বিদেশের ড্রাইভার

মঞ্জীরা সাহা

 


…গাড়ির ড্রাইভিং করা আর ধু ধু মরুভূমিতে সারাদিন উট চরানোর ভেতর আমার ধারণায় যে বড় একখানা পার্থক্য আছে সেটা এই বিদেশের লেবারটির কাছে যেন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। ড্রাইভারির কাজের আশায় গিয়ে ওই ধু ধু বালির ভেতর ওই উঁচু লম্বা মরুভূমির অবুঝ প্রাণীকে বশে আনার কাজটা এই পশ্চিমবঙ্গে নদীর পারে বড় হওয়া এক ষাট-বাষট্টিরর বৃদ্ধের কাছে যতটা দুর্ভোগেরই হোক সবটা যেন মেনে নিয়েছেন নিজের মতো যুক্তি সাজিয়ে সাজিয়ে। অভিযোগ করেননি। দোষারোপ করেননি। ভাই বা সেই বিদেশের মালিক কাউকেই না।…

 

চোখদুটো আবছা হয়ে আসছে ক্রমশ। কী ওটা! ওটা কি জল? আর একটু দূরে। ওই যে! ওই ঢাল পার করে ওই সামনের ঢেউ পেরিয়ে। পা-দুটো হড়কে যাচ্ছে। বেঁকেতেড়ে পড়ে ডেবে যাচ্ছে। ওঠাতে হচ্ছে টান মেরে। প্লাস্টিকের জুতো ভারি হয়ে আসছে। চোখদুটো আরও ঝাপসা হয়ে আসছে। চশমা দিয়ে আর দেখা যাচ্ছে না কিছুই। চশমার কাচটা অপরিচ্ছন্ন। কড়কড় করে উঠল চোখ। বালি! বালি! চশমা খুলতেই চোখের মধ্যে উড়ে এসে ঢুকে পড়েছে। চশমার ভেতর দিয়েও এতক্ষণ ঢুকছিল। চশমা পরে এ বালি আটকানো যাচ্ছে না। চশমার কাচের ওপরেও মোটা করে বালির আস্তরণ পড়ে গেছ। খাকি ফতুয়ার একপাশ দিয়ে মুছতে মুছতে খড়খড়ে দাগ হয়ে গেছে চশমায়। কালো কাচের পুরনো রোদচশমা। ঝোপঝাড় গাছগুলি পায়ের পাতায় থাইতে হাঁটুতে এসে ফুটিয়ে দিচ্ছে শরীরের কাঁটা। বিষের মতো জ্বলে যাচ্ছে কিছুক্ষণ। জোর হাওয়ায় ধাক্কা মেরে শরীরটাকে সামনে পেছনে ডানে বাঁয়ে ঠেলছে ক্রমাগত। এই খাঁ খাঁ উন্মুক্ত বিশাল প্রান্তরে নিজের শরীরটাকে যেন অনেকটা ছোট লাগছে। উত্তাল গরম শুষ্ক হাওয়া। হাওয়ার সঙ্গে জল নেই পাতা নেই। বালি আর বালি।  নাকের ফুটোয় কানের ভাঁজে পিছিতে ভ্রুতে কড়কড় করে চলেছে বালি। পাজামার সেলাই করা ভাঁজগুলো ভারি হয়ে আছে। জিভের উপর বালির স্তর। জলপিপাসায় গলা থেকে পেটের খাদ্যনালী অবধি যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। না না। জল নয়। জল নয়। খটখটে রোদে চকচক করে ওঠা বালি ওখানে। সেই গল্পের মতো। ওরকম জলের মতো দেখতে লাগে। কাছে গিয়ে দেখা যায় বালি। বলে মরীচিকা। ঠাঠাপোড়া রোদে গা হাত পা সারা শরীর যেন জ্বলে জ্বলে উঠছে। এই কোথায় গেল! কড়কড় করা চোখ দুটো গুনছে এবার। উনষাট ষাট একষট্টি বাষট্টি…, না একটা নেই তো। চারিদিকে যতদূর বালির ঢেউয়ের দিকে চোখ যায় খোঁজার চেষ্টা করছে। তারপর ঝাপসা। আটষট্টি উনসত্তর… না মিলছে না। কোনও একটা নাম ধরে চ্যাঁচাচ্ছে। আলম ইকবাল বা ইমরান…। ডাকছে। বারবার। মুখের ভেতর শুকনো জিভঁটা নড়ে নড়ে উঠছে। শুকনো গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোতে চাইছে না। বা আবু… ল আবু… ল। না সাড়া নেই। বারবার ডাকার চেষ্টা করছে। গলা উঠছে না। কে যেন চেপে ধরছে পেট থেকে। খুঁজছে খুঁজছে। জোরসে হাঁটার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পারছে না। পা ঢুকে যাচ্ছে বালিতে। পাগুলো আবার তোলার চেষ্টা করছে। যতটা জোরে হাঁটার চেষ্টা করছে ততটা জোরে পারছে না কিছুতেই। স্লো হয়ে যাচ্ছে। উপুর হয়ে পড়তে নিচ্ছে। হাতের লাঠিটা দিয়ে বালিতে ভর রেখে সামলে নিচ্ছে কোনওমতে। বালির ভেতর আলম ইকবাল ইমরান আবুল। কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বাকিরা আছে। ছুটতে শুরু করছে এবার। জোরে ছোটার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পা হড়কাচ্ছে জোরসে। স্যান্ডাক জুতোর সঙ্গে সঙ্গে বালি ছিটছে। বালি ছিটতে ছিটতে পিঠে। মাথার পেছনের ওই চুল কটা ভরে যাচ্ছে বালিতে। টাক মাথাটাতে বালিতে ভরা। ডাকছে ডাকছে। না! কোথাও নেই। ছুটতে ছুটতে এক কিলোমিটার দু-কিলোমিটার তিন কিলোমিটারের বেশি পেরিয়ে চলে এসেছে। ওই তো! ওই তো! চলেছে ওই তো! ওই দূরে দেখা যাচ্ছে। আরও দূরের দিকে চলে যাচ্ছে আবুল বা ইকবাল। এবার ডাকছে জোরগলায়। গলা চিড়ে যাচ্ছে। একগাদা বালি এসে গলার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। ওরা চলেছে হেলতে দুলতে। ডাক শুনেও ফিরছে না কিছুতেই। না! এভাবে ডাকলে ফিরবে না। হবে না। আর উপায় নেই। এবার খাকি রঙের ফতুয়ার পকেট থেকে ফোনটা বার করে নিচ্ছে। হাতের মুঠোয় ছোট্ট মোবাইলের সঙ্গে কিছুটা বালি উঠে এসেছে। চোখটা কচলে নিয়ে মোবাইলের নম্বরগুলো দেখার চেষ্টা করছে। ছোট্ট ফোনের সুইচগুলো বালিতে মাখামাখি হয়ে আছে। হ্যাঁ রিং হচ্ছে। রিং হচ্ছে। হ্যালো হ্যালো… গলায় উত্তেজ্জনা। জামাল বাইত। জামাল বাইত। মাফি রাজ্জা। মাফি রাজ্জা।

