হিন্দুরাষ্ট্রের চেহারাটি আসলে কেমন হবে

প্রভাত পট্টনায়েক

 

অনুবাদ: নন্দন রায়


বর্তমান সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন শ্রমজীবী জনতার ক্রমশ বেড়ে চলা দুর্দশা লাঘবের কোনও আশা নেই। পরিবর্তে জালিয়াতি করা তথ্য-পরিসংখ্যানের ওপরে ভিত্তি করে তৈরি করা জিডিপির বিকাশের সন্দেহজনক উচ্চহারকে হাতিয়ার করে সরকার তখন দেশের ‘উন্নয়নের স্বার্থে’ একচেটিয়া পুঁজিকে নানারূপ বদান্যতায় ভরিয়ে দেবে এবং যারা নিরপেক্ষ্ পরিসংখ্যান তুলে ধরে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে মানুষের দুর্দশা কীভাবে বেড়ে চলেছে, তাদের দেশদ্রোহী আখ্যায় ভূষিত করবে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা পরিচালিত সরকারেরই যদি এই কার্যক্রম হয়, তবে বোঝাই যায় কোনও হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারা মানুষের দুর্দশা মোচন করার সরকারি কর্তব্যকে প্রাতিষ্ঠানিক ঔদাসীন্যের কোন্‌ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। আর এই কারণেই ভবিষ্যতের হিন্দুরাষ্ট্রকে সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র হতেই হবে

 

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের জন্মই হয়েছিল হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্য মাথায় রেখে। সুতরাং যে প্রশ্নটি প্রথমেই মাথায় আসে, সেটি হল হিন্দুরাষ্ট্র মানে কী? পৃথিবীতে এমন অনেক দেশই আছে, যেখানে অন্যান্য বিদ্যমান ধর্মের তুলনায় একটি বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয় অথবা যাদের বলা হয় ধর্মতান্ত্রিক দেশ। অবশ্য তার ফলে সেইসব দেশের শ্রেণিপ্রকৃতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটে না। একইভাবে ভারতে যদি হিন্দুরাষ্ট্র আদৌ বাস্তবায়িত হয়, তবে সেক্ষেত্রে ভারতরাষ্ট্রের কর্ণধাররা প্রত্যহ অন্যান্য ধর্মের নিপাত কামনা করে সোচ্চারে হিন্দু ধর্মের জয়গান গাইতে পারে, তবে তার ফলে ভারতরাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের কোনও বদল ঘটবে না, ভারত আজকের মতই একচেটিয়া পুঁজি, বিশেষত একচেটিয়া পুঁজির নতুন এবং আরও আগ্রাসী এক প্রজন্মের দ্বারা অনুমোদিত সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্রই থেকে যাবে। এর কারণটি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের সভাপতি জর্জি দিমিত্রভ সপ্তম কংগ্রেসে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ফ্যাসিবাদ হচ্ছে “লগ্নিপুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে প্রতিশোধপরায়ণ অংশের সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র”। আমাদের যুক্তি হচ্ছে হিন্দুরাষ্ট্র যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সেটি আদতে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র হবে।

এইরূপ রাষ্ট্রে যাবতীয় সরকারি অনুষ্ঠান হিন্দু দেবতাদের পুজার্চনার দ্বারা আরম্ভ হবে; সমস্ত রাস্তা, রেলওয়ে স্টেশন অথবা শহরগুলির নাম, যা এখন মধ্যযুগের সম্রাট-মহারাজাদের নামে নামাঙ্কিত সেইসব নাম পাল্টে হিন্দুত্ববাদের প্রতীকি দেবতা, রাজা ইত্যাদির নামে নামাঙ্কিত করা হবে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব অনুষ্ঠান সরস্বতী বন্দনা দিয়ে শুরু হবে এবং এমনকি সরকারি অর্থে বহু মন্দির নির্মাণ করা হবে। কিন্তু এসবের কোনওটার দ্বারাই গড়পড়তা হিন্দু জনতার জীবনধারণের মানের একবিন্দুও উন্নতি হবে না, যেমন তুরস্কের এরদোগান সরকার যখন ইসলামি সেন্টিমেন্টকে তোষণ করার উদ্দেশ্যে বিখ্যাত হাজিয়া সোফিয়া চার্চটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করে, তাতে আম- তুরস্কবাসী নাগরিকদের জীবন-যাপনের মানের বিন্দুমাত্র উন্নতি ঘটেনি।

