পিটার হিগস এবং হিগস বোসন

ভাস্কর জানা

 


৮ এপ্রিল ২০২৪ সালে ৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন পিটার হিগস। তাঁর তৈরি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে আবিষ্কৃত হয়েছে হিগস বোসন যার কাজ হল অন্য মৌলিক কণাদের ভরের জোগান দেওয়া। মহাবিশ্বকে ব্যাখা করতে বিজ্ঞানীরা যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল তৈরি করেছেন তার কেন্দ্রে রয়েছে হিগস বোসন। এই কণার অনুপস্থিতিতে তৈরি হত না প্রোটন, নিউট্রন কিংবা পরমাণু। থাকত না দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কিছুই। কিন্তু তাঁর নামে এই মহার্ঘ্য কণাটির নামকরণ করায় বেশ বিব্রত ছিলেন তিনি, কারণ তিনি মনে করতেন সেই একই কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর আরও পাঁচ সহকর্মীর যাঁরা একসঙ্গে ১৯৬২ সালের বিখ্যাত পেপারটি লেখেন। এমনকি ৮২ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দিনটিতেও তিনি কাটিয়েছিলেন শহর থেকে অনেক দূরে লোকচক্ষুর অন্তরালে

 

বিজ্ঞানীরা সত্যসন্ধানী। নশ্বর জীবনকে আলোকিত করার জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালান তাঁরা। পরমাণুর ভিতর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগৎ থেকে অসীম মহাবিশ্ব, বস্তুগত চেতনার এই সমন্বয়সাধন করতে গিয়ে গবেষণা করে চলেছেন নিবেদিতপ্রাণ পদার্থবিদরা। তাঁদের মৌলিক গবেষণার সঙ্গে সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ইতিহাস যা মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ উন্নতির সোপান।

তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বলা যায়, গবেষণার মাধ্যমে যে মৌলিক তত্ত্ব তাঁরা তৈরি করেন, তার সুফল পেতে থাকে পরবর্তী অনেক প্রজন্ম। এঁদের অনেকেই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে নিজেকে সরিয়ে নেন সভ্যতার কোলাহল থেকে দূরে, থাকেন লোকচক্ষুর অন্তরালেই। এরকমই নিবেদিতপ্রাণ এক বিজ্ঞানী পিটার হিগস।

৮ এপ্রিল ২০২৪ সালে ৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। তাঁর তৈরি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে আবিষ্কৃত হয়েছে হিগস বোসন যার কাজ হল অন্য মৌলিক কণাদের ভরের জোগান দেওয়া। মহাবিশ্বকে ব্যাখা করতে বিজ্ঞানীরা যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল তৈরি করেছেন তার কেন্দ্রে রয়েছে হিগস বোসন। এই কণার অনুপস্থিতিতে তৈরি হত না প্রোটন, নিউট্রন কিংবা পরমাণু। থাকত না দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কিছুই।

প্রচারের আলো থেকে চিরকালই নিজেকে শত যোজন দূরে রেখেছিলেন হিগস। তাঁর নামে এই মহার্ঘ্য কণাটির নামকরণ করায় বেশ বিব্রত ছিলেন তিনি, কারণ তিনি মনে করতেন সেই একই কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর আরও পাঁচ সহকর্মীর যাঁরা একসঙ্গে ১৯৬২ সালের বিখ্যাত পেপারটি লেখেন। এমনকি ৮২ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দিনটিতেও তিনি কাটিয়েছিলেন শহর থেকে অনেক দূরে লোকচক্ষুর অন্তরালে।

