স্বাধীনতা-উত্তর কালের বাংলা গান: বিবর্তনের ধারা ও পরম্পরা— ৭

অনর্ঘ মুখোপাধ্যায়

 



লেখক ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতে মগ্ন, কথা ও সুরে সঙ্গীতস্রষ্টা, একটি বাংলা ব্যান্ডের ভোকালিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও পিয়ানিস্ট। সঙ্গীতের শাস্ত্রীয় ও টেকনিকাল বিষয়ে যেহেতু সকলে সমানভাবে অবগত নন, অবগত থাকার কথাও নয়, তাই সকল পাঠকের সুবিধার্থে গত পর্বগুলির মতো এই পর্বে আবারও লেখক নিজে পিয়ানো বাজিয়ে এবং গেয়ে কয়েকটি অডিও ক্লিপের মাধ্যমে বিভিন্ন সঙ্গীতকারদের গানগুলিকে বিশ্লেষণ করেছেন। আগ্রহী পাঠক সেই অডিও ক্লিপগুলি শুনে নিতে পারেন।

 

 

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

বাংলা গানের জগতে নচিকেতা ঘোষ এসেছিলেন একজন গায়ক হিসাবে। কিন্তু সময়ের পর্যায়ক্রমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক এবং সুরকার। ডাক্তারি পড়েছিলেন নেহাতই পারিবারিক ঐতিহ্যের চাপে, তবে পেশাগত জীবনে স্টেথোস্কোপের বদলে হার্মোনিয়ামকেই বেছে নিয়েছেন। সঙ্গীত বিষয়ে তিনি তাঁর পরীক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়ে গেছেন তাঁর সৃষ্ট সুরের মাধ্যমে। রাগের অলঙ্কার থেকে রক অ্যান্ড রোল (Rock & Roll), ব্লুজ়্ (Blues) বা জ্যাজ়্ (Jazz)-এর স্ক্যাট সিঙ্গিং (Scat Singing) কিংবা টোনাল স্কেল (Tonal Scale) থেকে অ্যাটোনাল স্কেল (Atonal Scale)— সবেতেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। আধুনিক বাংলা গানে পল্লীগীতির সুর প্রয়োগ করার ক্ষেত্রেও তিনি নিয়ে এসেছেন অভিনব স্বরবিন্যাস।

আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে” গানটাকে নিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। এই গানটার বৈশিষ্ট্য হল, এখানে জ্যাজ়্ (Jazz)-এর অ্যাটোনাল এবং ক্রোম্যাটিক প্রোগ্রেশনের পদ্ধতি ব্যবহার করে ঠাট আর রাগ আর পরিবর্তিত হচ্ছে, এমনকি ভারতীয় সঙ্গীতের আঙ্গিক থেকে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আঙ্গিকে প্রবেশ করছে। গানের স্থায়ীতে কল্যাণ এবং পূরবী ঠাটের প্রয়োগ রয়েছে, তার সঙ্গে মিশেছে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের শৈলী। অন্তরা আর আভোগ পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আদলে নির্মিত এবং সঞ্চারীর স্তবকে খুব প্রকটভাবে ক্রোমাটিক প্রোগ্রেশনের মধ্য দিয়ে হারমোনিক মাইনর স্কেল বদলে যাচ্ছে মেজর স্কেলে, তারপর শুদ্ধ গান্ধার স্বরকে রুট নোট (Root Note) হিসাবে ভিত্তি করে ব্যবহৃত হয়েছে ভৈরবীর সমান্তরালে থাকা পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ফ্রিজিয়ান মোড (Phrygian Mode) এবং সবশেষে, গানের টোনালিটি আবার মেজর স্কেলে ফিরে আসছে।

কোন পাখি ধরা দিতে চায়” গানটায় পাখির কল্পচিত্র তৈরি করার জন্য নচিকেতা ঘোষ গানের প্রিলিউডে স্ট্যাকাটো (Staccato)-তে বাঁশির প্রয়োগ করেছেন। সঞ্চারীতে “পুরনো চিঠির কোণে দেখো কারও নাম লেখা আছে” এবং “হারানো দিনের মাঝে দেখো তার নীড় বাঁধা আছে”— এই দুই লাইনে পাখির ডাকের মতো ভৈরব ঠাটের স্কেলকে ব্যবহার করেছেন। এছাড়াও এই গানে খুব সূক্ষ্মভাবে রয়েছে ভৈরবী রাগ; কিন্তু তার প্রয়োগ ঘটেছে পাশ্চাত্য শৈলীতে।

‘পৃথিবী আমারে চায়’ সিনেমার “ঘরের বাঁধন ছেঁড়েই যদি” গানে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে টোনালিটি, রাগ এবং ছন্দের পরিবর্তনের মাধ্যমে নচিকেতা ঘোষ এখানে জীবনের সুখ-দুঃখের নিত্যনৈমিত্তিক দ্বন্দ্বকে যথার্থভাবে চিত্রিত করার ক্ষেত্রে সার্থক হয়েছেন।