এই ঘটনার সূত্র ধরে ভাবনার আরও প্রসারণ ঘটানো যায়। প্রথমেই আমাদের দেশের কথা বলা উচিত। যে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর দ্বারা এখন শাসিত হচ্ছি তার অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ভীতিপ্রদ হয়ে উঠেছে। দেশের বেকারত্ব বহু দশকের মধ্যে এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। Centre for Monitoring the Indian Economy-এর সমীক্ষা অনুসারে[1] ভারতে বেকারত্বের হার ২০০৮-২০১৯ সালের মধ্যে মোট সক্রিয় শ্রমশক্তির[2] গড়ে ৫ এবং ৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করত তা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশে! হিন্দুত্ববাদীদের সরকার বেকারত্বের এই ঊর্ধ্বগতি রোধ করার জন্য কোনও রূপ পদক্ষেপ নেওয়া তো দুরের কথা, উপরন্তু সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কোনওরকম রাখঢাক না করে সরাসরি বলেই দিয়েছেন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার ব্যাপারে সকারের কিছু করার নেই। পরবর্তীকালে উক্ত আধিকারিক এই মন্তব্য প্রত্যাহার করেননি তো বটেই এমনকি সরকারের কোনও কর্তাব্যক্তিও এই মন্তব্যকে মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টার ব্যক্তিগত মতামত বলে ড্যামেজ কন্ট্রোলের কোনও চেষ্টাও করেনি। ফলে বোঝা যাচ্ছে কাজের সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে এটাই সরকারের অবস্থান। শ্রমজীবী জনতার প্রত্যহ বেড়ে চলা দুর্দশার পেছনে কাজের অভাবের যে সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যুটি রয়েছে, সে-সম্পর্কে সরকার কতটা উদাসীন।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

এসব ঘটনার নির্গলিতার্থ হল বর্তমান সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন শ্রমজীবী জনতার ক্রমশ বেড়ে চলা দুর্দশা লাঘবের কোনও আশা নেই। পরিবর্তে জালিয়াতি করা তথ্য-পরিসংখ্যানের ওপরে ভিত্তি করে তৈরি করা উচ্চহারের জিডিপির বিকাশের ফেটে যাওয়া কাঁসরটা সরকার এবং তাদের অনুগত মিডিয়া বাজিয়েই যাবে। জিডিপির বিকাশের এই সন্দেহজনক উচ্চহারকে হাতিয়ার করে সরকার তখন দেশের ‘উন্নয়নের স্বার্থে’ একচেটিয়া পুঁজিকে নানারূপ বদান্যতায় ভরিয়ে দেবে এবং যারা নিরপেক্ষ্ পরিসংখ্যান তুলে ধরে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে মানুষের দুর্দশা কীভাবে বেড়ে চলেছে, তাদের দেশদ্রোহী আখ্যায় ভূষিত করবে। এই যদি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা পরিচালিত সরকারের কার্যক্রম হয়, তবে এ-কথা সহজেই অনুমান করা চলে যে ভবিষ্যতে কোনও হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারা মানুষের বস্তুগত জীবনের দুর্দশা মোচন করার সরকারি কর্তব্যকে প্রাতিষ্ঠানিক ঔদাসীন্যের কোন্‌ পর্যায়ে নিয়ে যাবে।

এই কারণেই ভবিষ্যতের হিন্দুরাষ্ট্রকে সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র হতেই হবে। শ্রমজীবী জনতার ওপরে চাপিয়ে দেওয়া সম্পত্তিবান শ্রেণিগুলির যে-কোনও শাসনব্যবস্থা, তা যদি কোন গণতান্ত্রিক সরকারের দ্বারা পরিচালিত হয়ও বা, অন্তঃসারের দিক দিয়ে সেই শাসন আদতে শ্রেণি-একনায়কতন্ত্রের শাসন। এই কথা বলার অর্থ এটা নয় যে শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক রূপটি অপ্রাসঙ্গিক অথবা গণতন্ত্রের সঙ্গে শাসনব্যবস্থার বিষয়টি সম্পর্কহীন। এখানে কেবলমাত্র এই কথাটি বলা হচ্ছে যে শ্রেণি-একনায়কতন্ত্রের সার্বিক ঘেরাটোপের মধ্যে শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক অন্তর্বস্তু ক্ষয়প্রাপ্ত হয় কিন্তু যখন শ্রেণি-একনায়কতন্ত্রে মানুষের জীবনযাত্রার মান প্রকৃত অর্থে খারাপ হতে শুরু করে এবং সরকার এই রকম খারাপ হওয়া আটকানোর চেষ্টা করে না, তখন এই শ্রেণি-একনায়কতন্ত্র বাধ্য হয়ে শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক মর্মবস্তুকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে, অর্থাৎ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক শাসন পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে পদদলিত করে।

 

দুই.