আরও বালি উড়তে শুরু করেছে। ব্যস! আর দেখা যাচ্ছে না। কোথায় গেল? সামনে দিয়ে বালির হাওয়ায় আবছা হয়ে যাচ্ছে ওরা…

ডিসেম্বরের হাল্কা ঠান্ডা হাওয়া আমার পিঠে ধাক্কা মেরে চলে যাচ্ছে। ভাগীরথী থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে আমবাগান কাঁঠালবাগানে ধাক্কা খেতে খেতে। ভাঙনে মানচিত্র বদলে যাওয়া উঁচু নিচু মাটির উপর বসে আনিকুল আলমের মুখে গল্পটা শুনছি আর মরুভূমির দৃশ্য কল্পনা করে চলেছি। এই যে এতক্ষণ নামগুলো শুনছিলাম আবুল ইকবাল ইমরান— ওগুলো মানুষের নাম নয়। ওরা উট। ‘জামাল’ মানে আরবিতে উট। ‘বাইত’ মানে দূরে। ‘মাফি রাজ্জা’ মানে ঘুরছে না। উট দূরে। উট ফিরছে না। আরবি শব্দগুলো মনে করে করে বলছেন আনিকুল, ভুল হয়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝে।

উটগুলো চরে বেড়াচ্ছে যে-মরুভূমিতে সে-মরুভূমিটা এ-দেশের নয়। সৌদি আরবের। আর এই খাঁ খাঁ মরুভূমির ভেতর যিনি উটগুলিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি এই মালদার মানুষ। ভাঙাচোরাভাবে ও-দেশের শব্দের সঙ্গে বাংলা শব্দগুলো দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন সেই রিয়াধের পাশে তার উট চালানোর অবস্থাটা।

সেই ডাকাডাকির পর যখন উট কিছুতেই ফেরাতে পারলাম না ফোন করলাম কাফিলকে। উট ঘুরিয়ে আনতে শেষে কাফিল লোক পাঠাত। জিপ নিয়ে আসত ওরা। নাইলে নিজেই আসত। সে এসে ফিরিয়ে নিয়ে আসত উটদের।

উট না পেলে আমার শাস্তি হবে। তাই ফোন করে দিতাম। আমার কাফিলটা ভাল ছিল। ভাল মানুষ।

পুরো ঘটনার শেষেও এই ভাল মালিকটির ভালত্বের দিকগুলি আমি ঠিক খুঁজে বার করতে পারিনি। কাফিল মানে কি বুঝতে পারিনি প্রথমটায়। জিজ্ঞাসা করলাম। আনিকুল আলমই বললেন কাফিল মানে মালিক।

কষ্ট হত না আপনার?

ষাট-পঁয়ষট্টির আনিকুল হেসে ফেললেন। হাসিমুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। প্রশ্নের মতো চোখ করে আমার দিকে রুক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, কষ্ট! আমি বললেই আপনি বুঝবেন কেমন কষ্ট? ওই চড়া রোদ। ওই জোর হাওয়া। হাওয়া তো না তাপ… তাপ…। লু বলে তাকে। গা জ্বলেপুড়ে যায়। মাথার মধ্যে দপদপ করে। সেই যেমন হাওয়া তেমনি বালি ওড়ে। যেন চব্বিশ ঘণ্টা বালির ঝড়। ওইখানে হাঁটা যে কীরকম সে আর বলে কারুকে বোঝানো যাবে না। দেখেন ওই দেশে এমনি তো যাইনি! যেখানে কাজে গেলে দুটো টাকা বেশি পাব সেইখানেই যাব। শুনেছিলাম আরবে গেলে থাকাখাওয়ার খরচ বাদে মজুরি বেশি তাই গেছি। কিন্তু এমন বিপদে পড়ব তা তো আগে বুঝিনি।

কালো মিশমিশে চেহারাটা। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি। নিচে রংচটা একখানা গামছা। হাত পায়ে কাদা ভরা। এক্ষুনি কোনও মাঠ থেকে লেবারের কাজ সেরে ফিরেছেন। মাথায় ভরা টাক। বারবার ওই মাথাটার দিকেই চোখ চলে যাচ্ছে আমার। বারবার আন্দাজ করার চেষ্টা করছি মরুভূমির রোদ। যে শরীর সেই জন্মের সময় থেকে জল ঝড় মাটি ধান পাট বৃষ্টি রোদের সঙ্গে অভ্যস্ত, যে কোনওদিন একবেলার জন্যেও মরুভূমি দেখেনি তার কাছে ষাটের দোরগোড়ায় এসে সারাদিন মরুভূমিতে উট চরানোটা ঠিক কেমন সেটা বলার সময় রাগ দেখানোটাই বোধহয় স্বাভাবিক।

আপনি কি উট সওয়ারি নিয়ে চরাতেন?
না না। উট এমনি-এমনিই চরাতাম। এইখানে যেমন মাঠে রাখালি করে। গরু চরায়। ওখানে মরুভূমিতে তেমন উট চরায়। ভোর থেকে সন্ধে অবধি মরুভূমিতে উট চরানোই আমার ডিউটি ছিল।
কতগুলো উট?
পঞ্চাশ ষাট সত্তর আশি নব্বই। যার ভাগে যেমন পড়ে। আমার মতন এমন অনেক লোক যায় ওখানে রাখালি করতে। কেউ ইন্ডিয়া কেউ পাকিস্তান কেউ বাংলাদেশ কেউ সুদান কেউ ওমান কেউ তেহেরান থেকে। আমার ছিল সত্তরটা উট।

উট শব্দটা এমনভাবে উচ্চারণ করে চলেছেন শুনতে উঁট মনে হচ্ছে। মুখের অন্য শব্দগুলোতে ‘ছ’-এ বেশি জোর পড়ছে। যেন বাংলার সঙ্গে সেই সুদূর আরব আমিরশাহির সুর এসে মিশে গেছে।

