জাত নিয়ে অপমানিত হয়ে আমার ছেলেকে পড়া ছাড়তে হয়েছে

ঝুমা বাসফোর

 


আমার ছেলেকে কিন্তু পড়াশোনা ছাড়তে হল জাতপাত নিয়ে অপমানিত হওয়ার জন্য। এটা আমাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয়। আমরা কখনও কিছু প্রতিবাদ করি, কখনও চুপ করে থাকি, ধরে নিয়েছি এ আমাদের শুনতেই হবে। কিন্তু ছেলে তো ছোট। ওর গায়ে লেগে গেছে। ও যেখানে টিউশন পড়তে যেত সেখানে একজন টিচার জাত তুলে অপমান করত। তাই ও আর পড়তেই চাইল না

 

আমার বাড়ি মালদা শহরে। আমি সাফাইকর্মীর কাজ করি। বেসরকারি কাজ। নিজে নিজে বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়ি, আবাসনের সাফাইয়ের কাজ ধরি। পুরসভায় কাজ পাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। হয়নি। আমার স্বামী আগে কাজ করত পুরসভায়। কিন্তু সেখানকার কন্ট্রাক্টর ছাড়িয়ে দেওয়ার পর অনেকদিন বসে ছিল। এখন অন্য একজনের আন্ডারে হসপিটালে একটা প্রোজেক্টের কাজ পেয়েছে। সেটাই করছে। পুরসভায় কিন্তু আমার স্বামীর নাম এখনও আছে। কিন্তু কাজটা হচ্ছে না। আমার শাশুড়ি কিছুদিন দৌড়াদৌড়ি করেছিল, লাভ হয়নি। আমার ননদেরও কাজ ছিল পুরসভায়। কিন্তু ও বিয়ে হয়ে এখন তো অন্য জায়গায় চলে গেছে। আমি হসপিটালেও কাজের চেষ্টা করেছিলাম। ওরা টাকা চায়। সেই সময়ে ৫০০০০ টাকা চেয়েছিল। আজ থেকে আট-নয় বছর আগের কথা। এখন তো আর টাকা দিয়েও লোক নিচ্ছে না।

আমার স্বামী হসপিটালের যে প্রোজেক্টে কাজ করে তাতে ৫০০০ টাকা বেতন পায়। দিনে আট ঘন্টা কাজ। মাসে চারটে ছুটি আছে ওর। আমার ছুটিছাটা নেই। মাসে ৩০ দিনই কাজ করতে হয়। আমার রোজগার হয় মাসে ১১০০০ টাকা।

আগের চেয়ে রোজগার এখন একটু বেড়েছে বটে, কিন্তু তার জন্য পরিশ্রমও বেড়েছে অনেক। আমাকে দিনে এখন বারো ঘন্টারও বেশি কাজ করতে হয়। আসলে আমাদের তো এরকমই ব্যাপার। একটু রোজগার বাড়ানোর জন্য নতুন কাজ নিতে হবে। তাতে আরও সময় যাবে, পরিশ্রম বাড়বে।

আমাদের পরিবারে আমি, আমার স্বামী ছাড়া আমাদের দুই ছেলেমেয়ে আছে। এছাড়া শাশুড়ি আছেন, দেওর আর তার বৌ-বাচ্চারাও আছে। তবে ওরা আর আমরা আলাদাই খাই। আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে ছেলে বড়। ও পড়াশোনা করত, কিন্তু কিছুদিন হল ছেড়ে দিয়েছে। আমার মেয়ে ফোরে পড়ে। মেয়ের পড়ার খুব ইচ্ছে। বড় হয়ে টিচার হতে চায়।

আমার ছেলেকে কিন্তু পড়াশোনা ছাড়তে হল জাতপাত নিয়ে অপমানিত হওয়ার জন্য। এটা আমাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয়। আমরা কখনও কিছু প্রতিবাদ করি, কখনও চুপ করে থাকি, ধরে নিয়েছি এ আমাদের শুনতেই হবে। কিন্তু ছেলে তো ছোট। ওর গায়ে লেগে গেছে। ও যেখানে টিউশন পড়তে যেত সেখানে একজন টিচার জাত তুলে অপমান করত। তাই ও আর পড়তেই চাইল না।

তবে আমার মেয়ের স্কুলে যদিও কখনও এরকম কিছু হয়নি। বরং ওকে সবাই খুব ভালইবাসে।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

কিছুদিন আগের একটা ঘটনা বলি। মুখ্যমন্ত্রী যেদিন মালদায় এলেন। আমাকে সেদিন যাচ্ছেতাই অপমান করল ওঁর দলের লোকেরা। আমার অপরাধ, মুখ্যমন্ত্রীর আসার রাস্তাটায় আমি ঝাঁট দিচ্ছিলাম। ওটা তো আমার কাজ। আমায় কেউ ওখানে যেতে নিষেধও করেনি। সেইজন্য যা তা কথা বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। একটা দলের লোকেদের কাছে কি এরকম ব্যবহার আশা করা যায়?

দেশে এখন এসবই চলছে। এসব তো ভাল লাগার কথা নয়, আমারও লাগে না। সমাজে জাতপাতের ভেদাভেদ প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। আমার ছেলের কথা বললাম। দেখুন, বাচ্চাদেরও এই সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। জাতি-ধর্ম নিয়ে মানুষে-মানুষে ঝগড়া-কাজিয়া এখন প্রচণ্ড। ঝগড়া-মারামারিও হচ্ছে এসব নিয়ে। এসব একদমই ভাল লাগে না।

তবে সরকারের কাছ থেকে সুযোগসুবিধা তো কিছু পাই বটেই। যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাই। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড আছে।

ভোট দিয়েছি। সরকারের কাছ থেকে চাই বলতে সব বাড়িতে যেন অন্তত একটা চাকরি থাকে সরকার সে ব্যবস্থা করুক। আর চাকরি যদি নাও হয়, এমন কিছু কাজের সুযোগ যেন থাকে মানুষের যাতে রোজগারটা ভাল হয়, ঠিকঠাক হয়। আমরা তো খেটেই খাই। সেই খেটে খাওয়ার সুযোগ যেন ঠিকঠাক পাওয়া যায়।

 


*সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত। চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের পক্ষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অরিন্দম বিশ্বাস

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...