২০১২ সালে এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন এখনকার অ্যাকাডেমিক সিস্টেমে তিনি কতটা যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হবেন তা নিয়ে তাঁর নিজের মনেই প্রশ্ন হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখন প্রতি মিনিটে প্রায় তিনটি নতুন সায়েন্টিফিক পেপার প্রকাশিত হচ্ছে, সেখানে পিটার হিগসের গবেষণাজীবনে তাঁর প্রকাশিত পেপারের সংখ্যা কুড়ির নিচে। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের মনে হয়েছিল ১৯৮০ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত না হলে হয়তো বিশ্ববিদ্যলয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ছাঁটাই করে দিতেন। যদিও এই পরিসংখ্যান দিয়ে পিটার হিগসকে বিচার করতে চাইলে সেটা হবে চরম মূর্খামি। ১৯৬৪ সালে পিটার হিগস, ফ্রাসোয়া এংলার্ট এবং রবার্ট ব্রাউট-এর বিখ্যাত পেপারটি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস-এ প্রকাশিত হয়। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে বোসন কণাদের ভর কোথা থেকে আসছে তার প্রথম ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এই তিন বিজ্ঞানী। পেপারটি সেই সময়ের নিরিখে অনেক এগিয়ে ছিল,পার্টিকেল ফিজিক্সের অনেক মৌলিক কণা বিজ্ঞানীরা তখনও আবিষ্কার করে উঠতে পারেননি। হিগস তাঁর পেপারে যেভাবে হিগস ফিল্ড থেকে কণাদের ভর পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছিলেন তা প্রথমে পদার্থবিদদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাই ১৯৬২ সালে ইউরোপিয়ান জার্নাল ফিজিক্যাল লেটারের এডিটররা পেপারটিকে বাতিল করে দিয়েছিলেন। পরের প্রচেষ্টায় আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি দ্বারা পরিচালিত ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারসে পেপারটি প্রকাশিত হওয়ার পর সেটি বিজ্ঞানীমহলে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায় একইসময় এই মেকানিজম নিয়ে আরও একটি পেপার প্রকাশ করেছিলেন টম কিবল, হ্যাগেন এবং গুরালনিক নামে আরও তিন পদার্থবিদ।

রবার্ট ব্রাউট, ফ্রাসোয়া এংলার্ট, জেরাল্ড গুরালনিক, কার্ল হ্যাগেন, পিটার হিগস এবং টম কিবল, বাঁদিক থেকে ডানদিকে

 

হিগস কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে লেগে গিয়েছিল আরো পঞ্চাশ বছর। ২০১২ সালে ৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের সার্নের গবেষণাগারে একটি প্রেস কনফারেন্স করে বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন হিগস বোসন কণার অস্তিত্ব তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন। ২০১৩ সালে নোবেল পান পিটার হিগস।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন এই শতাব্দীর অন্যতম সেরা আবিষ্কার হল হিগস বোসন। পদার্থবিজ্ঞান চর্চায় হিগস কণার গুরুত্ব বুঝতে গেলে যদিও একটু পিছনে ফিরে তাকাতে হবে আমাদের।

 

মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল? পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা প্রথম জন্ম হওয়ার থেকে আজকের মহাবিশ্ব। কণা-পদার্থবিজ্ঞানীরা বলছেন আজ থেকে প্রায় ১৩৭০ কোটি বছর আগে ঘটেছিল এক মহাবিস্ফোরণ, যার নাম কিনা বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং শুরুর থেকে আজকের মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করা তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। পদার্থবিদ্যায় প্রত্যেকটি ঘটনাই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তাই এই গবেষণার কাজ যাঁরা করেন তাঁদের কাছে সব ঘটনাগুলোকে মেলানো একটা কঠিন Jigsaw Puzzle সমাধান করার মতোই জটিল।

শুরু করা যাক পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক দিয়েই। ডালটন এবং তাঁর পূর্বসূরিরা পরমাণুর ধারণা দিয়েছিলেন কিন্তু তাঁদের মতে পরমাণুকে আর ভাঙা যায় না। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে পারমাণবিক মডেলের ওপর একাধিক কাজ হয়েছিল যা পরমাণুর গঠন নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে আমূল বদলে দিল। ১৮৯৭ সালে ক্যাথোড রে টিউবের সাহায্যে পরীক্ষা করে জেজে থম্পসন পরমাণুর ভিতরেও ক্ষুদ্রতম এক নেগেটিভ চার্জ বহনকারী কণার সন্ধান পান যা কিনা ছিল ইলেকট্রন। এরপরের কয়েক দশকে রাদারফোর্ড এবং বোরের অ্যাটমিক মডেল এবং প্রোটন এবং নিউট্রনের আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা পরমাণুর গঠনকে আরও সুসংহতভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন।

ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে পদার্থবিদ্যায় আরেকটি বড় ঘটনা হল কোয়ান্টাম তত্ত্বের উদ্ভাবন। বোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে অ্যাটমিক মডেলকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন।

১৯৬০ সালের মধ্যে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে আরও অনেক নতুন মৌলিক কণার সন্ধান পেলেন যা ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রনের থেকে আলাদা। ১৯৩৭ সালে আবিষ্কৃত হল মিউয়ন যা ইলেকট্রনের ভরের প্রায় ২০০ গুণ। এছাড়া পাইয়ন এবং নিউট্রিনোর মতন একাধিক কণার অস্তিত্ব প্রমাণিত হল।

মহাবিশ্বের কার্যকরী সমস্ত বলগুলিকে একত্রিত করে চারটি মৌলিক বলের সংজ্ঞা দেওয়া হল। এই চারটি বল হল মহাকর্ষ বল বা Gravitational Force, তড়িচ্চুম্বকীয় বল বা Electromagnetic Force, Weak Nuclear Force এবং Strong Nuclear Force। কণাপদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল এই বল এবং মৌলিক কণাগুলিকে একত্রিত করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ব্যাখ্যা করতে পারে। যদিও এই মডেলের সাহায্যে এখনও পর্যন্ত Gravity বা মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা যায়নি কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার সিংহভাগ ঘটনার ব্যাখ্যা এই মডেলের মাধ্যমেই পাওয়া যায়। তাই পদার্থবিদদের কাছে এই মডেলের গুরুত্ব অপরিসীম।

স্ট্যান্ডার্ড মডেল আবার কোয়ান্টাম ফিল্ড তত্ত্ব মেনে চলে। পারমাণবিক স্তরে ইলেকট্রন, প্রোটনের মতন কণারা তরঙ্গের মতো আচরণ করে। এই তত্ত্ব দিয়ে তাদের ধর্মকে সফলভাবে ব্যাখ্যা করে যায়। সারা মহাবিশ্বে তরঙ্গের মতন ছড়িয়ে রয়েছে কোয়ান্টাম ফিল্ড। পুকুরের জলে ঢিল ছুড়লে যেরকম কিছুটা জল ছিটকে বেরিয়ে আসে সেরকম কোয়ান্টাম ফিল্ডের মধ্যে শক্তি প্রয়োগ করে কণাদের তৈরি করা যায়।

স্ট্যান্ডার্ড মডেলে কণাগুলির প্রকৃতি অনুযায়ী মৌলিক কণাদের দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। ফার্মিয়ন আর বোসন। ফার্মিয়ন বা বোসনকেও কোয়ান্টাম তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

প্রোটন বা নিউট্রন— এই উপপরমাণু কণাগুলির মৌলিক উপাদান হল ফার্মিয়ন। এদের প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায় ইলেকট্রন, আপ কোয়ার্ক এবং ডাউন কোয়ার্ক। তিনটি আপ কোয়ার্ক এবং ডাউন কোয়ার্ক বিভিন্ন বিন্যাসে থেকে প্রোটন এবং নিউট্রন তৈরি করেছে। প্রোটন এবং নিউট্রনকে একত্রিত করলে পাওয়া যাবে নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াস এবং ইলেকট্রনকে একত্রিত করলে তৈরি হবে পরমাণু। সুতরাং আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে এই তিনটি কণার বিভিন্ন কম্বিনেশনের ওপর ভিত্তি করে।