সেই সত্তরটা উট নিয়ে আমি ভোরবেলা বেরিয়ে যেতাম। উট চরানো সোজা কাজ না। সব কাজেরই একটা ট্রেনিং লাগে। উট চালানোরও ট্রেনিং লাগে। আমরা কী জানি সেসবের। জন্মে কোনওদিন উটই দেখলাম না তো উট চালানোর ট্রেনিং! তাই ওইরকম ছুটতাম শুধু। উটগুলো খালি দূরে দূরে চলে যায়। কখনও দেখতাম সত্তরটার মধ্যে একটা নেই দুটো নেই কি চার-পাঁচটা নেই। হাঁটতে হাঁটতে দলছুট হয়ে অনেক দূর চোখের আড়ালে চলে গেছে। চলে গেছে দু কিলোমিটার তিন কিলোমিটার দূরে। মরুভূমির মধ্যে এদিক-সেদিক বোঝা যায় না। মরুভূমিতে হেঁটে দেখবেন বালিতে কেমন পা টেনে ধরে! এগোতে দেবে না বালি আপনাকে। ওই বালির মধ্যেই উটগুলোর পিছন পিছন ছুটতাম। মাঝেমাঝে বুঝতেই পারতাম না কোনদিকে ছুটব। হয়তো দেখিনি একখানা কোনদিকে হাঁটছে! বেখেয়াল হয়ে গেছি। ব্যস! বা ধরেন এই পাড়া আর চলে গেছে সেই সতেরো মাইল।

সতেরো মাইল জায়গাটার নাম আজ সকালেই শুনেছি। বাসে করে এসে নেমেছিলাম সতেরো মাইল স্ট্যান্ডেই। জায়গাটা ফারাক্কা। ফারাক্কা ব্যারাজের আশপাশ ঘেঁষে ভাঙন যেখানে গ্রামকে গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে গেছে এ জায়গা তারই মধ্যে একটি। বিননগর-১ ব্লক। সতেরো মাইল থেকে টোলট্যাক্সের গেট দিয়ে আবার খানিক ফিরে এসে মেইন রোড ধরে পিছিয়ে এসে অনেকটা ঢাল হয়ে নেমে গেছে রাস্তা। তারপর বেশ খানিক। দেড়-দু কিলোমিটার হবে। এই উঁচু নিচু মাটির জায়গা। এখানে অনেক নামের পাড়া অনেক নামের গ্রাম আর নেই হয়ে গেছে ভাঙনে। যেখানে বসে আনিকুল আলমের সঙ্গে কথা বলছি সেটা আনিকুল আলমের বাড়ি। ভাঙনে তিনবার বাড়ি ভেসে গেছে। ভাঙনের আগের মুহূর্তে ঘর ভেঙে দিয়ে ইটগুলো জোগাড় করে রেখেছিল। সেই ব্যাঁকাত্যাড়া ইট দিয়ে কোনওরকমে গাঁথনি করে ঘর তুলেছে। প্লাস্টার নেই পাড়ার কোনও ঘরেই। হঠাৎ যেন পরপর লাইন লাইন ঘর উঠেছে। সামনে দিয়ে যে চলাচলের রাস্তা ওটা ঠিক রাস্তা নয়। মাঠ। এরকম লাইন-কে-লাইন বাড়িরই একখানা বাড়ি আনিকুল আলমের। বাড়িতে দরজা দিয়ে ঢুকেই একখানা ঘর। একখানা বারান্দা। পিছনে আবার ঘাসের রাস্তা। আবার বাড়ির লাইন। এ-জায়গাটা থেকে কয়েক পা হাঁটলেই বিশাল চওড়া ভাগীরথী বয়ে চলেছে। ২০১৯, ২০২০, ২০২১ পরপর তিনবার ভাঙন হয়েছে এখানে। ২০২১-এর ভাঙন ছিল সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক। এই শেষবারে নদী বেশি করে পরপর গ্রাম সমেত ভেঙে নিয়ে চলে গেছে। ভেঙে নিয়ে গেছে বহু প্রাচীন মসজিদ, স্কুলবাড়ি, ত্রাণশিবিরও। ভেঙে পড়া দেওয়াল, উপড়ে পড়া ঘরের মেঝে, ভাঙা জানালা দরজার অবশিষ্ট পড়ে আছে এখনও নদীর পারে। এই কাদামাটির মাঠঘাট থেকে বড় বড় গাছের ছায়ার নিচে বসে মধ্যাহ্নে আরবীয় মরুভূমির মধ্যে উট খুঁজে বেরানোটা ঠিক কেমন হতে পারে আমার পক্ষে আন্দাজ করাও কঠিন হচ্ছিল সেই শীতের দুপুরে।

 

বারবার প্রশ্ন করে চলেছি তার যাওয়া থেকে ফেরা অবধি পুরো ঘটনাটা শোনার জন্য। উত্তরগুলো ওই ভাঙাচোরা ভাঙন এলাকার ডাঙায় বসে হতভঁম্ব করে তুলছিল অহরহ।

আপনি গিয়েছিলেন কবে?

বেশ কিছুটা বিড়বিড় করতে করতে বললেন, সেই দুই হাজার ষোলোতে ভাঙন হল। ঘর বাড়ি সব ভেসে গেল। তারপর আবার নতুন করে ঘর হল। তারপর। দুই হাজার আঠারো, হ্যাঁ দুই হাজার আঠারোতে।

ঠিকাদারের সঙ্গে গিয়েছিলেন?
না আমার ভাই ছিল সেইখানে। ভাই একখানা ভিসা পাঠিয়ে দিয়েছিল। ওখানে আমির মানুষেরা ওরকম অনেক ভিসা দানে দেয়। সেইরকমই একখানা ভিসা ভাই পেয়েছিল। কোনও আমির লোক দান করে করেছিল গরিব লোকেদের। সেই ভিসাতেই গেছিলাম।

‘ভাই’ শব্দটি বললেন একগাল হেসে। ভাইয়ের কথা বলতে আনিকুলের চোখে মুখে আবেগ ফুটে উঠল। কিন্তু এরপর থেকে বাকি পুরো গল্পে আর ভাইয়ের অস্ত্বিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না।

