঁর ভাবনায় ধরা থাক যে বই তিনি আগামী দিনে পড়বেন, তা-ও।
যে বই পড়বই সংখ্যার জন্য কলম ধরলেন অনিতা অগ্নিহোত্রী, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, নবিউল ইসলাম, অপর্ণা ঘোষ, পার্থজিৎ চন্দ, অনুরাধা কুন্ডা, কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈকত ব্যানার্জী, রিয়া মুখার্জি। পাশাপাশি, গ্রন্থ-আলোচনার বিভাগ হুইলার্স-এ রইল দুটি নতুন বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া। অরুন্ধতী রায়ের আত্মকথা মাদার মেরি কামস টু মি পড়ে দেখলেন স্বাতী ভট্টাচার্য। শুভেন্দু সরকার লিখলেন প্রয়াত চিন্তক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের সদ্যপ্রকাশিত থিয়েটার ছাড়িয়ে: বাদল সরকার বইখানি নিয়ে।
এছাড়াও, যেমন থাকে তেমনই রইল বাকি সব নিয়মিত বিভাগ।
ভালো থাকবেন, বই পড়বেন…
প্রণামান্তে…