আর এক ধরনের মৌলিক কণা হল নিউট্রিনো। নিউট্রিনো ছড়িয়ে রয়েছে সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যেই। কিন্তু এই কণা কারও সঙ্গে কিছু আদানপ্রদান করে না। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে নিউট্রিনো হল Cosmic Ghost Particle। এছাড়াও ইলেকট্রনের থেকে কয়েকশো গুণ ভারী মিউয়ন এবং টাও-এর মতন কণা দেখা যায় যাদের ধর্ম ইলেকট্রনের মতোই। কোয়ার্কদের মধ্যেও এই বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। আপ এবং ডাউন কোয়ার্ক। আপ কোয়ার্কের মতন একই বৈশিষ্ট্যযুক্ত কিন্তু ওজনে অনেক ভারী চার্ম এবং টপ কোয়ার্ক। ডাউন কোয়ার্কের থেকে ভারী একই শ্রেণির স্ট্রেঞ্জ এবং বটম কোয়ার্ক। নিউট্রিনো আবার দুরকমের। সবমিলিয়ে এত ধরনের কণার উপস্থিতির জন্য রবার্ট ওপেনহাইমার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এই মৌল কণাদের সমাহারকে মজা করে নাম দিয়েছিলেন Particle Zoo।

 

যদিও এদের মধ্যে বেশিরভাগ কণার অস্তিত্বই ক্ষণস্থায়ী। অর্থাৎ মহাবিশ্ব শুরুর সময় কিংবা মহাজাগতিক বিস্ফোরণের সময় খুব কম সময়ের মধ্যে তৈরি হয়। তারপর শেষ পর্যন্ত ভেঙে গিয়ে ইলেকট্রন, টপ বা ডাউন কোয়ার্কে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা Particle Accelerator বা কণাত্বরণ যন্ত্রে উচ্চশক্তির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এই ক্ষণস্থায়ী কণাগুলিকে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন এবং এভাবেই তাদের অস্তিত্ব স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সাফল্য প্রমাণিত করেছে।

এই তো গেল ফার্মিয়নদের কথা। এরপর আসি বোসন কণাদের কথায়। আগেই বলেছিলাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল তিনটি মৌলিক বলকে ব্যাখ্যা করতে পারে। মৌলিক কণা ফার্মিয়নগুলো এই তিনটি বলের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে interaction (মিথস্ক্রিয়া) করতে পারে। অর্থাৎ এই তিনটি বল না থাকলে ফার্মিয়নগুলো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত।

অর্থাৎ বোসন কনাগুলি আসলে হল বলের carrier বা বাহক। প্রথমে শুরু করা যাক তড়িচ্চুম্বকীয় বল বা Electromagnetic Force দিয়ে। Electromagnetic Force-এর বাহক হল ফোটন। এই বল Electrically Charged পার্টিকলদের মধ্যে কাজ করে। ইলেকট্রন বা কোয়ার্কদের মধ্যে চার্জ আছে তাই তারা এই বলের সঙ্গে interact করতে পারে কিন্তু নিউট্রিনো চার্জহীন বলে এর সঙ্গে interact করে না।

এর পর Strong Force। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী মৌলিক বল এবং পারমাণবিক স্তরে খুব কম দূরত্বে কাজ করে। এই বলের রেঞ্জ ফেমটোমিটার স্কেলে মাপা হয়। ১ মিটারকে ১-এর পিছনে পনেরোটা শূন্য বসিয়ে ভাগ করলে এই স্কেল পাওয়া যায়। সুতরাং বোঝা যায় কত ক্ষুদ্র এই দূরত্ব যা মানুষের কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। এই বল কাজ করে দুটি কোয়ার্কের মধ্যে। এই বলের মাধ্যমেই প্রোটন এবং নিউট্রন নিউক্লিয়াসের মতো ছোট জায়গায় আটকে থাকে। নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তি এই ফোর্স থেকেই পাওয়া যায়। Strong Force-এর বাহক হিসেবে কাজ করে যে বোসন কণা তার নাম হল গ্লুয়ন। বাস্তবিক এটি গ্লু বা আঠার মতোই আটকে রাখে কোয়ার্কদের।

আরেকটি মৌলিক বল হল Weak Force। এই বল Strong Force-এর মতোই পারমাণবিক ক্ষেত্রে খুব কম দূরত্বের মধ্যেই কাজ করে। Weak Force-এর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। Weak Force-এর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে একটি ডাউন কোয়ার্ক টপ কোয়ার্কে রূপান্তরিত হতে পারে এবং এর ফলে একটি ইলেকট্রন এবং একটি নিউট্রিনো তৈরি হয়। এই ফোর্সের মাধ্যমে নিউট্রন রূপান্তরিত হয় প্রোটন কণায়। এই বলের মাধ্যমে নিউক্লিয়ার ফিউশন রিয়াকশন তৈরি হয় যা সূর্যের মতো নক্ষত্রের অনন্ত শক্তির উৎস। Weak Force-এর বাহককণার নাম W বোসন আর Z বোসন।