মরুভূমিতে উট চরাতে হবে জেনেই গিয়েছিলেন?
না না। গিয়েছিলাম তো ড্রাইভারি করতে হবে জেনে। ড্রাইভারির ভিসাতে গিয়েছিলাম।
তারপর হঠাৎ উট চালাতে লাগলেন কীভাবে?
ভাই সেই ভিসা পাঠাল সেই ভিসাতে গিয়ে নামলাম। ভাইয়ের একখানা চেনাজানা মানুষের সঙ্গে আমার দেখা করার কথা ছিল। দেখা হল। সেই চেনাজানা মানুষটা ওমরা করিয়ে দিল।
ওমরা কী??
বেটাইমে হজ করাকে ওমরা বলে। একখানা বাসস্ট্যান্ডের নাম বলে দিয়েছিল। এয়ারপোর্ট থেকে বাসে করে নামলাম গিয়ে সেই স্ট্যান্ডে। কাফিলের লোক আসার কথা ছিল সেই স্ট্যান্ডে। এল তারা। দেখা হল। বাসস্ট্যান্ড থেকে কাফিলের কাছে নিয়ে গেল আমাকে। ওখানে আকামা কার্ড করিয়ে দিল আমার।
আকামা কার্ডটা কী?
এটিএম কার্ড দেখেছেন না! এটিএম কার্ডের মতো একখানা কার্ড। ওই দেশে লেবারি করতে গেলে ওরকম কার্ড করাতে লাগে। ওই দেশেই গিয়েই সে কার্ড হয়। ওই কার্ড দেখেই পুলিশেও বুঝতে পারে এ কোথায় এসেছে। কী কাজে এসেছে। তারপর কাফিল নিয়ে নিল আমার ভিসা পাসপোর্ট। ওইরকমই করে ওইখানে। যে কাফিলের আন্ডারে কাজ করতে হবে কাফিল তার ভিসা পাসপোর্ট নিজের কাছে জমা রেখে দেয়। তখনও জানি ড্রাইভারি করতে হবে গাড়ির। আমি ড্রাইভারি করতে জানি। ভিসাটাও ছিল ড্রাইভারি ভিসা। আমাকে নিয়ে গেল যেইখানে উট থাকে। সত্তরখানা উট ধরিয়ে দিল আমাকে। বলল, কাল থেকে ওই উট চরাবি। কোথায় গিয়ে উট চরাতে হবে বুঝিয়ে দিল। দেখি যেখানে উট চরাতে হবে সে তো মরুভূমি। খালি বালি। হাঁটা যায় না। বসা যায় না। খালি কাঁটাগাছ। ওই ওর মধ্যে উট ছুটে চলে যায়। ডাকলে ফেরে না। কিছুতেই কথা মানে না। বশে আসে না। সঙ্গে ওই তাপ। মনে হত স্টোরোক হয়ে যাবে বোধহয় এই এক্ষুনি। ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে হাওয়া। বালিতে ঢাকা দিয়ে দেবে আমাকে। সেই বিদেশেই পড়ে মরে থাকব। লাশ পড়ে থাকবে বালুতে। বালির ঝড়ে লাশ ঢাকা পড়ে যাবে। বাড়ির মানুষগুলোর আর শেষ দেখা হবে না।
মালিককে বললেন না এ কাজ পারবেন না!
কী বলব! সে খরচা দিয়ে খানাপানি দিচ্ছে। পুষছে আমাকে। তার যা কাজ দরকার সে তো সেটা করিয়ে নেবেই। সে কি জানতে চাইবে আমার কিসে সুবিধা কিসে অসুবিধা! কিসে আমার মর্জি! আমার মতো আমার কাফিলের এরকম অনেক বাঁধা লোক ছিল। সবাইকে যার যার দেশ থেকে এরকমই এনে রেখে দিয়েছে।
আপনার ভাইকে কিছু বললেন না? তার জন্যই তো এত দুর্ভোগ হল আপনার!
ভাই কী জানে! ভাই খবর পেয়েছিল একখানা কাফিলের লোক লাগবে। ওর চেনাজানা লোক মারফৎ খবর পেয়েছিল। তাই তো একখানা ভিসা দানে পেয়ে পাঠিয়ে দিল আমার কাছে। ভাই নিজেও ওদেশে লেবারি খাটে। সে যে কী করে কে জানে! হয়তো এইরকমই কিছু করে! আমার একখানা কাজের দরকার তাকে বলেছিলাম। এইখানে কি কাজ আছে যে করব! এই তো অন্যের জমিতে লেবারি করি! যেদিন কাজ আছে দুটো পয়সা পাই। কাজ না পেলে হল! আর এই জায়গায় সেইরকম ভাঙন। সেই দুই হাজার ষোলো থেকে শুরু হল। তিন-চারবার নদী কাটল। পয়সাকড়ি জমিয়ে ঘর বানালাম। সেই ঘর জায়গা জমি খাট বিছানা নিয়ে জলে চলে গেল। কিছু ইট হয়ত ভেঙেচুরে আনলাম। তাতে কী হয়? আবার ইট কেনো। আরেক জায়গায় উঠে এসে বসলাম, আবার দুই দিন পর নদী কেটে সব ভেঙে নিয়ে চলে গেল। বিদেশে যা কাজ কাফিল বলবে সেই কাজ না করে উপায় কী বলেন?

এরপর কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বিড়বিড় করে বললেন, কী জানি ভাই কী শুনেছিল উট চালাতে হবে নাকি গাড়ি!