একচেটিয়া পুঁজির আশীর্বাদধন্য শ্রেণি-একনায়কতন্ত্রের হাত ধরে হিন্দুরাষ্ট্র যদি ভারতের ভাগ্যাকাশে উদিত হয়, তাকে নয়া উদারবাদী ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যেই কাজ করতে হবে। কারণ একচেটিয়া বুর্জোয়া ইতিমধ্যে নয়া-উদারবাদের অঙ্গীভূত হয়ে গিয়েছে। ফলে বিশেষত পুঁজির সঙ্কটের সময়ে শ্রমজীবী জনতার ওপরে নয়া-উদারবাদী আক্রমণ ও নিষ্পেষণ তীব্রতর হয়ে উঠবে, যার অর্থ হচ্ছে একচেটিয়া পুঁজির সেই একনায়কতন্ত্র যা কাজ হাসিল করার জন্য সন্ত্রাসের প্রয়োগে পিছু হটে না— অর্থাৎ বিকশিত হয় একচেটিয়া পুঁজির নবীনতর আগ্রাসী অংশের প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র।

বস্তুত, ঠিক এই কারণেই একচেটিয়া বুর্জোয়াদের অধিকাংশ হিন্দুরাষ্ট্রের প্রকল্পটিকে সমর্থন করে। এই প্রকল্পে সন্ত্রাস সৃষ্টির দোসর হিসাবে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বাতাবরণ উস্কে দেওয়া হিন্দুত্ববাদীদের অন্যতম কাজ, তার সঙ্গে রয়েছে সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীটিকে ‘অপর’ বলে প্রতিপন্ন করে মানুষের যাবতীয় সমস্যার মূল কারণ হিসাবে দায়ী করে, তাদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠের মানসিক জগতে বিদ্বেষের বীজ বপন করে এবং ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস করে— এসবই ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনা করে। এই কারণেই এই নিবন্ধের শুরুতেই আমরা বলেছিলাম হিন্দুরাষ্ট্রের নির্যাস হল একচেটিয়া পুঁজির শ্রেণি-একনায়কতন্ত্র যা সন্ত্রাসের কৌশল অবলম্বন করে নিজেদের সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ খোঁজে।

 

তিন.

সন্ত্রাসের ব্যবহার এবং হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের সুড়সুড়ি, হিন্দুরাষ্ট্রের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্মাণের এই দুই পদ্ধতি ছাড়াও তৃতীয় আরও একটি পদ্ধতি হিন্দুরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে— সেটি হচ্ছে সামাজিক প্রতিবিপ্লবের অর্গলমুক্তি। স্বাধীনতা লাভের আগে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতে দুটি সমান্তরাল আন্দোলন বিকশিত হয়েছিল: একটি হচ্ছে উপনিবেশ-বিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলন। দ্বিতীয়টি, জাতপাতভিত্তিক সামন্ত সমাজে হাজার বছর ধরে চলে আসা সামাজিকভাবে নিষ্পেষিত মানুষের মুক্তির আন্দোলন। একটি আন্দোলনের নেতৃবর্গের সঙ্গে অপর আন্দোলনের নেতৃত্বের খুব বেশি ব্যক্তিগত সদ্ভাব না থাকলেও দুই আন্দোলনের তৃণমূল স্তরের জনতা পরস্পরের সঙ্গে এক মিথোজীবী সম্পর্কের দ্বারা আবদ্ধ ছিল— বামপন্থী আন্দোলন এই পারস্পরিক সম্পর্ককে মূর্ত করে তুলেছিল।

এই দ্বিবিধ আন্দোলনের ফলে দেশজুড়ে এক বিপুল সামাজিক রূপান্তর ঘটেছিল। বুর্জোয়া ঘেরাটোপের সীমাবদ্ধতা-হেতু এই রূপান্তর তার স্বাভাবিক পরিণতি অর্থাৎ নতুন সামাজিক উত্তরণের পথে অবশ্য অগ্রসর হতে পারেনি বটে, তৎসত্ত্বেও তার সামাজিক অবদান কিছু কম ছিল না। একটি উদাহরণের উল্লেখই এই অবদানের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট হবে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বর্তমান কেরল ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে অস্পৃশ্যতার প্রথা প্রবলভাবে বিরাজ করছিল, শুধু তাই নয়, ‘অদৃশ্যতা’র প্রথারও প্রচলন ছিল। তার অর্থ হচ্ছে উচ্চবর্ণের কেউ যদি নিম্নবর্ণের কোনও মানুষকে দেখে ফেলে, তাহলে উচ্চবর্ণের মানুষটি কলুষিত হয়ে যাবে। সেই কেরলের সঙ্গে আজকের দিনের কেরলকে যদি আমরা তুলনা করি তাহলে দেখব যে মানব উন্নয়নের সূচকের বিচারে আজকের কেরল তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের থেকে এগিয়ে আছে শুধু নয়, উন্নত দূনিয়ার অনেক দেশের সঙ্গে সে টক্কর দিতে পারে। একথা সত্যি যে কেরলের উদাহরণ কিছুটা ব্যতিক্রমী বটে, তবু কেরলের মতো না হলেও গোটা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আপেক্ষিকভাবে বিপুল রূপান্তর ঘটেছে।