আরেকটি মৌলিক বল gravity বা মহাকর্ষ বলের বাহককণাকে বলা হয় গ্রাভিটন। যদিও এখনও পর্যন্ত গ্র্যাভিটিকে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মধ্যে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছিলেন স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এই বিভিন্ন বলগুলিকে একত্রিত করতে। হাই এনার্জি ফিজিক্সে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে তা ধীরে ধীরে করা সম্ভব হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে এরকমই একটি চ্যালেঞ্জ ছিল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স আর উইক ফোর্সকে একত্রিত করা। এই কাজ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এক জটিল সমস্যার সম্মুখীন হন। তখন পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে বোসনদের ভরের ধারণা কীভাবে আসছে তা কারও জানা ছিল না।

তাঁরা দেখেন উইক ফোর্স পারমাণবিক স্তরে এত কম দূরত্বের মধ্যে কাজ করে যে এই বলের বাহককণা W আর Z বোসনের ভর কোনওভাবেই শূন্য হতে পারে না। কিন্তু ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের বাহক ফোটন কণার কোনও ভর নেই। তাহলে W আর Z বোসনের ভর এল কোথা থেকে?

এই সমস্যার সমাধান করার করার জন্য কাজে লাগে পিটার হিগসদের তত্ত্ব। তাঁরা বলেছিলেন মহাশূন্যে এমন এক ক্ষেত্র রয়েছে যার থেকে ভর পায় W আর Z বোসনের মতন মৌলিক কণাগুলি। এই ক্ষেত্রকে বলা হয় হিগস ফিল্ড। যে-কণা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে যত ভালভাবে interaction করতে পারে সে তত বেশি ভর পায়। ফোটনের মতন কিছু কণা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে interaction করে না তাই তাদের ভর নেই। হিগস ফিল্ডের বাহককণার নাম হিগস বোসন। মহাবিশ্ব শুরু হওয়ার হিগস ফিল্ডে প্রচণ্ড আলোড়নের ফলে হিগস বোসন তৈরি হয়েছিল। ক্ষণস্থায়ী এই কণার থেকেই ভর নিয়ে তৈরি হয়েছে আজকের মৌলিক কণাগুলি।

হিগসের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই ওয়েনবার্গ এবং সালেম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স আর weak ফোর্সকে একত্রিত করে ইলেকট্রোউইক ফোর্স তৈরি করেন।

কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা অঙ্ক কষে যে তত্ত্ব বের করেন তা পরীক্ষামূলকভাবে সত্য প্রমাণিত না হলে সেই তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য একই শর্ত প্রযোজ্য। তত্ত্বকে পরীক্ষাগারে প্রমাণ না করতে পারলে অধরা থেকে যায় পদার্থবিদ্যার সাফল্য।

সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা হিগসের তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য কোনও পদ্ধতি ৬০-এর দশকে ছিল না। এছাড়া সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল হিগস বোসন কণার ভর কত হবে সেটিও তখন খুঁজে বের করা যায়নি। কাজেই তখন হিগস বোসন কণা খোঁজা মানে অন্ধকারে পথ হাতড়ানো।

১৯৯০-এর দশকে সার্নের বিজ্ঞানীরা লার্জ ইলেকট্রন পজিট্রন কোলাইডার (LEP) তৈরির একটি প্রজেক্ট শুরু করেন। ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের সীমানায় মাটির প্রায় ১০০ মিটার তলায় প্রায় ২৭ কিলোমিটার লম্বা একটি টানেল তৈরি করা হয়েছিল। এখানে Particle Accelerator-এর মাধ্যমে উচ্চশক্তির ইলেকট্রন এবং পজিট্রনকে বিস্ফোরণ ঘটানোর পর যে কণাগুলি তৈরি হয় ডিটেকটরে তাদের শনাক্ত করা হয়।