“বেশ তো নাহয় সপ্তঋষির অস্তে যাওয়ার প্রহরে” গানের প্রিলিউড নির্মিত হয়েছে রক অ্যান্ড রোলের আঙ্গিকে। কিন্তু, গানটা যখন শুরু হয়েছে, তখন চলে আসছে গজ়লের আঙ্গিক। এছাড়াও রয়েছে শিবরঞ্জনী, দরবারি কানাড়া, পিলু, জয়জয়ন্তী এবং কাফি রাগের প্রয়োগ।

নচিকেতা ঘোষ নিজের গানের কেরিয়ারের শুরু থেকেই বৈচিত্র্যময় সুর সৃষ্টি করেছেন। প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে, “এই গ্রামেতে আমার বাস” গানে ভৈরবীর সাথে মিশেছে বিলাবল, ভৈরব, পুরিয়া ধানেশ্রী এবং ইমন (খুব ক্ষণিকের জন্য হলেও) রাগের অংশবিশেষ। এরকম আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হল, “সাগরে উঠল যে ঢেউ” গানটা। সেখানে পল্লীগীতির সুরে মিশে যাচ্ছে জয়জয়ন্তী রাগ। এছাড়াও, যোগ রাগ আবির্ভূত হওয়া মাত্রই তা পাশ্চাত্যের মেজর সেভেন্থ (Minor Seventh) এবং মাইনর সেভেন্থ (Major Seventh) স্কেলে বিভাজিত হয়ে গেছে। এই পদ্ধতিতেই উনি সুর দিয়েছেন “রাজার পঙ্খী উইড়্যা গেলে” গানে— সেখানে কাফি ঠাটের পল্লীগীতির সাথে মিশে যাচ্ছে পিলু রাগ। “কান্দো ক্যানে মন রে” গানে মিশে গেছে মাইনর ব্লুজ়্ স্কেল এবং খাম্বাজ রাগ আশ্রিত কীর্তনের আঙ্গিক‌। “এমন আমি ঘর বেঁধেছি” গানটার সুরে পল্লীগীতির প্রভাব রয়েছে প্রবলভাবে এবং সাথে আছে মাইনর পেন্টাটোনিক স্কেলের প্রয়োগ; কাফি রাগের প্রয়োগ থাকলেও তা যৎকিঞ্চিৎ। “পথ আর কতদূর” গানে লোকসঙ্গীতের সাথে মিশে গেছে খাম্বাজ রাগ। কীর্তনের আঙ্গিক‌ ব্যবহার করে নচিকেতা ঘোষ সৃষ্টি করেছেন “হে মহাপৃথিবী” গানটা। “সূর্য ডোবার পালা” এবং “একটি-দুটি তারা করে উঠি-উঠি” গানদুটোর মধ্যে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের শৈলীর মধ্যেও কীর্তনের আঙ্গিকের সূক্ষ্ম ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

রাগপ্রধান গানেও নচিকেতা ঘোষের কৃতিত্ব অপরিসীম। “বনে নয় মনে মোর” গানটা নির্মিত হয়েছে পিলু এবং কিরওয়ানীর সংমিশ্রণে। “মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা” গানটার ভিত্তি হল রাগ ইমন কিন্তু বিবাদী স্বর বা অ্যাক্সিডেন্টাল নোট (Accidental Note) হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে কোমল ধৈবত। “এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না” গানটা সৃষ্ট হয়েছে রাগ বসন্তমুখারী এবং পিলুর সমন্বয়ে। “নীড় ছোট ক্ষতি নেই” গানের সুর দেওয়ার ক্ষেত্রে নচিকেতা ঘোষ ভৈরবী রাগের অবতারণা করেন। “কাহারবা নয়, দাদরা বাজাও” গানটা তৈরি হয়েছে কালাশ্রী রাগে এবং ছয় মাত্রার ঠুমরির ছন্দে। জিপসিদের লোকগান এবং কাওয়ালির আঙ্গিক মিশিয়ে নচিকেতা ঘোষ সৃষ্টি করেছেন “এই মন আচমকা” গানটা।

যদি ভাবো, এ তো খেলা নয়” গানের সুর নির্মিত হয়েছে খ্রিস্টীয় ধর্মসঙ্গীত হাইম (Hymn)-এর আঙ্গিকে। “নীলাঞ্জনা রে“, “আবার দুজনে দেখা” বা “চলো রীনা“-র মতো গানের সুর, স্যুইংয়ের ৬/৮ ছন্দ আর যন্ত্রানুষঙ্গ স্মরণ করিয়ে দেয় মার্কিন মুলুকের বিশ শতকের প্রথমার্ধের সঙ্গীতের ধারার কথা। আবার, “এই যৌবনতরঙ্গে দেয় দোল“, “ঘুম ঘুম ঘুম মেঘলা মনটা যে“-র মতো গান কম্পোজ় করার সময়ে নচিকেতা ঘোষ স্ক্যাট সিংগিং প্রয়োগ করেছেন। এখান থেকেই বোঝা যায় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই নচিকেতা ঘোষের সঙ্গীতের আঙ্গিকও বিবর্তিত হয়েছে। তবলা থেকে ড্রামস, বঙ্গো বা কোঙ্গা অথবা সেতার থেকে ইলেকট্রিক গিটার— সবকিছুকেই অক্লেশে এবং সোৎসাহে আপন করে নিয়েছেন নচিকেতা ঘোষ।

 

(চলবে)

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...