 

পড়ুন, গুজরাত গণহত্যার বিচার হয়নি

 

এই বিপুল সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের চাকা উলটোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার অনুক্ত প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব উদ্যোগ হিন্দুত্ববাদের উত্থানে সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। যে গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহের ফলে মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটেছে এবং তার দ্বারা এই রূপান্তর সম্ভব হয়েছে এবং গত প্রায় সত্তর বছর ধরে যে ধর্মনিপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি সংবিধান তার নাগরিকদের দিয়েছে, হিন্দুত্ববাদীরা সেই গণতন্ত্রকে প্রথমে খর্ব ও অবশেষে ধ্বংস করতে চায় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটিকেই বিলোপ করতে চায়। এই বিপরীত যাত্রা নেতিবাচক অর্থে আরও সুদুরপ্রসারী ও ব্যাপক— অর্জনের অমৃতের থেকে বর্জনের ফল আরও ভয়াবহ বিষাক্ত। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দুত্ববাদ চালিত নয়া-উদারবাদী প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের অতিরিক্ত শিক্ষাক্ষেত্র-সহ সমস্ত পরিষেবার যেরূপ বেসরকারিকরণ ঘটে চলেছে, তার ফলে সামাজিকভাবে বঞ্চিত নাগরিকদের কর্মক্ষেত্র থেকে  এবং অন্যান্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বর্জনের মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এটিও সমদর্শী রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রচলিত প্রবণতা থেকে পশ্চাদপসরণ।

উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা নয়া-উদারবাদী জমানায় নানারকম সুবিধাভোগ করেছে, তারা ক্রমে শ্রমজীবী শ্রেণিগুলি থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে। শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষের প্রতি একটুও সহানুভূতি তাদের অবশিষ্ট নেই এবং তারাই হচ্ছে প্রতিবিপ্লবের বড় সমর্থক। অর্থাৎ আমাদের বলার কথাটা হল, বিগত বহু বছর ধরে ভারতে সামাজিক রূপান্তরের যে স্রোত বহমান ছিল— কখনও তীব্র, কখনও ধীর গতিতে, হিন্দুত্ববাদের উত্থান মানেই হচ্ছে সেই গতিকে পেছনের দিকে প্রবাহিত করা। এই কারণে হিন্দুরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার অর্থ হচ্ছে প্রকৃত অর্থে প্রতিবিপ্লবের আবাহন।

সময়বিশেষে শব্দাবলি খুবই বিভ্রান্তিকর হতে পারে। হিন্দুরাষ্ট্র সেরকমই একটি ক্লাসিক উদাহরণ। হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলির প্রচারযন্ত্রগুলি নিরলসভাবে প্রচার করছে যে হিন্দুরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাক্ষণটি হবে যাবতীয় হিন্দুর মুক্তির শুভলগ্ন। কিন্তু বিপরীতে সেই অশুভক্ষণটি হবে হিন্দুরাষ্ট্রের ছদ্মবেশে একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থরক্ষায় পরিচালিত এক একনায়কতন্ত্র যারা অমোচনীয় সঙ্কট থেকে নয়া-উদারবাদী জমানাকে উদ্ধার করার এক ব্যর্থ প্রয়াস। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থরক্ষার বদলে তারা দ্বারোদ্ঘাটন করবে এক বিষাক্ত প্রতিবিপ্লবের, যে প্রতিবিপ্লব এতদিন ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক যা কিছু অর্জন তাকে বিপরীত পথে চালিত করবে। কৃষকদের সঙ্গে মৈত্রীবদ্ধ  শ্রমিকশ্রেণির ঐতিহাসিক কর্তব্য হচ্ছে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে-কোনও উদ্যোগকে প্রতিহত করা।


[1] যদিও এইরূপ আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় অবৈতনিক গার্হস্থ্য শ্রমকে কর্মসংস্থান হিসাবে ধরা হয় না এবং CMIE-ও অনুরূপ পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে।
[2] যারা হতাশ হয়ে কাজ খোঁজা ছেড়েই দিয়েছে তাদের বাদ দিয়ে এই শ্রমশক্তির হিসাব করা হয়।


*এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় পিপলস ডেমোক্র্যাসি পত্রিকার এপ্রিল ০১-০৭ সংখ্যায়। অনুবাদ করার সময় কিছুটা স্বাধীনতা নিয়েছি বিষয়টি প্রাঞ্জল করার অসীম ধৃষ্টতায়— অনুবাদক

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...