এভাবে W এবং Z বোসনের সব ধর্মই বের করা গেল। কিন্তু অধরাই থেকে গেল হিগস বোসন। বেশ কয়েক বছরে শুধু এটুকুই বোঝা গেল হিগস বোসনের ভর প্রোটনের ভরের ১২০ গুণের নিচে হতে পারে না। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অন্য সব কণাগুলিকেই সনাক্ত করা গিয়েছে তখন। বাকি রয়েছে শুধু হিগস বোসন।

ততদিনে হিগস বোসন জনসাধারণের কাছে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে গড পার্টিকেল নামে। ১৯৯৩ সালে নোবেলজয়ী পদার্থবিদ এবং ফার্মিল্যাবের ডাইরেক্টর লিও লেডারম্যান একটি বই লিখেছিলেন হিগস বোসন কণার গবেষণাকে আরও জনপ্রিয় করা তোলার জন্য। তিনি চেয়েছিলেন বইয়ে এই কণার নাম থাকুক Goddamm Particle। কিন্তু প্রকাশকের মনে হয়েছিল এতে অযথা বিতর্ক তৈরি হবে। সুতরাং শেষ পর্যন্ত বইটির নাম রাখা হলো “The God Particle: If the Universe Is the Answer, What Is the Question?” স্বয়ং হিগসও গড পার্টিকেল নামটি কখনও পছন্দ করেননি। কারণ সত্যি ঈশ্বরের সঙ্গে হিগস কণার কোনও সম্পর্ক নেই এবং হিগস নিজেও ছিলেন নাস্তিক। এছাড়া সাধারণ মানুষ এভাবে পদার্থবিদ্যার এক জটিল অঙ্কের সঙ্গে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে গুলিয়ে ফেলবেন যে-কোনও পদার্থবিদের কাছে চিরকালই তা না-পসন্দ।

যদিও প্রকাশকের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। বইটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল এবং তার ফলশ্রুতি হিসেবে হিগস বোসনকে এখনও গড পার্টিকেল নামেই বেশি চেনেন সাধারণ মানুষ।

২০০০ সালের শুরুর দিকেও হিগস বোসন স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল। এই কণার অস্তিত্ব না থাকলে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কোনও মানে হয় না।

সার্নের এরিয়াল ভিউ

 

মূলত এই সম্পর্কিত পরীক্ষা করার জন্যই সার্নে Large Hadron Collider বা LHC তৈরির কাজ শুরু হয় যা সম্পূর্ণ হতে প্রায় ৮ বছর লেগেছিল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এই রিসার্চ প্রোগ্রামে ১০০টি দেশের প্রায় ১০০০০ বিজ্ঞানী যুক্ত ছিলেন।

LHC বিশ্বের সবচেয়ে বড় Particle Accelerator বা কণাত্বরণ যন্ত্র যেখানে একটা বিশাল বড় রিংয়ের মধ্যে উচ্চশক্তির চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে তার মধ্যে প্রোটন বিম পাঠানো হয় এবং দুটি বিপরীতমুখী প্রোটন বিমকে সামনাসামনি ধাক্কা লাগিয়ে প্রচণ্ড শক্তি উৎপন্ন করা হয়। এরপর বিভিন্ন ডিটেক্টরের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হয় উৎপাদিত কণাদের।

লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের স্কিম ডায়াগ্রাম

 

LHC-র রিংটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ কিলোমিটার। প্রোটন বিমটি তৈরি করার পর বিভিন্ন ধাপে এটার শক্তি বাড়ানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত LHC-র মূল রিংয়ের মধ্যে পাঠানো হয়। সেই সময় বিমটির গতিবেগ থাকে প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি। এখানকার ম্যাগনেটগুলিকে Superconducting বা রোধশূন্য করার জন্য এগুলিকে লিকুইড হিলিয়ামের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয় যার তাপমাত্রা থাকে ১.৯ ডিগ্রি কেলভিন। চরম শূন্যের চেয়ে সামান্য বেশি এই তাপমাত্রা মহাবিশ্বের শীতলতম অংশের চেয়েও কম। LHC-র মধ্যে ১০০০-এর বেশি উচ্চশক্তির চুম্বক আছে যা একসঙ্গে ১১ গিগাহার্টজ শক্তি তৈরি করতে পারে। এই পরিমাণ শক্তি ১২ টন কপারকে একেবারে গরম করে গলিয়ে দিতে পারবে। এর ভিতরে চাপ সাধারণ বায়ুর চাপের প্রায় ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ। LHC-র মধ্যে প্রোটন বিমগুলির শক্তি থাকে ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট। এত কিছু করার পরেও এখানে হিগস বোসন পাওয়ার সম্ভাবনা খুব সামান্য। কতটা কম? প্রায় ১০০ কোটি সংঘর্ষ হলে একটি হিগস বোসন তৈরি হতে পারে।