কথা থামল। বড় একখানা নিঃশ্বাস ছাড়লেন।

গাড়ির ড্রাইভিং করা আর ধু ধু মরুভূমিতে সারাদিন উট চরানোর ভেতর আমার ধারণায় যে বড় একখানা পার্থক্য আছে সেটা এই বিদেশের লেবারটির কাছে যেন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। ড্রাইভারির কাজের আশায় গিয়ে ওই ধু ধু বালির ভেতর ওই উঁচু লম্বা মরুভূমির অবুঝ প্রাণীকে বশে আনার কাজটা এই পশ্চিমবঙ্গে নদীর পারে বড় হওয়া এক ষাট-বাষট্টিরর বৃদ্ধের কাছে যতটা দুর্ভোগেরই হোক সবটা যেন মেনে নিয়েছেন নিজের মতো যুক্তি সাজিয়ে সাজিয়ে। অভিযোগ করেননি। দোষারোপ করেননি। ভাই বা সেই বিদেশের মালিক কাউকেই না। একজন জেনে বা না-জেনে দায়সারাভাবে ঠেলে দিয়েছে তার নিকট বা দূর-আত্মীয় কোনও এক দাদাকে অন্য এক দেশে কোনও এক অনিশ্চিত কাজে। যে-কাজ করতে গেলে সে বাঁচতেও পারে মরতেও পারে। সে নিজেও বিদেশে খাটে। এই আনিকুল আলমের মতোই হয়তো সেও এভাবেই খাটে। তার কাছেও হয়তো উট চালানো আর গাড়ি চালানোর আর কোনও ফারাক নেই। খুব একটা ফারাক নেই দু-তিন বছর ধু ধু মরুভূমিতে অমানবিক পরিশ্রম করে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসার বা সময়কালের মাঝে কখনও লাশ হয়ে ফেরার। আর অন্য দেশের কোনও এক মানুষ খাটানোর মালিক বছরের পর বছর একে বন্দি করে রেখে দিয়েছে। রুক্ষ শুষ্ক মরুভূমির উট আর মৌসুমী জলবায়ুর মানুষের শরীরকে পোষ মানিয়ে কাজে লাগিয়ে গেছে। মালিক বা লেবার-ভাই কারও কোনও অপরাধ নেই আনিকুলের কাছে। তার নিজের বাঁচার আশায় যেতে চাওয়াটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধ।

প্রথম যখন উট চালাই, মনে হত আর পারছি না। মরে যাব এক্ষুনি। থাকতে পারব না। প্রথম বছর খালি মনে হত পালাই!
পালানোর চেষ্টা করেননি?
না। না…।

আনিকুলের এই না-বাচক উত্তর শেষ হওয়ার আগেই পাশ থেকে এক অল্পবয়সি ছেলে হেসে উঠল। বেশ কিছুটা আওয়াজ করে হাসতে হাসতে বলল, হ্যাঁ… হ্যাঁ…। পালিয়েছিল! পালায়নি আবার! হেঃ হেঃ হঃ হঃ…।

মনে হল হঠাৎ কী যেন একটা মজার প্রসঙ্গ এসে পড়ল এই ভাঙাচোরা উঁচুনিচু ভাগীরথীর পলি দিয়ে গড়া পাড়াটাতে। চারিদিকে বাকি দর্শকেরাও হাসতে শুরু করল। পুরুষ মহিলা কন্ঠে নানারকম হাসি। হঠাৎ মনে হল ষাট-বাষট্টির আনিকুল যেন বাচ্চা একটা ছেলে। যেন আনিকুলের টিফিনটাইমে ইস্কুল পালানো বা রাগী স্যারের টিউশন থেকে প্রেম করতে পালানোর মতো বেশ একটা মজার ব্যাপার নিয়ে এক্ষুনি কথা হচ্ছে। ছেলেটা খিক খিক আওয়াজ করে হাসতে হাসতেই বলে চলেছে, পালাতে নিয়েছিল তো কয়বার! পেরেছে নাকি! পেরেছে নাকি!

আনিকুল ইতস্তত করতে শুরু করেছে। মুখের ভাবটা বদলে গেছে। গলার স্বরটা নামিয়ে নিয়ে এবার যে উত্তরটা দিল সেটা আগেরবারের থেকে সম্পূর্ণ উলটো।

হ্যাঁ…। পালিয়েছি। সত্যি বলি কি অনেকবার পালাতে চেষ্টা করেছি। পারিনি। ওসব বিদেশে পালানো সেকি সোজা কথা! ভিসা পাসপোর্ট হাতে নেই। দেশে ফিরব কী করে? সে তো সব দূরের কথা, পালিয়ে ধরা পড়লে খুব শাস্তি হয় ওদেশে। ভয়েই পারিনি। উট চরাতে চরাতে পালানোর চেষ্টা করেছিলাম অনেকবার। বালির মধ্যে দৌড়ও লাগিয়েছিলাম। পালিয়ে কিছু দূর গিয়ে ফের ফিরে গেছি।

সেই বিকেলে আমার সামনে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ‘সত্য’ ‘মিথ্যার’ পালাবদল ঘটে গেল। একখানা সত্য প্রায় চেপে ফেলেছিল। অপরের নির্বুদ্ধিতার কারণেই হোক আর রসিকতার জন্যই হোক গোপন সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ল। আনিকুল আলম এখন নিজের গ্রাম মোল্লাটোলায়। তার দুবারের ভাঙনের পর তিনবার কাজে লাগানো ইট দিয়ে বানানো বাড়ির সামনে বসে আছে। বাড়িটা তার নিজের। সামনে মরুভূমি নেই। শ-য়ে শ-য়ে উট নেই। কাফিল নেই। আছে নিজের পাড়ার মানুষ। আর বাইরে থেকে আসা কোনও এক ভদ্রমহিলা। যিনি রেকর্ড করে চলেছেন আনিকুল আলমের মুখের কথা। ভাবছি, আনিকুল সেই বিদেশ থেকে পালানোর কথা প্রথমবার চেপে গেল কেন? কোন ভয়ে? আমার ক্যামেরাকে? ওর পালানোর কথা রেকর্ড হলে আর দশটা মানুষ শুনে ফেলবে? ফেললেই বা কী! আর কোন্‌ শাস্তি হবে? কাকে ভয় পাচ্ছে সে এখনও? সেই বিদেশের মালিক? যার সঙ্গে হয়তো আর কোনওদিন দেখা হবে না! নাকি এই ভয়টা কোনও এক মালিককে নয়! ও-দেশ এ-দেশ নানা দেশের সারা জগতে যত মালিক আছে প্রত্যেককে ভয়? যে-ভয় ওর মধ্যে ঢুকে গেছে সেই যবে থেকে অন্যের মালিকানায় খাটা লেবার হিসেবে নিজেকে জেনেছে। সে ভুলে গেছে এ-শ্রেণির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে। দোষারোপ করতে। শুধু মনে রেখেছে, এই ভরণপোষণ দেওয়া মালিকশ্রেণির হুকুম বিনা দ্বিধায় তামিল করার নিয়মগুলি। বেঁচে থেকে বা মরতে মরতে।

মুখটা কাচুমাচু করে বলে চলেছে আনিকুল, পালালে খুব শাস্তি হত ওখানে। খুব পেটায় ওরা ধরা পড়লে।

কে পেটায়? পুলিশ!
না না! পুলিশ পেটায় না। ওদেশে কাফিলই আসল। পুলিশ যদি ধরে আকামা কার্ড দেখে বলবে, বল তোর মালিক কে? কাফিলের ফোন নম্বর দে! সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে দেবে কাফিলকে। কাফিল আসবে। আটকে রাখবে ততক্ষণ। কাফিল আবার নিজের জিম্মায় নিয়ে নেবে। ফের ফিরিয়ে আনবে নিজের জায়গায়। তারপর খুব পেটাবে। চড় থাপ্পড় লাথি মারবে। লাঠি রড বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাবে। পেটাবেও আবার ডিউটিও করাবে। আরও বেশি উট চরাতে দিয়ে দেবে। যা চরাতাম তার চেয়ে ডাবল। ডিউটির টাইমও বাড়িয়ে দেবে। প্লাস খাওয়াদাওয়ার কষ্ট দেবে। আর ডাইরেক্ট কাফিলের হাতে যদি ধরা পড়ি তাহলে আরও শাস্তি। আমার কাজ করতে কষ্ট, পালিয়ে যাচ্ছিলাম, এসব জেনে কাফিল কী আর দেশে ফিরে যেতে দেবে?

যে ভাষায় আমি কথাগুলো লিখে গেলাম আনিকুল আলমের উচ্চারণগুলো ঠিক এরকম ছিল না। মাঝেমাঝে অহেতুক কিছু চন্দ্রবিন্দু আকার ইকার এসে বসছিল শব্দের সঙ্গে সঙ্গে। মাত্র এক দুপুরের আলাপে ওরকম একটা আরবি সুর মেশানো আরবে উট চালিয়ে আসা লেবারের মুখে উচ্চারিত বাংলাটা আমার পক্ষে লেখা সম্ভব হল না।

উট চালানো ছাড়া আর অন্য কিছু কাজ ছিল?
না! উট চালানোই কাজ ছিল। তা বাদে রোজার টাইমে উৎসবে পরবে ঘরের কাজ করাত।
ঘরের কাজ কীরকম?
ওদের বাসন মাজা ঘর মোছা। কচড়া ফেলা। এসব। সারা বছর না। শুধু রোজার টাইমে। ওসব সোজা কাজ।

উট চালানোর সময়কাল আনিকুল আলমের জন্য যা বরাদ্দ হয়েছিল তা বেড়ে গিয়ে দুই বছরের জায়গায় তিন বছর হয়ে গেল। সেটা অবশ্য কাফিলের দোষে নয়। যার কারণ কোনও এক ভাইরাস। বা হয়তো ভাইরাসের দোহাই দিয়ে যে-দেশের এরকম লাখ লাখ মাইগ্রান্ট লেবার পৃথিবীর নানা প্রান্তে গিয়ে রুটিরুজি চালায় সে-দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিনা বিবেচনায় হঠাৎ করে লকডাউন ঘোষণা। ২০২০-র মার্চের শেষের দিক থেকে ভারতের বড় বড় শহরে বড় বড় হাইরোডে স্টেশনে বাসস্ট্যান্ডে রেললাইনে কাতারে কাতারে মানুষকে বাক্সপ্যাঁটরা বৌ বাচ্চা গ্যসসিলিন্ডার কোদাল বালতি হাড়িকুড়ি নিয়ে অসহায়ভাবে জমা হতে দেখা গেছে। শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। হাজার হাজার কিলোমিটার হাঁটতে দেখা গেছে। বেঘোরে মরতে দেখা গেছে। মাঝদুপুরের চড়া রোদে, ভোরের অন্ধকারে বা মাঝরাতে দিনে রাতে যখনতখন। জানা যায়নি সব খবর। ওরা দেশের অন্য রাজ্যে কাজে যাওয়া লেবার ছিল। যারা মরেছে বেঁচেছে আটকে পড়েছে কোনওরকমে অসহ্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফিরেছে নিজের জায়গায়। বা আর কোনওদিন ফেরেনি। সেই দেখা যাওয়া মানুষগুলোর সংখ্যাটা এতই বেশি ছিল যেন দেশ জুড়ে এই প্রথম জানা গেল এত এত মানুষ আসলে ভিটেবাড়ি ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে পরিবার ছেড়ে কাজে যায়, লেবার হয়ে চলে যায় বাঁচতে। সে সংখ্যাটাই বা কত? নথি থেকে স্পষ্ট সেদিন জানা যায়নি। জানা যায় না আজও। তখন প্রতিদিন হেডলাইনে ছিল নতুন নামকরণ হওয়া ‘পরিযায়ী শ্রমিক’। এ-দৃশ্যগুলির বাইরে এ-দেশ থেকে বহুদূরে অন্য দেশে সিমেন্ট বালির কাজ করতে গিয়ে, পাইপলাইনের কাজে গিয়ে, বড় বড় জ্বলন্ত উনোনের সামনে রান্না করতে গিয়ে, সোনার কাজে গিয়ে, হাড়কাঁপানো শীতে ভিক্ষে করতে গিয়ে, ধু ধু মরুভূমিতে উট চালাতে গিয়ে… আর কত কত কীসব কাজে গিয়েছিল… কী হল তাদের? জানা যায়নি। আনিকুল আলম সেরকমই হাজারে হাজারে বিদেশ যাওয়া লেবারের মধ্যে একজন। যাদের বেশিরভাগ গিয়েছিল ট্যুরিস্ট ভিসায়। যারা কেউ গিয়েছিল পাড়া বেপাড়ার ঠিকাদার এজেন্ট ভাই জামাই কাছের দূরের আত্মীয় বা অন্য কারও কথায়। তাই দেশের সরকারের কাছে খবর ছিল না। বা খবর নেওয়ার সদিচ্ছাও ছিল না। মুর্শিদাবাদ মালদা লেবার কমিশন অফিসে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে উত্তর পাওয়া যায় না ঠিক কতজন বিদেশে লেবারের কাজ করতে গেছ। বা সেই যখন লকডাউন চলচ্ছিল তখন সংখ্যাটা কত ছিল! যারা এখন বিদেশে লেবারের কাজে গেছে তাদের কবে ফেরার কথা!