আর তৈরি হওয়ার মুহূর্তের মধ্যে কোয়ার্ক বা লেপটন জাতীয় কণার সঙ্গে interaction করে হারিয়েও যেতে পারে। কাজেই এই পরীক্ষা প্রায় খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতোই। এখানে ATLAS এবং CMS নামে দুটি ডিটেক্টরের সাহায্যে কণাদের সনাক্ত করা হয়। এই কাজ সার্নের প্রযুক্তিবিদদের কাছেও ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষাগারে প্রতি মুহূর্তে কয়েক লক্ষ কোটি সংঘর্ষ হচ্ছে এবং যে বিপুল পরিমাণ ডেটা তৈরি হচ্ছে তা রাখতে গেলে প্রতি ২ মিনিটে একটা করে হার্ড ডিস্ক ভর্তি হয়ে যাবে। সব ডেটা একত্রিত করতে প্রায় ২০ কিলোমিটার জায়গা লাগবে। তার সমাধান করার জন্য গ্রিড কম্পিউটিং-এর সাহায্যে সারা বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে ডেটাগুলো ভাগ করে দেয়া হল।

২০১০ থেকে ১১ সালের মধ্যে ক্রমাগত পরীক্ষা চালানোর পর প্রায় এক বছর তার ফলাফল বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানীরা। ২০১২ সালের ৪ জুলাই তাঁরা ঘোষণা করলেন হিগস বোসন কণার সন্ধান তাঁরা পেয়েছেন। ১২৫ ইলেকট্রন ভোল্টের এই কণার ভর প্রোটনের ভরের প্রায় ১২০ গুণ। সার্নের ডাইরেক্টর জেনারেল Rolf Heuer প্রেস কনফারেন্সে এই ঘোষণাটি করা মাত্র হাততালিতে ফেটে পড়ে সারা হল। এই হলে ছিলেন উপস্থিত ছিলেন সারা বিশ্বের প্রথম সারির পদার্থবিদরা। দশ বছর ধরে চলা এতজন বিজ্ঞানীদের এত পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত সফল হল। খোঁজ পাওয়া গেল স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সেই মিসিং লিঙ্কের। দর্শকদের মধ্যে ছিলেন হিগসও। আবেগে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তিনি। হয়তো ভাবতেও পারেননি তাঁর জীবদ্দশায় এই ঘটনার সাক্ষী থাকতে পারবেন। যদিও হিগস কখনওই এই ঘটনার জন্য কোনও মহান কৃতিত্ব দাবি করেননি। তাঁর মতে এই ঘটনা সামগ্রিকভাবে পদার্থবিদ্যার জয়।

পিটার হিগস এবং ফ্রাঁসোয়া এংলার্ট— ২০১৩ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দুই বিজ্ঞানী

 

হিগস বোসন নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন সার্নের গবেষণাগারে যে বিপুল তথ্য জমা আছে তা বিশ্লেষণ করতে আরও কুড়ি বছর লাগতে পারে। বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে পদার্থবিজ্ঞানীরা যে কাজ করছেন হিগস ছিলেন তার কুশীলব। যদিও তাঁরা জানেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পিছনে যে জটিল রহস্য কাজ করছে তার খুবই ক্ষুদ্র অংশ জানতে পেরেছে আজকের মানবজাতি। এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরকাল অনুপ্রাণিত করবেন হিগসের মতো বিজ্ঞানীরা।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...