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

আনিকুল আটকে গেল। প্রথম বছর যখন সেই মরুভূমিতে নিদারুণ অভিজ্ঞতার ভেতর আনিকুলের সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল পালাই পালাই, সেই এক বছর বাড়তে বাড়তে সাড়ে তিন বছরে গিয়ে দাঁড়াল। আনিকুল চোখ মুখ নাক কান সারা শরীরে বালি মেখে উট চালিয়ে গেল। সারা বিশ্বে ভাইরাস চরে বেড়ালেও বোধহয় উটের মরুভূমিতে চরতে কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তাই সেই দু হাজার কুড়ির মার্চ থেকে দু হাজার একুশের আগস্ট মাস অবধি লকডাউনে আটকে থেকে আনিকুল আলমও মরুভূমির বালির উপর চরে বেড়াল। চড়া রোদ উঠেছে, বালি-ঝড় বয়ে গেছে। হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে। আনিকুল উট চরিয়ে গেছে। রাতের বেলা মালিকের দেওয়া চাল ডাল ফুটিয়ে খেয়েছে। পরবের দিনে বাসন মেজেছে। আবর্জনা ফেলেছে। আর ভয় পেয়েছে। মরতে পারত ওই তীব্র তাপে। মরেনি। দীর্ঘ বন্দিজীবন কাটিয়ে ফেরার দিনে দান পেয়ে খুশি হয়েছে। ও-দেশের মালিক পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি। নিজের দেশের সরকার ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত করেনি বলেও দোষারোপ করেনি। ফিরে এসে বলেছে কাফিলটা ভাল ছিল। সাড়ে তিন বছর মরুভূমির উট চালানোর কাজ সেরে ফিরে মাথা গোঁজার আশ্রয়টুকু ভাঙনে চলে গেছে আবার। আবার থাকতে শুরু করেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মানুষগুলোর সঙ্গে ইশকুলবাড়ির গাদাগাদি করা মানুষের ভিড়ে। আবার ঠকেছে ত্রিপল না পেয়ে। নতুন জমির পর্চা না পেয়ে। পর্চা ছাড়া জমির উপর তিন নম্বর ইট দিয়ে বানানো ঘরে এসে উঠেছে। নিজে কখনও হয়েছে ত্রাণ না পাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে একজন। কখনও হয়েছে পলিটিকাল নেতার ভাষণের টপিক। কখনও ভোট পাওয়ার টুল। আবার অন্যের জমিতে কাদা মাটি মেখে লেবার হয়ে খাটতে গেছে। পালন করে গেছে এ-দেশের মালিকের আদেশ।

ওদেশে মরুভূমিতে উট চালানোর মতো শাস্তি, পালানোর শাস্তি, থাকতে বাধ্য করার শাস্তি বাদে আরও এক কাজ ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভাল কাফিলটি তার পোষ্য এই দাসটির জন্য যে আরেকটি অপরাধের কারণে শাস্তি বরাদ্দ করে রেখেছিল সে-কারণটা শুনে সেই শীতের দুপুরে ভিড়ের ভেতর বসেও কেমন গা ছমছম করে উঠেছিল।

মালিকের কড়া হুকুম ছিল কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না। কারও সঙ্গে কথা বলাটা ছিল সেখানে বড় ধরনের অপরাধ। অবাধ্য উটকে ফিরিয়ে আনতে বা চাল ডাল আটার দরকারে, হুকুম তামিল করতে কেবল যা যতটুকু কথা। আনিকুল কীরকম একটা ভীত মুখ করে শুরু করেছিল সে অপরাধের বিবরণ।

মানে অন্য রাখালের সঙ্গেও কথা বলা যাবে না। আপনি ধরেন উট চালাচ্ছেন, আরও এরকম কাউকে দেখেলেন উট চালাতে, তার সঙ্গে দুটো কথা বলা যাবে না। দেখেন কাউকে দেখলে তো মানুষের সাধ জাগে দুটো কথা কই। আরও যে নাকি আমারই মতো বিদেশে রাখালি করছে সেই ফাঁকা মরুভূমিতে। মালিকের পছন্দ ছিল না কথা বলা। ওখানে ওরকমই। ওখানে কাজ করতে গেলে কথা বলা যাবে না। কাজে ঢোকার দিনেই কাফিল বলে দিয়েছিল, একদম কথা বলবি না কারও সাথ।

যদি একবার দেখে ফেলে কথা বলতে। ব্যস! প্রথমে আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবে সেই রাখালর সঙ্গে কী কথা বলছিলাম? একটু পরে আবার ধরবে সেই রাখালকে। তাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে যাবে অন্য জায়গায়। জেরা করবে। কী কথা বলছিলাম জানবে ভাল করে। ধরেন আমি একরকম জবাব দিলাম। আর সে আলাদা। এইরকম দুইজনের কথায় যদি না মেলে আমার ঘেঁটি চেপে ধরবে। রাগ দেখিয়ে বলবে…

কথাটা বলতে গিয়ে আনিকুল আলমের চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেল। চোখ থেকে ভয় ভীতি উড়ে গিয়ে একটা রাগী রাগী মুখ তখন। ডান হাতের তর্জনিটা উঁচিয়ে ধরেছে কিরকম একটা কোণ করে। যেন পায়ের নিচে বসে আছে কেউ। তাকে লক্ষ করে বলে চলেছে, ঠিক করে বল! সত্য করে বল, কী বলছিলি! এখানে কথা বলা বারণ বলেছি না?

কাফিলের আরবি শব্দের অর্থগুলো সেই প্রথম প্রথম সবটা না বুঝতে পারলেও বারবার শুনে এখন সে বুঝে গেছে। হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছে অর্থ আসলে কী! মালিকের মুখের আরবি কথাগুলি গড়গড় করে বলে চলেছে সেই অদ্ভুত একটা বাংলায়। যেন রাগ দেখাচ্ছে সেই কাফিল। চোখমুখের ভাবে মনে হচ্ছে পারলে মেরেই দেবে তার কোনও এক পোষ্য দাসকে। লাল সিংহাসনের মতো ডিজাইন করা এম্বস করে সেলো কোম্পানির নাম লেখা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আনিকুল সেই মুহূর্তে যেন আরবদেশের কোনও এক বড়লোক কাফিল। যার আছে অসংখ্য উট। আছে টাকা দিয়ে কেনা গাদা গাদা মানুষ। যারা মুখ বুজে ধু ধু মরুভূমির ভেতর উট চরিয়ে বেড়ায়। যা খেতে দেয় তাই খায়। তাদের শরীর বলে কিছু নেই। চামড়া বলে কিছু নেই। যাদের মালিকের কাছে এসে অভিযোগ জানানোর অধিকার নেই। যাদের নিজের দেশে বাড়ি ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। কাফিল যা দেবে নিতে বাধ্য তারা। নিজের পুণ্যে দান দিলে খুশি হয়ে গ্রহণ করবে তারা। কথা বলা নিষেধ করলে মেনে নেবে চুপচাপ।

এখন ২০২২ শেষ হয়ে ২০২৩। মাল্টিন্যাশানাল ফোনের কোম্পানি ফোনে কথা বলার ফ্রিডম প্ল্যানের বড় বড় ফ্লেক্স হোর্ডিং করে। শহর মুড়ে দেয় ফ্রিডম প্ল্যানের বিজ্ঞাপনে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার। সেই ডিজিটাল ইন্ডিয়া থেকে লেবার হয়ে চলে যায় অসংখ্য মানুষ দেশ ছেড়ে। কী কাজে যাচ্ছে বেশিরভাগের জানা থাকে না। তাদের কথা বলা নিষেধ হয়। তাদের বাড়ি ফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তাদের ইচ্ছেমতো মারা যায়। ইচ্ছেমতো শাস্তি দেওয়া যায়। দেশ থেকে তাদের খোঁজ রাখা হয় না। ভোটের লিস্টে নাম থাকা এই মানুষগুলোর নামের পাশে ভোট পড়ে যায়।

এরপরের কথাটায় আরও চমকে উঠলাম। মাটির দিকে তাক করা হাতের আঙুলটা হঠাৎ তুলে নিল সোজা সামনের দিকে। তাক করে নিল চোখবরাবর সোজাসুজি। গলার স্বরটা উঠে গেছে উঁচুতে।

রাগ করে গুলি মেরে দিত একদম!
সেকী!
হ্যাঁ। গুলি করে মেরে দিত। ওই বালির মধ্যে মরুভূমির মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলে দিত।
আপনি দেখেছেন এরকম?
হ্যাঁ। চোখের সামনে দেখিনি। কিন্তু শুনেছি। জানি। একদম সঠিক। এরকম কত মার্ডার হয়ে যায় ওখানে কাজ করতে গিয়ে। আমার আগেই তো সুদানের একটা রাখালকে গুলি মেরে দিয়েছিল আমার কাফিল। কারও সঙ্গে কথা বলতে দেখলে, অবাধ্য হতে দেখলে কাফিলরা এরকম মেরে দেয়।
কোনও কেস হয় না?
না না! কোন কেস! কে কেস করতে যাবে ওই বিদেশে! কার বাড়ির লোকে টাকাপয়সা খরচা করে যাবে বলেন তো? লোকের কাছে পাসপোর্ট আছে না টাকা আছে? দুই দিন ফোন করবে। বাড়ির মানুষকে ফোন করে না পেলে যদি নম্বর থাকে হয়ত কাফিলকে ফোন করবে। কাফিল বলবে, হ্যালো হ্যালো। তোর ঘরের লোক পালিয়েছে। তারপর আবার যদি ফোন করে ফোন কেটে দেবে। আর পাবেই না ফোনে। কী হবে! ওই লাশ বালুর মধ্যে চাপা পড়ে থেকে যাবে। কার কেস?

আনিকুল বলে চলেছে। এবার গলার স্বরটা আবার নিচুর দিকে নেমে এসেছে। হাতদুটো নিচে নেমে এসে দু-হাঁটুর মাঝে। এক হাতের আঙুলগুলো অন্য হাতের আঙুলগুলোকে আঁকড়ে নিয়েছে।

আমি কথা বলতাম না কারও সঙ্গে। ওই কাফিলকে যা যতটুকু বলতাম দরকার লাগলে। চুপচাপ সাড়ে তিন বছর কাজ করে গেছি। মালিক যা বলেছে সব মেনে নিয়েছি। তাই তো কাফিল ফেরার সময় দান দিয়েছিল। ভালই ছিল আমার কাফিলটা।

 

যে জীবিত মানুষটি আমার সামনে বসে আছে এই মানুষটিই কয়েকমাস আগে দূর কোন মরুভূমিতে লাশ হয়ে বালির নীচে চাপা পড়ে থাকতে পারত। এই ভাঙনে ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ির অবশিষ্ট মানুষগুলোর ফোন থেকে ডায়াল করা নম্বরে রিং বাজত আরবের মরুভূমিতে। ঢেউ খেলানো বালির নিচে কাঠ হয়ে থাকত হয়তো ষাট-বাষট্টির আনিকুল। শরীরখানা পচে উঠত ওই স্তরে স্তরে বালির নিচে।

বা আজ এক্ষুণি এই দুপুরবেলা। সেই আরবের খাঁ খাঁ মরুভূমি। ডাক শোনা যাচ্ছে ইকবাল আমিন আলম ইরফা…ন।  সামনে পেছনে ডানে বাঁয়ে ধু ধু মরুভূমি। বালি… বালি। হাওয়ায় উড়ছে বালি। বালির ঝড়ে চারপাশ আবছা। হোঁচট খেয়ে পড়ছে কেউ সামনে। নাকে দাঁতে ঠোঁটে জিভে ভরে যাচ্ছে বালি। সামনে ঢেউ ঢেউ বালি। তার ভেতর আঁকাবাঁকা সামান্য উঁচু নিচু উঁচু। বালি আসছে উড়ে। ওই সামান্য উঁচু নিচু ঢেউগুলো  মিশে যাচ্ছে অন্য বড় ঢেউয়ে। আনিকুলের কোনও ভাই দাদা আত্মীয় অনাত্মীয় ওই উঁচু নিচু জায়গাটার নিচে শুয়ে আছে। শক্ত কাঠ হওয়া একখানা শরীর। মাথা পিঠ কোমরে উঁচু নিচু হয়ে আছে বালি। ঢেকে আসছে ক্রমশ ওই খাঁজ। ওই ওখানে এই মালদা মুর্শিদাবাদ নদিয়া উত্তর দিনাজপুর থেকে লেবার হয়ে যাওয়া কেউ। ভারত বা বাংলাদেশ ওমান সুদান থেকে যাওয়া কেউ। ষাট-বাষট্টির কিংবা কুড়ি-বাইশের।

ইমরান ইকবা…ল আল…ম ক্রিং… ক্রিং… ক্রিং… ক্রিং…। ওই যে শুয়ে আছে ওর ফোনে রিং বাজছে…। চুপ। কোনও আওয়াজ নেই। রিং বাজছে। রিং বাজছে। কেউ বলছে না, হ্যালো… হ্যালো… হ্যালো…

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

  • ফিরোজ শেখ
  • সিটু নেতৃত্ব, মালদা জেলা
  • মোল্লাটোলা গ্রামের অধিবাসীবৃন্দ

*লেখার ভেতরের ছবি দুটি লেখকের তোলা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...